গল্প : এক্সপেল : শহীদ ইকবাল

শহীদ ইকবাল ।।

দুলাল মাস্টার কখনও এক্সপেল বলেন না। বলেন ‘এক্সফেল’। আব্বা বলেন এক্সপেল্ট। আর বড় আব্বা ঠিক ব্রিটিশ উচ্চারণে বলেন ‘এক্সপেলডেড’। এ নিয়ে রাশেদের মহাযন্ত্রণা। কারণ, এবার সেনা শাসনের আওতাধীন পরীক্ষা। কোনো তেলেসমাতি চলবে না। তেড়িবেড়ি করলে সোজা লালঘর। চতুর্দিকে প্যান্ডেল করে এবার স্কুলঘরও ঘিরে ফেলা হয়েছে। নকল চলবে না। কিন্তু শফিকে তো পাস করতে হবে! এবার সে সাত সাবজেক্টে অকৃতকার্য হয়ে টেস্টে অ্যালাউ হইছে। শোনা যায়, এই অ্যালাউ হওয়ার জন্য সে চাকুন্দার হাট, বাউলার বাজার, নালদিঘির বাজারসহ নানা বাজারে বাপের চুরি করা ধান আর মায়ের ডিম বেচা টাকা স্কুলের মোটা মাস্টারোক খাওয়াচে। তিনি মাজিদ মাস্টার। মাজিদ মাস্টারকে গুড় আর দামি মাছ কিনি দিতে হয়েছে। সে নিয়া তো বিশাল এক ঝকমারি কাণ্ড। মাজিদ স্যর আবার আগেই বলছিলেন, বড়শির মাছ আমি খাই না। ফলে, জো হুকুম! তবে একদিন রাশেদ দেখছিল, খুব দুপুরবেলা, কাঁঠালতলা দিয়া ঢোলা পাজামা আর পাঞ্জাবি পরা মাজিদ মাস্টার পাটের ব্যাগোত করি সাদা কাগজের কী একটা বের করি দিছিল। পরে দেখে ওটা টেস্ট পরীক্ষার খাতা। এই খাতা দেওয়ার কারণ কী? তাও আবার চুপি চুপি- বাড়ির দেউড়িত আসি দেওয়া… মানেটা কী! ঠিক কিছু বোঝার আগেই মাজিদ মাস্টার পুরানা দুর্বল একটা সাইকেলে চড়ি দ্রুত টান দেন। তবে চক্ষুর আড়াল হলেও ধোঁয়াশাটা কাটেনি রাশেদের, সেটা ভারী হচ্ছিল আকাশ অন্ধকার করার কারণে। বাতাসের বেগও ছিল তখন তীব্র। ওই দুপুরটার রঙ ছিল পাতলা ওড়ানো ছাইয়ের মতো। দূরে গাঙচিল উড়ছিল। বুড়া কাঁঠাল গাছটার তলায় তখন জমাট ঠান্ডা। এদিকে বুদা মিঞা তখন চ্যাগার বোনার কাজে ব্যস্ত ছিল। সে নানান কাজে খুব তাড়াহুড়ায় থাকে। এই বুদাটাকেও তার সামলানো কম কথা নয়। সে সর্বদা আনছার বিড়ি টানে আর ট্যারা চোখে তিরতির করি বাইরে তাকায়। কাজে যত ফাঁকির তৎপরতা। মাঝেমধ্যে সে এ কাঁঠালতলা দিয়া যাওয়া-আসা করে। বিড়ি টানে আর রাস্তার মানুষ গোনে। এতে করে তার কাজের ফাঁকি দেওয়াটা ভালোই হয়। ঘোরাঘুরিটা হয়- অসুবিধা কী! নির্মল সবুজ পাতা কি এক ইঙ্গিতে বাতাসে তখন কাঁপতে থাকে। সত্যিই ছন্দ ছিল না তাতে। বাবুই আর বাচ্চা কাঠবেড়ালি হরহামেশা তাতে কথা ছাড়া ফুচকি মারছিল। তখন হঠাৎ শফিক দৌড়ি আসি ঘরোত ঢোকে। তারপর হাফপ্যান্ট পড়া সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রাশেদকে বেশ ব্যস্ততার তালে ডাকাডাকি শুরু করে। রাশেদ এলে কী এক প্লেন পাতায় বই দেখে দেখে ওরা লেখা শুরু করে। কিছু প্রশ্ন সল্ভ হচ্ছিল না- তাই রাশেদকে ডাকতে শুরু করে শফি। রাশেদ অপ্রস্তুত হয়। ‘হি কিল্ড হিমসেল্ফ’ ভয়েজটা কী? এর মাঝে কে যেন বাঁশি ফুঁকায়। তখন কাগজপাতি ফেলে দিয়া সব দৌড়ি পালায়। এসব পুলিশি আতঙ্ক যাই হোক, এভাবে পাস না করলেও শফির টেস্ট পরীক্ষাটাও তো আটকে যায়! এখন অনেকটা পথ পেরুনোর পর, শুকনা ক্ষেতের ধান আর জীবনের ধারণা একাকার হয়া চলে। একদিন পাশের কোনো এক স্কুলে গিয়া সে দুলাল মাস্টারকে হায়ার করি আনে। শর্ত, যত কড়াকড়িই থাকুক, তাকে ম্যাট্রিক পরীক্ষাত পাস করাতেই হবে। সেজন্য বহু রকম শলা-পরামর্শ চলে। প্ল্যান অনুযায়ী পরীক্ষা চলার এক ঘণ্টা পর সে স্কুলঘরের পেছনে কোনো এক কোটার ঘরোত আউট হওয়া প্রশ্নের সমন্বয়ে নতুন বইটা কাটা হবি। সেখানে প্রস্তুতকৃত প্রশ্নের উত্তর হাঁটুর নিচে বেঁধে পরীক্ষার হলোত ঢুকপি। এ লক্ষ্যে আগের দিন বড় হাটে গিয়া লুঙ্গি ও ইলাস্টিক কিনছে। এই ইলাস্টিকের ভেতরেই শফির পরীক্ষা পাসের স্বপ্ন তৈরি হয়। বলা যায়, পেন্ডুলামের মতো আশা-আকাক্সক্ষায় দুলতেও থাকে। হায়রে চওড়া ইলাস্টিক! উহার দাম কত? সে এখন তাহার স্বপ্নের সমান হয়া বড়। এই ইলাস্টিক পায়ে আটকাইয়া শফি সারারাত নির্ঘুম প্র্যাকটিস করে। স্বপ্নের ভেতরে সে টের পায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হইলে আকাশের তারা হাতে পাইবে। এই তারা তার আসমান-তারা। সে জীবনের চায়া বড়। সমাজের মান-মর্যাদা, প্রেম-ভালোবাসা, মায়ের বুক-উঁচা ডুলির ধান, তাগড়া হাঁসের ডিম আর ডেকি মুরগির দাম সব সমানরূপে আটকানো আছে ওই ইলাস্টিকে বান্দনোত। যেভাবেই হোক এবার পাস করা নাগবেই। খুব রোমাঞ্চকাতর মনে পরীক্ষার দিন সে ভোরে সূর্য দেখে। ক্রমশ উদীয়মান সূর্য, দিনের আলো ফোটায়। আজ এই সূর্যই তাহাকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলিয়াছে। যেভাবেই হোক ইলাস্টিকে সে সব বান্ধিয়া নিয়াছে- গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস কিংবা গালিভারের ডিমভাঙ্গা যুদ্ধের কাহিনি। এই দুইটা পরীক্ষায় আসপিই যে! আশা কখনও নিরাশ হয় না। ভোরের আজানের মধ্যেই সে তাহাজ্জুত শেষ করে। তারপর আড়মোড়া ভাঙিয়া ফজরের দুই ওয়াক্ত আর জরুরি দুই রাকাত নফল নামাজ শেষ করে। এই রঙিন সময়ে বাড়ির ওসরা থাকি মায়ের ডাক আসে। শুধু তাই নয়, পাড়া-পড়শি সকলেই তাহার প্রতি বেশ উদ্যোগী হয়। আয়োজনের ব্যাপারে সমীহ আরোপ করে। আজ যে শফির পরীক্ষার দিন! এ পরীক্ষা সকলের মনে যেন কোকিলের উৎসব বহাইয়া আনিয়াছে। সে উৎসবে পুকুরপাড়ের বড় গাছটায় শিমুল ফুটিয়াছে, ওদিকে বকুল ঝরিয়াছে আর দেখা দিয়াছে কড়া মোরগফুলের রঙের বিষাণ-ওঙ্কার। সকলেই শফিককে নিয়া মাথা বুলাইয়া আদর করে। পরনে তাহার ইলাস্টিক আর খরখরে দামি প্ল্যাকার্ড লুঙ্গি। এই লুঙ্গিতেই আজ তাহার স্বপ্নসিঁড়ির অভিষেক রচিত হইবে। এভাবে যখন সব আয়োজন সম্পন্ন- তখন নওশার আর বাকি কী! এই সেই নওশা- যেন বিবাহ করিতে যাইতেছে। তাই দোয়া চাই। সালাম আর দোয়া নিয়া সে আগাইয়া যায়, বড়বাড়ির দিকে। ওখানে মুরুব্বির আশীর্বাদ নেয়। সকলকে পায়ে ধরিয়া সালাম করে। মসজিদের সামনে দাঁড়ায়। তারপর নীরব পায়ে বিসমিল্লাহ বলিয়া রওয়ানা দেয়। কাঁচা রাস্তা মাড়াইয়া, তমিজের বাড়ির পাশ দিয়া, সখিনার জাংলি শিমের বাগান পার হইয়া, বড় ড্রেসের পাশের রাস্তা পার হইয়া, মেঝ মিঞার পুকুরের পাড় ধরিয়া, সবুজ ধানক্ষেতের সীমানা ধরিয়া বড় সড়কের দিকে সম্মুখে আগাইয়া যায়। সঙ্গে এ পাড়ার আরও লোক থাকিলেও সে এখন বড় ঘরের দামি পরীক্ষার্থী। কলেমা আর কপির আনন্দ যেমন আছে, সঙ্গে তত দৃঢ় হইয়াছে সক্কলের চোখকে ফাঁকি দিয়া চুরির জগতে রাজা সাজিয়া বিরাট পরীক্ষার্থী হইবার আনন্দ। সে আনন্দে থাকে ভয় আর অশ্রু মাখানো। তবে অনেক মানুষের মেলা পার হইয়া একসময় শফি একাকী হইয়া গেল। সে এবার পরীক্ষার্থী। পরীক্ষার কক্ষে বসা ভিআইপি। সক্কলকে ছাড়িয়া সে নির্ধারিত আসনে বসিলে নিচের ইলাস্টিক একবার পরীক্ষা করিয়া নেয়। প্রশ্ন পাইলে সে প্রথমেই গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস লিখিতে বসে। বইয়ের নকল পাতা ইলাস্টিকের ফাঁক হইতে খাতার নিচে আসিয়া বসিলে শিক্ষকগণ বুঝি টের পান নাই। পুরানা স্কুলঘরের পলেস্তারা পড়া দেয়ালে মাকড়সা নিজের মতো তখন ঘর বান্ধে। ছয় পায়ে বেড়ায়। উপরের চাটাইছাদে ঘুরি বেড়ায়। চাটাইয়ের ওপরে বুঝি টিনের চাল- সেখানে ইঁদুর আর বিড়াল খেলা করে। হুড়মুড় করি যখন পটপট দৌড়ায়, সেই শব্দের সাথে তাল মিলিয়া শফি নকলের চোথাটা খাতার তলোত নেয়। চোথার পড়পড়ানির মলিন ধ্বনি আর ইন্দুর-বিলাইয়ের তড়তড় আওয়াজের টাটকা ধ্বনি একত্র হইলে হলের ডিউটিরত মাস্টারদ্বয় সঠিক মনোযোগে আসীন হইতে পারে না। তাহারা আবুল দারোয়ানকে কী যেন বলে- সেই সুযোগে শফির কপি করার কাজ শুরু হয়। চতুর্দিকে নজর রাখার মতো কয়েকটি কাজ তখন একসঙ্গে চালানো কঠিন হয়। দক্ষতাও দেখাতে হয়। শফি দুমদুম করি লিখিয়া যায়, শিস কলমের কালি ভুলভাল নাকি অস্পষ্ট নাকি কলকব্জা ছাড়া যাই হোক- কে একজন অধিক নীরবতার আহ্বান জানাইয়া কন, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আইছে। তখন শফির মাথা নষ্ট। এখনও গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস লেখা হয় নাই, তার তো বাইরে গিয়া ভয়েস-ন্যারেশনের সমাধান নিয়া আসতে হইবো, সময় তো এক ঘণ্টার বেশি গেল- তখন সে অস্থির হয়। ম্যাজিস্ট্রেট সাবের অবস্থান জানার চেষ্টা করে। আবুল দারোয়ান এখন নিজেই যেন ম্যাজিস্ট্রেট। তাহার খোঁজ পাওয়া কঠিন। তবে কেন সে কাল মুরগিহাটিত দুইশ’ টাকা নিল? কোনো কাম তো করে না! ওদিকে শিক্ষকদের তৎপরতা দ্বিগুণভাবে বাড়লে কখন যেন ইঁদুর-বিলাই চলিয়া যায়, মাকড়সার দল স্থির হয়া দাঁড়াইয়া থাকে। মাঝে মাঝে ফুচকি মারে। ফলে কপি করার কাজটা অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়ে। তখন সে খাতার মধ্যে নকল রাখিয়াই কী সব গুরুত্বহীন বাজে লেখা লিখিতে থাকে। মনে মনে ভাবে একটু পরেই সে মোতার ছল নিয়া বাইরে যাইবে। এই কড়াকড়িতে তার সব জেলখানা মনে হইতেছে। জেলের দুয়ার সে দেখে নাই কিন্তু তা যে অতিশয় কঠিন সেটা কে না জানে! এভাবে মনের মধ্যে যখন দুরন্ত হাওয়া ঢোকে, তখন চট্টাৎ করি ম্যাজিস্ট্রেট সাব ঢোকেন। কডের প্যান্ট পরা শাদা রঙের পাট করা শার্টে ভদ্রভাবে হাঁটেন, তাকান- চলেন এবং পাশের কয়েকজন পার হয়া কন, ‘তুমি দাঁড়াও- খাতাটা তোল।’ কিছু পান না। আবার বলেন, ‘বেরিয়ে আস। নিচ থেকে তোল।’- এই ‘কে আছেন, ওকে এক্সপেল্ট করে দিন’। এর মধ্যেই ছেলেটি যখন মিনতির স্বরে দৃঢ়তার সঙ্গে পা জড়াইয়া ধরে তখন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব কথা বলেন না। শিক্ষকগণ ছাড়ানোর চেষ্টা করলে, হুম হুম করিয়া গরিবের ছেলেটি কাঁদিয়া ভাসাইয়া দেয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেট সাব বারান্দায় এলে এক্সপেল হওয়া ছেলেটা আবার সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা চালাতে থাকে। তখন চতুর্দিকে রব ওঠে- রহমতপুর থানার তেরো নং ইউনিয়নের নতুনপুর গ্রামের রাঙা মিঞার ছেলে আর পরীক্ষা দিতে পারিবে না। সে নকলের দায়ে এ বছরের জন্য পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার হইয়াছে। এমতাবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের ক্ষমতার দাপট চতুর্দিকে রঙিন বিলোড়ন তোলে। শুধু স্কুল প্রাচীর পরিবেষ্টিত এলাকা নয়, দক্ষিণে বড়বিলার বাতা উত্তরে বাজস্ট্যান্ট, পুবে দাখিল মাদ্রাসা আর পশ্চিমে দেউলাপুর পর্যন্ত এই ঘটনা ছড়াইয়া পড়ে। একজন নয়, পর পর কয়েকজনের নকলের দায়ে পরীক্ষা বাতিল হওয়ার খবর ছড়াইয়া পড়ে। কারও কারও ফিট লাগার খবরও রটিয়া যায়। কিন্তু কেউ যখন সত্যিই অচেতন হইয়া পড়ে- তখন তার শুশ্রুৃষার জন্য বহুলোক আগাইয়া আসে। কেউ পানি ঢালে, কেউ-বা বইয়ের মলাট দিয়া বাতাস করে, কেউ-বা কোনো কুঞ্জছায়ায় নিয়া ফুঁৎকার দিতে শুরু করে। আর এর ফাঁকে ফাঁকে ম্যাজিস্ট্রেটের গুষ্টি উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। কেউ কেউ তাহাকে কী করিয়া অপমান করা যায়, তার পরিকল্পনা করে। একজন অভিভাবক বলেন, নকল করা কোনো অপরাধ নয়, নকল ধরা অপরাধ, এক-আধটুক দেখি লেখলে কী হয়- বারে! আবার কেউ কেউ ম্যাজিস্ট্রেটের শিক্ষা-দীক্ষা নিয়া প্রশ্ন তোলেন। একজন সাপ্লাইয়ার শিক্ষক বলেন, শালা লেখাপড়া কিছু জানলে তো হবি, শালার ত্যাল হচে- গাড়িত চড়ি বেড়ায়। এমন কথার মাঝে, বহু জনতার ভেতর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের গাড়ি ঢুকিয়া পড়ে। তখন সব ভয়ে সুনসান হয়। এলোমেলো গুঞ্জনও থামিয়া যায়। যারা বাজে কথা বলছিল তারাও চুপ করি মুখ ফিরায়। কিছু কিছু গুঞ্জন জলপাই গাড়ির খোলা কাচের ভেতর দিয়া ম্যাজিস্ট্রেটের কানে আসিয়া পড়ে। কখনও তিনি তা কানে নেন, কখনও নেন না। কিন্তু একটি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করিয়া হাজার হাজার লোকের যে সমাগম- আর তা যখন রাস্তাঘাট দোকান বাড়িঘরসহ বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়ে- তখন বহুবিধ প্রশ্নে আকুল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব হঠাৎ একজনকে ডাকিয়া নিয়া কন, ‘আপনি কী করেন, কেন এখানে আসছেন?- ‘আমি করিমগঞ্জ হাইস্কুলের মাস্টার, পরীক্ষা দেখতে আসচি’। তখন চার চাকার গাড়ি থামি যায় এবং চতুর্দিকে উৎসুক মানুষের কেন্দ্র হইয়া দাঁড়ায় জিপ গাড়িটি। ম্যাজিস্ট্রেট কন, ‘স্কুল ছেড়ে আপনি এখানে কেন?- আপনার চাকরি নাই?’ তখন সে গাইগুই করে- ‘আমি এডুকেশন অফিসারকে বলছি।’ এভাবে ম্যাজিস্ট্রেট যখন ঘরে-বাইরে বড় ক্যারেক্টারে পরিণত হন, তখন পরীক্ষার আর মাত্র পঁচিশ মিনিট বাকি থাকে। সেই পঁচিশ মিনিটে হুট করি গাড়ি ঢুকিয়া যখন তিনি হল পরিদর্শনে যান, তখন শফি হুড়হুড় করি ইলাস্টিক জড়ানো পায়ে হলের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করে এবং হঠাৎ ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের চোখে সবটুকু আটকাইয়া যায়। একজন পরীক্ষার্থী কেন বাইরে- আর বাইরে থেকে ফেরার মুহূর্তে তার পায়ে এসব কী! সে কেন বাইরে গেল এবং আলগা ইলাস্টিক, যখন সব নকলপত্র নীচে নামিয়া আসিয়াছে এবং কিঞ্চিৎ দৃশ্যমান হইচে- তখন ম্যাজিস্ট্রেটের মনে অলক্ষ্যে এসব কীর্তির কারণে একপ্রকার হাসির উদ্রেক করে। এই উদ্রেকের ভেতর সে বলে, যত কষ্ট- কপি দেখে লেখায়, তত সময় নিয়ে পড়লে তো ভালো ফল পাওয়া যেত। কিন্তু কথাগুলো শফি ঠিক বুঝতে পারে না। পড়াশোনা করে পরীক্ষা দেওয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না- এটা আজকাল কেউ করে না! উনি পাগলের মতো কী কন- তবে ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্ভট নীতিকথার তলে কী এক দরদ আসিয়া পড়িলে পায়ের গোছার ভেতরে ইলাস্টিকে আটকানো সবগুলা কাগজ আবুল পিওনকে খুলিয়ে নেওয়ার অর্ডার দিয়া তিনি চলিয়া যান। তবে শফি তখনও পরীক্ষা হল থাকি বহিষ্কার হয় নাই। সে আগামীকাল পরীক্ষা দিবে, কিন্তু আজকের পরীক্ষায় প্রথম দিকের তিন পৃষ্ঠা ছাড়া নকলের সুযোগ না পাইয়া বাকিটা ফাঁকা রহিয়া গেল। ফলে এ বিষয়ে তার আর পাস করার সুযোগ নাই। যদি একমাত্র অলৌকিকভাবে রহমত পয়দা হয়- তবে আলাদা কথা। সেজন্য পরবর্তী পরীক্ষাগুলো এখন তার নকলের মহরত করা, আর ড্যাম কেয়ার হয়া ম্যাইজস্ট্রেটের চোখ ফাঁকি দেওয়ার রেহার্সেল- যা এ বছর ফেল করার পর পরের বছরে আবার কাজে লাগিবে। কিন্তু সেজন্য যে ফর্ম ফিলাপের টাকার দরকার হবে তা আগামী হাটবারেই নিশ্চিত করতে হবে। নইলে পশ্চিমের জমির ধান শেষ হলে পরবর্তী সময় আসতে হয়তো হাটের দাম পড়িয়া যাইতে পারে।

শহীদ ইকবাল : কথাসাহিত্যিক

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares