গল্প : দৈব সংযোগ : জুলফিয়া ইসলাম

জুলফিয়া ইসলাম ।।

এসব নিয়ে ভাবাভাবি প্রায় ছেড়েই দিয়েছে শফিক। আর কত ভাবা যায়?

বহুজাতিক কোম্পানির একজন বড় প্রশাসনিক কর্মকর্তা সে। তার ভাবাবেগ মানায় না। ভাবাবেগকে প্রশ্রয় দেওয়ার অর্থ নিজেকে ছোট করে ফেলা। ডিসিশন মেকার মানুষটি শুধু পাত্রী পছন্দের বেলাতেই কোনো ডিসিশন নিতে পারে না। এক্ষেত্রে পরিবারের সিদ্ধান্তই তাকে মেনে নিতে হয়েছে। অতি আধুনিক রীতিনীতিতেই পাত্রী দেখে থাকলেও এসব রীতিনীতি শফিকের কখনও পছন্দ নয়। তবুও এর চাইতে কোনো উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা যে আর হতে পারে না সেটা শফিক যেমন বোঝে, তেমনি তার পরিবারও বোঝে।

কনে দেখা আর কনে দেখা! নিয়তি এখনও প্রসন্ন হয়নি। যাত্রাপথে টিকিট কাউন্টারে এসেই চোখাচোখি হয়ে গেল একটি মেয়ের সাথে। দীপ্ত অবয়ব নিয়ে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে বাস কাউন্টারের কাছে। শফিকের দৃষ্টি পড়ে তার ওপর। ঝলসে ওঠে চোখ দুটো। কী অদ্ভুত শ্যেন দৃষ্টি মেয়েটির। কোনো একটা ছুঁতোয় চোখের দিকে তাকিয়ে পুরো শরীরের ওপর নজর ফেলে শফিক। যথার্থ- কাঠামোর প্রশংসা না করে পারে না শফিক। সুন্দরী প্রতিযোগিতার মাপজোখের হিসেবেই এই নারীর শরীর সুগঠিত।

শফিকের গন্তব্য নোয়াখালি। কে জানে মেয়েটি হয়ত অন্য কোথাও যেতে পারে। এখানে দক্ষিণবঙ্গের বাস সার্ভিসের সব যাত্রী ভিড় করে রয়েছে। যদি একই পথের যাত্রী হতো, তাহলে হয়তো আবার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এটুকু ভাবতেই ভালো হয়ে গেল মনটা। হঠাৎ আবারও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েই ভাবতে বসল- যে বাড়িতে ওরা পাত্রী দেখতে যাবে সেখানে কীভাবে পাত্রীর সাথে কথা বলবে। যদিও এ-যাবত এসব নিয়ে খুব একটা আগ্রহ তার হয়নি কখনও। এবার একটু আগ্রহ জন্মেছে ঘটকের কথায়। যে বাড়িতে ওরা যাবে সে বাড়ির মেয়েটি দেখতে যেমন তেমনি ওদের পারিবারিক একটি ঐতিহ্যও নাকি আছে। এই ভাবনার মধ্যে থেকেই কোন ফাঁকে সে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে উঠে বসেছে। পিছনের ছড়িয়ে দেওয়া প্রশস্ত আসনে শুয়ে শুয়েও গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। শফিক জানালার পাশের নিজের আসনটিতে আরাম করে বসে বাইরের লোকজনের চলাচল দেখতে লাগল। মনে মনে একবার মেয়েটিকে দেখতে ইচ্ছা করল। এখান থেকে মেয়েটিকে চোখ ভরে দেখা যেত। কিন্তু মেয়েটি গেল কোথায়। উধাও হয়ে গেল নাকি অন্য কোনো বাসে উঠেছে? কে জানে। সে অনুভব করল পাশের সিটে কেউ যেন এসে বসেছে। সে ফিরে চাইল না। মিনিটখানেক পরেই নাকে তীব্র একটা ঘ্রাণ এসে ধাক্কা দিলো।

ঘ্রাণটার উৎপত্তিস্থল নির্ধারণ করতে গিয়ে পাশে ফিরে হতভম্ব হয়ে গেল শফিক। সেই কাউন্টারের মেয়েটি তার পাশে এসে বসেছে। সে অবিশ্বাসের চোখে মেয়েটির আপাদমস্তক দেখল। না সেই মেয়েটিই তো। এমন সুন্দরী মেয়ের পাশ ঘেঁষে বসে আর একটি পাত্রী দেখতে যাবে। এ-ও কি হয়।

নিজেকে কেমন যেন বোকা বোকা ঠেকছে। সে স্মৃতি ঘেঁটে একবার দেখার চেষ্টা করল, এমন সুন্দর মেয়ে কি এর আগে কখনও দেখেছে? সুন্দরী তো অনেক দেখেছে। কিন্তু এ তো চমকে ওঠার মতো।

কাজল টানা মায়াভরা আয়ত চোখ দুটো ঠিক যেন সাদা-কালো যুগের নায়িকা। এমন সুডৌল, মাথাভর্তি কালো কেশের বন্যা শফিক আগে কখনও দেখেছে বলে মনে হয় না। নিশ্চয়ই এমন স্তুতিবাক্য মেয়েটি এর আগেও অনেক শুনেছে। এসব মেয়ে মুখের ওপরও বলতে ছাড়ে না- সুন্দরী মেয়ে দেখলেই আপনারা এমন ছোক ছোক করেন ক্যান? দেহ ঢাকতে জামার ওপর শরীরে ওড়না পেঁচিয়ে রেখেছে। নিজের দৈর্ঘ্য জানা আছে বলেই হাইহিলের বালাই নেই। ফর্সা পা দুটোয় ফিতেওয়ালা স্যান্ডেল। এমন দৃপ্ত ভঙ্গিমাকে অবজ্ঞা করা যায় না কিছুতেই, কোনোভাবেই।

পার্শ্ববর্তিনীর দিকে আড়চোখে তাকাতেই দেখল ভাবলেশহীন দু’চোখে কী যেন একটা বই পড়ছে। আকার দেখে মনে হচ্ছে পাঠ্যবই। শফিক এবার আর চোখ ফিরিয়ে নিলো না। কোথাও যেন সুচিত্রা সেনের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছিল। এ মুহূর্তে কেমন যেন সফল মনে হচ্ছে নিজেকে। সাফল্য ভাবতে গেলে সেই সিঁড়িতে তার প্রতিটি পদক্ষেপ জানিয়ে দেয়। এমনিভাবেই পাত্রীদের বাড়িতে ঘুরে ফেরা সফল হতে কি তাকে বাকি রেখেছে? অভিভাবকের পরিপূর্ণ চাওয়ার কাছে সে তার বঙ্কিমী সাহিত্যপ্রীতিকে দূরে ঠেলে দিয়েছে সেই কবে কোন বেলায়। কিন্তু এ মুহূর্তে এই মেয়েটি তাকে অভিভূত করে রেখেছে। বঙ্কিমী চালের কাছে তার প্রফেশনের হাবভাবকে কেমন তুচ্ছ ঠেকছে। শফিক তার আত্মীয় মহলে খুব আদর যতেœ দুধকলায় মেতে রয়েছে। কী করতে ভালো লাগে এসব তো চিতার আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছে কবেই। তাকে এখন বাজারি হিসাবেই সবাই মেপে চলে। বন্ধুমহলে তো বিশেষ খাতির-যত্নের কোনো কমতি নেই। এতকিছুর পরেও কোথায় যেন একটা কিছুতে হোঁচট লেগেই যায়।

পাশে বসা সুন্দরী মেয়েটিকে আমলে নিতে হবে। এদের কাছাকাছি থাকাটাও হৃদযন্ত্রে বিপদ বয়ে আনা। হার্টবিটের গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হতেই থাকে। জগতে সুন্দরের কাছে সবকিছুই নিষ্প্রভ হয়ে যায়। মেয়েটির উচ্চতার কাছে নিজের উচ্চতা একটু কম ঠেকছে। মুখের সৌন্দর্যও কেমন ম্লান মনে হচ্ছে। তবুও কথা শুরু করবে কীভাবে শুধু ভেবেই চলেছে। কিছু একটা অজুহাত দিয়ে তো শুরু করতেই হবে।

আপনার পরীক্ষা সামনে বুঝি?

মেয়েটি চোখ তুলে চাইল। একটু মুচকি হেসে চোখ সরিয়ে নিলো।

আমি তো এমনভাবে গাড়িতে পড়তেই পারব না।

সুন্দরী মেয়েদের মাথায় যে ঘিলু কম থাকে এটা ওর পড়ার প্রতি মনোযোগ দেখেই শফিকের মনে হচ্ছিল। মেয়েটি যে মনের টানে পড়ছে না, শফিকের এ মুহূর্তে সেটাই মনে হচ্ছিল শুধু। বাংলায় প্রচলিত ‘সুন্দর গাধা’ কথাটি আওড়ালো আবার মনে মনে। কিছুটা অহংকারও বোধ করল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রশ্ন করল, কোথায় যাচ্ছেন?

নোয়াখালি।

আমিও তো।

নিজের কণ্ঠ নিজের কাছেই উল্লসিত শোনাল। শফিক কেমন জানি একটা টান অনুভব করছে। দক্ষিণাঞ্চলের এটি একটি ব্যবহারের মুদ্রাদোষ। কিন্তু কই মেয়েটির এসব নিয়ে কোনো উৎসাহ টের পাচ্ছে না। এমন অনাগ্রহী মেয়ের সঙ্গে যেচে পড়ে কথা বলতে কেমন যেন অপমান বোধ হচ্ছিল। নিজেকেও এখন আর প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলে মনে হচ্ছে না। নিজের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম বলেও এটা নিয়ে তার এমন কোনো ভাবনা মনে হয়নি। এমন অদ্ভুত ভাবনাও কোনোদিন মনে আসেনি যে, ওর চেহারার সাইজটাও একটু ছোট। এ মেয়েটি কেমন যেন তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। এমন নরম ভাবনা তাকে আচ্ছন্ন করে তোলে। শক্ত হতে গিয়েও পারছে না সে। নিজেকে প্রমাণ করতে পারছে না সে কোনোভাবেই।

আপনার বুঝি সামনেই এক্সাম? আমি অবশ্য পরীক্ষার সময় খুব একটা লেখাপড়া করতে পারতাম না।

না, আমি আবার পরীক্ষার আগে লেখাপড়া না করলে মনে রাখতে পারি না। মেয়েটির কণ্ঠে একটা দৃঢ়তা আছে। মূর্খদের যে অহংবোধ থাকতে পারে এই সুন্দরীটাকে দেখে এ মুহূর্তে এর বেশি কিছু ভাবতে পারছে না শফিক। মন লাগিয়ে পড়ছে মনে হচ্ছে না। পড়া মনে থাকে না তাই পরীক্ষার আগের রাতে বই খুলে রাখা চোখের সামনে।

আপনার পরীক্ষার হল কোথায়?

না, আমি এখন নোয়াখালি যাচ্ছি আমার বাড়িতে।

ওহ! আপনার বাড়ি নোয়াখালি।

এবারও উল্লসিত শোনালো ওর কণ্ঠ। মেয়েটির প্রতি কি তার উৎসাহ আরও বেশি বেড়ে গেল নাকি? মেয়েটি এবার বই বন্ধ করে তার হাতব্যাগের ভিতরে হাত দিলো। টুকটুকে লাল লিপস্টিক লাগানো ঠোঁটটায় আরেকটা লিপস্টিকের আঁচড় দিলো। এবার শফিকের মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। এমন সুন্দরী মেয়ে তাকে লিপস্টিক ঘঁষতে হবে কেন। জ্যামিতিক নকশায় এঁকেছেন স্রষ্টা তাকে। ইতোমধ্যে গাড়ির সবগুলো বাতি নিভিয়ে হালকা বাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আশপাশের বাসগুলো শাঁই শাঁই শব্দে ছুটে চলেছে। শফিক আশপাশে তাকিয়ে দেখল। বাসের দুলুনিতে প্রায় সব যাত্রীই নিদ্রাচ্ছন্ন। মেয়েটিও কিছুটা সময় মাথা হেলিয়ে দিয়েছে তার সিটে। সব মানুষেরই ঘুমের কিছু নির্দিষ্ট সময় থাকে। তবু যানবাহনে মানুষ কেমন যেন অসময়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

শফিকেরও মন চাচ্ছে মেয়েটির মতোই হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে থাকতে। এ সময়ে স্বপ্নাচ্ছন্ন থাকতে খুব মন চায়। কল্পনার পাত্রীটিকে মনে মনে এঁকে ফেলল হৃদয়ে। চমৎকার একটি মেয়ে। মাথায় ঘোমটা টেনে ট্রে হাতে তার সামনে চা নিয়ে এসেছে। মেয়েটির চুল থেকে যে ঘ্রাণ উড়ে আসছে সেটি হালকা বেলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ মাখানো। ফুল আর ফুল। চারিদিকে ছড়ানো-ছিটানো কত ফুল। ছুটে ছুটে যাওয়া স্বপ্নগুলো। এই আসে খুব হৃদয় ছুঁয়ে। এই আবার নাই হয়ে যাচ্ছে। এসব কিছুই সত্য নয়, শুধু গন্ধটাই সত্য। স্বপ্নময় হলেও ভালো লাগছে বেলি ফুলের গন্ধমাখা মেয়েটির চুলের গন্ধ। কী শ্যাম্পু ব্যবহার করে মেয়েটি? মাতালের মতোই লাগছে। অজ্ঞাতে আর অনিচ্ছায় হলেও পাশের মেয়েটির চুলের ঘ্রাণই কি তার নাকে এসে ঠেকছে? কিছুটা সময় পাশাপাশি অবস্থানে ভালোলাগা মনটা অভিমানে বিভোর হয়ে ওঠে। চাইলে তো এমন একটা মেয়ের সান্নিধ্য পাওয়া কি খুব কঠিন ছিল তার মতো সফল ব্যক্তির জন্য? নিজের ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে এমন পাশ কাটিয়ে গেছে কত সুন্দরীর চকিত চাহনিকে। অথচ একটা সময় দীক্ষা বলেছিল, ওহে যুবক সময় থাকতে করো না হেলা, করো না হেলা।

সুন্দরী দীর্ঘ সময় তার পাশের সিটটাতেই বাহুলগ্না হয়ে রইল আর শফিক কিঞ্চিৎ ভয়ে চোখ মুদে রইল। পাছে সে আবার কোন দোষে দোষী হয়ে পড়ে। নারী-পুরুষ সম্পর্ক তো এমনই ঠুনকো। ক্যালকুলেশন করতে গিয়ে ঘুমের ভানে মাথা এলিয়ে দিয়ে থাকা। পথিমধ্যে চা-নাশতার জন্য কিছুটা সময় বিরতি। মেয়েটি ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছে। শফিক চোখ মেলে চাইল না। হেলপার এগিয়ে এসে বলল, আপা আপনার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে নিন। জায়গাটা খুব বেশি সুবিধার না। স্বামী শব্দটি শোনার পর শফিক কেমন  যেন চমকে ফিরে চাইল। অনুচ্চ স্বরে বলল, না এই তো আমিও নামব। বলতে বলতেই নিরাপত্তার সন্ধানে মেতে থাকা মনটাকে ভাঙতে ইচ্ছা করল না। আরও কিছুক্ষণ বসে থাকতে মন চাইছে। সবার কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। গাইড ওদের সামনে সামনে চলেছে। নিদ্রিত মন আর নিদ্রিত শরীর নিয়ে সিট থেকে নড়তে মন চাইছে না শফিকের। একটু নড়াচড়া আর নিশ্বাসেই বোঝা যাচ্ছিল অনেকটা পথ সে ঘুমিয়েই কাটিয়েছে। ঠিক যথাসময়ে বাস এসে টার্মিনালে ভিড়ল। ঘুমিয়ে পড়াতে নিজের প্রতি নিজে অকারণেই বিরক্তি বোধ করতে লাগল। সাবলীল ভঙ্গিতে যাত্রীরা যে যার মতো নেমে যাচ্ছিল। নেমেই প্রথমে বাস টার্মিনালের ওয়াশরুমে ঢুকল। শার্টের বুকের দিকে তাকাতেই কেমন যেন বেলি ফুলের ঘ্রাণটি ফিরে এলো আবার নাকে। নারীসঙ্গ বিবর্জিত জীবনে শ্যাম্পুর ঘ্রাণকে বেলি ফুল ছাড়া আর কীই-বা ভাবা যায়। একটি পরিণত বয়সের যুবতীর পাশে বসে এসেছে। এসব গল্প-উপন্যাসে মানায়। বাস্তব চরিত্রে এমনটি ভাবলে কি আর চলে। এসবকে পাত্তা দিতে না পেরে মনে মনে তৃপ্ত বোধ করে সে। এ রকমটাও আবার মনে হয়- জগতে নারীর সৌন্দর্য উপভোগের চেয়ে উপভোগ্য হয়তো অন্য কিছু নেই।

পাত্রী দেখতে ওরা যে বাড়িতে এসেছে, সেখানে আয়োজনে ওরা পুরো পরিবার বিমুগ্ধ। শফিকের নিজেকে গর্বিত মনে হতে থাকে। পারিবারিকভাবে সম্বন্ধ এবার। এ বিষয়ে আর কোনো কথা চলে না। আধুনিক ছেলে বলে নিজের মন-মানসিকতা বেশ উন্নত হলেও এ মুহূর্তে পরিবারের মতকেই উৎকৃষ্ট বলেই প্রাধান্য দিতে হবে। কনে বাড়ির বিশাল আয়োজনে নিজেকে বেশ বাবু-ই মনে হচ্ছিল। লোকজনের মধ্যে মার্জিত রুচি তেমন না থাকলেও আন্তরিকতার বিন্দুমাত্র অভাব নেই পরিবারটির। বিকেলের চা-নাশতার আয়োজনের পরেই বড় রকমের ভোজের আয়োজন আছে। আদর-আপ্যায়নে বোঝা যায় পুরোনো সম্ভ্রান্ত ঘরের বাসিন্দা এরা। মাত্রাতিরিক্ত আয়োজনে নিজেকে ত্যক্তবিরক্ত মনে হচ্ছিল। এখনও কনে দেখা হয়নি। শুধু এটুকুর অপেক্ষা। সবাই বলাবলি করছিলÑ নিয়তিতে থাকলে নাকি ঘটনা ঘটেও যেতে পারে। নিয়তির বিষয় নিয়ে জল ঘোলা করা আদতে বড় চাকুরেদের পোষায় না।

তবুও কিছু কিছু ক্ষণে চুপ থাকাটাই নিয়তি। কিছুক্ষণ পর একটি মেয়েকে আরও দু’জন মেয়ে দু’পাশ থেকে ধরে এনে ঘরে ঢুকল। এদের কথা বলার সুযোগ দিয়ে দেওয়া হলো। আশ্চর্য! তাকিয়ে দেখতেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। এ তো তার পাশের সিটের সেই সহযাত্রী। মেয়েটি খুব সুন্দর করে ফিক করে হেসে দিলো। টুথপেস্ট মার্কা দাঁত বের করে বলল, আপনি এত অবাক হচ্ছেন কেন? এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপনি কি ভেবেছেন, আমি ইচ্ছে করে আপনার পাশের সিটে বসে এসেছি? এসব ব্যবস্থা কি আগে থেকেই ছিল না? ও ভেবেছিলেন বাঁদরামি করার জন্য আপনার পাশের সিটে বসে এলাম। পাশের দুটি মেয়ে হা হা করে হাসতে লাগল। মেয়েটি ওকে চোখ টিপ দিয়ে বলল, এমন রামছাগল মার্কা ছেলে প্রশাসনে থাকে কী করে?

নিজের সম্পর্কে এ রকম উক্তি শুনে নিজেকে বলির পাঁঠার মতোই মনে হচ্ছিল শফিকের। বাহ্ এ মুহূর্তে নিজেকে তো সুখী সুখী মনে হচ্ছে। এমন একটি মুখরা মেয়েই তার দরকার ছিল। কী স্নিগ্ধ রূপ, সবকিছু যেন আগে আগেই নকশা করা ছিল। এ যেন বাংলা সাহিত্যেরই একজন টয়। অদ্ভুত এক ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল শফিক। এত ভালোলাগা তবে আছে জগতে?

জুলফিয়া ইসলাম : কথাসাহিত্যিক

#

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares