গল্প : আকাশে অনেক মুখ : বাদল সৈয়দ

বাদল সৈয়দ ।।

হাসপাতালে যেতে আমার আমার একদম ভালো লাগে না। রোগীর কষ্ট, পাশে দাঁড়ানো বিষণ্ণ স্বজনদের চেহারা আমাকে তীব্র বেদনার্ত করে তোলে।

তাই আমি পারতপক্ষে হাসপাতালে যাই না। এ নিয়ে অনেকের অভিমানও আছে। কিন্তু কী আর করা? সব সময় সব কিছু পারা যায় না।

এবার যেতেই হলো। এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের দু’বছরের বাচ্চা খুবই অসুস্থ। আইসিইউতে আছে। বাচ্চাটি জন্মেছিল হার্টের জটিল সমস্যা নিয়ে। সে কারণেই এ অবস্থা।

হাসপাতালে পৌঁছে দেখি ডাক্তাররা সব আশা ছেড়ে দিয়েছেন। বাচ্চার বাবা-মা অনবরত কান্না করছে। তাঁর ছোট চাচা থম মেরে আইসিইউ-এর সামনে বসে আছে। আমাকে দেখে সেও হাউমাউ করে কান্না করে উঠল। তরুণী মা প্রায় আমার পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, ভাইজান, আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান, আল্লাহর দোহাই আমার বাচ্চাকে বাঁচান। তারপর আবার হু হু করে কান্না শুরু করল। আমি অনেক কষ্টে তাকে সামলিয়ে হাসপাতালের বড় ডাক্তারের কাছে গেলাম। তিনি আমার পরিচিত। আমাকে দেখেই বললেন, স্যরি, বাদল ভাই, দেয়ার ইজ নো চান্স।

কোনো চান্সই কি নেই?

মেডিক্যাল সায়েন্স বলে, নেই। আপনারা বরং বাচ্চাটিকে বাসায় নিয়ে যান। ওখান থেকেই সে শান্তিতে চলে যাক। এত সব নলটল নিয়ে এখানে ওর খুব কষ্ট হচ্ছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, ওকে কি ঢাকায় নিলে কোনো সম্ভাবনা আছে?

‘মনে হয় না, আমরা মনে করি কোনো হাসপাতালের ওকে ভালো করার ক্ষমতা নেই। অযথা ঢাকায় নেওয়ার চেষ্টা করে ওকে কষ্ট দেওয়ার মানে হয় না’- বলতে বলতে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন, তারপর আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘বাদল ভাই, গত তিন দিন ধরে আমরা বাচ্চাটার জন্য নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে লেগে আছি।’ শহরের সব সেরা ডাক্তাররা মেডিক্যাল বোর্ড করে বসেছেন, কিন্তু কোনো আশা দেখছি না। নো চান্স অব কামব্যাক, ভাই- বলতে বলতে তাঁর গলা ভিজে এলো।

আমি ডাক্তার সাহেবের রুম থেকে বেরিয়ে বাচ্চার বাবার কাছে ফিরে গেলাম। তাকে ডেকে পুরো পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললাম, এখন কী করবি? ডাক্তার বলেছেন ওকে কষ্ট না দিয়ে…

আমার কথা শেষ করার আগেই সে ক্ষিপ্ত বাঘের মতো চেঁচিয়ে উঠল- অসম্ভব, আমার বাবু ভালো হয়ে যাবে। ওকে আমি ঢাকায় নিয়ে যাব, যে যাই বলুক…

এর মধ্যে আরও আত্মীয়-স্বজন পাশে ভিড় করেছেন। কেউ বাচ্চাকে ঢাকা নেওয়ার পক্ষে না। সবার এক কথা যেহেতু ডাক্তার বলে দিয়েছেন কোনো আশা নেই, তাহলে শুধু শুধু ওকে কষ্ট দেওয়াটা ঠিক হবে না। সিদ্ধান্তটি কঠিন হলেও আমিও তাঁদের সাথে একমত। কিন্তু সেটি বাচ্চার বাবা-মাকে বলার অবস্থা নেই। তবু বাচ্চার এক মামা আবার বললেন, আরেকবার ভেবে দেখো। এ অবস্থায় কীভাবে নেবে?

শিশুটির বাবা আবার গর্জে উঠল- যেভাবে পারি নেবো, আমার  ফ্ল্যাট, গাড়ি সব বিক্রি করে দেবো। কিন্তু আমার বাচ্চাকে মরতে দেবো না। ঢাকা না পারলে বাইরে নিয়ে যাবো।

বাবার গর্জনের সাথে যোগ হয়েছে মায়ের আর্তচিৎকার।

সব মিলিয়ে তীব্র বিষণ্ণ একটি পরিবেশ। এমন সময় আমার পাশে মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন। সাধারণ পোশাক-আশাক, চোখে পুরু লেন্সের চশমা। হালকা-পাতলা। তিনি বললেন, ভাইজান, আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?

খুবই বিরক্ত লাগল। এ সময়ে কি কারও সাথে খুচরো আলাপের সময় আছে? তারপরও ভদ্রতার খাতিরে বললাম, বলেন।

তিনি বললেন, বাচ্চাটিকে ঢাকা নিয়ে যান, ও বাঁচবে।

এবার মেজাজ সপ্তমে উঠল। বুঝতে বাকি রইল না ধান্দা করতে এসেছে। মানুষের বিপদকে পুঁজি করেই এদের ব্যবসা। এ সময় কেরামতির ভান করে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়। গরম কণ্ঠে তীব্র শ্লেষ ছড়িয়ে বললাম, কীভাবে জানলেন যে, বাচ্চাটিকে ঢাকায় নিয়ে গেলে বাঁচবে? আপনি কি পীর ফকির নাকি?

ভাইজান, আমি তা না, ওটা অনেক বড় ব্যাপার। আর আপনি যা ভাবছেন তাও ঠিক না, আমি কোনো ধান্দা করার জন্য এখানে আসিনি। আমার স্ত্রী এ হাসপাতালে আছেন। জেনারেল ওয়ার্ড। বেড নম্বর-২১। আপনাদের আহাজারি শুনে এখানে এলাম। আমার মনে হচ্ছে রোগীকে ঢাকা নিয়ে যান, ও বাঁচবে।

কিছুটা লজ্জা পেলাম তাঁর উত্তরে। এত কঠিনভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি। এবার সুর নরম করে বললাম, এটা আপনি কী বলেন? যেখানে সব ডাক্তাররা বলছেন…

তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ভাই সাহেব ‘জান’ দেওয়ার মালিক আল্লাহ, নেওয়ার মালিকও তিনি। তাঁর শান বোঝার ক্ষমতা আমাদের নেই। আপনারা বাচ্চার বাবাকে বাধা দিয়েন না। ওকে ঢাকায় নিতে দেন।

তারপর সালাম দিয়ে বললেন, আচ্ছা যাই ভাই, স্ত্রীর ওষুধ কিনতে হবে। আমি ছাড়া তাকে দেখার আর কেউ নেই। ওই যে বললাম, জান দেওয়ার মালিক আল্লাহ, তিনি আমার ঔরসে কোনো ‘জান’ তৈরি করেননি। সবই তাঁর শান। আমার কোনো আফসোস নেই।

এরপর তিনি কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত লিফটে নিচে নেমে গেলেন।

বাবা-মায়ের জোরাজুরিতে তাদের বন্ড নিয়ে বাচ্চাটিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে তাকে নিয়ে তারা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলো। আমি শুধু অ্যাম্বুলেন্সের ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, এনি চান্স দেয়ার?

উত্তর এলো, অল মোস্ট জিরো। কিন্তু আমরা চেষ্টা করব।

খুব মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে এলাম। কেন এমন হয়? একটি শিশু পৃথিবীর অপূর্ব সৌন্দর্য, বাবা-মায়ের আদর এসব উপভোগ করার আগেই চলে যাবে এটা খুব কষ্টকর।

আমারই এত খারাপ লাগছে, তাহলে যে মা তাঁর গর্ভে শিশুটাকে একটু একটু করে ধারণ করেছেন, যার রক্তে ধীরে ধীরে সে আকৃতি পেয়েছে, তাঁর কেমন লাগছে?

কিংবা তার বাবার? যিনি বাজার থেকে গর্ভে থাকতেই বাচ্চার নামের বই কিনে এনেছিলেন। কত পছন্দ! কোন নামটা রাখা হবে? ঘোড়া হয়ে বাচ্চাকে পিঠে নিয়ে সারা ঘর ঘুরেছেন। আহা কী কষ্ট! কী কষ্ট!

বিকেলের দিকে ঢাকা থেকে ফোন এলো। ফোন করেছে বাবার বাবা। কেন জানি তার আমার ওপর অগাধ বিশ্বাস। সে উত্তেজিত গলায় বলল, ভাইয়া, এখানে ডাক্তাররা বলছেন কোনো আশা নেই। ও যে অ্যাম্বুলেন্সেই কলাপ্স করেনি এটাই বিরাট আশ্চর্যের ব্যাপার। তাঁরা বলছেন কোনো আশা নেই। বলতে বলতে সে হু হু করে কান্না করে উঠল।

আমার বলার কিছু নেই। চুপ করে আছি। কিছুক্ষণ পর সে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, শুধু একজন ডাক্তার বলছেন, অনুমতি দিলে তিনি একবার অপারেশন করে দেখতে চান। যদিও এতে সফল হওয়ার চান্স নেই বললেই চলে, কিন্তু তারপরও চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। কিন্তু অন্য ডাক্তাররা তাঁর সাথে একমত না। আমি এখন কী করব?

আমি বললাম, ভাই, আসলে আমি বুঝতে পারছি না কী করা উচিত। তুমি কী ভেবেছ?

সে আবার কান্না ছড়িয়ে দিয়ে বলল, ভাইজান, আমি একবার  ট্রাই করতে চাই। কী আর হবে? আমার বাচ্চা যদি না-ই বাঁচে তাহলে না হয় অপারেশনেই মারা যাবে। তবু আমি মন মানাতে পারব যে, আমি চেষ্টা করেছি।

তাঁর কান্না আর কণ্ঠের বিষাদ আমার বুকে ধক করে এসে বিঁধল।

বললাম, তাহলে তাই করো। দেখো না কী হয়?

রাত ১২টার দিকে একটি অবিশ্বাস্য খবর এলো। ডাক্তাররা নাকি বলেছেন, অপারেশন নাকি সফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাঁরা নিজেরা নাকি ব্যাপারটা নিয়ে যারপরনাই বিস্মিত। এমনকি ব্যাপারটা তাঁরা টেলি কনফারেন্সে ভারতীয় হার্ট বিশেষজ্ঞ দেবী শেঠির সাথে আলোচনা করেছেন। তিনি নাকি একটি শব্দই উচ্চারণ করছেন- ‘মিরাকল!’ তবে বাহাত্তর ঘণ্টা যাওয়ার আগে অবশ্যি কোনো কিছু নিশ্চিত বলা যাবে না।

এ পুরো সময়টা বাচ্চার বাবা এবং মা আইসিইউ-এর সামনে জায়নামাজে ঠায় পড়ে রইল। তাঁদের বাচ্চার জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত তাঁরা নাকি উঠবে না।

এ সময়টা আমাদের টানটান উত্তেজনায় কাটল।

ঠিক বাহাত্তর নয় তিহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চার জ্ঞান ফিরে এলো।

ডাক্তার দেবী শেঠি এবার মন্তব্য করলেন, ‘জাস্ট আনবিলিভেবল। মে বি অলমাইটি হিমসেলফ অপারেটেড দ্য বেইবি।’

শেষ পর্যন্ত দু’মাস পর বাচ্চাটি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল।

যেদিন তাঁকে চট্টগ্রাম নিয়ে আসা হলো, আমি তাকে দেখতে গেলাম। সুস্থ-সবল একটি বাচ্চা। টলটলে পায়ে হাঁটছে, আধো বোলে ডাকছে ‘বাবা।’

আমি অনুভূতির ঊর্ধ্বে এক আনন্দ নিয়ে তাকে দেখছি। আহা! কী অপূর্ব একটি শিশু! কে বলবে কয়েক মাস আগেও সে মৃত্যুর সাথে প্রচণ্ড লড়াই করেছে?

হঠাৎ আমার বুকে ধাক্কা লাগল। মনে পড়ে গেল সেই সাধারণ মানুষটির কথা। সাধারণ পোশাক, চোখে পাওয়ারফুল চশমা, সেই লোক যিনি বলেছিলেন- ভাইজান বাচ্চাটিকে ঢাকা নিয়ে যান, ও বাঁচবে।

যে প্রশ্নটি আমাকে অবশ করে দিল, তা হলো- যেখানে সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিল, তখন তা ওই ভদ্রলোক কীভাবে জানলেন, ঢাকায় নিলে বাচ্চাটি বেঁচে যাবে?

আমি দ্রুত বাচ্চার বাবা-মা থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম। তারপর সোজা এসে পৌঁছালাম সেই হাসপাতালে, যেখানে বাচ্চাটির চিকিৎসা চলছিল। হাসপাতালের বড় ডাক্তার আমাকে দেখে একটু বিস্ময় নিয়ে বললেন, বাদল ভাই, আপনি?  কী মনে করে? আপনার ভাইপোর খবর আমরা পেয়েছি। রিয়েলি আনবিলিভেবল!

আমি বসতে বসতে বললাম, হ্যাঁ ঠিক তাই। সব আল্লাহর ইচ্ছা। তবে আমি এসেছি অন্য কারণে?

কী কারণ?

আচ্ছা, আমার ভাইপো যখন এই হাসপাতালে ছিল তখন জেনারেল ওয়ার্ডের ২১ নম্বর বেডে একজন মহিলা পেশেন্ট ছিলেন। তাঁর ঠিকানা কি আমাকে দেওয়া যাবে?

ডাক্তার সাহেব ইতস্তত করে বললেন, এরকম সাধারণত আমরা দিই না। তবে আপনি যখন বলছেন… তারপর কথা শেষ না করেই বললেন, কী দরকারে বাদল ভাই?

আমার খুব জরুরি দরকার, তবে কথা দিচ্ছি আপনাদের সমস্যা হয় এমন কিছু আমি করব না। আমি আগে ওনার হ্যাজব্যান্ডের সাথে ফোনে কথা বলে অনুমতি নিয়ে যাবো। যদি না দেন যাবো না।

তারিখটা মনে আছে?

১২ মে।

আচ্ছা দিচ্ছিÑ বলে ডাক্তার সাহেব ইন্টারকমে ওই রোগীর ডিটেইল এনে আমাকে দিলেন। এখনও তাঁর ইতস্তত ভাব যাচ্ছে না।

কাগজপত্রে দেখি ভদ্রলোকের নাম শামসুদ্দিন আহমেদ। থাকেন চট্টগ্রামের দেওয়ানবাজার মৌসুমি আবাসিক এলাকায়। বাড়ি নাম্বার ৩৩/ই। ভর্তি ফরমে তাঁর ফোন নাম্বারও দেওয়া আছে। আমি ঠিকানা, ফোন নাম্বার টুকে নিয়ে বের হয়ে এলাম।

হাসপাতালের করিডোর থেকেই ফোন করলাম। ওপার থেকে পুরুষকণ্ঠ ভেসে এলো, হ্যালো আসসালামু অলাইকুম।

‘ওয়ালাইকুম সালাম। ভাই আপনি কি শামসুদ্দিন সাহেব বলছেন?

 জি ভাই, আপনি কে বলছেন?

ভাই, আমার কথা আপনার মনে থাকার কথা নয়। আপনার স্ত্রী যখন হাসপাতালে, তখন কথা হয়েছিল। আমার ভাইয়ের বাচ্চাকে আপনি ঢাকা নিয়ে যেতে বলেছিলেন।

ও, হ্যাঁ মনে পড়ছে। তা, ভাই, বাচ্চাটা কেমন আছে?

ভালো আছে ভাই। ও বেঁচে আছে। আমি ওর ব্যাপারে আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই?

আলহামদুলিল্লাহ। আসুন ভাই। কিন্তু আপনি আমার বাসা চিনবেন কীভাবে?

আমার মনে হলো বাচ্চাটি বেঁচে যাওয়ায় তিনি একটুও অবাক হলেন না।

হাসপাতাল থেকে নিয়েছি। ওখান থেকেই ফোন নাম্বারও নেওয়া হয়েছে। ভাই, আপনি কিছু মনে করবেন না, আপনার অনুমতি ছাড়া এগুলো আমি হাসপাতাল থেকে জোগাড় করেছি।

না রে ভাই, কিছু মনে করি নাই। আমি সাধারণ মানুষ, আমার ঠিকানায় কী আসে যায়? আপনি আসেন।

তাঁর বাসায় যখন পৌঁছালাম তখন রাত প্রায় ৯টা। তুমুল ঝড় শুরু হয়েছে, সেই সাথে বজ্রপাত। মনে হচ্ছে দালানকোঠা সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে। রাস্তা জনশূন্য, বিদ্যুৎ নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকার। এর মধ্যে কোনো রকমে তাঁর বাড়ি খুঁজে বের করলাম। দরজা খুললেন তিনি নিজেই। চার্জলাইট জ্বলছে। তার আলোয় মানুষটিকে কেমন রহস্যময় মনে হচ্ছে। আমার গা কেমন যেন শিউরে উঠল। বাড়ি খুঁজতে গিয়ে প্রায় ভিজে গেছি, সেই ঠান্ডায় এ শিউরে ওঠা নয়। এটা অন্য ধরনের কেঁপে ওঠা। মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা একটি স্রোত যেন বয়ে যাচ্ছে। এই প্রথম বারের মতো মনে হলো, এখানে এভাবে হুট করে চলে আসা ঠিক হয়নি।

ভদ্রলোক কিন্তু খুব আন্তরিক গলায় বললেন, আসুন ভাইজান। আপনি তো মনে হয় পুরো ভিজে গেছেন। ভেতরে আসুন, একটা তোয়ালে দিচ্ছি। গা মুছে নেন।

আমি একটু দ্বিধা নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। তিনি একটি তোয়ালে এনে দিলেন। পরিষ্কার তোয়ালে। সদ্য ধোয়া বোঝা যাচ্ছে।

বসার ঘরটি বেশ ছোট। তিনটি কাঠের চেয়ার। এক পাশে ছোট্ট একটি খাট। কোনায় একটি ছোট টেলিভিশন।

ভদ্রলোক সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, কী আবহাওয়া দেখেছেন? মনে হচ্ছে সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আমি ভেবেছিলাম এ দুর্যোগ মাথায় নিয়ে আপনি আসবেন না। আমার সাথে তো আপনার কোনো জরুরি কথা থাকার কথা নয়।

না, ভাই, আপনার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। খুব জরুরি।

বলুন তাহলে। তবে আমি মাফ চেয়ে নিচ্ছি, আমার স্ত্রী বাড়ি নেই। তিনি ওনার ভাইয়ের বাড়ি গিয়েছেন। এদিকে সকাল থেকে বাসায় গ্যাস নেই যে, চা বানাব।

আমি তাড়াতাড়ি বললাম, না, না, কিচ্ছু লাগবে না। আপনি যে এত রাতে আমাকে সময় দিচ্ছেন এটাই অনেক বড় কথা।

না ভাই, অতিথি নারায়ণ ভব। অতিথি হচ্ছেন দেবতা সমান। আমি এ দেবতাকে খালি মুখে ফেরত যেতে দিতে পারি না। হোটেল থেকে দুপুরে কিছু খাবার এনেছিলাম, কথা শেষ হলে দু’জনে তা ভাগ করে খাব। ঠান্ডা ভাত, মজা পাবেন না। কিন্তু কী আর করা।

আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, ভাই সাহেব, দয়া করে আপনি ওই ঝামেলায় যাবেন না…

কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি প্রায় হাত জোড় করে বললেন, ভাইজান, এটা ঝামেলার কিছু না। ভাগ করে খেলে আমারই নেকি হবে বেশি। তাই আপনি খেলে ঝামেলা নয়, উপকার হবে।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। ভদ্রলোক শুনবেন বলে মনে হয় না। তারপরও পরে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করা যাবে। তার আগে দরকারি কথা সারি।

এবার তিনি বললেন, বলুন ভাইজান, আপনি কী বলতে চান?

আমি সরাসরি প্রসঙ্গে এলাম, আচ্ছা, আপনি কীভাবে জানতেন যে, বাচ্চাটিকে ঢাকায় নিলে সে বাঁচবে?

ভদ্রলোক কোনো উত্তর দিলেন না। আধো আলোয় দেখা দেখা যাচ্ছে তিনি মাথা নিচু করে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন।

বাইরে তুমুল ঝড়। ভেতরে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। আমিই সেই নির্জনতা ভাঙলাম। আবার বললাম, ভাই সাহেব, আপনি কি আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন?

তিনি মাথা তুলে বললেন, ভাইজান, সব প্রশ্নের উত্তর জানা কি জরুরি?

এটা আমার কাছে জরুরি। যখন দুনিয়ার সবাই বলছিল বাচ্চাটির কোনো আশা নেই, তখন আপনি ধূমকেতুর মতো উদয় হলেন। তারপর বললেন, ওকে ঢাকায় নিয়ে যেতে, তাহলে ও বেঁচে যাবে। শেষ পর্যন্ত তাই হলো, এটা অতি আশ্চর্য একটি ঘটনা। এর একটি ব্যাখ্যা থাকা উচিত।

ভাইজান, সব কিছুর কি ব্যাখ্যা দরকার। ধরে নিন ওটা কো-ইন্সিডেন্ট। আমার মনে হয়েছিল তাই বলেছি। পরে দেখা গেল ঝড়ে বক মরেছে।

আমি কিছুটা কঠিন কণ্ঠে বললাম, এটা আমার কো-ইন্সিডেন্ট মনে হচ্ছে না।

তিনি এবার সামান্য শব্দ করে হাসলেন, ‘তাহলে কি আমাকে পীর-ফকির মনে হচ্ছে? আমি আসলে তা না। ওটা হতে গেলে অনেক ওপরে উঠতে হয়, সাধন করতে হয়, সেটার ধুলা পরিমাণও আমি করি নাই ভাইজান।

আমি বললাম, আমি আপনি পীর-ফকির তা বলছি না। কিন্তু আমার মনে হয়, আপনার মধ্যে কিছু একটা আছে। হতে পারে সেটা ইএসপি। Extrasensory perception ক্ষমতা। যেটা দিয়ে মানুষ ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। এটা কিন্তু অনেকেই স্বীকার করেছেন যে, কিছু  মানুষের এ ক্ষমতা আছে। আমেরিকার ডিউক ইউনিভার্সিটি এ ব্যাপারে বেশ উচ্চকণ্ঠ।

ভদ্রলোক মৃদু গলায় বললেন, ভাইজান, আমি সিম্পল বিএ পাস মানুষ। বেসরকারি একটা কোম্পানিতে মাঝারি মানের চাকরি করি। আপনার কঠিন কথা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। তবে এটুকু বলি, ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা আমার নেই।

আমি নাছোড়বান্দার মতো বললাম, তাহলে আপনি কীভাবে বললেন বাচ্চাটি বেঁচে যাবে?

তিনি আমার হাত ধরে বললেন, ভাইজান, এ প্রসঙ্গ বাদ দিলে হয় না?

ভাই, আমি আপনাকে জোর করব না। আপনি উত্তর দিতে না চাইলে বাদ দেন। তাহলে আমি আসি।

তিনি প্রায় চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে এলেন, অসম্ভব ভাইজান, আপনাকে খেয়ে যেতে হবে । সামান্য আয়োজন, ডাল-ভাত…

আমি না করার আগেই তিনি আমার হাত চেপে ধরলেন।

কিছু কিছু আন্তরিকতা আছে যা অস্বীকার করা যায় না।

আমিও পারলাম না। সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষটির সাথে খেতে বসলাম। আয়োজন সামান্য। ডাল, ভাত, মাছের একটি তরকারি। সব ঠান্ডা হয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর আতিথেয়তা সব ভুলিয়ে দিলো। আমি খাচ্ছি আর ভাবছি মানুষ এত আন্তরিক হয়!

খাওয়া শেষে আবার বসার ঘরে চেয়ারে এসে বসেছি। এখন বিদায় নেয়া উচিত। কিন্তু বাইরে ঝড় কমেনি। তাই অপেক্ষা করছি। ভদ্রলোক সামনে বসে আছেন। কোনো কথা বলছেন না। মাঝে মাঝে বাজের আলো এসে বন্ধ জানালার কাচে পিছলে যাচ্ছে।

আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছে। এবার যাওয়া উচিত। ভদ্রলোকের মনে হয় ঘুমের সময় হয়েছে। তিনি কিছুটা ঝিমুচ্ছেন। তাই বৃষ্টি উপেক্ষা করে বললাম, ভাইসাহেব, এবার যাই, অনেক রাত হলো।

তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন- না, না, এই ঝড়ের মধ্যে কীভাবে যাবেন? কোন রিকশা-ট্যাক্সিও তো এখন পাবেন না। গাড়ি ছাড়া এসেছেন বোঝাই যায়। নইলে এত ভিজতেন না। একটু অপেক্ষা করেন।

আসলেই তাই, আজ ড্রাইভার ছুটিতে, তাই সিএনজি নিয়ে বের হয়েছি।

বাধ্য হয়ে বসে আছি। তিনি আবার চুপ মেরে গেছেন। যেন ধ্যানমগ্ন। চার্জলাইট ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন জ্বলছে একটি মোমবাতি। তার আলোয় মানুষটিকে কেমন অবসন্ন মনে হচ্ছে। হঠাৎ মৌনতা ভেঙে তিনি বললাম, ভাইজান, আমি গন্ধ পাই।

আমি অবাক হয়ে বললেন, কিসের গন্ধ?

মৃত্যুর গন্ধ, ভাইজান। কোনো মানুষের যদি মরণ আসন্ন হয়, তবে আমি মৃত্যুর গন্ধ পাই। তাই কোনো রোগীর কাছে গেলে আমি বুঝতে পারি সে বাঁচবে না মরবে?

আমার গা শিউরে উঠল। এ লোক বলে কী? এ তো বদ্ধ উন্মাদ। আবার তীব্র এক ভয় আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এলো।

আমি কোনো রকমে বললাম, এটা আপনি কী বলেন, আপনি মৃত্যুর গন্ধ পান? সেটা কি সম্ভব?

ভাইজান আমিও জানি এটা সম্ভব না। কিন্তু বিশ্বাস করেন আমি পাই। বাসে ট্রেনে যাওয়ার সময়ও অনেক সময় কোনো যাত্রীর গা থেকে এ গন্ধ পাই। সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ, কিন্তু আমি জানি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তিনি মারা যাবেন। আবার কোনো রোগীর কাছ থেকে যদি এ গন্ধ না আসে, আমি বুঝে যাই ওই লোক মরবে না, ডাক্তাররা যাই বলুক। আপনার ভাইয়ের বাচ্চার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। ডাক্তাররা বলছিলেন, ও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা যাবে। আমি এক ফাঁকে আইসিইউতে গিয়ে তাকে দেখে এলাম। কোনো গন্ধ পেলাম না। তাই আমার বিশ্বাস জন্মেছিল সে বাঁচবে। তাই ঢাকায় নিতে বলেছিলাম। মন বলছিল একটা চান্স নেওয়া উচিত। ভালো হাসপাতালে গেলে বাচ্চাটা বেঁচে যাবে। তার গা থেকে তো মৃত্যুর গন্ধ আসছে না।

কিন্তু আপনি এ গন্ধ কীভাবে পান?

মোমবাতির আলোয় মানুষটিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তারপরও মনে হলো তিনি হাল্কা কেঁপে উঠেছেন। তাঁর অস্পষ্ট চোখের তারায় কেমন যেন অসহায়ত্ব।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ভাইজান, আপনার দেশের বাড়ি কোথায়?

চট্টগ্রামের বোয়ালখালি।

এবার মনে হলো, তাঁর চোখের মণি সামান্য উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, মিলিটারি পুল চেনেন? বোয়ালখালি থেকে পটিয়া যাওয়ার পথে পড়ে।

হ্যাঁ চিনি।

ওটার নাম কেন মিলিটারি পুল তা জানেন?

হ্যাঁ, শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই পুলের ওপর বাঙালিদের সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। সেই থেকে এর নাম হয়ে যায় মিলিটারি পুল।

হ্যাঁ, ঠিক শুনেছেন। ওই ব্রিজটা মিলিটারিরা দখল করেছিল, কারণ দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাথে যোগাযোগের জন্য ওটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আমি কিছুটা অস্থির হয়ে বললাম, ভাই সাহেব, এর সাথে আপনার মৃত্যুর গন্ধ পাওয়ার কী সম্পর্ক?

তিনি আবার চুপ মেরে গেলেন। তাঁর মধ্যে কেমন যেন অস্থির ভাব। লম্বা শ্বাস নিচ্ছেন, যেন বাতাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। আমি উঠে গিয়ে বললাম, ভাই সাহেব, আপনার কি খারাপ লাগছে? বেশি খারাপ লাগলে বলার দরকার নেই। আপনি রেস্ট নিন।

তিনি হাত নেড়ে ‘না’ করে দিয়ে ইঙ্গিতে আমাকে বসতে বললেন।

আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর বললেন, ভাইজান, একটু বসেন। আমি একটু মুখে পানির ঝাঁপটা দিয়ে আসি। মাঝে মাঝে কেমন অস্থির লাগে। তখন মুখে পানি দিলে ভালো লাগে।

ভেজা মুখ নিয়েই তিনি ফিরে এলেন।

আবার পা দোলাচ্ছেন।

আমার অস্থির লাগছে। ভদ্রলোককে বোধ হয় চাপাচাপি না করাই ভালো ছিল। কিছু ব্যাপার মানুষের খুব একান্ত বিষয়, সেগুলোকে আলোতে আনার চেষ্টা না করাই ভালো।

একটু পর তিনি একটু স্থির হলেন। তারপর বললেন, জুলাই মাসের ষোলো তারিখ মিলিটারি পুল মুক্তিযোদ্ধারা উড়িয়ে দেন। সাথে আটজন পাকিস্তানি সৈনিক আর এগারোজন রাজাকারও উড়ে যায়।

আমি বুঝতে পারছি না তিনি আসলে কী বলতে চাইছেন? তারপরও বললাম, তারপর?

আবার তিনি অস্থিরভাবে পা দোলাতে লাগলেন। আমি চুপ করে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

মুক্তিযোদ্ধাদের যে দলটি ওই পুল উড়িয়ে দিয়েছিল, আমার বাবা ছিলেন তার কমান্ডার।

আমি কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বললাম, তাই নাকি?

হ্যাঁ, আমার বাড়ি পটিয়ার ধলঘাটে। আমার বাবা ছিলেন সাধারণ একজন দর্জি। আপনি জানেন, চট্টগ্রামে দর্জিদের ‘খলিফা’ ডাকা হয়। আমার বাবা ‘খলিফা মালেক’ নামে গ্রামে পরিচিত ছিলেন। দর্জির কাজ ছাড়াও তিনি আমাদের গ্রামের মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করতেন। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, এমন সুরেলা আজান আপনি কখনও শোনেননি।

‘সে কাজ ছেড়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

হ্যাঁ, তাঁদের মূল কমান্ডার ছিলেন আজকের বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল কমরেড শাহ আলম। তাঁরা মূলত ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেরিলা অপারেশন করতেন। আমার বাবা এ রকম একটি ছোট দলের কমান্ডার ছিলেন। তাঁরাই মিলিটারি পুল উড়িয়ে দেন।

তারপর?

‘আমার বয়স তখন দশ বছর’Ñ তাঁর শরীর তির তির করে কাঁপছে। ধলঘাটে গ্রামের বাড়িতে শুধু আমার মা আর আমি থাকতাম। আমার আর কোনো ভাইবোন ছিল না। পরে অন্যদের মুখে শুনেছি, সি ওয়াজ এক্সপেক্টিং দেন। বাবার কোনো খোঁজ আমরা জানতাম না। তিনি সম্ভবত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই বাড়ি ছাড়েন। আমার মা প্রায় সারাদিন কাঁদতেন। লোকজন অনেক কথা বলত, কেউ কেউ খবর দিত বাবা ইন্ডিয়া চলে গেছেন। তবে কেউ তেমন আমাদের বাড়ি আসত না। যে বাড়ির লোক মুক্তিযুদ্ধে গেছে, তাই অনেকেই ভয়ে এড়িয়ে চলত। আমরা কিন্তু জানতামই না যে, বাবা আমাদের আশপাশেই আছেন। তিনিও যোগাযোগ রাখতেন না। সম্ভবত আমাদের নিরাপত্তার কারণেই রাখতেন না। নিজের নিরাপত্তার বিষয় তো ছিলই।

তারপর? আমার কণ্ঠ নিজের কাছেই বেসুরো শোনায়।

যে রাতে মিলিটারি পুল উড়িয়ে দেওয়া হয়, তার পরের রাতেই পাকিস্তানি আর্মি আমাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। তারা যেভাবেই হোক জেনে গিয়েছিল, ওই পুল ওড়ানোর পেছনে মূল মানুষটি কে? তাদের সাথে ছিল একদল রাজাকার।

আমার আর তাঁর কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। আমি জানি এরপর কী শুনব? আমি তা নিতে পারব না।

ভদ্রলোকও মনে হয় আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মুখ হা করে নিশ্বাস নিচ্ছেন, তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছে।

আমি উঠে গিয়ে তাড়াতাড়ি বললাম, ভাই সাহেব, আমার আর শোনার দরকার নেই। আমি আপনি মৃত্যুর গন্ধ কীভাবে পান তা জানতে চাই না।

তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছেন, হিসহিস করে বললেন, না, ভাইজান শোনেন, আপনাকে শুনতে হবে।

আমি ধপ করে আবার চেয়ারে বসলাম।

মিলিটারিরা এসে প্রথমেই যেটা করল তা হলো, আমার মাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে দরজা আটকে দিলো। আমি ছুটে বাধা দিতে গেলাম। এক সৈনিকের লাথি আমাকে প্রায় উড়িয়ে উঠানে নিয়ে ফেলল। সেখানে রাজাকাররা আমাকে একটি গাছের সাথে বেঁধে রাখল।

আশ্চর্য হচ্ছে তাঁর গলা এখন কাঁপছে না। তিনি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে যন্ত্রের মতো কথা বলছেন। মনে হচ্ছে মানুষ নয়, কোনো রোবট কথা বলছে।

ঘণ্টা তিনেক পর মিলিটারির দল ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর একজন রাজাকারকে আমাকে দেখিয়ে কী যেন বলল। সে আমার বাঁধন খুলে দিয়ে বলল, যা ভেতরে যা, তোর মাকে অনেক মজা দেওয়া হয়েছে, গিয়ে দ্যাখ।

তারপর আমাকে পাঁজাকোলা করে সে বাড়িতে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে দেওয়া হলো।

আমি সেখানে ঢুকেই থরথর করে কেঁপে উঠলাম। চারদিক রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু রক্ত নয়, প্রথম যে ব্যাপারটা আমার মাথায় এলো- তা হলো, আমার মাকে ঢেকে দেওয়ার জন্য একটা কাপড় দরকার। খুব জরুরি দরকার। তিনি যেভাবে আছেন, সেভাবে এমন কি সন্তানের সামনেও কোনো মা থাকতে পারেন না। আমি হাঁচড়ে-পাঁচড়ে একটি কাঁথা এনে মাকে ঢেকে দিলাম। এরপর আমার সব বোধ কোথায় যেন উবে গেল। আমি তাঁর পাশে বসলাম। দেখলাম তিনি বেঁচে আছেন। হালকা গোঙাচ্ছেন। চারদিকে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আমি আমার মায়ের রক্তের ওপর বসে মাথা ঝুঁকিয়ে ডাকলাম, মা, মা…

তিনি উত্তর দিলেন না। কেবল একটু করে হাত উঁচু করে আমাকে ছুঁতে চাইলেন, পারলেন না। হাতটা হেলে পড়ে গেল।

আমি তাঁর হাত তুলে নিলাম। আমি জানি না ভাইজান, দশ বছরের একটি বাচ্চা ছেলে এ সাহস কোত্থেকে পেল? নির্জন রাত, মেঝেতে পড়ে আছেন তাঁর মা, যার আত্মাকে একটু আগে হত্যা করা হয়েছে, চারদিক রক্তে ভেসে যাচ্ছে, তালাবদ্ধ দরজা, অথচ একটুও ভয় না পেয়ে, একটুও অস্থির না হয়ে আমি মায়ের হাত ধরে বসে আছি!

আমার মা গোঙাচ্ছেন, তাঁর চেহারায় তীব্র ব্যথার ছাপ, আমি তাঁর হাত ধরে মাঝে মাঝে ডাকছি- ‘মা, মা।

কিন্তু তিনি উত্তর দিতে পারছেন না। ক্রমাগত তাঁর বুক আর নিম্নাঙ্গ থেকে রক্ত এসে কাঁথা ভেসে যাচ্ছে, তারপর তা গড়িয়ে আসছে মেঝেতে। আমি সে রক্তে মাখামাখি হয়ে তাঁর পাশে বসে আছি।

কতক্ষণ বসে আছি জানি না, শুধু একসময় দেখলাম মোরগ ডাকছে, অন্ধকার আবছাভাবে ফিকে হয়ে আসছে। এমন সময় ভেসে এলো আজান। যে আজান ক’দিন আগেও আমার বাবা দিতেন। ঠিক যখন বলা হচ্ছে- ‘ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম’, সে সময় আমি হঠাৎ চমকে উঠলাম। পুরো বাড়িতে অদ্ভুত এক সুগন্ধ! এ কেমন সুগন্ধ আমি বোঝাতে পারব না। তবে বলতে পারি, এমন মিষ্টি গন্ধের উৎস এ দুনিয়া নয়। মর্ত্যলোকের ক্ষমতা নেই এমন সুগন্ধ সৃষ্টির। সেই অস্বাভাবিক মুহূর্তেও আমি অবাক হয়ে ভাবছি, এমন মিষ্টি গন্ধ কোত্থেকে আসছে? তারপর খেয়াল করলাম, তা আসছে আমার নিঃস্পন্দ মায়ের শরীর থেকে। সেখান থেকেই এ অপার্থিব গন্ধের উৎপত্তি।

আমি তাড়াতাড়ি তাঁর দিকে ঝুঁকে আবার ডাকলাম, মা, মা…

কী আশ্চর্য! এবার মা চোখ খুলে তাকালেন। সেখানে তীব্র বিষাদ। তারপর আবার একরাশ সুগন্ধ তাঁর শরীর থেকে আমার নাকে আবার ঝাঁপটা দিলো। এমন সময় কোত্থেকে একটি প্রজাপতি এসে আমার মায়ের ঠিক বুকে বসে তাঁর রক্তে ‘লালরঙা’ হয়ে উঠল। তারপর আবার সেই তীব্র সুবাস। সে সুবাস গায়ে মেখে রক্তে লাল হয়ে যাওয়া প্রজাপতিটি জানালা দিয়ে বাইরের আলোয় উড়ে গেল। আর আমার মায়ের চোখের আলো ঠিক সে মুহূর্তে দপ করে নিভে গেল…

ভদ্রলোক তারপর প্রায় লাফ দিয়ে আমার বুকে এসে পড়লেন। তারপর সেখানে মাথা রেখে গোঙানো কণ্ঠে বলতে লাগলেন- ভাইরে, ও ভাই, তারপর থেকে আমি মৃত্যুর গন্ধ পাই। যখন কেউ মারা যায়, তখন তার পাশে এ সুগন্ধ ছড়াতে থাকে- বলতে বলতে তিনি থর থর করে কাঁপতে থাকেন।

তাঁর গলা থেকে শুধু এক অপার্থিব গোঙানির শব্দ ছিটকে বেরিয়ে আসছে মা, মা, মা…

আমি পাখির ছানার মতো কাঁপতে থাকা মানুষটিকে বুকে নিয়ে বসে আছি। এমন সময় উজ্জ্বল বাজের আলো জানালায় পিছলে পড়ে। মুহূর্তে সে আলোয় দেখি ভদ্রলোকের চোখের তারায় কিলবিল করছে রাগ।

এ রাগের জন্ম মনে হয় পৃথিবীতে নয়। এমন ঘৃণা মেশানো রাগের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের এ গ্রহের নেই।

বাদল সৈয়দ : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares