গল্প : আধ আঙুলের হিসাব : ধ্রুব এষ

ধ্রুব এষ ।।

বাবা মরলেন এক আশ্বিনের বিকালে।

আমি তখন বাসায় ছিলাম এবং টেলিভিশনে কার্টুন দেখছিলাম। থান্ডার ক্যাটস কার্টুন। এটা আমি মিস দিই না।

থান্ডার ক্যাটস চলছে, দেখছি, দেখছি, হঠাৎ উঠানে দেখি মান্না। কী হয়েছে?

মান্না বলল, ‘হাসপাতালে চল।’

‘অ।’

মান্না আমার বন্ধু। হাসপাতালে ছিল।

হাসপাতাল হাঁটা-দূরত্বে। গিয়ে দেখি কেবিনে বাবার ডেডবডি তারা সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছে। আমি সরিয়ে কিছু দেখতে গেলাম না।

হরিবোল ধ্বনি উঠল আমাদের উঠানে। রাস্তায়, শ্মশানঘাটে।

বড় ছেলে, আমি বাবার মুখাগ্নি করলাম।

আশ্বিনের এক আশ্চর্য কমলা রঙের সন্ধ্যায় আমার দেওয়া আগুন মুখে নিয়ে বাবা পুড়ে লনী হয়ে গেলেন।

আমার মাথায় হরিবোল ধ্বনি থাকল।

হরি বোল! হরি বোল!

বলো হরি! হরি বোল!

হরি বোল! হরি বোল!

শোক তাপহীন একটা জড় রাত কাটল।

ঘুম হলো, ঘুম হলো না।

তেরো দিন হবিষ্য করে শ্রাদ্ধ। শহরের হিন্দু সমাজপতিরা রাতে ধার্য করে দিয়ে গেছেন। এই একটা ব্যাপার, মায়ের সময় বুঝতে পারিনি। আমাদের শহরে লৌকিকতার বাইরেও আলাদা গোপন একটা হিন্দু সমাজ আছে এবং সেই সমাজের কিছু গণ্যমান্য সমাজপতিও আছেন। তারা দেখভাল করেন শহরের হিন্দুদের। ভালো। যাবতীয় আচার বিধান তারা আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। তেরোটা দিন ধর্মগত কিছু নিয়ম-সিয়মের মধ্যে থাকতে হবে আমাদের। বীরু কাকা বিশেষ করে আমাকে বললেন, ‘তুমি থান পরছো, খুশি হইছি বাবা। কষ্ট করো এই তেরো দিন। এই কয়টা নিয়ম-সিয়ম মানো।’

বীরু কাকা কী মনে করেছিলেন?

আমি থান পরবো না?

মায়ের সময় পরিনি? নিয়ম-সিয়ম মানিনি?

থান পরেছি, কুশাসন নিয়েছি। নিয়ম-সিয়ম সব মানবো। ধর্ম নিয়ে আমার বোঝাপড়া আলাদা, সেটা এখানে প্রযোজ্য না।

রাতে আমরা চার ভাই একসঙ্গে মাটিতে শুয়েছি। তারা উঠে গেছে আমার আগেই। রান্নার জোগাড় দেখছে দুই ভাই, এক ভাই তুলসীতলায় নৈবেদ্য সাজাচ্ছে। নতুন তুলসীতলা বানানো হয়েছে। তুলসী বেদিতে প্রদীপ জ্বালানো হবে তেরো দিন। বড়ই গাছের নিচে দেখলাম আবদুন নূর চাচা বসে ফোঁপাচ্ছে। বড়ই গাছের সঙ্গে একটা আঙুর গাছ আছে, বড়ই গাছ জড়িয়ে-মড়িয়ে উঠেছে। টক আঙুর হয়। দুটো গাছের চারাই বাবা পুঁতেছিলেন।

আবদুন নূর চাচা কি আমাকে দেখল?

জলে ঝাপসা চোখে কতটা দেখা যায়?

কাল সন্ধ্যা থেকে কাঁদছে মানুষটা। গলা ফাটিয়ে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। তার কান্না কি এখনও ফুরায়নি? আমাদের ফুরিয়ে গেছে।

পুরোত ঠাকুর এলেন। আচার কার্য হলো। এখন আমরা চার ভাই স্বপাক অন্ন গ্রহণ করতে পারব।

হবিষ্যান্ন বলে।

বিধবা চন্দনের মা পিসি এর মধ্যে চা দিয়ে গেছে আবদুন নূর চাচাকে। আবদুন নূর চাচা এখনও ফোঁপাচ্ছে।

আবদুন নূর চাচা বাবার কী হয়?

অ্যাসিস্ট্যান্ট। ফার্মেসির এবং ব্যক্তিগত। ফার্মেসির টুকটাক কাজকর্ম করত এবং পাট্টা থেকে মদ এনে দিত বাবাকে। আবগারি দোকানের বাংলা। কোমায় যাওয়ার দুই দিন আগেও বাবা ফার্মেসিতে গেছেন এবং বাংলা গিলে দিনটাকে রাত করে দিয়েছেন।

আবদুন নূর চাচাকে আমরা জন্ম থেকে দেখছি। বাংলা শার্ট, চেক লুঙ্গি এবং প্লাস্টিকের নাগরা জুতা পরে। ছোটখাটো মানুষ। মাথায় টাক আছে। সে থাকে লম্বাহাটিতে। দারাপুত্র পরিবার আছে। তাদের কাউকে আমরা কখনও দেখিনি। আবদুন নূর চাচাও গোপনে মদ খায়।

বাজারের পয়েন্টে বাবার ফার্মেসি। খুলতেন সকাল নয়টায়, বন্ধ করতেন রাত নয়টায়। সকালে বাসা থেকে ভাত খেয়ে যেতেন, রাতে ফিরে আবার ভাত খেতেন। সারাদিন আর দানা না, পানি। পাট্টার বাংলা। এক্ষেত্রে শহরের কেউ আমার বাবার নিন্দামন্দ করবেন না কখনও। দিনমান মদ গিলতেন মানুষটা, একফোঁটা মাতাল হতেন না কখনও। টলতেন না কখনও। উচ্চবাচ্য কিছু করতেন না কখনও। এ বড় আজব মদখোর!

আবদুন নূর চাচা কতদিন ধরে ‘ন্যাশনাল ফার্মেসির’ বাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট? ফার্মেসি পত্তনের দিন থেকেই। সাতাশ-আটাশ বছরের কম না তাহলে। এত বছর ধরে দিনের অর্ধেকটা একসঙ্গে কেটেছে দু’জন মানুষের, তাদের বোঝাপড়া মূল্যায়ন করার মতো অধিকার আমরা রাখি না নিশ্চয়।

কাল রাতে আবদুন নূর চাচা মদ খায়নি?

কথা বলি।

‘আবদুন নূর চাচা, ও।’

তাকাল মানুষটা। কালো মুখটা কান্নার দাগে ভরে আছে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোঁফের ফাঁকে ফাঁকে কান্না। পোর্ট্রেট স্টাডি হিসাবে দারুণ হতে পারে। মনে মনে আমি তার কিছু রাফ ড্রয়িং করে রাখলাম।

‘আবদুর নূর চাচা!’

চোখ মুছল।

‘চা খাও। চা তো ঠান্ডা হয়ে গেছে মনে হয়। আরেক কাপ দিতে বলি পিসিরে।’

মাথা দোলাল। লাগবে না।

‘সকালে নাস্তা-পানি কিছু করছো?’

মাথা দোলাল। করেছে।

‘রাতে ঘুমাইছো?’

মাথা দোলাল না। কথা বলল। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠ।

‘দুই চোউখ এক করতে পারি নাই, বাপ!’

‘এইটা তো ভালো করো নাই।’

‘কী করি!’

আবার চোখ ভিজে আসছে মানুষটার।

‘কী করবা, অনিয়ম করবা না।’

‘আর নিয়ম আর অনিয়ম, বাপ। তোমার বাপে কোন নিয়মে গেল? যাওনের সময় কি হইছিল তার?’

‘কী করবা, বলো।’

কেঁদে কঁকিয়ে উঠল মানুষটা। কান্না জড়িয়ে-মড়িয়ে যা বলল, ‘সে গেছে তার মতো গেছে, আমার কথা চিন্তা করে নাই। অনে আমার আধ আঙুলের হিসাব আমারে কে দিব রে বাপ?’

বলে আবদুন নূর চাচা যে সুরটা তুলল, সেটা এই পোক্ত রোদের সকালে আমাকে নিয়ে গেল কোন অমাবস্যার রাতে। আমাদের পাড়ার কুকুর ছিল ডিমলার, হেমবাবু উকিলের কুকুর, ঘোর অমাবস্যার রাতে সে এরকম কাঁদত। দীর্ঘলয়ের একটা, উ-উ-উ ধ্বনি। আমি অবশ্যি বুঝতে পারলাম না আবদুন নূর চাচা তার আধ আঙুলের কী হিসাবের কথা বলল।

বাবার শ্রাদ্ধ হলো তেরো দিন পর। আমি আরও কিছুদিন শহরে থাকলাম। আবদুন নূর চাচার সঙ্গে এর মধ্যে যে ক’বার কথা হয়েছে, সব বার তার আধ আঙুলের হিসাবের কথা বলে গেছে সে। অশ্রুসিক্ত হয়েছে এবং তার কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়েছে। আমার কিন্তু একবারও মনে হয়নি জিজ্ঞেস করে দেখি কিসের সে হিসাব। আমার বাবার সঙ্গে তার অ্যাসিস্ট্যান্টের আধ আঙুলের হিসাবটা কী?

ফরিদ, মান্না, ইশতিয়াক, মৃদুল, বাপি, রাজীব, তুষার, অমিয়। শহরে এরা আমার বন্ধু। এখানে প্রাসঙ্গিক একমাত্র ফরিদ। স্কুল লাইফের আগ থেকে আমরা বন্ধু। পারিবারিক সম্পর্ক। ফরিদের বড় চাচা বাবার বন্ধু। সাদ চাচা। এই সাদ চাচাই আমার জন্মের আগে আঙুরের চারা দিয়েছিলেন বাবাকে। ফরিদদের বাসায়ও একটা আঙুর গাছ আছে।

সাদ চাচার ছোট ভাই নাসির চাচার ছেলে ফরিদ। বাবা অত্যধিক স্নেহ করতেন তাকে। ফরিদের সঙ্গে যত কথা বলেছেন, আমাদের চার ভাইয়ের সঙ্গে তার সিকি ভাগও বলেননি জীবনে। ফরিদ ছিল তার এক রকম বন্ধু। মদখোর হলেও ঠান্ডা, চুপচাপ, আত্মগত আমার বাবা, ঠাট্টা-মশকরা করে কথা বলতেন এই পৃথিবীতে মাত্র দুই জনের সঙ্গে। এক. আমাদের টেডি পিসি, দুই. ফরিদ।

ফরিদদের বাসা ছাড়া শহরের আর দুই একটা বাসায় গতায়াত ছিল বাবার। ফরিদদের বাসায় নিয়মিত যেতেন। খেয়েদেয়েও ফিরতেন কখনও কখনও। একদিন আমরা একটা আজব ঘটনা বা দৃশ্য দেখলাম। তার আগে বাবার ড্রেসকোড বলি। সাদা বাংলা শার্ট, সাদা ধুতি আর খড়ম। ধুতি লুঙ্গির মতো করে পরতেন। খড়ম টায়ারের। জন্ম থেকে এটা আমরা দেখেছি। এক রাতে দেখলাম বাবা একটা নীল রঙের বাংলা শার্ট পরে ফিরেছেন। এটা এতই বিস্ময়কর ছিল যে, প্রথমে কিছুক্ষণ আমরা মূক হয়ে গিয়েছিলাম, পরে নিঃশব্দে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসিও করেছিলাম। মা এবং আমরা তিন ভাই। আমাদের ছোট ভাইটা তখনও হয়নি।

সাদ চাচার বড় মেয়ে হাসিনা আপার বিয়ে হয়েছে এবং থাকেন লন্ডনে। গতকাল দুপুরে মাত্র শহরে ফিরেছেন। বাবার নীল শার্ট দেখার দুই দিন পর হাসিনা আপা এলেন আমাদের দেখতে। উদ্্ঘাটন হলো বিখ্যাত নীল শার্ট রহস্য।

‘ও মামি, মামা তার নীল শার্ট নিয়া কিছু বলে নাই?’

হাসিনা আপা বললেন।

মা বললেন, ‘না রে, বেটি।’

‘শোনো, আমি শহরে আসছি, একদিন পর সে গেছে আমারে দেখতে! চিন্তা করতে পারো? নীল শার্ট দিলাম, বলে পরবে না। বললাম পরবে না মানে। ইস্ট লন্ডনের সেরা টেইলাররে দিয়া এই শার্ট আমি বানায়ে আনছি। তুমি এই শার্ট পরবে না মানে? তবে আমার কেমন মামা হও তুমি! তখন বলে, আচ্ছা দে, পরব। পরবে মানে? এখন পরো। পরিয়ে তবে ছাড়ছি, বুঝছো? তার পরনের সাদা শার্টটা প্যাকেট করে দিছিলাম। ভুলে আনে নাই। আমারও আজকে আনতে মনে নাই। পাঠায় দিবো নে ফরিদরে দিয়া।’

ফরিদ, অহিদ ভাইরা কাকা ডাকে বাবাকে। হাসিনা আপা ডাকেন মামা।

হাসিনা আপার নীল শার্টটা বাবা অনেক বছর ধরে পরেছিলেন। আমাদের ছোট ভাইটা জন্মেও দেখেছে।

ফরিদকে আবদুন নূর চাচার কথা বললাম। আধ আঙুলের হিসাবের কথা বললাম। ফরিদ কিছু বলতে পারল না। তবে বলল, ‘দাঁড়া, আমি একবার ব্যাটার সাথে কথা বলে দেখি।’

পরে আমি কয়েকবার গেছি শহরে। আধ আঙুলের হিসাবের কথা আর ওঠেনি। বছর দুয়েক পর নদীর পাড়ে বসে, মান্না, ইশতিয়াক, মুস্তফা, ফরিদ আর আমি আড্ডা দিচ্ছিলাম, হঠাৎ ফরিদ বলল, ‘এই! আবদুন নূর ব্যাটার আধ আঙুলের হিসাবের কথা মনে আছে তোর?’

মনে থাকবে না?

ফরিদ বলল, ‘আরে, কাকা তো মদ খাইতেন একটা স্টার কনডেন্সড মিল্কের কৌটায় বুঝছিস? পলিশ করা কৌটা। হিসাব ছিল আবদুন নূর ব্যাটা তিন আঙুলের মাপে দিব প্রতিবার। ব্যাটা করত কি, আড়াই আঙুল কাকারে দিয়া আধ আঙুল সাবাড় করত কিনা নিজেই। এই হইল তার আধ আঙুলের হিসাব, বুঝছস?’

বুঝলাম। নাকি বুঝলাম না?

দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাটানো দু’জন মানুষের বোঝাপড়ার হিসাব আধ আঙুল?

আধ আঙুল। একটু বেশি না, একটু কম না।

কাজকর্মের চাপ, নানাবিধ ব্যস্ততা, ক্রমে আমার শহরে যাওয়া কমেছে। চার-ছয় বছরে যাই একবার। গেলেও দেড়-দুই দিন থাকি। সবার খবর নিয়ে উঠতে পারি না।

মানবজাতি এর মধ্যে একটা আজব মেশিন আবিষ্কার করে ফেলেছে। মোবাইল ফোন। জিনিসটা বিরক্তিকর হলেও কাজের। আবদুন নূর চাচার কথা মনে পড়ল একদিন, কল দিলাম আমার ছোট ভাইকে।

‘আবদুন নূর চাচা কি আছে?’

‘আছে-এ-এ। বাসায় আসে তো। বুড়া হয়ে গেছে। অর্ক, অহনা আর অরণিরে নিয়া বসে থাকে।’

অর্ক, অহনা এবং অরণি, আমার ভ্রাতুষ্পুত্র এবং ভ্রাতুষ্পুত্রী।

‘সব দিন আসে?’

‘প্রায় সব দিন। অসুখ-বিসুখে পড়লে আসে না আর কি।’

‘মদ খায় এখনও?’

‘খায় মনে হয়।’

‘আমি তোরে কিছু টাকা পাঠাব। তুই তারে দিতে পারবি না?’

‘পারব! পাঠাও।’

‘লম্বাহাটিতে গিয়া দিয়া আসবি তুই।’

‘আচ্ছা-আ!’

বিকাশ করে আমি কিছু টাকা পাঠালাম।

ঘণ্টা তিনেক পর সন্ধ্যায় কল দিল আমার ছোট ভাই, ‘বড়দা!’

‘বল।’

‘আবদুন নূর চাচারে দিছি টাকা। ব্যাটা যে কী কান্নাটা কানলো। ছেলে, ছেলের বউ, নাতি নাতনি সব কয়টারে ডাকছে। দেখো রে! দেখো! দেখো! তোমরা দেখো! আমার বাবুর পোলা কী করছে দেখো!’

আমার ভাই হাসল।

আমিও হাসলাম।

দুই দিন পর রাত এগারোটার দিকে ফরিদ ফোন করে বলল, ‘আবদুন নূর ব্যাটা তো সন্ধ্যায় মারা গেছে রে!’

‘কী বলিস?’

আর কী বলব? আধ আঙুলের হিসাব তবে ফুরাল।

ধ্রুব এষ : চিত্রকর, কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares