গল্প : নৌকাডুবি ও বিস্মৃতি : শাহাব আহমেদ

শাহাব আহমেদ ।।

বাড়ির পূর্ব দিকে ছিল আমাদের মস্ত বড় পুকুর, তারপরে রথখোলার পুকুর। শুকনোর সময়ে দুটোর সীমানা নির্ধারণকারী ছোট আলটি জেগে উঠতো, কিন্তু বর্ষায় মিলে হতো এক মস্ত দীঘি। এর উত্তর দিকে ছিল আমাদের বাগানবাড়ি, গাছগাছালিতে ভরা। সেই বাগানবাড়ির পূর্ব সীমান্তে বিশাল বাঁশঝাড় ও সাপ-খোপের বাসা, তার পরে একটু নিচু হালট, দশ-পনেরো গজ প্রশস্ত। তা-ই বর্ষায় দুই পুকুরের সাথে আমাদের বাড়ি ও বাগানবাড়ির উত্তর দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া, সারা বছর নাব্য, বড় দিঘলি- কনকসার খালের সংযোগ সাধন করত।

পূর্ব-উত্তর কোনায় খালের প্রায় লাগোয়া ছিল একটা বিশাল গাবগাছ, আর তার নিচে ল্যাট্রিন। তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকার বাসা বাঁধত এই গাব গাছে, গ্রামের সমস্ত ভূত থাকত এর ডালে ডালে, পাতায় পাতায়। রাতে কখনও যদি এর কাছাকাছি যেতে হতো আয়তুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিতে দিতে যেতাম। এই সুরার ছিল অসামান্য শক্তি, কোনো ভূত-প্রেত আমাদের স্পর্শ করেনি কোনোদিন। কোনায় যে বাড়িটি ছিল রথখোলা সন্নিহিত, ল্যাট্রিনটি ছিল সে বাড়ির। ওরা মুসলমান ছিল না। আয়তুল কুরসি ওরা পড়েনি তবে ও বাড়ির কাউকেও কখনও ভূতে ধরেছে বলে শুনিনি। ধারণা করি তাদেরও হয়তো কোনো শক্তিশালী মন্ত্র ছিল।

এ ছাড়া পুকুরের পুব পাড়ে ছিল বেশ কয়েকটি বাড়ি, একটার গা ঘেঁষে অন্যটি। একটা মস্ত ঝাকড়ানো হিজল গাছ ছিল পুকুরের পুব পাড়ে, বর্ষায় তার গাঢ় সবুজ পাতা ও হিজল ফুল জল ছুঁয়ে থাকতো। জলের স্রোতে সেই পাতাগুলো নড়তো, আর প্রসারিত নরম হিজল ফুলের সুতা জলের বুকে আঁচড় কেটে অগভীর ক্ষতের সৃষ্টি করত।

অসামান্য ছিল সেই হিজলের জলকেলি।

পুকুরের পূর্ব-দক্ষিণ কোনায় ছিল অনেকগুলো হিজলের বীথি। শুকানোর সময় তাই হতো সাপের বাসা বা লোকজনের প্রাকৃতিক কাজ স¤পাদনের অতিরিক্ত স্থান। শুধু বর্ষাকালে অসংখ্য হিজল রূপসীর গা স্পর্শ করে তৈরি হতো সরু একটি খালের মতো এবং চলে যেত ব্রাহ্মণগাঁও হাইস্কুল ও পাইকারা গ্রামের দিকে। দিঘলি- কনকসার খাল থেকে পূর্ব-উত্তর কোনা দিয়ে নৌকা ঢুকতো আমাদের পুকুরে, তারপর পূর্ব-দক্ষিণ কোনা দিয়ে বেরিয়ে যেত। আধডোবা হিজলগুলোর ফাঁকে ছিল অসম্ভব স্রোত ও ঘূর্ণিজল। বড় নৌকা চলার মতো প্রশস্ততা ছিল না; কিন্তু কোষা নৌকা বা ছোট ‘কেরাইয়া’, নৌকা চলত। আর ছোট এই নৌকাগুলো কখনও কখনও ডুবে যেত।

একবার আমাদের গ্রামের গৌরাঙ্গদা নৌকা বাইছিল। সেই নৌকায় ছিল খুব সুন্দরী ও যৌবনবতী এক নারী, গ্রামেরই এক বৌদি। তার কপালে ছিল লাল সিঁদুর আর চোখে কাজল, চুল ছিল কোমর পর্যন্ত, যাকে বলা হতো মেঘকালো চুল। আর তার দেহে ছিল বর্ষা-হিজল যৌবন। আমি ছিলাম সেই ছোট নৌকায় আর সেই বৌদির ছোট্ট ফুটফুটে মেয়ে, আড়াই কি তিন বছরের। গৌরাঙ্গদা ছিলেন ভালো ছেলে, ভালো ছাত্র এবং বেশ ছিল তার সুনাম। সেই দিন হয়তো দিনটি ছিল সুন্দর এবং তার মন হয়েছিল উড়নচণ্ডী, তার কোথা থেকে কী মনে হলো, তিনি নৌকায় একটি দুলুনি দিয়ে বললেন, ‘বৌদি দেই নৌকা ডুবাইয়া’? নৌকার দুলুনিতে বৌদি সন্ত্রস্ত হলেন। বললেন, ‘না লক্ষ্মী ভাই, না’, বাচ্চা মেয়েটি কেঁদে উঠল। দাদা লজ্জিত হলেন। তার অর্বাচীন রসিকতার রেশ কেটে ওঠার আগেই নৌকা এসে গেল পূর্ব- দক্ষিণের সেই দুর্দান্ত স্রোতের জায়গাটিতে। যেন কোনো অশুভ শক্তি প্রচণ্ড গতিতে নৌকাটিকে টেনে নিতে লাগল, গৌরাঙ্গদা নৌকার নিয়ন্ত্রণ হারালেন, ঘূর্ণির মধ্যে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়ে নৌকাটি উল্টে গেল। গৌরাঙ্গ দা, বৌদি, আমি সাঁতরে রেহাই পেলাম। বৌদির ছোট্ট মেয়েটি নিখোঁজ হয়ে গেল, জলস্রোত তাকে কোথায় নিয়ে গেল কোনো হদিসই করা গেল না। দু’দিন পর তার মৃতদেহ ভাসতে দেখা গেল হিজল গাছের ঝোপের মধ্যে জলে ডুবানো ডালপালার মাঝে।

সারা গ্রামে শোক নামল, কেউ কেউ গৌরাঙ্গদাকে তিরস্কার ও দোষারোপ করল যে, সেই ইচ্ছে করে এই দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছে, যদিও তার কোনো মোটিভ খুঁজে পাওয়া গেল না। আমি সেই বৌদিকে কাঁদতে দেখেছিলাম পাগলিনীর মতো আলুঝালু চুলে। আমি গৌরাঙ্গদাকে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে খালি হাসতে দেখেছিলাম।

তারপরে আমাদের গ্রামে এলো যুদ্ধ। সেই দেশ আর সেই দেশ রইল না। অপ্রকৃতিস্থ গৌরাঙ্গদার হাবভাব চালচলন দেখে মিলিটারিদের মুক্তিযোদ্ধা বলে সন্দেহ হলো, তারা তাকে ধরে নিয়ে গেল। আর কন্যাহারা বৌদি বাংলার অজস্র নারীর মতো অসংখ্য বন্য বরাহের নখরের আঁচড়ে আঁচড়ে নাই হয়ে গেলেন। আজও চোখে ভাসে তার কপালে লাল সিঁদুর, চোখে কাজল… সেই বৌদি, সেই গৌরাঙ্গদা কোথায় হারিয়ে গেলেন। না, তাদের কোনো চিহ্ন বা স্মৃতি সেই গ্রামে আর  নেই। সেই গ্রাম, সেই পুকুর, সেই উন্মত্ত কাটালের হিজল বীথিও ধুয়েমুছে গেছে পদ্মায়। সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা কেউ মনে রাখেনি এবং আমি যখন চলে যাব সেও মুছে যাবে চিরতরে, মানবজাতির স্মৃতি হতে।

শাহাব আহমেদ : কথাসাহিত্যিক

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares