গল্প : নদী শিকস্তি : কাবেদুল ইসলাম

কাবেদুল ইসলাম ।।

‘এই যে দেখতিছেন দুনিয়েডা, চাইর পাশে এত সবুজ গাছপালা, পাখপাখালি, রংবেরঙের মানুষজন, এর সব কিছুর মধ্যি আসলে ফাঁকিবাজ মাইয়ে মানুষির কারবারে ভর্তি। আপনারা যুবোক ছোয়াল-পান, এহন বোঝপেন না, আগে বিয়েশাদি অরেন, তহন বোঝপেন ইর্গে কারসাজি। ইর্গে এট্টাই কাজ, পুরুষগুনোরে লোভের মায়াজালে ফাঁসাইয়ে প্রথমে সংসারের খাঁচায় পোরে, তারপর কিছুদিন তাইর্গে নিয়ে খেইলে-দুলে শেষে অকুল সমুদ্দিরি ভাসায় দেয়।’

যেন কত ভেবেচিন্তে, তাবত দুনিয়ার মেয়েলোকদের সম্পর্কে আদালতের বিজ্ঞ হাকিমের মতো রায় ঘোষণা করতে পেরেছে, এমনভাবে ধীরে ধীরে, গুছিয়ে কথাগুলো বলল প্রৌঢ় খেয়ামাঝি। পরে জেনেছিলাম, তার নাম উকিলদ্দি গাজি, লোকে ডাকে ‘উকিল মাঝি’ বলে। সারাদিনের রোদে পোড়া মুখ, প্রায় কোটরে-বসা কুতকুতে হলুদ এক জোড়া চোখ, গায়ের রং পাটকিলে তামাটে, কোমরের উপরের অংশে ময়লা গেঞ্জি আর নিচে পুরোনো চেক লুঙ্গি। সব মিলিয়ে খেয়াঘাটের মাঝির টিপিক্যাল চরিত্র, ফলে চেহারায় ব্যতিক্রম বা নতুনত্ব কিছু ছিল না।

কিন্তু তার কথা শুনলে অবাকই শুধু নয়, কখনও কখনও ভিরমি লাগারও জোগাড় হতে পারে কারও কারও। এই যেমন উপরের কথাগুলো বলে লোকটা আমাদের বিস্ময় ও কৌতূহল বাড়িয়ে দিলো কয়েকগুণ।

আমাদের আগ্রহ দেখে অর্থাৎ প্রায় এক হালি মনোযোগী শহুরে শিক্ষিত শ্রোতা পেয়ে সে এবার হাতের বৈঠাটা কাঁধ আর কান বরাবর স্থির রেখে নৌকাকে আপন গতিতে চলতে দিয়ে একইভাবে বলে চলল, ‘এরা পুরুষ মানুষিরি ছলনায় বাঁধে ঠিকি, কিছুদিন ঘর-সংসারও করে, তারপর হুট কইরে একদিন তারে ফ্যালায় থুইয়ে রাত্তিরির আন্ধারে ভাইগে যায় আরেকজনের সাথে। মাঝখানথে উর্গে পেরেম-পিরিতির মোহে পইড়ে বারোডার হদ্দ বাইজে যায় পুরুষগুনোর।’

দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে থামল উকিল মাঝি। উদাস ভঙ্গিতে কাঁধ থেকে বৈঠা নামিয়ে অভ্যস্ত হাতে কয়েকবার জোরে জোরে টেনে নৌকার চলার গতি বাড়াল।

তারপর সেই অবস্থায়ই অদ্ভুত, তীক্ষ্ণ চোখে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পাকা জহুরির মতো তাকে প্রায় ঘিরে-বসা শ্রোতা তিনজনের উৎসুক মুখ জরিপ করল। শেষ হলে কিছুটা উদ্বিগ্ন গলায় বলল, ‘কিন্তু আপনারা কারা- কনদিনি বাপুরা, কোহানথে আইছেন? আপনাগের তো আগে কোনোদিন এ মুহো দেহিনি। টাউনতে নতুন আয়ছেন বুঝি?’

আজব কিসিমের লোক উকিল মাঝি, প্রশ্ন করল বটে, কিন্তু উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে পরক্ষণেই কী মনে করে মৃদু প্রবহমান নদীর স্রোতের দিকে চোখ ফেরাল। নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকল সেদিকে।

বিস্মিত আমরা, তার দিকে তাকিয়ে আছি তখনও। সত্যি কথা বলতে আমাদের সবার মধ্যে তখন কৌতূহল জেগে বসেছে, যেন রহস্যের আভাস পাচ্ছিলাম সবাই।

কী বলতে চায় লোকটা? এই বিচিত্র জগৎ-সংসারে এত কিছু থাকতে কেনই-বা সে হঠাৎ মেয়েমানুষের চরিত্র-ঠিকুজি নিয়ে উঠে পড়ে লাগল? নিশ্চয়ই এর পিছনে কোনো কারণ আছে।

নিজেদের ভিতরে এসব নিয়ে আমরা যখন ভাবতে শুরু করেছি, সে তখন আবার সেই অদ্ভুতুড়ে কথাগুলো বলা শুরু করল। তবে এবারে তার গলার স্বর আগের মতো তত উঁচু ও স্পষ্ট নয়, বরং অসংলগ্ন ও প্রায় দুর্বোধ্য। ফলে অধিকাংশ কথাই আমরা বুঝতে অক্ষম হলাম। তা সত্ত্বেও তার মুখনিঃসৃত দু-চারটে আরও যে অদ্ভুতুড়ে শব্দ শুনলাম, তাতে করে তার প্রতি কৌতূহল সৃষ্টির পরিবর্তে উকিল মাঝির মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়েই সন্দেহ দেখা দিলো আমাদের মধ্যে। বয়স্ক লোকটা কি পুরো সুস্থ, নাকি এক ধরনের বিকারগ্রস্ত, যেজন্য এতক্ষণ ধরে একের পর এক প্রলাপ বকে যাচ্ছে?

এখন অঘ্রানের শেষ।

শীতের শীর্ণদেহী নদী বলে ঘাট-পারানিদের নদী পার হতে সময় লাগে না তেমন। আমাদেরও লাগল না। আমরা ইতোমধ্যে নিজেদের মধ্যে ফিসফিসিয়ে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি যে, আপাতত উকিল মাঝি সম্বন্ধে আরও কিছু তথ্য না নিয়ে নৌকা থেকে নামব না। প্রয়োজনে আগের মতো আবার নৌকা রিজার্ভ করে এ নৌকাতেই নদী পার হবো। উপযুক্ত ভাড়া আর কম যাত্রী পেলে নিশ্চয়ই সে আপত্তি করবে না। তবু উকিল মাঝির এসব উদ্ভট কথার পেছনের রহস্য জানা দরকার।

নৌকা এপারের ঘাটে এসে ভিড়লেও আমরা নামছি না দেখে উকিল মাঝি এবার অতিরিক্ত কৌতূহল নিয়ে আমাদের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে নিস্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কি শহুরে মেঞারা, লাও থে নামবেন না নাহি? না সারা জেবন বইসে থাকপেন?’ পরক্ষণেই যোগ করল, ‘তা থায়েন বাপুরা, আপনাগের সুমায় থাকলি থায়েন বইসে, আমার কি? তায় আমার পাওনা ভাড়া কিন্তু ঠিকি দিতি হবে নে। ঘণ্টা পেরতি তিরিশ টাহা। এর কলাম মাপ নেই, টাহা না পালি বাড়ি যাইয়ে খাব কি? কলাডা!’

এবার আমাদের মধ্যে সিনিয়র রুহুল আমিন সিদ্দিকি ভাই বললেন, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, ভাড়া তো দেবোই, নিশ্চয়ই দেবো। তার আগে-।’ থেমে গেলেন তিনি। কী বলবেন?- যেন কথা খুঁজে পেলেন না, এমনভাবে আমতা-আমতা করলেন। তারপর হঠাৎ মাথায় আসতে বুদ্ধি করে বললেন, ‘সিগারেট কেনার সময়ে ওপারে এক দোকানে হাতের ব্যাগ ফেলে এসেছি, আবার ওপারে যেতে হবে, আপনার নৌকায় যেতে চাই, কষ্ট করে নিয়ে যাবেন আমাদের? উপযুক্ত ভাড়া পাবেন।’

‘তা উপযুক্ত ভাড়া পালি, একবার ক্যান, আপনারা চা’লি দিনের মধ্যি শ’বার নিয়ে যাব, যাব না ক্যান? লাও বায়াই তো কাজ। টাহা পাবো আর পানির মধ্যি ঝটপট বৈঠের গুঁতোয় লাও এপার ওপার এ্যরব, এতে আর বেশি কি?’

বোঝা গেল, প্রসঙ্গ পেলে সহজে কথা শেষ করতে চায় না উকিল মাঝি। একেবারে মনের ভাব সম্পূর্ণ নিংড়ে দিয়েই তবে তার ক্ষান্তি।

এবার আমিই বললাম, ‘তা হলে এক্ষুনি নিয়ে চলেন ওইপারে, তাড়াতাড়ি না গেলে ব্যাগটা আবার কেউ হাতিয়ে নিতে পারে।’

‘তা যা কয়ছেন’, উকিল মাঝি শুরু করল, ‘এহন দিনকাইল যা পইড়েছে, চোর-চাট্টা আর চোগোলখুরিতি ছাইয়ে গেছে দ্যাশ-গিরাম। আগের দিন হোলি ওরাম দিনকে দিন জিনিসপত্তর পইড়ে থাকলিউ কেউ ছুতো না। তা চলেন যাই, দেরিং না অইরে নিয়ে যাই।’

বলতে বলতে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে, শক্ত হাতে বৈঠা চালিয়ে ছোট্ট পারানি নৌকার গলুই ঘুরাল সে। এই ফাঁকে আমরা আগের স্থান থেকে একটু পিছনে সরে এসে দু’জন পাটাতনের ওপর এবং একজন নৌকার পাশের ডালিতে নিতম্ব রেখে পা ছড়িয়ে বসলাম। তারপর উকিল মাঝি যেন বুঝতে না পারে এমনভাবে কখনও ইংরেজিতে কখনও বাংলায় ইঙ্গিতবাহী দু-এক শব্দে পরবর্তী করণীয় সেরে নিলাম।

তার নৌকায়ই ফিরব আবার। ইত্যবসরে লোকটার কাছ থেকে জেনে নিতে হবে তার নাম-পরিচয়, বাড়ি কোথায়, সংসারে কে কে আছে- এইসব। কিন্তু লোকটা যেহেতু একটু অন্য টাইপের, তাই যদি তার কাছ থেকে কোনো কিছু জানা সম্ভব না হয়, তবে দু’পারের ঘাটের স্থানীয় লোকজন, দোকানিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করব তার সম্পর্কে। দরকার হলে তার ওপর একটা ফিচার স্টোরি তৈরি করব বলেও মনঃস্থ করলাম আমরা।

নৌকা মাঝনদীতে এলে উকিল মাঝি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘তা মেঞারা, আপনাগের কাছথে তো জানা হোলো না, দল বাইধে যাতিলেন কোহানে?’

‘দুধলমৌ, দুধলমৌ গ্রামে যাব আমরা।’ দলের তিন নম্বর সদস্য ফরিদ বলল। ‘চেনেন গ্রামটা? হাঁটাপথে নদীর ওপার থেকে কত দূর হবে?’

আচমকা অতিউৎসাহী হয়ে প্রায় চেঁচানো গলায় জিজ্ঞেস করল উকিল মাঝি, ‘দুধেলমৌ চিনিনে মানে, কচ্ছেন কি? পাশেই তো আমা’গের গিরাম।’ একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, ‘তা দুধেলমৌ যাবেন কোহানে, কাইর্গে বাড়ি? নজির ব্যাপারির? তার বাড়িতিই তো ঘটনাডা-।’ শেষ করল না সে, কৌতূহল জমিয়ে রাখল।

এবার সত্যি-সত্যিই বিপদে পড়লাম আমরা।

কী জবাব দেবো তার প্রশ্নের, কিছুই তো জানি না। অফিস থেকে শুধু একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়েছে একজনের ঠিকানার, নদীর ওপার থেকে ভ্যানে ৪ কিলোমিটার গিয়ে প্রথম যে ছোট্ট বাজারটা পড়বে, সুরখালি না কী নাম, সেখানেই থাকবে ঠিকানার আবুল হোসেন নামের ছেলেটা। বাকি পথ চিনিয়ে সেই আমাদের নিয়ে যাবে উদ্দিষ্ট জায়গায়। তারপর সেখানে গিয়ে আমরা আমাদের মতো করে কাজ করব, খবর তথ্য ইত্যাদি সংগ্রহ করব।

অবশ্যি এই ফাঁকে আমাদের পরিচয়ও একটু দিয়ে নেওয়া দরকার। আমরা আসছি খুলনা থেকে। পেশায় তিনজনই সংবাদকর্মী। জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকের পক্ষে এখন যাচ্ছি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু চাঞ্চল্যকর ও রহস্যময় ঘটনার নিউজ কাভারেজের জন্য।

 গত দু-তিন সপ্তাহ যাবত বাঘ-হরিণ-সমাচ্ছন্ন সুন্দরবনের গহিন অরণ্যের প্রায় লাগোয়া (অবশ্যি মধ্যে এক চিলতের একটা নদী আছে, স্থানীয়রা কাঠ কাটতে প্রায়ই তা সাঁতরে পার হয়ে গিয়ে ওঠে বনের ভিতর) ‘দুধলমৌ’ নামক গ্রামে কী এক অদ্ভুত প্রাণীর নাকি আবির্ভাব ঘটেছে! প্রাণীটার দেহ ও পদ দিব্যি মানুষের মতো হলেও তার মস্তক নাকি সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আকৃতির। গ্রামের এক কিশোর খুব ভোরে কলাবনে প্রাতঃক্রিয়া সারতে গিয়ে শৌচকর্ম শেষে যখন পিছন ফিরে গৃহের পথ ধরল, তখনই নাকি সেই অদ্ভুতদর্শন জন্তুটা দেখেছে সে। তবে অজ্ঞাত কারণে জন্তুটা তাকে আক্রমণ না করে উল্টো নিজেই ভয়ে দ্রুত সটকে পড়ে বাগানের ভিতর। প্রচণ্ড চিৎকার দিয়ে কিশোর তখন অজ্ঞান এবং ভূমিসাৎ। পরে তার পরিবারের লোকজন গিয়ে যখন তাকে জীবিত উদ্ধার করে ততক্ষণে বালকের একটা পায়ের অনেকখানি খোয়া গেছে অর্থাৎ খেয়ে ফেলেছে কীসে যেন! সেইসঙ্গে তার সারা শরীরের এখানে-ওখানে দৃশ্যমান অজ্ঞাত প্রাণীর দাঁতের ও নখের আঁচড়। ছেলেটার জ্ঞান ফিরলে পরিবারের সকলের এবং প্রতিবেশী আরও দু-চার লোকের সামনে সে জানাল তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। ব্যস্, তারপরই রটে গিয়েছিল খবরটা গ্রামময়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল তীব্র আতঙ্ক। চাপা ভয় ও উত্তেজনা সবখানে। দু’দিন পরে স্থানীয় এক দৈনিকের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হলো এ খবর। কয়েকদিনের ব্যবধানে অনুরূপ ঘটনা একই গ্রামের অন্য একজন কিশোর ও একজন কিশোরীর ক্ষেত্রে ঘটলে টনক নড়ল প্রশাসনের। এর মধ্যেই সাংবাদিকেরা স্থানীয় থানার ওসির সঙ্গে এ নিয়ে দু’দফা কথা বলেছে। কিন্তু তার কাছ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। চতুর্থ আরেকটা ঘটনা ঘটলে জাতীয় দৈনিকগুলোতেও কৌতূহলজনক খবরটা কাভারেজ পেল। শুরু হলো সিভিল-পুলিশ- উভয় প্রশাসনের দৌড়াদৌড়ি। ডিসি-এসপিও এলাকাটা ঘুরে গেছেন, এবং শিগগিরই এর একটা বিহিত ব্যবস্থা নেবেন বলে লোকজনকে আশ্বস্ত করে গেছেন। সেইসঙ্গে অনুরোধ করে গেছেন আপাতত ভয় না পেতে ও ধৈর্য ধরতে।

সঙ্গত কারণে আমরা যারা স্থানীয় সাংবাদিক এবং কোনো কোনো জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি তাদের ওপর উপরমহলের নির্দেশ এসেছে, সরেজমিনে গিয়ে এটার ওপর একটা তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট তৈরি করার। বস্তুত এই উদ্দেশ্যেই আমরা তিনজন সকালে খুলনা থেকে রওনা হয়েছিলাম।

 সোনাডাঙ্গা নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে চড়ে ওপার পর্যন্ত এসেছি লক্কড়-ঝক্কড় মুড়ির টিন-মার্কা বাসে, তাও প্রায় আড়াই পৌনে তিন ঘণ্টা পেটে খিঁচুনি-ধরানো ঝাঁকুনি খেতে খেতে। মাত্র ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ কিলোমিটারের যাত্রায় তিন ধরনের রাস্তা পেরিয়েছি। এর মধ্যে অর্ধেকের কম ছাল-ওঠা কুকুরের মতো স্থানে স্থানে অসংখ্য ভাঙা-চোরা পিচরাস্তা, কিলোমিটার তিন-চার উঁচু-নিচু হেরিংবোন আর বাকিটা গর্ত-কাদাবহুল এবড়োখেবড়ো মাটির পথ। মাঝে প্রায় আধঘণ্টা বিরক্তিকর ঘাটে অপেক্ষার পর ১০ মিনিটের ফেরিপার একটা। সব পেরিয়ে যখন এই পানখালির ঘাটে এসে পৌঁছেছিলাম, তখন অবশ্যি ঘাটে পারানির কোনো নৌকা ছিল না।

পারাপারের যাত্রীও হাতেগোনা দু-চার জন ছিল মাত্র।

খোঁজ নিয়ে জানলাম, ব্যক্তিগত মালিকানার তিনটে খেয়ানৌকা এপার-ওপার করে নদীর। একটার মালিকের মৃত্যু হওয়ায় সেটা সপ্তাহখানেক ধরে বন্ধ। ফলে এখন দুটো চলাচল করছে। তাকিয়ে দেখলাম, দুটোর একটা ওপারের ঘাটে যাত্রী তুলছে এবং অন্যটা মাঝনদীতে, মন্থর চালে হেলতে-দুলতে এপারমুখো।

পরে মাঝনদীর নৌকাটা এপারে এলে ত্রিশ টাকায় রিজার্ভ করেছিলাম আমরা।

এটাই উকিল মাঝির নৌকা। তার সেই নৌকায়ই আবার এপারে এসে পৌঁছুলাম।

‘ব্যাগটা নেব আর একটু চা খেয়েই চলে আসব’- বলে তিনজন নেমে এলাম নৌকা থেকে। উকিল মাঝিকে আমাদের সঙ্গে চা খেতে আসতে বললে, সে মাথা নাড়িয়ে ‘ওসব গরুর মুত-চ্যানা আমি খাই নে’ বলে মুখ সিঁটকালো। অগত্যা তাকে বসতে বলে আমরা তীরে উঠতে শুরু করলাম।

নদীতে এখন ভাটা। এর মধ্যেই পানি কিছুটা নিচে নেমে যাওয়ায় তীরের নরম ‘সর’ আর ‘পেড়ি’ কাদা দেখা দিতে শুরু করেছে। তবে যাত্রীদের ওঠা-নামার পথটা এখনও মোটামুটি শুকনো। পাড়ে উঠে হাঁটতে লাগলাম আমরা একচালা দোকানগুলোর দিকে।

চা খেয়ে ১৫/২০ মিনিটের মধ্যেই আবার ফিরে এলাম।

উকিল মাঝি তখন গলুইয়ে বসে আপন মনে গুনগুন করে গান করছে। গলার স্বর তার একেবারে মন্দ নয়, বরং মিষ্টিই মনে হলো।

আমাদের দেখে শশব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘আয়ছেন মেঞারা, ওঠেন-ওঠেন তাড়াতাড়ি, আপনা’রগে পার কইরে দিয়ে আমার বাড়ি যাতি হবে জলদি। গোছল দে’ ঘুম দেবো কইসে এট্টা। ঠিক করিছি আইজ আর লাও চালাব না। এত খাট্নি অইরে কি এরব? দুইন্যে-সংসারে খা’য়ার মানুষ আছে ডা খিডা যে, দিনরাইত লাওয়ে পইড়ে থাকপো? সহালথে এ পয্যন্ত যা পাইছি, তাতেই চইলে যাবেনে কয়দিন।’ বলতে-বলতে সে নৌকা থেকে তীরে নেমে নৌকার মুখটা এক ধাক্কায় ঘুরিয়ে দিলো ওপারের দিকে। আমরা ততক্ষণে উঠে পড়েছি নৌকায়।

উকিল মাঝি গলুইতে গিয়ে বৈঠা হাতে নিয়ে বসল।

চলতে শুরু করল নৌকা।

এবার আমরা তার থেকে একটু দূরত্বে প্রায় গোল হয়ে পাটাতনের ওপর বসে পড়লাম এদিক-ওদিক মুখ করে। ভাবখানা, তার প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাই যে-যার মতো নদীর দিকে তাকিয়ে ঘোলা স্রোতের বহে চলা দেখতে লাগলাম।

আসলে চা খেতে-খেতেই আমরা ঠিক করে এসেছি, উকিল মাঝি যদি স্বেচ্ছায় কিছু বলে তো ভালো, না হলে একবার রুহুল ভাই, একবার আমি বা ফরিদ, আবার রুহুল ভাই এভাবে পাল্টাপাল্টি প্রশ্ন করে কৌশলে তার মুখ থেকে কথা বের করে আনব। এবং সেটা যদি পারাপারের অল্প সময়ের মধ্যে না হয় তবে প্রয়োজনে ওপারের ঘাট থেকে দূরে যে ইটভাটাটা দেখা যাচ্ছে, সেখানে নিষিদ্ধ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে কি-না তার ছবি তুলব বলে তাকে সেখানে নিয়ে যেতে বলব। তাতে করে তার নৌকায় আরও কিছুক্ষণ থাকতে পারব। তবে প্রথমে কিছুক্ষণ উপযাচক হয়ে আমরা কেউ কোনো কথা বলব না, তাকেই সুযোগ দেবো, সে নিজের ইচ্ছায় কিছু বলে কি-না, দেখব।

প্ল্যান মতো উকিল মাঝির আবোল-তাবোল কথাবার্তা শুনবার প্রস্তুতি নিয়ে অধীর আগ্রহে কান পেতে রইলাম তিনজন। তবে যা ভেবেছিলাম, তা হলো না। উকিল মাঝি এই মুহূর্তে আশ্চর্য রকমের চুপচাপ এবং নির্বিকার। আপন মনে নিঃশব্দে বৈঠা বাইছে তো বাইছেই। যেন কোনো অলৌকিক শক্তি বলে সে আমাদের মনের গোপন ইচ্ছা জানতে পেরেছে, আর তাই কথা না বলে বরং গম্ভীর মুখে এক মনে নৌকা বেয়ে চলেছে।

কিন্তু এভাবে চললে তো আমাদের উদ্দেশ্য পণ্ড হবে। নৌকা এর মধ্যেই নদীর অর্ধেক পেরিয়ে এসেছে। অস্থির হয়ে উঠলাম আমরা। তাকে এড়িয়ে সাবধানে নিজেদের মধ্যে উদ্দেশ্যমূলক চাহনি বিনিময় করলাম, অর্থাৎ এবার আমাদের অ্যাকশনে যাওয়া দরকার, না হলে সময়ে কুলোবে না।

ফরিদ আর আমার নীরব সম্মতি পেয়ে রুহুল ভাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, মাঝি মিয়া, এই যে এতক্ষণ ধরে আপনার নৌকায় আছি, আগেরবার যাওয়ার সময় আপনি বেশ মজার মজার কথা বললেন, শুনে খুব ভালো লাগল। তো আপনার নামটা এখনও জানা হলো না! কি নাম বলুন তো আপনার?’

প্রশ্নটা যাকে করা তার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সে বুঝি এই মুহূর্তে ইহজগতে নেই। কুতকুতে চোখ অর্ধেক কুঞ্চিত করে রোদ ঝলসানো আকাশের দিকে তাকিয়ে নির্বিকারভাবে বৈঠা বাইছে আর একবার-একবার দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বিড়বিড় করে কাকে যেন কী বলছে!

আমরা একটু ভড়কে গেলাম। কয়েক মুহূর্তে নীরব থেকে রুহুল ভাই আবার জিজ্ঞেস করলেন। তবে এবার প্রশ্ন করার মতো করে নয়, বরং অনেকটা অনুনয়ের ভঙ্গিতে, নরম গলায়।

‘তা আপনার মতো এত চমৎকার, ইন্টারেস্টিং লোকের নাম জানতে না পারাটা সত্যিই আমাদের জন্যে দুঃখজনক। আপনাকে মনে রাখব কী করে, বলুন?’

একইসঙ্গে তাকে উৎসাহিত করতে তিনি আরও যোগ কললেন, ‘আমাদের ব্যাগ, ক্যামেরা দেখে নিশ্চয়ই বুঝেছেন, আমরা সাংবাদিক মানুষ। ভেবেছিলাম আপনার নাম জানতে পারলে, সেইসঙ্গে আরও দু’চারটে তথ্য পেলে আপনাকে নিয়ে আমরা একটা চমৎকার ফিচার করতাম। আপনি যে মজার মজার কথাগুলো বলেছেন, এসব খুব মূল্যবান। নিশ্চয়ই আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন। দেশবাসীকে তা জানানো দরকার।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘কিন্তু আপনি তো আমার কথার কোনো জবাবই দিচ্ছেন না, তা হলে কি করে আমরা আপনার সম্বন্ধে জানব, বলুন? অবশ্যি অসুবিধা থাকলে আলাদা কথা। আচ্ছা, কী হয়েছে বলুন তো, কথা বলছেন না কেন?’

তবু মুখ খুলল না উকিল মাঝি। শুধু জোরে জোরে বেঠা টেনে চলল।

নৌকা তখন এপারের ঘাটের কাছে চলে এসেছে।

স্থির বুঝলাম, আমাদের প্ল্যানটা পুরোপুরি মাটি হতে চলেছে।

এবার আমি তার দিকে কিছুটা এগিয়ে রুহুল ভাইয়ের চেয়েও মোলায়েম গলায় বললাম, ‘কি মুরুব্বি, একটু আগেও তো আপনি কত ভালো ভালো, সুন্দর সুন্দর কথাবার্তা বলেছেন, আপনার কথা আমাদের খুব ভালো লেগেছে। এখন এমন চুপচাপ কেন? মন-মেজাজ খারাপ, কিছু হয়েছে? আমাদের কথায় আঘাত পেয়েছেন?’

এবারও সে চুপচাপ। আরও গম্ভীর হয়ে গেল।

নৌকা ততক্ষণে ঘাটে ভিড়ব-ভিড়ব করছে। পারাপারের অপেক্ষায় কয়েকজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে ডাঙায়।

এবারে শেষ চেষ্টা হিশেবে ফরিদ তার দিকে সরে গিয়ে কিছুটা উষ্মার স্বরে বলল, ‘মিয়া, এত কী চিন্তা করেন, নামটা বললে এমন কি ক্ষতি হবে। জানেন, আমরা আপনার ওপরে পেপারে নিউজ করলে, ফিচার স্টোরি করলে সারাদেশে শিক্ষিত মানুষজনের মধ্যে আপনার নাম ছড়িয়ে পড়বে, রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাবেন আপনি, কিন্তু আপনি মুখ খুলছেন না, যত্তসব ফালতু-।’

সে মৃদু বিরক্তি প্রকাশ করতে গেল, কিন্ত বিরক্তি দূরে থাক, মুখের কথাই পুরো শেষ করতে পারল না, তার আগেই ঘটল ভিন্ন ঘটনা।

 এজন্য আমরা অবশ্যি কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। পরে এ নিয়ে আফসোসও করেছিলাম, ফরিদের এভাবে মাঝি লোকটার সঙ্গে কথা বলা উচিত হয়নি। না হলে হয়তো অদ্ভুত প্রকৃতির লোকটা এমনভাবে আচমকা খেপে গিয়ে প্রচণ্ড মারমুখী আচরণ করত না আমাদের সঙ্গে।

নৌকা তখন এপারের ঘাটে লেগেছে কি লাগেনি, ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎই বৈঠা হাতে গলুই থেকে উঠে মুখে বিচ্ছিরি খিস্তি করতে-করতে উকিল মাঝি দ্রুত তেড়ে এলো ফরিদের দিকে।

‘শোরের বাচ্চা, আমারে বিখ্যাত বানাতি চাইস্, তুর্গে ইচ্ছে কি আমি জানিনে বুঝিছিস, আমারে দে’ পয়সা কামাবার ধান্দা, হারামির ছাবাল। পেপারে আমার নামের দরকার নেই, তোরা এহনি নাম আমার লাওয়ের থে।’

ভাটায় পানি তখন অনেকখানিই নেমে গিয়েছিল। তীর থেকে নৌকা তাই থেমেছিল বেশ নিচে, নদীর চরে। সেখানে পরপর কয়েকটা খেজুরগাছের কাণ্ড সারি দিয়ে ফেলানো রয়েছে যাত্রীদের বেয়ে ওঠা-নামার জন্য।

কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, গাছের কাণ্ডের ওপর নামতে পারলাম না। লোকটার মারমুখী আচরণ আর দাঁত-মুখ খিঁচুনি এতটাই ভড়কে দিয়েছিল যে, তড়িঘড়ি করে নামতে গিয়ে কাণ্ডের ওপর পা রাখার বদলে অনভ্যস্ততায় আমি স্যান্ডেল আর ফরিদ তার নতুন কেনা জুতো সমেত পা পিছলে পড়ে গেলাম এক হাঁটু কাদায়।

তখন ডাঙার যাত্রীদের মধ্যে শক্ত-পোক্ত দু’জন ছুটে এসে দ্রুত আমাদের সে অবস্থা থেকে উদ্ধার করে ওপরে নিয়ে এলো।

মাঝি লোকটা তখন গলুইতে গিয়ে বসেছে।

রুহুল ভাই তখনও নৌকায়। ভাড়া মিটোনোর জন্য পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সাহস করে তার দিকে টাকা দিতে এগিয়ে গেল, ‘নিন, আপনার ভাড়া।’

এবার তাকেও উদ্দেশ করে অশ্রাব্য ভাষায় বকা শুরু করল সে। ‘ভাড়ানির বাচ্চা, ভাড়া দিবি, তুর্গে ভাড়ার টাহা আমি চাই নে, তুই নাম আমার লাওয়ের থে, নাম্, তোর ও টাহার মুহি আমি মুতি।’

রুহুল ভাইও প্রাণভয়ে নেমে এলেন। তড়িঘড়ি ও অসাবধানতায় তারও একটা পা খেজুরগাছের কাণ্ড থেকে পিছলে সরে গেল কাদায়। তবে আমাদের মতো তার জুতো-প্যান্ট নষ্ট হলো না। আগের যাত্রী লোকটা তাকেও গিয়ে এক হাত ধরে-ধরে উঠিয়ে আনল তীরে।

এদিকে পিছনে তখনও গজরাচ্ছে মাঝি, স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি আমরা তার গলার উচ্চরোল, ‘শালার বাচ্চারা, আমারে বিখ্যাত বানাতি চায়, তুর্গে মতলব আমি বুঝি নে না? শিক্ষিত মানুষগুলোর ধান্দা আমি বুঝিনে, না? ক্যান্, আমি কি যাত্রার সঙ, না ছিলেমার লায়ক? মারাতি আয়চে সব আমার কাছে।’

তীরে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ তখন ‘কী হয়েছে’, ‘কেন উকিল মাঝি খেপল হঠাৎ’ জানতে চাইল আমাদের কাছে।

রুহুল ভাই আমাদের পরিচয় দিলেন এবং সংক্ষেপে তাদের নৌকার ব্যাপারটা খুলে বললেন। শুনে তারা দুঃখ ও সহানুভূতি প্রকাশ করল।

কারও কারও মধ্যে মৃদু ফিসফিসানিও শুরু হলো।

মনঃক্ষুণ্ন তরুণ এক যাত্রী বলেও ফেলল, ‘দেলেন তো ভাই, আমাগের পার হওয়াডা মাটি অইরে। এহন  আর উকিল মাঝির নৌকো চলবে না, হাজার কলিও, কাঁড়ি কাঁড়ি টাহা ঢাললিও তারে রাজি করানো যাবে না। এহন অপেক্ষা করতি হবে, ঐ নৌকোডা আসার।’ সে ওপারের ঘাটে যাত্রী তোলারত নৌকার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করল।

অন্য একজন বলল, ‘পাগল মানুষটার সাতে আপনাগের ওভাবে কতা ক’আ উচিত হইনি। দ্যাখলেন যহন গম্ভীর হয়ছে, ভাবে আছে, তহন আপনারাও চুপ মাইরে যা’তেন, তা’লি আর ঐরাম ব্যাপার ঘটত না। নিজেরগের দোষেই আপনারা বেজ্জতি হলেন।’

এবার আরও একজন কী মন্তব্য করতে গেলে তাকে থামিয়ে দিলেন সাদা কলার-অলা শার্ট-প্যান্ট পরিহিত এক মধ্যবয়স্ক যাত্রী। বললেন, ‘তুমরা চুপ করো, বাপু। ওনারা সাংবাদিক মানুষ, শহর থেকে নতুন আয়ছেন, ওনারা কি উকিল মাঝি সম্পর্কে অত কিছু জানেন? খালি-খালি দোষ দিচ্ছো তোমরা ওনারগে।’

তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘ভাই, আপনারা কিচ্ছু মনে করবেন না, এরা ছেলেপেলে মানুষ, এদের কথায় কষ্ট পেলে মাপ করে দেবেন।’

ভদ্রলোক তার নিজের পরিচয়ও দিলেন। জানা গেল, তিনি স্থানীয় নিম্ন-মাধ্যমিক স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক। বাড়ি নদীর ওপারে।

এবার আমরাও এখানে আমাদের আগমনের কারণ, কোথায় যেতে চাই, কী করব ইত্যাদি বর্ণনা করলাম। শুনে লোকজনের মধ্যে আমাদের বিরুদ্ধে এতক্ষণ যে বিরূপ ভাব ছিল, সেটা কেটে গেল।

ততক্ষণে সেখানে এপারের বাজারের কিছু কৌতূহলী লোকজনও এসে জড়ো হয়েছে। তারাও আমাদের ঘিরে ধরল।

এর পরের ঘটনা : স্কুলশিক্ষক আর কয়েকজন উৎসাহী যুবক আমাদের নিয়ে গেল ঘাট থেকে আধকিলোমিটার দূরের পানখালি নিম্ন-মাধ্যমিক স্কুলের মাঠে।

ছুটি শেষে স্কুল তখন বন্ধ হয়ে গেছে। তবু এদের তৎপরতায় আশপাশের বাড়িঘর থেকে কয়েকটা টুল, চেয়ার বেঞ্চ জোগাড় হলে আমরা একটা ক্লাসরুমের সামনের বারান্দায় বসলাম। উভয়পক্ষে কুশলাদি বিনিময় হলো। ওটা-ওটা কথাবার্তার ফাঁকে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদে স্কুলশিক্ষক, যুবকের দল এবং ইতোমধ্যে স্থানীয় আরও যারা আমাদের দেখে সেখানে জড়ো হয়েছিল, তাদের সঙ্গে আলোচনায় অদ্ভুত চরিত্রের উকিল মাঝি সম্বন্ধে বেশ কিছু তথ্য জানতে পারলাম।

পরে আমাদের মূল কাজ দুধলমৌ গ্রামের রহস্যময় প্রাণী-সম্পর্কিত খবরের তত্ত্ব-তালাশ শেষে ফেরার পথে স্থানীয় গ্রামবাসী ও পানখালির ওপার থেকে দুধলমৌ যাওয়া-আসার পথে যে ভ্যানগাড়িতে চড়েছিলাম, তার দুই চালক এবং নদীর এপারের ঘাটের দু-তিনজন দোকানির কাছ থেকেও উকিল মাঝি সম্বন্ধে প্রায় অনুরূপ কথা-কাহিনি শুনেছিলাম। বস্তুত এদের সকলের বলা কথা-কাহিনি যোগ করলে উকিল মাঝি সম্পর্কে যে স্টোরি দাঁড়ায়, তাতে আগেই জানিয়ে রাখি যে, নতুনত্ব কিছু নেই। কেননা বাংলার গ্রামে-গঞ্জে কখনও কখনও এবং শহরে হরহামেশাই এ রকমের ঘটনা ঘটছে। ফলে এটাকে আর আমরা কাভার স্টোরি করে কোনো ফিচার বা ওই জাতীয় কিছু তৈরির প্রয়োজন অনুভব করিনি। তাছাড়া রুহুল ভাই আর ফরিদ তো তাদের সঙ্গে উকিল মাঝির এ বিশ্রী, মারমুখী ব্যবহারের জন্য তার সম্পর্কে উৎসাহই হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবু সত্যি কথা বলতে, উকিল মাঝির ব্যক্তিজীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা আমাকে সেদিন কিছুটা হলেও ব্যথিত ও ভাবনাকাতর করেছিল।

যাই হোক, বিভিন্ন জনের কাছ থেকে আমরা যা শুনেছিলাম ও জেনেছিলাম, একটা সত্য ঘটনানির্ভর গল্পে দাঁড় করালে উকিল মাঝির জীবনকাহিনি হবে এ রকম :

উকিল মাঝি ওরফে উকিলদ্দি গাজির বাড়ি দুধলমৌ গ্রামের পাশের গ্রাম তেলিখালিতে। লোকটা অল্পবয়সেই বাপ-দাদার ভিটেমাটির একমাত্র ওয়ারিশ হয়েছিল। বাপ মরেছিল সে যখন মায়ের পেটে তখন, ফলে মা আজিমন্নেছা বিবিই তাকে কোলে-পিঠে করে বড় করেছে। বিলেন জমি, বাড়ি ও ভিটের ক্ষেত-খামার মিলিয়ে বেশ ৫/৬ বিঘা জমিন-জিরাতের মালিক হয়েছিল সে। তবে ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি ছিল তার প্রবল ঝোঁক। মা তাকে গ্রামের প্রাইমারিতে ভর্তি করে দিলেও ঘঁষেমেজে ছয় ক্লাসের বেশি উঠতে পারেনি। অর্থাৎ পড়ালেখা বলতে ক্লাস সিক্স পর্যন্তই তার বিদ্যার দৌড়। তার নিজের কোনো গানের দল না থাকলেও সে ছিল তাদের অন্যতম শরিকদার। দলে গান গাইতোও সে, কণ্ঠও ছিল তার ভালো, মিষ্টি। গান-বাজনা নিয়েই দিন-রাত পড়ে থাকত এখানে-ওখানে, দূর-দূরান্তে। যেখানে শুনত গানের আসর বসেছে বা বসবে কিংবা যাত্রাপালা হবে, নাওয়া নেই খাওয়া নেই, হন্যে হয়ে ছুটত সেদিকে। পরপর দু’দিন তিন দিনও কোনো খোঁজ থাকত না। পরে একদিন হুট করে অনেকটা নাওয়া-খাওয়াহীন উশকো-খুশকো চুল, মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ নিয়ে ফিরে আসত বাড়িতে।

ফলে তার এই সংসার-বিবাগী উড়নচণ্ডী স্বভাবের কারণে বুড়ো মায়ের জোরাজুরিতে তার একমাত্র জীবিত আত্মীয়কুলÑ মামাবাড়ির লোকজন তাকে ঘরবন্দি করতে উঠে পড়ে লেগেছিল তার বিয়ের জোগাড়-যন্তরে। তাদের ইচ্ছে, পাত্রী ও পাত্রীর পৈতৃক অবস্থা যেমনই হোক, সেসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই, তাদের দরকার নরম তরিবতের কমবয়সী অবিবাহিত একটা মেয়ে। তার হাতেই উকিলদ্দিকে গছিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে চাইছিলেন মামারা। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও তার মায়ের জীবদ্দশায় মামারা সফল হতে পারলেন না। তবে ততদিনে একটা ভালো কাজ হয়েছিল, তার সয়-সম্পত্তি দেখভালের ব্যবস্থা তারা করেছিল। ৫/৬ বিঘা জমির প্রায় সবটাই তারা উৎপাদনশীলতা অনুযায়ী বছরে বিঘাপ্রতি ১০/১৫ মণ ধান ও তিল চাষের মৌসুমে ১/২ মণ তিল দেওয়ার চুক্তিতে স্থানীয় বর্গাদারদের কাছে লাগিয়ে দিয়েছিল। এর ফলে জমাজমির একটা বার্ষিক হিল্লে হলেও মূল সমস্যা যেটা ছিল, তা থেকেই গেল। উল্টো আগের চেয়েও তা জটিল হলো। কেননা এখন উকিলদ্দি বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে একগাদা নগদ টাকা হাতে পেতে লাগল। একে উঠতি যুবক, তার ওপর গান-পাগলা ও বেহিসাবি। সঙ্গে ছিল তার মতোই উচ্ছন্নে যাওয়া বন্ধুবান্ধবের দল। এ অবস্থায় টাকার গরমে নিজের মর্জি মতো চলার সুযোগ ঘটল তার আরও। আগে একনাগাড়ে দু-তিন দিন বাড়িঘরে অনুপস্থিত থাকত, মা মরে যেতে সেটা বেড়ে হয়েছিল চার-পাঁচ দিন, কখনও কখনও এক-দু’সপ্তাহ পর্যন্ত। এ পর্যায়ে তার মামারাও পড়েছিল মহাবিপদে, সমালোচনায়। গ্রামের লোকজন তাদের দুষতে শুরু করল। তারা ছেলেটার ভালো করতে গিয়ে বরং আরও সর্বনাশ ডেকে এনেছে। কাজেই মামারাও এবার আটঘাট বেঁধে লাগলেন- যে করেই হোক, কানা কি খোঁড়া, কালো বা ধলা, যাই হোক, ভাগ্নের গলায় পাত্রী তারা একটা জোটাবেনই। তবে সেটা করতেও গেল বছরখানেক। ততদিনে গ্রাম-গাঁ হিসেবে পাত্রের বয়স হয়ে গিয়েছিল যথেষ্ট। প্রায় পঁয়ত্রিশ ছুঁই-ছুঁই। বেশিও হতে পারে।

তবু রক্ষে যে, ভাগ্নে তাদের শেষপর্যন্ত বিয়েতে মত দিয়েছে এবং পাত্রীও একটা ভালো পাওয়া গেছে। তারপর একদিন মহাধুমধাম করে তারা চার ক্রোশ দূরের আইচগাঁতি নামের এক গ্রাম থেকে বউ নিয়ে এসে পাত্র-পাত্রীকে বাসরে ঢুকিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত ও নিশ্চিন্ত হলেন। পাত্রী সখিনা দেখতেও খুব ভালো। গ্রামের লোকজন মামাদের খুব প্রশংসা করেছিল এই বলে যে, তারা বাপ-মা মরা ভাগ্নেটাকে শেষপর্যন্ত একটা অপাত্রে গছিয়ে দেয়নি, সাধারণত এ রকম অবস্থায় অন্য মামারা যা করে, সেটা তারা করেনি।

পাত্রী সখিনার বয়স তখনও ১৩/১৪ বছর পেরোয়নি। স্বভাবতই শরীর-স্বাস্থ্য পুষ্ট নয়। তবে মুখশ্রী খুবই সুন্দর। শ্যামলা বর্ণের গোলগাল মুখাবয়বে টিকালো নাক, চিকন ঠোঁট আর ধবধবে দু’পাটি দাঁত। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল সখিনার চোখজোড়া। অনেকটা পটোলচেরা, কোনো একদিকে তাকালে ভীষণ সুন্দর দেখাত তার সে চাহনি। এ বিয়েতে কিছু হলেও কাজ হয়েছিল। বছরখানেকের জন্য উকিলদ্দির বাউণ্ডুলেপনা ঘুচেছিল। সুযোগ-সন্ধানী বন্ধুবান্ধবের দল গান শুনতে যাবার তাগিদ দিতে এসে বিফল হয়ে ফিরে যেত। অবশ্যি বছর ঘুরতে না ঘুরতে সে আবার আগের মতোই এখানে-সেখানে গান শুনতে যাওয়া শুরু করেছিল। তবে কোথাও রাত কাটাত না। দিনে যেখানে যাক, যত দূরেই থাকুক না কেন, রাতে সে বাড়ি ফিরে আসতই, এবং সেটা কাটাত সখিনার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে।

এভাবেই কাটল চার-চারটে বছর।

সখিনা ততদিনে গায়-গতরে আরও স্বাস্থ্যবতী ও সুশ্রী হয়েছে। শুকনো মুখ হয়েছে ভরাট। তেলতেলে, জেল্লাদার একটা ভাব এসেছে চেহারায়। কিন্তু ঘাটতি তবু একটা থেকে গেল দু’জনের সংসারে। বিয়ের এত বছরেও মা হতে পারল না সে। ফলে আশপাশের পড়শি এবং গ্রামবাসীর মধ্যেও এ নিয়ে ফিসফিসানি শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে আড়ালে-আবডালে বউ-ঝিরা সখিনাকে ‘বাঁজা মাইয়ে-মানুষ’ বলে ডাকতে শুরু করেছিল। সরাসরি না শুনলেও ঘনিষ্ঠ কারও মাধ্যমে সেটা জেনে সখিনার মনটাও ভীষণ খারাপ আর উদাস হয়ে যেত। ফলে মামিদের তাগিদে মামারা আবার উঠেপড়ে লাগলেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জনকে নিয়ে ছোটা শুরু হলো গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তার ও বদ্যি-কবিরাজের কাছে, শুরু হলো টোটকা, তাবিজ-কবজ, ফকিরের পানি পড়া, ঝাড়-ফুঁক অর্থাৎ যে-যাই বলত, তাই-ই শুনতে ও করতে লাগল তারা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। সন্তানশূন্যতা থেকেই গেল উকিলদ্দি-সখিনার।

ততদিনে পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছিল গান-পাগল উকিলদ্দির সেই আগের মতো ছন্নছাড়া জীবনযাপন, দিনকাল। প্রথমে এক-দু’রাত করে বাড়িতে অনুপস্থিতি, পরে সেটা বেড়ে আগের মতোই একনাগাড়ে পাঁচ-ছয় দিনে গিয়ে ঠেকল। তবে কেন জানি সাত দিনের বেশি কোথাও থাকত না উকিলদ্দি। যেভাবেই হোক, যত দূরেই যাক, সাত দিনের দিন ফিরে সে আসতই, আসত।

সখিনা প্রথম প্রথম অভিযোগ করত, মুখ ফুলিয়ে অভিমান করত। রাগ করে কথা বলত না দু-তিন দিন। দু-একবার ইচ্ছে করেই রান্নাঘরে হাঁড়ি চড়ায়নি। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। পরে সবকিছু মেনে নিয়েছিল সে। এভাবে কাটল আরও দুটি বছর।

এরপরই সেই অলক্ষুণে, ত্যাদড় ছেলেটা এসে জুটেছিল তাদের সংসারে। উকিলদ্দির আপন মামাতো ভাই। বয়সে তার চেয়ে অনেক ছোট, ২৩/২৪ বছরের নবীন যুবক। নাম বজলুর রহমান, সবাই ডাকে ‘বজল’ বলে।

বজল ঢাকায় পড়াশুনা করত, সঙ্গে ছাত্ররাজনীতি। উত্তুঙ্গ ছাত্র আন্দোলনের কারণে ঢাকায় তখন পুলিশি ব্যাপক ধরপাকড় চলছে। বজল পালিয়ে এসে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল। পুলিশ তার বাবার বাড়িতেও হানা দিতে পারে ভেবে, গ্রামের মুরব্বি ও শিক্ষিতজনদের পরামর্শে তার বাপ-চাচারা তাকে আপাতত গুপ্ত স্থান হিসেবে ভাগ্নে উকিলদ্দি গাজির বাড়িতে রেখে গিয়েছিল।

শিক্ষিত মামাতো ভাই। দীর্ঘদিন দেখা-সাক্ষাৎ নেই। বিপদে পড়ে এসেছে, ক’দিন থাকবে মাত্র, খুব খুশি হয়েছিল উকিলদ্দি বজলের আগমনে। তবে বজলের সঙ্গে তার যে খুব একটা কথাবার্তা হতো, তা নয়। বজল বগলে বই-পুস্তক নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকত মাঠে, বাগানে। দুপুরে তার খাবার পাঠিয়ে দিত সখিনা। তারপর সন্ধ্যা হলে ফিরে এসে নিঃশব্দে গিয়ে ঢুকত তার জন্য আলাদা করা হেঁশেল-ঘরের লাগোয়া দোচালা ছাপরা ঘরে। মা বেঁচে থাকতে উকিলদ্দি নিজেই থাকত ওটায়। পরে মা বিগত হলে বড় ঘরটায় উঠেছে সে। এখন সখিনাকে নিয়ে এটাতেই থাকে। ফলে এতদিন খালি পড়ে ছিল তার পুরোনো ঘরটা। মেরামতের অভাবে প্রায় পড়ো-পড়ো অবস্থায় পৌঁছেছিল। ঘরামি ডেকে সেটাই ঠিক করে দিলো সে বজলের অস্থায়ী বাসস্থান হিসেবে।

তবে বজলের থাকার দিনগুলোতেও গান-পাগল উকিলদ্দির বাইরে যাওয়া ও থাকা বন্ধ হয়নি। এদিকে অজ্ঞাত কারণে বজলেরও নির্জনাবাস শেষ হচ্ছিল না।

এতে করে দিনের পর দিন বন্ধুবান্ধব নিয়ে যখন সে পড়ে থাকত গ্রাম থেকে দূরে, এখানে-সেখানে, গাছের নিচে, খোলা জায়গায় বা কারও দোকানঘরে, স্কুলের বারান্দায়; তখন তার খোলা বাড়িতে থাকত দু-দুটো নর-নারী। একজন তার সন্তানহীনা যুবতী স্ত্রী, অন্যজন স্ত্রীর বয়স থেকে কিছুটা বড়, স্বাস্থ্যবান, শহরে পড়ুয়া যুবক। ফলে পরিণতি যা হওয়ার বা ঘটার, সেটাই ঘটেছিল।

একদিন দুপুরে পুকুর থেকে গোসল সেরে ফিরে এসে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে ভেজা শাড়ি-ব্লাউজ পাল্টাচ্ছিল সখিনা। কী মনে করে বজলও সেদিন আগেভাগে বাড়িতে এসে হাজির হয়েছিল। বরাবরের মতো সে নিঃশব্দে আসা-যাওয়া করে। আজও সেভাবে এসেছিল। ফলে তার আগমন মোটেও টের পায়নি সখিনা। অন্যদিকে সখিনাও যে এসময় ওভাবে থাকতে পারে, বজল ভাবেনি বা জানতে পারেনি।

নিজের ঘরের দাওয়ায় উঠতে গিয়ে বজলের চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল সখিনার দিকে। এক হাতে ব্লাউজের হাতা গলিয়েছে কেবল। তার ঊর্ধ্বাঙ্গের সামনের অংশ তখন পুরোটাই বস্ত্রহীন। ভরাট, ঈষৎ টোল-খাওয়া স্তন।

শুধু একপলকই দেখেছিল বজল। ততক্ষণে সেও সামলে নিয়েছে নিজেকে, মুহূর্তে সখিনাও সরে গেছে আড়ালে।

কিন্তু সেই একমুহূর্ত দেখাই কাল হলো বজলের জন্য।

এরপর থেকে দিনে-রাতে যখনই সে একা হতো বা থাকত, নজর দিত বইয়ের পাতায়, শুধু কালো অক্ষরের আঁকিবুকি দেখত। কিছুতেই মন বসাতে পারত না। রাতেও তার চোখের সামনে ভাসত সেই দৃশ্য। কিছুতেই চোখ থেকে, মন থেকে সরাতে পারে না সেই অতি-উত্তেজক ও আকর্ষক দৃশ্যটা।

এরপর এক রাতে, উকিলদ্দির তখন কয়েকদিন থেকেই খোঁজ নেই, কোথায় নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে কে জানে, সে রাতে হালকা পূর্ণিমা ছিল আকাশে, চরাচরে ছিল ফুরফুরে হাওয়া, কিছুতেই ঘুম আসছিল না বজলের। সে একসময় ঘর ছেড়ে উঠোন পেরিয়ে ছোট পুকুরপাড়ে এসে বসল। সম্ভবত সখিনারও মনটা সে রাতে উচাটন ছিল। সেই ঘটনার পর থেকে একদিকে সে যেমন সদাসতর্ক থাকে, তেমনি তক্কে তক্কে থাকে, দেখে- কবে, কখন বজল বাইরে যায়, ঘরে আসে। সে রাতে সেও ছিল নির্ঘুম, অস্থির। যখন টের পেল যে বজল বেরিয়েছে, সেও বেরিয়ে এলো ঘর ছেড়ে। গুটি গুটি পায়ে গিয়ে দাঁড়াল বজলের পিছনে।

বজল পিছনে পায়ের মৃদু শব্দ শুনেই বুঝেছিল, অন্য কেউ না, সখিনাই এসে দাঁড়িয়েছে। সে তাই না ফিরেই বলল, ‘ভাবি, বসো।’

ধরা পড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে সখিনা বলল, ‘কী করে বুঝলে যে আমি, আমি আইসে দাঁড়াইছি।’

‘পা’র শব্দ তো এট্টা পাইছি। তাছাড়া এত রাতে তুমি ছাড়া আর কে আসবে এখানে?’ বজল একবার পিছনে তাকিয়ে, পরক্ষণেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, ‘কেন যেন ঘুম আসছিল না, তাই ভাবলাম কিছুক্ষণ পুকুরপাড়ে কাটিয়ে আসি। তা তুমি কী মনে করে?’ বজল সখিনার দিকে ফিরল।

বজলের বসার স্থান থেকে হাত দুয়েক দূরে মাটিতে বসতে বসতে সখিনা বলল, ‘আমারও আইজ ঘুম আসতিছে না। ক’দিন থেই বাপের বাড়ি যা’র জন্যি মনডা কিরাম এরতিছে য্যানো। তা তুমার ভাই নেই, তাই যাতিও পারতিছি নে। সে আসলিপ্পর কয় দিনির জন্যি বেড়াতি যাবো, ভাবদিছি।’

একটু থেমে আবার বলল, ‘তা আমি গিলি তুমার খা-দা’র ইট্টু অসুবিদে হবে নে, ক’দিনির জন্যি মাত্তর আইছাও, তাই মনডা পুরোপুরি সায়ও দেচ্ছে না। এইসব ভাবদি-ভাবদি ঘোম আইসতিলো না। হঠাৎ শুনলাম তুমার দরজা খুলার শব্দ। বেড়ার ফাক দে’ চাইয়ে দেখলাম, তুমি বারোয় পুওরপারে যাচ্ছো। তাই আমিও বারোয় আসলাম। ভাবলাম, তুমার সাতে কয়ডা সুখ-দুখ্যির কতা কই।’

‘ভালোই করিছ। বসো, কিছুক্ষণ দুজন কথা বলি। খানিক্ষণ গল্পগুজব করার পর যার যার মতো যাইয়ে শুয়ে পড়ব।’

সে রাতে অনেকক্ষণ তারা পুকুরপাড়ে বসে গল্প করল। পরে যখন যার যার ঘরে ফিরল, তখন রাত প্রায় কাবার হয়ে এসেছিল। তবে সে রাতে এবং তারপরও দু’সপ্তাহ তাদের মধ্যে গভীর কোনো সম্পর্ক হয়নি। এর মধ্যে এক সপ্তাহ এসে থেকে গেছে উকিলদ্দি। সংসারের প্রয়োজনীয় টুকিটাকি সদাইপাতি কিনে দিয়ে গেছে সখিনার অনুরোধে, বাড়িতে যেহেতু মেহমান আছে। বজল কেমন আছে, কবে যাবে তার খোঁজখবরও নিয়েছে। তারপরই আবার চলে গেছে যাত্রাপালা শুনতে।

সেদিনও বজল বাড়ি ফিরল দুপুরের পরপর।

সখিনা তখন ঘরের মেঝেয় মাটিতে পাটি বিছিয়ে বালিশে মাথা রেখে শুয়ে ছিল। সাধারণত এ সময় সে থাকে রান্নাঘরে কিংবা গোসলের জন্য যায় পুকুরঘাটে। বজল তাকে এ অবস্থায় দেখে অবাক হয়ে খোঁজ নিতে তার ঘরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু সখিনা এমনভাবে শুয়েছিল, মাথা দরজা বরাবর এবং শাড়ি অসংলগ্ন থাকার কারণে  ব্লাউজের গলা দিয়ে স্তনের অনেকখানিই দেখা যাচ্ছিল। সেদিকে চোখ পড়তে বজল আজ আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। তীব্র যৌন কামনাক্রান্ত হয়ে পড়ল। সে যুবক এবং ঢাকায় সমবয়সী অসংখ্য ছাত্রীর মধ্যে পড়াশোনা করলেও আজ পর্যন্ত কোনো নারীদেহের সংস্পর্শে আসেনি। তার শিক্ষা ও বিবেক কয়েকবার তাকে দ্বিধান্বিত করলেও শেষপর্যন্ত সে এগিয়ে গিয়ে বসল চৌকাঠের ওপরে। মুখে বলল, ‘এই অবলোয় শুয়ে আছো যে, শরীর খারাপ করেনি তো? জ্বর-টর?’

বালিশ থেকে মাথা উঠোতে-উঠোতে সখিনা বলল, ‘না, শরিল খারাপ, জ্বর-টর কিছু না, তয় মনডা ভালো না। ভাবদিছি, তুমার ভাই আসুক-না আসুক, কাইল-পরশোই বাপের বাড়ি চইলে যাবো। কিছুদিন থাইয়ে আসি সেহানে যাইয়ে।’

সখিনা পাটি গুটাতে শুরু করল। তবে ইচ্ছে করেই কি-না বজল তা বুঝল না, সখিনা পাটি গুটোনোয় অনাবশ্যক বেশি সময় নিলো এবং দু’হাতে গুটানোর সময় ব্লাউজের গলার ফাঁকে দৃশ্যমান সুপুষ্ট লুব্ধকর ঈষৎ ধবধবে স্তনযুগল উন্মুক্ত রাখল।

সে কি ইঙ্গিতে কিছু বলতে চায়, বজল মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল। মনে হলো তাই। বজল এবার সমস্ত লজ্জা, শঙ্কা ভেঙে এগিয়ে গিয়ে সখিনাকে ধরল। বলল, ‘কী ব্যাপার, তুমি খুব অস্থির, মনডা মোটেও ভালো না তোমার বুঝা যাচ্ছে। কী হয়েছে তোমার?’ বলতে বলতে দু’হাতে কাছে টেনে নিল সে তাকে।

সখিনা কিছু বলল না, সরেও গেল না। ফলে সখিনার দিক থেকে কোনো বাধা না পেয়ে সে এবার প্রবল জোরে চেপে ধরল তাকে বুকের সঙ্গে। উষ্ণ নিশ্বাস পড়ছে তার তখন।

সখিনাও বুঝি প্রস্তুত ছিল এ জন্য। স্বামীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, খেদ, নিজের স্বাভাবিক যৌনতাড়না তাকে যেন ভিতরে ভিতরে ধসিয়ে দিয়েছিল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। অনেকটা এলিয়ে পড়ল।

বজলের তখন মনে হলো, নিয়ন্ত্রণহীন সখিনা তার কঠিন হাতের চাপে পিষ্ট হতে চাচ্ছে। সে এক পা এগিয়ে ডান হাতে ভিতর থেকে দরজায় হুড়কো তুলে দিল।

পরপর দু’বার তারা শারীরিকভাবে মিলিত হলো। প্রথমবার অনভিজ্ঞ বজলের দ্রুত স্খলনজনিত ব্যর্থতা তাকে দ্বিতীয়বার উদ্বোধিত ও বাধ্য করল সখিনাকে দলিত-মথিত করতে। আর এই পুরো সময়টায় সখিনা কেবল একদলা এঁটেল কাদার মতো শিথিল হয়ে পড়ে থাকল। আর সেইসঙ্গে গোঙানির মতো অস্ফুটধ্বনি করে গেল।

পরদিন সকালে কেমন একধরনের লজ্জা তাদের দু’জনকে আচ্ছন্ন করল। কিছুতেই পরস্পরের মুখোমুখি হতে পারছিল না তারা। এর মধ্যে খুব ভোরে পুকুরে গোসল সেরে এসে সখিনা ভাত-তরকারি রান্না করল। তারপর লজ্জা-জড়তা নিয়েই বজলকে ভাত খেতে ডাকল। বজলও সংকোচ নিয়ে খেতে এলো। অন্যদিন খাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় দু-চারটে কথা বলে বজল। বিশেষ করে উকিলদ্দি ভাই কবে আসবে, কোনো খোঁজ-খবর পাঠিয়েছে কি-না, এ জাতীয়। কিন্তু আজ একটা কথাও না বলে খুব দ্রুত ভাত খেয়ে উঠে গেল। অবশ্যি একবার শুধু নুন চেয়েছিল। বজল ভাতে নুন খায়, আজ বেখেয়ালে সখিনা তা থালের কোনায় রাখতে ভুলে গিয়েছিল।

বজল উঠে যাওয়ার সময় সখিনা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি কি এহনি বারোয় যাবা?’ বজল মাথা নাড়িয়ে শুধু ‘হ্যাঁ’ বলে নিজের ঘরে একটুক্ষণের জন্য ঢুকে হাতে কিছু বইপত্তর নিয়ে বেরিয়ে গেল।

এরপর দুপুরে আর খেতে আসেনি বজল। এসেছিল বেশ রাতে।

সে এলে তাকে ভাত বেড়ে খেতে দেয় বলে অনেকক্ষণ সখিনা অপেক্ষায় থেকে থেকে ঘুমিয়ে পড়েছিল। পরে কখন বজল ফিরেছিল এবং তাকে ঘুম থেকে না জাগিয়ে শুয়ে পড়েছিল, সখিনা তা টের পায়নি।

সকালে সখিনা নিজেই উপযাচক হয়ে বজলকে ঘুম থেকে উঠিয়ে ভাত খেতে ডেকে আনল। বজল তখন অনেকখানি স্বাভাবিক। সে ভাত খেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সখিনা তাকে বলল, ‘আইজ দুইফোরে ভাত খাতি আসতি ভুলে না জ্যানো? আইজ কুড়োডা জবো দেব।’

দুপুরে বজল ফিরলে দু’জন একসঙ্গে ভাত খেলো। সখিনা হেঁশেলে, বজল ঘরের দাওয়ায় বসে।

সেদিন দুপুরের পর আবার তারা যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হলো।

তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবো-হবো করছে। দু’জন তখনও ঘরের মধ্যে, আর ঠিক এ সময়ই ফিরে এসেছিল উকিলদ্দি। ফলে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেল দু’জন।

মুখ কাঁচুমাচু ও মাথা নিচু করে বন্ধ ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বজল। অনেকক্ষণ বাইরে থেকে দরজা গুঁতিয়ে এবং ভেতর থেকে তা খোলার কোনো লক্ষণ না দেখে উকিলদ্দি তখন রাগে-ক্ষোভে জ্বলছে। চেঁচাচ্ছে। পরে যখন বিস্র্রস্ত বেশবাসে বজল বের হলো, তখন যারপরনাই সে বিস্মিত, ক্ষিপ্ত ও স্তম্ভিত।

সে কিছু বলার আগেই বজল পাশ কাটিয়ে দ্রুত ছুটে গিয়ে উঠল নিজের থাকার ছাপরায়। রাগে গজগজ উকিলদ্দি তখন সখিনার চুলের মুঠি ধরে বেদম কিল-ঘুষি মারছে আর ‘খানকি মাগি, কুলখাগি, বেইশ্যে, ছিনাল’ ইত্যাদি মুখে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছে।

তার চেঁচামেচি শুনে প্রতিবেশীদের অনেকেই সেখানে এসে হাজির হলো। তারা বউকে মারার কারণ জিজ্ঞেস করলে দু’জনকে একঘরে একত্রে পাওয়া এবং তাদের ফষ্টিনষ্টির কথা জানাল উকিলদ্দি। শুনে সবাই ‘ছিঃ-ছিঃ’ দিতে শুরু করল। কেউ কেউ তাকেও দোষী সাব্যস্ত করল। কেননা ঘরে জোয়ান বউ ফেলে সে দিনের পর দিন বাইরে থাকে, রাত কাটায়। তার ওপর জোয়ান-মদ্দ একটা বাড়িতে থাকায়, এ অবস্থায় উকিলদ্দির বাইরে যাওয়া মোটেই উচিত হয়নি। অবিবেচকের মতো গেছে যখন, এখন যা হবার তাই হয়েছে। এতে আর আশ্চর্য কী!

পরে সবাই চলে গেলে উকিলদ্দি নিজেও কী মনে করে বেরিয়ে গেল। সে বুঝি কাকে ডাকতে গিয়েছিল, কিন্তু তাকে না পেয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে যখন ফিরে এলো, ততক্ষণে বাড়ি ত্যাগ করেছে বজল। এদিকে চরিত্রভ্রষ্টা, কুলটা সখিনা তখন রান্নাঘরে ভিতর থেকে হুড়কো তুলে দিয়ে স্বেচ্ছাবন্দিত্ব নিয়েছে।

এই ঘটনার পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল; নানা ছুঁতো-নাতায় যখন তখন উকিলদ্দি সখিনাকে মারত, বাপ-মা চৌদ্দগুষ্টি তুলে গালিগালাজ করত। ঠিকমতো বাজার-সদাই করত না।

এসব নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল-মিশেরও চেষ্টা করল প্রতিবেশীরা কয়েকবার। কিন্তু উকিলদ্দির আচরণের কোনো পরিবর্তন হলো না।

এদিকে বিয়ের সময়ই বিঘাখানেক জমি বিক্রি হয়েছিল। বিয়ের পর নতুন বউ-সংসারের খরচ মেটাতে বিক্রি করতে হয়েছিল আরও দু-বিঘা। তারপর সখিনা-বজলের এই অনৈতিক, অনভিপ্রেত ঘটনার পর রাগ করে অবশিষ্ট আড়াই বিঘা বিলেন জমিও বিক্রি করে দিলো উকিলদ্দি। এখন আছে শুধু ভিটেবাড়ির জমিটুকু। আগে থেকেই তার মধ্যে সহজাত একটা ঘরছাড়া, বিবাগী ভাব ছিল। এই ঘটনার পর থেকে সংসারের প্রতি তার ঔদাসীন্য ও বৈরাগ্যপনা আরও বাড়ল। লোক-পরম্পরায় জানা গেল, জমি বিক্রির কিছু টাকা দিয়ে উকিলদ্দি একটা নৌকা কিনতে বা বানাতে চায়।  সেটা পেলে সংসার ছেড়ে গ্রাম ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাবে সে।

এভাবেই কাটছিল স্বামী-স্ত্রীর দিনকাল। নৌকাটা তখনও জোগাড় হয়নি উকিলদ্দির, এর মধ্যে স্বামীর নিত্যকার শারীরিক নির্যাতন, মানসিক গঞ্জনা এবং তার চেয়েও বড় ব্যাপার- একপর্যায়ে সংসারের খরচপাতি একদমই বন্ধ করে দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে এক রাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে, প্রায় এক কাপড়ে উকিলদ্দির সংসার ছেড়েছিল সখিনা। তবে সে তার বাপ-মার বাড়ি যায়নি, কোথায় গেছে আজ পর্যন্তও কেউ তার হদিস পায়নি। লোকমুখে শোনা যায়, সে নাকি ঢাকায় আছে। বস্তিতে থাকে আর মানুষের বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে।

নৌকা কেনার পর উকিলদ্দিও বাড়িঘর ফেলে একদিন খুব ভোরে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিল। চলে যাওয়ার আগে তার নিরুদ্দেশের কথা সে শুধু তার দু-চারজন ঘনিষ্ঠ ইয়ার-দোস্তেরই কাছে জানিয়েছিল, তবে কোথায় যাচ্ছে বা যাবে, তা বলেনি। আসলে তখন নিজেও সে জানত না, ঠিক কোথায় যাবে।

এরপর দু’বছরের মাথায় মুখে দীর্ঘদিনের না কামানো দাড়ি-গোঁফ, রোদে পোড়া তামাটে শরীর আর চোয়াল-চামড়া ধসানো চেহারা নিয়ে হঠাৎ ফিরে এসেছিল উকিলদ্দি। ততদিনে তার মাথায় দেখা দিয়েছে সামান্য গণ্ডগোল। বাড়ি ফিরে দীর্ঘদিনের অযত্ন-অব্যবহারে ভেঙেপড়া ঘর-চালা কোনো রকমে ঠিক করে মাথা গুঁজবার ঠাঁই করেছিল। পুরোনো, ভাঙা নৌকোটার টুকিটাকি মেরামত করে জীবিকার্জনের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিল এই খেয়া পারাপারের মাঝির কাজ। এই কাজে, শরীর-মন যখন সুস্থ থাকে, তখন ঠিক মতোই যাত্রী পারাপার করে, কারও সঙ্গে কোনো অসঙ্গত বা খারাপ আচরণ করে না। তবে অমাবস্যা-পূর্ণিমার গোনে তার মাথা একটু খারাপ হয়। তখন সে নৌকা বাওয়ার সময় নিজের মনে বিড়বিড় করে কথা বলে, বকবক করে অকারণে এবং হঠাৎ হঠাৎ খেপে গিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে অভদ্র আচরণ করতে শুরু করে। অবশ্য এর মধ্যেই দু’পারের বাজার কমিটির লোকজন ঠিক করেছে, আর দু-একটা চালান তারা দেখবে, এর মধ্যে উকিলদ্দির মাথা যদি ঠিক না হয় বা তার আচরণে পরিবর্তন না ঘটে, তবে যাত্রী ও নিজেদের স্বার্থেই তারা তাকে সরিয়ে দিয়ে অন্য কোনো মাঝিকে তার জায়গায় নিযুক্ত করবে। প্রয়োজনে খেয়া নৌকা নিজেরাই সরবরাহ করবে তারা।

আমরা এখন বুঝতে পারছি, কেন সেদিন উকিল মাঝি আমাদের ওপর হঠাৎ খেপে গিয়ে রুহুল ভাই আর ফরিদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেছিল। নিশ্চয়ই আমরা তার সেই দুঃসময়ের দিনগুলোর মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম।

স্কুলশিক্ষক অবশ্যি বলেওছিলেন, ‘অমাবস্যার গোন আছে, উকিল মাঝির মাথায় গণ্ডগোল শুরু হওয়ার সময় এসে গেছে। আপনারা কিছু মনে করবেন না ভাই, খুব শিগগিরই আমরা তাকে সরিয়ে দিচ্ছি, নতুন মাঝি ঠিকও হয়ে গেছে একজন। পরের বার এলে এ রকম ঝামেলায় আর পড়বেন না।’

চলে আসার সময় লোকজন আমাদের অনুরোধ করল, ‘ভাই, আপনারা সাংবাদিক মানুষ, কাইন্ডলি এটা নিয়ে আবার নিউজ-টিউজ করবেন না, তা হলে আমাদের এলাকার খেয়াঘাটের বদনাম হয়ে যাবে। এমনিতেই আমরা অজ্ঞাত প্রাণীর ব্যাপার নিয়ে বিব্রত আছি।’

আমরা তাদের কথা দিলাম, উকিল মাঝির ব্যাপার নিয়ে খবর না করার। অবশ্যি রুহুল ভাই আর ফরিদ যেভাবে লোকটার ওপর মহাখাপ্পা হয়েছিল, তাতে করে তার ঘটনাটা নিউজ বা ফিচার-স্টোরি তৈরি করার যোগ্য হলেও আমরা তা করতাম না। এ রকম কত কিছুই তো করি না, কোথাকার কোন উকিল মাঝি, সে পাগল কি ছাগল, তাকে নিয়ে মাথাব্যথার কী আছে!

তবু সব খবর বা ঘটনার পিছনে যেমন আরেকটা খবর বা ঘটনা থাকে, যেটা না বললে পুরো বিষয়ের নিষ্পত্তি হয় না, তেমনিই উকিল মাঝির আরেকটু ঘটনা যেটা আমি পরে জেনেছিলাম, সেটা বলে উকিল মাঝির আখ্যানটা শেষ করব।

সে-বার যাওয়ার মাস ছয়েকের মধ্যে আবার একবার এদিকে আসতে হয়েছিল আমাকে। চিংড়ি চাষের জমির ‘হারি’র টাকা ঠিকমতো পরিশোধ না করে একপ্রকার জোর করেই স্থানীয় কৃষকদের জমি ভোগ করছে অস্থানীয় চিংড়ি চাষি-মালিকরা, সেটার ওপর ঢাকার একটা সাপ্তাহিকের জন্য ফিচার স্টোরি তৈরি করার মাল-মসলা সংগ্রহের জন্য গিয়েছিলাম আমি একাই। এবার ঘাট পারাপারের সময় তিনটে নৌকাই দেখেছিলাম। যে দুটো এপারে ছিল, তার একটাতেও উকিল মাঝিকে দেখলাম না। অন্য নৌকাটা ছিল ওপারে। ফলে আমি ইচ্ছে করেই সেটার আসার অপেক্ষায় এ দুটোর একটায়ও চড়লাম না। তারপর নৌকাটা এপারে এলে তাতে উঠে দেখলাম, এরও মাঝি অন্য একজন, বলশালী যুবক গোছের। ফলে কৌতূহল আর চেপে রাখতে পারলাম না। এপারে এসে এক ছাপরা দোকানে চা খাওয়ার অছিলায় ঢুকলাম। চা খেতে-খেতেই দোকানির কাছে জানতে চাইলাম, ‘ভাই, এই ঘাটে না উকিল মাঝি নামে এক লোক খেয়া চালাত, তাকে তো দেখলাম না। তিনি কি নেই, নাকি নৌকা চালানো ছেড়ে দিয়েছেন?’

দোকানি আমার অর্ডারের দ্বিতীয় কাপের কড়া চা বানাতে বানাতে নিরুৎসাহিত ভঙ্গিতে উত্তর দিলো, ‘সে আর কইয়েন না ভাই, এমন আজব আর খচ্চর গোছের মানুষ আমি জীবনে দুডো দেহিনি।’

আমার ঔৎসুক্য বেড়ে গেল। তবু লোক দেখানো নিস্পৃহ গলায় বললাম, ‘কেন, কেন? কী হয়েছে তার?’

‘আরে ভাই’, দোকানি আমার দিকে কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘যার বউ ফষ্টিনষ্টি কইরে ভাইগে গেছে বইলে সে জমিন-জিরেত সব বেইচে ফ্যাললে, ঘর-সংসার ছাড়লে, লৌকো নিয়ে কয় বছর ঘাটে খেয়া পারাপারিও করলে, সেই কি-না শেষমেশ আরেক জনের বৌরি নিয়ে পালালে। এমনও কহনো হোতি পারে! কোনোদিন শুনিছেন?’

 দোকানিকে এবার আমি নিজের পরিচয় দিলাম এবং আগের ঘটনা সব জানি বলে, নতুন ব্যাপারটা একটু খুলে বলতে অনুরোধ করলাম। সাংবাদিক শুনে সেও খুব উৎসাহ নিয়ে বলল। তবে ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত, ন্যক্কারজনক, তাই গ্রামের কেউ আর এ নিয়ে উৎসাহ দেখায় না।

ঘাট কমিটির লোকজন উকিল মাঝিকে আমাদের সঙ্গে তার সেই আচরণের মাসখানেকের মধ্যেই ছাড়িয়ে দিয়েছিল। উকিল মাঝি তখন পুরোপুরিই বেকার হয়ে পড়ে। সংসারে তখন সে একা একজন মানুষ। জমি-জিরাত নেই, আয়-রোজগার বন্ধ, মামারাও এখন আর তাকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। খুব কষ্টে তাই দিন গুজরান হচ্ছিল তার। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই সে মানুষের বাড়ি-বাড়ি কামলা দিতে শুরু করে। লোকে বলে, তখন তার মাথাটাও ভালো হয়ে গিয়েছিল। সে অবস্থায়ই, তাদেরই গ্রামের গফুর শেখের বিধবা বউ, যে নিজেও গৃহস্থবাড়িতে ‘বাড়াবান্দনি’ খাটত, তার সঙ্গে গোপনে পিরিত করা শুরু করেছিল। ব্যাপারটা জানাজানি হলে লোকে দু’জনকেই কাজে নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। বলা যায়, ‘একঘরে’ করেছিল। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং ‘একঘরে’র শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, তাদের মনে তখন অন্য চিন্তা।

এরই কিছুদিন পরে, হঠাৎ করে একদিন, এই দু’জন বয়স্ক নর-নারী গ্রাম থেকে উধাও হয়ে গেল।

রাতে ভেগেছিল কি ভোর-সকালে, কেউ তা জানে না। কেননা যেতে তাদের কেউ স্বচক্ষে দেখেনি। তবে গায়েব হওয়ার কয়েক দিন আগে নাকি উকিল মাঝি তার এক পুরোনো বন্ধুকে বলেছিল, মানুষের জীবন হচ্ছে নদীর জোয়ার-ভাটার মতো। এই আছে, এই নেই। জোয়ার-ভাটায় নিরন্তর নদীর পাড় ভাঙে, তবে নদী কখনও মাটি নিয়ে যায় না। সে এক পাড় ভেঙে অন্য পাড় গড়ে। সখিনা তার সোনার সংসার ভেঙেছে, সেও চেয়েছিল অন্য কারও ঘর-সংসার ভাঙতে। কিন্তু সে পাপটা তার পুরো করা লাগেনি, একজন এমনি-এমনিই তার কাছে এসে ধরা দিয়েছে। শুনেছে, দক্ষিণে কোথায় নাকি নদীতে বিশাল চর জেগেছে। ভূমিহীন অনেক মানুষ ছুটছে সেদিকে। সেও গফুর শেখের বিধবা স্ত্রী সুফিয়াকে নিয়ে চলে যাবে সেখানে। চরে গিয়ে তাকে ‘নিকে’ করে নতুনভাবে ঘর-সংসার পাতবে।

এসব জেনে গ্রামের একদল নীতি-নৈতিকতাবাগীশ তাকে অভিশাপ দিয়েছে, একজনের বিধবা বউকে ‘নিকে-শাদি’ না করে এভাবে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য। অন্যদল বলেছে, এতদিনে বাঁচার একটা পথ খুঁজে পেল বেচারা। এক অল্পবয়সীকে বিয়ে করে মেয়েলোকের ফাঁকিতে পড়ে অর্ধেকেরও বেশি জীবন তার দুঃখে কেটেছে, এবার এক বয়স্ক নারীকে বিয়ে করে বাকি জীবনে যদি একটু সুখ পায়!

কাবেদুল ইসলাম : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : রাজিব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares