গল্প : রাজিব আলির পরকীয়া : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

মোজাম্মেল হক নিয়োগী ।।

কয়েকদিন ধরেই রাজিব আলির মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন অস্থিরতা ছিল, তা আজ নিঝুম চাঁদনি রাতে প্রকট হয়ে ওঠে। আকাশে একাদশীর নিঃসঙ্গ চাঁদটি অন্তহীন কালচে আকাশে ঝুলে আছে—ভরাট নৈঃশব্দ্যের দোতলা বাড়ির একফালি বারান্দায় পায়চারি করতে করতে সেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে ক্ষণকালের জন্য স্থির হয় রাজিব আলি। রাজিব আলির ধূমপানের অভ্যাস থাকলেও বাসায় রাতে কখনও সিগারেট টানে, আবার কোনো রাতে টানেও না। কিন্তু আজ বেশ কয়েকটা সিগারেট ভস্ম করে আরেকটি জ¦ালিয়ে দুই আঙুলের মাঝখানে রেখে তাকিয়ে আছে ঝুলন্ত চাঁদটির দিকে। একবার নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে কয়েকটা কুকুর জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাজিব আলি এদের মতলব বুঝতে চেষ্টা করে হতাশ হয়ে বারান্দার চেয়ারে বসে সিগারেটে দম দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে।

দুই মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় ফারজানা ইয়াসমিন সিঁথির সঙ্গে। সিঁথিই এক রাতে ফেসবুকের ইনবক্সে হাই বলে সম্বোধন করে। তারপর হাই-হ্যালো থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলের ছবি ট্যাগ করা হয় উভয় পক্ষ থেকেই। রাজিব আলি কয়েকবার প্রোফাইল চেক করেছে, সিঁথির একাধিক ছবি চেয়েছে ইনবক্সে দেওয়ার জন্য, দাবি অনুযায়ী চালানও নিশ্চিত হয়েছে। এসব করে রাজিব আলি নিশ্চিত হয়েছে আইডি ফেক কিনা। না, আইডি ফেক নয়। এক তরুণী যে কিনা ঢাকার এক গৃহবধূ। কিন্তু কেন রাজিব আলির সঙ্গে জড়িয়ে গেল সেটিই বড় কথা। পরকীয়া প্রেমের সুখ যেমন আছে ঝামেলাও কম নয়। এক অপূর্ব মিষ্টি চেহারার মেয়েটি জানায় তার স্বামী থাকে চট্টগ্রামে। মাসে একবার আসে। সারা মাসের বকেয়া দিনগুলোতে মনের কথা বলার মানুষ কই? শুধুই কি কথা? শরীর বলে কি কিছু নেই?

ফেসবুকে চ্যাটিং হচ্ছে রাতের পর রাত। এখন একবার মুখোমুখি দেখা না হলে দু’জনের জীবনই ব্যর্থ হওয়ার সমূহ আশঙ্কার মুখে। বহতা প্রেমের নদীর পাড়ও ভাঙনের মুখে পড়বে। শুধু কি দেখাই সার? রাজিব আলি প্রশ্ন করেছিল সিঁথিকে। সিঁথি খোলাখুলিই উত্তর দিয়ে দিয়েছে, যা মন চাইবে তাই করবে। সুযোগও অবাধ। একটি ফ্ল্যাটে একা একা থাকে সিঁথি। আর একাকিত্ব ঘোচাতেই তার একজন সঙ্গী দরকার।

তারপর শুরু হলো মোবাইল ফোনে রাতের পর রাত নানান গল্প। জীবন ও যৌবনের রসাস্বাদনের যত উপাচার রয়েছে সবই মোবাইল ফোনের বদৌলতে বিনিময় করেছে তারা।   

রাজিব আলিকে বেশ কিছুদিন পীড়াপীড়ি করে কোমরে দড়ি বাঁধতে পারে সিঁথি। তবে দিন-তারিখ ঠিক হওয়ার পরেও মনের শঙ্কা কাটেনি। অফিসের কাজে, বাসায় এমনকি বন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলে সে শান্তি পায় না। সিঁথি এমনই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, মনে হয় শ্রাবণের নদীকে ডাকছে এক মহাসাগর।

এই শহরে কত রকমের প্রতারণা হয় সে খবর রাজিব আলির ফাইলে সেভ করা আছে। গত মাসেও এক প্রতারক চক্র নারীর প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিল এক ব্যবসায়ীর পাঁচ লক্ষ টাকা। টাকা নিল তো নিলই, মান-সম্মান কি আর অটুট রেখে গেছে? তাও গেছে টাকার সঙ্গে।

খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে একবার এ নিয়ে কথা বলেছে। বন্ধুটি দুই কাঠি উপরের সরেস প্রেমিক। সে বলল, আমাকে আইডির নাম বল, বিহিত কী হবে আমি জানাতে পারব। এই বন্ধুটি নানা জায়গায় যাওয়ার অভ্যেস আছে যা সে বলে নিঃসংকোচে। তার বলার ভঙ্গি আর বিভিন্ন বর্ণনা শুনলে কান লাল হয়ে যায়। কিন্তু রাজিব আলি কি এত বোকা! যদি নিজে কিছু করতে না-ই পারবে তবে বন্ধুর হাতে ছেড়ে দেব কেন? প্রেমিকার সঙ্গে এমন হারামিপনা করা সম্ভব নয়। সে তথ্যতালাশ করবে।

অনেক চেষ্টা তদবির করে বন্ধুটি ব্যর্থ হয়, রাগে-ক্ষোভে কোনো সুপরামর্শও দেয়নি।

দ্বিধা ও শঙ্কাগ্রস্ত রাজিব আলি কী করে যাবে সিঁথির কাছে এমন দীর্ঘদিন ভাবার পর আজকেই মনস্থির করে সিঁথিকে জানিয়ে দেয় আগামীকাল সেই প্রত্যাশিত অভিসারের কথা। সিঁথিও অধীর আগ্রহে ক্ষণ গুনতে থাকে।

রাজিব আলি শঙ্কাহীন হয়, দ্বিধাহীন হয়। কারণ, কয়েকবার ওদের দেখা হয়েছে। কথাও তো কম হয়নি। পরস্পরের প্রতি অকাট্য বিশ^াসের সেতুবন্ধ রচিত হওয়ার পরেই না দিনটি বেছে নিতে পারল।

প্রথম ওরা মুখোমুখি দেখা করেছে যমুনা ফিউচার পার্কে। একটি ক্যাফেতে কফি খেয়ে সিনেমা দেখেছে দু’জনে। সিঁথির অনেক কষ্টের কথা শুনে রাজিব আলি মুহ্যমান হয়ে পড়ে। এই কষ্ট শরীরের। একজন শিক্ষিত মানুষ কেন বুঝতে পারে না স্ত্রীর শারীরিক চাহিদার কথা? কেবল নিজের পরিতৃপ্তিতেই কি দাম্পত্য জীবনের সুখ নির্ভর করে? খুব মায়া হয়েছিল যখন সিঁথি অবলীলায় বলেছিল, তৃপ্তি আমি কখনও পাইনি; অথচ পাঁচ বছর হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে। মেয়েদেরও যে পরিতৃপ্তি আছে, এই জ্ঞানটুকুও তার নেই। আমি তার কাছে একটি ডল ছাড়া কিছুই না।

তুমি তাকে বোঝাতে পারো না?

না।

সিঁথির দু’চোখের কোনায় দু’ফোঁটা অশ্রু চিকচিক করে নিচে নামে। রাজিব আলিও বিগলিত হয়। একজন নারীর জীবন কি তাহলে এভাবে কাটে? একটি ছেলেও আছে ওদের তিন বছরের। অথচ স্বামী এখনও বুঝতে পারে না নারীর শরীরের আবেদন। বড় অবাক করা কাণ্ড! 

তোমার স্বামীকে ডাক্তার দেখাও।

অনেকক্ষণ নীরব থেকে রুদ্ধ কণ্ঠে অস্ফুট উচ্চারণে সিঁথি বলল, অনেকবার বলেছি। সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বলে, ডাক্তার কী করবে? আমি যতটুকু পারি তাই নিয়েই তোমাকে চলতে হবে। না চাও তো আমাকে ছেড়ে চলে যাও। অন্য কাউকে বিয়ে করো।

তাহলে তাই করো।

একি সম্ভব! একটা ছেলে আছে। ওর মুখের দিকে তাকালে নিজের সুখের কথা আর ভাবতে পারি না। ওকে নিয়েই থাকি। বেশ আছি। মানুষকে বোঝাতে পারি স্বামী-পুত্র নিয়ে আমি পরম সুখী নারী।

তোমার সামনে তো জীবনের অনেক সময় পড়ে আছে। একটা জীবনকে কেন নষ্ট করবে?

মেয়েদের কত রকমের কষ্ট! কী করে বোঝাব বলো? কাকে বোঝাব বলো? কেউ কি বিশ্বাস করবে? বলবে স্বামীর দুর্বলতা থাকলে ছেলে হলো কী করে? তুমিই বলো। 

সিঁথির জীবনের ধূসর পাণ্ডুলিপির পাঠ করে রাজিব আলি আপ্লুত হয়। মনে মনে হিসাব-নিকাশ করে, যদি এমন হয় যে, সিঁথি ওর স্বামীকে তালাক দিয়ে আরেকজনকে বিয়ে করে, সেও যদি সিঁথিকে বুঝতে না পারে। যদি এমন হয় যে, সিঁথি তালাক দিল, কিন্তু কাউকে বিয়ে করতে পারল না- তাহলে কী হবে? ছেলেটার কী হবে? এই সমাজ-সংসারের দায়, ছেলেটার দায়, সিঁথির পরিবারের দায়- সবই তো সিঁথির উপর বর্তাবে? যতটুকু না দোষ তার চেয়ে বেশি দূষণের ছাপ লাগবে কপালে, সব অপবাদের উত্তরাধিকার হবে সিঁথি। কেউ কি ওর পক্ষ নেবে? মা, বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন কে নেবে? আর কাকেই বা সে বোঝাতে পারবে যে স্বামীর রহস্যময় গোপন শিথিলতা। এ কথা তো কেবল সেই নারীই জানবে যার উপর পুরুষটি উপগত হবে। এ ছাড়া আর কে জানবে? তবু একদিন দু’দিন এমন হতে পারে, তাই বলে পাঁচ বছরে একবারও না!

কী ভাবছ?

সিঁথি প্রশ্ন করলে রাজিব আলি হকচকিয়ে যায়।

বলে, না কিছু ভাবছি না। ভাবছি জীবনের আঁকেবাঁকে কতই না কষ্টের রূপ। কতই না কষ্টের বিষ।

কলহাস্যে ভরপুর ছোট্ট ক্যাফেতে হঠাৎই নেমে আসে জমাট নৈঃশব্দ্য। কিছুক্ষণ পর সেই জমাট নৈঃশব্দ্যের প্রাচীর ভেঙে অনুপ্রবেশ করে একটি দীর্ঘশ্বাস। সিঁথির দীর্ঘশ্বাসে আছে কষ্টের স্পষ্ট আভাস। এই কষ্ট অল্পদিনের পরিচয়ের মধ্যে যেন সেতুবন্ধ রচনা করে এক অমোঘ প্রেমের। গভীর উপলব্ধি থেকেই নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চায়, দেখতে চায় মহুয়ার জীবনের সঙ্গে রাজিব আলির দাম্পত্যজীবনের কোথাও ফাটল আছে কিনা। নিজেকেও পৌরুষের অন্তরালে সুপুরুষ ভাবলেও তার কি হেরে যাওয়ার ইতিহাস নেই? সে কি নারীর শরীরের কাছে পরাজিত হয়নি কোনোদিন? অনুস্মৃতি উদ্ঘাটন করতে গিয়ে রাজিব আলি বিয়ের আগের খতিয়ান ঘাঁটাঘাঁটি করে। ছাত্রজীবনে তারিনের সঙ্গে প্রথম সম্পর্কে কি সে হেরে যায়নি? সেদিন তারিন কি তিরস্কার করেনি? বলেনি, প্রথম অভিজ্ঞতা বুঝি? আমার সঙ্গে খেলতে এলে আরও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন?

তারপর নিজের পৌরুষের প্রতি নিজেই সন্দিহান, আস্থাহীন, দীর্ঘদিন বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত এবং পরে কোনো এক ডাক্তারের পরামর্শে বিয়ে করে আস্থা ফিরে পায়। এমনও হতে পারে সিঁথির স্বামীর ক্ষেত্রেও।

কষ্ট আর ক্লেশকাতুরে সিঁথির বসে থাকতে ইচ্ছে করেনি। মুহ্যমান, মলিন ও ভারাক্রান্ত মুখমণ্ডল, নত দৃষ্টি, বলল- চলো, আর ভালো লাগছে না।

রাজিব আলিরও কথা বলতে ইচ্ছে হয়নি। বের হয়ে বাইরে কিছুক্ষণ দু’জনে পায়চারি করলেও কারও মুখের দিকে কেউ তাকাতে পারেনি। বুকের ভেতরের কষ্ট যেন উপচে পড়েছে চোখেমুখে। কষ্ট সত্যিই সংক্রামক।

সিনেমা দেখেছে দু’জনে। কিন্তু দু’জনই সেদিন পাথরের মূর্তি। অথচ সিনেমা হলে যাওয়ার পরিকল্পনা হওয়ার পর রাজিব আলি, এমনকি সিঁথিও ভেবেছিল দু’জনের হাত ধরবে। স্পর্শ করবে। কিন্তু না কিছুই করতে পারেনি। শুধু সিনেমার টিকিটের টাকাটা হালাল করার জন্যই হয়তো সময়টুকু হলে বসে কাটায় মৌনবিথারে।  

পথের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে রাজিব আর সিঁথি সিএনজি ট্যাক্সিতে করে বাসার দিকে রওনা হয়। যে সিঁথির শরীরের প্রতি মোহাচ্ছন্ন ছিল রাজিব, সেই সিঁথির শরীরের মোহের চেয়ে অন্তর্দহন নিবৃত্তির জন্য প্রবৃত্ত হয়। এই কি ভালোবাসা, ভাবে রাজিব। একদিনেই কেন এতটা ভালো লাগল সিঁথিকে, নাকি করুণা…।

রজবও একটি ট্যাক্সি করে বাসায় ফেরে। স্মৃতিতে খোদিত সিঁথির শাড়ি, কিশোরীর মতো পিঠে পড়ে থাকা দুটি বেণি, পদ্মের পাপড়ির মতো হাতের আঙুল, কমলা ফালির মতো ওষ্ঠাধর, সরু কটির কোমর দুর্নিবার আকর্ষণে রাজিব আলির মনের ভিতরেই গুনগুন করে গান গায় হাজারো ভ্রমর।

প্রতিদিন সকালেই ওরা ফেসবুকের ইনবক্সে শুভ সকালের বিভিন্ন ইমেজ পাঠায়। প্রতিটি সকাল ওদের বসন্তের সকাল হয়ে ওঠে। বাসা থেকে বের হয়ে অথবা অফিসে গিয়ে ফোন করে সিঁথিকে। ‘আজকের দিনটি বড় সুন্দর হয়ে গেল। একটি দিন হয়ে গেল সুখময়।’ সিঁথি কলকলিয়ে হাসে। এত মিষ্টি হাসি! এত সুন্দর করে কথা বলে মেয়েটি! বলবে না কেন, লেখাপড়া তো কম করেনি।

স্নাতকোত্তর। বাংলা সাহিত্যে। 

স্বামীও বড় চাকুরে।

আরও দু’দিন ওদের দেখা হয় দুটি রেস্টুরেন্টে। সিঁথির পছন্দের মেন্যুতে খাওয়া হয়। সিঁথিই বিল চুকিয়ে দেয়। শেষের দিন রাজিব বলেছিল, লং ড্রাইভে যাওয়ার জন্য। দূরে কোথাও দু’দিনের জন্য।

সিঁথি বলল, নিজের বাসায় অবাধ সুযোগ থাকতে দূরে কেন? দূরে তো নানা রকম রিস্ক।

তোমার বাসায় রিস্ক নেই?

আসলে পরকীয়ার রিস্ক সব জায়গাতেই আছে। কিন্তু আমার দূরে যাওয়ার রিস্ক বেশি। আমার বাসায় কম।

তোমার ছেলে।

ও মাঝে মাঝে মায়ের বাসায় থাকে। ছেলে কোনো সমস্যা নয়। কিছু রিস্ক থাকবে সেটা আমি সামলাতে পারব। তুমি কি ভয় পাও?

আমার জন্য কোনো ভয় নেই। তোমার জন্য ভয় হয়।

আমার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না।

এভাবেই তৈরি হয় রাজিব আলী আর ফারজানা ইয়াসমিন সিঁথি।

এর পরেও রাজিব আলি আর সিঁথি অনেক কাছাকাছি হয়, দেখা হয়। নাটক দেখা হয়। সিনেমা দেখা হয়, রিকশা করে ঘোরাঘুরি করে, সবই দু’জনের মনের টানে। 

এক বছরের ছেলেকে জড়িয়ে বেডরুমে অপেক্ষা করে মহুয়া। রাজিব আলি চাঁদটির দিকে আবার তাকায়, চাঁদের মাঝে দেখতে পায় সিঁথিকে। রাজিব তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মোবাইল ফোন সেটের ফেসবুকে সিঁথির ছবিটি দেখে। দুর্নিবার আকর্ষণে মায়াবী চোখে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। ওর রিনিঝিনি সুরেলা কথাগুলো কানে বাজতে থাকে আর রাজিব মোহাচ্ছন্ন হতে থাকে। রাত আট থেকে দশটা পর্যন্ত চ্যাট করেছিল। এখন নেটে নেই, হয়তো গভীর ঘুমে মগ্ন সিঁথি। আগামীকাল সিঁথির সঙ্গে দেখা হবে সেই আনন্দ-রোমাঞ্চের শিহরণ এবং মহুয়ার সঙ্গে প্রতারণা করার কষ্টের নতুন দ্যোতনা বুকের ভেতরে সৃষ্টি করেছে একপ্রকার মাদকীয় মন্দ্রজাল। সেই মন্দ্রজালে আটকা পড়েছে রাজিব আলির রাতের ঘুম। ঘুমহার রাতের এমন শিকার আর কখনও হয়নি রাজিব আলি জীবনে। মহুয়াকে কীভাবে ঠকাবে, কেন ঠকাবে, কেন মহুয়ার সঙ্গে প্রতারণা করবে- এমন নানা প্রশ্নে রাজিব আলির প্রেমের যেন ভাঙাগড়া আর পুনর্নির্মাণ চলছে। 

দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মহুয়া বলল, শাহান শাহর কি রাজকার্যাদি সম্পন্ন হয়নি? এবার নিদ্রায় গিয়ে ফুলশয্যাকে মুক্তি দিন।

মহুয়ার কথা শুনে চমকে ওঠে রাজিব আলি। ঠান্ডা চোখে সে মহুয়ার দিকে তাকায়। একফালি বারান্দায় ঢোকার দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মহুয়া, একাদশীর চাঁদের আলোর মতো উদ্ভাসিত ওর মুখ, ঘুম ঘুম চোখ।

মহুয়া বরাবরই এমন। খুব বিরক্ত হলে এভাবে কথা বলে। আজকে বিরক্ত হওয়ার কথাই। রাতের খাবারের সময় চোখের ইশারায় বলেছিল- কি, আজকে হবে?

রাজিব আলি হেসে বলেছিল, হুম।

কিন্তু এত রাতেও বিছানায় অপেক্ষা করে এক ঘুম সাবাড় হলো, তখনও রাজিব আলির দেখা না পাওয়াতে এই বয়ান দিল। রাজিব আলির শরীর আজকে সায় দিচ্ছে না, মহুয়ার জেগে ওঠা শরীরও এখন শিথিল। রাজিব আলি বলল, যাও আসছি। 

আপনি জানেন না শাহান শাহ ছাড়া রাজরানি একা একা ঘুমাতে পারে না। 

রাজিব আলি হাসে।

বলি হাসির কী হলো? রাতের দৈর্ঘ্য কি ভগবান আপনার জন্য বাড়িয়ে দেবেন?

রাজিব আলি কথা না বাড়িয়ে মহুয়ার সঙ্গে শুতে চায়। বেডরুমে বাতি জ্বালায়, তন্ময় ঘুমের ঘোরে হাসছে। মহুয়া বলল, রাজকুমার মনে হয় স্বপ্ন দেখে হাসছে।

এত ছোট মানুষ আবার স্বপ্ন দেখে? 

নাহলে হাসবে কেন?

হাসছে আমাদের প্রেমলীলা দেখে।

ঢঙের কথা রাখো। কথা দিয়েও কথা রাখোনি। খাবারের সময় মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছিলে কেন? আবার ঢং কত! লাইট অফ করো। খুব ঘুম পেয়েছে।

তন্ময়কে মাঝখানে রেখে দু’জন দু’পাশে শোয়। মহুয়ার নাক ডাকার মিহিন শব্দ শোনা যায়। রাজিব আলির চোখের পাতা একসঙ্গে মিশতে মিশতে রাতের আয়ু শেষ।

ছুটির দিন বলেই এই শহরের অনেকের ঘুম ভাঙে দেরিতে। রাজিব আলিও অন্যান্য ছুটির দিনের মতোই রোদের প্রখরতা বাড়লে ঘুম থেকে জাগে। মহুয়া একটু আগে বিছানা ছেড়ে নাশতা তৈরি করে টেবিলে সাজিয়ে রাজিব আলিকে ডাকছে। বলি, নাশতা পাহারা দেওয়ার মানুষ কি আছে? রাজরানি যদি নাশতা পাহারা দেয়, তাহলে তো রাজযজ্ঞ চাঙে উঠবে। উঠুন রাজাধিরাজ, নাশতা খেয়ে অবলা রানিকে মুক্তি দিন।

রাতের রাগ এখনও মহুয়ার মনে। তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুমে ঢোকে।

মহুয়া চায়ের মগ নিয়ে চেয়ারে বসে আয়েশে চুমুক দেয়।

প্রাতঃকালীন কাজকর্ম সেরে নাশতা খেতে খেতে এগারোটা পার। চায়ে চুমুক দিয়ে রাজিব বলল, আমি একটু বাইরে যাব। ফিরব রাতে।

মহুয়া চোখ বড় করে তাকিয়ে বলে, কোথায় যাবে শুনি? আগে তো বলনি। 

এখন বললাম তো।

মহুয়া কথার ধরন পাল্টিয়ে জিজ্ঞেস করল, দুপুরে খাবে না?

না। বাইরে খাব।

কিছুটা বিস্মিত হয়েই মহুয়া বলল, কালকে এত বাজার করলাম আজকে বাসায় থাকবে বলে। আর কিনাÑ মহুয়া বাক্যটি শেষ করতে পারেনি। উত্তরের প্রত্যাশায় রাজিব আলির মুখমণ্ডল নিরীক্ষণ করে মহুয়া। না, উত্তর না পেয়ে আশাহত হয়।

কাপড় পরে হালকা সুবাসের সেন্ট স্প্রে করে গায়ে। এ ধরনের কোনো খায়েশ মহুয়া কখনও দেখেনি। বিয়ের পর গায়ে কোনোদিন সেন্ট মাখেনি। আজকে কেন সেন্ট মাখল? মহুয়া জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে যায়, অহেতুক প্রশ্ন করে বেচারাকে বিব্রত করার কোনো মানে হয় না। হয়তো কোথাও মিটিং আছে। ছুটির দিনেও কাজ থাকে। তাছাড়া রাজিব আলিকে নিয়ে কোনো প্রকার সন্দেহ মহুয়ার মনে কোনোদিন পোষণও করেনি।

উচ্ছ্বাসের আড়ালে দুশ্চিন্তার একটা হালকা ছায়া রাজিব আলির কপালে মৃদুমন্দ কাঁপছে যা সে অনুভব করে। বাসা থেকে বের হয়ে পথের পাশে দাঁড়িয়ে রাজিব ভাবতে থাকে- রিকশায় করে যাওয়াই ভালো। পরকীয়া প্রেম বড় মধুর। প্রলম্বিত সাক্ষাতে সেই মধুরতা বেশি উপভোগ্য। সিঁথি হয়তো অপেক্ষা করছে ভীষণ অস্থিরতায়।

কয়েকদিন আগে শিল্পকলায় নাটক দেখার সময় এবং নাটক দেখে বাসায় রিকশায় করে ফেরার সময় সিঁথির শরীরের স্পর্শ রাজিব আলিকে খুব রোমান্টিক করে তুলেছিল। একই রিকশায় দু’জনের ফেরা, জীবনকে উপভোগের গল্প করা, শরীরের উত্তাপস্পর্শ ছিল অন্যরকম ভালো লাগা। আজ দুপুর থেকে রাত অব্দি সিঁথির বাসায় থাকা—ভাবতেই চোখমুখ লাল হয়ে যায় রাজিব আলির।

মাথার উপরে সূর্য, রোদের জেল্লায় প্রখর তাপ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। একটা দমকা বাতাস এসে শরীরে মেখে দিল পথের অসংখ্য ধূলিকণা। মুখে বালি বালি লাগছে। চুলগুলো মনে হয় ধূলিতে একাকার।

ফুরফুর মেজাজে রিকশায় বসে ভাবছে আজকে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত সিঁথিকে নিয়ে কীভাবে কাটাবে। অনেক দিনের সিঁথির সঙ্গে সম্পর্কের নাটকের আজকের ক্লাইমেক্সের রোমান্টিক ভাবনায় রাজিব আলি বারবার শিহরিত হয়। রিকশাঅলাকে বলল, আড়ংয়ে যাও। সিঁথির ভাবনায় রাজিব আলি এমনই আচ্ছন্ন ছিল যে, কখন যে আড়ংয়ের সামনে চলে এসেছে টেরই পায়নি। রিকশাঅলা যখন বলল, স্যার এই যে আড়ং।

রাজিব আলির ঘোর কাটে। ওহ, চলে এসেছ?

জি স্যার।

ভাড়া চুকিয়ে রাজিব আলি হালকা মেজাজে ঢোকে মেয়েদের ফ্লোরে। কী কেনা যায়, কী দেওয়া যায় সিঁথিকে? একটা আকর্ষণীয় উপহার দেওয়া চাই। সারা ফ্লোর ঘুরে ঘুরে দেখে শেষ পর্যন্ত এক জোড়া দামি কানের দুল, দুটি চুড়ি আর এক সেট থ্রিপিস কিনে র‌্যাপিং করে নিল।

আড়ং থেকে বের হয়ে রিকশা নিয়ে সোজা স্টার কাবাব থেকে দুই প্যাকেট কাচ্চি বিরিয়ানি নিয়ে রওনা হয় রাজিব আলি। আড়ং থেকে যাওয়ার পথে সারাক্ষণই কথা বলেছে রাজিব আর সিঁথি। সিঁথিকে বলে দিয়েছে, তোমার বাসায় রান্না করে একটুও সময় নষ্ট করতে দেব না। সবটুকু সময় তোমার আর আমার। আমার আর তোমার।

তোমার জন্য রান্না করলে আমি কৃতার্থ হতাম।

না, হবে না। একটি মিনিটও আমার কাছ থেকে সরতে দেব না। আমি খাবার নিয়ে আসছি।

আজকের দিনটি তোমাকে উৎসর্গ করা আছে। তোমার ইচ্ছের বাইরে কিছুই হবে না। তাড়াতাড়ি এসো।

ত্বর সইছে না যে।

আমারও মন মানছে না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো।

রিকশা এগিয়ে যায়। সিঁথির সৌষ্ঠব চেহারার মায়াকাড়া চোখের আকর্ষণের কথা ভেবে রাজিব আলি বারবার পুলকিত হলেও হাজারো প্রশ্নের জালে বন্দি হয় ক্ষণে ক্ষণে? সহজ-সরল মহুয়ার প্রেমকে কি হারতে দেব? এত যত্নআত্তি করে সকালে নাশতা খাওয়ালো, কাপড়গুলো ওয়ার্ডরোব থেকে বের করে দিল, দরজা পর্যন্ত এগিয়ে বলেছিল, সাবধানে যেও, বেশি রাত করো না। মহুয়া কি জানত যে, তারই পরম আরাধ্য স্বামীবর আজ আরেক নারীর সঙ্গে সময় কাটিয়ে নিজেকে উজাড় করতে যাচ্ছে। মহুয়া কি জানে যে, রাজিব আলি এক প্রতারক স্বামী- যে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করে আরেক নারীর বিছানায় শোয়? যদি কোনোদিন মহুয়া জানতে পারে, কিংবা কোনোভাবে রাজিব আলি সিঁথির কাছে ফেঁসে যায় তাহলে মহুয়ার কাছে কী জবাব দেবে? মহুয়া যদি এভাবে অন্য পুরুষের সঙ্গে শোয়, তাহলে আমি কী করব? খুন? কত মানুষই তো গোপনে কত কিছু করে। আমার এত দুশ্চিন্তা কেন? সিঁথির জীবনের একটি দিন যদি সুখময় হয় তাহলে সেটি কি কম? তারও তো একটা জীবন আছে? এমন অসুখী নারী হয়তো এদেশে হাজারো আছে। তাহলে আমার কি সেসব নারীকে সুখী করার দায় পড়েছে? আমার কাছে ‘সুখ’ ভাড়া পাওয়া যায়? আমি কি ‘সুখ’ ভাড়া দেব?   

মোড় পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলেই রিকশাটি চলে যাবে সিঁথিদের বাসার গলির রাস্তায়।

কুহক। কুহক।

বুকের ভিতরটা তার মোচড় দিয়ে ওঠে।

রাজিব আলি রিকশা শ্রমিককে বলল, মামা, রিকশাটা ঘুরাও। যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে যাও।

পথিমধ্যে রাজিব আলি ভাবে এই উপহারসামগ্রী বাসায় নিয়ে সংসারে সন্দেহের ইঁদুর ঢোকাতে চাই না।

মামা তোমার রিকশাটা একটু থামাও।

রিকশা থামালে রিকশাঅলাকে রাজিব আলি বলে, রিকশার সিটটা উপরে উঠাও।

কী করেন স্যার?

সিটের নিচে উপহারসামগ্রী নিজ হাতে রাখতে রাখতে রাজিব বলল, এগুলো তুমি নিয়ে যাও। তোমাকে দিয়ে দিলাম। উপহার। 

না, স্যার। মানুষে আমারে চুর ভাববো। মাইর দিব। 

রাজিব আলি ক্ষণকাল চিন্তা করে বলল, আমার কার্ড দিচ্ছি। যদি কেউ তোমাকে চোর মনে করে ধরে, আমাকে ফোন করবে। তোমার কোনো সমস্যা হবে না।

রিকশাঅলার ঠোঁটের ফাঁকে মিহিন হাসি খেলে যায়Ñ যেন অন্ধকার রাতে বিদ্যুতের চমক।

রিকশাঅলা ওর নিজের পথে চলতে লাগল।

রাজিব আলি গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে বাসার পথ ধরে। আজকের দুপুরের চাঁদি ফাটানো কড়কড়ে রোদে মানুষের ঠাসঠাসি ভিড়ের পথে হাঁটতে ভীষণ ভালো লাগে রাজিব আলির।

মোজাম্মেল হক নিয়োগী : কথাসাহিত্যিক

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares