গল্প : পথের গল্প : মাহবুবর রহমান

মাহবুবর রহমান ।।

সকালে লেকপাড়ে হাঁটতে হাঁটতেই শিউলীর সাথে পরিচয়। এই-সেই করে ক্রমে সে আমার ঘরের সব খবর জেনে যায়। ঘটনাটা একটু খুলেই বলি।

হাঁটার জন্য অত সকালে সঙ্গে মানিব্যাগ নিয়ে বের হবার মতো বোকা আমি নই সেটা ছিনতাইকারী ভাইয়েরা জানেন। তবে সাত নম্বর রোডের লেকপাড়ের ফল বিক্রেতা জুলহাসের দোকানে একবার ঢুঁ মারাটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। তাই খুচরো কিছু টাকা ট্র্যাকস্যুটের পকেটে রেখে দিই। কিন্তু সর্বশেষ লন্ড্রি থেকে নিয়ে আসার পর পকেটে আর টাকা রাখা হয়নি। সমস্যাটা হলো ঠিক সেদিনই।

এক নম্বর রোড থেকে বের হয়ে কবি মোহাম্মদ রফিকের বাড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে ডানে মোড় নিয়ে দু’নম্বর রোড খুব সাবধানে পার হতে হয়। খুব ভোরে ঢাকার  রাস্তায় কোনো ট্রাফিক ব্যবস্থা কার্যকর থাকে না। আপনি ভাবছেন প্রথমে ডানে তাকিয়ে মাঝ বরাবর গিয়ে বাম দিকে তাকাবেন। তারপর নিরাপদে রাস্তা পার হয়ে যাবেন। কিন্তু না। যখন আপনি ডান দিকে তাকিয়ে পার হচ্ছেন ঠিক তখনই উল্টো পথে বাম দিক থেকে হঠাৎ একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা আপনার ওপর চড়াও হবে। তাই ক্রমাগত লেফট-রাইট, লেফট-রাইট তাকিয়ে তবে সড়ক পার হয়ে লেকপাড়ের দিকে এগিয়ে চললাম।

শীতের প্রায় শেষ। এ সময় সাধারণত বৃষ্টিবাদল হয় না। তাই মনে মনে আসন্ন বসন্তের কোনো গানের প্রথম কলি গুনগুন করে উদাসীন হয়ে পড়েছিলাম। যৌবনের শুরুতে বসন্ত ছিল রঙিন বেলুন। ‘আহা, আজি এ বসন্তে.. এত  ফুল ফোটে!’ এই টাইপের আরোহী আবেগের রসে টইটম্বুর গান।  আর এখন এই বিকেল বয়সে বসন্ত নিয়ে আসে হারাবার হাহাকার। এখনকার বসন্তের গান হলো- ‘দিয়ে গেনু বসন্তের এই গানখানি’ টাইপের অবরোহী বেদনায় ভরা স্মৃতিকাতর ক্রন্দন। অর্থাৎ পাবার সম্ভাবনা শেষ, এখন শুধু দেবার পালা।  হায় রে! বয়সের সাথে বসন্তের চেহারাও বদলে যায়।

যাই হোক বুকের ভেতর কোথাও এক অব্যক্ত  আবেগ উঁকি দিচ্ছিল। এই সময় বলা নেই কওয়া নেই কোত্থেকে হঠাৎ এক বেরসিক  বৃষ্টি এসে হাঁটার ছন্দটাকে মাটি করে দিল। হাতে ছাতা নেই, তাই দ্রুত শিউলীর ঘরে আশ্রয় নিলাম।

পাঁচ নম্বর সড়কের ডানপাশের ফুটপাথের ওপর ত্রিপল টানানো শিউলীর পিঠার দোকান। একটি কাঠের তৈরি ভ্যানের ওপর পিঠা বানাবার যাবতীয় সরঞ্জাম। যারা আমার মতো গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে অনেক কষ্টে স্মার্ট হবার চেষ্টা করেও স্মার্ট হতে পারেননি কেবল তারাই এই ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে গরম চুলার ধোঁয়াযুক্ত গরম পিঠার  আকর্ষণ যে কি অপ্রতিরোধ্য তা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন।

শিউলী সেই দুর্বলচিত্ত নবাগত নগরবাসীর মগজে কৈশোরের ফেলে আসা মায়ের হাতের পিঠার গন্ধটি কৌশলে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সে আগ্রহ সহকারে আমাকে একটি প্লাস্টিকের বেঞ্চিতে বসতে দিয়ে বলল, ‘ভাইজান, চিতই না ভাপা?’

চিতই ই দাও।

একটু বহেন। গরম গরম ভাইজ্যা দি। বাসার জন্য কী দিমু?

দুটোই দাও। ভাপায় গুড় নারকেল বেশি দিও।

আইচ্ছা। মাইয়াডারে লইয়া আইলেন না ভাইজান?

নারে। খুব অলস রে। ঘুম থেকে উঠতেই চায় না।

কথার ফাঁকে পিঠা ভাজা চলছে। একই সঙ্গে ছয়টি কেরোসিনের  চুলো জ্বলছে। তিনটাতে চিতই, তিনটাতে ভাপা। শিউলী নিজে চিতই ভাজে, তার সহকারী একটি বারো তেরো বছরের ছেলে ভাপার কাজ করছে।  খুন্তির সাহায্যে চিতই পিঠা খুঁচিয়ে তুলে একটি ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে সাজটি মুছতে গেলেই গরম জলের স্পর্শে সাজটি ছ্যাঁৎ ছ্যাঁৎ করে রেগে যাচ্ছে। সেই রাগের বাস্তব নমুনা হিসেবে একটা হাল্কা বা®প উপরে দৃশ্যমান হচ্ছে। শিউলী সেই মৃদু শান্ত হওয়া শূন্য সাজে সাদা রঙের নতুন মণ্ড ঢেলে দিচ্ছে। একটি মাটির ঢাকনা দিয়ে সেটিকে ঢেকে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর ঢাকনা তুলে দেখে নিচ্ছে পিঠার বুক পর্যাপ্ত ফুলে-ফেপে পরিপুষ্ট হয়ে উঠল কিনা। পাশাপাশি ভাপার দিকেও নজরদারি করতে হচ্ছে।

ঐ ছ্যামরা, মন দিয়া কাম কর। ভাইজানের মাইয়ার জন্য নারকেল গুড় ঠিক মত দিস।

ইতিমধ্যে ‘বেম পার্টির’ (শিউলী ব্যায়ামরত মানুষদের এই ভাষায় বলে থাকে) সমাগম বেড়ে গেছে। যথারীতি পিঠার জন্য লাইনও লম্বা হয়ে গেছে।

ঐ জামাইল্যা, জোরে হাত চালা। ছারেরা খাড়াইয়া আছে দ্যাখস না?

চালাইতে আছি খালা।

জামাল মাথা নিচু করে ভাপা করে যাচ্ছে। চুলোর তাপে এই শীতের মধ্যেও শিউলী আর জামালের মুখমণ্ডল ঘর্মাক্ত হয়ে উঠেছে।

মেয়ের জন্য পিঠা নিয়ে টাকা দিতে পকেটে হাত দিতেই বুকটা ধক করে উঠল। টাকা আনা হয়নি! আমার দশা তখন অনেকটা সমারসেট মমের মতো। তিন মণ ওজনের লাঞ্চন লেডি দেদার খাবারের অর্ডার দিয়ে যাচ্ছে, অথচ লেখকের পকেট খাঁ খাঁ করছে!

যাই হোক শিউলীকে বললাম, ‘আজকে আর পিঠা নিব না, সমস্যা আছে।’

কী কন ভাই? মাইয়াডার জন্য এছপেসাল পিঠা বানাইলাম, আর অহন কইতাছেন নিবেন না!

এইডা আমার গিফ (গিফট) আপনের মাইয়ার জইন্যে।

তার পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত পিঠা নিতেই হলো। এভাবে দিনে দিনে সে আমার মেয়ের সাথে একটি অদৃশ্য বন্ধন তৈরি করে ফেলল।

দু’সন্তানের মা বাবা শিউলী দম্পতি। তাদের মেয়েটির যখন বয়স চার বছর, তখন হঠাৎ মরণব্যাধি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় একপ্রকার বিনা চিকিৎসায় মারা গেল। শোকের অসহনীয় কষাঘাত না শুকাতেই খরস্রোতা মেঘনার উন্মত্ত ভাঙনে একদিন মেয়ের কবরটিসহ বসতবাড়িটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেল। রাক্ষসী নদীটি সবকিছু গিলে কলকল শব্দ তুলে বঙ্গোপসাগরের দিকে ছুটে চলল।  পেছনে পাঁজরভাঙা শূন্যবুকে অসীম হাহাকার নিয়ে শিউলী দক্ষিণের নিষ্ঠুর গ্রাসের দিকে তাকিয়ে রইল কেবল।

‘আহারে আমার কলিজার টুকরা মাইয়া! তোরে সুখ দিতে পারি নাই, পেট ভইরা ভাত দিতে পারি নাই মা, আর তোরে নদীর পেটের খিদা মিটাইতে গিল্যা ফ্যালাইল! ওরে আল্লা এই তোমার বিচার!’

শিউলীর নিষ্ফল আহাজারি প্রশস্ত নদীবক্ষে বাতাসের কান্নায় ক্ষীণ ঢেউ তুলে আবার  শূন্যে মিলিয়ে যায়।

একমাত্র ছেলেটি নিয়ে তাদের নতুন ঠিকানা হলো রায়েরবাজার বস্তি। সামান্য পুঁজি যা ছিল তা দিয়ে একটি ভ্যানগাড়ি কিনে স্বামী-স্ত্রী  বাঁচার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অভাগার এমনই কপাল যে, একদিন স্বামী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হলো। তাদের ছেলেটি বড় হয়ে দেখল এই সংসারে তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাই একদিন সকালে ভ্যানগাড়িটি নিয়ে সেই যে উধাও হলো আর খবর নেই। নিঃস্ব অসহায় শিউলী বাঁচার শেষ সংগ্রাম শুরু করল এই পিঠা ব্যবসার মাধ্যমে।

যদি শিউলীর মেয়েটি আজ বেঁচে থাকত তাহলে আমার মেয়ের বয়সের কাছাকাছি হতো। তাই যখনই আমরা সকালের ভ্রমণে বের হই, আমার মেয়ের দিকে শিউলীর একটি মাতৃত্বের  মায়াবী দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে।

ইতিমধ্যে ধানমন্ডিতে পিঠাখালা হিসেবে শিউলীর নামডাক হয়ে গেছে। শর্ষে ভর্তা দিয়ে ধোঁয়া ওঠা চিতই বেশ লাগে। আবার তাজা নারকেল গুড় দিয়ে ভাপার স্বাদও অপূর্ব। গত বছর চিতই ছিল পাঁচ টাকা, ভাপা ছয়। ক্রমবর্ধমান মূল্যের সাথে গুড়-নারকেলের মূল্যও বৃদ্ধি পায়। তাই এবার এক টাকা বাড়িয়ে ছয় ও সাত টাকা করা হয়েছে। কিন্তু ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া বড় বড় ফ্ল্যাটবাড়ির মালিকরা যারপরনাই নাখোশ! এক বছরের মধ্যে প্রায় কুড়ি শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি নিদারুণ অন্যায়।

এই নব্য দার্শনিকরা যদিও দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় চিতই-ভাপার চরমভক্ত, তবে স্বাস্থ্য রক্ষায় তাঁরা এতই সচেতন যে, প্রতি তিন মাস পরপর তাঁদের অমূল্য মল-মূত্র পরীক্ষার জন্য কালো টাকা এবং ক্ষমতার মাত্রা অনুযায়ী ব্যাঙ্কক, সিঙ্গাপুর বা লন্ডন গমন না করলে কোনোমতে চলে না। আর যাদের সাধ চড়া কিন্তু সাধ্য ততটা মজবুত নয়, তারা নিদেনপক্ষে কলকাতা দিল্লি ঘুরে না এলে স্বদেশপ্রেম ততটা শক্তপোক্ত হয় না। দেশে ফিরেই দেশীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও ডাক্তারদের নিয়ে পশ্চিমা নরম গণতন্ত্রে কঠিনভাবে বিশ্বাসী যুক্তিবাদী এই দার্শনিকরা রীতিমতো খিস্তিখেউড় শুরু করে দেন। তাঁরা দেশের গণতন্ত্রহীনতা ও জবাবদিহির অভাবকে এর জন্য দায়ী করেন।

হঠাৎ শিউলীর কাছে ফুলে-ফেঁপে ওঠা চিতই পিঠাগুলোকে জেগে জেগে ঘুমানো দার্শনিক বলে মনে হয়। সে চোয়াল শক্ত করে  মুখ বুজে শুয়ে পড়া  দার্শনিক চিতই পিঠাগুলোকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জাগিয়ে তোলে।

ক্রমাগত বাসা বদলের পরিক্রমায় আবারও বাসা বদল হলো। এক নম্বর থেকে সোজা চলে এলাম এগারো নম্বরে। ফলে হাঁটার সময় ও গতিপথও পরিবর্তন হলো। শিউলীর বলয় থেকেও কিছুটা দূরে চলে এলাম।

সময় এবং স্রোত সবার অগোচরে কালের গর্ভে বিলীন হতে থাকে। ইতিমধ্যে আমার মেয়েটিও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী হলো।

আগের হাঁটার সেই আনন্দ আর পাই না। রাস্তা পার হবার সময় কচি হাতটির নির্ভরতার স্পর্শটুকু আর পাই না। ডাবওয়ালা এখন না বলতেই ডাব কেটে দেয় না। কোন গাছের কী নাম তা আর কাউকে বলা হয় না। পাখির সম্মিলিত কূজন এখন সঙ্গীতের মধুর ধ্বনি হয়ে  অন্তর পূর্ণ করে না। সর্বত্র একটি শূন্যতা, একটি হাহাকার আমাকে ঘিরে বেটোফেনের হৃদয় ছিঁড়ে যাওয়া মূর্ছনায় আঁকড়ে ধরে।

সেদিন কী মনে করে পাঁচ নম্বর সড়কের দিকে যেতেই শিউলীর সাথে দেখা।

ভাইজান আমাদের ভুইল্যা গেলেন?

আরে না, বাসা বদল করেছি তো তাই দেখা হয় না।

আমি পকেট থেকে পাঁচশ’ টাকার একটি নোট বের করে শিউলীর হাতে দিয়ে বললাম, এই টাকাটা আমার মেয়ে তোমাকে দিয়েছে। সে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে টাকাটা নিল।

ভাইজান আপনার মাইয়া কোথায় গেছে?

বিদেশে, আমেরিকায়। সে অসহায়ের মতো আমার দিকে তাকিয়ে বললÑ আমরিকা কোন দিকে ভাইজান?

আমি পশ্চিম দিকে হাত বাড়িয়ে বললাম- ওই দিকে।

সে আমার আঙুল নির্দেশিত আলোকরেখা অনুসরণ করে পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধে দৃষ্টিকে প্রসারিত করল।

সেই আলোকভরা অসহায় দৃষ্টির ভেতর আমি আমার মেয়ের মুখটি দেখতে পেলাম।

মাহবুবর রহমান : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares