গল্প : নিভেছে যার বাতি : দিলওয়ার হাসান

দিলওয়ার হাসান ।।

তুমি যত বড় হও,

তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড় নও।

‘আমি মৃত্যু-চেয়ে বড়’ এই শেষ কথা বলে

যাব আমি চলে

                             -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

‘এইখানে যে আসবা তা আমারে জানাইলেই তো পারতা। কতজনের কাচেই তো আমার ঠিকানা আচে।’

“সত্যিকথা কী দাদা আপনে যে শিলিগুড়িতে হে কথা মনে আছিল না। হোটেল থিকা বাইর হইয়া হাঁটনের সময় দেখি ‘আকাশবাণী শিলিগুড়ি’- আপনের কথা মনে পইড়া গেল। ঢুইকা পড়লাম। কইলাম বাংলাদেশ থিকা আসছি- বিপিন রঞ্জন সরকারের ঠিকানা দ্যান, আমরা অবশ্যি তারে টুনুদা কইয়া ডাকি। আপনেগো এইখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়।”

‘আমার বাঙ্গল কথা শুইনা তারা হাসলেন, তারপর ঠিকানা আর ফোন নম্বর দিয়া দিলেন। আপনেরে ফোন করবার পারতাম, ইচ্ছা হইল সারপ্রাইজ দেইÑ ৩৬ বছর আগে আমাগো ছাইড়া চইলা আইচেন।’

‘ভালোই করছ। তা বেড়াবার আইলা? দার্জিলিং, কার্শিয়াং, জলপাইগুড়ি? পারলে মংপুতেও যাইও, বেশিদূর না এহান থিকা- তোমাগো গুরুর প্রিয় জায়গা।’

‘হ, তা তো জামুই। তয় আইচি এক উদ্দেশ্য লইয়া’…

‘ও বুচ্চি তোমাগো আর এক গুরুর বাড়ি যাইবা? কী যে পাগল তুমরা আছিলা যৌবনে। তা এতদিন পরে আইলা যে?’

‘চাকরি বাকরি সংসার এইসব সামলাইয়া বাইর হওয়োন যায় না দাদা।’ বলল ইমতিয়াজ, ‘তা আপনের ছেলেপেলে কী?’

‘আমার ছেলে একটাই। বউ লইয়া কোইলকাতা থাকে। হে ইঞ্জিনিয়ার। একটা মাত্র মাইয়া তার। মাঝে মধ্যে আসে ছুটি কাটাইতে। একবার লইয়া গেছিলাম বাংলাদেশে। আমাগো স্বর্ণকমলপুল তাগোর ভালো লাগছে।

‘তা তুমি ইমতু ব্যাগ অ্যান্ড ব্যাগেজ লইয়া এইখানে চইলা আস। সিন্ডারেলা ভালো হোটেল; কিন্তু দরকার কী? আমাগো লগে থাকো। তোমাগো বউদি রান্দন বাড়ন খারাপ করে না।’

‘কী যে কন দাদা, আপনে হইলেন সঙ্গীত-রসিক, ভোজন-রসিকও, আপনের বউ ভালো রান্দন জানব না? তা কাইল রাতে আইসা খামুনে আপনেগো লগে। আমি হইলাম ভবঘুইরা মানুষ, জোইটালই ভালো আমার লিগা। কাইল সক্কালে যামু মহানন্দপাড়ায়।’

‘তা যাইওনে। তোমার হোটেল থিকা বেশিদূর না। একটা ইলেকট্রিক রিকশা লইও। হ্যার বাড়ির কথা জিগাইলেই দেখাইয়া দিব। তারে এখানকার সক্কলেই চিনে। কাল্ট-ফিগার না?’

‘গেছেন হ্যার বাড়ি? আপনাতো আবার পলিটিক্স ফলিটিক্সে মদ্দে আছিলেন না কুনদিন।’

‘না ছিলাম না তাতে কী। এত বড় লিডার। শিলিগুড়ির মানুষ ভালোবাসত তারে। বাইরে তিনি নাকি খুব সহজ সরল মানুষ আছিলেন। একটা কথা কী জানোÑ মানুষরে ভালোবাসতে না পারলে বড় নেতা হওন যায় না, তিনি মানুষরে ভালোবাসতেন যতদূর আমি শুনছি।’

আধা ঘণ্টাখানেক লাগল। একটা মিষ্টির দোকানে জিজ্ঞেস করতে বলল, ওই সামনে ডান দিকে ২৭ নম্বর বাড়ি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে যাইনি বলে আশংকা হলোÑ সবাইকে বাড়িতে পাওয়া তো?

ওর ছেলে অভিমন্যু শিলিগুড়ি কলেজে ইংরেজি পড়ায়। বিয়ে-শাদি করেনি। বড় মেয়ে অমিতা ডাক্তার। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে মধুরিমা শিক্ষক। বিয়ে হয়েছিল। স্বামী মারা গেছে। এ বাড়ির সবাই নিঃসঙ্গ। বাড়িটাও যেন বিষাদের মূর্তপ্রতীক। শীতের সকাল। বাড়ির সামনের ফুলগাছগুলোর একটা পাতাও নড়ছে না।

নিজের পরিচয় দিলাম লেখক বলে। তারা ভেবেছিল কাগজের লোক। এখন তো কেবল ওরাই আসে, বলল অভিমন্যু, চোখে পাওয়ারওয়ালা চশমা, ফ্রেঞ্চকাট দাড়িÑ পাকা, চুলও পাকা। বাবার প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) কেন্দ্রীয় কমিটির শিলিগুড়ি শাখার সাধারণ সম্পাদক।

ওই বাড়িটা এখন দু’ভাগে বিভক্ত। নতুন করে নির্মিত সম্মুখভাগটা সবার জন্য উন্মুক্ত। বাকি অংশে কাউকে যেতে দেওয়া হয় না। এটা হিরন মজুমদারের আদি বাড়ি। কাঠের একটা ঘরে থাকতেন, লিখতেন- পড়তেন, কমরেড আর বন্ধুদের সঙ্গে কাজ করতেন নকশালবাড়িকে জোতদারদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্যে। ওখানে বসেই লিখেছিলেন আটটি দলিল। যে-দলিলে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেওয়া হয়েছিল, যা তাকে রাষ্ট্র ও সিপিআই (এম)-এর শত্রুতে পরিণত করে। দল তাকে বহিষ্কার করে, পুলিশ পিছু নেয়। ১৯৬৯-এ আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। আর কোনো দিনও বাড়িতে ফিরে আসেননি। লাশটি পর্যন্ত আসেনি।

বাড়ির ভেতরে ঢোকার পর আমার মধ্যে যে-বিষণ্নতাটা তৈরি হয়েছিল তা কেটে গেল কিরণ মজুমদারের সরব উপস্থিতি টের পেয়ে। অভিমন্যু বলল, ‘আমার ঠাকুরদা ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের অধিকারী। স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সব সম্পত্তি দান করে ঝাড়া হাত-পা হয়েছিলেন।’…

তার বেড়রুমের শেল্ফে রবীন্দ্রনাথের বই দেখে অবাক হলাম। অভিমন্যুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এগুলো কি নতুন সংগ্রহ করা?’

‘না না বাবার সময়কার। খুব বই পড়তেন। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর পড়তেন মন দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা চমৎকার করে আবৃতি করতেন। গানও খুব প্রিয় ছিলÑ বিশেষ করে ক্ল্যাসিক্যাল। প্রায়ই গুনগুনিয়ে গাইতেনÑ ‘যেতে যেতে একলা পথে নিভেছে মোর বাতি’।

‘বাবার এক কম বয়সি কমরেড ছিলেন। তার নাম ভাঙুর। তিনি বলতেন, বাবার সঙ্গে তিনি সাহিত্য নিয়ে বিস্তর আলোচনা করতেন। একদিন তিনি বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, সার্ত্র পড়েছেন? সার্ত্রকে তো চীনারা সংশোধনবাদী বলে। বাবা বললেন, একটা মাত্র পড়েছি- প্রিজন অব আলটোনা, খুব একটা ভালো লাগেনি। ওর সঙ্গিনী সিমন দ্য বোভেয়ার ম্যান্ডারিন পড়েছি- ফ্রান্স সম্বন্ধে সলিড ইনফরমেশন পাওয়া যায়। পরে ভাঙুর বাবুর কাছ থেকে ‘সেকেন্ড সেক্স’ ও ‘বিইং অ্যান্ড নাথিংনেস’ নিয়ে পড়েছিলেন। ওয়ের্স্টান ক্ল্যাসিক নাকি বাবা খুব উপভোগ করতেন- এই ধরুন বেটোফেন, মোৎসার্ট এইসব।’

‘তাহলে আমরা যে শুনি উনি রবীন্দ্রনাথের মতো কবিদের বিরোধী ছিলেন?’

‘হয়েছে কী, ইতিহাস লেখকরা সব জায়গা থেকে বাবার স্মৃতি মুছে ফেলতে চায়। তা ছাড়া ওর বিষয়েও অনেক কিছু এখন মিথের মতো। তিনি বলতেন, লেনিনের কাছে তলস্তয় যদি রাশিয়ার আয়না হয়ে থাকেন, শেক্সপিয়র যদি স্তালিনের কাছে সর্বহারার নাট্যকার হন, তাহলে কী দোষে রবীন্দ্রনাথকে আমরা প্রত্যাখ্যান করব, ছুড়ে ফেলে দেব? প্রায়ই গাইতেন- ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে।’ শুধু তা-ই নয় কালিদাসও খুব প্রিয় ছিলেন তার। বলতেন, বিরহ-যজ্ঞের রোমান্টিকতা একজন বিপ্লবীর হবে না? তিনি মনে করতেন- একজন গরিব চাষির মনে জমির বাইরে আকাক্সক্ষা তৈরি করতে না পারলে সে বড় জায়গায় আসতে পারবে না।’…

আমার জন্য চা-টা নিয়ে ঘরে ঢুকল অমিতা। অভিমন্যু বলল, ‘আপনি ভগ্নিদের সঙ্গে কথা বলুন। আমাকে কলেজে যেতে হচ্ছে, তা কদিন আছেন এখানে?’

‘দিন তিনেক।’

‘এত কম? বেরিয়ে যান না কটা দিন। বেড়াবার মতো জায়গা তো এখানে অনেক।’

‘না চাকরি কইরা খাই তো।’

অমিতা বলল, ‘চাকুরি করেন তাতে কী, ছুটিটুটি নেই?’

‘সে বড় কম। সব করপোরেট এনভায়রনমেন্ট। খালি কাম করাইয়া নিবার চায়।’

‘আপনাদের ওখানে দেখি সব লেখক চাকরি-বাকরি করেন। ফুলটাইম লেখক নেই? একবার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়েছিল মহাশ্বেতা পিসির বাড়িতে। উনিও তো কোন একটা কলেজে পড়ান।’

‘লেইখা প্যাট চালান? সেইটা সোনার পাথরবাটি দিদি আমাগো দ্যাশে।’

‘ও আচ্ছা। চা নিন। মধুকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, ওর সঙ্গে কথা বলুন। আপনার জন্য রান্না করি।’

‘না না আমার জন্যি রান্তে হইব না। হোইটালে গিয়া খামুনে।’

‘সেটি হচ্ছে না, পরে বাড়িতে গিয়ে বলবেন, খেয়ে এসেচেন না গিয়ে খাবেন, হা হা হা। আপনাদের ও দিককার আতিথেয়তার কত গল্প শুনি। আমাদের বাড়ি থেকে না খেয়ে যেতে পারবেন না।’

মধু মানে মধুরিমা। হিরণ বাবুর ছোট মেয়ে। বলল- ‘আমাদের বাড়িতে অনেক দিন পরে বাইরের কেউ এলো।’

 ‘কেন? আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব?’

‘না কেউ আসে না। দ্বীপের মধ্যে পড়ে থাকি।’

‘আপনারা কিন্তু অভিমন্যুর জন্য একটা বউ আনতে পারতেন।’

‘বেশ বলেছেন। সবাই বলেছিল। অভি সে পথে গেল না, কেন গেল না সে কথা বাইরের লোকদের বোঝানো কঠিন। সে যাকগে, এই যে কষ্ট করে এতদূর এলেন, একি শুধু কৌতূহল বাবার সম্পর্কে, সবাই তো ধরুন বইপত্তর পড়ে…’

‘না না নিছক কৌতূহল না এইডা, তার জন্য এট্টুখানি ভালোবাসাও আচে, ইয়া ছাড়া আপনেগো দেখা, আলাপ-পরিচয় করা আপনেগো লগে…’

এ কথায় মধুরিমা ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকাল। চোখেমুখে একটুখানি হাসির আভাসÑ এই জিনিসটাকে বোধ হয়- হাসির দীপ্তি ছড়াল খানিকটা, এটা বললে ভালো হয়।

বললাম, ‘বাবা-মা দুজনেই রাজনীতির মানুষ ছিলেন, আপনেরা কি রাজনীতির মদ্দে গেসলেন কুন সময়?’

‘প্রত্যক্ষ রাজনীতি আমরা করিনি; কিন্তু সেই সময়ের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রভাবযুক্ত নাটক ও গানে আমি আর দিদি অংশ নিতাম। অভি তখন ছোট। আমরা রাজনৈতিক আবহাওয়ায় বড় হয়েছি। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে এক অপার শান্তি ছিল। দেখেছি বাবা-মায়ের সততায় এক অদ্ভুত মিল।

‘থিসিস, গুরুগম্ভীর আলোচনা, বিতর্ক, পলিটিক্যাল অ্যানালাইস এসব তো বই পুস্তকে ম্যালা পড়েন। আমি না হয় আমাদের জীবনের ছোটখাটো কিছু ঘটনা বয়ান করি কী বলেন?’

‘হ কন, আনটোল্ড স্টোরির মতন হইবানে, ইন্টারেস্টিং।’

‘ঠিক আনটোল্ড নয়, তবে ইন্টারেস্টিং বটে। একদিন সকাল ৯টা নাগাদ বড়োসড়ো একটা বাক্স নিয়ে গঙ্গাধর শীল আমাদের বাড়ির সামনে এসে হাজির। মা বললেন, আমার মেয়েদের চুল বড় হয়ে গেছে, সুন্দর করে ছেঁটে ছুটে দাও। উৎসাহী নাপিত মনের আনন্দে অতি যত্ন সহকারে আমাদের চুল ছাঁটতে শুরু করল। বেশ খানিকক্ষণ কাঁচি চালানোর পর মা চিৎকার করে উঠলেন- আমার মেয়েদের এ কী ছিরি করেছ অ্যা? তখন আয়নায় নিজের ছবি দেখব বলে দৌড় লাগালাম। এমন সুরত করেছে যে, হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারিনি। মা সেই ছবি জেলে বাবাকে পাঠালেন, বুঝুন একবার ব্যাপারটা।’

‘আপনের চেহারাটা কাগো মতন হইচিল কই? হা হা হা।’

‘না না, খবরদার কিস্সুটি বলবেন না।’ মধুরিমা একদম কচি খুকি এখন।

‘বাবারে লইয়া এ রকম মজার গল্প নাই?’

‘বাবা-মায়ের বিয়ের গল্প বলি, দেখুন মজা পান কিনা। বাবা যখন সিদ্ধান্ত নিলেন মাকে জীবনসঙ্গিনী করবেন, একদিন মা জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি এলেন। মায়ের বয়স তখন একত্রিশ। একটা স্কুলে পড়ান। বাবা ঠাকুরদাকে বললেন, একে বিয়ে করব। ঠাকুরদা বললেন, এই কালো বয়স্ক মেয়েকে বিয়ে করিসনে, আমি তোর জন্য একজন সুন্দরী পাত্রী ঠিক করে রেখেছি। মাকে বললেন, আমার ছেলের কিন্তু কোনো আয়রোজগার নেই, তাকে বিয়ে করলে আপনি না খেয়ে মারা যাবেন।

‘এসব তো আর ধোপে টেকেনি। বিয়েটা হয়েই যায়। সব আয়োজন দেখেটেখে আমার ছোট মামা বললেন, হিরণদা আপনারদের বাড়িতে দিদি যে কোথায় শোবে তারও ঠিক নেই, সেটাও আমাদের দেখতে হবে। বাবা বলেছিলেন, যা যা কাপড় দরকার আপনার বোনের দেন, তার বাইরে কিছু দেবেন না। পুরুত ঠাকুরকে বাবা বলেছিলেন, একেবারে নিয়ম রক্ষের জন্য যে টুকু করবার শুধু তাই করুন। ফলে মালা বদল, সাত পাকে ঘোরাÑ এসব কিছুই হলো না। শুধু আংটি বদল হলো। মা ঠাকুরদাকে প্রণাম করতে গেলে তিনি পা সরিয়ে নিলেন। কী বুঝলেন মশাই?’

‘এ তো দেখতাছি দারুন ট্র্যাজিক ব্যাপার?’

‘ট্র্যাজিক কেন? একজন দুর্ধর্ষ নকশাল লিডার ব্যান্ড পার্টি বাজিয়ে বিয়ে করবে নাকি, হা হা হা।

‘থাক বাবাকে নিয়ে অন্যরকম কথা বলি। এক ঘোর বাদলা দিনে সংসারের কিছু টুকিটাকি জিনিস কিনতে মা আমাকে দোকানে পাঠিয়েছেন। তড়িঘড়ি করে সবকিছু কিনে বাড়ি ফিরে দেখি বাবা কাঁদছেন। মায়ের কাছে শুনলাম তার এক কমরেড পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন।

এভাবে অনেক কমরেডের মৃত্যুসংবাদ পেতাম। হয়তো ক’দিন আগেই তারা আমাদের বাড়িতে থেকে গেছে। আপনি তো জানেন নকশাল আন্দোলনে নারী, শিশু, কিশোর, যুবক, মধ্যবয়সী, এমনকি অনেক বৃদ্ধ পুলিশের অত্যাচার কিংবা গুলিতে প্রাণ দিয়েছে।

কংগ্রেস সরকারের সময় পুলিশি অত্যাচার ইংরেজ আমলের অত্যাচারের চেয়েও অনেক বেশি নিষ্ঠুর ও নির্মম ছিল। ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে বেতমারা, গুহ্যদ্বারে খোঁচা মারা, বুকের ওপর ভারী কিছু রেখে চাপ দেওয়া, কম্বলে পেঁচিয়ে প্রহার, নখে পিন ফোটানো, গায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকা, পেছন দিক থেকে গুলি করে মারা, আরও সব ভয়াবহ ধরনের অত্যাচার যার সীমা-পরিসীমা ছিল না। তাই কারও ধরা পড়ার কথা শুনলে ভয়ে শিউরে উঠতাম ।

আমার পরিচিত এমন একটা পরিবারের কথা জানি, যে পরিবারের দুটি সন্তানই পুলিশি নির্যাতনে মারা গেছে। বৃদ্ধ বাবা-মা দেশের মুক্তির দিকে তাকিয়ে আশায় দিন গুনছে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা তাদের ছেলেদের মৃত্যু বৃথা যাবে না।’

মধুরিমা মাথা নিচু করে  চুপ করে বসে রইল। এমনিতেই সে বিষণ্ন। এখন কেমন যেন বিপন্ন লাগছে। কারও বিষণ্নতা আমাকে খুব এফেক্ট করে। আমিও কথা না বলে উদাস বসে রইলাম। তখনই অমিতার প্রবেশ, ‘কী ব্যাপার? চুপচাপ যে সব? ও বুঝতে পেরেছি, মধু আপনার কাছে বাবার গল্প করছিল। আমার সঙ্গে করলেও ও খুব মেলাঙ্কলিক হয়। চলুন খেতে চলুন। মধু তুই চান করলে করে আয় যা।’

খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি অমিতা অনেক পদ রান্না করেছে। বললাম, ‘এই অল্প সময়ের মধ্যে এত আয়োজন?’

‘যাতে বাড়ি গিয়ে বউকে বলতে না পারেন পশ্চিম বাংলার মানুষগুলো বড়ো কেপ্পন, হা হা হা।’

‘ছি কী যে কন? হিরণ বাবুর ছাওয়াল-পাওয়ালের লগে প্রাণ খুইলা কথা কইতাছি, এই তো আমার সৌভাগ্য। তার মধ্যে এত ভালো ভালো খাওন দাওয়োন।’

‘ভাববাদীদের মতো কথা বলবেন না তো, নিন শুরু করুন।’

‘আপনেরা খাইবেন না? সক্কলে একলগে বইলেই তো হইত।’

‘মধু আর আমি একসঙ্গে খাব। ওর এখনও চান-ই হয়নি।’

‘আপনের লগে কথা কিন্তক শ্যাষ হয় নাই আমার।’

‘বেশ তো খাওয়া-দাওয়ার পর বলবেন। আমার রান্না কিন্তু সুবিধের নয়, খেতে পারছেন তো?’

‘কেডা কইছে আপনের রান্ধন বালা না? আমার তো খুব স্বোয়াদ লাগতেছে। এই যে দুধকচুডা রানছেন, কইলকাতার রেস্তোরাঁয় খাই, ওয়াইফরে একবার কইছিলাম রানতে, ওগো মতো এত মজা হয় নাই।’

‘ওদের মতো কি হয়, ওরা কত কী দেয়, আর রাঁধতে রাঁধতে পাকা হয়ে গেছে। আপনি রেস্ট নিন, আসছি আমরা, একটুখানি ভাত-ঘুম দিতে চাইলেও দিতে পারেন।’

‘আরে সেই সবের দরকার নেই, আপনেরা খাওয়া-দাওয়া কইরা লন।’

‘ইচ্ছে করলে আমাদের বাড়িটা ঘুরে দেখতে পারেন, দেখবার মতো তেমন কিছু নেই যদিও।’

‘কিছু নাই মানে? কন কী দিদি, এই বাড়িতে তো মিউজিয়াম হওনের কতা। জ্যোতিবাবুরা এতদিন ক্ষমতায় রইলেন, কী করলেন আপনেগো লিগা? হ্যারাও তো বামপন্থি। খালি নিজেগো পার্টির লাইন আর আইডিওলজি লইয়া থাকলে চলব! মমতা দিদিগোর কতা আর না কইলামÑ হ্যারা অন্য লাইনের লোক।’

‘আপনি খুবই আশাবাদী মানুষ দাদা!’

হিরণ বাবু যে ঘরটাতে থাকতেন সেটাতে গেলাম। অভিমন্যু তার একটা আবক্ষ মূর্তি গড়িয়েছে শান্তিনিকেতনের এক ভাস্করকে দিয়ে। বাবার ব্যবহৃত বিছানার পাশে রাখা হয়েছে। তার একটা আরাম কেদারাও ওখানে রাখা, কাউকে বসতে দেওয়া হয় না।

আমার তখন ইতিহাসের নানা কথা মনে পড়ে যায়- হিরণ বাবুই প্রথম ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। বাংলার মন্বন্তরের সময় তিনি সিপিআই-এর কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ’৪৬-এ তেভাগা আন্দোলনে যোগ দেন। ওই আন্দোলনে বর্গাচাষিদের তাদের উৎপাদিত ফসলের অর্ধেকের বদলে তিন ভাগের দু’ভাগ প্রদানে জোতদারদের বাধ্য করা হয়। ’৬৭-তে তিনি চাষিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে জমি দখলে উদ্বুদ্ধ করেন। এ-কারণে তাকে সিপিআই (এম) থেকে বহিষ্কার করা হয়। বেশ ক’জন নেতা তার সঙ্গে দল ছাড়েন। সর্বস্তরের মানুষ কলকাতা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালার বুদ্ধিজীবীরা, বাংলার সাধারণ মানুষ তার বাড়িতে ভিড় জমায়।

অভিমন্যু বলছিল, বিখ্যাত অভিনেতা উৎপল দত্ত তাদের বাড়িতে আসতেন, ওর বাবার সঙ্গে বেঠক করতেন। ’৬৭-তে নকশালবাড়ি আন্দোলন শুরু হয়। পুলিশ হিরণবাবুকে খুঁজতে থাকে। মা আর স্কুলগামী তিন ভাই-বোনকে রেখে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। এই ছেলেমেয়েরা এখন কত্তো বড়- অমিতা, মধুরিমা, অভিমন্যু।

বীমা কোম্পানি চাকরি করতেন শীলা। বেতনের টাকা দিয়ে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন।

৫০ বছরের বেশি সময় অমিতারা বাবার বিষয়ে মিডিয়া বা অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেনি। আমার সঙ্গে অবশ্যি বলেছে কেননা আমি মিডিয়ার লোক নই, আর ওদের বাবার জন্য আমার কিঞ্চিৎ ভালোবাসা আছে।

খাওয়া-দাওয়া সেরে অমিতা আমার পাশে এসে বসল। বেশকিছুদিন আগে ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দিয়েছে। সমাজের একশ্রেণির মানুষের দুর্ব্যবহার সে সইতে পারেনি।

বলল, ‘বাবাকে আমি ভালোবাসি, কিন্তু তিনি আমার হিরো ছিলেন না। তিনি ছিলেন আমার ফ্রেন্ড, ফিলোসোফার ও গাইড। আমার পড়ালেখার ব্যাপারে কোনো সাহায্য করেননি, যা করেছিলেন আমার মা।

‘কলকাতায় মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় ক্লাসমেটরা আমাকে বিদ্রুপ করে বলত, কেন তুমি এত নামিদামি কলেজে পড়ছ, তোমার বাবা তো সবাইকে স্কুল ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। আমি তাদের বলেছি বাবা ও কথা বলেননি, ওই পরামর্শ ছিল শুধু তাদের জন্য যারা বিপ্লবী হতে চায়।

নকশালবাড়ির মুক্তাঞ্চলে গরিবদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে বাবার ইচ্ছে কিছুটা পূরণ করেছি। কিন্তু তা করতে গিয়েও হতাশ হয়েছি। জোতদাররা এখন নেই, কিন্তু পরিবেশটা একদম বিষিয়ে উঠেছে, ডাক্তারিটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।’

হিরণের নিন্দুকরা তাকে স্বৈরাচারী বলে অভিহিত করে, খুনি বলে, কিন্তু তার সন্তানরা স্বাধীনভাবে মানুষ হয়েছে। অনেকের কাছেই হিরণ ছিলেন ত্রাস। আদর্শের নামে তার সমর্থকরা নকশালবাড়িতে একশ’রও  বেশি জোতদারকে হত্যা করে। পশ্চিম বাংলায় আঠারো শ’ পুলিশ ও সরকারি কর্মচারীকে মেরে ফেলা হয়- কখনও গলা কেটে, পিটিয়ে কিংবা গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে। সব দায় পড়ে হিরণের ঘাড়ে, তিনি তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে।

এ সময় অভিমন্যু এলো। বলল, ‘আপনার খাওয়া-দাওয়া হয়েছে তো?’

আমি বললাম, ‘হ হইচে, আমি খাইছি। তুমিও খাইয়া লও। আরও কথা আচে তোমার লগে।’

অমিতা বলল, ‘একটু চা করতে বলি, আপনার ঘুম ঘুম ভাবটা কেটে যাবে।’

‘ভালোই অয় তাইলে, আনবার কন।’

‘বাবা কিন্তু খুব সাহসী মানুষ ছিলেন। দু-দুটি হার্ট অ্যাটাকে পড়বার পর ৪৯ বছর বয়সে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেন। ’৬৫ সালের দিকে চিত্তরঞ্জন মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তারপরও বিপ্লবের ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে ঘরে বসে থাকতে পারেননি।’ বলল অমিতা।

‘বাবা কিন্তু খুব প্রাণোচ্ছল মানুষ ছিলেন। সৌমেন কাকুর মুখে শুনেছি ছাত্রদের মধ্যেও ভীষণ পপুলার ছিলেন। অল্পবয়সী ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা মারার সময় এক রকম সুরে কথা বলেছেন, আবার কৃষকদের সভায় অন্যরকম। তাদের সঙ্গে কথার ধরনটাই ছিল আলাদা। সবাইকে দিয়ে কথা বলাবার চেষ্টা করতেন। কখনও হাসাচ্ছেন, সামনের সারিতে যারা বসে আছেন তাদের একজনকে উদ্দেশ করে কথা বলেছেন। তাকে দিয়ে আবার বলাচ্ছেন। কখনও আবেগে উদ্বেলিত, কখনও উত্তেজনায় অস্থির, আবার কখনও ইতিহাসের উদাহরণ টেনে ক্রোধে উন্মাতাল।’…

‘আপনেগো এই সৌমেন কাকুর একখানা স্মৃতিকথা আমিও পড়ছি। সেইখানে এক অন্যরকম হিরণ বাবুর ছবি আচে।…

‘তিনি মাঝে মধ্যেই হাফপ্যান্ট পইরা খালি পায়ে কারুর বাড়িতে যাইয়া হাজির হইতেন। হৈ-হুল্লোড় ভালোবাসতেন। ম্যায়ারা নাকি হ্যারে খুব পছন্দ করতেন। আপনার মায়ের লগে নাকি হ্যার খুব অ্যাকটা আলাপ পরিচয় আছিল না। অনেক ম্যায়ার লগেই নাকি মিশতেন।’

‘একদিন সৌমেন বাবু দ্যাখেন সন্ধ্যা ব্যালা পার্টির এক মাইয়ার কান্দে হাত দিয়া কথা কইতে কইতে হাঁটতাছেন রেললাইনের ধার দিয়া। দেইখ্যা তো সৌমেন বাবু দারুন শক্ড। তিনি ভাবলেন- হিরণ দা এত খারাপ। এ রকম একজন নারী কমরেডের একাকিত্বের সুযোগ লইতাছেন। বেশ কিছুদিন বাদে তার হেই ভুল ভাঙে। তিনি কইচেন- সেই দিন আমার সংকীর্ণ চোখ দিয়া হিরণ দারে দেখচিলাম। একটা আলোচনার সুমায় পাশের সঙ্গীরে মেয়ে ভাবেন নাই, একজন কমরেড হিসাবে দ্যাখছিলেন। তিনি মাইয়াগোর মধ্যেও জনপ্রিয় আছিলেন। তারা একটা সোয়েটার বানাইলে হিরণ দা ফাস্ট প্রেফারেন্স পাইতেন। অদ্ভুত অ্যাকটা জাদু আছিলো তার মইদ্দে, কী বুঝলেন?’

‘হ্যাঁ, সৌমেন কাকুর ওই লেখা আমরাও পড়েছি। ওই লেখাতেই আছে বাবা মদ খুব পছন্দ করতেন। বন্ধুবান্ধব কেউ আমন্ত্রণ জানালেই চলে যেতেন। স্কচ পেলে তো কথাই নেই। কেউ আড্ডা মারার আহ্বান জানালে বলতেন, ড্রিংস থাকলে যাব। মদ খাওয়াকে ডিফেন্ড করে বলতেন মদ খেয়ে একটু আনন্দ  হবে, বেশি বকবক করব, প্রগলভ হবো, এই তো? এ জন্যই তো মদ পান।

‘লোকে কী বলল না বলল তা নিয়ে পরোয়া করতেন না। হাঙ্গেরির এক রিপোর্টার আমাদের ঘরে কালিমূর্তি দেখে প্রচার করলেন তিনি কালিভক্ত। ধর্মযুগ পত্রিকার এক সাংবাদিক আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ও কালির ছবি প্রসঙ্গে বাবাকে প্রশ্ন করলে তার সাফ জবাব- কালির ছবি টাঙ্গান থাকা বা না থাকায় আমার কিছুই যায় আসে না। আর রবীন্দ্রনাথ? তার একটা কবিতা শুনুন, এই বলে পুরো ‘মৃত্যুঞ্জয়’ কবিতাটি আবৃত্তি করলেন।’

খাওয়া দাওয়া শেষ করে অভিমন্যু এসে বসল। ‘কী যেন জিজ্ঞেস করবেন?’

‘না আপনের বাবার মৃত্যুর ঘটনাটা লইয়া তো আমরা নানান কথা শুনচি। ব্যাপারটা আসলে কেমুন আছিল?’

’৭২ সালের ১৬ জুলাই কলকাতার এক গোপন আস্তানা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। কলকাতাবাসী কোনোদিনই তার হাইডআউটের সন্ধান পুলিশকে দেয়নি। বাবার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী শীতল বিশ্বাস পুলিশকে জানিয়ে দেয় কলকাতার গোপন আস্তানার ঠিকানা। শীতলকে বাবা খুব বিশ্বাস করতেন। ’৬৭-তে মাও সে তুং-এর সঙ্গে দেখা করার জন্য তাকেই চীনে পাঠানো হয়েছিল। পুলিশের নির্যাতন সইতে না পেরে সে হাইডআউটের ঠিকানা চাউর করে দেয়। বাবার মৃত্যুর পর সে শিলিগুড়ি আসে। বাবার ঘনিষ্ঠ আর এক সহযোগী আমিনুল হকের লোকেরা ওকে ওর বাড়ির কাছেই গুলি করে হত্যা করে।

‘বাবার গ্রেফতারের খবর শুনে অমিতা দিদি লালবাজার থানায় ছুটে যান। তখন তিনি মেডিকেল কলেজে পড়ছেন। গিয়ে দেখেন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে তার শরীর, ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছেন। ইনহেলার কিংবা অক্সিজেন কোনোটাই তাকে দেওয়া হয়নি। তার ধারণা হয় জীবন রক্ষাকারী কোনো ওষুধও তাকে দেওয়া হয়নি। দিদি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পুলিশ প্রহরায় কী অবস্থায় তার কাটছে। তিনি বলেছিলেন বুঝতেই পারছিস, এই পুলিশদের সঙ্গে আছি।

‘১২ দিন পরে, ২৮শে জুলাই আমাদের বাড়ির সামনে পুলিশের একটা গাড়ি এসে থেমেছিল। একজন অফিসার এসে জানালোÑ হিরণ মজুমদার মারা গেছেন। প্রতিবেশীরা কলকাতায় যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কিনে দিল। কলকাতায় নামার পর গোটা পরিবারকে সাদা পোশাকধারী পুলিশ অনুসরণ করতে লাগল। এসএসকেএম হাসপাতালের মর্গে বাবার লাশ রাখা হয়েছিল। রাতের শেষ প্রহরে লাশ কেওড়াতলা শ্মশানঘাটে নিয়ে যাওয়া হলো। ওখানটায় পাহারা দিচ্ছিল সিআরপিএফ ও পুলিশের লোক। রাস্তাঘাট সুনসান, কারফিউ- নীরবতা। লোকজন সব সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১২ বছরের ছেলের হাতে অগ্নিশিখা তুলে দিয়ে বলা হলো- নাও মুখাগ্নি করো। মা লাশ শিলিগুড়ি নিয়ে আসতে চাইলেন। পুলিশ দিল না।…

কয় বছর পরে মহাশ্বেতা পিসি লিখলেন, ব্রতী-সমুদের কথা। …রাতে লাশ জ¦লে। যারা শ্রাদ্ধ-শান্তিতে বিশ্বাসী, তারাও শাস্ত্রের নিয়মে সকালে শ্রাদ্ধ করতে পারে না। …ব্রতী স্লোগান লিখেছিল। পুলিশ যখন ওর ঘর তল্লাশ করে তখন সুজাতা দেখেছিলেন স্লোগানের বয়ান সব। ব্রতীদের হাতে লেখা- কেননা জেলই আমাদের বিশ^বিদ্যালয়। বন্দুকের নল থেকেই… এই দশক মুক্তির দশকে পরিণত হতে চলেছে। ঘৃণা করুন! চিহ্নিত করুন। চূর্ণ করুন মধ্যপন্থিকে।…’

‘হ, পড়চি তো, হাজার চুরাশির মা।’

‘আর যে- ছেলেটা লিখেছিল : কোনো কোনো মৃত্যু বেলেহাঁসের পালকের চাইতে ও হাল্কা, আর কোনো কোনো মৃত্যু হিমালয় পাহাড়ের চাইতে ভারী- যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র তিমিরবরণ সিংহ, বহরমপুর জেলে পুলিশের গুলিতে তার হত্যা হয়ে যাওয়ার খবরও পেয়েছিলাম বাবার হত্যাকাণ্ডের বছরে।’

‘আর সাঁওতালরা গান বানচিল :

সিদাক ডারে সিধু হো

মায়ামাতে দোম নুমেন হো?

সিদাক ডারে কানু হো

হুল হুলেম মেমেন?

জাত ভাইকো লাগিত

মায়ামতে ডো নুমেন

পেয়ারিয়া কোমব্রো হায়রে

দিসম ডোকো হুয়ি।…

যার মানে করলে হইব :

সিধু তুমি ভাস কেন রক্ত গঙ্গায়?

কানু তুমি কান্দ কেন হে?

রুখে দাঁড়াও বিদ্রোহ কর

ভাইয়ের জন্যে ভাসি আমরা রক্তগঙ্গায়

বাণিজ্যের চোরেরা লুটে নিচ্ছে

জমিজিরেত সব।

‘তারও বেশ কিছু পরে লেখা হয়েছিল নকশালবাড়ি লাগোয়া রাঙালি গ্রামের ভূমিহীন কৃষক রুহিতন কুরমির স্বপ্নজাল বোনার কাহিনি। এক স্বপ্নের জগৎ গড়ে তুলতে চেয়েছিল রুহিতন তার জীবনের সবকিছু পণ রেখে। শুরু হয়েছিল মুক্ত অঞ্চল গড়ার, শ্রেণিশত্রু খতম করার, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার লড়াই। কিন্তু  তারপর কী হয়ে যায়! কোথায় ঘনায় মেঘ, কোথায় বরষায়; আর জীবনের রঙিন কাপড়খানি যায় সপসপিয়ে ভিজে! জীবন বোধ করি এমনই- ওই বই এক আপাতব্যর্থ মহান সংগ্রামীর বিফল স্বপ্নের হৃদয়বিদারক গল্প। বাবার মতো কেউ একজন এর নায়ক।’

‘কিন্তু একটা কতা তুমি অভিমন্যু আমারে কও- তোমার মায় তো রাজনীতি করা মানুষ আছিলেন। তিনি ক্যান্ এত বড় হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করলেন না?’

‘এ ব্যাপারটা আমি ঠিক বলতে পারব না। হয়ত তিনি তার সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবেছিলেন। ’৭২-এর ভেতরই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কারণে নকশাল আন্দোলন স্তিমিত হয়ে এসেছিল। মতদ্বৈততা সৃষ্টি হয়েছিল। বাবার রাজনৈতিক কৌশলের তীব্র সমালোচনা হচ্ছিল। দল ভেঙে টুকরো হয়ে গিয়েছিল। অনেক উপদল গড়ে ওঠে। তার মৃত্যুর পর তো দ্বন্দ¦-সংঘাতও বেড়ে যায়। এসব ব্যাপারে খুব দুঃখ পান মা। তিনি কোন দিকে যাবেন তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যান। এসব কারণেই সম্ভবত তিনি নীরব হয়ে যান।’…

অভিমন্যু এ কথার পর স্তব্ধ হয়ে থাকে। আমি জিজ্ঞেস করার মতো আর কোনো কথা খুঁজে পাই না। ওই স্তব্ধতা আমাকে এত বিপন্ন করে তোলে যে, মনে মনে ভাবি এ বাড়িতে দু’জন নারী- কিন্তু একটা বাচ্চা নেই যে, তারা কান্না করে এই স্তব্ধতাকে চুরমার করে দেবে। তখন অনেক আগে পড়া কবি মনিভূষণ ভট্টাচার্যের লেখা ক’টা লাইন মনে পড়ে যায় : ভোজন কক্ষের দীপাবলি একে একে নিভে যাবার পর, বহুকাল পরে আমাদের হৃদপিণ্ড এবং ফুসফুস ছিদ্র্র করে জেগে উঠেছিল একটি অগ্নিঅক্ষর উৎকীর্ণ ঝলসিত ইস্পাতফলক- স্বপ্ন এবং স্বপ্নদর্শীকে একসঙ্গে হত্যা করা যায় না।…

দিলওয়ার হাসান : কথাসাহিত্যিক

#

সচিত্রকরণ : কাব্য করিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares