গল্প : একটি মানিব্যাগ : ওমর কায়সার

ওমর কায়সার ।।

বটতলী রেল স্টেশন। কারও যাত্রা শেষ। কারও শুরু। কেউ যাচ্ছে, কেউ আসছে। কেউ উঠছে, কেউ নামছে। চারদিকে কোলাহল। কারও কথা শুনবার, কারও দিকে তাকাবার বিরাম নেই কোনো মানুষের। এত মানুষের ভিড়ের মধ্যে একটা মানিব্যাগ হারিয়ে ফেলল একটা লোক। কীভাবে তাকে চিহ্নিত করবে ইমন। মানিব্যাগ-ভর্তি কিছু টাকা। একটি ভিসা কার্ড, একটা ছবি। কার পকেট থেকে পড়ল?  উনি কি চট্টগ্রাম শহরে এসেছেন নাকি চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে গেলেন।  কিন্তু এতসব ভাবার কি কারও অবসর আছে? ইমনও কেন ভাবছে? কার মানিব্যাগ পড়ে গেল, কে চট্টগ্রাম এলো কিংবা গেল তাতে তার কী আসে যায়? একটা মানুষ ব্যাগ হারিয়ে সাময়িক হয়তো ক’দিন কষ্ট পাবে। তাতে কী হয়েছে? ধরি, পুরো দেশের সব মানুষ কষ্টে আছে, তাতেও ইমনের কী? এমনকি পুরো পৃথিবীটাই যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাতে তো তার কিছু যায় আসে না। কারণ সেই নিজেই তো আর এই পৃথিবীতে থাকছে না। সে তো এই স্টেশনে এসেছে আর না থাকার  জন্যই। মানুষ এখানে আসে কোথাও যেতে। ইমনও যাবে অসীম শূন্যতায়। আজ সে স্টেশনে এসেছে এক অশেষ যাত্রায়। একপথের যাত্রার টিকিট নিয়েছে সে। এই কোলাহলমুখর স্টেশন, এই জন্মের শহর, এই সবুজ গ্রহ ছেড়ে সে অনন্ত নক্ষত্রবীথির দেশে পাড়ি দেবে। অন্ধকার রাতে সমুদ্রসৈকত হঠাৎ পর্যটকশূন্য হয়ে পড়লে শূন্য বেলাভূমিতে যেরকম ঢেউগুলো আকুল হয়ে আছড়ে পড়ে সে-রকম কোনো আহাজারি কিংবা বাতাসে কারও দীর্ঘশ্বাস ঘুরে বেড়াবে না তার জন্য, সে জানে। আর তাই আপাতত তার কোনো পিছুটান নেই। স্টেশনের কোলাহলকে সাক্ষী রেখে ঝুপ করে ট্রেনের তলায় নিজের মাথাটা ঢুকিয়ে দেবে, তারপর মুহূর্তে সব শেষ, সব লেনদেন, সব বন্ধন, সব ইতিহাস ‘নেই’ করে দেবে সে।

 পরদিন পত্রিকায় একটা ছোট খবর  উঠবে- ট্রেনের নিচে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা। ইমনের লাশ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে ডাক্তাররা ব্যবচ্ছেদ করবে। মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করবে। কিন্তু কেউ কিছুর সন্ধান পাবে না। ইমন তার আত্মহননের কারণ কাউকে জানিয়ে দিতে চায় না। গোয়েন্দা অনুসন্ধানে কারও নাম উঠে আসুক সেটা ইমন চায় না, আত্মহত্যার প্ররোচনার দোষে কেউ দোষী হয়ে কারাগারে মানবেতর জীবন যাপন করুক সেটা সে চায় না। অন্তত তার আত্মহত্যার জন্য ইভার কোনো ভোগান্তি সে চায় না। ক’দিন আগে পত্রিকায় একটা খবর উঠেছিল, চট্টগ্রামে এক যুবক আত্মহত্যা করেছে। তার আগে লোকটি জগতের সকল মানুষের কাছে বউয়ের বিরুদ্ধে নালিশ করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আত্মহত্যা করে লোকটি করুণা আদায় করেছে। আর বউকে মানুষ ছি ছি করল। পুলিশ তার বউকে গ্রেফতার করেছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বুঝেশুনে আত্মহত্যা করেছে। তার জন্য আরেকজনের জীবনে নেমে এলো বিপর্যয়।

ইমন এমনটি চায় না, তার মৃত্যুর পর জটিল জালে আটকা পড়ে জীবনটা কারও তছনছ  হয়ে যাক সেটা সে চায় না। সে শুধু চায় মৃত্যুর পর ইভা তার মনের প্রকৃত অবস্থান বুঝতে পারুক। তাতেই তার আত্মা শান্তি পাবে। ইভা তার আত্মহত্যার প্ররোচনাদায়িনী নয়, সে নিজেই সব দায় মিটিয়ে নিতে স্টেশনে এসেছে।  পৃথিবীতে প্রতিদিন নানা অপঘাতে কত প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। সেও না হয় হারিয়ে যাবে। এই তো সেদিন ঢাকার গুলশানে আগুনে পুড়ে মারা গেল ২৫ জন মানুষ। মানুষের মৃত্যু আসলে এক একটি সংবাদ ছাড়া আর কিছু নয়। একদিন পরেই সে সংবাদ বাসি হয়ে যায়। কালো কালো অক্ষরে লেখা তার আত্মহননটাও দিনের আরেকটা সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাবে। ঘর থেকে একপ্রকার বের করে দেওয়ার সময় মামুনও প্রায় একই কথা বলছিল। বলেছিল চিন্তা করিস না, একটা নতুন চাকরি তুই জুটিয়ে নিতে পারবি। আরও অনেক ইভা তুই পেয়ে যাবি। মানুষ তো ভুলোমন। সবকিছু ভুলে যায়। কিন্তু আমি মানুষ নই। আমি ভুলতে পারব না তোর এসব কর্মকাণ্ড। আমি আর তো সঙ্গে থাকতে পারব না। হয় তুই এই ঘর ছেড়ে চলে যা। নয়তো আমি চলে যাই। 

মামুনের এ রকম নিষ্ঠুর আচরণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু সবসময় মনে হতো নিষ্ঠুরতা আসলে তার আবরণ। তার কথাবার্তায়, আচার-ব্যবহারে তাকে মনে হয় স্বার্থান্ধ, গোঁয়ার, একরোখা-কাঠখোট্টা।  জীবনে নিজের স্বার্থটা ছাড়া অন্য কিছুর তোয়াক্কা করে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার ভেতরে যেন একটা ঝরনাধারা করুণার মতো বয়ে চলে নিরন্তর। মনে পড়ে, দু-এক বছর আগে সামান্য কিছু পাওনা টাকার জন্য ইচ্ছেমতো গালিগালাজ করে অপমান করেছে। অথচ পরের দিন তার পকেটে টাকা গুঁজে দিয়ে বলেছিল, আমি জানি তোর টাকা নেই। আজ তোর মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। বাড়ি গিয়ে মায়ের কবর জিয়ারত করে আয়। সে-বার বাড়ি গিয়ে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধু মামুনের বৈপরীত্যের কথাই  ভাবছিল। সেদিন অন্য কোনো ব্যাপার হলে মামুনের কাছ থেকে টাকাগুলো নিত না। কিন্তু মায়ের কথা বলাতে, তার ভেতরে মান-অপমানবোধ আর কাজ করেনি। ইমনের দুনিয়ায় মা-ই ছিল একমাত্র অবলম্বন। মাত্র দু’বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা মারা যায়। ছেলেটাকে বুকে আগলে রেখে কঠিন জীবন সংগ্রামে নেমে পড়েছিল তার মা। সন্তানের দিকে তাকিয়ে নিজের দিকে ফিরে তাকায়নি। সেই ছেলে বড় হয়েছে। এবার সংসারের হাল ধরবে। মায়ের আশা। সেই আশাটাও পূরণ হলো না। একদিন ঘুম থেকে আর জাগলো না মা। মামুন তার জীবনের সব ইতিবৃত্ত জানে। এমনকি তার মায়ের মৃত্যুদিবসের কথাটাও মনে রেখেছে। সেই মামুন তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। মামুন এরকমই মানুষ। দয়া আর নিষ্ঠুরতা দুটোই সমান্তরাল রেখার মতো তার ভেতরে বয়ে গেছে। একসঙ্গে মিতব্যয়ী, অন্যদিকে বেহিসাবি। দু’জনে মিলে চিলেকোঠার একটি ঘর ভাড়া নিয়েছে দশ হাজার টাকায়। প্রতি মাসের এক তারিখে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া চাই। মাস শেষ হওয়ার তিন দিন আগে থেকে তার তাগাদা শুরু হয়। বাড়িওয়ালার চাইতে সে নিজে বেশি তৎপর। মামুন একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। আর ইমনের চাকরি নেই। একটা চাকরি তোর নিশ্চয় হয়ে যাবে- এরকম নিশ্চয়তা সে সবসময় পেত। কিন্তু চাকরিটা হতো না। ‘চাকরি হয়ে যাবে চিন্তা করো না’- এই জাতীয় সান্ত্বনা বাক্য শুনে তার খুব রাগ হতো। কোনো কিছুই ভালো লাগত না। মাসের শেষে মামুন যখন বেতনের টাকা নিয়ে ঘরভাড়া, বিদ্যুতের বিল এসবের হিসাব করে এক এক করে পরিশোধ করত, তখন তার ইচ্ছে হতো সব এলোমেলো করে দিয়ে চলে যায় কোথাও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেকার ইমনের ঘর ভাড়ার টাকাও মামুনকে দিতে হতো। এ রকম একতরফা সবকিছুর খরচ চালাতে গিয়ে মামুন নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই নিজেই সে চেষ্টা তদবির করে বন্ধুর জন্য তিনটি টিউশনি জোগাড় করে দেয়। অনন্যোপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত ওটাতেই মন দিয়েছিল।  কিন্তু এই মনোনিবেশ বেশি দিন টেকেনি। মনটা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে অর্ধেক টিউশনিতে, বাকি অর্ধেক ছাত্রীর প্রতি ঝুঁকে পড়ল। বাঙালি চরিত্রের যেন এটি এক অনিবার্য পরিণতি।

গৃহশিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রীর  মনের আদান-প্রদানের এই বহুল পরিচিত, চেনা কাহিনির বিস্তৃতি অবশ্যি তেমন দীর্ঘ নয়।  এর উত্থানপর্ব ও সমাপনী পর্ব সংক্ষিপ্ত। ছাত্রী হিসেবে ইভা যেমন মেধাবী, তেমনি প্রেমিকা হিসেবে চালাক, বুদ্ধিমতী, বাস্তববোধসম্পন্ন। সে জানে চাল নেই,  চুলো নেই, এরকম একজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি তার ব্যবসায়ী অহংকারী বাবা মেনে নেবেন না। নাটক, সিনেমা, উপন্যাসের নায়িকার মতো ইভা নায়কের হাত ধরে পালিয়ে যেতেও পারবে না। তাই সে নিজেই তাগাদা দেয়, ইমনকে প্রেরণা দেয়, বোঝায়, যেভাবেই হোক তাকে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে হবে। ইভা বোঝে একটা কঠিন অমসৃণ পথে সে পা দিয়েছে। নানা শঙ্কা, আতঙ্ক আর ভয়ের মধ্যেও সে ইমন স্যারের ঘোরের ভেতর থাকে।

একটা মোহাচ্ছন্ন সময় দু’জনে পার করছে। এ রকম একটা ঘোরের ভেতর ইভার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ। ইমনের টিউশনিও শেষ। কিন্তু তাদের সম্পর্কের শেষ হলো না। পড়ার ঘরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে সেটি ছড়িয়ে পড়ল নগরের বিভিন্ন পার্ক, রেস্তোরাঁয়। এই আপাত ভবঘুরে প্রেমের অবসান ঘটাতে ইভা নিজেই একটা সাহসী উদ্যোগ নিয়েছে। বাবার কাছেই গিয়ে অনুরোধ করল ইমন স্যারের জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে। মেয়ের প্রস্তাব শুনে বাবা প্রথমে একটু ইতস্তত করেছেন, কিন্তু ইভা এমনভাবে বলেছে, যাতে বাবার মনে কোনো ধরনের সন্দেহ না জাগে। বেচারি স্যারের চাকরি নেই, এখন টিউশনিও বন্ধ। মাস্টার্স পাস করে এখন বেকার। একটা চাকরি বাবাকে দিতেই হবে। মেয়ের অনুরোধ বাবা রক্ষা করেছেন। কয়েক মাসের মধ্যেই ইমনের চাকরি হয়েছে তাদেরই প্রতিষ্ঠানে।

ইমনের চাকরি, আর ইভার বিশ্ববিদ্যালয়।  দু’জনের জীবনের নতুন পর্ব। নতুন আনন্দ। আর এই আনন্দে বিভোর হয়ে তারা ভুলে গেছে স্থান কাল-পাত্রের কথা। কখনও সব কিছু ভুলে বাবার কর্মস্থলে গিয়েছে ইমনকে দেখতে। কখনও চাকরির অবসরে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেছে ইমন। কখনও সারারাত জেগে থেকেছে মুঠোফোনের আলাপচারিতায়।

এই অন্ধ উদ্বেল দিনগুলোর পরিণতিও খুব গতানুগতিক। এই প্রেম কাহিনিতে একটা প্রতিকূল বাঁক তৈরি হয়। তাদের ঘনিষ্ঠ চলাচল বাবার নজর এড়ায় না। তিনি অবশ্যি অন্য সব বাবার মতো রেগে যাননি। খুব শান্ত মাথায় একদিন তার কোম্পানির নতুন মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ ইমনকে নিজের রুমে ডেকে বললেন, ‘স্টেডিয়ামে ঢোকার মুখে রাস্তার মোড়ে ‘আড্ডা’ নামে একটা চায়ের দোকান আছে। ওখানকার মালাই চা দারুন। তুমি অফিস থেকে ফ্লাস্ক নিয়ে আমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আসো।’

এক কাপ চা আনতে হবে ইমনকে। একটু বিভ্রান্তি এলো মনে। এটা কি আদেশ নাকি আবদার? অফিসের বস তো নন তিনি শুধু। ইভার বাবাও। তার জন্য এক কাপ চা এনে দিলে ক্ষতি কি? তাই দেরি করেনি। ৪৫ মিনিটে চা এনে হাজির হয়েছিল তার সামনে। 

‘বাহ! এ কাজটা তো তুমি ভালোই পারো’- চা আনার পর তিনি বলেছিলেন। তুমি যে কাজে এখন আছ, সেটার যোগ্য তুমি নও। তোমাকে দিয়ে কোম্পানির ক্ষতি হবে। মাস শেষে হতে আর ১০ দিন বাকি। এ ক’দিন তুমি আমার চা আনার কাজটিই করবে।

ইমন বুঝে গেছে চাকরিটা গেল। কিন্তু অপমানটা সহ্য করতে তার কষ্ট হয়েছে। অফিস থেকে বের হওয়ার সময় পা দুটো খুব ভারী লাগছিল। তাৎক্ষণিক সে সিদ্ধান্ত নিলÑ বাকি দশ দিন সে আর অফিসে যাবে না। বেতনের টাকা দিক না দিক আর অফিসে যাওয়া ঠিক হবে না। বের হয়েই ফোন করল ইভাকে। ফোনটা বন্ধ। বোঝা গেল, কঠিন অবস্থায় শুধু সে নয়, ইভাও পড়েছে। বাংলা প্রেমের নিয়তি নির্ধারিত এ রকম একটা পর্ব যে আসবে সেটা সে জানে। নিজেকে আপাতত চলচ্চিত্রের নায়কের মতো মনে হলেও চা আনার ব্যাপারটি তাকে পুড়িয়ে মারছে। ক্ষোভ, অসহায়ত্ব, অনিশ্চয়তা নিয়ে রাতে ঘরে ঢুকল। আর ঘরে ঢুকতেই এই গল্পের কাহিনি নতুন দিকে মোড় নিল। তার রুমমেট, বন্ধু মামুন অফিস থেকে ফিরেছে আগেভাগে। অপেক্ষা করছে ইমনের জন্য। ইমন ঢুকতেই তার ওপর চড়াও হলো। কিল-ঘুষি তো চলছেই, তার ওপর অশ্রবণযোগ্যও গালিগালাজও। শেষ পর্যন্ত তুই এত নিচে নামলি?  শালা যেই পাতে ভাত পাবি, সেই পাতে পেচ্ছাব করে দিলি। এতক্ষণে ইমন বুঝতে পারে এই অতর্কিত আক্রমণের কারণ। এ রকম আরও অনেক আঘাত, প্রতিবাদ আসবে ইমন জানে। তার জন্য সে প্রস্তুত। তাই সে মামুনকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে- তোর কাছে তো আমি কখনও কিছু গোপন করিনি। শুধুই তো ভালোবেসেছি। কোনো তো অপরাধ করিনি।

সেটাই তো আমি জানতাম। ছাত্রী পড়াতে গিয়ে ছাত্রীর প্রেমে পড়েছিস শালা। এটাও আমি তোর কাছ থেকে আশা করিনি। মনে করতাম তুই একটু আলাদা। সাধারণ মানুষ যা যা ভুল করে তুই তা করবি না। মনে করেছিলাম, দায়িত্বজ্ঞান বলতে তোর কিছু আছে। আর সেই জন্যই তোকে টিউশনিটা দিয়েছি। আর তুই পড়াতে পড়াতে মেয়েটাকে পটিয়ে ফেললি। সেটা মানলাম। ওর বাবার প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিলি। সেটাও মানলাম। আর চাকরি নিয়ে কী করলি? অফিসের মেয়ে কলিগের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করলি। ছি ছি ইমন। ঘেন্না হচ্ছে আমার। নেহাৎ একই গ্রামের লোক বলে তিনি আমার অনুরোধে তোকে টিউশনিটা দিয়েছিলেন। আজ তুই আমাকে আর ইভাকে ছোট করলি। আমি কীভাবে মুখ দেখাব তাকে।

কোথাও একটা বড় গণ্ডগোল কিংবা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। ছাত্রীর প্রেমে পড়া, চাকরি নেওয়া সব ঠিক আছে। কিন্তু অফিসে কারও সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি? এর মানে কী? এটা আবার কী অভিযোগ? কে বলেছে তোকে, কার কাছে শুনেছিস? জোর গলায় একটু রেগে গিয়ে জানতে চায় ইমন।

মামুন আরও জোর দিয়ে বলে, তবে তুই কী মনে করেছিস? তোর নষ্টামির কথা কেউ বুঝবে না? চোরের দশদিন, গৃহস্থের একদিন। তুই বন্ধুত্বের সব যোগ্যতা হারিয়েছিস। তোর সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই।

মামুনের কথাগুলো আর কথার পর্যায়ে নেই।  প্রত্যেকটা শব্দ এক একটা ময়লা জুতোর মতো বিরামহীনভাবে ইমনের মুখে এসে পড়ছে। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে তার। ক্ষোভে ফেটে পড়তে চাইছে মন। কিন্তু সে জানে এই ঝড় তাকে মোকাবেলা করতে হবে ঠান্ডা মাথায়। তাই সে শান্ত হয়ে বলল, দেখ মামুন, আমি তোর কাছে কখনও কিছু চাইনি, কখনও হাত পাততে হয়নি তোর কাছে। তুই নিজেই আমাকে উদ্ধার করেছিস নানা সময়ে। আমার বিপদে, দুঃসময়ে কাছে এসেছিস। তুই আমার বন্ধু, কিন্তু কাজ করেছিস পিতার মতো, ভাইয়ের মতো। আমি তোর কাছে ঋণী। আমি ভুল করেছি। ছাত্রীর প্রেমে পড়েছি। এটাতো আমি তোকে বলেছি। তখন আপত্তি করলেও জোর প্রতিবাদ কখনও করিসনি। আজ কেন তুই এই বিষয়টা নিয়ে এমন রেগে গেলি?

ইমন যতই শান্ত হচ্ছে, মামুন ততই উত্তেজিত- দেখ ইমন, তুই এমন ভাব করছিস যেন কিছুই বুঝতে পারছিস না। আজ তোর ছাত্রী, তোর প্রেমিকা, তোর চাকরিদাতা আমাকে ফোন করেছে। বলেছে তুই অফিসের টেলিফোন অপারেটরকে সবসময় উত্ত্যক্ত করিস, তাকে হয়রানি করিস। তার জন্য তোকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে ওর বাবা। 

তুই কি বিশ্বাস করেছিস এসব কথা?

আমার বিশ্বাস অবিশ্বাস দিয়ে কী হবে। যে মেয়েটি তোর জন্য এত কিছু করল, তার তো বিশ্বাস হারালি। ভাই শোন। এখন তোর ব্যাপার নিয়ে তুই থাক, আমার সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলবি না। আমি আর তোর সঙ্গে থাকব না। হয় এখানে তুই থাকবি, নয় আমি থাকব।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় অস্ত্রের নাম ‘কথা’। মামুন তাকে সেই অস্ত্রে আঘাত হেনেছে। এমন আঘাত! যে আঘাতে তার জীবনীশক্তি যেন ফুরিয়ে গেছে। বেঁচে থাকার বিন্দুমাত্র আশা সে হারিয়ে ফেলেছে। যেন সে দৃষ্টিশক্তিই হারিয়ে ফেলেছে। চোখে কিছুই দেখছিল না। ঘর থেকে বেরিয়ে ইভার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছে বহুবার। কিন্তু কাজ হয়নি। ফোন বন্ধ। একবার মনে হয়েছিল তাদের বাসায় যাবে। কিন্তু হঠাৎ মনে প্রশ্ন এলোÑ মামুনের কাছে এত বড় অভিযোগ করল ইভা, একবার যাচাই করল না। তাকে একবার ফোন করে জানতে চাইতে পারত। মামুনকে ফোন করতে পেরেছে, অথচ তাকে ফোন করল না।

হঠাৎ চাকরি চলে গেল, ইভার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল, বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ হলো। এই মুহূর্তে স্টেশন ছাড়া অন্য কোনো গন্তব্য পেল না ইমন। সমস্ত অভিযোগের জবাব সে চিরকালের জন্য দেবে। আর বেশি দেরি নয়, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সকল কিছুর অবসান হবে।

তবে এই অনন্ত যাত্রাপথে এখন ছোট্ট একটি বাধা। একটি মানিব্যাগ। হঠাৎ তার সামনে এসে পড়ল। কার মানিব্যাগ এটি? কে ফেলে গেল? লোকটা কি চট্টগ্রাম থেকে যাচ্ছে? নাকি এলো? জীবনের অন্তিম সময়ে এসে একটা ছোট মানিব্যাগ কি কোনো ব্যাপার? এটা নিয়ে কেন এত মাথা ঘামাতে হবে? স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পেয়েছে, সেখানেই পড়ে থাক। সে যদি না আসত, তাহলে অন্য কেউ পেত। এখনও পাবে। এই ভেবে ছুড়ে মারতে উদ্যত হয়। আবার থামে। মনে মনে ভাবে একটা মানুষ মানিব্যাগ হারিয়েছে। এতগুলো টাকা। এগুলো যদি তার বেতনের টাকা হয়। যদি তার সংসার না চলে। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে যদি একটা মানুষের অন্তত উপকার করতে পারি যদি তবে তো শান্তি পাব। মনে মনে ভাবে ইমন। তাহলে কোথায় পাবে সে মানিব্যাগের মালিককে। স্টেশন মাস্টারকে দিয়ে আসবে? না, লোকটা যদি প্রকৃত মালিককে ফেরত না দেয়, তবে দায়টা তার কাঁধেই এসে পড়বে যেন। মানিব্যাগটি খুলে দেখে সে। কোথাও কোনো ফোন নম্বর পাওয়া যায় কিনা। কোনো ভিজিটিং কার্ড? পকেটগুলো খুঁজে দেখে। পাওয়া গেল দশ-বারোটি ভিজিটিং কার্ড। কিন্তু কোন কার্ডটি মালিকের। মানিব্যাগের টাকাগুলো গুনে দেখল। এক হাজার টাকার নোট পাঁচটা। পাঁচশ’ টাকার নোটও আছে দশটা। একশ’ টাকার নোটও আছে দশ-বারোটা। মোটামুটি অনেক টাকা। একটা ভিসা কার্ডও আছে। কার্ডটিতে নিশ্চয় নাম থাকবে মালিকের। বাংলাদেশের একটা নাম করা বেসরকারি ব্যাংকের মোড়ক। মোড়ক থেকে বের করল কার্ডটি। নাম পড়ার চেষ্টা করল। একবার পড়ল। ধক করে উঠল বুকটা। দু’বার পড়ল। বিশ্বাস হচ্ছে না। আবার পড়ে। হুম স্পষ্ট লেখা ইংরেজিতেÑ মামুন হোসাইন। এটা তাহলে মামুনের মানিব্যাগ। এখানে কীভাবে এলো? সে কোথায়? পৃথিবীতে মামুন হোসাইন কি শুধু একজন? তার বন্ধু ছাড়া অন্য কোনো বন্ধু থাকতে পারে না? কী করা যায় এখন? কিছুক্ষণ চুপ থেকে মানিব্যাগটা পকেটে পুরে মোবাইলটা অন করল ইমন। তারপর কল করল মামুনের নাম্বারে। ওপাশ থেকে কথা ভেসে এলো। শান্ত। স্থির। হুম। মানিব্যাগটা আমার। চলে আয়। আমি স্টেশনের বাইরে তোর জন্য অপেক্ষা করছি। আমি তো তোকে জানি। একটা মানিব্যাগ পড়ে থাকবে নিচে কোনো মানুষের। আর সেটা দেখে তুই ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়বি, এমন ছেলে তুই না। আয়। তাড়াতাড়ি আয়। আমার খুব খিদে পেয়েছে।

ওমর কায়সার : গল্পকার

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares