গল্প : উপড়ে পড়া বটগাছ : স্বদেশ রায়

স্বদেশ রায় ।।

দশ বছর পরে নিজ এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের রিপোর্ট করতে যাচ্ছে তরুণ রিপোর্টার জোয়ার। সারা রাত ট্রেনের দুলুনিতে তার যত না ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেছে, তারচেয়ে বেশি ঘটেছে একটি উত্তেজনায়। কেমন দেখবে সে তার এলাকাকে। সেখানে কোথাও কি খুঁজে পাবে তাঁর কৈশোর, খুঁজে পাবে লতার মতো বেড়ে ওঠা এক হ্যাংলা কিশোরের উচ্ছ্বাস। আরও অনেক চিন্তা, অনেক ভালোলাগা তার মনকে নাড়া দেয়। মনে মনে এও ভাবে এতই যদি নিজের অতীতকে খুঁজি, মনে করি, তাহলে রিপোর্টিং করব কীভাবে? এসব ভাবতে ভাবতে একদিকে যেমন ভোর হয়ে যায়, অন্যদিকে ভোরের একটা আধফোটা আলো এসে লাগে ট্রেনের জানালার শার্সিতে। শুধু তা নয়, ট্রেনটা পৌঁছেও গেছে জোয়ারের নিজ শহরে।

ট্রেন স্টেশন থেকে নেমে জোয়ার মনে করেছিল সোজা কোনো একটা হোটেলে গিয়ে উঠবে, তারপর ফ্রেশ হয়ে তবে নদী পার হওয়া। কিন্তু স্টেশনে নামতেই তার সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। স্টেশনের বিশাল বটগাছটিকে শিকড় সমেত ওভাবে উল্টে পড়ে থাকতে দেখে অনেকটা নিশ্চল পাথরের মতো হয়ে যায় জোয়ার। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ধীরে ধীরে মূল উপড়ে পড়ে থাকা বটগাছটার দিকে এগিয়ে যায়। গাছের অনেক কাছে চলে যায় জোয়ার। একজন রিপোর্টার হিসেবে তার প্রথম দায়িত্ব ছিল একের পর এক অনেকগুলো অ্যাঙ্গেল থেকে বটগাছটির ছবি নেওয়া। তার বদলে অনেক ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বটগাছটির মূলের কয়েকটি শিকড় স্পর্শ করে জোয়ার। তাকিয়ে দেখতে থাকে গাছটির সারা শরীর।

জোয়ারের মনে পড়ে তার বাবার কথা। এই বটগাছটির সঙ্গে তার বাবার কোনো স্মৃতি নয়, বরং গাছটির সঙ্গে তার বাবার একটা মিল খুঁজে পায় জোয়ার। তার মনে পড়ে বাবাও এমন বিশাল ছিলেন। তারপরে কোনো ঝড় নয়, একদিন এমনি উপড়ে পড়ে গেলেন। মনে হলো সংসার থেকে সকল শেকড় তুলে নিয়ে তিনি চলে গেলেন। তার মনে হয় স্টেশনের বটগাছটি কি কারও বাবা ছিল?

গাছটিকে নিয়ে অনেক স্মৃতি মনে করতে পারে জোয়ার। এমনকি একটি প্রেমের গল্পও লিখতে পারে। কারণ সে আর ছায়া চক্রবর্তী দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছে এই বটগাছ তলায়। ছায়া তার বন্ধুর বোন। সে কী যেন বলতে চাইতো তাকে। জোয়ারও যে একেবারে বুঝত না তা নয়। তার পরেও যেসব ছেলে ছুটে চলার জন্য জন্ম নেয়, আর যাই হোক ছায়া চক্রবর্তীরা তাদের বাঁধতে পারে না। আজ হঠাৎই ছায়া চক্রবর্তীর সঙ্গে বটগাছের একটা মিল খুঁজে পায়। বটগাছটি যেমন এক জায়গায় স্থির হয়ে ছিল সারাটা জীবন। ছায়া চক্রবর্তীর চোখ কেমন যেন তাকে ঘিরে একটা স্থিরতা চাইত। অথচ যার জন্ম পাহাড়ে। জন্মেছে সে সাগরের দিকে ছুটে চলার জন্যÑ তার কি পাহড়ের গায়ে একটি স্থির পাথর হয়ে বসে থাকা সাজে?  তাই হয়তো ছায়া চক্রবর্তীর যে আঙুলগুলো মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠত, তা দেখতে পেলেও সে কোনো দিন ওই আঙুলের হাতটিকে চেপে ধরেনি। বরং আজ স্টেশনের বটগাছটিকে উপড়ে পড়ে থাকতে দেখে তার একবার মনে হয়, ছায়া চক্রবর্তী এতদিনে নিশ্চয়ই কোনো সংসারে একটি বটগাছ হয়ে গেছে।

এবার বটগাছটির কয়েকটি ছবি নেয় জোয়ার। মনে মনে ভাবে শতবর্ষী এই বটগাছটিকে নিয়ে তাকে একটা আলাদা স্টোরি লিখতে হবে। সেখানে এই গাছের সঙ্গে এই ভূগোলের ইতিহাস বদলের অনেক কাহিনি সে যোগ করতে পারবে। ইতিহাসের ছাত্র না হলেও শত শত বছরের ইতিহাস পড়েছে সে। তাই  সে জানে এই ট্রেন স্টেশনটি কত কত ইতিহাসের টানাপোড়েনের সাক্ষী। ইতিহাসের ওই সব দুঃখের অংশের সঙ্গে বটগাছটিকে মিলিয়ে দিলে পাঠক হয়তো ভালোভাবেই পড়বে তার স্টোরিটি। তবে আবার তার হাসি পায় এই ভেবে, হায় রে মানুষের মন। ওই পাঠকের কাছে অনেক ছায়া চক্রবর্তী বা শাহিদার কথা, সাইফুলের কথা যখন বটগাছটি ঘিরে তুলে ধরা হবে, তখন সেটা আর ফিচার থাকবে না, হয়ে যাবে গল্প। মানুষের মনের এই দ্বন্দ্ব নিয়ে বড়ই অদ্ভুত লাগে জোয়ারের। মনের কথা লিখলে সত্য ঘটনাও হয়ে যাবে, গল্প আর প্রতিদিনের জীবনের কথা লিখলে হবে সংবাদ। মন কি তাহলে আদৌ সত্য নয় মানুষের কাছে। জোয়ার মনে মনে ভাবে পৃথিবীর কোন প্রান্তে এসে মন মানুষের কাছে বেশি সত্য হবে। মন যেদিন মানুষের কাছে বেশি সত্য হবে, সেদিন হয়ত রক্ত ক্লেদাক্ত পৃথিবী একটি সুন্দর পথে হাঁটবে। যাক পৃথিবীকে নিয়ে এতটা ভাবনা জোয়ারের মতো একজন রিপোর্টারকে ভাবতে নেই। তাকে খুঁজতে হয় প্রতিদিনের রক্তপাতের ওপরের অংশ।

বটগাছটির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে, ট্রেন থেকে নেমে আসা এক চা-ওয়ালা তার কাছাকাছি আসে। জোয়ার মনে মনে ভাবে তার রিপোর্টিংয়ের থেকে ব্যবসাটা কম নয়। যে ব্যবসা করে তার দৃষ্টিশক্তি রিপোর্টারের থেকে আরও বেশি। তা না হলে এই ক্ষুদ্র চা বিক্রেতা কীভাবে বুঝতে পারল জোয়ারের এখন এক কাপ চা দরকার। চা খেতে খেতে জোয়ারের মনে পড়লÑ আচ্ছা, মল্লিকা তো করোনেশনে পড়ত। সে কি কোনোদিন এই বটগাছ তলায় এসেছিল। মল্লিকার স্বামীর কথা মনে হতেই জোয়ারের মনে হয়, সে যেন কোনো ব্যক্তি নয়, একটি বন্দরের জাহাজ। কোথা থেকে কোন বিদেশ থেকে এসে বন্দরে ভিড়ে পৃথিবীর হাটের দামি মালগুলো ভরে নিয়ে চলে গেল। মল্লিকার বিয়ের পরে তার সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল জোয়ারের। মনে মনে তার হাসি পেয়েছিল। মল্লিকার এই এক ঢাল কালো চুলের পাশে তার স্বামীর টাক মাথা। পৃথিবীর সঙ্গীতের ইতিহাসের সঙ্গেও দাস ব্যবসার যদি যোগ থাকে, তাহলে মল্লিকার চুলের সঙ্গে তার স্বামীর টাক মাথা থাকার দোষ কী! এই ভেবে আরেকবার হেসেছিল জোয়ার। আজ এই বটগাছটির তলায় দাঁড়িয়ে জোয়ারের মনে হয়, আচ্ছা কেন সে মল্লিকার বিয়ের পরে আর কোনোদিন করোনেশনের পাশ দিয়ে যায়নি! কেন সে অ্যাভয়েড করেছে করোনেশনের পাশের রাস্তাটি! মনের অদ্ভুত সব খেয়াল আজ আবার মনে পড়ে এই উপড়ে যাওয়া বটগাছের পাশে দাঁড়িয়ে। আবার তার চোখ যায় শিকড়ের দিকে। এত বড় বড় শিকড়, এত সহজে উপড়ে গেল- এমন অদ্ভুত সব ঝড়ের খেয়াল। এতকিছু থাকতে বটগাছটির শেকড়ের সঙ্গে তার যত যুদ্ধ হলো!

না আর সময় নষ্ট নয়, এখন তাকে এগোতে হবে। হোটেলে ডেরা পেতে তার পরে বেরিয়ে পড়তে হবে দুর্গত এলাকায়। খুঁজতে হবে কিছু মানুষের লাশ যা জলে পড়ে ফুলে আছে। বেশি ভালো হয় শিশুর মৃতদেহ পেলে, সঙ্গে যদি কোথাও মা থাকে। এই নিষ্ঠুর সব দৃশ্য পত্রিকার পাতায় ছাপতে পারলে, সেগুলোর বর্ণনা ও আদ্যোপান্ত ঘটনা লিখতে পারলে, পাঠক তার রিপোর্ট পড়বে। আসলে পাঠক কি ভাববে একবার এসব মৃত্যু কত স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে! আবার আদৌ কি সব মানুষের স্বপ্ন থাকে! না, প্রতিদিনের নিয়মের ছকে মানুষ এগিয়ে চলে। এই যেমন কোন স্বপ্ন নয়, কেবলই ছকে বাঁধা কাজে জোয়ার তার নিজ শহরে এসেছে। জোয়ার  মনে মনে ভাবে- এই শহর যদি এই ঝড়ে হরপ্পা বা মহেনজোদাড়ো হয়ে যেত তার পরে সে এখানে এসে রিপোর্টিং করতে পারত কি? আচ্ছা ঝড় আর জোয়ারের জল শহরের পাশের গ্রামগুলোর অনেক ক্ষতি করে গেছে হয়তো। অথচ করোনেশন স্কুলটি তেমনই আছে! বিল্ডিংটি আস্ত মাটির তলায় ঢুকে গেলেও তো যেতে পারত। এবার হাসে জোয়ার। লাভ কী তাতে, তার পরেও তো ওই ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে যেতে গেলে জোয়ারের মনে পড়ত : এখানে ওই স্কুলটি ছিল।

কাপের চা শেষ হয়ে গেছে। চা-ওয়ালা কাপ নিয়ে চলে গেছে। স্টেশনের ওপরে এখন সকালের সূর্যের আলো এসে পড়েছে। সূর্যের আলো দেখে জোয়ারের আজ বড় নিষ্ঠুর মনে হয় সেই আলোকে। এত বড় একটা ঘূর্ণিঝড়। দু-পা এগিয়ে শহরে প্রবেশ করলে পাবে তার হাজারটি ছোবলের চিহ্ন। শুধু স্টেশনে নামতে পেল এত বড় বটগাছটির এই দশা। অথচ সূর্যের আলোর কোনো পরিবর্তন নেই। সে প্রতিদিন ঠিক যেমনটি করে আসে, তেমনি এসেছে। আসলে মানুষের দুঃখ, হাসি-কান্না কোনো কিছুতেই সূর্যের আলোর কিছু যায় আসে না। জোয়ার মনে মনে ভাবে সেও তো একধরনের সূর্যের আলো। এই তো বটগাছ উপড়ে গেছে তার ছবি তুলল, এর পরে কত মানুষের জীবন উপড়ে গেছে তার ছবি তুলবে। তারপরে সেসব নিয়ে পাতার পর পাতা লিখে পাঠিয়ে দিয়ে হালকা একটা নভেল বা ক্যাপিটালিজমের মন্দ দিক নিয়ে সোশ্যালিস্টদের গালিগালাজের কোনো বই টেনে নিয়ে বসে যাবে সে হোটেলে। কোনো দাগ কাটবে না সারা দিনে মৃত্যু, ধ্বংস আর স্বপ্নভঙ্গের ওই সব সত্য ঘটনাগুলো।

বটগাছটাকে ছেড়ে যাবার সময় কী যেন মনে করে জোয়ার একবার স্পর্শ করে বটগাছটিকে। কেমন একটা শিহরণ জাগে তার শরীরে। মনে পড়ে অনেক দিন দাঁড়িয়েছে সে বটগাছ তলায় ট্রেনের অপেক্ষায়। আর কোনো কিশোর কোনো দিন এই বটগাছটিকে পাবে না। হয়তো স্টেশন মাস্টার, না হয় বন বিভাগ আবার নতুন করে একটি বটের চারা লাগবে এখানে। তারপরে আরও শতবর্ষের দুয়ারে গেলে একটি কিশোর এই বটগাছ তলায় এসে ভাববেÑ অনেক বয়স এই বটগাছটির। হয়তো-বা সে কিছুই ভাববে না। হয়তো সে ছুটে চলা কোনো কিশোর নয়, সে কোনো শাহিদার বা ছায়া চক্রবর্তীর হাত ধরে স্থিরতা খুঁজবে। আসলে বটগাছটি যে শতবর্ষ ধরে এক স্থানেই ছিল, সে কি স্থির ছিল? না, প্রশ্নের কোনো উত্তর পায় না জোয়ার। বরং সে মনে করার চেষ্টা করে, প্রথম কবে সে এই বটগাছটিকে দেখেছিল?

যতদূর মনে করতে পারে, ছোটবেলায় যতবার সে এই স্টেশন থেকে বাবা বা ভাইদের হাত ধরে গেছে, কোনোদিন স্টেশনের  এই বটগাছটির দিকে তার চোখ পড়েনি। তার চোখ থাকত ট্রেনের দিকে। তার মনে হতো কতকগুলো ড্রয়িংরুম আর বেডরুম নিয়ে যেন একটি চলন্ত বাড়ি ছুটে আসছে স্টেশনে। আর স্টেশনজুড়ে কত  হৈচৈ, কত ফেরিওয়ালা, তাদের কত রকম কণ্ঠ। এই সবই আকৃষ্ট করে রাখত জোয়ারকে। প্রথম বটগাছটি তার যখন চোখে আসে, সে বারই সে স্কুল ছাড়িয়েছে। বর্ষার মেঘভরা এক মধ্য সকালে সে এসে দাঁড়িয়েছিল এই স্টেশনে। মনের ভেতর তারুণ্যের উত্তেজনা। স্কুল ফাইনালে ভালো রেজাল্ট করার পরে সে কলেজে যাচ্ছে। স্টেশনে দাঁড়িয়ে তার বার বার মনে হচ্ছিল রবীন্দ্রনাথ কলেজকে কালেজ লিখতেন। এটুকু মনে করে তার মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় যদি ওমনি করে তাসের ঘরের মতো তার বাবার সংসারটি ভেঙে না পড়ত তাহলে আজ হয়তো তাকে এ কলেজে যেতে হতো না। সে রবীন্দ্রনাথের নায়কদের মতো বিলেতের কোনো কালেজে পড়তে যেত। সেখান থেকে দেশে ফেলে যাওয়া কোনো বাঙালি কিশোরীকে মাঝে মাঝে চিঠি লিখে চমকে দিত। খুব ছোটবেলায় বাবাও তাকে বলেছিল বিলেতের কলেজেই সে পড়বে। আর এ জন্য  তার মিশনারি স্কুলে পড়া। জোর দেওয়া ইংরেজিতে। রবীন্দ্রনাথের নায়কদের মতো, এমনকি রবীন্দ্রনাথের মতো সেও পড়েছে জন ডান একের পর এক। মনে করেছে বিলেতে যাবার আগে ডানকে, কীটসকে, ইয়েটসকে জেনে যেতে হবে। সবকিছু ওলট-পালট করে দিলো বাবার সংসারের চলার পথটি পিচ্ছল হয়ে যাওয়া। আর আজ তাই সে কলেজের উদ্দেশে এই রেলস্টেশনে। এখান থেকে গিয়ে সে উঠবে কলেজ হোস্টেলে।

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে তার চোখটি স্টেশনের কোনার দিকে চলে যায়। আর তার চোখে পড়ে বিশাল এই বটগাছটি। যার তলায় অনেক যাত্রী আছে, আবার চিরস্থায়ী ভিক্ষুকও আছে। প্রথম দিনে ওইটুকু মাত্র দেখা হয়েছিল বটগাছটির সঙ্গে। এর পরে অনেকদিন দুপুরের ফাঁকা ট্রেনে এসে প্রায় নিস্তব্ধ রেলস্টেশনে নেমেছে জোয়ার। তারপরে ধীর পায়ে এগিয়ে গেছে বটগাছটির কাছে। ভিখারি যেমন নিজে বাসা বেঁধেছে তেমনি গাছটি জুড়ে অসংখ্য পাখিও বাসা বেঁধেছে। গাছটা মাঝে মাঝে তাকে আনমনা করে দিত, মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে যেত ইতিহাসের অতলে। কিশোর মন ভাবত, এত বড় গাছ, এই শহরের কত ইতিহাস না সে দেখেছে! এমনি করে আস্তে আস্তে বটগাছটির সঙ্গে একটু একটু করে পরিচয় হয়েছিল তার। তারপরে একদিন সসংকোচে বটগাছটির শরীর স্পর্শ করেছিল সে। সেদিন বটগাছটিকে আরও জীবন্ত মনে হয়েছিল তার। কেমন যেন তার চারপাশের কেউ একজনকে মনে হয়েছিল বটগাছটিকে।

তারপরে কলেজের দুই বছর কতবার এই স্টেশনে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। আর স্টেশন মানেই তো অপেক্ষার স্থান। এই অপেক্ষাকালে বটগাছটির কাছে গেলে সময়গুলো যেন দ্রুত কেটে যেত। তার পরে একদিন এই স্টেশন দিয়েই সে চলে  গিয়েছিল কলেজ শেষ করে। না, সেদিন তার বটগাছটির কথা মনে পড়েনি, মনে পড়েনি ছায়া চক্রবর্তী, শাহিদা রহমান বা রবীন বকসি ও সেলিমের কথা। মনে পড়েনি করোনেশন স্কুলের কথা। এমনকি কলেজটিও তাকে পিছু টানেনি। মানুষের জীবনে মনে হয় মাঝে মাঝে এমন অধ্যায় আসে, যেখানে তার সামনে ছুটে চলা ছাড়া আর কিছু মনে থাকে না। গাছের জীবনেও কি এমন সময় আসে? গাছের ডাল থেকে যে পাখিরা উড়ে যায়, ওদের ডানায় চড়ে কখনও কি গাছ নিজেও উড়ে যায়!

তারপরের এই ছুটে চলা জীবনে আজ আবার ফিরে আসতে হয়েছে এই শহরে। না কোনো সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, কোনো শারদোৎসব তাকে এখানে টেনে আনেনি। আজ তার কণ্ঠে কোনো গান নেই। আর একটু পরেই সে যাবে মানুষের মৃত্যুর চিত্রগুলো তুলে আনতে। নিপুণ শিল্পীর মতো তার মানুষের মৃত্যুগুলো তুলে আনতে হবে। আর সেই পথে পা বাড়াতে ভোরের অস্ফুট আলোয় সে দেখতে পেল, এই শহরের দুয়ারে তার প্রথম আপনজন, তার স্পর্শ যার সঙ্গে লেগেছিল সেই শতবর্ষী বটগাছটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে শিকড় উপড়ে পড়ে আছে। তার এমন কোনো তলা নেই যেখানে কোনো ভিখারি বসতে পারে।

স্বদেশ রায় : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক  

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares