গল্প : বনানী : মোহীত উল আলম

মোহীত উল আলম ।।

গাড়ি থেকে নেমে আতিফা খান মেয়েকে হাতে ধরে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। খুব দ্রুত তাঁকে এ কাজটা করতে হবে। পুলিশ বাচ্চাদের স্কুলের সামনে একদম পার্ক করতে দেয় না। স্কুলের মধ্যেই অপেক্ষমাণ গার্জিয়ানরা বলাবলি করছিল বনানীর কোথায় যেন আগুন লেগেছে। রাস্তা পার হয়ে কোনোমতে নিজের গাড়ির সামনে দাঁড়ানো মাত্রই ব্যাগের ভিতর থেকে মোবাইলের শব্দ তাঁর কানে বাজল। ফুটপাতে উঠে এক হাতে মেয়েকে ধরে চাবি দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে মেয়েকে বসিয়ে নিজে ঘুরে এ পাশে ড্রাইভিং সিটে বসার সময় খুব কৌশলের সঙ্গে ব্যাগটা খুললেন। কোন মোবাইলটা বাজল সেটা ব্যাগের ভিতর খুঁজতে তাঁর একটু সময় লাগল বটে। ‘হ্যালো, কী বলছ?’ স্ক্রিনে তাঁর স্বামীর নাম উঠেছে, ‘প্রিয়তম’।

ওপাশ থেকে তাঁর স্বামী তমাল খান বললেন, ‘টিভিতে দেখতে পাচ্ছি, বনানীতে এফ আর টাওয়ারে আগুন লেগেছে। তুমি কোন জায়গায়?

আতিফা প্রায় রুষ্ট স্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি শুনেছি, গার্জিয়ানরা আলাপ করছিল। তা তুমি অত ভয় পাচ্ছ কেন? আমরা তো ধানমন্ডিতে। ৮-এর ব্রিজের সামনে। মেয়েকে নিয়েই আমি ফেরত আসব।’

‘আচ্ছা’ বলে তমাল রেখে দিলেন। আতিফা ব্যাগের ভিতর মোবাইলটা ঢুকিয়ে পাশে বসা মেয়ের ঊরুর ওপর আলতো করে হাত রেখে বললেন, ‘শাম্মি, তোর তো একটাই পরীক্ষা ছিল, তাই না?’

শাম্মি ভারি আদুরে স্বভাবের ফোলা ফোলা গালের একটি এগারো-বারো বছরের মেয়ে। স্কুলের আকাশি নীল রঙের ফ্রক গায়ে আর পায়ে সাদা কেডস, সাদা মোজা, হাঁটু পর্যন্ত টানা। তার গায়ের রঙ শ্যামলা মাজা, চোখে পুরু কাচের চশমা। মাথার চুল পনি টেল করে বাঁধা। একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ক্লাস ফাইভে পড়ে। কিন্তু যে তমাল খানের সঙ্গে তাঁর মা আতিফা খানের বাক্যবিনিময় হলো, সে তমাল খান তার বাবা নয়। তার বাবার সঙ্গে তার মায়ের বিচ্ছেদ হবার পর মায়ের সঙ্গে তাঁর পূর্বতন স্বামীর অফিসের এক সহকর্মীর পুনরায় বিয়ে হলে সে মায়ের সঙ্গী হয়, আর তমাল খান তার সৎ পিতা হলেও সে তাঁকে ডাকে ড্যাডি বলে। এ ঘটনা যখন হয় তখন শাম্মির বয়স ছিল পাঁচ বছর।

আতিফা খান এখন পঁয়ত্রিশে পড়েছেন। তাঁর মেজাজ একটু রেখে-ঢেকে বললে বলতে হয় চড়া। শাম্মিকে তাঁর মেয়ে হিসেবে দেখার চেয়ে তার বাবা মোহন রবের মেয়ে হিসেবে দেখা উচিত। মোহন রবও মেয়ের মতো ভারী শরীরের। কিন্তু আতিফা অনেক বছর ধরে একই ওজন ধরে রেখেছেন এবং চেহারার ধারালো ভাবটাও তাঁর বজায় আছে। গায়ের রঙের দ্যুতি তাঁর বরাবরের ছিল। ঠিক ফর্সা না হলেও ফর্সার কাছাকাছি তাঁর গায়ের রঙ। তাঁর চনমনে ফিগারের একটা রহস্য তিনি জানেন, যেটা অন্য কাউকে জানান না। সেটা হলো আলস্য না করা।

মেয়ের স্কুলের কাছাকাছি পৌঁছাতে তিনি ভাবলেন, মেয়ের চোখ আমার মতো উজ্জ্বল কালো হয়নি। তারপর ভাবলেন, মেয়ের নাক আমার মতো সরু টিকোলো হয়নি। আবার ভাবলেন, মেয়ের ঠোঁটজোড়া আমার মতো পাতলা হয়নি। তাঁর চেহারা খানিকটা লম্বাটে, মেয়েরটা গোলগাল। হ্যাঁ, তিনি এবার স্বীকার করলেন, মেয়ে আমার তীক্ষè মেধা পেয়েছে বটে।

বাসায় এসে আতিফা টিভি খুললেন। তাঁর চোখের সামনেই একটা লোক ডিশ ক্যাবলের তার ধরে নামতে গিয়ে ছিটকে পড়ল। শূন্যে ডিগবাজি খেতে খেতে প্রথমে নিচে রাখা একটা পিকআপের ওপরে পড়ল লোকটা। তারপর বাউন্স করে মাটিতে। ‘উ মা’ বলে চিৎকার করে আতিফা টিভি বন্ধ করে দিলেন। মৃত্যু দেখতে তাঁর ভালো লাগে না। তাঁর অবশ্যি রান্নাঘরে কাজ ছিল, তাই চোখেমুখে পানির একটু ঝাপটা মেরে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে রান্নাঘরে ঢুকলেন। তমাল আসবেন দুপুরে খেতে, তারপর তাঁরা একসঙ্গে খেয়ে বের হবেন। তমাল তাঁর অফিসে, আতিফা নিজে একটা অ্যাড ফার্ম চালান, মহাখালীতে। সেখানে দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা অবধি বসেন। তাঁরা দু’জনেই ফিরে এলে শাম্মি তালামুক্ত হয়। কাজের বুয়ার ওপর আতিফা বা তমালের একবিন্দু বিশ্বাস নেই। তাই যতক্ষণ দু’জনে বাইরে থাকেন, ঘরে তালা মেরে বাবা-মা বাইরে যান, শাম্মি থাকে একলা ঘরের ভিতরে। শাম্মি অনেকবার বলেছে, আম্মু আমি কি বন্দি? ডু আই হ্যাভ টু লিভ লাইক আ প্রিজনার? মেয়ের এই প্রশ্নের উত্তর না জানা আছে তমালের, না আতিফার। কিন্তু ভয় যে দু’জনের এক জায়গায় নয়! তমাল ভাবেন, এখনকার মেয়েরা যা পাকা! শাম্মি বারো বছরের হলেও গাবদা-গোবদা, চোখে পড়ে। তাঁরা দু’জনেই মেয়েকে স্মার্ট ফোন দিয়ে রেখেছেন, অন্তত যাতে সে ঘরবন্দী অবস্থায় নিরানন্দে না থাকে। তমালের কলিগ আশরাফ সাহেব বলেন, খবরদার, আঠারো বছরের আগে মেয়ের হাতে স্মার্ট ফোন দেবেন না। দেখেন না, চট্টগ্রামের একটি স্কুলের মেয়ের কী পরিণতি হলো! বাবা-মা খুব কড়াকড়ি করত। কিন্তু মেয়ের হাতে স্মার্ট ফোনটা ছিল। ব্যস, ফেসবুক থেকে অন্য একটা স্কুলের ছেলের সঙ্গে প্রেম করে বের হয়ে গেল কাউকে না বলে। আর বাসায় জীবন্ত ফিরতে পারল না। তমাল তোতলাতে তোতলাতে বললেন, আমি তো দিতে চাই না। কিন্তু ওর মায়ের জন্য পারি না। বোঝেন তো, মেয়ে তো আমার না, মেয়েটা ওর। ওর মা সব ডিক্টেট করে, আমি হুকুম তামিল করি মাত্র। আতিফার ভয়টা হলো বাড়ির সিকিউরিটির লোক। কে কখন মেয়েকে কি না কি বলে দরজা খোলায়Ñ বিপদের তো কোনো হাত-পা নেই। সাবধানের মার নেই। লক্ষ্মী মেয়ে তাঁর, স্মার্ট ফোনে এমন কিছু করবে না, যার জন্য বিপদ হবে।

দরজায় কলিং বেল বাজল। শাম্মি ছুটে গেল দরজা খুলতে। ওই নিজের বেডরুম থেকে দরজা পর্যন্ত ওইটুকু দূরত্ব মেয়েটা কী আনন্দের সঙ্গে যে দৌড়ে পার হয়ে গেল! আতিফা ডাইনিং টেবিলের পাশ পর্যন্ত ছুটে এলেন। ওখান থেকে দরজাটা পরিষ্কার দেখা যায়। বুয়ার আসার কথা। বুয়াই, কিন্তু পেছনে তমাল।

তমাল ক্লান্ত পায়ে ঘরে ঢুকে সোফায় বসে বললেন, অফিস ছুটি দিয়ে দিল। আমাদের অফিসের উল্টোদিকে তো ঠিক এফ আর টাওয়ার। কই, টিভির রিমোটটা কই?

অল্পতেই খুঁজে পেলেন তমাল টিভির রিমোটটা। কয়েকটা চ্যানেলে ঘটনাটা লাইভ করছিল। কিন্তু সরকারি চ্যানেলটা এমন ভাব দেখাচ্ছিল যেন পৃথিবীতে বনানী বলে কিছু নেই, এবং থাকলেও সেখানে কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটেনি। একটি বেসরকারি চ্যানেলে তমাল অন করলে ঠিক ওই সময়ে দেখাচ্ছিল একটা লোক ডিশ ক্যাবলের তার বেয়ে নামছিল। কিন্তু শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে কিংবা ভয় পেয়ে তারের ওপর থেকে তার হাত ফসকে যায়। সে শূন্যে কয়েকবার ডিগবাজি খেয়ে আর্তনাদ সহকারে ঠাস করে নিচে কংক্রিটের ফুটপাতে আছাড় খায়। সাথে সাথে জনাকয়েক লোক নিজেরাই কান্নাকাটি করতে করতে লোকটাকে উদ্ধার করে ভিড়ের মধ্যে একদিকে নিয়ে যায়। সাংবাদিকের ক্যামেরা ওদের ওপর জুম করলে দেখা গেল তারা একটা অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে লোকটাকে তুলে দেয়। তারা সমানে অবশ্য গালাগালি করছিল ভবনের মালিক, ফায়ার সার্ভিস ও সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার ওপর।

তমাল চিৎকার দিয়ে বললেন, ও মাই গড। ওহ্। রান্নাঘর থেকে আতিফা আওয়াজ দিলেন। বীভৎস। আমিও দেখেছি। আমি এ জন্য টিভি বন্ধ করে দিয়েছি।

কি রে মা, তুই আমার পেছনে পেছনে কেন? শাওয়ার নিয়ে নে না।

শাম্মির হাতে স্মার্ট ফোনটা বেজে উঠল। মেসেঞ্জারে।

কে?

মাই স্কুল ফ্রেন্ড, মাম্মি।

হি অর শি?

মাম্মি, ইউ ক্যান্টবি দ্যাট মিন।

আতিফা মনে মনে ভাবছেন, তমালের অফিস যখন ছুটি দিয়ে দিয়েছে, তাঁরও আর নিজের অফিসে যাবার দরকার নেই। যদিও আজ বৃহস্পতিবার, সপ্তাহের শেষ দিন। ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে চেক-টেক আসতে পারে। কিন্তু এ দুর্যোগের সময় অফিস চালালে তাঁর কর্মচারীরা হয়তো অস্থির থাকবে।

ইটস বনি, মাম্মি।

তিনি মেয়ের দিকে একটু ফিরলেন, একটু সরল হাসি হেসে বললেন, মা রে এমনিতে জিজ্ঞেস করছি। মাই লিটল শাম্মি ইজ আ গুড গার্ল, আই নো।

গ্যাসের চুলার পাশে তাঁর মোবাইলটা ছিল। নিরাপদ দূরত্বে রেখেছিলেন। সেটি নিয়ে তিনি অফিসে লাগালেন।

মফিজ, শোন, আজকে অফিস আর না করাই ভালো হবে। ছুটি দিয়ে দিলাম। তুই অফিস ভালো করে বন্ধ-টন্ধ করে যাবার সময় বাসায় চাবি দিয়ে যাস। আর ম্যানেজার সাহেবকে একটু দে।

সালেমালেকুম ম্যাডাম, ইরফান বলছি। জি, জি, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। সবাই চলে যাচ্ছেন। তবে চট্টগ্রাম থেকে একটা মাছের পার্সেল  আসছিল। ওরিয়েন্ট ফিশারিজের কাছ থেকে। মনে হয় আপনি অ্যাড বানাইছিলেন তো ওদের- এ জন্য মাছের গিফট পাঠাইছে।

আচ্ছা, ভালো হয়েছে মফিজ এদিকে আসার সময় ঐটা দিয়ে দিয়েন।

তিনি কয়েক পিস চিকেন ভাজছিলেন। তখন ভাবলেন, অফিসেই যখন আর যাচ্ছেন না, তমালও বাসায়, আরেকটা পদ বিফ বা ফিশ রাঁধলে কেমন হয়। আবার ভাবলেন, না, থাক, এ রকম একটা আগুন জ্বলছে, লোকজন মারা যাচ্ছে, আজকে আর খানা বাড়িয়ে লাভ নেই।

আবার শাম্মির দিকে ফিরে বললেন, আচ্ছা মা, তুই কি গোসল করবি না। এখনও দাঁড়িয়ে আছিস কেন? একটু পরে আমি ঢুকব বাথরুমে। কিছু বলবি। আবার একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, বনি  বনি। বনি, ইজ ইট আ গার্ল অর আ বয়?

-মাম্মি! শাম্মির চোখ পানিতে ভরে এলো।

চিকেনের টুকরাগুলো বাদামি আবরণ থেকে ক্রমশ লালচে হয়ে উঠছে। আতিফা গ্যাসের চুলার পাশে রাখা প্লেট থেকে কাটা পেঁয়াজের আরও এক মুঠো ছিবড়া প্যানে দিয়ে দিলেন। ছাঁ করে একটা শব্দ উঠল, সামান্য আগুনের হলকাও। ফ্রাইং স্টিক দিয়ে চিকেনটা নাড়াতে নাড়াতে মেয়েকে বললেন, অ্যাট ইয়োর এইজ, ইট ডাজ’ন্ট ম্যাটার- বয় অর গার্ল।

মাম্মি, ক্যান আই গো টু হিজ বার্থডে দিস আফটারনুন?

আতিফার চোখে পানি চলে এলো। রান্নার ঝাঁজ থেকেও চোখে পানি এলো কিনা তিনি টের পেলেন না। বাম হাত দিয়ে ওপরের কেবিন থেকে টিস্যুবক্সটা না নামিয়ে আলতো করে ওপর থেকে কয়েকটা টিস্যু টেনে চোখ মুছলেন। তারপর চিকেনে কয়েকবার নাড়া দিয়ে স্টিমিংয়ের জন্য কিছুক্ষণ প্যানটা চুলার ওপর ধরে রাখলেন। এর পর রান্না শেষ। তিনি চুলা বন্ধ করতে নব ঘোরালেন। ডাবল বার্নার। আগুনটা একটু পরেই নিভল। সিকিউরিটির মাজু এ কাজগুলো পারে। নাকি আজকেই ডাকবেন ওকে চুলাটা একটু দেখে দিতে। রান্নাঘরের দরজার চৌকাঠের পাশে ইন্টারকমের টেলিফোনটা দেয়ালে সাঁটা। কেয়ারটেকার ধরলে জিজ্ঞেস করলেন মাজুকে পাওয়া যাবে কিনা। তিনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন কেয়ারটেকার মাজুকে ডাকছেন এবং না পেয়ে খিস্তি করছেন। ফোনটা রাখার পর সাথে সাথে আবার ফোন এলো। মাজু। সে তখনই আসতে চায়। সে বৃহস্পতিবারে সন্ধ্যায় বাড়ি চলে যায়। বনানীর অগ্নিকাণ্ডের ফলে ট্রাফিক জ্যাম হবে। তাই আগেভাগে সে ছুটি নিতে চায়। আতিফা একটু ভেবে বললেন, হ্যাঁ, এসো।

শাম্মিকে প্রায় ঠেলে বাথরুমে ঢোকানোর সময় বললেন, দিস আফটারনুন, কিচ্ছু হবে না। দেখছিস না, পুরো বনানী জ্বলে যাচ্ছে।

এটা তো ধানমন্ডি, বনিদের বাসাও ধানমন্ডি।

আতিফার চোখে আবার পানি চলে  এলো। মেয়েটা যাবেই। মোহনের স্বভাব একেবারে। একটা জেদ। কোথাও যেন একটা জেদ। লোকটা কেন যে তাঁর জীবন থেকে চলে গেল এভাবে তিনি বুঝতেই পারেন না। কী সুন্দর জীবন ছিল তাঁদের। মোহন গার্মেন্টসে চাকরি করছিলেন। তমাল সেখানে তাঁর বন্ধু। আর আতিফা নিজে একটা অ্যাড ফার্মের ব্যবসা করছিলেন। কিন্তু তাঁর অফিসে ওই রেহানাকে চাকরি দেওয়াটাই খাল কেটে কুমির আনা হলো। আতিফা আর ওইদিকে ভাবতে চান না। মেয়েকে বাথরুমে ঢুকিয়ে তিনি আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। চুল আঁচড়াতে গিয়ে সামনে কপালের দিকে রেশমি রঙের দু-এক গাছি চুল দেখতে পেলেন। কিন্তু তাঁর চেহারার ঋজুু ভাব, চোখের দ্রুত চাহনি, মসৃণ গণ্ডদেশ, পেছনে পিঠের মধ্যভাগে মেরুদণ্ডের অবতল, দু’পাশে ডানার মতো একজোড়া কাঁধ, তাঁর গায়ের তরতাজা মাজা রং এসব ফেলে চলে গেল কী করে মোহন!

এ সময় টিভি রুম থেকে তমাল প্রায় চিৎকার করে বলছেন, মাজু এসেছে।

আতিফা চিরুনিটা যথাস্থানে রেখে আবার রান্নাঘরে এলেন। মাজু রান্নাঘরের সামনে দাঁড়ানো। তাকে দেখে বললেন, দেখ তো চুলাটা ভালো করে। কেমন যেন দেরিতে নেভে। বন্ধ করার পরও কোনো আগুন থেকে যাচ্ছে নাকি। বাবা রে ভাবতেও ভয় লাগে। বনানীতে এখনও আগুন জ্বলছে। দেখবে, তদন্তে বের হয়ে আসবে, কেউ হয়তো গ্যাসের চুলা খোলা রেখে সিগারেট ধরিয়ে চুলা আর বন্ধ করেনি।

মাজু বলল, জি ম্যাডাম, গ্যাসের চুলা খুব সাংঘাতিক। যে কোনো সময় যে কোনো বিপদ ঘটতে পারে।

মাজু মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসেছে। পরনে বাড়ির সিকিউরিটিরদের দেওয়া নীল হাফ হাতা শার্ট। পরনে কালো ট্রাউজার। তার পাশে কাঠের একটা বাক্স খুলে সে একটা লোহার শলাকা বের করল। পেছন থেকে আতিফা মাজুকে দেখছে। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। মুখাকৃতি গোলাকার। হাতার বাইরে কনুই থেকে হাত পর্যন্ত সবল স্বাস্থ্যের চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সের একজন যুবকের প্রতিচ্ছবি। মাজু প্রথমে কিচেনের প্যানেলের নিচের অংশে দেয়ালের সঙ্গে যুক্ত গ্যাসের লাইন পরীক্ষা করল। জয়েন্টটা ঠিক আছে দেখে সে এবার দাঁড়াল। বার্নার দুটোই সে চুলার মুখ থেকে আলগা করে বলল, ম্যাডাম, মোছার জন্য কোনো ন্যাকড়া হবে। বুয়া ন্যাকড়াটা কিচেন দরজার হাতলে গুঁজে রাখে। আতিফা নিঃশব্দে তাকে সেদিকে আঙুল দিয়ে দেখাল। মাজু ন্যাকড়াটা দিয়ে বার্নার দুটো অনেকক্ষণ সময় নিয়ে মুছে আবার চুলার মুখে বসিয়ে দিয়ে অন্য একটা কী কাজ করতে লাগল। আতিফা মাজুর কাজ দেখছে কিন্তু ভাবছে মোহনের কথা। একটা ছোট্ট চিঠি : ‘আমি আর তোমার সঙ্গে থাকব না। ব্যবসাতে আমার পার্টনারশিপের অংশটা তোমাকে দিয়ে গেলাম। বাই-ই। এ চিঠিটাকে ডিভোর্স লেটার হিসেবে নিও।’

মাজু কাজ শেষ করে পেছন ফিরে দাঁড়াল। বলল, ম্যাডাম, আর সমস্যা হবে না। তবে চাবিটা বদলাতে হবে।

চাবি কোথায় পাব, কিনে আনতে হবে না?

ম্যাডাম, কিনেও আনতে পারেন, তবে আমি দেখি নিচে স্টোর রুমে আছে কি-না। থাকলে আপনি বললে ওখান থেকে একটা নিয়ে এসে লাগিয়ে দিতে পারি।

নতুন তো? নাকি পুরোনো?

না, ম্যাডাম, নতুনই, খুব সামান্য দাম। মাজুর ঠোঁটের কোণে অকারণে একটু হাসির ঝিলিক খেলে গেল। দাম দিতে হবে না, ম্যাডাম, এসব জিনিস স্টোরে অনেক আছে।

আতিফা মাজুর পেছন পেছন দরজা বন্ধ করতে এসে হঠাৎ বলল, তুমি অন্য কী কাজ পারো?

মাজু সরল হেসে বলল, কেন ম্যাডাম, আপনি জানেন না? এ বিল্ডিংয়েতো আমার চাকরি ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। যদিও আমি সব ধরনের কাজ করি। ইলেকট্রিক আর গ্যাস তো করিই, বাথরুমগুলোও আমি দেখি। আলমারি, দরজার চাবি হারিয়ে গেলে নকল চাবি বানানোর কাজও করি।

আতিফা মৃদু হেসে বললেন, তুমি তো ডেঞ্জারাস তাহলে।

মাজু সেটা প্রশংসা হিসেবে নিয়ে বলল, জি, আপনাদের দোয়ায়।

দরজা বন্ধ করে ফিরতেই আতিফা দেখেন সোফার ওপর তমাল গাল হাঁ করে ঘুমাচ্ছেন।

শাম্মি বের হয়েছে। আতিফা কিছুটা বিরক্তকণ্ঠে বললেন, আমি তোর চালচলন কিছু বুঝতে পারি না, কেমন যেন লেইট লেইট। এ রকম কেন?

শাম্মি বলল, মাম্মি, ইউ ডৌন্ট লাইক মি, ইউ আর আ স্কোল্ড।

স্কোল্ড! স্কোল্ড! আমি স্কোল্ড, তোকে খালি গালাগালি করি তাই না। পড়ালেখায় একটু ভালো, তাই বলে কি তুই মায়ের সঙ্গে এভাবে কথা বলবি নাকি?

শাম্মি চিৎকার দিয়ে উঠল, বলল, মাম্মি, ডৌঞ্চ ইউ বুলি মি, তুমি আমার ওপর চিৎকার করো, এটা আমার পছন্দ হয় না।

তমালের ঘুম চটে গেছে। তিনি আস্তে আস্তে হাই তুলে বললেন, এই তোমরা আবার মা মেয়ে শুরু করলে। শাম্মি মা, তোমার ঘরে যাও।

বাথরুমে ঢুকে আতিফা হারপিক লিকুইড দিয়ে কমোড সাফ করলেন, হারপিক পাউডার দিয়ে বেসিন আর  মেঝে পরিষ্কার করলেন। ব্রাশগুলো বদলাতে হবে। মোহনের সময় এগুলো তাঁকে কখনও ভাবতে হতো না। খুব মনোযোগ দিয়ে বাথটাবও পরিষ্কার করলেন। সাদা রঙের বাথটাবে কোথাও একটু হলুদ বা কালো দাগ থাকতে পারবে না। বাথটাবে দাঁড়িয়ে গোসলের জন্য যেই মাথা শাওয়ারের নিচে রাখলেন, দেখলেন পানি নেই। ব্যাপার কী? এ সমস্যাটা গরমের শুরুতে হতে থাকে।  তাঁর মাথা ঘুরে গেল। সত্যি সত্যি যদি মেয়ের মন রাখতে বনিদের বাসায় যেতেই হয়, সেভাবে তো তৈরি হতে হবে। মেজাজ তাঁর তুঙ্গে উঠল।  বাথরুম থেকেই তমালকে হাঁক পাড়লেন। তমাল বুঝতে পেরেছেন। বাথরুমের ও পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ডার্লিং, ওরা মেশিন ছেড়েছে। বিশ-পঁচিশ মিনিট। তুমি এখন বের হয়ে আসো। পানি এলে গোসল নিও।

আতিফা বেজার মুখ নিয়ে বের হলেও একটু হেসে ফেললেন। তমাল হাঁটু মুড়ে বিছানায় বালিশ জমিয়ে ঠেশ দিয়ে বসে আছেন। হাতে মোবাইল। বনানীর ঘটনার লাইভ স্ট্রিমিং হচ্ছে। মোহন হলে এ সময়টাতে বাথরুমেই ঢুকে পড়তেন। অপরিকল্পিত কোনো কিছুর দিকে তাঁর ছিল তীব্র আকর্ষণ। যে কোনো কিছু থেকে যে কোনো কিছু করে ফেলা ছিল তাঁর স্বভাব। কিন্তু তাঁর দাবি ছিল সবসময়, সর্বত্র। আতিফা মাঝে মাঝে ভীষণ মনঃক্ষুণ্ন হতেন। আমার শরীরটা ছাড়া কি তোমার কাছে আর কিচ্ছু ভালো লাগে না। মোহন তার ভুঁড়িটি নাচিয়ে বলতেন, জীবন একটা, যৌবনও একটা। মিছামিছি বাঙালি কৃচ্ছ্রসাধন করে।

গায়ে তাঁর পাতলা একটা ওড়না। তিনি বিছানার এক কোনায় হালকা পাছা লাগিয়ে বসলেন। তমালের দৃষ্টি মোবাইলে নিবদ্ধ। আতিফা বললেন, মেয়ে তো বিকেলে তার এক ক্লাস-বন্ধুর বাসায় যেতে চায় জন্মদিনে।

তমাল মোবাইল থেকে নিস্পৃহভাবে চোখ সরিয়ে আতিফার দিকে তাকিয়ে বললেন, কবে?

আজকেই।

তো যাক না। কোথায়?

এ ধানমন্ডিতেই।

তো যাক না।

আতিফা বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি তো বলবেই যেতে। তোমার তো মেয়ে না। মেয়ের ভালো-মন্দতে তোমার কিছু এসে যায় না।

তমাল আরও নিস্পৃহ গলায় বললেন, কী আসলে বলতে চাও সেটা বলো। ইনডাইরেক্ট হবার দরকার নেই।

আতিফা ভাবলেন, ‘চলো না, আমরাসহ যাই’ তমাল এ কথাটি বলবেন। সেটি আসলে বলতেন মোহন। জীবনযাপনটাই ছিল ওরকম, সবসময় রেডি। এরকম শুধু ওড়না গায়ে দিয়ে বসে থাকলে মোহন বলতেন, এক্ষুনি আসো, পরের কথা পরে।

আতিফা অনেকটা মোহনের ঢঙে বললেন, চলো না, আমরাসহ যাই।

তমাল বিপরীত দিকের দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি এবার শাওয়ার নিতে পারো, পানি নিশ্চয় এতক্ষণে এসে গেছে।

বুঝেছি, বলে আতিফা আবার শাওয়ারে ঢুকলেন। তাঁর মহাখ্যাপা অবস্থা শান্ত করতে তিনি অনেকক্ষণ সময় নিয়ে গোসল করলেন। বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখলেন তমাল লম্বা হয়ে শুয়ে গাল হাঁ করে গভীর ঘুমাচ্ছেন।

তমাল ছিল মোহনের বন্ধুদের মধ্যে ব্যতিক্রম। সারাক্ষণ চুপচাপ। ভদ্র, মার্জিত, এবং সুদর্শন। মোহনের অন্য বন্ধুরা ছিল মোহনের মতোই ডাকাবুকো। সারা রাত হয়তো পার্টি করতে বসে গেল। ইচ্ছা হলো কি রাতেই যার যার গাড়ি নিয়ে লং ড্রাইভে বের হয়ে গেল। আতিফার স্বামীর এ জীবনটা ভালো লাগত, আবার লাগত না। একটু ছাড়া, একটু বাঁধা এটাই তো জীবন। আর মোহন বলত, তুমি হলে একটা ভীতুর চুনোপুঁটি। বিছানায় যেমন মোহন একচেটিয়া রাজা ছিল, সে আতিফার সব ব্যাপারে রাজা থাকতে চাইতো। যেন আতিফাকে বিছানায় দলাই-মলাই করার মতো, তাঁর সত্তাকেও মোহন ঐভাবে নিষ্পিষ্ট করতে চাইত। আতিফা একদিন মোহনকে বললেন, এটা কীভাবে সম্ভব যে, তুমি রেহানাকে এসএমএস দাও। আশ্চর্যÑ সে হলো আমার অফিসের স্টাফ, সরাসরি আমার স্টাফ, তুমি তাকে কীভাবে এসএমএস দাও! স্ট্রেইঞ্জ! মেসেঞ্জারে কোনো ভিডিও চ্যাটিং করো কিনা সেটাও তো আমার সন্দেহ হয়। মোহন হো হো করে হেসে উঠে বললেন, তোমার ওয়াইল্ড ফ্যান্টাসি। তুমি আমার মোবাইল চেক করতে পারো। আতিফা বলেছিলেন, তুমি আমার রুচি সম্পর্কে জানো। ওই কাজ আমি কোনোদিন করব না। তখন মোহন বলেছিলেন, দেন ইউ হ্যাভ টু বিলিভ মি।

সমস্যার যে পর্যায়ে তমাল ইন করেন, তখন মোহন প্রায় দিনরাত মদে চুর হয়ে থাকতেন। তমাল বললেন, ভাবি, বহুত চেষ্টা করছি, কিন্তু কোনোভাবেই এ মেয়েটা থেকে ফেরাতে পারছি না। সে আমাকে বলে- না রে দোস্ত, মদ ছাড়তে পারব, কিন্তু এ মেয়েটাকে ছাড়তে পারব না। তমাল অবশ্যি আতিফাকে আরেকটা কথা বলেননি। মোহন বলেছিলেন, মাই ওয়াইফ! শি ইজ অল টক অ্যান্ড টক। তাঁর জিবের বাড়িতে আমার কলজেটা বের হয়ে আসে। তমাল বলেছিলেন, বাট শি লাভস ইউ। মোহন একটা চতুর হাসি দিয়ে আরেক পেগ যখন গ্লাসে ঢাললেন, তখন তমাল তাঁর ঘর থেকে বের হয়ে যায়। বের হবার পথে দেখলেন আতিফা ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছেন। তমাল তাঁকে ‘ভাবি যাই’ বলার সাথে সাথে আতিফা বলে উঠলেন- শোনেন, তমাল ভাই আপনার সাথে আমার কথা আছে।

তমাল ভাই, আমি একটা ডিসিশন নিয়েছি। আমার বোধহয় মোহনের সঙ্গে ঘর করা আর ঠিক হবে না। একটা মাস আমি সময় দিচ্ছি, আপনি এ কথাটা ওকে জানাবেন।

একটা মাস লাগেনি, তার কয়েকদিন পরে আতিফা সে চিঠিটি পান। 

তমালের সঙ্গে বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে যখন পরিষ্কার হলো যে, তমাল খানিকটা অসুস্থ, তখন চেন্নাইয়ের এক ডাক্তার বললেন, এটা খুব রেয়ার সিনড্রোম, রিভার্স সিনড্রোম,  এটার জন্য ইনজেকশন আছে; কিন্তু কাজ করবে গ্যারান্টি নেই। অনেক দম্পতি আছে, এটা মেনে নিয়েই আজীবন সংসার করে যায়। আসলে অন্য কোনো তো অসুবিধা নেই, তৃপ্তি তো ঠিকই পাচ্ছেন। দু’জনে হ্যাঁ বললেও যেন পুরো সত্য কথা বললেন না। সে ট্যুরে শাম্মিও সাথে ছিল। সে জন্য দু’জন মনমরা হয়ে থাকলেও তারা পার্শ¦বর্তী ঘোরার জায়গা উটি ঘুরে এলেন। এক বিকেলে উটির চূড়ায় উঠে দূরপাহাড়ের কোলে সূর্যাস্ত দেখার সময় তমাল তাঁর মায়াবী চোখ জোড়া কাঁপিয়ে খুব ব্যথিত গলায় বললেন, তাহলে শাম্মিই আমার একমাত্র মেয়ে হয়ে রইল। আতিফা চুপ করে রইলেন।

তমালের ঘুম ভেঙে গেলে দেখলেন ডাইনিং টেবিলে আতিফা আর শাম্মি খাওয়া শুরু করে দিয়েছেন।

তমাল যোগ দিলেন যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও। এ দেশটা একটা জাহান্নামের দেশ। এখন বলছে রাজউক নাকি জানত না এফ আর টাওয়ারের তেইশ তলার পারমশিন ছিল না।

আতিফা বললেন, সমস্যাটা তো তেইশ তলা নিয়ে না, সমস্যাটা হলো তাদের ফায়ার এস্কেপ রুট নাকি ছিল না। ওটা দেখলে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। আমাদের এই বিল্ডিংটা নিয়েও আমার ভয় হয়। 

খেতে খেতে আতিফা বললেন, আমি ঠিক করেছি যাব, শাম্মিকে নিয়ে বনির বাসায়। শাম্মি মা, তাই না!

শাম্মির মুখ গোমড়া। মুখে কপাটি মেরে আছে। অনেক নিচুস্বরে বলল, অ্যাজ ইউ উইশ।

তমাল চুপচাপ খাচ্ছেন। আতিফা তাঁকে বললেন, তুমি যাবা?

শাম্মি হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে বলল, ড্যাডি, উইল ইউ গো?

তমাল শাম্মির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে দিলেন। ইয়েস। কিন্তু ওরা কি বার্থডে করছে নাকি পোস্টপোন করেছে, খবর নিয়েছ?

আতিফা বললেন, ওরা বার্থডে করছে। বনি আরও একবার টেলিফোন দিয়েছে। কিন্তু আতিফার ভালো লাগল না তমালের ইয়েস বলার ধরনটা। আতিফার ভিতরটা কুরে কুরে খায় কেন তমাল এমন ভান করে। কেন সে আন্তরিকভাবে বলতে পারে না। কেন সে শাম্মির ব্যাপারে এমন একটা লোকদেখানো ভাব বজায় রাখে?

তমাল তাঁকে এ ব্যাপারে একদিন বলেছিলেন- আতিফা, তোমার এটা বাড়াবাড়ি। লোকদেখানো হবে কেন? নিজের বাচ্চা না হলেও কি মানুষ ভালোবাসতে পারে না অপরের বাচ্চাকে? যেখানে আমি নিজে সন্তান উৎপাদনে অক্ষম, সেখানে তোমার এ চিন্তাটা কেমনে খাটে! আতিফা বলেছিলেন, তুমি ওকে নিজের বাচ্চার মতো মনে করলে ওকে কড়া শাসনে রাখতে, আদরও যেমন করতে, বকাও দিতে। তমাল তখন বলেছিলেন, আর কড়া শাসন করলে তখন তুমি বলতে, আমি সৎ-বাবা বলে ওকে দেখতে পারি না। ওর প্রতি তাই আমি ক্রুয়েল।

গাড়িতে উঠে আতিফা বললেন, কিংস থেকে একটা কেক নিয়ে নিই। কেক নিতে গিয়ে শাম্মি একটা চকলেটের বাক্সও পছন্দ করল। কাউন্টারের ছেলেটা জিজ্ঞেস করল কেকের ওপর কী লিখতে হবে। শাম্মি তার চশমাসহ মুখটা নাড়িয়ে বলল, জাস্ট নাথিং। কিচ্ছু লিখতে হবে না। আতিফা বললেন, সে কী রে মা, একটা উইশ করবি না। শাম্মি বলল, ও কে, অ্যাজ ইউ উইশ। তমালের গাড়ি চালাতে বেগ পেতে হচ্ছিল। সামনে, পেছনে, সাইডে সবদিকেই  গাড়ি, অটোরিকশা আর বাইক। এমন যে, তাঁরা নেমে হাঁটলেও হয়তো এতক্ষণে পৌঁছে যেতেন। আতিফা পেছনে বসেছেন আর লক্ষ্য করলেন তমাল আর শাম্মির মধ্যে বেশ কথাবার্তা হচ্ছে। তমাল চুপচাপ টাইপের মানুষ হলেও খুব স্নেহপ্রবণ। ইনফ্যাক্ট, সে খুব চেষ্টা করেছিল মোহন আর আতিফার বিয়ে টিকিয়ে রাখতে। পারেনি কারণ তখন রেহেনাকে নিয়ে গোপনে মোহন অলরেডি সেন্টমার্টিন ঘুরে চলে এসেছে।

তমালের কী একটা কথায় শাম্মি খুব জোরে হেসে উঠল। ড্যাডি, ইউ মাস্ট বি কিডিং! 

পেছনে বসে আতিফা জোকটা ধরতে পারলেন না। মনে মনে ভাবছিলেন, বনিদের বাসা বলতে গেলে কখনও যাননি, কীরকম পরিবেশ কে জানে! তাঁর মনে হলো, মানুষে মানুষে সম্পর্ক কীভাবে হয়, কীভাবে টেকে এগুলো নিয়ে যেন তাঁর কোনো জ্ঞান নেই। তিনি যেন একেবারে শিশু। 

বনানীর ঘটনার চাপে নিশ্চয় ধানমন্ডিতেও ট্রাফিক জ্যাম বেড়ে গিয়েছিল। তমালের গাড়ি আর এগোয়ই না।

শাম্মি অস্থির হয়ে বলল- মাম্মি, আমরা তো হেঁটেও যেতে পারি। ড্যাডি গাড়ি নিয়ে আসুক।

আতিফা বললেন, ওটা ঠিক হবে না, যাই এক সাথেই যাই, একটু দেরি হলোই বা।

তমাল বললেন, শাম্মি, অস্থির হয়ো না, সবারই এরকম দেরি হবে।

বনিদের বাসা ধানমন্ডির আর দশটা অ্যাপার্টমেন্ট হাউজের মতো। তাঁরা লিফটের বোতাম টিপে ৪বি-তে ঢুকলেন। বনি আর তার বাবা মা দরজায় তাঁদের রিসিভ করলেন। তাঁরা ভিতরে ঢুকে একটা জোড়া সোফায় আতিফা মেয়েকে নিয়ে বসলেন। তমাল বসলেন একটা সিঙ্গেল সোফায়। ঘরের সিলিংয়ে কিছু রঙিন বেলুন ঝুলছে। বেশি না। আতিফা লক্ষ করলেন, বনি আর শাম্মি পরস্পরকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে। স্কুলের চৌহদ্দিতে একরকম, কিন্তু বাসার মধ্যে সহপাঠিনীকে কী বলবে বা সহপাঠীকে কী বলবেÑ এ দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়ে সেটা ঠিক করতে পারছে না দেখে আতিফা মজা পেলেন। তিনি সোফা থেকে উঠে গিয়ে বললেন, এই ইউ টু কিডস, কাম হিয়ার। লেট মি টেক আ সেলফি। এরপর ফটোসেশন শুরু হলো, বনির বাবা-মা, বনির দু’জন কাজিন, তমাল, আতিফা আর শাম্মি মিলে বেশ কয়েকবার অদল-বদল করে বিভিন্ন মোবাইল ক্যামেরায় টানা অনেকগুলো ছবি তোলা হলো।

বনির একটা সিঙ্গেল ছবি নিয়ে আতিফা সোফায় বসলেন। বনিরও গাবদা-গোবদা শরীর। মাথায় ঘন চুলের বোঝা। মুখটা গোলগাল, চোখ দুটো কৌতূহলে ভরা। বনিকে ডেকে পাশে বসিয়ে আতিফা কথা বলতে লাগলেন।

এ সময় বনির মা তাঁদের ডাইনিং হলে ডাকলেন। একটা মোটামুটি সাইজের কেক রাখা হয়েছে। শাম্মিদের কেকটাও পাশে রাখা হয়েছে, ওটা খোলা হয়নি। বনির আরও দু-চারজন বন্ধু আসার কথা। কিন্তু ওরা এখনও এসে পৌঁছাতে পারেনি। বনিদের টিভিটা ডাইনিং রুমের দেয়ালের সঙ্গে। টিভি চলছে কিন্তু শব্দ বন্ধ করা। বনানীর আগুন নিভেছে এটা বারবার একটি চ্যানেলের টিভি স্ক্রলে দেখাচ্ছে।

বনির বাবা একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলী। মাহমুদ জং। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেনÑ ফায়ার এস্কেপ ছিল না বলছে, এটা ঠিক নয়, তবে তালা মারা ছিল।

কেন?

আতিফার প্রশ্নের উত্তরে মাহমুদ জং বললেন, লোভ।

লোভ? মানে, এ প্রশ্নটা করলেন, বনির মা সেঁজুতি জং, যিনি স্থানীয় একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রিন্সিপাল।

মাহমুদ জং বললেন, যারা যে ফ্লোর কিনে নিয়েছে, কি ভাড়া করেছে তারা এস্কেপ রুটের সিঁড়িগুলো দখল করে সেখানে দরজায় তালা মেরে দিয়েছে। ফলে ওই জায়গাটা তাদের হয়ে গেল, স্টোররুম হিসেবে ব্যবহার করল। যখন আগুন লেগেছে মানুষ আর বের হতে পারেনি ওই তালার জন্য।

সেঁজুতি জং বললেন, অনেকে বলেছিল আজকে বার্থডে টা না করতে। কিন্তু আমাদের সব প্রস্তুত, দুপুরেই হয়েছে দুর্ঘটনাটা, এর অল্প পরেই তো বনির বন্ধুদের আসার কথা। কাজেই ভাবলাম, বরঞ্চ ভালো হবে সবাই মিলে একত্র হয়ে আগুনের ব্যাপারটা যে একটা জাতীয় সমস্যা, তা নিয়ে আলাপ করি।

আতিফা বললেন, এটাতে তো আমি কোনো অসুবিধা দেখি না। এটাই তো দুনিয়ার নিয়ম। যার যার কাজ সে সে করবে।

তমাল খুব শান্ত গলায় বললেন, ওয়েট, যদি ওই বিল্ডিংয়ে আমি বা তুমি বা মাহমুদ সাহেব বা ভাবি যদি আটকে পড়তাম, তখন কি এই বার্থডে পার্টি হতো?

আতিফা অনেকটা তমালকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘যদি’ দিয়ে কোনো বাস্তব ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তুমি এটা এভাবে দেখছ না কেন, বনি তাদের একমাত্র সন্তান, ছেলেটা ফাইভে পড়ে, আজকের দিনে এগারো-বারো বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিল। তার জন্য আজকের দিনটা শুভক্ষণ, সেটা তারা সেলিব্রেট করবে না? সরকারের কোনো অনুষ্ঠান এখন বাতিল আছে নাকি? সরকারি চ্যানেলটাতে দাও, দেখো কী চলছে? 

সেঁজুতি জং বললেন, ভাবি এগারো বছর আগে।

আতিফা অবাক হয়ে গেলেন, শাম্মির বারো চলছে। তার অর্থ বনি শাম্মির চেয়ে ছোট- এ কথাটাই জানিয়ে দিলেন সেঁজুতি। কিন্তু মুখে বললেন, তাই হলো, যাহা এগারো, তাহা বারো। 

কোনো একটা কথা কোথাও একটু অসুন্দর হয়েছে মনে করে সেঁজুতি ভাঁজ দেবার জন্য বললেন, ভাবি, আপনারা খুব লাকি। মেয়ের মা-বাবা হবার চেয়ে পৃথিবীতে সুখের কিছু নেই।

মাহমুদ জং বললেন, ছেলেমেয়ে বলে কথা নেই, সুস্থ ছেলেমেয়ে উপযুক্ত হয়ে বড় হলেই হলো।

আতিফার চোখ পড়ল তমালের দিকে। তমাল খুব গভীরভাবে টিভির সাইলেন্ট করা প্রোগ্রাম দেখছেন।

আর সেঁজুতি আবার যোগ করলেন, বাহ্বা ছেলে হলে সামলানো যে কি দায় আমি বুঝি। ওহ্্, বিচ্ছুর এক শেষ।

আতিফাকে বলতে হলো, ভাবি ওরকম বলছেন কেন? আপনার বনি তো খুব লক্ষ্মী ছেলে। মেধাবীও। সে কী হয়েছিল ফাইনাল পরীক্ষায়?

সেঁজুতি বললেন, শাম্মি তো ফার্স্ট হয়েছিল তাই না? 

সেঁজুতির গলায় খানিকটা বেদনার আভাস পেয়ে আতিফা এবার ভাঁজ দিলেন। ছেলেরা প্রথমে একটু পিছিয়ে থাকে, কিন্তু বড় হতে হতে তারা মেয়েদের ডিঙিয়ে যায়।

মাহমুদ জং যোগ করলেন, এটা আর সত্য না। এখন বাংলাদেশে মেয়েরা এগিয়ে আছে। এই দেখুন টিভিতে, একজন মহিলা দেখেন ক্যাবল তার বেয়ে নামছেন। কী দুর্দান্ত সাহস! 

সেঁজুতি স্বামীর এরকম একটা উদাহরণের কোনো আগা-মাথা বুঝতে না পেরে বললেন, ভাবি, আসলে বনি কনসেন্ট্রেশন রাখতে পারে না।

এর মধ্যে বনির বাকি বন্ধুরা এলো। দেখা গেল সবাই প্রায় তাদের নিজ নিজ বাবা-মাসহ এসেছে। তাদের মধ্যে জুঁই নামের মেয়েটি নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতাটি আবৃত্তি করল অপরূপ বাচনভঙ্গিতে। শাম্মি বন্ধু বনিকে উৎসর্গ করে ইংরেজিতে লেখা একটি ছোট গদ্য পড়ল। সবাই হাততালি দিল, কিন্তু জুঁইয়ের আবৃত্তির পর যেমন ঘর ভরে তালি পড়েছিল তেমনটি হলো না। বনির বাবা-মা তাঁদের রাতে না খাইয়ে ছাড়লেন না।

গাড়িতে বসে আতিফা উশখুশ করতে লাগলেন। তমালকে বললেন- আচ্ছা, তুমি এভাবে গাড়ি চালাও কেন? এই সামান্য দূরত্ব, এখানে ওভারটেক করার দরকার কি?

তমাল শাম্মিকে অস্পষ্টভাবে বললেন, তোমার মা খেপেছে, চলো আমরা আরও জোরে চালাই।

বাসায় ফিরে শাম্মিকে ওর ঘরে শুইয়ে দিইয়ে আতিফা একেবারে রণরঙ্গিণী।

একটা কথা তুমি আমাকে স্পষ্ট করে বলো তো, তুমি কি আমাকে নিয়ে সুখী নও?

কেন, এ প্রশ্ন কেন? হঠাৎ তুমি এত উত্তেজিতও কেন?

কথা পাশ কাটিও না, স্ট্রেইট উত্তর দাও। ইয়েস অর নো।

তমাল শান্ত ভাব বজায় রেখে হেসে দিলেন। বললেন, ইয়েস বললে কী হবে, আর নো বললে কী হবে সেটা আগে জানা দরকার।

তমাল মোবাইলের চার্জার লাগানোর জন্য বিছানার পাশে গোল টেবিলটার কাছে একটু নুয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আতিফার থেকে পেছনে ফিরে।

হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে ফিরলেন। আতিফা একেবারে তাঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তাঁর গরম নিশ্বাসের হলকা তমালের মুখে লাগছে।

প্লিজ, তুমি সত্য করে বলো, তুমি কি আমাকে নিয়ে সুখী?

তমাল আতিফার চোখে কী দেখলেন তিনি বুঝলেন না, কিন্তু আতিফাকে সবেগে বুকে টেনে নিলেন। আর আতিফা হুহু করে তাঁর বুকের ওপর মাথা ঢলে দিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন।

এর অনেক অনেকক্ষণ পরে তাঁরা যখন লাইট নিভিয়ে পাশাপাশি শুয়ে ঘুমানোর আয়োজন করছেন, তখন তমাল আস্তে করে বললেন, ঘুমিয়েছ?

আতিফা রুদ্ধশ্বাসে বললেন, না, বলো।

তমাল বললেন, তোমার প্রতি রিকোয়েস্ট, তুমি তুলনাতে যাবে না। গেলে কষ্ট পাবে, না গেলে ভালো থাকবে। আমার যেমন তুলনা করার কিছু নেই, তাই আমি শান্ত থাকি।

আতিফা কিছু না বলে তমালের মুখে হাত বুলাতে বুলাতে ঘুমিয়ে পড়লেন। তমাল তাঁর ট্যাবলেট অন করে বনানীর ঘটনাগুলোর ভিডিও দেখতে লাগলেন সাইলেন্ট মোডে।

২.

তখন বিকেল ঠিক ৫টা ৫ মিনিট। আতিফার টেলিফোন বেজে উঠল। শাম্মি।

মাম্মি, হেলপ মি। ফায়ার ইন দ্য হাউজ।

হোয়াট! ও মাই গড। কোথায়?

আমাদের নিচের ফ্ল্যাটে। মাম্মি, হোয়াট শ্যাল আই ডু। আই ক্যান্ট গো আউট। দ্য ডোর ইজ লকড।

আতিফা প্রায় তাঁর রিভলবিং চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন। বললেন, তুই ইন্টারকমে কল দে। স্টে কুল। একদম ঘাবড়াবি না। চিন্তা করিস না। আমি এখনই আসছি।

ইন্টারকম ইজ নট ওয়ার্কিং, দে হ্যাভ কাট অব দ্য পাওয়ার লাইন।

ওহ, নো। এখনই আসছি আমি!

বললেন তিনি বটে কিন্তু মহাখালী থেকে ধানমন্ডি বিরাট ডিসট্যান্স। তবুও ভাগ্য গাড়িটা তাঁর সঙ্গে আছে। তিনি তাঁর সাততলা অফিস থেকে দ্রুত নামলেন মফিজকে নিয়ে। বাড়ির কেয়ারটেকারকে টেলিফোন দিলেন, তার দুটো টেলিফোনই এনগেজড। বাড়ির অ্যাসোসিয়েশেনের সভাপতি প্রামাণিক সাহেবকে টেলিফোন দিলেন। তাঁকেও পেলেন না। তিনি গাড়ি চালাচ্ছেন বেহুঁশের মতো। মফিজ পাশে বসে তাঁকে বারবার অভয় দিচ্ছে, কিচ্ছু হবে না, ম্যাডাম, চিন্তা করবেন না।

অ্যাসোসিয়েশেনের ট্রেজারার হামিদ সাহেবকে পেলেন। হামিদ সাহেব, জি, জি, আমি সাত সি-র আতিফা খান বলছি। প্রায় ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, বাড়িতে নাকি আগুন লেগেছে, আমার মেয়েটি আটকা পড়ে গেছে, চাবি আমার কাছে, যে কোনোভাবে দরজাটা খোলেন, ভাঙেন, যা করেন, আমার মেয়েটাকে বের করে নিন, প্লিজ।

ও মা, তাই। আমি এক্ষুনি দেখছি। আপনি চিন্তা করবেন না।

প্রতিটা মুহূর্ত যখন এক যুগ মনে হচ্ছে তখন তমালকে টেলিফোন দিলেন। তমালই বললেন, তুমি ঘাবড়ে যেয়ো না। আমি প্রামাণিক সাহেবকে পেয়েছি। দরজা খোলার ব্যবস্থা করছে ওরা। তবে মাস্টার চাবির গোছাটা পাচ্ছে না খুঁজে। কিন্তু মাজুকে দিয়ে দরজা খোলাচ্ছে।

মাজু, মাজু, ওহ্, মাজু, গ্যাসের চুলা ঠিক করে যে ওই মাজু, ও আল্লাহ ও কি পারবে? ও আল্লাহ ও যেন পারে।

মহাখালীর রাস্তাটা কখনও ফ্রি থাকে না। আতিফার মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সব গাড়ি যেন এ পথে নেমেছে। এক হাতে গাড়ি চালাচ্ছেন, আরেক হাতে মোবাইলে মেয়ের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছেন।

শাম্মি বলছে, মাম্মি, দে আর ট্রায়িং টু ওপেন দ্য ডোর। বাট ইট ইজ গেটিং হটার ইনসাইড। মাম্মি, উইল আই ডাই?

নো, ইউ ঔন্ট! এমন জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলেন তিনি যে মফিজ হকচকিয়ে গেল। তখন তাঁর জ্ঞান আছে কি নেই তিনি জানেন না, ভূত যেন ভর করেছে এরকমভাবে তিনি গাড়িটা রাস্তার এক পাশে সাইড করলেন। নামতে নামতে গাড়ির র্স্টাট বন্ধ করতে করতে দ্রুত নিশ্বাসে মফিজকে বললেন, তুই অফিসে ফোন করে ড্রাইভার মজিদকে আসতে বল। ও এসে গাড়ি নিয়ে যাবে। তুই থাক, গাড়িটা পাহারা দে। আমি যাই, হেঁটে, দৌড়ে, যেভাবে পারি আমাকে মেয়ের কাছে যেতেই হবে। আই মাস্ট!

আতিফা হক ফুটপাত ধরে দৌড়াচ্ছেন, দৌড়াচ্ছেন। তাঁর কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তাঁর শ্বাসে টান পড়ছে, কিন্তু তিনি দৌড়াচ্ছেন। লোকজনও কেমন যেন সরে সরে যাচ্ছে। একটা পথের কুকুর যে তাঁর লাথি খেয়ে দু’হাত দূরে ছিটকে পড়ল, সেটা তিনি টেরও পেলেন না। দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি পান্থপথের মিরপুর রোডের সংযোগে এলে বাম দিকের রাস্তা ধরে ধানমন্ডির দিকে আরও দৌড়াবেন, হঠাৎ খেয়াল করলেন একটা অটো তাঁর পাশ ঘেঁষে দাঁড়াচ্ছে। তিনি কোনো কথা না বলে উঠে কেবল বললেন, ধানমন্ডি আট। এবং এতক্ষণে তাঁর সম্বিৎ হলো যে হাতের মধ্যে ধরা মোবাইল এতক্ষণ বেজেই চলেছিল। 

মোবাইল স্ক্রিনে রিংয়ের সংখ্যা দেখাচ্ছে ২৫। হামিদ সাহেবেরই বাইশটা। আশ্চর্য তিনি একবারও টের পাননি।

কল ব্যাক করলে ধরলেন হামিদ সাহেব। হামিদ সা. . .।

কথা শেষ করতে পারলেন না, ওদিক থেকে হামিদ সাহেব প্রচণ্ড দম-ধরা কণ্ঠে বলে উঠলেন, ও ভাবি, আংকেলকে উদ্ধার করেছি, মাজু দরজা খুলতে পেরেছে। মেয়ে ভয় পেয়েছে, পাশের বিল্ডিংয়ে আমরা সবাই আছি। দমকল এসে আগুন থামিয়েছে। এসি থেকে লেগেছিল। আপনি কোথায়?

আমার, আমার, মেয়েকে বের করেছেন, সত্যি, সত্যি? বলেন, সত্যি, সত্যি।

জি, জি, শিওর, শিওর, আমি টেলিফোনটা আপনার মেয়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছি, আপনি কথা বলেন।

কিন্তু হামিদ সাহেবের যেন টেলিফোন অনন্তকাল ধরে আসছে না। 

অস্থির হয়ে আতিফা মেয়েকে মেসেঞ্জারের ভিডিওতে কল দিলেন। ঐদিক থেকে কোনো রেসপন্স নেই। তখন নরম্যাল কল দিলেন। মেয়ের টেলিফোন বাজছে, কিন্তু ধরছে না। ধরছে না কেন, ধরছে না কেন? হামিদ সাহেবও দেরি করছেন কেন। কী হচ্ছে আসলে। ও মা, আল্লাহ্্, তুমি আমার মেয়েটাকে রক্ষা করো। সাথে সাথে তাঁর বুকের ধড়ফড়ানি বেড়ে গেল। তিনি বোধ করতে লাগলেন তাঁর গায়ের সব শক্তি যেন অন্তর্হিত হয়ে যাচ্ছে। প্রায় এলিয়ে পড়ছেন অটোর ভিতরে। একবার সামনের সাইড গ্লাসে চোখ পড়লে মনে হলো ড্রাইভারের এক জোড়া চোখ তাঁকে নিষ্পলক দেখছে। 

এ সময় টেলিফোনটা বেজে উঠল। অনেকদূর থেকে যেন তিনি টেলিফোনের আওয়াজটা শুনতে পেলেন। হামিদ সাহেব ঐ প্রান্ত থেকে বলছেন, নেন, কথা বলেন, মেয়ের সাথে।

শাম্মি বলছে, মাম্মি, আই অ্যাম অ্যালাইভ। দে হ্যাভ সেভড মি। মাম্মি…

শাম্মির কথা শেষ হলো না, তার আগেই সিএনজির মধ্যে আতিফা জ্ঞান হারালেন।

মোহীত উল আলম : কথাসাহিত্যিক

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares