গল্প : ভূমিকম্প : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ।।

শনির আখড়ায় বাসা নিয়ে থাকতেন আমাদের কুতুবুদ্দিন আইবেক। সড়ক ও জনপথ বিভাগে একটা ছোটখাটো চাকরি করতেন। প্রতিদিন সকালে দাঙ্গাবাজদের সহিংসতা নিয়ে বাসে উঠতেন, মৎস্য ভবনের মোড়ে নামতেন; বিকেলে ওই মোড় থেকে আবার বাসে উঠতেন, শনির আখড়ায় নামতেন। তারপর হেঁটে হেঁটে দুই গলি ঘুরে, ক্লান্ত, বিপর্যস্ত শরীর নিয়ে তিনতলা বাড়ির দুই কামরার ফ্ল্যাটে পৌঁছাতেন। দেহে মোটামুটি দুই আনা প্রাণ থাকলেই ছিল যথেষ্ট, স্ত্রী আসফিয়া বাকিটার দায়িত্ব নিয়ে নিতেন। তাকে সেবা দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে রতিসুখ দিয়ে বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টার মধ্যে পরের দিনের জন্য সচল সতেজ করে তুলতেন। সকালে যখন কুতুবুদ্দিন বাড়ি থেকে বেরোতেন, তার বাহুতে থাকত টপ দাঙ্গাবাজের শক্তি, আর মনে তরুণ কাসানোভার চাঞ্চল্য ও স্ফূর্তি।

সে ছিল কুড়ি বছর আগের ঘটনা। তারপর কালক্রমে ওই তিনতলা বাড়ির তিনি মালিক হয়েছেন- না না, দাঙ্গাহাঙ্গামা করে নয়, রীতিমতো ক্রয়সূত্রে। তারপর সেই বাড়ি ভেঙে পাঁচতলা ফ্ল্যাটবাড়ি করেছেন। আশপাশের দু’চার টিনের বাড়ি জমির মালিকানাসহ লাভ করেছেন। কুতুবুদ্দিন সাহেবের চাকরিটা ছোট হলেও গুরুত্বটা ছিল বিরাট। টেন্ডার মৌসুমে তার টেবিলে সওজ-এর প্রায় সকল ঠিকাদারকে একবার হলেও ধরনা দিতে হতো। আর সওজ-এ মৌসুম বলতে ভাই ওই একটাই- টেন্ডার মৌসুম। নানাবিধ ফাইলপত্রের যাত্রা শুরুর ইস্টিশন ছিল তার টেবিল।

কুতুবুদ্দিন আইবেকের বাবা ছিলেন কালিয়াকৈর দিনেশচন্দ্র হাই স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক। এরকম স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষকরা সন্তানদের নামকরণে যতই ঐতিহাসিক-সুলভ বাহাদুরি দেখাতে পারেন, দিনান্তে পরিবারের জন্য দুটো ভাতের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস ওঠে। কুতুবুদ্দিনের ঐতিহাসিক পিতা একসময় দারিদ্র্যের হাতে নিজের রাজ্যস্বত্ব ত্যাগ করে প্রায় নির্বাসনেই চলে গিয়েছিলেন। কুতুবুদ্দিন তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে আনলেন। তাকে সমাসীন করলেন শনির আখড়ার চকমেলানো রাজধানীতে তার পাঁচতলা প্রাসাদে। ছোট বড় যে আরও তিন ভাই ছিল কুতুবুদ্দিনের, যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল কালিয়াকৈর আর বাংলাদেশের দু-এক অন্ধ জনপদে, তাদেরও সংগ্রহ করে আনলেন সেই রাজধানীতে। তাদের অবশ্যি বিদ্যাবুদ্ধির কমতি ছিল না, কমতি ছিল শুধু ভাগ্যের অর্থাৎ সুযোগের অর্থাৎ টাকা-পয়সার। কিন্তু কেউ একজন ধাক্কা দিয়েও তাদের জাগতিক ইঞ্জিনটি স্টার্ট করে দেয়নি এতকাল। কুতুবুদ্দিন আইবেক দিলেন। তারপর তারা তরতরিয়ে এগিয়ে যেতে থাকল জগতের রাস্তায়। শনির আখড়া-নির্ভর নতুন আইবেক সাম্রাজ্য ক্রমশ বিকশিত হতে শুরু করল।

গত কুড়ি বছরে বাংলাদেশে যত মানুষ ফকির থেকে আমির হয়েছে, ভাই, তত মানুষ অনেক দেশের ইতিহাসে জন্মগ্রহণই করে নাই- বিশ্বাস না হলে মালদ্বীপ অথবা মনাকোর ইতিহাস পড়ে দেখুন; আর পড়ার ধৈর্য না থাকলে কুতুবুদ্দিনের ঐতিহাসিক বাবাকে জিজ্ঞেস করুন। ফলে, বাংলাদেশের বড় বড় শহর দালানে ভরে যেতে থাকল। শনির আখড়ায় একসময় এত দালান উঠল যে, কুতুবুদ্দিন আইবেক তার জানালা খুলে দেখতে পেলেন, চারদিকে আকাশ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে শুধু ইমারতরাজি। এক ফোঁটা নীল নেই সবুজ নেই। তিনি তার জানালা থেকে দেখলেন- না, আকাশ না বৃক্ষ না, বরং দেখলেন পাশের ফ্ল্যাটবাড়ির একটা ঘরে সোফায় বসে টিভি দেখছে এক তরুণ, আর তার একেবারে কোলে বসে আছে একটি স্খলিত বসনা তরুণী। তিনি তো অবাক। আসফিয়া তার অবাক দৃষ্টি অনুসরণ করে জানালায় এসে বাইরে তাকালেন। তারপর জানালার পর্দা টেনে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বললেন, নতুন বিয়ে করেছে তো। তারপর তিনি হঠাৎ কুতুবুদ্দিনের হাত ধরে বিছানার দিকে ঈষৎ টানলেন। আপনি আমি হলে এই টানার রহস্য ঠিকই ধরতে পারতাম। কিন্তু কুতুবুদ্দিন পারলেন না, অথবা চেষ্টাও করলেন না। তিনি বরং উত্তেজিত হয়ে অনুজ শের শাহ সুরির সঙ্গে বিষয়টার একটা ফয়সালা করার জন্য পাশের বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। না, তরুণ-তরুণীর যুগলবন্দী হয়ে টিভি দেখা নয়- ওই যে, এত দালান উঠছে চারদিকে, এখন কী করা যায়, সে বিষয়টি ফয়সালা করার জন্য।

আসফিয়া বেগম নীরবে দীর্ঘশ্বাস এবং হয়তো এক ফোঁটা গোপন অশ্রু ফেললেন। কবে শেষ উপগত হয়েছেন স্বামী আর কবে শেষ দিয়েছেন সঙ্গ(ম) সুখ? স্মৃতি হাতড়ে একটি দিন তারিখ স্মরণ করতে গিয়ে তিনি আতংকিত হয়ে আবিষ্কার করলেন, মুন্নার পঞ্চম জন্মবার্ষিকীর রাতে এক হঠাৎ ওঠা চাঁদের তাড়নায় হয়তো-বা শেষ নিষ্কণ্টক রতিক্রিয়া স¤পন্ন করেন তারা। তারপর যবনিকা, তারপর শুধু শূন্যতা। মুন্নার বয়স কিনা এখন সাত! হায়। সামান্য কান্নার ভাব উঠেছিল মনে। সেটি মোচন করার জন্য ঘরের বাতি নিভিয়ে আস্তে জানালার পর্দা সরালেন আসফিয়া বেগম। নাহ্। সেই গোলাপি নীল দৃশ্যের ওপর চালাক মেয়েটি জানালার পর্দা টেনে দিয়েছে। বাতিও নিভিয়েছে।

বেচারি আসফিয়া!

২.          

কুতুবুদ্দিন আইবেক যেদিন দেখলেন, উঁচু উঁচু দালানগুলো হাত বাড়িয়ে তার গলা টিপে ধরেছে যেন, সেদিন থেকে এক নিদারুণ আতংক তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তার আতংকটা নিদারুণ শুধু নয়, বিরাটও এবং একটা দুঃস্বপ্নের বেশে সে প্রায়ই হানা দেয়। সেটি এই : পাশের জমিতে শুল্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত পরিদর্শক আলাউদ্দিন মুন্সির সাততলা বাড়িটা এক ভোররাতের ভূমিকম্পে যেন ভেঙে পড়েছে তার পাঁচতলা বাড়ির ওপর। তাতে তার বাড়ি স¤পূর্ণ গুঁড়িয়ে গেছে, কারণ মুন্সির বাড়িটা কোটি টাকায় তৈরি, ভীষণ ভারী। মোটা দেয়াল, মার্বেলের মেঝে, মেহগনির দরোজা কপাট। তাছাড়া আজকাল মানুষ যেখানে প্লাস্টিকের পানির ট্যাঙ্ক লাগায়, সেখানে মুন্সির বাড়ির মাথায় বিশাল এক কংক্রিটের ওভারহেড ট্যাংক, ছোটখাটো একটা পুকুরের আকৃতির। তিনি হিসাব করে দেখেন, মুন্সির বাড়ি তার বাড়িটাকে চৌদ্দআনা গুঁড়িয়ে দিলেও দু’আনা অন্তত রক্ষা পাবে, তবে সেটা সামনের দিকে। সামনে রাস্তা ফাঁকা, রাস্তা পেরিয়ে পৌনে তিন কাঠা জমি ছিল ফাঁকা। সেদিক দিয়ে যারা বাঁচত, তাদের বেরিয়ে যাওয়ার অথবা উদ্ধার হওয়ার একটা সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু হায়! এতদিনের ফাঁকা জায়গা ভরাট হতে শুরু হয়েছে। সে জমিতে ছয়তলা বাড়ি তুলছেন জনাব আবদুল কুদ্দুস, পুলিশের দারোগা, কোনো এক থানার ওসি। তার বাড়িটাও কোটি টাকার। অতএব উঁচু এবং ভারী। কুতুবুদ্দিন আইবেক মাঝরাতে ঘুম ভেঙে সারা বিছানায় কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে থাকেন। তার বুক ধড়ফড় করে, তিনি ঘামতে ঘামতে তাড়িত কণ্ঠে স্ত্রীকে দুঃস্বপ্নের কথা বলেন। প্রথম প্রথম স্ত্রী সান্ত্বনা দিতেন। শুরুর দু-এক রাতে খুব আদর করে গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে নানান নরম কথাও বলেছেন। ‘দু-একটা ও রকম দুঃস্বপ্ন সবাই দেখে। ও কিছু না’, বলে নিজের গায়ের ওপর টেনেছেন তাকে। শরীরের দু-একটা স্পর্শকাতর জায়গায় হাত বুলিয়ে মনের গোপন ভাবটা ব্যক্ত করার চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু হা হতোস্মি! কুতুবুদ্দিন যে তাড়িত মানুষ। হয়তো এক ঘণ্টা নিদ্রাচ্ছন্ন পড়ে থেকে আবার উঠে বসেছেন ধড়ফড়িয়ে। অর্থাৎ আবার ভূমিকম্পের স্বপ্ন। শের শাহ সুরি অবশ্যি শুরুতে অগ্রজের ভূমিকম্পভীতি ভাগ করে নিতে অপারগ ছিলেন। ‘এসব কী বলছেন ভাইজান? কবে কখন ভূমিকম্প হবে, সে ভয়ে এখন আপনার রাতের ঘুম হারাম?’ তিনি শ্লেষের সুরে শুরু করলেও শীঘ্র গলা নরম করে বলেছেন- যেহেতু তিনি ভালোমতোই জানেন, যে হাত খাবার দেয়, সে হাতে কামড় দিতে নেই- ‘এসব নিয়ে ভাববেন না। আল্লাহতালার হাতে ছেড়ে দেন। তিনিই জন্ম-মৃত্যুর এবং সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগের মালিক। সালাত আদায় করেন, ভাইজান, দীনের পানিতে দিল পরিষ্কার করেন! সব ঠিক হয়ে যাবে।’

আগে শের শাহ সুরির ধর্মেকর্মে তেমন মতি ছিল না, কিন্তু এখন পোক্ত নামাজদার, পাড়ার মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। অগ্রজকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কুতুবুদ্দিন দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকেন ব্যবসাপাতি নিয়ে। দীনের কাজে সময় দেবেন কখন।

অগ্রজের ভূমিকম্পভীতি নিশ্চয় সেই অবহেলার শাস্তি, সুরী ভাবেন। কুতুবুদ্দিন অবশ্যি অপ্রত্যাশিত সমর্থন পেয়েছেন ঐতিহাসিক পিতা এবং অগ্রজ মোহাম্মদ ঘোরি থেকে। পিতা থাকেন মুহাম্মদ ঘোরির সঙ্গেই, সকালে ছানিপড়া চোখে দীর্ঘক্ষণ পত্রিকা পড়েন। পিতা জানালেন, ইদানীং ভূমিকম্প নিয়ে অনেক লেখা বেরোচ্ছে কাগজে। প্রথম আলো একটা গোলটেবিলও করেছে, ভূমিকম্প হলে কী করণীয়, সে বিষয়ে। সেখানে এক বক্তা বেশ কৌতুক করেই বলেছেন, করণীয় কিছুই থাকবে না বেশির ভাগ নাগরিকের যদি ঢাকায় ৬.৫ রিখটার স্কেলে একটা ভূমিকম্প হয়। কারণ তারা মুহূর্তেই লক্ষ লক্ষ টন ইট সিমেন্ট পাথর পিলার ইস্পাত মার্বেল কাঠ গাজী ট্যাংকের স্তূপের নিচে পড়ে তাৎক্ষণিক চিরনিদ্রায় চলে যাবেন। যারা বেঁচে থাকবেন, তাদেরও হাত-পা নাড়াবার জো থাকবে না। তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে সকলেই মরে পচে যাবেন। ঐতিহাসিক পিতা তার অমানুষিক স্মৃতি থেকে উদ্ধৃতি দিলেন : ‘তাছাড়া, তিতাসের গ্যাসলাইন ফেটে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূচনা হবে, তাতে যারা জীবিত থাকবেন, তারা পুড়ে কাবাব হয়ে যাবেন।’

মোহাম্মদ ঘোরি বললেন, ‘জানিস কুতুব, তোর ভয় আমাকেও ধরেছে এখন। রাতে আমিও ঘুমোতে পারি না। অনেক সময় রাস্তায় নেমে আসি। এখন কী হবে আমাদের, বল?’

কী বলার আছে, কুতুবুদ্দিন আইবেকের?

৩.          

কুতুবুদ্দিনের সবচেয়ে ছোট ভাই, ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি, যে সদ্য বিবাহ করেছে (কিছুটা দেরিতেই, কারণ তার বয়স ত্রিশ পেরিয়েছে), তার কাছে ভূমিকম্পের গল্প ফাঁদলে কিছুটা বিরক্ত হয়ে অগ্রজকে বলেছে, ‘ভাইজান, এ রকম আজগুবি স্বপ্ন নিয়ে কথা বলবেন না। জগতে অনেক ভালো কাজ ভালো চিন্তা করার আছে, ভালো স্বপ্ন দেখার আছে। ভূমিকম্প নিয়ে প্রতিরাতে স্বপ্ন দেখে নিজেকে মিজারেবল করেন কেন?’

খিলজিকে কুতুবুদ্দিন একটু সামলে চলেন। ছেলেটি স্বাধীনচেতা, একরোখা, খাবার দেনেওলা হাত কামড়াতে ভয় পায় না। তাছাড়া, তার হাতটাও যে এখন খাবার দেনেওলা! গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা ছিল। অস্ত্রটস্ত্রও ছিল। বস্তুত খিলজির জন্য আইবেক সাম্রাজ্যের গায়ে কোনো আঁচড় লাগেনি গত দশ বছরে, আঁচড় লাগার অনেক কারণ সত্ত্বেওÑ সেসব কারণ আপনারা আন্দাজ করতে পারেন। খিলজি এখন ব্যবসাপাতি করে। অগ্রজের দেওয়া পুঁজির উইঢিবিকে সে লাভের ছোটখাটো একটা পর্বতে পরিণত করেছে। তার কাছে ভূমিকম্পের ভয়ে মুহ্যমান হয়ে থাকার চেয়ে অনেক ভালো কাজ করার আছে- যেমন, নববিবাহিতদের নানা করণীয়। আসফিয়া বেগম জানেন, অগ্রজের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে সে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে কাজের মানুষ-টানুষকে বের করে দিয়ে জানালার পর্দা টেনে টিভি দেখতে বসবে, কোলে বসাবে স্ত্রীকে এবং স্ত্রীর বসন স্খলিত হতে হতে…।

আসফিয়া বেগম শিহরিত দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর চমকে চারদিকে তাকালেন। না, কেউ দেখেনি।

৪.          

ঐতিহাসিক পিতা, মোহাম্মদ ঘোরি এবং কুতুবুদ্দিন আইবেক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, ঢাকায় থাকা যাবে না, শনির আখড়াতে তো নয়-ই। যদি বাঁচতে হয়, তাহলে সমতল ভূমিতে নাতিউচ্চ বাসস্থানে যেতে হবে। সমতল ভূমি অর্থাৎ কালিয়াকৈর থেকে মাইল তিনেক গভীরে, ফৈজালি গ্রামে, যে গ্রাম থেকে আইবেক বংশের উত্থান। ফৈজালিতে প্রচুর জমি কিনেছেন কুতুবুদ্দিন, পল্লী বিদ্যুতের লাইনের ব্যবস্থাও করেছেন। ঘরবাড়ি বানিয়েছেন, একেবারে পাকা, সেসব ঘরবাড়ি তার বালকবেলার যৌথপরিবার-বান্ধব স্থাপত্য কল্পনায় সাজানো। বাড়ির সীমানার ভেতরে প্রথমে টুঙ্গিঘর, তারপর ফলবাগান। তারপর অন্দরমহল। সে মহলের ব্যাপ্তি একটা বড় উঠানের চারদিকে। অনেকগুলো ঘর, চার-পাঁচটা পরিবারের যৌথ অথবা আলাদা বসবাসের জন্য উত্তম। সেই বসবাসের আকাক্সক্ষায় প্রতিদিন আইবেক দলপতিরা একটা রণহুংকার দিতে থাকলেন, ‘ফৈজালি যামু।’

শুরুতে সুরি আর খিলজি প্রতিবাদ করেছে, বিরক্তি প্রকাশ করেছে। কুতুবুদ্দিনের পুঙ্খানুপুঙ্খ স্বপ্ন বর্ণনাকে তারা বলেছে অতিরঞ্জিত। কিন্তু কুতুবুদ্দিন এক নতুন বর্ণনার সূত্রপাত করলে সুরির প্রতিরোধ শিথিল হয়েছে। সে বর্ণনাটা এই রকম : ভূমিকম্পে সারা শহরের মানুষ চাপা পড়েছে। যারা ভাগ্যবান, যারা চাপা পড়েনি, তারা রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু যেটুকু রাস্তা অবশিষ্ট সে কি রাস্তা, না জঙ্গল? আশপাশের সব গ্রাম থেকে ছুটে এসেছে মানুষ। তারা শ্বাপদের মতো ঘুরছে সেই (অবশিষ্ট) রাস্তায়। বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, খাদ্য নেই। চলছে ল্টুপাট। যে যেখানে যা পাচ্ছে, লুট করে নিচ্ছে। আইন নেই, শৃঙ্খলা নেই, পুলিশ নেই, মিলিটারি নেই। চরম অরাজকতা। মাগো!

এই লুটতরাজের সঙ্গে অবধারিতভাবে যুক্ত হচ্ছে খুন ও ধর্ষণ। কেউ বাধা দিলে খুন, যে কোনো যুবতী মেয়েকে দেখা পেলেই ধর্ষণ। ‘কে বাধা দেবে?’ কুতুবুদ্দিন আইবেক ভাতিজি পিংকি (৯) এবং ভাবি সফেনা বেগম (৪৯)-এর দিকে কৌণিক তাকিয়ে দাঁত দিয়ে কথাগুলোকে পিষতে পিষতে বললেন, ‘শুধু যুবতী কেন, নয় থেকে উনপঞ্চাশ, কেউ রক্ষা পাবে না।’ তারপর অনুজ সুরির দিকে তাকিয়ে, কথাগুলো যেন উত্তপ্ত বালিতে সেঁকে নিয়ে বললেন, ‘প্রাণ গেলে প্রাণ যায়, কিন্তু ইজ্জত গেলে সব যায়। কোনো মেয়ের ইজ্জত গেলে সেই পরিবারের সকলের এক লক্ষবার মৃত্যু হয়।’

শের শাহ সুরির সঙ্গে একটি শ্যালিকাও থাকে, হোম ইকোনোমিকস্ কলেজে পড়ে। কুতুবুদ্দিনের বর্ণনার আঘাতে সুরি আচমকা দেখতে পেলেন বিধ্বস্ত শহরের আলোহীন শ্বাপদসংকুল রাস্তায় স্ত্রী ও শ্যালিকা প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করছেন, তারা বে-আব্রু এবং তাদের পেছনে ৮-৯ উল্লাসরত গ্রামবাসী যুবক। মাগো! তিনি স্ত্রী, শ্যালিকা এবং পাঁচ বছরের শিশুকন্যার জন্য যারপরনাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।

আধা মাস ধরে ভূমিকম্প-ভয়ের সঙ্গে আইবেক বংশের স্ত্রী-কন্যাদের ইজ্জত হারানোর ভয়টা সকলের গায়ে কাঁটা দিয়ে বেড়াতে লাগল। তাদের রাতের ঘুম নষ্ট হলো। পিংকির বড় বোন বাবলি, বয়স ২২, এমন ভীত হয়ে পড়ল যে, সে কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিল। সে সুরির শ্যালিকা মনিজার সঙ্গে পড়ে। একসঙ্গে কলেজে যায়, আসে। বাবলি কলেজ খতম করে দিলে মনিজাকেও ইচ্ছার প্রবল বিরুদ্ধে, কলেজ যাওয়া বন্ধ করতে হলো। সুরীর স্ত্রী পিতৃমাতৃহীন অনুজাকে সান্ত্বনা দিল, ‘কটা দিন সবুর কর। তার পর সব ঠিক হয়ে যাবে।’

কিন্তু এই ক’টা দিনও মনিজা ঘরে বসে থাকতে চায় না। তার কাছে কলেজের জীবন এবং কলেজের বাইরে ঘণ্টাখানেক রোজ নিউমার্কেট গাউসিয়া ঘুরে বেড়ানোর জীবন অনেক বেশি রঙিন।

আইবেক দলপতিদের ‘ফৈজালি যামু’ আন্দোলনে এবার যুক্ত হলো খিলজির সমর্থন। অবাক কাণ্ড। এত শক্তিশালী, একরোখা, কুসংস্কারমুক্ত খিলজির মতো পরিবর্তনের কী হেতু? না, হেতুটা খুবই সরল। খিলজিরা এখন ক্ষমতায় নেই। কাজেই যৎসামান্য অসুবিধাতো হবেই তার। তার ওপর সম্প্রতি তারই প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় প্রতিপক্ষের তিন চাঁই ধরা পড়ে মাসখানেক জেল খেটে বেরিয়ে এসে অসুবিধাটা অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিন পাড়ার প্যারাডাইস সেলুনে যখন চুল কাটছিল সে, জেল খাটা দুই চাঁই, কানা খলিল্যা আর বান্টু ভাই, এসে তাকে একটু শাসিয়েছে। বান্টু ভাই একটা ক্ষুর গলার কাছে ধরে বলেছে, ‘খিলজি ভাই, অনেক ঝামেলা করছেন। এহন এট্টু তফাৎ থাহেন।’ তারপর চোখ নাচিয়ে বলল, ‘শুনলাম কারে তুইল্ল্যা আইন্ন্যা বিয়া করছেন? লোকে কয় ফিল্মের হিরোইনদের মতো সোন্দর? হাছানি, খিলজি ভাই?’ খিলজির ব্যবসায়ে যৎসামান্য টান পড়েছে খলিল্যা আর বান্টু ভাইয়ের কারণে, কিন্তু তার থেকে বড় টান পড়ল এবার তার দিলে, এসব ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তায়। তুলে আনার মানে কী? শুরুতে আপত্তি ছিল রাফিয়ার। নিশ্চয়। একটু জোর না খাটালে কি চলত? কিন্তু এখন?

এতএব বৌকে ফৈজালি পাঠিয়ে দেওয়াই নিরাপদ। খিলজির এটুকু আত্মবিশ্বাস আছে, ফৈজালিতে এ দুই মক্কেল কোনো কুমতলব নিয়ে হাজির হলে জ্যান্ত গোর হয়ে যাবে।

৫.          

ফৈজালিতে এসে প্রথম প্রথম বেশ ভালোই লাগল সকলের, এমনকি বাচ্চাদেরও। ঐতিহাসিক পিতা ও ভূমিকম্প-ভয়ে কাতর সন্তানদের বুক থেকে ভার  নেমে গেল। তাদের মনে হতে লাগল, তারা মুক্ত, নবজন্মপ্রাপ্ত। ফৈজালি থেকে ঢাকায় যেতে ঘণ্টা আড়াই লেগে যায় বটে, কিন্তু সপ্তাহে তিন দিন একটু কষ্ট না হয় হলো। তাছাড়া, গাড়িতে ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে পড়ে থাকতে থাকতে কুতুবুদ্দিনের মনে হয়, স্ত্রী পুত্র কন্যা পিতা এবং ভাইদের পরিবারের সকলে নিরাপদে, অক্ষত শরীরে আছেন, থাকবেন তাদের স্বাভাবিক জীবনকাল পর্যন্ত, এ চিন্তাটিতে যে তৃপ্তি, তার ধারেকাছে কোনো চিন্তাই আসতে পারে না। টাকার পাহাড়ের চূড়ায় যারা বসে থাকে, তাদের জন্য একটা দু-টা নিচের পাথর খসে পড়া, অথবা একটা দু-টা আস্ত টুকরো ধসে পড়া, কোনো ব্যাপার না। তিনি জানেন পরিবারের আয়টা যথেষ্ট কমে গেলেও এখনও যথেষ্ট থেকে যথেষ্টই বেশি। এই সোজা হিসাবের আনন্দ কুতুবুদ্দিনের সকল কষ্টকে ধুয়েমুছে দিল।

কুতুবুদ্দিন এবং ঘোরি এবং অবাক কাণ্ড, (এখন) শের শাহ সুরিও বিশ্বাস করেন ভূমিকম্প দিনে হয় না, হয় রাতে। কুতুবুদ্দিনের স্বপ্ন কাঁপানো ভূমিকম্প হানা দেয় ভোররাতে, যখন সবাই ঘুমিয়ে। এ জন্য সারাদিন তারা ঢাকার ব্যবসা পাড়ার উঁচু উঁচু দালানে লিফট বেয়ে উঠতেও সামান্য ভয়ও পান না।

তবে, একটা দুঃস্বপ্ন মুক্ত হয়ে কুতুবউদ্দিন আইবেক আরেক দুঃস্বপ্নের কবলে পড়লেন। এটি আমাদের কাছে অবাক হওয়ার বিষয় হলেও মনস্তত্ত্ববিদদের কাছে অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। কুতুবুদ্দিনের দ্বিতীয় দুঃস্বপ্নটি অবশ্য প্রথম দুঃস্বপ্নের মতো এত বিরাট নয়। তবুও দুঃস্বপ্ন বলে কথা। তিনি গাড়িতে ঢাকা থেকে ফৈজালি ফিরতে ফিরতে একদিন একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। হঠাৎ বুক কাঁপিয়ে একটা ভয়ের শিহরণ খেলে গেল। তার তন্দ্রা ছুটে গেল। তিনি সোজা হয়ে বসে সুরিকে বললেন, ‘শোন, ঢাকায় যদি ভূমিকম্প হয় তাহলে কি মনে করিস শুধু ঢাকার মানুষই মরবে, সাফার করবে, আর এই ফৈজালিতে আমরা বেঁচে যাব, আমাদের গায়ে আঁচড়টিও পড়বে না?’

সুরি বললেন, ‘বুঝতে পারলাম না ভাইজান, কী বলছেন।’

‘বলছি মহামারির কথা। ঢাকার ভূমিকম্পের পরে যে বিরাট মহামারি দেখা দেবে, তা এই ফৈজালিতে আমাদের ঘরেও ঢুকবে।’

সুরি উচ্চ স্বরে ‘নাউজুবিল্লাহ’ বলে একটু বিরক্তি প্রকাশ করলেন। ‘কী যে বলেন ভাইজান। আপনার কথা কিছু বুঝতে পারি না। খালি ভয় লাগে।’

৬.          

মহামারি ব্যাপারটা যেহেতু ভূমিকম্পের মতো এত নাটকীয় নয়, এর দৃশ্যসূচিও তেমন চোখ কাঁপানো নয়, সেজন্য তার প্রভাবটা তেমন তীব্র হলো না, যদিও ঝাড়ু দিয়ে বিষয়টা একেবারে গালিচার নিচে পাঠিয়ে দিতেও ইচ্ছুক ছিল না কেউ। ভূমিকম্পের তুলনায় মহামারি ম্রিয়মাণ হলেও এর প্রত্যক্ষ ফল সমান ভীতিজনক। মৃত্যু যেভাবেই আসুক, মৃত্যুই। সে জন্য আইবেক পরিবার মিলাদ পড়িয়ে, পির আনিয়ে, ঘর বাঁধিয়ে এই উপদ্রব থেকে নিস্তার পেতে চাইল। মনের গোপন কোণ থেকে একটা আতংকের কালো ছায়া তবুও বিদায় হতে চাইল না।

আইবেক পুরুষরা এখন আগের মতোই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, শুরুতে তিন দিন হলেও এখন ৫-৬ দিনই ঢাকা যাচ্ছেন। বাচ্চারা হৈ হৈ করে স্কুলে যাচ্ছে, আগের মতোই, বরং এখন আরও বেশি হৈ হৈ করে উঠানে মাঠে পুকুরে তাণ্ডব করছে। শুধু মেয়েদের সময়টা নিশ্চল হয়ে গেছে। পল্লি-বিদ্যুতের ভালোবাসায় ঘরে টিভি আছে, ফ্রিজ আছে। কিন্তু রাপা প্লাজা, কর্ণফুলী গার্ডেন আর গাউসিয়ার শপিং? কোথায় মধুমিতায় গিয়ে মাঝে মধ্যে সিনেমা দেখা? কোথায় সোহাগ না হয় নিউ প্রিয়াংকায় বিয়ের দাওয়াত খেতে যাওয়া? যাবার আগে নিউ ড্যামসেল হেয়ার ড্রেসারে চুল বাঁধিয়ে নেওয়া? বাবলি ভয়ে কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল, এখন সে খুব পস্তাচ্ছে। ‘কেন যে এই কাজটা করেছিলাম, মনিজারে!’ সে মনিজাকে বলে আর সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করে। মনিজাও এখন ফৈজালিতে কারণ তার যাবার কোনো জায়গা নেই। ইদানীং তাকে এবং আপাকে উঠানের বাইরে কোথাও যেতে কড়া নিষেধ করেছেন দুলাভাই। কারণ পর্দা। এখন কী করা?

এ রকম অবস্থায় অবরোধবাসিনীদের একজন হঠাৎ, এক রাতে, গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি মোহাম্মদ ঘোরির পত্নী সফেনা বেগম। তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা, বমি, উঁচু টেম্পারেচার। ব্যথার চোটে তিনি কাতরাতে থাকলে কুতুবুদ্দিন আইবেক নিজের পত্নীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাবির কী সমস্যা?’ আসফিয়া বেগম নিচুস্বরে বললেন, ‘স্ত্রীরোগ’। কুতুবুদ্দিন ‘ও’ বলে চুপ করে গেলেন। তারপর, ভোর হলে অনুজ সুরিকে নিয়ে কালিয়াকৈর রওনা হলেন, উদ্দেশ্য ডাক্তার ডেকে আনা। ঢাকা যাবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু দুই কারণে যাননি। এক. ঢাকা থেকে কোনো ভালো ডাক্তার ফৈজালি আসবে না। আর দুই. অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো এবং ঐতিহাসিক পিতাও ছানি পড়া চোখে তাকে দেখে সায় দিলেন, সফেনা বেগমের শরীর মোটেও ভালো না।

কালিয়াকৈরে ডাক্তারের সংখ্যা প্রচুর নয়। তাছাড়া, ভোরবেলা সবাইকে পাওয়া যায় না। তারা শেষ পর্যন্ত যাকে পেলেন, সে যাত্রার নায়ক হিসেবে উৎকৃষ্ট হতে পারত, কিন্তু ডাক্তার হিসেবে কেমন হবে, এ সন্দেহ রয়েই গেল। তদুপরি ডাক্তার একটা অপ্রয়োজনীয় কথাও বলল না, ফি নিয়ে দাম-দরও করল না। শুধু ব্যাগ হাতে নিঃশব্দে গাড়িতে উঠে বসল। শের শাহ সুরির মনে হলো, পুরুষ রোগীকে দিয়ে স্ত্রীলোকের রোগ দেখানো একটা বড় গর্হিত কাজ। আর এ রকম তরুণ পুরুষ ডাক্তার দিয়ে! আল্লাহ মালিক। অন্তত মনিকা অথবা মনিজা অসুস্থ হয়নি।

 তরুণ ডাক্তার, যার নাম রেজাউল করিম, সফেনা বেগমকে দশ মিনিট দেখেই একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল। ব্যাগ থেকে এক ফাইল ওষুধ বের করে নিজেই এক ডোজ খাওয়াল রোগিনীকে। তারপর মোহাম্মদ ঘোরিকে ওষুধটা বুঝিয়ে দিয়ে, একটা কাগজে আরও দুটি ওষুধের নাম লিখে সেগুলো কালিয়াকৈরের কোথায় কিনতে পাওয়া যাবে সেই নির্দেশনা দিয়ে ঘরের বাইরে যাবার জন্য পা রাখল। কৃতজ্ঞ মোহাম্মদ ঘোরি তার হাতে একটা পাঁচশ’ টাকার নোট গুঁজে দিলেন। ডা. করিম ঈষৎ হেসে টাকাটা পকেটে পুরে বেরিয়ে গেল। যাবার সময় বলল, ‘একটা বাজে পেটের পীড়ার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। সকলে একটু সাবধানে থাকবেন। তেল-চর্বি আর ভাজাপোড়া খাবার পরিহার করবেন।’

কথাগুলো অনেকগুলো নারীমুখের দিকে তাকিয়েই বলল রেজাউল। নারীমুখগুলো খুব উৎসুক হয়ে তাকে দেখছিল। কয়েকটি মুখে ডাক্তার এমন এক অনুভূতি দেখতে পেল, যার সঙ্গে সে নেহাৎ অপরিচিত নয়। সে তার পৌরুষকে অভিনন্দিত করল। সে দেখল, অন্তত তিনজনের চোখে পলক পড়ছে না, তিনজনের নিশ্বাসও যেন বন্ধ হয়ে আছে, তিনজনের যেন পা কাঁপছে, এখুনি পড়ে যাবে। সে জানে, এই লক্ষণগুলো একটি বিশেষ রোগের, যা এখন এই পরিবারে একটা ছোটখাটো মহামারি বাধিয়ে ফেলতে পারে।

ডা. রেজাউল করিম চলে যাওয়ার পর আইবেক পরিবারের অন্দরমহলে একটা অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এলো। সারাদিন তিনজন টিভি দেখল না, তেমন কিছু খেতেও পারল না। দৃষ্টি কিছুটা উদ্ভ্রান্ত, নিশ্বাসের ওঠানামা অনিশ্চিত। সন্ধ্যার মধ্যে সফেনা বেগম সুস্থ হয়ে উঠলেন। তিনি তরুণ ডাক্তারের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন, তাতে তিনজনের মুখে কিছু গোলাপি ছায়াও খেলল।

শেষ রাতে মনিকা অসুস্থ হয়ে পড়ল। একই রকম অসুখ। শের শাহ সুরি বললেন, ডাক্তারের দরকার নেই। ভাবির ওষুধ খেলেই মনিকা ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু কুতুবুদ্দিন আইবেক তা নাকচ করে দিলেন। ডাক্তার আসবে, দেখবে, তারপর ওষুধ দেবে। তাছাড়া, তার মনে একটা শংকাও কাজ করে : পরপর দু’রাতে দু’জন অসুস্থ। আল্লাহ জানেন। কী তাঁর উদ্দেশ্য, এই জগৎ সংসার ফৈজালি আর আইবেক পরিবার নিয়ে।

ডা. রেজাউল করিম এবার রোগিনীকে পঁচিশ মিনিট পরীক্ষা করল। তারপর ওষুধ লিখে দিলো। শেরশাহ সুরি তাকে দুইশ’ টাকা দিলেন, তারপর কালিয়াকৈর পৌঁছে দিয়ে ওষুধ কিনে বাড়ি ফিরলেন। ফিরতে না ফিরতেই দেখলেন, খিলজির স্ত্রী আক্রান্ত হয়েছে। তার অবস্থাটা আরেকটু বেশি সিরিয়াস। অতএব আবার ডাক্তারকে আনো। আবার ডাক্তারকে পৌঁছে দাও, আবার ওষুধপত্র কেনো। আবার ডাক্তারকে আনো, কারণ বাবলি আর মনিজা একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

মহামারিই বটে।

ডা. রেজাউল করিমকে বেশ ঘন ঘন আসতে হলো অতঃপর। একদিন সফেনা বেগমের তীক্ষè উপস্থিতিতে সে দীর্ঘক্ষণ বাবলীকে দেখল, মনিজাকে দেখল। বলল, আপনারা এখন ভালো।

বাবলি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল আমরা ভালো নই- বলে, সফেনা বেগম একটু আড়াল হতেই, রেজাউলের হাতটা টেনে ধরল। রেজাউল হেসে হাত ছাড়িয়ে নিল। এবার মনিজা টানল তার হাত। রেজাউল তার হাতও ছাড়িয়ে নিল। তারপর উঠে চলে গেল।

সেই দিন সন্ধ্যায়, কেন জানি হয়তো ছোটখাটো কোনো তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে বাবলি আর মনিজার খুব ঝগড়া হলো। এমন ঝগড়া যে, শেষ পর্যন্ত বড়দের হস্তক্ষেপ করতে হলো। কিন্তু ততক্ষণে কাঁচি দিয়ে মনিজার তলপেটে বেশ একটা কোপ দিয়ে ফেলেছে বাবলি। ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করেছে। এবং বাবলি তার দীর্ঘদিনের প্রিয় বন্ধুকে বলেছে, ‘ফকিরের মাইয়া, ফকিরের লাহান পইড়া আছস আমাগো বাসায়। অহন আমার উফরদ্যা হাত বাড়াইতে চাস? তোর হাতডা আমি ভাইঙ্গা এক্কেরে হান্দাইয়া দিমু।’ তার ভাষা শুনে মনিকার প্রায় চেতনা লোপ পেল। প্রায় চেতনালুপ্ত মনিকা ও স্ত্রীকে নিয়ে সুরি গেল ঢাকা মেডিক্যালে।

বাবলি ঘরের দরজায় খিল দিয়ে শুয়ে পড়ল। আসলে শুয়ে পড়ল না। রাত আটটার সময় জানালা খুলে বাগানে নেমে পড়ল। ডাক্তার রেজাউল বলেছে তার জন্য অপেক্ষা করবে। ফৈজালি থেকে কালিয়াকৈর কতক্ষণ লাগবে একটা ভ্যানে যেতে? যতক্ষণ লাগুক। ভ্যানচালক রবিউলের স্ত্রীকে পাঁচশ’ টাকা অগ্রিম দিয়ে রেখেছে বাবলি।

কিন্তু যথাস্থানে ভ্যান নেই। অবাক। বাবলি এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর একটু হেঁটে অন্ধকার শালবনের ভিতর দিয়ে ভয় পেতে পেতে রবিউলের বাড়িতে হাজির হলো। রবিউলের স্ত্রী তাকে দেখে তো অবাক। কেন আফা, ওতো চইল্যা গেল। এক ঘণ্টা হইল।

বাবলি রাগে দুঃখে রবিউলের স্ত্রীকে দুই ঘা লাগাল। তারপর সিদ্ধান্ত নিল, আজ সে হেঁটেই কালিয়াকৈর যাবে। রেজাউল তার জন্য অপেক্ষা করছে।

হ্যাঁ, বাবলি হাঁটা দিল। রাত সাড়ে আটটায়!

৭.          

পরদিন বাবলিকে পাওয়া গেল ফৈজালি থেকে সোয়া মাইল দূরে শালবনে। পথ ভুলে সারারাত শালবনে ঘুরে ঘুরে শেষ পর্যন্ত জ্ঞান হারিয়ে পড়ে ছিল শালের পাতার স্তূপে। বেশ অপ্রকৃতিস্থ। আলুথালু বেশবাস। তবে অক্ষত। হ্যাঁ অক্ষত। এ কথাটা জোর দিয়ে বলল আইবেক পরিবার। তাকে জিনে ডেকে নিয়ে গেছে রাতে। জিন কিছু খোঁচাখুঁচি করেছে শরীরে। বাকিটা করেছে রাতের জঙ্গল। আইবেক পরিবার এ কথাটা বিশ্বাস করেই সবাইকে বলল। অথবা সবাইকে বলতে বলতে বিশ্বাস করল।

কিন্তু একজনকে পাওয়া গেল না। সে খিলজীর স্ত্রী রাফিয়া। সে যেন হাওয়া হয়ে গেছে। আর পাওয়া গেল না ডা. রেজাউল করিমকে। সে-ও হাওয়া। স্থানীয় লোকজন বলল, কোথায় গেছে তারা জানে না, চট্টগ্রাম গিয়ে দেখতে পারেন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া বা রাউজানে বাড়ি, এরকম তারা শুনেছে।

আরও পাওয়া গেল না একটা স্যুটকেস, যা ভর্তি ছিল পাঁচশ’ টাকার বান্ডিল, সোনার গয়না, ডলার ও ইউরোর নোটে। ভূমিকম্পের ভয়ে এসব ফৈজালিতে এনে রেখেছিলেন কুতুবুদ্দিন আর খিলজি। খিলজির ব্যাপারে আরও বলা যায়, হয়তো কানা খলিল্যা আর বান্টু ভাইয়ের ভয়ও ছিল সেই সঙ্গে। কে জানে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : কথাসাহিত্যিক

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares