উপন্যাস : নক্ষত্রের তুমুল চুমুক : মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ । ।

‘আমাকে কি তোমার পাগল বলে মনে হয়!’

ইনিসী মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব কথা বলে; এসব কথার কোনো উত্তর হয় না, আমিও এই কথার উত্তর না দিয়ে হাসিমুখে তার দিকে তাকাই। ইনিসী তার বড় বড় চোখ আরও বড় করে বলে, ‘মাঝে মাঝে আমার খুব অস্থির লাগে। কী করব বুঝতে পারি না। কোথাও যেতে ইচ্ছা করে!… কোথায় জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা প্রেম করে ফেলি!’ -হতভম্ব হয়ে ইনিসীর দিকে তাকাই; আমরা বসে আছি সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির মাঠে, সন্ধ্যার কিছু পরেÑ দু’জন বসে বসে চা-শিঙাড়া খাই, গল্প করি; হাসিÑ এর মধ্যে ইনিসীর কথা আমাকে হতভম্ব করে দেয়।

ইনিসী ঘোরের মধ্যে থেকে যেন কথা বলতে থাকে, ‘কেমন একটা ডিপ্রেশন হয়, বুঝলে! ভেতরে অসম্ভব একটা অস্থিরতা!’

চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে, মাঠের মধ্যিখানে বসে থাকি আমরা; অস্পষ্ট অন্ধকারে ইনিসীর তীক্ষè চোখ দেখার চেষ্টা করি, পিঠ ছাওয়া ঘন চুল ঘাড়ের দু’পাশ দিয়ে সামনে নিয়ে আসে, ফতুয়া-জিন্স পরা ইনিসী ঘাসে বসে উদ্বিগ্ন স্বরে আবার বলে, ‘আচ্ছা, আমাকে কি তোমার পাগল বলে মনে হয়!’

নামের মতোই অদ্ভুত মেয়ে ইনিসী।

তাকে প্রথম দেখি দুই বছর আগে। সেবার জানুয়ারিতে শিল্পকলা একাডেমির প্রযোজনায় ‘রক্তকরবী’ নাটক মঞ্চায়ন হবে, সব নাট্যদল থেকে নাট্যকর্মী আহ্বান করা হয়, আমি যাই ঢাকা থিয়েটার থেকে, ইনিসী নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় থেকে; সেখানেই আমাদের পরিচয়। আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র, ইনিসী বুয়েটের আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের ফোর্থ ইয়ার। আমাদের নির্দেশক আতাউর রহমান, আতা ভাই।

আমরা একটানা ৭৩ দিন রিহার্সল করি ‘রক্তকরবী’ নাটকের, ইনিসী অবধারিত নন্দিনী- সেই ডাগর চোখ, তীক্ষ্ন নাক-চোখ-মুখ-ভ্রু- পাখির দুই ডানা, লালাভ ফর্সা গায়ের রঙ, বেতস লতার মতো নিখুঁত শরীরে লম্বা-প্রাণবন্ত ইনিসী যখন মাথায়-চুলে-শরীরে ফুল দিয়ে সেজে মঞ্চে এসে গান ধরে, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে/আয় রে চলে/আয় আয় আয়’- আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় রবীন্দ্রনাথ ইনিসীকে কল্পনা করেই নন্দিনী রচনা করেছিলেন; মঞ্চ ভরে ওঠে যখন ইনিসী নাচতে নাচতে গাইতে থাকে- হাওয়ার নেশায় উঠল মেতে/দিকবধূরা ধানের খেতে…’ -কোনো কোনো মানুষ যে প্রাণের ভেতর থেকে হাসে, চোখের ভেতর থেকে হাসে- ইনিসীর হাসিভরা গান আমাকে তা জানিয়ে দেয় : ‘মাঠের বাঁশি  শুনে শুনে আকাশ খুশি হলো-/ঘরেতে আজ কে রবে গো! খোলো দুয়ার খোলো…’

‘রক্তকরবী’তে আমিও একটা চরিত্র পাই। অধ্যাপক। নন্দিনী মানে ইনিসীর সাথে বহু বোঝাপড়া করি মঞ্চে অধ্যাপক সেজে, কাছের মানুষজন আমার অভিনয়কে ভালো বলে; নাটকের শো করি একটানা পাঁচ দিন; ২০১৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি- ব্যস, তারপর ‘রক্তকরবী’ আমাদের জন্য আপাতত শেষ হয়- অবশ্যি মাঝে মধ্যে রবীন্দ্রনাথ উপলক্ষ্যে নানা দিবসে শিল্পকলা একাডেমি নাটকটির বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করে, প্রদর্শনীর আগে দু-পাঁচদিন আমরা রিহার্সল করি।

ঢাকার বেশ ক’টি দলের প্রায় শ’খানেক নাট্যকর্মী ছিল ‘রক্তকরবী’তে। টানা ৭৩ দিন, নাটকের শো শেষে আমরা যে যার দিকে চলে যাই, ইনিসীর সাথে আমার যোগাযোগ রয়ে যায়।

‘রক্তকরবী’র নন্দিনী সে, সবার আগ্রহের কেন্দ্রে, আমাকে পাত্তা দেবার তার কোনো কারণ নেই, তখন রিহার্সলের ১৫-২০ দিন; আমি অধ্যাপক চরিত্রটি মন দিয়ে করার চেষ্ট করি, মঞ্চ যখন ভাগ করি একসাথে, নন্দিনী মানে ইনিসীর চোখের দিকে তাকাই, থিয়েটারের পরিভাষায় যাকে বলে আই কন্টাক্ট- মনে হয় গভীর সমুদ্রের সামনে আমি!… কিন্তু ইনিসী প্রাণবন্ত, নন্দিনীর মতোইÑ মুক্তবিহঙ্গের মতো উড়ে উড়ে বেড়ায়। একদিন রিহার্সল শেষে ইনিসী এগিয়ে আসে, ‘আপনি জাহাঙ্গীরনগরের নাট্যতত্ত্বের না? রুবায়েতদের ব্যাচ?’

আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ি।

ইনিসী বলে, ‘সবাই আমার নামের অর্থ জিজ্ঞেস করে। আপনি করলেন না।’

‘হবে একটা কিছু। নামে কি আসে যায়?’

‘অনেক কিছু আসে যায়। আপনার নাম রঞ্জু। রক্তকরবীর রঞ্জন থেকে নেওয়া নিশ্চয়ই!’

‘জি না। আমার বাবা-মা এত রবীন্দ্রপ্রেমী নন। একটা নাম রাখতে হয়, রেখেছেন!’

‘আমার নাম… বুঝলেন… ইনিসী। জাপানি শব্দ। রাশিয়ান একটা নদীর নাম ইনিসী। জাপানি ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে, এ মিস্টিরিয়াস রিলেশনশিপ দ্যাট বাইন্ডস টু পিপল টুগেদার!… রহস্যময় একটা সম্পর্ক যা মানুষকে বেঁধে রাখে..!’

অবাক হয়ে ইনিসীর দিকে তাকাই, মেয়েটা নিজের থেকে হঠাৎ এত কথা বলে; ইনিসী বলতে থাকে, ‘রাশিয়ার ইনিসী নদী আলতাই পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়েছে। এশিয়ার বিস্তৃত সমতল ভূমির সবচেয়ে বড় নদীগুলোর একটি হলো এই ইনিসী।’ কথা বলতে বলতে হঠাৎ চলে যায় ইনিসী, আমার ভালো লাগে তার সহজ কথা বলার ভঙ্গি আর হাসি; ভাবিÑ এরপর হয়তো আমাদের আরও কথা হবে; কিন্তু না, পরদিন দেখি খেয়ালই করে না আমাকে, আমিও আর কথা বাড়াই না। এভাবে কয়েকদিন যায়।

আরেকদিন রিহার্সলের বিরতিতে মেঝেয় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছি; ইনিসী কাছে এসে বলে, ‘এইযে রঞ্জন বাবু, মুখ আমসি করে বসে আছেন কেন? শরীর খারাপ?’

ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলি, ‘না। না। এমনিতেই…!’

‘আরে, উঠে বসছেন কেন? বসব আপনার পাশে।… আপনিও বসুন… আপনার কাছে সিগারেট আছে? সিগারেট খাবো!’

ইনিসী আমার পাশে মেঝেতে বসে। পকেট থেকে সিগারেট বের করে দিতে দিতে আমি বলে বসি,        ‘আচ্ছা, আপনার এই অদ্ভুত নাম কে রেখেছে? এ মিস্টিরিয়াস রিলেশনশিপ দ্যাট বাইন্ডস টু পিপল টুগেদার…!’

‘বাপ রে! একেবারে মুখস্থ করে রাখছেন? দেখলে তো মনে হয়, কিছুই খেয়াল করেন না?’

‘কী আবার খেয়াল করব? কে রেখেছে এই নাম? আপনার বাবা? তিনি কী করেন?’

‘বাবাই রেখেছেন। তিনি খুলনার বয়রা গার্লস কলেজের ইংরেজির টিচার। একসময় কবিতা লিখতেন। তাই হয়তো রেখেছেন!’

‘আপনার নামের অর্থ খুব সুন্দর!’ আমি বলি।

‘আর আমি? আমি সুন্দর না?’ ইনিসী সিগারেটে টান দিতে দিতে বলে।

‘সেটা আপনি খুব ভালোই জানেন।’ আমি বলি।

‘তা আপনার বলতে কী খুব অসুবিধা? নাকি লজ্জা পাচ্ছেন বলতে?’

‘তা কেন! যেটা জানেন, সেটা আবার বলবার দরকার কী!’

ইনিসীর সাথে আমার বন্ধুত্ব হবার কথা না। ফারজানা হক ইনিসী সে চোখ ধাঁধানো সুন্দরী, নানা গুণ তারÑ বুয়েটের ছাত্রী, তার পরিমণ্ডল আলাদা; আমি তখনও জাহাঙ্গীরনগরে নাট্যতত্ত্বের ছাত্র, এ অবস্থায় আমাদের আশ্চর্য বন্ধুত্বের শুরু। আমরা ঢাকা শহরের এ-প্রা›ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত হাঁটতে শুরু করি। আর কফি খাই, আর চা খাই- ফুটপাতের টংয়ের দোকান থেকে শুরু করে ধানমন্ডি-বনানী-গুলশানের অজস্র চা-কফির দোকানে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি; বড় বোনের বাসা উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে; আমি যতই নিষেধ করি ইনিসীকে- তোমাকে বুয়েটে দিয়ে আমি বাসে করে উত্তরা ফিরব; সে তাতে রাজি হয় না। সে আমাকে উত্তরা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বাসে করে একা ফিরতে চায়! …অসম্ভব, আমি তা মানতে চাই না, উত্তরা থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত আবার আসি, ইনিসীকে হলে পৌঁছে দিয়ে এসএম হলে আমাদের নাটকের দলের ছোট ভাই শান্তর রুমে রাতে থাকি।

অবিশ্রান্ত হাঁটা আর অবিরাম চা-কফি খাওয়ার মধ্যেই ইনিসী তার জীবনের টুকরো টুকরো গল্প করে। আমার বলবার মতো গল্প খুঁজে পাই না; তাই আমি শুনি বেশি, ইনিসী বলে।

ইনিসীর বাড়ি খুলনায়। সেখানেই স্কুল, কলেজ শেষে বুয়েট।

‘বুঝলা…আমার সরলসোজা জীবন। বুয়েটে সেকেন্ড ইয়ারে এক কবির প্রেমে পড়ি! ধুর, শালা সারাদিন গান্জা খেয়ে পড়ে থাকত। আরও কী সব নেশাফেশা! জীবন বরবাদ করে দিছিল!’ একদিন আমরা হাঁটছি চন্দ্রিমা উদ্যানের পাশ দিয়ে, ইনিসী বলে ওঠে, ‘এই রাস্তাটা দুনিয়ার সেরা রাস্তা! কী ছিমছাম! মনে হয়, রাস্তাটা কানে কানে আমার সাথে কথা বলে!’

‘তোমার সেই প্রেমিক ওই কবি কই?’ জিজ্ঞেস করি।

‘অমনি বুঝি বাবুর হিংসে হলো!’ ইনিসী গোল গোল চোখে আমার দিকে তাকায়!

কয়েক মাসের মধ্যে বুঝতে পারি, একজন আরেকজনকে না দেখলে আমাদের খারাপ লাগে। আরও বুঝতে পারি,  ইনিসী সেটা কখনওই সরাসরি আমাকে বলবে না। অবশ্যি এমন এক বিশেষ অধিকারবোধ নিয়ে সে আমার সাথে কথা বলে, তাতে আমার নিজস্ব ভাবনার আর কোনো সুযোগ থাকে না; আচমকা ফোন দিয়ে বলবে, ‘এই যে…কই তুমি!’

‘কই আর! ডেইরিতে খেয়ে রুমে এলাম।’

‘বাসে করে চলে আসো নীলক্ষেত।’

‘কখন আসব?’

‘এখন আসবা।’

…আর কথা না বাড়িয়ে আমি জাহাঙ্গীরনগরের বাসে চড়ে নীলক্ষেত নামি, বুয়েটের ছাত্রী হলের সামনে দাঁড়াই, ইনিসী বের হয়ে এলে আমরা হাঁটতে শুরু করি…

আমার মনে হতে থাকে, ইনিসী অসাধারণ একজন মেয়ে, তার ভেতরটা কোমল জোছনায় ভরপুর, বাইরে থেকে তাকে যত ডাকাবুকোই মনে হোক না কেন, ভেতরে সে নিরিবিলি একাকীÑ তার বুকের মধ্যে আস্ত একটা খাঁ-খাঁ সমুদ্দুর, জীবনের সব রস সে চেখে দেখতে চায়; আমি এ-রকম একটা মেয়েকে কেন ভালোবাসব না!

আমরা সেদিন ধানমণ্ডি আবাহনী মাঠের কাছে ধাবায় বসে আছি। সন্ধ্যার ঠিক আগে।

কফির অর্ডার করি। আজ ইনিসী ফুচকাও খাবে।

‘তোমাকে একটা কথা বলব।’ আমি বলি, মনে আছে সেদিন জুলাই মাসের ১৪ তারিখ। ২০১৮ সাল। পরিচয়ের বয়স তখন আমাদের চার মাস।

‘কী আবার কথা? … কেঁদেটেদে ফেলো না! তুমি যা ইমোশনাল!’ ইনিসী বলে।

‘দ্যাখো …একটু সিরিয়াস হও।…সারাদিন হুদাই কথা বলি আমরা। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা এবার বলি।’ বলে, ইনিসার হাতটা ধরি আমি, টেবিলের এপার থেকে। ইনিসা হাসতে হাসতে বলে, ‘দ্যাখো… বোকার মতো কিছু বলো না। আমি হেসে ফেললে তোমার মন খারাপ হবে!’

হাত ছেড়ে দিই ইনিসীর; কথা বাড়াই না। ফুচকা-কফি খেয়ে আমরা ধানমন্ডি, মিরপুর রোড হয়ে নীলক্ষেতের দিকে হাঁটতে থাকি।

কাঁটাবনে রাস্তা পার হবো, রাত ৮টার মতো বাজে, ইনিসীকে হল গেটে পৌঁছে জাহাঙ্গীরনগর ফেরার বাস ধরব; তখনও আমি জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে থাকি, পাস করে বের হইনি; ইনিসী আচমকা আমার হাত ধরে বলে, এবার বলো তখন কী বলতে চাইছিলা!’

‘রাস্তা পারাপারের সময় বুঝি কেউ এইসব বলে!’

‘আমি এখুনি শুনব!’

‘উফ… এই রাস্তায় আমি তোমাকে এইটা বলব না।’

‘তো… কোথায় বলবি তুই? তোর জন্য কি রাজপ্রাসাদ লাগবে?’

‘তুই বুঝিস না আমি কী বলব?’ ইনিসীর হাত ধরে রাগের ভঙ্গিতে বলি ও রাস্তা পার হতে শুরু করি। ইনিসী উল্টো হেঁচকা টানে আমাকে দাঁড় করায়। ‘তুমি এখুনি বলবা, কী বলতে চাইছিলা!’

আশপাশে দ্রুতগতির বাস, চলমান মানুষ ও রাস্তাÑ ধোঁয়া, চিৎকার, ভিড়… সব উপেক্ষা করে আমি ইনিসীকে বলি- ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

‘অ… আচ্ছা!’ ইনিসীর দুই ঠোঁট বন্ধ রেখে আশ্চর্য এক হাসিতে উদ্ভাসিত হয়!

‘তুমি কিছু বলবা না?’ অবাক হয়ে ইনিসীকে জিজ্ঞেস করি।

‘আমি আবার কী বলব!’ ইনিসী বলতে বলতে আমার হাত ধরে নির্বিকারভঙ্গিতে রাস্তা পার হতে শুরু করে।

বইপত্রে পড়া রোমান্টিক উপাখ্যানের মতো, একটা দিন একে অপরকে না দেখলে আমাদের কারোরই ভালো লাগে না, দিনের মধ্যে কতবার যে মেসেঞ্জারে আমরা কথা বলি, অবশ্য বেশিরভাগই- কী করো? তুমি কই? …‘আসো তাড়াতাড়ি!’… ইনিসী সারাদিন ক্লাস সেরে চলে আসে শিল্পকলা বা টিএসসি, আমি জাহাঙ্গীরনগর থেকে ছুটতে ছুটতে আসি তার কাছে। তখন সপ্তাহে অন্তত ৩-৪ দিন সন্ধ্যায় আমাদের দেখা হয়, কোনোদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, কোনোদিন বুয়েটে ছাত্রী হলের গেটে, আমার পরীক্ষা থাকলে ইনিসীই বাসে করে চলে যায় জাহাঙ্গীরনগর।

সেদিন জাহাঙ্গীরনগরে আসে ইনিসী; আল বেরুনি হলে আমার ১১২ নাম্বার ঘরে, বিকেলের দিকে; পরদিন আমার এমএ থার্ড পেপার পরীক্ষা; সারা বছর কিছুই পড়ি নাই, পরীক্ষার ২-৩ দিন আগে থেকে রাত-দিন পড়া চলে, আর আমার যা অভ্যাস, চারপাশের সব এলোমেলো, পরীক্ষার সময় নিজেই ঘরে রান্না করি। আমার সিঙ্গেল সিট রুম। ইনিসী ঘরে এসে সব দেখেশুনে কালবিলম্ব না করে ঝাড়ু জোগাড় করে ঘর পরিষ্কার করতে শুরু করে, পিঁয়াজের খোসা, রান্নার এঁটো… সব এত যত্ন করে তুলে তুলে সে ঘরখানা এমন নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে যে, আমার মনে হয়, ইনিসী আমাকেই নিখুঁত যত্নে সাজিয়ে রাখে। সেটা তাকে বলি, আর যায় কোথায়; ‘এইসব নাকি কান্না টাইপ কথা বলবা না তো!… যে কারও ঘর এরকম দেখলে আমি গুছায় দিতাম! এত নোংরা, অসহ্য!’

‘…আচ্ছা। আর বলব না।’

‘হ্যাঁ, আর বলবা না। এখন আমি যাবো। আমাকে বাসে তুলে দিয়ে আসো।’

ইনিসীকে বাসে তুলে দিতে ফজিলাতুন্নেছা হলের সামনে ট্রান্সপোর্ট এলাকায় যাই। বাস তখন ছাড়তে কয়েক মিনিট দেরি, আমরা লেকের পাড়ে বেঞ্চে বসি পাশাপাশি, ইনিসী বলেÑ ‘তোমার মতো গাধা আমি জন্মে দেখি নাই!’

অবাক হয়ে ইনিসীর দিকে তাকাই, -‘আবার কী করলাম?’

‘কিছু না।’ বলে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বাসে ওঠে সেদিন ইনিসী।

বাস ছেড়ে দেবার পর রুমে ফিরে আসি। সাজানো সুন্দর ঘরখানা দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দেয়, কেন? আমি জানি না।

টুং করে একটা শব্দ। মেসেঞ্জার।

ইনিসী মেসেজে লিখে পাঠায়- ‘ঘরে ফিরছ?’

‘হুম। ফিরলাম।’

‘তুমি যে একটা মস্ত গাধা, এইটা তুমি জানো?’

‘গাধামি আবার কী করলাম?’

‘আজকে তো হাতটা অন্তত ধরতে পারতা! ঘরে তো কেউ ছিল না!… গাধার গাধা…! খালি প্যানপ্যান করে!’

আমার পুরো অস্তিত্ব যেন ঝনঝন করে বাজতে থাকে।

কী উত্তর দেব এই কথার!

আসলেই তো আমি একটা আস্ত গাধা।

তারপর ফাইনাল পরীক্ষা শেষে, আমি ঢাকায়- বড় বোনের উত্তরার বাসায় রাতে ঘুমাই আর সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরি। একটা ব্যবসা দাঁড় করানোরে চেষ্টা করি আমরা তিন বন্ধু মিলেÑ তুহিন আমি আর চঞ্চল। নিকেতনে ছোট্ট একটা আপিসও নিই আমরা; বন্ধু চঞ্চলের সাথে রাস্তাঘাটে দৌড়ে চলেছি; এসবের মধ্যে এক সপ্তাহ পর আজ ইনিসীর সাথে আমার দেখা, ইনিসী তার আর্কিটেক্ট ফার্ম থেকে শিল্পকলায় আসে সন্ধ্যার আগে। সে ‘সাবকনসাস’ নামে একটা আর্কিটেক্ট ফার্মে ইন্টার্নি করে, তার আপিস পল্টনে, নিকেতনে আমাদের ‘ট্রাইঙ্গেল’ এজেন্সি আপিস থেকে চলে আসি শিল্পকলার মাঠে, ইনিসী এলে মাঠের ঘাসে বসি মুখোমুখি; ইনিসীর ঠোঁটে যত হাসি, চোখে তার চেয়ে বেশি; বিদ্যুৎতরঙ্গের মতো হাসতে হাসতে সে তার ইন্টার্নি জীবনের গল্প করে- ‘প্রতিদিন কত যে কাণ্ড হচ্ছে! আমার সাথে মুকেশ গাধাটাও আছে! …আরে, মুকেশ! মুকেশ! ওই যে মোটা মতো ছেলেটা… রক্তকরবীর শো শেষে আমি যার সাথে হলে ফিরতাম।’

মনে পড়ে- মুকেশের মুখ, ইনিসীর সহপাঠী; ‘রক্তকরবী’ শো’র আগে-পরে দেখেছি; অবশ্যি বহুদিন দেখি না-

‘ক্লায়েন্ট যা বলে মুকেশ চোখ বন্ধ করে তা ফলো করে। আরে… একটু বুদ্ধি খাটা। না, তিনি উমেদারি করেন। অবশ্যি আমি ক্লায়েন্টের সাথে জোর ফাইট দিচ্ছি।’ বলতে থাকে ইনিসী- ‘… পূর্বাচলে মিডলক্লাস ফ্যামিলির জন্য ১২০০ স্কয়ার ফিটের দুশো ফ্ল্যাটের প্রজেক্ট। ক্লায়েন্ট মুরগির খোপ বানতে চায়। একটুও খালি স্পেস রাখবে না। এমন বারান্দার সাইজ যাতে একজন মানুষের পক্ষেও বাঁকা হয়া দাঁড়ানো সম্ভব না!’… ইনিসী বলতে থাকে, ‘আচ্ছা… বলো… মানুষের জন্য এম্পটি স্পেস… কত জরুরি! এটা ডিজাইনে থাকবে না?… আমি যতই ডিজাইনে খালি জায়গা বের করি, মুকেশ তত ভয় পায়, ক্লায়েন্ট হাতছাড়া হবে! আমরা ড্রপআউট হয়ে যাবো!… হিহিহি! কী যে ভয় পায় মোটা মুকেশ! ওর চেহারা যদি তুমি দেখতা!…’

ইনিসী বলে- ‘এই শোন… ইয়োগা ফাউন্ডেশন বান্দরবানের লামায় তিন দিনের একটা কোর্স করায়। ওখানে আমি গত সপ্তায় গেছিলাম।’

‘যাওয়ার আগে বলে তো যাবা! তোমার ফোন বন্ধ; আমি চিন্তায় অস্থির!’-আমি বলি।

‘কেন? তোমাকে বলে যেতে হবে কেন? তখন আমার দমবন্ধ অবস্থা। কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। তাই চলে গেলায় ইয়োগায়। তা তোমার সাথে কথা বলবো কেন? কথা বললেই তো তুমি পিছ নিতে চাইবা? সেখানে গিয়ে তোমার সাথে প্রেম করবো আমি! দূর!’

‘তাই বলে একটু জানাবা না? তোমার জন্য আমার চিন্তা হবে না?’ বিস্ময়ের সাথে বলি।

‘কিসের চিন্তা? আমি কি ছোট মানুষ!’ ইনিসীর কণ্ঠে রাগ।

‘বিপদ কি শুধু ছোট মানুষের হয়? বড়দের হয় না?’

‘ধ্যুৎ আমি এতকিছু ভাবতে পারব না তো! এতকিছু ভাবলেই আমার দমবন্ধ লাগে! …এত জবাবদিহিতা আমাকে কেন করতে হবে?’ ইনিসীর গলা আস্তে আস্তে চড়তে শুরু করে।

‘কোথাও গেলে বা ফোন বন্ধ রাখলে, সেটা বলে করা মানে জবাবদিহিতা!’ আমার মন খারাপ হয়ে যায়।

‘অ্যাই, ঘ্যান ঘ্যান করো না তো!… ’

কথা না বলে ইনিসীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। কী বলব এসব কথার উত্তরে…

‘মাঝে মাঝে আমার খুব অস্থির লাগে!’ আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে আরও বলে ইনিসী- ‘আমাকে কি তোমার পাগল বলে মনে হয়!’

০২.

নিকেতনের ভেতরে বাসাবাড়ি আর আপিস এমনভাবে পাশাপাশি, বোঝাই যায় না কোনোটাতে মানুষ সপরিবারে থাকে আর কোনোটাতে আপিস!

আমাদের এজেন্সির আপিস একটু ভেতরের দিকে, ছয়তলা ভবনের চারতলায়- এই অ্যাপার্টমেন্টেও একই অবস্থা। আমাদের মুখোমুখি ফ্ল্যাটে একটি পরিবার থাকে, তারাও ভাড়ায়- আমরা আপাতত এখানে থাকলেও চেষ্টা করছি খানিক গুছিয়ে নিয়ে বনানীর দিকে আপিস নিয়ে চলে যাবো।

ব্যবসায়ী হবো- এরকম দূরবর্তী স্বপ্নও কোনদিন দেখি নাই! আসলে নিজেকে নিয়ে আমি সত্যিকার কোন স্বপ্ন কখনও দেখি নাই।

বাবা ছিলেন কাস্টমস অফিসার, বদলির চাকরি, আজ এখানে, কাল ওখানে, টাকাপয়সা আমাদের খারাপ ছিল না- সম্ভবত কাস্টমস শব্দটার সাথেই টাকা পয়সার একটা সম্পর্ক থাকে; আমাদের সচ্ছল সংসারে আমার মা হঠাৎ একদিন মরে যান। আমি তখন পড়ি ক্লাস সিক্সে, বড় বোন রিনু তখন কারমাইকেল কলেজে ব্যবস্থাপনায় অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ; বাবা তখন রংপুরে কাস্টমস অফিসার, সেখানেই থাকি আমরা। রোজার মাস, সুস্থ মা সারাদিন রোজা রেখে বাবা আর আমাকে নিয়ে ইফতার করলেন, ঘণ্টাখানেক পর বললেন- বুকে ব্যথা। ২ মিনিটের মধ্যে চিৎকার করে কাঁদতে থাকলেন আমার নাম ধরে, ‘রঞ্জুরে… মরে যাচ্ছিরে…!’

জাহাজ কোম্পানির মোড়ে আমাদের ভাড়া বাসা, সেখান থেকে হাসপাতাল গাড়িতে দশ মিনিটের পথও নয়, মাকে নিয়ে বাবা রওনা দিলেন সেদিকে, আর পথেই তিনি নাই।

তখন ১২ বছর বয়স আমার, মায়ের মৃত্যু ব্যাপারটা পুরো বোঝার আগেই দেখি বাবা কয়েক মাসের মধ্যে রিনু আপার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তার বিয়ে ঠিক করলেন রংপুরের এক বিত্তবান ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে। রিনু আপার বর; ছাত্ররাজনীতির নামে মারামারিতে জড়িয়ে পড়াশোনা শেষ করেননি; বাবার বৈষয়িক চিন্তা- বিত্তবান বাবার একমাত্র পুত্র, ঢাকায় উত্তরার মতো জায়গায় ছয়তলা বাড়ি, কলেজ পর্ব অসমাপ্ত রেখে বাবার  মোটর পার্টস সাপ্লাইয়ের দোকানে বসে মাঝে মধ্যে; বাবার একটাই কথা- পাত্র হিসেবে ফয়সাল অসাধারণ! রিনু আপার কান্না তখন থামে না- ‘আমি গাড়ির মেকানিক বিয়ে করব!’

‘কিসের মেকানিক! কোটি টাকার ব্যবসা ওদের! না বুঝে চিল্লাস!’-বাবা বোঝান রিনু আপাকে।

আমি তখন না বুঝলেও রিনু আপা ঠিকই বোঝেন, বাবা চাইছেন দ্রুত তাকে বিয়ে দিয়ে ঢাকার উত্তরায় জামাইয়ের ফ্ল্যাটে পাঠাবেন, আর তিনি শুরু করবেন তার দ্বিতীয় জীবন…

ফয়সাল ভাইয়ের সাথে রিনু আপার বিয়ে হয়, আপা আর পড়াশুনা করেন না; চলে যান বরের সঙ্গে ঢাকার উত্তরায়।

আর পরের বছর বাবা বিয়ে করেন, তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি, রংপুর জিলা স্কুলে।

তেরো বছরের একটি ছেলের পক্ষে বাবার বিয়ে দেখার অভিজ্ঞতা কেমন!

এক যুগ আগের কথা, পরিষ্কার সব মনে আছে; আমি নিজেকে শুধু লুকাতে চেয়েছিলাম তখন। রিনু আপাকে বললাম- তোমার কাছে নিয়ে যাও আমাকে। আপা আমাকে ঢাকায় নিয়ে এলেন বিয়ের সেই ক’দিন।

বাবার নতুন বিয়ের পর আমি আবার রংপুরে, আবার স্কুলে।

দ্বিতীয় মা হাসিখুশি ভদ্র তরুণী- বাবার সাথে বয়সের বিস্তর পার্থক্য, কত হবে? ২০/২২? বাবার তখন বয়স ৫০-এর কাছাকাছি, মায়ের বয়স ২৭/২৮। তার প্রথম বিয়ে। ওই যে, বাবার যথেষ্ট টাকা-পয়সা; ওটা থাকলে অনেককিছুই সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়; আমি তখন এই রকমভাবে নিজেকে বোঝাই। বাবা- দ্বিতীয় মা ভালোই আছেন, বাবার বয়স এখন ৬২; চাকরি থেকে অবসর নিয়ে নিজের জেলা ময়মনসিংহে একটা স্কুল কাম কলেজ দিয়ে বসেছেন; তিনি তার চেয়ারম্যান, আকন্দ শরিফুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ- তার পিতার নামে প্রতিষ্ঠান; শ’ পাঁচেক ছাত্র; বেশ আছেন তিনি- নতুন ঘরে তার দুই সন্তান- এক  ছেলে সঞ্জু, এক মেয়ে বিনু। ছেলেটির বয়স ১০, মেয়েটির ৮।

আমি কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস দিয়ে জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হই। বাবার সাথে আমার বা রিনু আপার যোগাযোগ আলগা হয়ে যায়।

বাবার বা দুলাভাইয়ের অর্থনৈতিক সামর্থ্য আছে, এটা আমি মনে করতে চাইনি কখনও; একটা জড়তা আমাকে সমবসময়ই তাদের কারও কাছে টাকা চাইতে অস্বস্তিতে ফেলে দিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পত্রিকায় ফিচার লিখে আর টেলিভিশনে বিদেশি সিরিয়ালে বাংলা ডাবিংয়ে কণ্ঠ দিয়ে চলার মতো টাকা নিজেই জোগাড় করে নিই; কখনও বাবাকে খোঁজ নিতে দেখিনি, আমি যে মাসে মাসে টাকা নিই না, কীভাবে চলি! আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নাম্বারও কোনোদিন চাননি। বাবার নতুন বিয়ের পর ছ’বছর তাদের সংসারেই ছিলাম, সেটিও কেমন ছাড়া ছাড়া, যেন আমি বেড়াতে এসেছি তাদের সংসারে; তাদের আহ্লাদ-আনন্দ সবই নিজেদের ঘিরে, তখন আমি ঢ্যাঙা লম্বা হয়ে উঠছি, কণ্ঠস্বর ভাঙছে; বুঝতে পারি, বাবার নতুন স্ত্রী এরকম বেঢপ একখানা পুত্রকে তার পরিমণ্ডলে পরিচয় করিয়ে দিতে চান না! এদিকে তিনি ভদ্র এক তরুণী, মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারেন না, বাবাও ভদ্র, তবে তার চোখ বলে, আমি ঠিক বুঝতে পারি, নতুন দম্পতির সামাজিকতায় যেন আমি উপস্থিত না থাকি।

আমি তাই তাদের সংসারে ছ’বছর থাকলেও নিজেকে সবকিছু থেকে অনুপস্থিত করে রাখতে শুরু করি। এটা একটা কৌশল, চাইলে নিজেকে অনেক কিছু থেকেই অনুপস্থিত রাখা যায়।

তখন আমি চেয়েছিলাম রিনু আপা উত্তরায় তার বাসায় আমাকে নিয়ে আসুক। দুলাভাই বেঁকে বসলেন; তার নতুন সংসার, তিনি বউ নিয়ে আজ এখানে কাল ওখানে ঘুরতে যাবেন, একটা শ্যালক তিনি বয়ে বেড়াতে পারবেন না!

এটিও রিনু আপা আমাকে সরাসরি বলতে পারেন না; তার ভদ্রতায় বাধে, তবে প্রথমবার আমি যখন তার কাছে বলি, আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চলো; কথাটা শোনার পর আপার ইতস্তত ভাব দেখেই বুঝতে পারি, দুলাভাই চান না শ্যালককে ঢাকায় এনে স্কুল-কলেজ করাতে!

আমি দ্বিতীয়বার রিনু আপার কাছে এই প্রস্তাব আর দিই নাই।

এর মধ্যে দিন গড়ায়, আপা-দুলাভাই জমিয়ে সংসার করেন; গাড়ির পার্টসের ব্যবসা তো আছেই, আরও কী কী যেন ব্যবসা করেন দুলাভাই; বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিকে তিনি প্রায়ই বলেন, ‘রঞ্জু। নিজের কেউ নাই। আসো আমার সাথে।’

আমার অস্বস্তি হয়, সেই যে কিশোর বয়সে বাবা আর দুলাভাই থেকে আমি নিজেকে অনুপস্থিত রাখতে শুরু করি, পরে তা আর বদলায় না।

রিনু আপা বুঝতেন আমার অস্বস্তির জায়গাটি, এ’নিয়ে তাই কথা বাড়ায় না; বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার বাসায় গেলে ফিরবার পর দেখতাম আমার মানিব্যাগে আপা আলগোছে কয়েক হাজার টাকা ঢুকিয়ে দিয়েছে! রিনু আপার বাসায়ও তখন আমি নিয়মিত যাওয়া বন্ধ করি।

পাস করার পর যখন রিনু আপার উত্তরার বাসায় রাতে থাকতে শুরু করি; তার দুই কন্যা- সৃষ্টি আর বৃষ্টি- পিঠাপিঠি দুই সন্তানকে নিয়ে আপা খুব ব্যস্ত; বড়টার বয়স ৯; ছোটটার ৬, উত্তরার সানিডেলে পড়ে; ৩ নম্বর সেক্টরে আপার বাসা, সেখান থেকে ১৮ নম্বরে আনা-নেওয়া, নাচ-গানের স্কুল, বাসায় টিচার… রীতিমতো একটা হুলস্থুল ব্যাপার।

এর মধ্যে আপা আমাকে নিয়ে পড়লেন- ‘ক’দিন পর বিয়ে করবি। তারপর তো আর আমার সাথে থাকবি না। বিয়ের আগ পর্যন্ত আমার বাসায় থাক।’

জাহাঙ্গীরনগরের পাঠ চুকিয়ে তাই আমি আর ঢাকায় কোনো ডেরা খুঁজি না। সারাদিন এজেন্সির কাজ শেষে আপার উত্তরার বাসায় যাই।

আপার কাছ থেকে টাকা নিয়ে চঞ্চল আর তুহিনের সাথে এজেন্সি ব্যবসা আরম্ভ করি।

চঞ্চলের সাথে আমার বন্ধুত্বের শুরুটা আকস্মিক এক ঘটনায়।

ঢাকা থিয়েটার সেলিম আল দীন নাট্যোৎসব করবে সে-বার জানুয়ারিতে; ডিসেম্বর মাসে পোস্টার করেন আফজাল ভাই- আর্টিস্ট, অভিনেতা আফজাল ভাই; আমি যাই ধানমন্ডি ২৭ নাম্বারে আফজাল ভাইর ‘মাত্রা’ নামের আপিসে, তার কাছ থেকে পোস্টার ডিজাইন বুঝে নিতে।

পেঁৗঁছে দেখি আমারই বয়সী এক তরুণ রেকর্ডারে আফজাল ভাইর সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। তরুণের নাম চঞ্চল। ভাবলাম, ছেলেটি কোনো পত্রিকার সাংবাদিক, পাশের চেয়ারে চুপ করে বসে তাদের কথা শুনি। কথা শেষ হলে আফজাল ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন- ‘এর নাম চঞ্চল। আমার ওয়েবসাইট বানাবে। সেটার জন্য কথাবার্তা রেকর্ড করছে। ওয়েবসাইটে অডিও ভিডিও থাকবে।’

‘আপনার ওয়েব সাইট নাই?’ অবাক হয়ে যাই আমি।

‘আছে। থাকবে না কেন? কিন্তু চঞ্চলের আইডিয়া অন্যরকম। এটা অনেকটা লাইফ স্কেচ ধরনের সাইট হবে।’

চঞ্চল লাজুক হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘পারসোনালিটির ওয়েবসাইট বলতেই আমরা যে বুঝি, কিছু ইনফো… এটা তা হচ্ছে না। এটা হবে ডিজিটাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব আফজাল হোসেন।’

পোস্টার নিয়ে চঞ্চলের সাথে আফজাল ভাইর আপিস থেকে বের হই। চঞ্চলকে বলি, ‘নীলক্ষেত যাবো। এটা ছাপতে দিতে হবে।’

‘চলেন… আমিও আপনার সাথে যাই।’ চঞ্চল আমার সাথে নীলক্ষেত চলে।

কোনো কারণই ছিল না আমার সাথে চঞ্চলের নীলক্ষেত যাবার, কিন্তু সে রওনা দেয়; আমরা একটা রিকশা নিই, জানতে পারি, চঞ্চল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যোশিওলজিতে পড়ে, তবে তার ধ্যানজ্ঞানে আছে ব্যবসা। সে নতুন ধরনের ব্যবসা করতে চায়। এখন পুঁজি সঞ্চয় করছে।

‘কীভাবে পুঁজির সঞ্চয় করছ? চাকরি করতেছ?’ রিকশায় বসে ততক্ষণে আমরা আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসি।

চঞ্চল বিজ্ঞের মতো হাসতে হাসতে বলে, ‘আরে, চাকরির টাকা দিয়ে কী ব্যবসায় পুঁজি হয়? যোগাযোগ… কমিউনিকেশন! এই যে আফজাল ভাই… এ রকম বড় বিগ শটদের সাথে কমিউনিকেশন করতেছি! এরাই হবেন আমার ব্যবসার পুঁজি।’

চঞ্চলের মাধ্যমেই তুহিনের সাথে পরিচয়। তুহিন তখন চারুকলার ছাত্র, দারুণ তার আঁকার হাত। চঞ্চল প্রায়ই তুহিনকে নিয়ে জাহাঙ্গীরনগরে আল বেরুনি হলে আমার ১১২ নাম্বার রুমে চলে আসে, আমরা রাতভর আড্ডা দিই; আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়।

জাহাঙ্গীরনগর পর্ব শেষে আমি তখন ঢাকায়, চঞ্চল আমাকে বোঝায়, ‘কিছু টাকা নিয়া আমার সাথে যোগ দে!’

‘কিছু টাকা নিয়া মানে?’ আমি বলি।

‘তোর যোগাযোগ নাই! থাকবার মধ্যে আছে অদ্ভুত ওই মেয়েটার সাথে সারাদিন আদাড়ে-বাদাড়ে হাঁইটা বেড়ানোর এক্সপেরিয়েন্স। …থিয়েটার করিস! সেইটাও তো রেগুলার না!’ চঞ্চল বলে।

চঞ্চল বিশদ করে, তিনজনে ইনভল্ব হলে ব্যবসা করতে সুবিধা। পার্টনারশিপ হবে পারহেড পাঁচ লাখ টাকা। তবে চঞ্চলের মিনিমাম কমিউনিকেশন প্রথমেই ব্যবহার হবে, তাই সে দেবে আড়াই লাখ; আর তুহিন ডিজাইন পুরোটা একলাই দেখবে শুরুতে- তাই সে-ও দেবে আড়াই লাখ!

আমার যেহেতু কোনো কমিউনিকেশন নাই; তাই আমাকে পাঁচ লাখ দিতে হবে! আমার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয় চঞ্চলের কথা, রিনু আপার কাছ থেকে টাকাটা চাই ।

আপা ভূতের মুখে প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনবার মতো অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়।

‘নিজের কানে শুনছি তো! তুইতো সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে যাচ্ছিস? টাকা চাইছিস? কী করবিরে বাবু?’

‘ব্যবসা করব। পার্টনারশিপে এজেন্সি।’

‘বাবার কাছ থেকে নে কিছু! জীবনে তো কিছু চাইলি না… তোর আর আমার কি ভাগ নাই বাবার সম্পত্তিতে? …তুই তো জড়পদার্থ, আমি কিন্তু একবিন্দু ছাড়ব না। ঈদের পরেই যাবো মোমেনসিং। বাবাকে বলব আমার আর তোর ভাগ বুঝিয়ে দিতে…!’

‘কী মুশকিল!’

‘কিসের মুশকিল! আকন্দ তরিকুল ইসলাম কি আমার আর তোর বাবা না? টাকার নহর বইয়ে দেবেন তিনি কচি বউয়ের জন্য? আমরা ভাইসা আসছি!’

‘তুমি আমাকে টাকা দিবা কিনা বলো! এর মধ্যে বাবা কেন আসতেছে! …আমি পরে তোমাকে টাকাটা ফেরত দেব!’

‘টাকা ফেরত দিতে এলে ঠ্যাং ভেঙে দেব। আমার কিছু নাই নাকি! আমি ফকির! …একটামাত্র ভাই তুই, সারাজীবন কারও একটু ভালোবাসা পাইলি না…’

আপার এই এক সমস্যা; সুযোগ পেলেই মেলোড্রামার চূড়ান্ত করে, আমি রিনু আপার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা এনে জমা দিই আমাদের এজেন্সির অ্যাকাউন্টে।

তিনজনের সমান পার্টনারশিপে এজেন্সির নাম দিই- ট্রায়াঙ্গেল। নিকেতনে আপিস নিয়ে মহা উৎসাহে কাজ শুরু করি। আমাদের কাজের মধ্যে আপাতত সারাদিন এখানে-ওখানে দৌড়ঝাঁপেই যায়, চঞ্চলের ভাষায়- কমিউনিকেশন বিল্ডআপ! আমি আর চঞ্চল কমিউনিকেশন বিল্ডআপের কাজ করি, তুহিন আপিস সামলায়। অ্যাকাউন্টসের একজন- তবারক, অফিস ম্যানেজার জামিলুদ্দীন আর অফিস সহকারী নুরুল ইসলাম- এই তিনজন আপাতত বেতনভুক্ত কর্মচারী।

আমি, চঞ্চল আর তুহিন বাড়ি ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, অন্যান্য খরচ বাদে লাভের টাকা থেকে সমান তিন ভাগ নিই। সেখান লাভের টাকার টেন পার্সেন্ট আবার জমা হয় ফিউচার ফান্ডে। এসবই চঞ্চলের পরিকল্পনা।

চঞ্চল আর আমি মতিঝিলপাড়ায় ঘুরে বেড়াই। ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্ট বেরোয় কাগজে; আমাদের চেষ্টা থাকে- বিগ শট কাউকে দিয়ে ফোন করিয়ে নিজেদের এজেন্সিতে কাজটা নিয়ে আসা!

এর মধ্যে ট্রাইঙ্গেল থেকে কিছু প্রকাশনা করি, বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা যায়- এমন কিছু বিষয়ের উপর চোখ ধাঁধাঁনো বই- চঞ্চল আসলেই অনেক কাজের; তার এতদিনের যোগাযোগ, সব বিগশট লেখক-প্রাবন্ধিক, অনেকেই অকৃপণ সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। আর তুহিনের ডিজাইন সেন্স, গ্রাফিকস- এককথায় অতুলনীয়। আমার কাজ হয়, চঞ্চলের কথামতো এর-ওর কাছে যাওয়া; বুঝতে পারি, চঞ্চল তার মতো করে আমার যোগাযোগ সক্ষমতা বাড়িয়ে নিতে চায়, আমি যাই। যোগাযোগ করি।

আমরা দুই-তিনটি ব্যাংকের বার্ষিক অডিট রিপোর্ট ডকুমেন্টেশনের কাজ পাই; কয়েকটি তরুণকে খণ্ডকালীন কাজও দিই ট্রাইঙ্গেলে, একটু একটু করে এগোতে থাকি আমরা।

তুহিন অল্পকথার মানুষ, চুপচাপ কাজ করে যায়। কাজ না থাকলে কম্পিউটারে গেমস খেলে, ফেসবুক দেখে; আর চঞ্চল? যত তাকে দেখি, তত বিস্মিত হই; প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা একজন, এই পরিকল্পনা করছে, এই দৌড়ে যাচ্ছে এয়ারপোর্ট।

কী ব্যাপার?

অমুক স্যার আসছেন কলকাতা থেকে, তার গাড়ি নষ্ট; চঞ্চল উবার ভাড়া করে ছোটে এয়ারপোর্টে। শুরুর দিকে বুঝি নাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত এসব অধ্যাপক আমাদের কোন কাজে আসবে?

একটু একটু করে বুঝতে পারি, চঞ্চল তাদের কাছে নিজেকে কাছের এমন এক মানুষে পরিণত করে যে, তার কোনো অনুরোধ তারা সহজে ফেলতে পারেন না। উদাহরণ দিই।

বাংলাদেশ নিয়ে আমরা যে ডকুমেন্টেশন পাবলিকেশন করি, তার সম্পাদনা পরিষদে চঞ্চল এমন সব নাম বসিয়ে দেয় যে, আমি চমকে যাই। বলি, ‘স্যারের নাম সম্পাদক হিসেবে বসিয়ে দিলি! স্যার তো এর ঘুণাক্ষরও দেখেন নাই? বইতে ভুলভাল হলে স্যার আমাদের আস্ত রাখবেন!’

চঞ্চল বলে, ‘মানুষের কাজে কিছু ভুল থাকাই স্বাভাবিক! খুঁজে পেতে তুখোড় সব ছেলেকে কাজে লাগাইছি। ভুল হবে কেন?… আর স্যার মোটেই মাইন্ড করবেন না। আমি জানি।’

০৩.

আজকাল গরমের সাথে সাথে একটা বাতাস বয়, এইটাই লু হাওয়া নাকি!

শাপলা চত্বর থেকে নটর ডেমের দিকে হেঁটে যেতে যেতে নজরুলের গানের কথা ও সুর ভাজার চেষ্টা করি- উড়িছে ওড়না লু হাওয়ায়… কী জানি প্রথম লাইনটা; জিন্সের পকেটে মোবাইল নড়েচড়ে ওঠে, প্যান্টের পকেটে মোবাইল ফোন রাখবার সময় প্রায়ই ভাইব্রেট করে রাখি, চারদিকে এত শব্দ- রিংটোন বাজলেও তা আমার কান পর্যন্ত পৌঁছুনোর সম্ভাবনা থাকে না; তাই ফোন ভাইব্রেট করে রাখি; ফোন ধরি, ফোন করে ইনিসী- ‘কই তুমি?’

‘মতিঝিল।’

‘কী করো?’

‘আইএফআইসির হেড অফিস যাই। তুমি কি করো?’

‘অফিসে। ভাল্লাগে না। …খিদা লাগছে। লাঞ্চ করব। পল্টনের মৌরিতে আসো।’

থতমত খেয়ে চুপ করি, আইএফআইসি ব্যাংকের এমডির সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বেলা ৩টায়, ভেবেছি, নটর ডেমের কাছে কোথাও খেয়ে নিয়ে ব্যাংকে যাবো; এর মধ্যে ইনিসীর ফোন, ওর ফোন পেলে দুনিয়ার আর সবকিছু আমার অপ্রয়োজনীয় ঠেকে- ইনিসী অস্থির গলায় বলে, ‘কী হলো! চুপ মেরে গেলা! ব্যবসা করে মনে হয় ফাটায় ফেলতেছো!’

‘একটা কাজ আছে!’ নিজেকে বলতে শুনি আমি।

‘ও! আজকাল তাইলে আমার চেয়েও জরুরি কিছু আছে জীবনে! …আচ্ছা আসতে হবে না!’ বলে ইনিসী  ফট করে ফোনের লাইন কেটে দেয়। চঞ্চলকে ফোন দিই- ‘তুই কই?’

‘আইএফআইসি ব্যাংকের এমডির পিএসের রুমে। পিএস স্যারের সাথে একটু কথা বলতেছি। ঘণ্টাখানেক সময় আছে হাতে। তুইতো তিনটায় আসবি!’

এই হলো চঞ্চল; তিনটায় এমডি সাহেবের সাথে মিটিং, সে এক ঘণ্টা আগে গিয়ে তার পিএসকে স্যার বলে ডাকতে শুরু করেছে- বুঝতে পারি, গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করছে সে; কাজটাতে আর কে কে অংশ নিচ্ছে… হেনতেন …তো আমি না গেলেও তো হয় আজ! চঞ্চলকে বলি, ‘দোস্ত। তুই তিনটার মিটিং করে ফেল। আমার একটা কাজ…!’

‘জানি তো কি ঘোড়ার ডিমের কাজ! ঠিক আছে… পরে কথা বলি।’ চঞ্চল ফোন রাখলে আমি ফোন দিই ইনিসীকে, একবার/দুইবার/ তিনবার…

চারবারের বার ফোন ধরে সে, অবাক হয়ে যাই; একই মানুষের এত বিচিত্র গলার স্বর কী করে হয়; যখন ইনিসী রেগে যায়, মনে হয় তার গলার স্বরের মতো খারাপ কণ্ঠস্বরের মানুষ কম আছে! রীতিমতো বাজখাঁই এক কণ্ঠস্বর!

ইনিসীর বাজখাঁই সেই স্বর শুনি আমি, ‘কী চাই!’

‘এ রকম করো নাতো!’ কাতর কণ্ঠে বলি।

‘আমি কীরকম করি মানে! …তুমি আমাকে ফোন করছো কেন?’

‘আরে …কী মুশকিল! আমাকে দুই মিনিট সময় দেবে তো!’

‘কিসের সময়। মতিঝিল থেকে পল্টন এসে তুমি আমার সাথে লাঞ্চ করতে পারো না? তোমার চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্য যে, আমি তোমাকে লাঞ্চে ডাকছিলাম…’ ইনিসীর মুখে তুবড়ি ছোটে।

‘আচ্ছা ঠিক আছে। এখন আমার চৌদ্দ দু’গুণে আঠাশ পুরুষকে উদ্ধার করে তুমি আসো মৌরিতে, আমি যাইতেছি সেখানে!’

‘অ! সব তোমার ইচ্ছামতো হবে!’

‘কী মুশকিল! আমি তোমাকে কী বলছিলাম…!’

‘তুমি আমাকে কাজ দেখাইছো!’

‘কাজ তো ছিল। এটা জানাতে পারব না!’

‘তাইলে কাজই করো। আসতে চাও কেন?’

‘আরে যন্ত্রণা। আমি ম্যানেজ করছি।’ নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কাছেই ক্লান্ত লাগে আমার।

‘আমার জন্য তোমার এত ম্যানেজ করতে হবে না।’ ইনিসীর কণ্ঠে জেদ কমেই না।

‘প্লিজ। এমন করো না। আসো মৌরিতে।’

আমরা মৌরিতে বসি; ইনিসীর আপিসের কাছে সবচেয়ে ছিমছাম রেস্তোরাঁ মৌরি; দুপুরের দিকে প্রায়ই আসি আমরা; দেখি- ইনিসীর চোখ-মুখ ফোলা, ব্যাপারটা কী?

‘ঘুম হয় না। সারারাত জাগি। সকালে উঠে অফিস চলে আসি।’ ইনিসীর মুখখানা ফুলে কেমন অন্যরকম হয়ে গেছে। দিনকয় হলো ইনিসী ইন্টার্নি শেষে জুনিয়র আর্কিটেক্ট হিসেবে ‘সাবকনসাস’-এ চাকরি আরম্ভ করেছে; তাকে সহজ করার জন্য বলিÑ ‘তোমার নতুন চাকরির ট্রিট দিবা কবে?’

‘ভাল্লাগে না ছাতার চাকরি। মানুষের সাথে চালাকি করে বাড়িঘরের নামে মুরগির খোপ বানাও! আর.. যেমনে পারো তেমনে মানুষকে ঠকায়ে পয়সা বানাও। জঘন্য!’ বিরক্তির সাথে বলে ইনিসী।

‘সব কাজেই কিছু ঝামেলা থাকে। এটাকে বলে প্রফেশনাল হ্যাজার্ড!’ আমি বলি।

‘অ্যাই… বস্তাপচা ইংরেজি বলবা নাতো! আস্ত খ্যাত একটা!’

বুঝতে পারি, আজ ইনিসীর মন-মেজাজ দুটোই খারাপ, যেদিন সেটা খারাপ থাকে; তাকে কিছুতেই চেনা যায় না। অন্য যে কেউ আমাদের এসব দিনের আলাপ শুনলে ভাববে- একে আবার প্রেম বলে কীভাবে? এ তো রীতিমতো শ্রেণিদ্বন্দ্ব! ক্লাস স্ট্রাগল!

আগেও ছিল; তবে খেয়াল করি, কয়েক মাসে আমার সাথে ইনিসীর আচরণ, ব্যবহার দ্রুত পাল্টে যায়। আমার প্রতি তার বহু অভিযোগ।

সেলিম আল দীন বনাম সৈয়দ জামিল আহমেদকে নিয়ে ঝগড়ার কথাটা বলি।

শিল্পকলায় শহিদুল জহিরের উপন্যাস থেকে নাটক করেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। মাত্র ৫-৬টা শো হবে, ঠিক সে সময় আমাদের ‘ট্রাইঙ্গেল’ থেকে এবি ব্যাংকের অডিট রিপোর্ট জমা দেবার দিন ঘনিয়ে আসে; নাকে-মুখে কাজ নিকেতনের আপিসে দিনরাত, তুহিন করছে ডিজাইন আর আমি খুঁটে খুঁটে টেক্সট দেখি, সব ঠিকমতো আছে কিনা! এর মধ্যে ইনিসী ফোনে জানালো, সে নাটকটি দেখবে; আমার ব্যবস্থা করতে হবে!

খুশি মনেই অনলাইনে টিকিট কাটি; আজকাল মঞ্চ নাটকের টিকিটও অনলাইনে কাটা যায়, চমৎকার ব্যবস্থা- ঢাকা থিয়েটারের টিকিটেও এই কাজ করতে হবে, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ভাইকে জানাব, ভাবতে ভাবতে যাই, সেদিন বিকেলে ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ নাটক দেখতে। একটা ফুটফুটে  সুন্দর হলুদ শাড়ি পরে ইনিসী সেদিন, সাথে ঘটি হাতা সাদা ব্লাউজÑ অদ্ভুত সুন্দর লাগে তাকে; শিল্পকলার সামনে দাঁড়িয়ে আমি ইনিসীকে দেখে এগিয়ে যাই।

‘অ্যাই. গাধার মতো তাকায়া থেকো নাতো! কোনোদিন দেখো নাই আমাকে! এখানে প্রত্যেকটা মানুষ আমাদের চেনে! …’ টিকিট কাউন্টারের সামনে হিসহিস করে বলে ইনিসী।

ভড়কে যাই, আসলেই বোধহয় বেশি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম ইনিসীকে; অন্যদিকে তাকিয়ে, যেন কিছুই হয়নি এভাবে বলি, ‘নাটকটার শো মাত্র ৫/৬টা কেন হবে? মন্ত্রণালয় নাকি ২০ লাখ টাকা দিয়েছে নাটকের দলটাকে! এত অল্প শো করে একটা নাটক শেষ হলে সেটা গ্রুপ থিয়েটার চর্চা হয় কী করে?’

‘তুমি তো জামিল স্যারকে দেখতে পারো না, তাই এসব বলছ!’ ইনিসী বলে।

‘দেখতে না পারার কী হলো! …যেখানে অন্য নাটকের দলগুলো কোনো রকমে টিকে আছে, অনুদান নাই …সেখানে স্যার এ তো টাকা পাচ্ছেন, তো নাটকটা সারা বছর মঞ্চস্থ হবে না কেন?’ আমি তর্ক জুড়ি।

‘স্যার টাকা পাচ্ছেন নিজের যোগ্যতায়, কেউ তাকে দান করছে না!’ ইনিসী যুক্তি দেয়।

‘এই নিয়ে তো আমার আপত্তি নাই। স্যার তো মহান …তিনি অনেক জ্ঞানী। তাকে তাই লাখ লাখ টাকা দেওয়াই যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে …৫/৬টি শো করেই কেন এত বড় বাজেটের একটা মঞ্চ নাটক শেষ হবে!’

‘স্যারকে নিয়ে বাজে কথা বলবা না …খবরদার!’

‘আরে বাজে কথা বললাম কোথায়? সত্য বলতে পারব না?’ আমি যুক্তি দিতে থাকি।

‘হিংসা! তোমরা হইলা সেলিম আল দীনের চ্যালা। পেটভরা তোমাদের খালি হিংসা! হিংসা ছাড়া তোমরা আর কী শিখছ সেলিম আল দীনের কাছ থিকা!’ ইনিসী উল্টো আমাকে আক্রমণ করে।

নাটক শুরু হতে মিনিট পনের বাকি, আমরা পেছনের মাঠের দিকে হাঁটাহাঁটি করি আর তর্ক করি…

আমি বলি, ‘সেলিম স্যারকে নিয়ে খবরদার খারাপ কথা বলবা না! তিনি মহাপুরুষ!’

ইনিসী তেলেবেগুনে জ্বলে যায়, ‘আইছে! মহাপুরুষ! সেলিম আল দীনরে নিয়া ‘মি টু’ বাইর হয় নাই। একটা লুচ্চা লোক! ছি!’

…আমার মুখের ভেতরটা তিতে হয়ে ওঠে, ‘এগুলা কোন কথা! সেলিম আল দীন হলেন জাহাঙ্গীর নগরের ছাত্রছাত্রীদের কাছে রবীন্দ্রনাথ! …তারে নিয়া মি টু …তোমরা কি মানুষ!’

এবার রাগে ছিটকে পড়ে ইনিসী, ‘অ্যাই ঘোড়ার ডিম। তোর সাথে নাটকই দেখব না আমি! তুই থাক তোর সেলিম আল দীনরে নিয়া…’

বুঝতে পারি, আর বাড়ালে ইনিসী সত্যিই নাটক না দেখে উল্টোদিকে হাঁটা দেবে; বলি, ‘আচ্ছা, বাদ দাও। তুমিও সেলিম স্যাররে নিয়া বাজে কথা বলবা না; আমিও জামিল স্যাররে নিয়া কিছু বলব না!’

‘সেটা হবে না। আমি বলব, কিন্তু তুমি বলতে পারবা না। …রাজি থাকলে বলো, তাইলে নাটক দেখব।’

রাগে আমার দাঁত কিড়মিড় করে, তবে ইনিসীর চোখে হাসির বুদবুদ দেখে রাগ কোথায় উড়ে যায়; এই মেয়েটির জন্য আমি যে কোনো কিছু করতে পারি! বলি, ‘আমি রাজি!’

‘গুড বয়!’

আমরা নাটক দেখি। নাটক দেখে বের হয়ে ঢাকা থিয়েটার, জাহাঙ্গীরনগর, ইনিসীর নাগরিক নাট্যদল …অনেকের সাথে দেখা হয়; আমি ইনিসীকে হারিয়ে গেটের উল্টোদিকে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাই। আর কারও সাথে আমার কথা বলতে ইচ্ছা করে না।

ইনিসী অন্যদের সাথে কথা বলতে বলতে আমার দিকে দূর থেকে আড়চোখে তাকায়; মিনিট দশেক পরে সে তার বন্ধুদের ছেড়ে আমার কাছে আসে। বলে, ‘এভাবে হাদার মতো একা দাঁড়ায় থাকার কী হলো! সবার সাথে কথা বললে কি হয়!’

‘আর কারও সাথে আমার কথা বলতে ভালো লাগে না!’ আস্তে আস্তে বলি।

‘দুর। সারাদিন প্রেম আর প্রেম! অসহ্য! এখন আমি যাবো। ধানমন্ডিতে স্যারের একটা মিটিং আছে। মিটিং শেষ হলে তার কাছ থেকে একটা পয়েন্ট বুঝে নিয়ে হলে ফিরে যাবো। …বাসা খুঁজতেছি …বুঝছো! হল ছেড়ে দেব!’

‘কাল সকালেই অফিসে যাবা! সেখানে স্যারের কাছে পয়েন্ট নিলেই তো হয়!’

‘উফ্ফ! এত জবাবদিহি করতে পারব না! আমি উবার ডাকলাম!’ ইনিসী বলে।

‘আমিও যাই তোমার সাথে!’ একরোখার মতো বলি।

ইনিসী অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়, ‘তুমি কই যাবা? তুমি আমার সাথে আমার স্যারের কাছে যাবা?’

‘তা না। ধানমন্ডি পর্যন্ত গেলাম আরকি! পরে আমি চলে আসলাম।’ আমার শান্তস্বর শুনেই কিনা জানি না, ইনিসী নরম হয়ে আসে, বলে- ‘বুঝছি তো, ধানমন্ডিতে গিয়া কফি খাইতে চাইবা… তাই না!’

‘একটু না হয় চাইলামই। কতদিন দেখা হয় না। ম্যাংগোতে বসি একটু চলো।’

‘…আল্লারে …স্যারকে আমি বলছি…’

‘রাখো তোমার স্যার। কতদিন কফি খাই না বলো তো…!’

আমরা ধানমন্ডির ক্যাফে ম্যাংগোর দোতলায় খোলামেলা বারান্দায় বসি। ফুরফুরে বাতাসে, ইতস্তত সবুজে আমার মন ভালো হয়ে যায়, আচ্ছা, কোনদিকে বাসা নেবে ইনিসী? বাসা আমি খুঁজে দেব না?

‘শোন …ঘড়ি দেখে ১৫ মিনিট। আমি কফি খেয়েই দৌড় দেব।’

‘এ রকম করছ কেন? তোমার সমস্যাটা কী?’ অবাক লাগে আমার।

‘তোমার সমস্যাটা কী? তোমার বয়স কি ১৫? …আজকে তো দেখাই হইল! একসাথে নাটক দেখলাম; এখন ক্যান আবার বসে বসে কফি খেতে হবে! …হুদাই এই তামাশাগুলার মানে কী?’ রাগে ফেটে পড়ে ইনিসী।

‘আমার সাথে কফি খাওয়া মানে হুদাই! …ঘোড়ার ডিম লাগবে না তোমার কফি খাওয়া। আমি চলে যাবো। …তুমি যাও তোমার স্যারের কাছে!’ …এই প্রথম ইনিসীর উপর নিজেকে সত্যিকারের রেগে উঠতে দেখি আমি।

‘কফির অর্ডার দেওয়া হইছে! এরা বলবে কি? কফিটা খেয়ে যাও!’ ইনিসী এবার আমাকে বোঝাতে শুরু করে।

‘দরকার নাই। কে কী মনে করল! নাই আমি এসবের মধ্যে!’ বলে হনহন করে দোতলার টেবিল ছেড়ে সিঁড়ির দিকে আসতে আসতে মনে হলো; এভাবে ইনিসীকে একা রেখে চলে যাবো; আবার ফিরে আসি টেবিলে, ইনিসীর মুখোমুখি বসে বলি, ‘আমি স্যরি।’

‘তুমি …তুমি একটা অসহ্য!…’ রাগে কাঁপছে মনে হয় ইনিসী। তার মুখ টকটকে লাল- বলতে থাকে,  ‘কখনও তো নিজের বাপ নিয়ে কিছু বলো না, আমি নিশ্চিত …তোমার বাপ মাঠের একটা আস্ত চাষা ছিল! …নো ডাউট, তুমি একটা চাষার ছেলে! …তোমার ব্যবহারই তা বলে দেয়…!’ ইনিসী সম্ভবত বুঝতে পারে না আর কী বলে সে আমাকে আঘাত দেবে!

হাসিমুখে বলি, ‘চাষার ছেলে খারাপ কি? ওরাই তো সব অন্ন জোগায়! …আমরা বসে বসে কফি খাই আর মাস্তি করি!’

‘রামছাগল কোথাকার! …মাস্তি করার টাইম আমার নাই। …বসে বসে মাস্তি করো। আমি গেলাম।’ …আমাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ইনিসী গটগট করে সে সন্ধ্যায় চলে যায়।

স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকি ম্যাংগোতে। ওয়েটারগুলোও, মনে হয়, আমার অবস্থা দেখে হাসে।

নাহ, এই মাথানষ্টের সাথে আমি আর নাই। হন হন করে ম্যাংগো থেকে নেমে ধানমন্ডি ২৭-এর মীনাবাজারের সামনে এসে দাঁড়াই; উবার ডাকি, সোজা উত্তরায় আপার বাসায়; নাই! আমি আর নাই মাথানষ্টের সাথে! …স্যার! স্যার! স্যার! পাইছে কি সে!

সারারাত ইনিসীকে ফোন বা মেসেজ করি না, ইনিসীও না; পরদিন আপিসে মন দিয়ে কাজ করি, দুপুরের পর আচমকা ফোন করে ইনিসী। গতকাল যে এ রকম কুৎসিত ঝগড়া আমাদের হয়; আমরা যে প্রায় ২২ ঘণ্টা কথা বলি না- ইনিসীর সাথে কথাবন্ধের ঘণ্টা-মিনিটের হিসেব আমার থাকে-  তার রেশও থাকে না ইনিসীর কথায়…

‘কী! মুখচোখ শক্ত করে বসে আছো কেন? কী হইছে! কী ভাবো!’ মৌরির চিংড়ি ইনিসীর পছন্দ, সে লাঞ্চে গলদা চিংড়ি অর্ডার করে।

‘আমরা যে অহেতুক ঝগড়া করি, এগুলো আমাদের ক্ষতি করছে! এটাই ভাবছিলাম।’ আস্তে আস্তে বলি।

‘এখন তো ঝগড়া করছি না। এখন তো আমাদের ভাব।’ ইনিসীর হাসিমুখ।

‘কিন্তু যখন ঝগড়া করো, তখন মাথার তার সব ছিঁড়ে ফেলো!’ আমি বলি।

‘ঝগড়া হয় তোমার জন্য!’ ইনিসী বলে।

‘আমার জন্য?’ আমার বিস্ময়।

‘অবশ্যই তোমার জন্য। তুমি ইল্লজিক্যাল আচরণ করো!’ ইনিসী হাসে।

‘জি। আমি খুবই ইল্লজিক্যাল। আর আপনি লজিক ছাড়া কিছুই বোঝেন না!’

‘হ্যাঁ। আমি তাই। …শোন, তিনা আর বদরুনের সাথে মিলে তিন রুমের একটা বাসা পাইছি জিগাতলায়। ২০ হাজার টাকা ভাড়া। …ওরাও বুয়েটের; সব মিলিয়ে ভালোই হবে মনে হয়!’

‘আচ্ছা, আমরা বিয়ে করবো কবে? নিজেদের বাসা হবে কবে?’

‘…গাধার মতো কথা বলবা না। আরেকটা এমএ করবো অস্ট্রেলিয়ায়। সেখান থেকে ফিরে যা করার করব। এর মধ্যে নিজেকে একটু গোছাও! …এভাবে রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে হেঁটে নিশ্চয়ই আমাদের জীবন যাবে না!’ -ইনিসীর কণ্ঠস্বর আমার কানে পৌঁছে, কিন্তু বিশ্বাস হয় না, এটা সে-ই বলে; এত গোছানো ও স্পষ্ট কথা; রাগ নেই, ঝাঁজ নেই, স্বাভাবিক স্বরে সে জানায়, ‘এভাবে রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে হেঁটে নিশ্চয়ই আমাদের জীবন যাবে না!’

‘একি! …প্লেট থেকে খাবার পড়ছে কেন! আচ্ছা, তুমি একটু সভ্য হবা না? এভাবে গপগপ করে কেউ খায়!’

লজ্জাই লাগে, ‘আসলেই আমার খাওয়ার স্টাইল ভালো না।’ আমি বলি।

‘তোমার কোনো কিছুরই স্টাইল ভালো না। তুমি একটা চূড়া›ত চাষা!’ ইনিসী বলে। তারপর কয়েক মুহূর্ত আমরা চুপচাপ খাই। ইনিসী কীভাবে জানি না, একটু পর বলে, ‘এই যে রাগু মিয়া! খুব রাগ হলো বুঝি!…’

‘নাহ্। রাগ করি নাই।’

‘কেন রাগ করতে পারো না?’ ইনিসী আমার চোখের দিকে তাকায়।

‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাই রাগ করতে পারি না।’ আমি বলি।

‘এইটাকে ভালোবাসা বলে না। এইটাকে বলে মোহ! ভালোবাসা আর মোহ এক জিনিস না।’

‘আমার প্রতি তোমার কি আছে? ভালোবাসা না মোহ!’

‘ভালোবাসা আছে। কোনো মোহ নাই। তবে আপাতত আমি আরেকটা মাস্টার্সের স্বপ্নকে ভালোবাসতেছি। এটা ছাড়া কিছুই আর আমার সামনে নাই!’

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলি, ‘তোমার স্যারের গল্প করলে না! প্রতিদিনই তো করো। দেখা হলে বা ফোনে …স্যার, স্যার …আমার স্যার …আজ করছ না যে!’

একটু কি চমকে ওঠে ইনিসী! সে এমনিতে দুর্দান্ত সপ্রতিভ, যে কোনো কথার সামনে সহজাত যুক্তি মেলে ধরতে একমুহূর্ত দম নেয় না; সেই ইনিসী- তার স্যারের কথায় কি চমকে উঠল; নাহ্, আমারই কুমন! খালি কুডাক দেয়া অভ্যাস। দেশ-বিদেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া আর্কিটেক্ট হুমায়ূন চৌধুরী- বুয়েটের আর্কিটেকচারের নামি শিক্ষক, বুয়েট ছেড়ে চলে যান অস্ট্রেলিয়ার এক ইউনিভার্সিটিতে; সেটাও ছেড়ে ফিরে আসেন নিজের দেশে; ‘সাবকনসাস’ নামে দেশের সবচেয়ে নামকরা আর্কিটেক্ট ফার্মের একটা গড়ে তোলেন হুমায়ূন চৌধুরী। এই প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নি করে সেখানেই জুনিয়র আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করতে শুরু করে ইনিসী।

‘স্যার দেশের বাইরে। দু’দিন পর ফিরবেন!’

‘কই গেছেন!’

‘থাইল্যান্ড। রেগুলার চেকআপ!’

‘কী হয়েছে তার?’

‘স্পেসিফিক কিছু না। রেগুলার চেকআপ-ই মনে হয়!’

‘আচ্ছা, স্যারের ওয়াইফ যেন কয়টা? মানে… এ পর্যন্ত কয়টা বিয়ে করছেন তিনি!’ খেতে খেতে কেন যে জিজ্ঞেস করি, জানি না।

‘এটা কেমন প্রশ্ন হলো! কী রকম অশিক্ষিত আর খ্যাত তুমি! …মাঝে মাঝে তোমাকে ঘেন্না হয় আমার!’ …এবার আর রেগে চিৎকার করে ওঠে না ইনিসী, আস্তে আস্তে চাপাস্বরে বলে।

০৪.

মাঝে মাঝে নিজেকে দূর থেকে দেখলে নিজের প্রতি আমার একধরনের মায়া হয়।

১২ বছর বয়সে মায়ের মৃত্যু; তার এক বছরের মধ্যে বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, তারপর থেকে নিজেকে দৃশ্যমান পারিবারিক সামাজিকতা থেকে অনুপস্থিত করবার ধারাবাহিক চেষ্টা। এর মধ্যে বড় বোন, দুলাভাইয়ের সংসারে কিশোর আমাকে নিয়ে অস্বস্তি, ভালোভাবেই বুঝি!

আমার দ্বিতীয় মা বিয়ের সময় বয়সে ছিলেন ২৭-২৮; তিনি মনে করতেন আরও অনেক কম; নিজের কানে শুনি, আমার দাদি মানে তার শাশুড়িকে বলছেন, তার বয়স ২৩!

তো ২৩ বছরের এক তরুণী ১৩ বছরের পূর্ণ কিশোরকে পুত্রের মর্যাদায় নিজের পরিমণ্ডলে কী করে উপস্থাপন করেন; হোক না স্বামী তার যত্তই ৫০ বছর বয়স্ক! লক্ষ্য করি, আমার যে বাবা আমার মায়ের প্রবল চেষ্টাতেও কোনোদিন ১০ মিনিটের জন্য হাঁটতে বের হন নাই, সেই তিনি দ্বিতীয় বিয়ের পর পূর্ণোদ্যমে হাঁটাহাঁটি থেকে শুরু করে সাঁতার-বুকডন সব দিব্যি চালাতে শুরু করেন! আর তার বিছানার পাশের টেবিলে জড়ো হতে থাকে শক্তিবর্ধক বিষয়ক নানা টোটকামূলক বই। আমি যে ১৩-১৪ বছরের একটি প্রায় যুবকÑ কী করে এসব স্বাভাবিকভাবে দেখি!

হয়তো এগুলোই স্বাভাবিক, মানুষ তার নিজের জীবনের প্রয়োজনে অনেক কিছুই করে বা করতে চায়Ñ এগুলো নিয়ে আপত্তির কিছু নাই, কিন্তু আমার বয়স যে তখন কেবল ১৩-১৪! মা মারা গেছেন, বোনটাও বহুদূরে, বন্ধুরা বাবার বিয়ের কথা বলে, তার ঊর্ধ্বশ্বাসে ব্যায়ামের কথা বলে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসে; ইচ্ছে হয়, অনুপস্থিত শুধু নই, আমি একেবারে পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে যাই।

এই সময়ই বই পড়বার নেশায় পায় আমাকে।

একটা দুইটা বই নয়, বইয়ের পর বই; রংপুর মুসলিম লাইব্রেরি, পাবলিক লাইব্রেরি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন লাইব্রেরি …বাবাও পছন্দ করেন, ছেলে বইয়ে মুখ ডুবিয়ে থাকলে তার ও তার নতুন স্ত্রীর অনেক সুবিধা; তিনি লাইব্রেরিগুলোতে বলে রাখেন, ছেলে চাওয়ামাত্র যেন বই দিয়ে দেয় তারা; তিনি টাকা পরিশোধ করবেন! 

এভাবেই শুরু আমার।

শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ হয়ে মানিক, তারাশংকর …তারপর বাংলাদেশের অনেকের। এর মধ্যে শওকত আলীর একটা বই এত ভালো লাগে, নাম- ‘সম্বল’; দুটো গল্প নাম- গীতারানীর গল্প আর ফুলবানুর গল্প- আমাকে বিভোর করে রাখে, মনে হতে থাকে; আমাদের মানুষেরা কীভাবে এত গোত্রে গোত্রে ভাগ করে রাখে অন্য মানুষদের; কীভাবে মানুষে মানুষে এত ভেদাভেদ!

এখান থেকেই কি আমার মধ্যে শ্রেণিচেতনা, শ্রেণিদ্বন্দ্বের চিন্তা মাথায় আসে!

রংপুরে আমাদের বাসা ছিল দোতলায়, নিচতলায় বাড়িওলা থাকতেন, দোতলায় আমরা। বাসাটির বাউন্ডারি দেয়াল ঘেঁষে পেছনে সুদীর্ঘ ফসলি জমি, বাসার ছাদে উঠলে পেছনের দিকে তাকালে, যতদূর চোখ যায় ধানী জমি। তখনও ধান নিজের রঙে রঙিন হয়ে ওঠেনি, মনে আছে, একদিন তীব্র রোদে ছাদে উঠে তাকিয়ে আছি, বাতাসে নড়তে থাকা বিস্তারিত সবুজের দিকে; মনে হলো- আমিও দুলছি নব তৃণদলের সাথে, মনে হলো- প্রতিটি তৃণের সাথে জড়িয়ে আছে কৃষকের দিনরাত্রির কত শ্রম, স্বপ্ন! সরাসরি লেখেননি এসবের কিছুই শওকত আলী তার ‘সম্বল’ বইতে; কিন্তু আমার মনে হতে থাকেÑ কোথায় যেন মিল আছে গীতারানী আর ফুলবানুর জীবনের সাথে এসব তৃণদলের!

তখন আমি নবম, দশম শ্রেণিতে পড়ি। একাকী কিশোর, তরুণে রূপান্তরিত হচ্ছি- শওকত আলী, মানিক পড়তে পড়তে মনে হয়, আমার সামনে মস্ত একটা জীবন। আমি বৃহত্তর মানুষের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেব।

ভাবলে হাসিই পায়; বয়সটাই ছিল রোমান্টিসিজমের, সম্ভবত শ্রেণিহীন সমাজের একজন হতে চেয়েছি। উচ্চ মাধ্যমিকে রংপুরে খুঁজেছি বামপন্থি ছাত্ররাজনীতি যারা করে; তাদের এদিকে বাড়িতে, আপন পরিবেশে নিজেকে অনুপস্থিত রাখবার অবিরত চেষ্টা করে চলি, শেষ পর্যন্ত ভীরু, ম্রিয়মাণ একখানা মধ্যবিত্ত মানসিকতার গড় তরুণ হয়েই জাহাঙ্গীরনগরে পড়তে যাই।

বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচর্চার জায়গা, এখানে পড়াশুনার অবারিত সুযোগ; ভর্তিও হই নাট্যতত্ত্ব বিভাগে। যেখানে নিজের চিন্তা ও সৃজনশীলতার ছাপ রাখতে পারো বলে আমার ধারণা ছিল। কিন্তু এসবই কাগুজে বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি মানে আমার মনে হতে থাকেÑ সরাসরি সামন্তীয় ভাবভঙ্গির চর্চা। এমনকি টাকা-পয়সা উপার্জনেরও সহজ রাস্তা বলে মনে হয় ছাত্র রাজনীতিকে, এখানে আরও দেখি, শিক্ষকরা উসকে দেন ছাত্রদের, এর বিরুদ্ধে একদল, ওর বিরুদ্ধে আরেক দল। একটা ভাবনা ভেতরে ভেতরে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবার সময়- বাম ছাত্ররাজনীতি করব; নিজেকে তৈরি করব- শিল্পকলার নানা শাখায় শ্রেণিহীন সমাজের কথা বলবার একজন কর্মী হিসেবে; কিসের কী? বেশিরভাগ সরকারি ছাত্র সংগঠনে ভিড়ে ঝাঁকের কই হয়ে নির্বাক থাকতে চায়, বাকিরা উদাসীন- নির্বিকার-নির্লিপ্ত; রাজনীতি? এটা কেন? এটা কাদের জন্য?

জাহাঙ্গীরনগরে কিছুদিন ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেদের সাথে মিশি, আদর্শের কথা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এরপর কী? ছাত্রনেতারা কী বোঝান বুঝতে পারি না, সম্ভবত আমারই বোঝার ভুল; আস্তে আস্তে সেখান থেকে সরে এসে ঢাকা থিয়েটারে যুক্ত হই। নাটকের দলে দিনের পর দিন রিহার্সলে মগ্ন হয়ে থাকব, আমার চারপাশ নিয়ে চিন্তার আর দরকার দেখি না; সেটিও খুব যে হয়, বলা যাবে না; বেশিরভাগই ব্যস্ত জীবনের নানা প্রয়োজন মেটানোর জন্য, যানজট- চাকরি-ব্যবসা সব মিটিয়ে তারপর থিয়েটার!

এসব দেখতে দেখতে চার বছর চোখের নিমেষে কাটে জাহাঙ্গীরনগরে; এমএ পরীক্ষা দেবার সময়ই শিল্পকলায় সেই ‘রক্তকরবী’। ৭৩ দিন একটানা রিহার্সল করি, টানা কয়েকটি শো হয়; এর পরও বছর দুয়েক মাঝেমধ্যে শো হয়েছে; ‘নন্দিনী’ ইনিসীর সাথে আমি ‘রক্তকরবী’তে অধ্যাপক। আজও ঘুমের মধ্যেও অনর্গল বলে যেতে পারি নন্দিনীর সাথে আমার সেইসব সংলাপ :

অধ্যাপক। নন্দিনী! যেয়ো না ফিরে চাও!

নন্দিনী। কী অধ্যাপক।

অধ্যাপক। ক্ষণে ক্ষণে অমন চমক লাগিয়ে দিয়ে চলে যাও কেন। যখন মনটাকে নাড়া দিয়েই যাও তখন না হয় সাড়া দিয়েই বা গেলে। একটু দাঁড়াও, দুটো কথা বলি।

নন্দিনী। আমাকে তোমার কিসের দরকার।

অধ্যাপক। দরকারের কথা যদি বললে, ঐ চেয়ে দেখো। আমাদের খোদাইকরের দল পৃথিবীর বুক চিরে দরকারের বোঝা-মাথায় কীটের মতো সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে উপরে উঠে আসছে। এই যক্ষপুরে আমাদের যা-কিছু ধন সব ওই ধুলোর নাড়ির ধন- সোনা। কিন্তু সুন্দরী, তুমি যে সোনা সে তো ধুলোর নয়, সে যে আলোর। দরকারের বাঁধনে তাকে কে বাঁধবে।

নন্দিনী। বারে বারে ওই একই কথা বল। আমাকে দেখে তোমার এত বিস্ময় কিসের অধ্যাপক।

অধ্যাপক। সকালে ফুলের বনে যে আলো আসে তাতে বিস্ময় নেই, কিন্তু পাকা দেয়ালের ফাটল দিয়ে যে আলো আসে সে আর-এক কথা। যক্ষপুরে তুমি সেই আচমকা আলো। তুমিই বা এখানকার কথা কী ভাবছ বলো দেখি।

নন্দিনী। অবাক হয়ে দেখছি, সমস্ত শহর মাটির তলাটার মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে অন্ধকার হাতড়ে বেড়াচ্ছে। পাতালে সুড়ঙ্গ খুদে তোমরা যক্ষের ধন বের করে আনছ। সে যে অনেক যুগের মরা ধন, পৃথিবী তাকে কবর দিয়ে রেখেছিল।

অধ্যাপক। আমরা যে সেই মরা ধনের শবসাধনা করি। তার প্রেতকে বশ করতে চাই। সোনার তালের তালবেতালকে বাঁধতে পারলে পৃথিবীকে পাব মুঠোর মধ্যে।

নন্দিনী। তার পরে আবার, তোমাদের রাজাকে এই একটা অদ্ভুত জালের দেয়ালের আড়ালে ঢাকা দিয়ে রেখেছ, সে-যে মানুষ পাছে সে কথা ধরা পড়ে। তোমাদের ওই সুড়ঙ্গের অন্ধকার ডালাটা খুলে ফেলে তার মধ্যে আলো ঢেলে দিতে ইচ্ছে করে, তেমনি ইচ্ছে করে ওই বিশ্রী জালটাকে ছিঁড়ে ফেলে মানুষটাকে উদ্ধার করি।

অধ্যাপক। আমাদের মরা ধনের প্রেতের যেমন ভয়ংকর শক্তি, আমাদের মানুষ-ছাঁকা রাজারও তেমনি ভয়ংকর প্রতাপ।

নন্দিনী। এসব তোমাদের বানিয়ে তোলা কথা।

অধ্যাপক। বানিয়ে তোলাই তো। উলঙ্গের কোনো পরিচয় নেই, বানিয়ে তোলা কাপড়েই কেউ-বা রাজা, কেউ-বা ভিখিরি। এসো আমার ঘরে। তোমাকে তত্ত্বকথা বুঝিয়ে দিতে বড়ো আনন্দ হয়।

নন্দিনী। তোমাদের খোদাইকর যেমন খনি খুদে খুদে মাটির মধ্যে তলিয়ে চলেছে, তুমিও তো তেমনি দিনরাত পুঁথির মধ্যে গর্ত খুঁড়েই চলেছ। আমাকে নিয়ে সময়ের বাজে খরচ করবে কেন।

অধ্যাপক। আমরা নিরেট নিরবকাশ গর্তের-পতঙ্গ, ঘর কাজের মধ্যে সেঁধিয়ে আছি; তুমি ফাঁকা সময়ের আকাশে সন্ধ্যাতারাটি, তোমাকে দেখে আমাদের ডানা চঞ্চল হয়ে ওঠে। এসো আমার ঘরে, তোমাকে নিয়ে একটু সময় নষ্ট করতে দাও।

নন্দিনী। না না, এখন না। আমি এসেছি তোমাদের রাজাকে তার ঘরের মধ্যে গিয়ে দেখব।

অধ্যাপক। সে থাকে জালের আড়ালে, ঘরের মধ্যে ঢুকতে দেবে না।

নন্দিনী। আমি জালের বাধা মানি নে, আমি এসেছি ঘরের মধ্যে ঢুকতে।

আহ! নন্দিনী! …আহ! ইনিসী! …কোন ঘরের মধ্যে ঢুকতে চায় সে! …কেন আমাদের একটা ঘর হতে পারে না!

ইনিসীর সাথে আসলে আমার সম্পর্কটা তাহলে কী!

আমি ইনিসীকে ভালোবাসি। প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা যে নন্দিনী ইনিসী, তাকে ভালোবাসি; কিন্তু ইনিসীর যে অংশটা কিছুতেই নিজেকে প্রকাশ করে না, আশ্চর্য কুহকে ঢেকে রাখে নিজেকে- তাকে চিনি না আমি। কিন্তু ইনিসী কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসে!

ভালো যে বাসে না, এটা আমি কীভাবে ভাবি! এই তো কিছুদিন আগেই এক শুক্রবার ফোন করে ইনিসী- ‘এই যে রাগু মিয়া … বাসায় পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছো নিশ্চয়ই!’

‘কী আর করব!’

‘উবার নিয়া আসতেছি উত্তরায়। রেডি হও। …তোমাকে নিয়ে যাবো জল জঙ্গলের কাব্যে।’

…আগে যাইনি পূবাইলের জল-জঙ্গলের কাব্যরিসোর্টে; ইনিসী আসে, আমরা দু’জনে যাই। এখানে প্রকৃতি নিজের মতো করে অক্ষুণ্ন, ইট কাঠ দিয়ে নাস্তানাবুদ বানানো হয়নি, মনটা স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে, ইনিসী আমার হাত ধরে মাঠ পেরিয়ে একটা তালগাছের নিচে নিয়ে যায়। আমরা চুপচাপ বসে থাকি, ইনিসী আমার কাঁধে মাথা দিয়ে রাখে। হঠাৎ কী হয়, বিকাল তখন, চারপাশ কালো করে বৃষ্টি নামে; ‘খুব খুশি না?’ বলতে বলতে একটা ঘরের দিকে এগোয় ইনিসী। চারদিকে ছন, উপরে টিন; ঘরের ভেতর চমৎকার বিছানা, আমি আর ইনিসী পাশাপাশি শুই; এর আগেও জাহাঙ্গীরনগরে বা দূরে কোথাও বহুবার আমরা বেড়াতে গিয়েছি- চুমুও খেয়েছি বহুবার, কিন্তু ওই পর্যন্তই। ইনিসীর দিক থেকে কেমন একটা শীতলতা, শরীরে সে যেন অনভ্যস্ত, বিব্রত। কথায় সে যত সাবলীল, শরীর প্রসঙ্গ এলেই সে কুঁকড়ে যায়।

সেদিন আমি ইনিসীকে জড়িয়ে ধরে শেষ পর্যন্ত যাবার উদ্যোগ নিই। ইনিসী বাধা দেয়, ‘এভাবে না।’

‘তাইলে কীভাবে? প্রেমের মধ্যে শরীর থাকবে না?’ আমি বলি।

‘চুমু খাও। চুমু খেতে তো না করি নাই!’

‘এটুকুতে হয়! …তুমি এত রক্ষণশীল কেন?’

‘ধ্যাৎ। ভাল্লাগে না। দেখো না …সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির কবিতা আবৃত্তি করো তো!’ ইনিসী বলে।

কী বলব আমি একে? ইনিসীর রক্ষণশীল মনোভাব? বিয়ের জন্য অপেক্ষা? বিয়ে নিয়ে কোনো কথাই সে বলে না; আর আজকাল শুরু করেছে, অস্ট্রেলিয়া যাবে, আরেকটা মাস্টার্স করে আসবে!

কিন্তু আমি?

আসলেই নিজের জন্যে মায়া হয় আমার। ইনিসীর কাছ থেকেও মাঝে মাঝে অনুপস্থিত হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। আসলেই একদিন সব চুকিয়ে দেব! নো মোর ইনিসী!

ক’টা বাজে? রাত ১টা? এতক্ষণ বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবলাম! রিনু আপা, দুলাভাই রাত ১১টার মধ্যে ঘুম, বাচ্চাদের সকালে স্কুল, পুরো বাসায় গাঢ় নীরবতা; উত্তরার এই দিকটা এখনও বেশ খোলামেলা, সুন্দর। মোবাইল ফোন হাতে নিই, ফেসবুক মেসেঞ্জারে দেখি ইনিসী সবুজ হয়ে জ্বলছে। দেখি, ঘণ্টাখানেক আগে ইনিসীর একটি মেসেজ এসে বসে আছে আমার দেখার অপেক্ষায়…

‘কী করো?’ ইনিসী লিখে পাঠিয়েছে।

‘কিছু না।’ উত্তর লিখে পাঠাই।

‘এই কিছু না লিখতে তোমার এক ঘণ্টা লাগল! এক ঘণ্টা ধরে কী করতেছিলা!’

‘তোমার কথা ভাবতেছিলাম।’

‘কী ভাবতেছিলা?’

‘তোমার ব্যাপারটা কি? তোমার সাথে আমার সমস্যাটা কী?’

‘কিসের আবার সমস্যা? কই সমস্যা?’

‘তুমি শরীর সম্পর্কে একটা পর্যায় গিয়ে থেমে যাও। চুমু পর্যন্ত। …আমরা কি টিনএজার নাকি!’

‘অ আচ্ছা। রাইতের বেলা তোমার শরীর গরম হয়া গেছে!’

‘ফাজলামি করবা না। আমি কি শালার ট্রান্সজেন্ডার নাকি!’

‘ট্রান্সজেন্ডাররা খারাপ নাকি! গালি দিচ্ছ মনে হচ্ছে!’

‘না। ট্রান্সজেন্ডাররা আমার প্রেমিকা। তাদের কোলে নিয়া বসে থাকব।’

‘উফ। অসভ্যর মতো কথা বলো নাতো। …ঘুমাও।’

‘যুক্তির কথা বললেই বলো …ঘুমাও। আমরা দু’জন স্বাভাবিক তরুণ-তরুণী। আমাদের মধ্যে কেন নরমাল সেক্সুয়াল সম্পর্ক হবে না!’

‘আবার অসভ্যের মতো কথা!’ ইনিসী লিখে পাঠায়।

‘তুমি এত লেখাপড়া জানো। এত সচেতন সবকিছু নিয়া। আর আমাকে যে একটা লিঙ্গহীন বস্তুতে পরিণত করছ, সেইটা বোঝো!’

‘আহ্! লিঙ্গবান আসছেন তিনি। যা ব্যাটা …ঘুমা!’

‘আমাদের সম্পর্কের ডেসটিনেশন কি? তুমি আমাকে বলো ইনিসী!’

‘সব সম্পর্কের ডেসটিনেশন থাকতে হবে কেন!’

‘তার মানে?’

‘সম্পর্কের ডেসটিনেশন মানেই কি সেক্স করতে হবে! …এই ডেসটিনেশন মানি না।’

‘তুমি একটা অস্বাভাবিক মানুষ। ইনকমপ্লিট ওম্যান!’

‘খুব ভালো। তুমি কমপ্লিট সুপারম্যান। …এবার ঘুমাও।’

‘আগে বলো। কী বলতে চাও তুমি! …অবশ্যই সম্পর্কের ডেসটিনেশন থাকে। আমরা বিয়ে করব কবে?’

‘কেন বিয়েই করতে হবে? এত প্রথাগত কেন তুমি? কোন আচারটা তুমি মানো? হঠাৎ বিয়েপাগলা হয়ে গেলা ক্যান?’ ইনিসী লিখে পাঠায়।

ইনিসী মেসেজের দিকে তাকিয়ে থাকি, এই মেয়েকে বোঝার সাধ্য আমার নাই; চোখ জ্বালা করে ওঠে; আচ্ছা, আমি কি কোনোদিন কেঁদেছিলাম! মায়ের মৃত্যুর পর তো কাঁদছিই, তখন তো অনেক ছোট, তারপর…। উহু। আর মনে পড়ে না।

‘থম মারলা ক্যান। কথা কও না ক্যান। অধিক শোকে পাথর! বিয়েপাগলা!’ ইনিসী আবার লিখে পাঠায়।

‘তোমার সাথে আমার সরাসরি কিছু কথা বলা দরকার!’ আমি লিখে পাঠাই।

‘এখন কি বাঁকা করে কথা বলতেছি? সরাসরিই তো বলি। …তোমার কথা তো ওই একটাই প্যানপ্যান ঘ্যানঘ্যান …ভালোবাসি, ভালোবাসি …অসহ্য!’

‘আর বলব না। আর কোনোদিন বলব না। এই শেষ। তোমার মতো মাথানষ্টের সাথে আমার কথা নাই। বাই।’

‘আচ্ছা। বাই।’ মেসেঞ্জারে লিখে পাঠায় ইনিসী। আমি ওয়াইফাই, মোবাইল ডাটা সব অফ করে মোবাইল ফোনটাই বন্ধ করে অন্ধকারে বিছানায় কয়েক হাত দূরে ছুড়ে মারি। ফাজিলের ফাজিল! …আমি আর নাই এর সাথে। সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলব। একেবারে নতুন সাবান দিয়ে…!

শেষ! শেষ! সব শেষ!

বারান্দায় গিয়ে বসি। ছোট্ট বারান্দা, কিন্তু গাছ দিয়ে এত সুন্দর করে রাখে রিনু আপা, মুগ্ধ হতে হয়। আমার বোনটা অনেক গুণের, ছোটবেলায় ভালো গান গাইত, ছবিও আঁকতে পারত, মা মারা যাবার পর তার জীবন অন্যরকম হয়ে গেল! দুলাভাই যে তাকে অযত্ন করে তা নয়, কিন্তু রিনু আপার মন বুঝবার মতো মানুষ সে না, এইটা আমি বুঝতে পারি। দুলাভাইয়ের জগৎ সারাদিন টাকা-পয়সার হিসাব, ক্লাবে গিয়ে মদ্যপান করে রাতে এসে ঘুমানো; আপার যে নিজস্ব একটা জীবন আছে, সেখানে যে তার অংশগ্রহণ জরুরি, কে তাকে বোঝাবে! অপরিমিত অর্থ সে জোগান দেয় আপার হাতে, ব্যস- আর সে নাই কোথাও; আপা তার দুই সন্তান নিয়ে, তাদের লেখাপড়া. গান-নাচ-সাঁতার নিয়ে দিনমান ব্যস্ত! …আপার মুখে কি ক্লান্তির দাগ দেখি আজকাল! হয়তো না, এসব আমারই চোখের ভুল; খারাপ লোকের পাল। রায় পড়তে পারত রিনু আপা, বাবা তো বিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন; সেক্ষেত্রে বিপদ আরও অনেক বেশি হতো! এই ভালো, টাকা-পয়সার আপার বাড়বাড়ন্ত সংসার।

দখিনমুখী বারান্দা নাকি! এত বাতাস! বেতের একটা মোড়ায় বসে আছি, মনে হচ্ছে উড়িয়ে নিয়ে যাবে! আমি দিককানা; কোনো দিকই বুঝতে পারি না; যে কোনো জায়গায় ঠিকানা খুঁজতে গেলেই লোকে বলে, পশ্চিম দিকে যান, উত্তর দিকে যান। ঘোড়ার ডিম! কোনো দিকই চিনি না! আমি চিনি দুটো দিক; একটা ডান দিক, আরেকটা বাঁ দিক।

রাত বেশি হলে কি গভীর সব চি›তা মাথায় আসে?

চঞ্চল যেমন বুঝতেই পারছে না, ওর অনেক কাণ্ডই আমি বুঝতে পারি। ও কী করছে. আমাকে আর তুহিনকে বাদ দিয়ে সে কী করতে চাইছে; সবই বুঝি, কিন্তু কিছুই বলতে ইচ্ছা করে না। আমরা কি কারও ওপর বিশ্বাস রাখব না? বন্ধুর অনুকূল হাসি আর দ্বিধাহীন হাত আমার কাঁধে এসে নিশ্চিন্তে পড়ে থাকবে, এটা শুধু গল্প-উপন্যাসের কথা!

ক’টা বাজে? ঘরে ঢুকে ফোনটা খুঁজে বের করে আবার বারান্দায় এসে বসি। ফোন খুলতেই দেখি, ইনিসীর কমপক্ষে ত্রিশটা মেসেজ এসে বসে আছে…

‘তোমার মতো গাধা আর দেখি নাই…’

‘উত্তর দাও না ক্যান?’

‘কী হইলো?’

‘মোবাইল ডাটা বন্ধ রাখছ?’

‘কতক্ষণ বন্ধ রাখবা চান্দু?’

‘তুমি এত গাধা কেন?’

‘তোকে আমি ভালো না বাসলে ওই জাহাঙ্গীরনগরে সেই কবে তোর ঘরের বিছানায় তোর পাশে গিয়ে শুইলাম!’

‘ভুলে গেছিস বুদ্ধু!’

‘না, তার খালি চুমুতে হয় না!’

‘তুই একটা শুয়োর!’

‘ফোন বন্ধ রাখছিস ক্যান?’

‘প্রতিদিন তোরে আমার বলতে হবে ভালোবাসি …ভালোবাসি…!’

‘তুই একটা কচি খোকা!’

‘আমাকে কি বেশ্যা মনে হয় তোর?’

‘তাইলে কেন জল জঙ্গলে বললি …করে ফেলি!’

‘তুই একটা পশু…!’

…মাই গুডনেস; ইনিসীর মাথা আসলেই নষ্ট; এর মধ্যে আমি যে দেখেছি তার পাঠানো মেসেজ, তার সবুজ দাগ সংকেত দেখে আবার মেসেঞ্জারে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইনিসী-

‘অ্যাই শুয়োরের বাচ্চা…’

‘বলো..’

‘কী করতেছিলি!’

‘বারন্দায় বসে ছিলাম। আর কী করব?’

‘তুই জানিস না, এভাবে তোর ফোন বন্ধ পেলে আমি ঘুমাতে পারব না। কেন ফোন বন্ধ রাখছিলি! ক্যান? আমারে কষ্ট দিতে চাস?’

‘রাগ হইছিল। আর ফোন বন্ধ করব না।’

‘তুই তো একটা চাষা। চাষার ছেলে চাষা। রাগ হইলে ফোন বন্ধ করিস!’

‘বললাম তো আর করব না।’

‘তাইলে এবার আমাকে আদর কর!’ ইনিসীর পাঠানো মেসেজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার ভেতরটা টলমল করে!

০৫.

কখনও কখনও মানুষ নিজের আচরণে নিজেই নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। তার রাগ, তার অহেতুক বিরক্তি কথায় বোঝা যায়, তার ভেতরে কোনো সমস্যা হচ্ছে।

স্পষ্ট না হলেও ধারণা করি, ইনিসী সম্ভবত বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে। কিছুই সে বলে না আমাকে সরাসরি, সব ঠিকই মনে হয়; এরকমই তো সে, আচমকা রেগেমেগে একাকার করে কিছুক্ষণ পরেই জড়িয়ে ধরে! তারপরও আমার মনে হয়, কিছু একটা সমস্যা আছে।

ইন্টার্নির শুরুর দিকে ইনিসী বহু গল্প করেছে হুমায়ুন চৌধুরীর- তার স্যার, দারুণ মানুষ; কম কথা বলেন কিন্তু তীক্ষ্ণ হিউমারে পরিপূর্ণ। অনায়াস যুক্তিতে অন্যকে সহজে নিজের মতে পরির্তন করতে পারেন!

‘জানো …কী কাণ্ড! …আমি তো ডিজাইনের নামে মুরগির খোপ বানাব না! …ক্লায়েন্টের সাথে তর্ক করি। …স্যার আমাকে বোঝালেন, তিনিও সব সময় ভাবেন- এমটিস্পেস নিয়ে! মানুষের একটু শূন্যস্থান দরকার হয়। তা যেমন তার থাকবার জায়গায়, তেমনই মানসিকভাবেও। আমরা সম্পর্ক বললে বুঝি, একজন আরেকজনকে আঁকড়ে ধরা। কোনো স্পেস দিই না! …আমাদের মতো দেশে তো আরও! বিয়ে হয়েছে তো হলো, যে কোনোভাবে বিয়ে টিকিয়ে রাখতে হবে! তাতে কার কতখানি স্পেস আছে বা দিই; তাতে কিচ্ছু আসে যায় না! …আর্কিটেকচারের স্পেস থেকে তিনি হিউম্যান রিলেশনের স্পেস বুঝিয়ে দেন!…’ – ইনিসী যেদিন এই গল্প করে, তার চোখ-মুখে আমি জোছনা দেখি।

ইনিসী বলে, ‘স্যার আমাকে বলেছেন, তর্ক করে নয়, ক্লায়েন্টকে ইমোশনালি বোঝাতে হবে! প্রয়োজনে কবিতা দিয়ে, গান দিয়ে তাকে বোঝাতে হবে- একটু সবুজ, একটু শূন্যস্থান মানুষের জন্য কত প্রয়োজনীয়!’

‘স্যারের সাথে খুব কবিতা পড়া হচ্ছে বুঝি আজকাল!’ আমি ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিলাম। ইনিসী বুঝতে পারে না, তন্ময়ের মতো আবৃত্তি শুরু করে…

…নবীন কিশোর, তোমায় দিলাম ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ

তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর ফুসফুসভরা হাসি …

কথা বলবার চেষ্টা করতেই ইনিসী সেদিন আমাকে ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে চুপ থাকতে বলে, আমরা সে স›ধ্যায় বসেছিলাম গুলশান আড়ংয়ের কাছে ফ্লোরেনটিনা কফিশপে, ওখানে সুন্দর স্মোকিং জোন আছে, ইনিসীর ইশারায় চুপ করে তার আবৃত্তি শুনি আর সিগারেটে টান দিই-

…দুপুর রৌদ্রে পায়ে পায়ে ঘোরা, রাত্রির মাঠে চিৎ হ’য়ে শুয়ে থাকা

এসব এখন তোমারই, তোমার হাত ভ’রে নাও আমার অবেলা

আমার দুঃখবিহীন দুঃখ ক্রোধ শিহরণ

নবীন কিশোর, তোমাকে দিলাম আমার যা-কিছু ছিল আভরণ

   জ্বলন্ত বুকে কফির চুমুক, সিগারেট চুরি, জানালার পাশে

   বালিকার প্রতি বারবার ভুল পুরুষ বাক্য,

    কবিতার কাছে হাঁটু মুড়ে বসা, ছুরির ঝলক

   অভিমানে মানুষ কিংবা মানুষের মতো আর যা-কিছুর বুক চিরে দেখা

   আত্মহনন, শহরের পিঠ তোলপাড় করা অহংকারের দ্রুত পদপাত

   একখানা নদী, দু-তিনটে দেশ, কয়েকটি নারী-

   এ-সবই আমার পুরোনো পোশাক, বড় প্রিয় ছিল,

  এখন শরীরে আঁট হয়ে বসে, মানায় না আর

  তোমাকে দিলাম, নবীন কিশোর, ইচ্ছে হয় তো অঙ্গে জড়াও

   অথবা ঘৃণায় দূরে ফেলে দাও, যা খুশি তোমার

   তোমাকে আমার তোমার বয়সী সব কিছু দিতে বড় সাধ হয়। …

‘রক্তকরবী’র নন্দিনীর মুখে সুনীলের ‘নবীন কিশোর’- ফ্লোরেনটিনার আবছায়ায় তখন অসাধারণ তন্ময়তা, আমার রাগ হয়- ‘ওই বুড়ো স্যারের কণ্ঠে তাইলে আজকাল কবিতা শোনা হচ্ছে! এই হলো আর্কিটেকচারের ইন্টার্নি!’

‘তুমি একটা হিংসুটে। জংলি। …কী অসাধারণ আবৃত্তি স্যারের! শুনলে বুঝতা! …দাঁড়াও একদিন পরিচয় করিয়ে দেব তোমার সাথে!…’

একাই বলে চলে ইনিসী, আমি শুনি- ‘শোনো, স্যারকে বলছি তোমার কথা।’

‘কী বলছ?’

‘আমরা যে একসময় দিনরাত ঢাকার একমাথা থেকে আরেক মাথায় হেঁটে গেছি …বলছি …আরও অনেককিছু!’

‘আরকি!’

‘আর বলছি …আমার দেখা সেরা গাধা মানব। কিন্তু এই গাধা মানবটাকে না দেখলে আমার মন খারাপ হয়!’

…আরেকদিন হন্তদন্ত হয়ে ফোন দেয় ইনিসী। ‘শাহবাগ পাঠক সমাবেশে যাচ্ছি। তুমি আসতে পারবা?’

‘ঘটনা কী?’

‘কিছু বই কিনব। আসো!’

আমি যাই। গিয়ে দেখি, বইয়ের লিস্ট মিলিয়ে বই কিনছে ইনিসী, প্রথমে ভাবি- বইগুলো তার ইন্টার্নির জন্য প্রয়োজন; পরে দেখি, সবই ফিকশন, কবিতা আর সাইকোলজির বই।

‘একেবারে আজই লি¯ট ধরে এ’সব কিনতে হচ্ছে?’

‘স্যারের সাথে কথা বলতে গেলে আটকে আটকে যাই। খালি এসব বইয়ের রেফারেন্স। না পড়লে মুর্খ মনে হচ্ছে নিজেকে!’

বইয়ের তালিকা দেখি, আসলেই সমৃদ্ধ- লোকটার রুচি আছে!

তারপর ইন্টিার্নি থেকে রেগুলার চাকরি শুরু করে ইনিসী সেখানে, আস্তে আস্তে তার স্যারের গল্প কমে আসে।

এর মাঝে শুরু হয় আমার সাথে তার ধারাবাহিক ঝগড়া।

টানা দিনের পর দিন দেখা তো করেই না, ফোনে কথাও বলে না ইনিসী। ফোন দিলে ‘ধ্যাৎ’, ‘ধুত্তরি’…‘কি ফোনে গুজুর গুজুর…’ ‘ ভাল্লাগে না’!

এসব যখন চলে, ঠিক করি- নাহ, আর ফোন দেব না। ঠিক সেদিনই ইনিসীর ফোন-

‘কি ব্যাপার! ফোন দাও না কেন?’

‘তুমিই তো না করলা!’

‘আমি আবার না করলাম কখন?’ সোজা ইনিসীর অঙ্গীকার।

‘ধ্যাত ধ্যাত করো!…’

‘ভালো করি। তুমি এখুনি আমার সাথে দেখা করবা-’

…আমার আর মনে কিছু থাকে না। আমি ইনিসীর সাথে দেখা করবার জন্য ছুটে যাই।

০৬.

যারা সবসময় হাসিখুশি থাকে, কখনও মন খারাপ করে বসে থাকলে তাদের বেশি বিধ্বস্ত দেখায়। চঞ্চলকেও ক’দিন হয় বিধ্বস্ত মনে হয়; এক সকালে তাকে আপিসে ধরি, ‘ব্যাপারটা কী? তোর দম শেষ হয়ে গেল নাকি! উৎসাহে না টগবগ করিস তুই!’

‘আর কী হবে! জগৎ দুই দিনের…!’

‘মানে কি? বাসায় কোন ঝামেলা। লোপার সাথে ঝগড়া?’

লোপাও হাসিখুশি খুব, চঞ্চলের বউ; তাদের বিয়েটা অনেকটা বাল্যবিবাহ ধরনের, সোশিওলোজিতে দু’জনে তারা সহপাঠী ছিল, সেকেন্ড ইয়ারে পড়বার সময়- কারও বাড়িতে কিছু না জানিয়ে দু’জনে বন্ধুবান্ধব নিয়ে বিয়ে করে। এমন না যে, কোনো পরিবারের কারও আপত্তি ছিল তাদের সম্পর্কে, বরং যৌক্তিক পরামর্শই ছিল- পাশ করে বিয়ে করো! …তা না, তারা দুম করে বিয়ে করে! মিরপুরে বাবা-মা, ছোট ভাই নিয়ে তখন থাকে চঞ্চল, পরে ছোট ভাই সেনাবাহিনীর কমিশনড অফিসার হয়ে চট্টগ্রামে, সেই থেকে বাবা-মায়ের সাথেই চঞ্চল বউ নিয়ে আছে। থার্ডইয়ারে তার প্রথম সন্তান- কন্যা লাবনি আর তার দুই বছর পর পুত্র গুগল আসে তাদের জীবনে; কম বয়সে অনেক দায়িত্ব এলেও করিৎকর্মা চঞ্চল সব সামলিয়ে চলছিল!

হলো কী!

‘লোপা সংসারে শুধু অভাব দেখে আজকাল! ভাল্লাগে না।…খ্যাচ খ্যাচ করছে তো করছেই! বুড়া বাপ মায়ের সামনে বেইজ্জতি!’ মুখচোখ করুণ করে বলে চঞ্চল।

‘হঠাৎ এমন হলো কেন?’

‘তার ছোট বোনের বিয়ে হইছে কয়েক বছর আগে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার! বোনকে নিয়া কানাডা গেছে; আর আমার সংসারে লাগাইছে আগুন!’

‘মানে কি!  বোন কীভাবে আগুন লাগায়!’

‘কানাডায় গিয়া সে এই করতাছে সেই করতাছে… ঘোড়ার ডিমের ফেসবুকে সারাদিন ফটো দেয়, আর লোপার মাথা খারাপ হয়! …তার বাচ্চারা এই দেশে গরিব স্কুলে পড়ে, বোনের বাচ্চা পড়ে বিদেশি স্কুলে …বুঝবি না এইসব!’ চঞ্চল সত্যিই বিমর্ষ হয়ে ওঠে। আমার খারাপ লাগে, এত উদ্যমী চঞ্চল, এত তার যোগাযোগ আর কর্মতৎপরতা, এদেশেই সে ভালো কিছু করবে। আমি বুঝাই, ‘তুই খারাপ আছিস কি? কয়েক মাসেই আমরা ব্যবসায় কত লাভ করছি …হিসাব করে দ্যাখ!’

আমি জানি, আমাদের মোট ক্যাপিটাল ছিল ১০ লাখের মতো; এখনও বছর পুরো হয়নি, মূলধন ১০ লাখ আছে তো বটেই, সাথে লাভের কমপক্ষে পাঁচ লাখের মতো যোগ হয়েছে; প্রতি মাসে আমরা তিনজনই গড়ে ৫০ হাজারের মতো এখন নিই, চঞ্চলকে ভাগে কিছু বেশিই দিই আমরা, কিছু কাজ সরাসরি তার একক নামে হয়, দেখেও আমরা দেখি নাÑ বেচারা দুই সন্তানের পিতা! অনেক দায়িত্ব।

‘তোর এসব পিঁপড়ার হিসাব এই দুনিয়ায় অচল! এখন কোটিতে গিয়া ঠেকছে মানুষের চাহিদা! জানো তো না কিছু …বুদ্ধু …বিয়া করো আগে!’ চঞ্চল বিড়বিড় করে বলে।

‘তাইলে কি করবি? চিন্তা করছিস কিছু?’ চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করি।

‘চাঁদপুরে শহরে বাবার পৈতৃক ভিটা আছে একটা। বিক্রি করে লাখ পঞ্চাশেক টাকা হবে। …তুই কিছু জোগাড় করো। বড় অ্যামাউন্ট। লাখ পঞ্চাশেক। তুহিনও আনুক বাড়ি থিকা। দেড় কোটি টাকা মিলায়ে প্রোডাকশনে যাই। প্রোডাকশন ছাড়া টাকা বানানোর রাস্তা দেখি না। আমাদের এই ধুনফুন ৩/৫ লাখ টাকা দিয়া এই শহরে আমরা কেমনে টিকুম!’ চঞ্চলের কথায় তুহিন যেমন নড়েচড়ে বসে, আমিও হতবাক হয়ে তার দিকে তাকাই; এক কথায় ৫০ লাখ টাকা জোগাড় করে আনতে পারব- আমাদের পক্ষে সম্ভব, এটি চঞ্চল কি করে ধারণা করে!

নিজের বোকামিতে নিজেরই হাসি পায়। আমি কিছুই বলি নাই আমার বাবা সম্পর্কে, কিন্তু চঞ্চল আমার বাবার সব তথ্য নিশ্চিয়ই জেনে বসে আছে, এটা জানা তার জন্য কোনো রকেট সায়েন্স না, বরং খুবই সম্ভব; সেদিন বিকেলে তুহিন আমাকে সেই কথাই বলে, ‘আরে তোর সব খবরই চঞ্চল আমারে বলছে। তোর বাবা কাস্টমসের বিরাট মালদার পারসন। সেইটা সে জানে। জানে বলেই তোরে এজেন্সিতে ভিড়াইছে। আর কিছু না!’

চঞ্চল তখন আপিসের বাইরে। তুহিনের দিকে তাকিয়ে থাকি, সে বলতে থাকে- ‘আর আমারে রাখছে ডিজাইনের কাজে। এইটা সে পারে না। …এখন টাকার ব্যাপার যখন তোরে কেমনে একলা কয়, তাই আমারেও বলতেছে! তোরা দুইজন দিলে আমাকেও দিতে হবে। কিছু হইলেও তো দিতে হবে! কী যে করি!’ তুহিনের কণ্ঠে হতাশা!

‘কী করা যায়?’ তুহিনের কাছ থেকে পরামর্শ চাই।

‘তুই টাকাটা তোর বাপের কাছ থেকে নিয়ে আয়। চঞ্চলও আনুক। আমি মাকে বরছি, সিরাজগঞ্জে আমাদের কিছু জমি আছে। বিক্রি করে ২০ লাখের মতো দেবে! সেইটাই দেই আমি! …তারপরে রেশিওতে আমারে লাভ দিবি তোরা…!’

চঞ্চল যেমন আমার খোঁজখবর বের করে, আমিও কিছু বুঝতে পারি তার সম্পর্কে। এতগুলো টাকা কোন বিশ্বাসে তাকে দেব আমি? সে যে রকম, মুহূর্তে চোখ উল্টালে আমার পক্ষে কী করা সম্ভব হবে! আমি যেতেই পারি, বাবার কাছে; চাইতেও পারি টাকা; নিজের মুখে চাইলে বাবা আমাকে টাকা দেবেন, এইটাও জানি, আমার প্রতি তার কিছু ক্ষোভ জমা আছে। কেন আমি নত হয়ে কিছু চাই না তার কাছে! দূর কিচ্ছু ভালো লাগে না! ইনিসীর মুখোমুখি বসে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কোনো চিকিৎসাই নেই!

দুনিয়ার আর সব রসাতলে যাক! ইনিসীকে ফোন করি, ‘সন্ধ্যায় কী করছ আজকে?’

‘সব তোমারে বলতে হবে!’

‘মানে?’

‘মানে হলো আমি কী করছি, কই যাচ্ছি; সব ক্যান তোমাকে বলতে হবে!’

‘আমি দেখা করব তোমার সাথে!’

‘রোজ রোজ দেখা করাটরা ছাই আমার ভাল্লাগে না! আমি স্যারের সাথে একটা মিটিংয়ে যাবো!’

ফোন কেটে দিয়ে ইনিসীকে একটা শিক্ষা দিতে ইচ্ছা হয় আমার। কাকে ফোন করা যায়? কাকে নিয়ে সন্ধ্যার সময় হুডখোলা রিকশায় ঘোরা যায়; টিএসসিতে আড্ডা দিয়ে রিকশায় উঠব, নীলক্ষেত- নিউমার্কেট হয়ে রিকশা সাতমসজিদ রোড দিয়ে এগোতে থাকবে। এত ভিড়ের মধ্যেও আমাদের কোনো সমস্যা হবে না…

ইনিসীর সাথে ঘোরাঘুরির আগে আমি জানতামই না, শুধু দু’জনে মিলে ঘুরতে কত ভালো লাগে! ছিলাম একটা নিঃসঙ্গ অনুপস্থিত মানুষ- তার চারপাশ থেকে যে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়। আমাকে উপস্থিত করে দিয়ে এখন ইনিসী নিজে উধাও হয় ইচ্ছামতো! আপিসের বারান্দায় একা বসে সিগারেট খাই, আরেকটা প্রাণীও নেই, নিস্তব্ধ চারপাশ, ঘণ্টাখানেক কেটে গেছে চুপ করে বসে আছি; ফোনটা বেজে ওঠে। ইনিসীÑ

‘কই তুমি!’

‘অফিসে!’

‘এখনও অফিসে। কী করো!’

‘বলো …কী বলবে!’

‘গুলশানে স্যারকে নামালাম। থাকো… তোমার অফিসে আসছি।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই নিকেতনে ট্রাইঙ্গেলের আপিসে পৌঁছে ইনিসী। লাল মসৃণ সিল্ক শাড়ি পরনে, সুন্দর করে সেজেছে; কিন্তু তার পুরো মুখখানা কেমন ফ্যাকাশে!

‘শোনো। তোমার সাথে আমার খুব জরুরি কথা আছে। তোমার পারসোনাল রুমে চলো।’ ইনিসী বলে।

‘পুরো অফিসে কেউ নাই। পিয়নও চলে গেছে। চলো আমার ঘরে।’ আমি বলি।

‘এক গ্লাস পানি দাও তো। খুব ঠান্ডা। ফ্রিজের পানি দাও!’

‘কী হইছে তোমার? এরকম দেখাচ্ছে কেন!’

‘পানি দিতে বলছি না!’

পানি নিয়ে আসি। ইনিসী ঢক ঢক করে পুরো গ্লাস পানি খায়; বলে, ‘আরেক গ্লাস দাও। প্লিজ।’

‘হইছে কী তোমার?’

‘পানি আনো। আমাকে পানি দাও!’

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে ইনিসীকে জড়িয়ে ধরি। সে হাইমাউ করে কাঁদতে শুরু করে- ‘তুমি আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করো না!’

‘কী হইছে বলবা তো! বাংলা সিনেমার মতো করছ কেন? জানি তো তুমি হুমায়ূন চৌধুরীর প্রেমে পড়েছ। তো এত কান্নাকাটির কী হইল!’

‘মানে কি? তুমি কীভাবে জানো?’

‘জানি। তা কি দেখে প্রেমে পড়লা! বিয়ে করবা!’

‘তুমি যা ভাবছো তা না… মানুষটা এত নিঃসঙ্গ… জানো…বয়স হয়ে যাচ্ছে, একদিন বলল… হাফশার্ট পরতে ইচ্ছা করে তার, যেন বয়স কম মনে হয়! আমার কী মনে হলো …সেদিন এক ডজন হাফশার্ট নিয়ে তার সামনে উপস্থিত হই। মানুষটা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এত মৃদু আর স্নিগ্ধ একটা মানুষ। তোমাকে… তোমাকে আমি বলতে চাইছিলাম…!’

ইনিসীকে ছেড়ে পাশের চেয়ারে বসি। ‘বললেই পারতা! লাগাতার ঝগড়া না করে…!’

‘তোমাকেও আমার একটুও ছাড়তে ইচ্ছা করে না। আমি জানি, আমি তোমাকে ছেড়ে দিলে কালই তুমি আরেকটা প্রেম শুরু করবা! আমি সেটা সহ্য করতে পারব না!’

‘তাইলে আমি করবটা কি? তুমি ওই বুড়ারে বিয়া করবা; আর আমার সাথে রোজ ঝগড়া করবা!’

আমার মুখটা নিজের মুখের সামনে দুই হাতে ধরে ইনিসী, ঠোঁটে গাঢ় চুমু খেয়ে বলে, ‘তুমি নিজেকে বিরাট বুদ্ধিমান মনে করো! আসলে বোঝ ঘোড়ার ডিম! …স্যার দারুণ একজন মানুষ! এসব প্রচলিত কোনো সংস্কারে তাকে মাপতে যেও না!…’

কথা বলতে বলতে আবার কাঁদতে শুরু করে ইনিসী- ‘আমি অনেক বড় হতে চাই জীবনে। হেজিপেজি হয়ে থাকতে চাই না। …স্যার আমাকে সত্যিই ভালোবাসেন। …হ্যাঁ, তোমাকে লুকাইছি আমি। লুকায়ে লুকায়ে স্যারের সাথে ঘুরছি, কথা বলছি, নানা জায়গায় গেছি।’

‘এই কারণেই আমার সাথে শরীর নিয়ে তোমার দ্বিধা! একসাথে দু’জনের সাথে…’

‘…উফফ …কী জঘন্য তুমি!’ এবার কান্না থামায় ইনিসী, দম নিয়ে বলে, ‘আমাকে অস্ট্রেলিয়ায় স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি যাবো। …তুমিও যাবা কিছুদিন পর। সেখানে তুমি ড্রামাটিক্সের ওপর কোর্স করবা। স্যারকে বলেছি তোমার কথা। তিনি তোমার ব্যবস্থাও করবেন বলেছেন। তিনি আমাদের সব কথা জানেন!’

নিজেকে ইনিসীর বাহুবন্ধন থেকে ছাড়িয়ে নিতে আমার আর কষ্ট হয় না।

‘তুমি কীভাবে ভাবলে আমি যাবো এভাবে! তুমি কীভাবে চিন্তা করলে! তুমি কীভাবে পারলে!’ আমি বলি।

‘অসুবিধাটা কী!’ ইনিসী বলে- ‘তুমি জানো, মেলবোর্নে স্যারের নিজের বাসা আছে। কত সুবিধা হবে আমার, তুমিও তো সেখানে যাবা কিছুদিন পরে! আমি সব ব্যবস্থা করতেছি!…’

‘দুনিয়াতে কিছু একটা করতেই হবে, এটা কে বলছে তোমাকে!’

‘এইগুলা নাটকের ডায়ালগ। শিল্পকলাতেই মানায়। জীবন নাটক না …রঞ্জনবাবু!’

…কতদিন পরে ইনিসী আমাকে সেই নামে ডাকে, সেই ‘রক্তকরবী’র সময়, সে ডাকত এই নামে; আমার কেমন যেন বুকের  ভেতরটা হাল্কা লাগে; রোজ সন্ধ্যায় ‘রক্তকরবী’র রিহার্সলে ইনিসীকে দেখে সত্যিই নন্দিনী ভেবে বসেছিলাম তাকে- মুক্তআনন্দের প্রতীক, অনিন্দ্য সৌন্দর্যের পিপাসায় পূর্ণ; আমি রঞ্জন হয়ে তাতে ভেসে গিয়েছিলাম, ইনিসীর মুখে তার স্যারের সাথে আশ্চর্য সম্পর্কের গল্প আমাকে ‘রক্ত করবী’র বন্ধন থেকে  শেষ পর্যন্ত মুক্তি দেয়।

বারান্দায় যাই; পাঁচতল বারান্দা থেকে হাতিরঝিলের অনেকটা দেখা যায়; রাত কত হলো! আশৈশব দেখা রাতের আকাশ- ফ্যাকাশে সাদার ফাঁকে ফাঁকে তীব্র নীলচে রঙ, লালাভ আভাও ছড়ানো, কিছু নক্ষত্র জ্বলজ্বল করে- ইনিসী আমার পাশে এসে নিঃশব্দে দাঁড়ায়, আমারই মতো সে-ও নিঃসীম আকাশে তাকায়- নক্ষত্রের তুমুল চুমুকে আমরা ততক্ষণে যে যার নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুধু নিজের দিকে তাকাই।

মাহবুব আজীজ : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক

#

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares