উপন্যাস : আমাদের আগুনবিহীন কাল : জাকির তালুকদার

জাকির তালুকদার ।।

বাস থেকেই নামতেই নিরীহদর্শন জনপদটি তাকে নীরব অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। হাইওয়ে নির্মিত হলে মানচিত্রের কারণে কিছু কিছু গ্রাম হঠাৎ করেই প্রমোশন পেয়ে বাসস্ট্যান্ডে পরিণত হয়। সেখানে দূরপাল্লার বাস হয়তো থামে না। কিন্তু লোকাল বাস, ট্রাক-লরি, নছিমন, ভ্যানরিকশার একটা জটলা সারাদিনই থাকে। তাই নিভৃতি পরিণত হয় সরগরমে। কয়েক বছর আগেও যা ছিল নিঝুম পল্লি, আজ সেখানকার বাসিন্দারা বাসস্ট্যান্ড হবার সুবাদে তাদের গ্রামকে দেখতে পায় হাটবারের মতো রোজই গমগম গিজগিজ করছো। বাসস্ট্যান্ড মানেই সেখানে যাত্রীছাউনির মতো কিছু একটা, কয়েকটা দোকান, বাঁধানো কোনো বট বা আমগাছের তলায় টেবিল-বেঞ্চি পেতে চায়ের দোকান আর ভ্যানরিকশার প্যাটলারের জটলা থাকবেই। এখানেও সে সবকিছুই ঠিকঠাক পেয়ে গিয়েছিল। সঙ্গে ছিল বড় বড় দুটো স্যুটকেস, ট্রাভেল ব্যাগ, ল্যাপটপের ব্যাগ। তাকে বাস থেকে নামতে দেখেই যে রিকশা বা ভ্যানওয়ালারা এগিয়ে আসবে, এটাও তার জানা ছিল। ‘কই যাবেন ছার’ বলে এগিয়ে এসেছিল একাধিক প্যাটলার। প্যাটলার যে ভুল ইংরেজি এটা সে জানে। প্যাডেল মারে যে, সে প্যাডেলার। কিন্তু ভুল বা অপভ্রংশ প্যাটলার শব্দটিকেই তারা এখন গ্রহণ করে নিয়েছে। মনে হয়, এই শব্দটার বঙ্গীকরণ হয়ে যখন গেছে, তখন বাংলা শব্দ হিসাবেই প্যাটলার চালু থাকুক। প্যাটলাররা এগিয়ে এলেও সে তাদের হাত নেড়ে জানিয়েছিল- এখন না, একটু পরে যাবে সে। তারপর স্যুটকেস, বাক্স রাস্তার ঢালে ফেলে রেখেই চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে গিয়ে বসেছিল। যেন এখানে সে সেদিনই প্রথম আসেনি, আগেও বহুবার এসেছে, এখানকার নাড়ি-নক্ষত্র সব তার জানা। চা ছিল যথারীতি বাসস্ট্যান্ডের চায়ের মতো। সে অন্যমনস্কভাবে দু-একটা চুমুক দিয়েছিল। মোবাইল ফোনটা পকেট থেকে বের করে মাকে ফোন করে জানিয়েছিল সে তার গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। শুধু মাকেই ফোন করেছিল সে। ঢাকা শহরে এত এত সংযোগের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে কেবল মাকেই ফোন করেছিল। তার পরেই মোবাইলটা সাইলেন্ট বাটন টিপে পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিল। বাস থেকে নেমে চায়ের দোকানে কয়েক মিনিট কাটানোর মধ্যেই আকাশে হঠাৎ জমা মেঘ থেকে স্বল্পমাত্রার বৃষ্টি শুরু হলে দোকানদার তার জিনিসপত্র সব ভিজে যাচ্ছে বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সে গা নাড়ায়নি। খুব স্বল্পমাত্রার এবং স্বল্পস্থায়ী বৃষ্টি। গাঁয়ের লোকের ভাষায় ‘বকরি খেদানো বিষ্টি’ তার দামি তোরঙ্গগুলোর ওয়াটারপ্রুফ কভারগুলোকেও ভিজিয়ে সারতে পারেনি। এরপরে সে সিগারেট ধরিয়ে একটা ভ্যানঅলাকে ডেকেছিল, এবং কোনো বাড়তি ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই পৌঁছে গিয়েছিল কাজের এবং বসবাসের ঠিকানায়। তারপর অফিসিয়াল কিছু ফর্মালিটি, তার ডরমিটরি পরিচ্ছন্ন করা, রান্না এবং কাজের বুয়া ঠিক করা, পাশাপাশি পরদিন থেকেই হাসপাতালে রোগী দেখা শুরু করা, এবং থিতু হয়ে বসতে বসতে একটা পুরো সপ্তাহ কেটে গেছে। গত শুক্রবারে এসেছিল সে। আজ, পরের সপ্তাহের শুক্রবার, দুপুরের খাবারের পরে সে প্রপিতামহ খান বাহাদুর খন্দকার আব্দুল করিমের ডায়েরিগুলো বের করে পুনরায় পড়তে শুরু করার অবকাশ পায়।

২.

টিএইচও ডাক্তার খলিলুর রহমান মানুষটা খারাপ না, কিন্তু একঘেয়েমিতে আক্রান্ত। ২৪ বছর ধরে সরকারি চাকরি করে এতদিনে মেডিক্যাল অফিসার থেকে থানা হেলথ অফিসার হয়েছেন। তিনি জানান, তার ক্লাসমেট, যারা প্রশাসন ক্যাডারে গিয়েছে, তারা পাঁচ বছর আগেই ডিসি হয়ে গেছে। তিনি এখনও পড়ে আছেন গ্রামে-গঞ্জে। এই হচ্ছে মেডিক্যাল ক্যাডারের অবস্থা। আসলেই ডাক্তারদের সরকারি চাকরি করা উচিত নয়। তবে থানা লেভেলে চাকরি করে করে তিনি ঢাকাতে ফ্ল্যাট কিনেছেন, গাড়িও একটা আছে, দেশের বাড়িতে ত্রিশ বিঘার ওপর জমি কিনেছেন বাগান বানানোর জন্য বাড়িও একটা বানিয়েছেন দোতলা। এক ছেলে এবং এক মেয়ে। একজন মেডিক্যালে পড়ছে, আর একজন বেসরকারি ইউনিভার্সিটেতে বিবিএ। জেলা শহরে থাকলে প্র্যাকটিস কিছুটা বেশি হতো। কিন্তু কী আর করা। নিজের সম্পর্কে এই পর্যন্ত জানিয়ে দিলেন তাকে এখানে আসার পরদিনই। তারপরেই জিজ্ঞেস করলেন- ‘তা ইমরুল করিম তুমি কেন এই রিমোর্ট উপজেলায় এলে? ধরাধরি করে একটু ভালো জায়গায় পোস্টিং নিতে পারলে না? মামা-চাচা নাই? তা বাবা কী করেন?’

সে উত্তর দেয়- ‘ব্যবসা।’

‘কীসের ব্যবসা?’

‘এই আর কী।’

সে এর চেয়ে বেশি বলে না। ডা. খলিলও বেশি চাপাচাপি করেন না। আসলে অন্যের কথা কম শুনতে শুনতে তার অভ্যেস হয়ে গেছে। নিজের কথা বেশি বলতেই আরাম পান। সেই অভ্যাসবশেই আবার বলে ফেলেন- ‘কী দরকার ছিল এই ধ্যাদ্ধেরে গোবিন্দপুরে আসার! ইয়াং ছেলে। সময় কাটানোর উপায় নাই। কথা বলার মতো মানুষ খুঁজে পাবে না। মেলামেশা করা তো দূরের কথা। কীভাবে থাকবে এখানে!’

 বাবাও এমন কথাই বলেছিল। ‘ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছা ছিল- পড়েছ। এখন চাকরি করতে গ্রামে যাওয়ার কী দরকার? আমাদের ফার্মেই কত ডাক্তার চাকরি করছে। তুমি চাইলে অ্যাপোলো বা স্কয়ারে বা ইউনাইটেডে ঢুকিয়ে দিচ্ছি। তাছাড়া চাকরির দরকারই বা কী। অনারারি খাতায় নাম লিখিয়ে পিজি বা ডিএমসিতে যাতায়াত করো। দুই বছর পরে এমডি বা এফসিপিএস করতে ঢোকো। কিংবা যদি এখনই চাও, চলে যাও ইংল্যান্ডে। এমআরসিপি বা এফআরসিএস করে এসো। বিলাতি ডিগ্রি বলে কথা। সবাই সেলাম ঠুকবে। আর যদি সরকারি চাকরিই করতে চাও, জয়েনিং দেখিয়ে ডেপুটেশন করে দিচ্ছি ঢাকার কোনো হাসপাতালে। মোট কথা গ্রামে যাওয়ার দরকার নাই।’

কিন্তু সে তো সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছিল গ্রামে আসার, এবং এখানেই আসার। কবে থেকে? প্রপিতামহের ডায়েরিটা পড়ার পর থেকেই। এখানে পোস্টিং পেতে তার আদৌ কষ্ট করতে হয়নি। বরং যখন সে এখানকার পোস্টিংয়ের চিঠি হাতে নিয়ে ডিরেক্টরের অফিস থেকে বেরিয়ে আসছিল, তার দিকে করুণার চোখেই তাকিয়েছিল কেউ কেউ।

ডা. খলিলের কথা শেষ হলে সে আস্তে জিজ্ঞেস করেছিল- ‘আমি কি আউটডোরে যাব স্যার?’

  একটু অবাক হয়েই তার দিকে তাকিয়েছিলেন থানা হেলথ অফিসার- ‘সে কী! প্রথম দিন এসেই কাজে নেমে পড়তে চাও! কাজ তো করতেই হবে। আমার এখানে থাকার কথা নয় জন ডাক্তারের। আছে পাঁচজন। তার মধ্যে দু’জন উপর মহলে ধরে ডেপুটেশন নিয়ে চলে গেছে ট্রেনিং পোস্টে। কাজ করতে করতে নাকের পানি চোখের পানি এক হয়ে যাবে হে! তাই বলছি আগে দুই-একদিন একটু ঘোরাঘুরি করো, ইচ্ছে হলে সিনিয়র তিন ডাক্তারের রুমে গিয়ে বসো, কথাবার্তা বলো তাদের সাথে, দ্যাখো তারা কীভাবে ম্যানেজ করে রোগীর পাল, তারপর তোমাকে রোস্টার দেব।’

খুবই বাস্তবসম্মত কথা। ইমরুল আর দ্বিরুক্তি না করে বেরিয়ে যায় একই মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করা সিনিয়র ভাই ডা. সেলিমের রুমের দিকে।

তবে তাকে কাজ শুরু করতে হয় সেই মুহূর্ত থেকেই।

সেলিম ভাই তাকে ঢুকতে দেখেই বলেন- ‘আইছো যহন, বইসা পড়ো মিয়া। আমারে যাইতে হবে ইনডোরে। ভাবতেছিলাম কারে রাইখা যাই। আমি উঠতাছি। তুমি আউটডোর সামলাও। এই চেয়ারেই বসো।’

অ্যাটেনডেন্ট ফরদু মিয়া প্রথম রোগীটাকে ঢুকিয়ে বসিয়ে দেয় তার টেবিলের বাম পাশের টুলে। 

রোগীটার দিকে চোখ পড়তেই মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয় ইমরুলের। তার সত্যিকারের কর্মজীবনের প্রথম রোগী। এর নাম-ঠিকানা-চেহারা তার মনে থাকবে চিরকাল। অন্তত মনে থাকা উচিত। রোগী আসলে একটা বাচ্চা। বছর আটেকের। তার মা তাকে কোলে নিয়ে বসে আছে জড়োসড়ো কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে। যেন ডাক্তারের কাছে এসে, ডাক্তারকে বিরক্ত করতে হচ্ছে বলে সে মহা অপরাধ করে বসেছে। তার সামনে রোগীর আউটডোর টিকিট রেখেছে ফরদু মিয়া। সেখানে হিজিবিজি দ্রুত অক্ষরে লেখা নাম- পাখি। বয়স নয় বৎসর।

বাচ্চা মেয়েটার দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকায় ইমরুল। পলিমাটির মতো সোঁদা কালো মুখ। শুকনো। তবু কিশোরীসুলভ লাবণ্য মুছে যায়নি। হাত-পায়ের দিকে তাকালে বোঝা যায় অপুষ্টির শিকার মেয়েটি। তার মা-ও। তাদেরকে এত মনোযোগের সাথে লক্ষ করছে ডাক্তার, দেখে আরও যেন সিঁটিয়ে যায় মা-মেয়ে। ইমরুল একটু হাসি ফোটায় মুখে। অভয় মন্ত্রের মতো। নরম কণ্ঠে জানতে চায়- ‘কী হয়েছে? কী কষ্ট আপনার বাচ্চার?’

খালি ফিট লাগে। কয়দিন পর পর ফিট লাগে। এখন রোজ রোজ ফিট লাগে। দিনে দুই-পাঁচবারও ফিট লাগে।

ভুঁরু কুঁচকে ওঠে ইমরুলের। এপিলেপসি! মৃগি!

ভালো করে হিস্ট্রি নিয়ে আর পরীক্ষা করে মোটামুটি নিশ্চিত হয় ইমরুল- এটা মৃগিই।

কিন্তু সে ট্রিটমেন্ট দেবে কী করে? এটা তো বিশেষজ্ঞের কাজ। শিশু নিউরোলজিস্টের কাছে পাঠাতে হবে। তিনি একে ইইজি করাবেন, সিটি স্ক্যান করাবেন, এপিলেপসির টাইপ নির্ধারণ করবেন, তারপর চিকিৎসা দেবেন। মেডিক্যাল কলেজে ইন্টার্নশিপের সময় এটাই দেখে এসেছে ইমরুল। ফরদু মিয়াকে জিজ্ঞেস করেÑ ‘এখানে কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ আছেন?’

‘নাহ। তাক পাইতে হলে যাওয়া লাগবি জেলা সদরের হাসপাতালেত।’

পাখির মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে ইমরুল- ‘মেয়েকে নিয়ে যেতে পারবেন টাউনে?’

রোগীর মা বলে- ‘আমরা হদ্দ গরিব ছার! আপনেই যা হয় ওষুধ দ্যান ছার!’

‘একজন শিশু বিশেষজ্ঞ দেখালে ভালো হয়।’

বাচ্চার মা এবারও বলে- ‘আমরা হদ্দ গরিব ছার!’

‘কিছু পরীক্ষা করিয়ে আনতে পারবেন?’

পাখির মা আবারও বলে- ‘আমরা হদ্দ গরিব ছার!’

মনে মনে একটু অসহায় বোধ করতে থাকে ইমরুল। ইনস্ট্রাকশন অনুযায়ী এই রোগীকে তার রেফার করতে হবে। কিন্তু যা মনে হচ্ছে, একে রেফার করলে তার আর কোনো চিকিৎসা হবে না। দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে। তার কর্মজীবনের প্রথম রোগী। নিজের দায়িত্বেই এর চিকিৎসা করবে সে। স্লিপটা টেনে নিয়ে খস খস করে ওষুধ লেখে। বাড়িয়ে দেয় পাখির মায়ের দিকে। মুখে বলে- ‘এই ওষুধগুলো খাওয়াতে শুরু করেন। সামনের শনিবারে আবার নিয়ে আসবেন আমার কাছে।’

বাচ্চা কোলে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মহিলা। এই সময় ইমরুল ডাকে ফরদু মিয়াকে- ‘এই বাচ্চার ঠিকানাটা ভালো করে লিখে রাখেন তো ফরদু ভাই!’

স্পষ্টতই অবাক হয় ফরদু মিয়া। একটু বিরক্তও। বাইরে রোগীদের ঠেলাঠেলি। সে দরজা ছেড়ে নড়লেই সবাই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়বে রুমের মধ্যে। এর মধ্যে এই হুকুম! তার বিরক্তি পরিষ্কার বুঝতে পারে ইমরুল। একটু অনুরোধের সুরেই বলেÑ ‘আমি তো এই এলাকার কোনো গ্রাম বা পাড়ার নাম জানি না। আঞ্চলিক ভাষায় বললে বুঝতে পারব না। তাই আপনাকে কষ্ট দিচ্ছি।’

ফরদু মিয়া এই রকম ভাষা ডাক্তারদের কাছে শুনতে অভ্যস্ত নয়। সে একটু বেশিই ত্রস্ত হয়ে ওঠে। একটা স্লিপ টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করে পাখির মাকে- ‘এই তোমার সোয়ামির নাম কী?’

‘হামিদ মিয়া।’

‘কুন পাড়াত বাড়ি?’

‘জিয়োনি পাড়া।’

‘আচ্ছা যাও। আমি চিনতে পারিছি।’

স্লিপটা যত্নের সাথে মানিব্যাগের ভাঁজে ঢুকিয়ে রাখে ইমরুল। তারপর মন দেয় পরের রোগীর দিকে।

তার পরেই আক্ষরিক অর্থেই রোগীর স্রোতে ভেসে অথবা ডুবে যায় ইমরুল। আসতেই থাকে রোগী। আসতেই থাকে। একটা একটা করে রোগী দেখছিল ইমরুল। ফরদু মিয়া এসে বলে- ‘এভাবে রুগি দেখলে ছার রাত তো হবিই, বিয়ানও হয়ে যাবার পারে!’

‘তাহলে?’

‘একসাথে চার-পাঁচজনারে ঢুকাই, আপনে এক কান দিয়া শুনবেন, এক হাত দিয়া লেখবেন, আর ফটাফট বিদায় করবেন। সব ছার এইভাবেই রুগি দ্যাখে ছার।’

ঈষৎ বিরক্তির সাথে ইমরুল বলেÑ ‘আপনার ডিউটি টাইম শেষ হলে আপনি চলে যাবেন ফরদু ভাই। আমাকে জিজ্ঞেসও করতে হবে না। আমি যেভাবে দেখছি, সেভাবেই রোগী দেখে যাব।’

একটু যেন লজ্জিত হয় ফরদু মিয়া। তবে ডিউটি টাইমের পরে সে থাকবে না চলে যাবে, সে সম্পর্কে কিছু বলে না।

৩.

‘এই মহিষচরা নামক গ্রামটিতেই আমার সুদীর্ঘ চাকুরীজীবনে একমাত্র মানুষ হত্যার ঘটনা চাক্ষুষ করিয়াছিলাম। বস্তুত সেই হত্যাকাণ্ডটি আমারই নির্দেশে সংঘটিত হইয়াছিল। সেই কথা ভাবিলে আজিও আত্মগ্লানিতে আমার মন ভরিয়া ওঠে। তবে গভরমেন্টের একজন নিমকখোর কর্মচারী হিসাবে দেশের স্বার্থে আমি তাহা করিতে বাধ্য ছিলাম। আমার স্থলে অন্য কেউ থাকিলে তাহাকেও একই পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইত। ঘটনাক্রমে ঘটনাটি আমার কর্মজীবনের শেষ বৎসরে সংঘটিত হইয়াছিল। এই প্রজাবিদ্রোহ সাফল্যের সহিত দমন করিতে পারায় আমার প্রমোশন হয়, সদাশয় মহারানী ভিক্টোরিয়ার ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট আমাকে উক্ত সনে দ্বিগুণ ইনক্রিমেন্ট প্রদান করেন। কারণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে এই গ্রামের অসন্তোষ এবং প্রজাবিদ্রোহ ছিল নিতান্তই বিরক্তিকর। বিদ্রোহীদের সমুচিত শিক্ষা বঙ্গীয় পুলিশ বাহিনী আমার নেতৃত্বেই প্রদান করিয়াছিল বলিয়া কলিকাতাস্থ বঙ্গীয় পুলিশ বিভাগের সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেব আমাকে একটি সার্টিফিকেটও প্রদান করিয়াছিলেন। আমার খান বাহাদুর খেতাব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এই সুপারিশপত্র বড়ই কাজে আসিয়াছিল।’

ইমরুল মনের চোখে দেখতে পায় তার পিতার পিতামহ আবদুল করিম ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত পার্কার কলমে জার্মান কালিতে এই চামড়া-বাঁধানো ডায়েরিতে নিজের কৃতিত্বের কথা লিখছেন। ‘আত্মগ্লানি’ শব্দটি একবার লিখেছেন বটে, কিন্তু বাকি ডায়েরিগুলোর কোথাও অনুতাপ বা অনুশোচনার চিহ্নমাত্র নাই। বরং তিনি ছত্রে ছত্রে বর্ণনা করেছেন এই ঘটনা কীভাবে তার বীরত্বব্যঞ্জক ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছিল, সরকারি মহলের আশীর্বাদ কীভাবে তার পরিবারের উত্তরপুরুষদের এদেশে একেবারে সমাজের উপরের তলায় অবস্থান নিতে সহায়তা করেছিল। আজ যে ‘করিম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’ ছোট্ট এই ব-দ্বীপের এ-প্রান্ত ও-প্রান্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তার সূত্রপাত তো সেদিনই ঘটেছিল। সেই দিনটাতে, যেদিন এই উপজেলার মহিষচরা গ্রামে গোরা পুলিশের বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ২২ জন কৃষক নিহত হয়েছিল প্রকাশ্য দিবালোকে, হাটভর্তি জনতার মধ্যে।

মোবাইল বাজে। নিশি। ইয়েস বাটন টিপে কানে ঠেকাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে একরাশ অভিমানী শব্দÑ ইমু ইমু আমি কী তোমার কেউ না হয়ে গেলাম! ইমু ইমু…

সে অপেক্ষা করে নিশির অভিযোগ এবং অভিমান পুরোপুরি উদ্গার হবার। তারপরে ক্লান্ত কণ্ঠে বলেÑ নিশি আমি পরে একসময় তোমাকে সব বুঝিয়ে বলব। অনেক কথা বলতে হবে। কারণ সে অনেক কথা। মোবাইলে কুলাবে না নিশি।

সে নাহয় হলো! কিন্তু তাই বলে তুমি আমাকে সারাদিনে একবারও ফোন করবে না! আমি ফোন করলেই তুমি দুই-এক মিনিট পরেই ব্যস্ততার কথা বলে লাইন কেটে দাও। পরে করবে বলেও আর ফোন করো না। আমি ওয়েট করি ওয়েট করি। কিন্তু তোমার কল আর আসে না। তুমি তো জানোই যে, আমি ওয়েট করতে জানি না। আই হেট ওয়েটিং। কিন্তু আমি তোমার জন্য ওয়েট করি। আমি তোমার জন্য সবকিছু পারি। তুমি জানো ইমু ফর ইয়োর সেক ওনলি আই ক্যান চেঞ্জ মাইসেলফ, আই হ্যাভ অলরেডি চেঞ্জড মাইসেলফ।

পরিবর্তন তো আমারও হয়েছে নিশি।

তোমার হয়েছে রিভার্স সাইডে। আমি নিজেকে পরিবর্তন করেছি তোমার জন্য, তোমার দিকে। আর তুমি চেঞ্জ হয়ে গেছো অপোজিট ডিরেকশনে।

এসব থাক নিশি। আমি সামনের কোনো এক উইকএন্ডে আসছি। মুখোমুখি কথা হবে। ডিটেইল কথা হবে।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে দু’জনেই। তারপরে নিশি ঈষৎ ভঙ্গকণ্ঠে বলেÑ গুড বাই। টেক কেয়ার।

ইমরুলও বলেÑ বাই।

ফোন রাখতে যাওয়ার সময় যেন খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে নিশির কণ্ঠÑ লাভ ইউ জান!

সেই কাতরতা অনেকটা সময় ধরে বেজে চলে ইমরুলের কণ্ঠে। সে মনে মনে বলেÑ আমি দুঃখিত নিশি। কিন্তু জীবনে এই প্রথম আমি একটি মিশন খুঁজে পেয়েছি। জীবনকে এখন আর আমার কাছে অর্থহীন ভোগসর্বস্ব মনে হচ্ছে না। কিন্তু সেই মিশন তোমার চিন্তারও অগম্য নিশি। তুমি কোনোদিনই সেই মিশনের পার্ট হতে পারবে না। স্যরি মাই বিলাভেড!

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও জীবনটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। সেদিনটার কথা মনে পড়ে।

তখনও জীবনটা ছিল উদ্দেশ্যবিহীন। তাই বিষণ্ন থাকত ইমরুল। এড়িয়ে চলতে চাইত চেনা মহল। কিন্তু নিশি তাকে এড়িয়ে চলতে দেয় না। আবার তাকে এড়িয়ে চলার সুযোগটাও দেয় না ইমরুলকে।

আজকেও কোনো পূর্বসংকেত না দিয়েই নিশি ঢুকে পড়ল ইমরুলের ঘরে। এমন হুড়মুড় করে সে ঢোকে যে ইমরুল বিরক্ত হওয়ার সময়টুকুও পায় না। ঘরে ঢুকেই খলবলিয়ে উঠল নিশিÑ কী ব্যাপার তোমার কোনো সাড়াশব্দ নাই ক্যান? আমি কতবার তোমাকে মোবাইলে ট্রাই কঢ়লাম, বাট তোমাঢ় রেসপন্স নাই। শেষে আমি বাধ্য হলাম চলে আসতে। বাট তুমি তো বুঝতে চাও না আমাঢ় পক্ষে ফ্রিকুয়েন্ট বাইঢ়ে আসা একটু ডিফিকাল্ট।

অর্থাৎ নিশি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সে একজন স্টার এবং সেলিব্রেটি। লাক্স ফটোসুন্দরী তারকা। পত্রিকায় মাঝে মাঝেই তার ছবি ছাপা হয়। টিভিতেও দুই-একটি বিজ্ঞাপনের মডেল সে। এমনিতেই সুন্দরী তরুণীর দিকে রাস্তার মানুষও কমপক্ষে দুইবার তাকায়। আর নিশির মতো কেউ বাইরে বেরোলে তার দিকে কৌতূহলী চোখের দৃষ্টি যে আছড়ে পড়বে তাতে আর আশ্চর্য হওয়ার কী আছে।

কিন্তু ইমরুল এখন গল্প করার মুডে নেই। সে সরাসরি আক্রমণ করল নিশিকেÑ ভাগ্যিস তোমাদের ফটোসুন্দরী প্রতিযোগিতায় কোনো কথা বলতে হয় না। তাহলে তোমার ভাগ্যে আর পুরস্কার জুটত না।

বড় বড় চোখ তুলে তাকায় নিশি- ক্যান? আমার ভয়েস কি খারাপ? টিভির ভাইয়ারা তো বলে আমি নাকি গান শিখলে ফাটাফাটি হয়ে যাবে।

তোমার টিভির ভাইয়ারা! তাচ্ছিল্যের হাসি ফোটে ইমরুলের ঠোঁটেÑ আমি তোমার ভয়েসের কথা বলছি না, বলছি তোমার উচ্চারণের কথা। এত জঘন্য তোমার উচ্চারণ!

ক্যান? কোন উচ্চারণটা খারাপ?

বুঝতে পারলে কী আর লোকের সামনে এত নির্লজ্জভাবে স্টাইল করে ভুল উচ্চারণ করতে!

কোনটা ভুল করেছি বলবে তো!

র-এর উচ্চারণ করার সময় জিভটাকে রসে ভিজিয়ে ঢ় উচ্চারণ করো।

না না তুমি ঠিক বুঝতে পারোনি। আমরা অলমোস্ট সব্বাই তো এভাবেই কথা বলি।

সবাই বললেই যে ভুলটা শুদ্ধ হয়ে গেল তা তো নয়। আর কথার মাঝখানে বারবার ইংরেজি শব্দ ঢোকানোর দরকারটা কী? তারপরে আছে বিরক্তিকর ন্যাকা ন্যাকা ভঙ্গি।

রাগে না নিশি। উল্টো খিলখিল করে হেসে বলে- তুমি বুঝতে পারোনি পণ্ডিত মশাই, এটা ন্যাকা ভঙ্গি নয়। এটি হচ্ছে সেক্সি ভঙ্গি।

যার-তার সাথে কথা বলার সময়েও সেক্সি ভঙ্গি আনতে হবে? বাপ-চাচার সঙ্গেও?

এই কথায় থতমত খেয়ে যায় নিশি। বলে- আসলে বোঝোই তো এখন গ্লোবালাইজেশনের পিরিয়ড। অ্যাপিলিং না হলে কি চলে?

এমন নির্লজ্জ কথাগুলো এমন স্বাভাবিকভাবে বলতে শুনলে কার আর মাথা ঠিক থাকে। রাগের চোখে গালি বেরিয়ে এলো ইমরুলের মুখ থেকে- পারভার্ট!

তা বললে তো আমাদের জেনারেশনের সবাইকে বলতে হয়।

না। সবাই নয়।

সবাই না হলেও অলমোস্ট সবাই। অন্তত ঢাকা সিটির…

রেগে উঠল ইমরুলÑ ঢাকা সিটির কতটুকু জানো তুমি? তোমার টিভি স্টুডিওগুলোই কি ঢাকা সিটি?

কাছে এসে ইমরুলের চুলের মধ্যে আঙুল ঢোকানোর চেষ্টা করে নিশি। ইমরুল মাথা সরিয়ে নিলেও উজ্জ্বল চোখে হাসে নিশি- আচ্ছা বাবা আচ্ছা! এখন থেকে আমি তোমার কথামতো ঠিক উচ্চারণ করার চেষ্টা করব। আচ্ছা একটু ভুল উচ্চারণ হলে কী হয়?

গম্ভীরভাবে বলে ইমরুল- এই ভাষাটা শুধু তুমি-আমি তৈরি করিনি লামিয়া। শত শত বছর ধরে ভাষার চর্চাকারী উন্নত মেধার মানুষরা ভাষার গতি-প্রকৃতি-চরিত্র লক্ষ্য করেছেন, তারা ভাষার প্রমিতায়ন করেছেন, সঠিক উচ্চারণবিধি তৈরি করেছেন, সঠিক লেখন-রীতি তৈরি করেছেন। হাজার হাজার মনীষীর এই কাজগুলিকে তুমি এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে যা খুশি সেভাবে ভাষার ব্যবহার করা তো ভাষার ওপর রীতিমতো বলাৎকার করা।

কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে ইল্লিটারেট মানুষরা তো সবসময় ভুল উচ্চারণ করে?

তাতে ক্ষতি নেই। তারা কথা বলে নিজস্ব ছোট পরিমণ্ডলে। কিন্তু তোমরা যখন কথা বলো টেলিভিশনে বা সিনেমায় বা অন্য কোনো মিডিয়াতে, তখন ভুল করা অন্যায়। কারণ দর্শক-শ্রোতাদের অনেকেই তখন মিডিয়ার উচ্চারণটাকেই মডেল হিসাবে নেয়। তারা নিজের অজান্তেই ভুল জিনিস শেখে। এতে ক্ষতি হয় মারাত্মক। পুরো জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এতক্ষণে যেন ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে নিশি। বলেÑ স্যরি ইমরুল! আমি এভাবে কখনও ভাবিনি। আই স্যাল চেঞ্জ মাইসেলফ।

দ্যাটস ফাইন। ইমরুল ধন্যবাদ জানায় এভাবেই।

এবার দুষ্টুমির হাসি নিশির ঠোঁটে- কিন্তু তার বিনিময়ে আমি কী পাব?

কী পাবে মানে? কী চাও?

তোমাকে চাই।

যেন নিশি খুব দারুণ একটা রসিকতা করেছে এমনভাবে হেসে ওঠে ইমরুল। বলেÑ আমাকে আবার চাওয়ার কী আছে! আমি তো এমনিতেই তোমাদের সাথে সাথেই আছি।

আমাদের নয়Ñ আমার করে চাই তোমাকে। নিশির কণ্ঠে গাঢ় আবেগ।

ইমরুল একটু হাসে। জিজ্ঞেস করে- তোমার কি এখন টাইমপাস করা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিশি?

ঝাঁঝিয়ে ওঠে নিশি- এটা টাইমপাস নয়! তুমি কেন বুঝতে চাও না আমি রিয়েল…

না নিশি! মাথা ঝাঁকিয়ে তাকে থামিয়ে দেয় ইমরুল- উচ্চারণ করো না শব্দটা! যা বলতে চাইছ সেই ‘ভালোবাসা’ শব্দটা আমাদের কারও উচ্চারণ করাই উচিত নয়। আমরা, মানে তুমি-আমিসহ এই জেনারেশনের এবং ঢাকা শহরের এই পরিবারগুলোর সদস্যরা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি ভালোবাসার অনুভূতি। আমাদের এই সমাজে সবকিছু হয় লাভ-লোকসানের হিসাব, নয়তো টাইমপাস, নয়তো জাস্ট স্পোর্টস। আমাদের মুখ থেকে সত্যিকারের ভালোবাসার কথা উচ্চারিত হলে সেটাকে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর বাংলা নাটকের ডায়ালগের মতো হাস্যকর মনে হয়।

এবারে রক্ত সরে যায় নিশির মুখ থেকে। কোনোমতে বলতে পারে- তুমি আমার এই ফিলিংসটাকেও অভিনয় বলছ?

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে ইমরুল। তারপর বিষণ্ন গলায় যখন কথা বলে, তখন মনে হয় তার অবস্থান এখান থেকে অনেক অনেক দূরে- এটি তোমার-আমার ব্যাপার নয় নিশি, এটি আমাদের সমাজের এবং সময়ের অভিশাপ। আমাদের এই পশ সোসাইটির মানুষ, এই আমরা যে জীবন বেছে নিয়েছি, সেখানেও প্রতিমুহূর্তে গ্লোবাইলাইজেশন আর ওপেন মার্কেট ইকোনমির কমপিটিশনে অবৈধভাবে জয়লাভের নিশ্চয়তা। তার বিনিময়ে আমাদের যা যা হারাতে হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ভালোবাসা।

অসহিষ্ণু হয়ে নিশি বলে- আমি তোমার এত তত্ত্বকথা বুঝি না। আমি স্ট্রেট জানতে চাই তুমি আমাকে চাও কি না?

ম্লান হাসে ইমরুল- চাওয়া বা পাওয়ার সাথে ভালোবাসার তো কোনো সম্পর্ক নেই নিশি। আমাদের সোসাইটির লোকজন আমরা চাওয়া বুঝি, ছলে-বলে-কৌশলে তা পাওয়া বা আদায় করে নেওয়া বুঝি। কখনও কখনও ভুল করে তাকেই ভালোবাসা মনে করি।

নিশি একগুঁয়ে- আচ্ছা তা-ই হলো! তবু আমি তোমাকে চাই!

এই কথার কী উত্তর দেবে ইমরুল! কিন্তু নিশি ছাড়ে না তাকে। জেদের সুরে বলেÑ বলো তোমাকে পাওয়ার জন্য কী করতে হবে আমাকে? তুমি যা করতে বলবে আমি তাই-ই করব।

ইমরুল একটু ফাঁপরে পড়া কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- কিন্তু তুমি আমাকেই বা চাও কেন? কতজনই তো আছে তোমার জন্য পাগল! তাদের যে কোনো একজনকে বেছে না নিয়ে তুমি আমাকে চাইছ কেন?

কারণ… কারণ তুমি ডিফারেন্ট।

হো হো করে হেসে উঠল ইমরুল- একই রকম মানুষের সাথে চলাফেরা করতে করতে একঘেয়েমি এসে গেছে নিশি? তাই এবার স্বাদ বদল করতে চাইছ?

মুখটা ম্লান হয়ে গেল নিশির। বলল- তুমি আমাকে যতই অপমান করতে চেষ্টা করো না কেন, আমি আমার অনেস্ট অনুভূতির কথা বলতেই থাকব।

ইমরুল আবার একটু গম্ভীর- ভালোবাসার তুমি-আমি কিছুই জানি না নিশি। ভালোবাসা জানে হাসারি পাল।

হু ইজ দ্যাট ফেলা?

হাসারি পাল। ডোমিনিক লাপিয়েরের ‘সিটি অব জয়’ মুভিটা দেখোনি?

দেখতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু খুব মনোটোনাস মুভি কোনো সাসপেন্স নেই। পুরোটা দেখতে পারিনি।

হাসারি পালদের জীবনে তো সাসপেন্স থাকে না নিশি। মুভিজে সাসপেন্স আসবে কোত্থেকে! তবে তাদের জীবনে আছে ভালোবাসা।

কই সেই ছবিটাতে কোনো প্যাশনেট সিন আছে বলে তো মনে পড়ছে না!

এবার জোরেই হেসে ফেলল ইমরুল- ভালোবাসা দেখাতে হলে প্যাশনেট সিন দেখাতে হবে তাই না? নারী-পুরুষের তীব্র দৈহিক মিলন? একজন হামলে পড়ছে আরেকজনের ওপর? প্রায় বেসিক ইন্সটিংক্ট! না নিশি  অতখানি গ্ল্যামারাস সেক্স দৃশ্য হাসারি পালদের হয় না। তবে ভালোবাসা হয়। হাসারি পাল নিজের পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে শহরে এসে রিকশা চালাচ্ছে। তারপরে তার টিবি। তখন টিবির ওষুধ হয়নি। মৃত্যু নিশ্চিত। সে মরলে পরিবার বাঁচবে কী খেয়ে? হাসারি পাল তখন মৃত্যুর আগেই দালালদের কাছে বিক্রি করে দিল নিজের কঙ্কাল।

ইস্! আনবিলিভেবল! আমি মুভিটা আবার দেখব।

মৃদু হাসল ইমরুল- মুভি না দেখলেও আমাদের চারপাশে অনেক হাসারি পাল দেখা যায়।

মোবাইল নামিয়ে রেখে ডায়েরিটাও বুক থেকে সরায় ইমরুল।

বেরিয়ে আসে বাইরে। ট্রাউজার এবং টি-শার্ট পরেই। দুপুর গড়ান দিয়েছে বিকেলের দিকে। এলাকাটাই ঘুরে দেখা হয়নি। ফরদু মিয়া বলেছিল- কী আর দেখবেন ছার! নেহাত পাড়াগাঁ। নাম হইছে টাউন। হইছে উপজেলা। কিন্তু আছে সেই পাড়াগাঁ-ই।

তাদের হেলথ কমপ্লেক্সটা লোকালয়ের একেবারে দক্ষিণ মাথায়। তারপর উপজেলা পরিষদের অফিসগুলো। উত্তর দিকে মূল বাজার। সেটাই আসল কেন্দ্র। একা একাই বাজারের দিকে হাঁটতে শুরু করে ইমরুল।

এই পড়ন্ত দুপুরে এবং উঠতি বিকেলেও বাজারে বেশ ভিড়। ইমরুল আগেই শুনেছে চলনবিল এলাকার কয়েকটা বড় বাজার এবং মোকামের মধ্যে এটি একটি। বর্ষাকালে চলনবিলের সমস্ত পণ্যই ভেসে আসে এই বাজারে। বিশেষ করে সপ্তাহের দুই হাটের দিনে। অন্য সময়েও বিলের উত্তর অঞ্চলের ফসলাদি আসে এই মোকামেই। মাড়োয়ারিদের অন্তত তিনটা কুঠি আছে। কেউ কেউ দাবি করে এদের কুঠি আছে সেই জগৎ শেঠের সময় থেকেই। জগৎ শেঠের বিভিন্ন বাণিজ্য কুঠি ছিল চলনবিলের বিভিন্ন বাজারে, এ কথা সবাই জানে। কাজেই এখানেও হয়তো ছিল।

গ্রামে-গঞ্জে এখন বাইরের মানুষ আসে হরদম। কাজেই নতুন লোক দেখে খুব ঔৎসুক্যের চোখ নিয়ে আর ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে না তারা। দশ বছর আগে হলেও এখানে ইমরুলের পদার্পণ সকলের চোখের কড়া খোরাক হয়ে থাকত। কিন্তু আজ কেউ তেমন একটা লক্ষ করে না তাকে। ব্যাপারটা একটু স্বস্তি দেয় ইমরুলকে। সে বিনা বাধায় বিনা নজরদারিতে বাজারটা ঘুরে বেড়াতে পারবে। তাকে দেখে এলোমেলো ঘোরাঘুরির  কথা মনে হলেও আসলে সে সুনির্দিষ্ট একটা জিনিস খুঁজছে। সে একজনের কাছে শুনেছিল বাজারের ঠিক মাঝামাঝি আছে জিনিসটা। কিন্তু প্রায় আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বাজারের এমাথা-ওমাথা ঘুরে আসে সে। রোদ পুরোটা সময়ই তার মাথার ওপর। হাঁটাহাঁটির তেমন অভ্যেস নেই। তাই হাঁপ ধরে গেছিল পাঁচ মিনিটের মধ্যেই। কিন্তু গা না করে ঘোরাঘুরি চালিয়ে গেছে সে। ঘামে প্রায় ভিজেই গেছে টি-শার্ট। চুল বেয়ে ঘাড়ে-পিঠে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম। সঙ্গে রুমাল রাখার অভ্যেস নেই। ঢাকা শহরে টিস্যুর চল এখন। এখন থেকে পকেটে রুমাল রাখতে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে কী করা যায়? দোকানের তাকের দিকে চোখ তুলতেই সে দেখতে পায় আছে। ছোট পকেট টিস্যুর প্যাকেট ঝুলছে বেশ কয়েকটি মনোহারি-মুদিখানা দোকানে। খুশিমনে কিনে নেয় ইমরুল। না একেবারে গন্ড কোনো গ্রামে আসেনি সে। কিন্তু যা খুঁজছে সেটা তো নেই! হতাশ হয়ে ফিরে যাবার কথা ভাবে ইমরুল।

ঠিক সেই সময়েই পাশের ওষুধের দোকান থেকে বেরিয়ে আসে এক যুবক। তার কাছে এসে দাঁড়ায়Ñ স্লামালেকুম স্যার!

তার দিকে তীক্ষè চোখে তাকায় ইমরুল। ইতস্তত করে। যুবকটি সপ্রতিভ কণ্ঠে বলেÑ বাজার দেখতে আইছেন স্যার? আসেন। আমার দোকানে বসে এক কাপ চা খান স্যার।

আপনি আমাকে চেনেন?

একটু দ্বিধা করেও শেষ পর্যন্ত বসারই সিদ্ধান্ত নেয় ইমরুল। সে যা খুঁজছে তার জন্য তো তাকে নানারকম সংযোগ-সূত্র খুঁজে বের করতে হবে। স্থানীয় লোকের সাথে তার যোগাযোগ করতেই হবে। সেটা এই যুবক ওষুধ ব্যবসায়ীতে দিয়ে শুরু হলে মন্দ কী! সে পা বাড়ায় রওশন ফার্মেসির দিকে।

মৃদু হেসে যুবক উত্তর দেয়- চিনি তো স্যার। আপনে আমারে হেলথ কমপ্লেক্সের নতুন ডাক্তার। আমি স্যার ওষুধের ব্যবসায়ী। আপনাদের না চিনলে কি আর আমার চলে স্যার। আসেন স্যার। আমার দোকানে একটু বসেন!

বেশ বড়সড় দোকান। ভেতরে ঢুকে একটু আরাম করেই বসে ইমরুল। তাকে ডেকে নিয়ে যুবককে বলেÑ কিছু মনে করবেন না। আমি আপনার নাম জানি না।

আরে জানবেন কী করে স্যার? আমি তো আর আগে সামনাসামনি হয়নি আপনার। আমার নাম রতন স্যার। সাইদুর রহমান রতন।

দোকানে তার চেয়ে কম বয়সী সহকারী আরও দুইজন আছে। তাদের একজনের দিকে তাকিয়ে রতন বলে- কালামরে, একটু কার্তিকের দোকানে যা। টাটকা রসগোল্লা আনবু বড় সাইজের। তারপরে চা আনবু রাজেনের ঘরেত থেকে।

একটু আপত্তি জানায় ইমরুল- না আমি মিষ্টি খাবো না। শুধু চা হলেই চলবে।

এই প্রথম আমার দুয়ারে পারা দিলেন স্যার। ইকটু মিষ্টিমুখ না করলে মনে দুঃখ পাবো স্যার। খান স্যার। কার্তিকের মিষ্টি খুব ভালো। নিজের হাতে ছানা তৈয়ার করে কার্তিক। চলনবিলের দশগাঁয়ের মানুষ কুটুমবাড়ি যাওয়ার সোমায় কার্তিকের মিষ্টি নিয়া যায়।

আর সে প্রসঙ্গে কথা না বাড়িয়ে ইমরুল বলে- এই দোকান কতদিনের।

তা বলতে পারেন স্যার প্রায় চল্লিশ বৎসরের। দ্যাশ স্বাধীনের পরপরই আমার আব্বা সরকারি চাকরি ছাড়া দিয়া এই দোকান খুলিছিল। এই অঞ্চলে এইটাই প্রত্থম ফার্মেসি স্যার। আপনাদের দোয়ায় এখনও সবচায়ে বেশি চালু ফার্মেসি এইডাই। খুচরা বিক্রি দিনে কয়েক হাজার টাকা হয় স্যার। আর পরায় দুইশো দোকান আছে চলনবিলের নানান গাঁয়ে যারা আমার কাছ থেকে হোলসেলে ওষুধ কিনে স্যার।

এসব কথা খুব অস্পষ্টভাবে কানে ঢুকছে ইমরুলের। সে ভাবছে তার উদ্দিষ্ট জিনিসটার খোঁজ কোথায় পাওয়া যাবে। রতন থামতেই সে চট করে জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা… আমি শুনেছিলাম এখানে একটা পুরনো স্মৃতিসৌধ আছে। শুনেছি সেটা এই বাজারের মধ্যেই। আমি অনেকক্ষণ ধরে ঘুরলাম, কিন্তু দেখতে পেলাম না। বলতে পারবেন ওটা কোথায়?

একটুও চিন্তা না করে রতন বলে- সেইটা তো এইখানে না। গণ্ডগোলের, মানে মুক্তিযুদ্ধে যারা মারা গেছিল, তাদের একটা শহীদ মিনার আছে হাইস্কুলের মাঠে।

ইমরুল মাথা নাড়ায়- না সেটা নয়। অনেক পুরনো একটা স্মৃতিসৌধ। ব্রিটিশ আমলের।

মাথা চুলকায় রতন- এমন জিনিসের কথা তো স্যার আমার জানা নাই। ঠিক আছে আপনে চা-মিষ্টি খান। আমি বাজারের চৌকিদারেক ডাক দিচ্ছি। বুড়া মানুষ। সে-ই জানলে জানতে পারে।

আরেক সহকারীকে পাঠায় রতন চৌকিদার রজব আলিকে খুঁজতে।

মিষ্টি এবং চা খেতে খেতে একটু অসুবিধাতেই পড়ে ইমরুল। রসগোল্লাটা সত্যিই খুব বেশি মিষ্টি। আর চা-ও একেবারে সর ভাসা দুধের চা। গলা পেরিয়ে নামতে চায় না। কিন্তু যেচে আসা হলেও মেজবানকে অপমান করা যায় না। তাই বেশ কষ্ট করে হলেও মিষ্টি এবং চা দুটোই গিলে ফেলতে হয় তাকে। কিন্তু মুখের মধ্যকার অস্বস্তিকর অনুভূতিটা কুট কুট করতে থাকে। একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ডাক্তার মানুষের জনসমক্ষে ধূমপান অনেক কথার জন্ম দেবে মনে করে চেপে থাকে সে। কিন্তু রতন দেখা যায় তার এই অভ্যাসের কথা ঠিকই জানে। সে বেনসনের প্যাকেট আর দেশলাই সামনে ধরে। ইতস্তত করে ইমরুল- লোকজনের সামনে সিগারেট খাওয়া…

খান স্যার, কিচ্ছু হবি না। টিএইচও স্যার তো এই জাগাত বসেই একর পর এক টেনে যায়। অন্য ডাক্তার স্যারেরাও খায়। আপনি নিশ্চিন্তে খান স্যার।

সিগারেট শেষ হবার আগেই আরেক সহকারী ফিরে আসে। রজব আলিকে বাজারের মধ্যে দেখা যায়নি। রতন একটু ভুরু কুঁচকায়- বুড়া আবার গেল কুন জাগাত! তার তো কামের মধ্যে আছে বাজারের এই দোকানে ওই দোকানে ঘুরা আর বিনা পয়সাত চা-পান-বিড়ি খাওয়া। আচ্ছা ইউনিয়ন পরিষদে নাই তো? ঐ জাগাত যায়া একবার দেখবু নাকি?

তাকে নিরস্ত করে ইমরুল। বলে- আর একদিন হবে রতন সাহেব। আমি এখন উঠি।

রতন বেশি কিছু বলার আগেই উঠে পড়ে ইমরুল। হাঁটতে থেকে ফেরার পথ ধরে। ফেরার পথেও দুইদিকে তাকায় তীক্ষ্ন চোখে। নাই কি স্মৃতিসৌধটা? ধ্বংসাবশেষ হলেও যদি থেকে থাকে? বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক অস্থিরতা ডানা ঝাঁপটায়। সেখানে নামগুলো তো লেখা থাকবে। ওটাকে খুঁজে না পেলে এই এলাকায় পোস্টিং নিয়ে আসাই ব্যর্থ হবে ইমরুলের।

৪.

আউটডোরে যথারীতি প্রচণ্ড ভিড়। সকাল ঠিক ঠিক ৯টায় রোগী দেখতে শুরু করেছে ইমরুল। বারোটা বেজে গেলেও ভিড় তেমন কমেনি। সকাল এগারোটায় টিএইচও-র রুমে হালকা রিফ্রেশমেন্টের সিস্টেম আছে। চায়ের সঙ্গে বিস্কুট, ডালপুরি কিংবা শিঙাড়া। এই সময়টাতে সারাদিনের কর্মপন্থাও ঠিক করে নেওয়া হয়। বিভিন্ন মিটিংয়ে যোগ দিতে হয় খলিল সাহেবকে। তাই তিনি এই সময়টাতেই সবাইকে ইনস্ট্রাকশন দিয়ে বেরিয়ে যান। আজ তেমনভাবে বসতে পারেনি ইমরুল। একটা বিস্কুট মুখে গুঁজে চায়ের কাপে দুই চুমুক দিয়েই উঠে পড়েছে। সেলিম ভাই এবং গাইনির ঝরনা আপা হাসে মুখ টিপে। রোগীর জন্য ইমরুলের ঝটপটপনি দেখে হাসে। কয়েকদিন পরে দেখা যাবে তাদের মতো ইমরুলও রোগীদের সংখ্যা দেখে বিরক্তি প্রকাশ করছে, চেম্বার খুলে বসছে বিকেলে, ফরদু মিয়াকে দিয়ে রোগীদের বলাচ্ছে যে এখানে কী ভালো করে রোগী দেখা যায়? ভালো চিকিৎসা পেতে হলে তারা বিকেলে আসুক তার প্রাইভেট চেম্বারে। সেখানে ভালোভাবে রোগী দেখা হয়, ভালো ব্যবহার করা হয়, ভালো ওষুধ লেখা হয়।

সেলিম ভাই অবশ্যি বলে- আমি যতদূর জানি ইমরুল অসম্ভব ধনী পরিবারের সন্তান। টাকার জন্য কোনো চাপ নাই ওর।

ঝরনা আপা বলে- আরে রাখেন তো সেলিম ভাই! আমরা কি ভিখারি পরিবারের সন্তান? কিন্তু পেশা হচ্ছে পেশা। পেশাদার হয়ে গেলে তখন আর অন্য কোনো পথ থাকে না। টাকার দরকার থাকুক আর না থাকুক, তখন জীবন সেইভাবেই সাইজ হয়ে যায়। ইমরুলও সাইজ হয়ে যাবে।

এসব কথা শোনার সময় নেই ইমরুলের। সে রোগী সামলাতে ব্যস্ত। সেই সময় পর্দা ঠেলে ঢোকে তিন যুবক। তাদের দেখে একটু তটস্থ হয়ে ওঠে ফরদু মিয়া। তাড়াতাড়ি করে ইমরুলের সামনের চেয়ারগুলো মুছতে থাকে। মুখে বলেÑ আসেন বাবারা আসেন!

তিনজনের মধ্যে একজনের পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। বাকি দু’জনের পরনে জিনস এবং চক্রাবক্রা গেঞ্জি। একনজর দেখেই আঁচ করে নেয় ইমরুল। এরা এই উপজেলার কেষ্টুবিষ্টু যুবক। মনের মধ্যে কাঠিন্য তৈরি হয়ে যায় আপনাতেই।

জিনস পরা একজন মুখ খোলে- ভাই কলো নতুন ডাক্তার আইছে, চল তার সাথে একটু আলাপ পরিচয় করে আসি।

খুব ভালো করিছেন। ফরদু মিয়া তড়বড় করে বলেÑ নতুন ডাক্তার ছার নিজেই যাবেন বলিছিল, কিন্তু এত রুগী! ছার তো টাইমই পায় না।

পরিচয় পর্বে জানা যায় পাজামা-পাঞ্জাবি হচ্ছে সরকারি দলের যুব সংগঠনের উপজেলা প্রেসিডেন্ট। সে বেশ বিনয়ের সাথে ইমরুলকে জিজ্ঞেস করে এখানে তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না।

নাহ। তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।

যুব-সভাপতি জানায়- তার আরও আগে আসা উচিত ছিল। এলাকায় কোনো সম্মানিত ব্যক্তি বা কর্মকর্তা এলে তার তো দায়িত্ব হয়ে পড়ে তার সুবিধা-অসুবিধা দেখা। কিন্তু এত চাপ! এমপি সায়েব এলাকায় আসেন কম। তার হয়ে প্রায় সবকিছুই দেখাশোনা করতে হয় যুবনেতাকে।

ইমরুল উসখুস করছিল। বাইরে রোগীরা অপেক্ষা করছে। সে চায় নেতারা তাড়াতাড়ি চলে যাক। সেই কারণে ফরদু মিয়াকে চা জোগাড়ের কথাও বলেনি সে। কিন্তু নিজের গুরুত্ব সম্পর্কে পুরো সবক না দিয়ে উঠবে না যুবনেতা।

অবশেষে আসল কথাটা আসে- বুঝেনই তো ডাক্তার সায়েব, সারাদিন পাবলিকের কাম করে বেড়াই, আমার সংসার কীভাবে চলে? চান্দাবাজি তো করতে পারি না। তেমন বংশের ছাওয়াল আমি না। তাছাড়া এই যে এত এত লোকের কাম করে দি, কেউ কুনোদিন বলতে পারবে না যে একটাকা ঘুষ দিতে হইছে আমাক। কিন্তু আমার সংসার তো চালাতে হবি। তাই একখান ছোটোমোটা প্যাথলজি দিছি। ডায়াগনস্টিক সেন্টার আরকি। সেইডা তো আর আপনাদের সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। তা খলিল ভাই প্রতিদিন দশখান রোগী পাঠায়। অন্য ডাক্তাররাও পাঁচ-দশখান করে কেস পাঠায়। আমি শুনলাম এখন হাসপাতালে আপনেই সবচায়ে বেশি রোগী দ্যাখেন। তা ভাই আমাক যে খানিক হেল্প করা লাগে।

এইসব লোক যে বিনা উদ্দেশ্যে এক ধাপও নড়ে না ইমরুল তা জানে। তার কাছে আসার পেছনের ধান্ধাটা জানা হয়ে গেলে বলে- ঠিক আছে আমি চেষ্টা করব। আসলে রোগীকে পরীক্ষা করতে পাঠাব কী, এরা এতই গরিব যে, বাইরে থেকে ওষুধ কেনার দরকার হলে সেটাই কিনতে পারে না।

হেসে ওঠে যুবনেতা। বলে- আপনে তো গাঁয়ের মানুষেক চিনেন না! এরা হচ্ছে সদকা খাওয়ার যম। যদি বুঝতে পারে যে আপনে নরম মানুষ, আপনের সামনে খালি নাকে কাঁদবি। আপনে যদি কন যে পরীক্ষা করাই লাগবি, তখন দেখবেন যে সুড় সুড় করে প্যাথলজির দিক হাঁটতিছে।

এখনকার মতো ঝামেলা দূর করার জন্য ইমরুল বলে- আচ্ছা ঠিক আছে, আমি দেখব।

তা তো দেখবেনই। আমিও আপনেক দেখব। দেখব যাতে আপনের কুনো অসুবিধা না হয়।

ওরা বেরিয়ে গেলে ইমরুল বলে ফরদু মিয়াকে- তাড়াতাড়ি রোগী পাঠান!

ফরদু মিয়া যেন কিছু বলতে চায়। তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় ইমরুল।

ফরদু আমতা আমতা করে বলে- না মানে ছার, এরা সব মানুষেক বিপদে ফেলা মানুষ। একটু বোঝ-বুঝ দিয়া চলতে হয়। আপনে তাদেক ঠিকমতো সনমান করলেন না, চা-ও দিলেন না, এই নিয়া ঝামেলা হতে পারে ছার।

মাথাটা গরম হয়ে ওঠে ইমরুলের- সেটা আপনার ভাবনার বিষয় না। আপনি রোগী পাঠান।

ভেবেছিল গরম মাথা নিয়ে রোগী দেখা কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু রোগী সামনে এসে বসতেই একটু আগের তিতকুটে স্মৃতি মুহূর্তেই উবে যায় ইমরুলের মন থেকে।

৫.

পরদিন খুব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিল ইমরুল। কোনো দিকে না তাকিয়ে বাজার এলাকায় এসে পৌঁছেছে। উদ্দেশ্য ভিড় বেড়ে ওঠার আগেই বাজারের সবগুলো অলি-গলি চষে ফেলা, যাতে স্মৃতিসৌধটার কোনো চিহ্ন অন্তত খুঁজে পাওয়া যায়।

বাজার এখনও ঘুম থেকে জেগে ওঠেনি পুরোপুরি। একেবারে উত্তর কোণে একটা চায়ের দোকানে ঘুঁটের আগুন জ্বালানো হয়েছে। কেতলি বসানো হয়েছে চুলায়। দূর থেকেও ইমরুল দেখতে পায় কেতলির নল দিয়ে খুব সরু ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। চুলার সামনের বেঞ্চে বসে আছে জনা তিনেক টুপি-পাঞ্জাবি পরা মানুষ। মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে এখানে জমা হয়েছে তারা চায়ের তৃষ্ণা নিয়ে। তাদের পাশ কাটিয়েই বাজারে ঢুকতে হবে। ইমরুলকে তারা দেখে কৌতূহলী চোখ মেলে। তবে কোনো প্রশ্ন করে না।

পুরো বাজার পাক খায় সে। কিন্তু চোখে পড়ে না আকাক্সিক্ষত কাঠামোর সদৃশ কোনো বস্তু। হতাশায় ছেয়ে যায় মনটা।

সর্বশেষ গলির শেষ মাথায় পৌঁছে আবার ফেরার উদ্যোগ নেয়। পুরোপুরি পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পায় গলির মাথায় লাঠি হাতে খাকি জামা আর লুঙ্গি পরা বেঁটে মতো এক প্রৌঢ় তাকে একদৃষ্টিতে দেখছে। ইমরুল এগোতে থাকে। প্রৌঢ় একটুও নড়ে না। চোখের পলকও পড়ছে না তার। একই ভাবে তাকিয়ে আছে ইমরুলের দিকে। দু’জন যখন একেবারে কাছাকাছি, সেই সময় প্রৌঢ় মুখের দাড়িগোঁফের জঙ্গলের ফাঁক থেকে একটু হাসি বের করার চেষ্টা করে। সালাম দেয় ইমরুলকে। সালামের প্রত্যুত্তর পাওয়ার সাথে সাথেই সে প্রশ্ন করে ইমরুলকেÑ কী খুঁজেন? বাজার তো এখনও বসে নাই।

ইমরুলের মনে হয়, এই লোকই বোধহয় চৌকিদার হবে। কী নাম যেন বলেছিল রতন? অনুমান করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে প্রশ্ন করে- আপনিই কি এই বাজারের চৌকিদার?

হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেয় লোকটা। তারপরে আবার প্রশ্ন করে- কী খুঁজেন? এখন তো কুনো সদাই-পাতি পাবেন না।

সদাই না। আমি অন্য একটা জিনিস খুঁজি।

কী জিনিস?

উত্তর দিতে গিয়ে একটু ভাবতে হয় ইমরুলকে। স্মৃতিসৌধ শব্দটা কি বুঝতে পারবে মানুষটা? অন্য কোনো প্রতিশব্দও মনে আসছে না। শহিদ মিনার বললে কি চলবে?

তাকে ইতস্তত করতে দেখে একটু সন্দেহের ছায়া ঘনায় প্রৌঢ় চৌকিদারের মুখে। আশ^স্ত করতেই নিজের পরিচয় দেয় ইমরুল- আমি ডাক্তার। এই হাসপাতালে নতুন এসেছি।

সঙ্গে সঙ্গে নির্মল অভ্যর্থনার হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে প্রৌঢ়ের মুখ। সেই হাসি দেখেই যেন ইমরুলের মনে পড়ে যায় তার নাম। রজব আলি।

রজব আলি বলে- হ্যাঁ হ্যাঁ ছার, আপনের কথা কইছে আমাক রতন ডাক্তার। আপনে একটা শহিদ মিনার খুঁজতিছেন।

ঠিক। একটু উদগ্রীব হয়েই জানতে চায় ইমরুল- আপনি জানেন কোথায় আছে সেটা?

তাকে সঙ্গে আসতে বলে এগিয়ে চলে রজব আলি। জয়প্রকাশ আগরওয়ালার ভুসিমালের আড়তের সামনে এসে দাঁড়ায়। হাতের বাম দিকে একটা বন্ধ ঢোপ-দোকান। সেই দোকানের পেছনে ঢোকে সে। তার ইশারা অনুযায়ী ইমরুলও এগিয়ে যায়। তাকায় রজব আলির ইশারা করা ভগ্নস্তূপের মতো একটা স্থাপনার দিকে। দেখতে অনেকটা রাস্তার ধারের মাইলপোস্টের মতো। উচ্চতায় চার ফুটের কাছাকাছি হবে। একসময় সাদা রং ছিল। কিন্তু এখন শুধু একটা চল্টাওঠা অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনদিকেই ভাঙা। ওটার গায়ে ঘুঁটে শুকানোর দাগ, কফ-থুথু, পানের পিক, চুনের দাগ। তবু কোনো ঘৃণার উদ্রেক হয় না ইমরুলের মনে। ব্যগ্র হয়ে সে এগিয়ে যায় স্থাপনার একেবারে কাছে। হাত বোলায় ওটার গায়ে। তারপর সামনে উবু হয়ে বসে পড়ার চেষ্টা করে প্রায় মুছে যাওয়া বিলীন হয়ে যাওয়া অক্ষরগুলো।

সিমেন্টের ওপর ছেনি দিয়ে কেটে কেটে অক্ষর বসানো হয়েছিল সেই সময়। সেই কারণেই বেশ কিছু অক্ষরের অস্তিত্ব এখনও বোঝা যাচ্ছে। অক্ষরের ওপর ধুলা-মাটি, কাগজসহ বিভিন্ন ধরনের ময়লা লেপ্টে আছে। ইমরুল হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে মাটিতে। কোনো কিছু না ভেবেই গা থেকে টি-শার্ট খুলে বেদিটা পরিষ্কার করার চেষ্টা শুরু করেছে। শশব্যস্ত রজব আলি বলেÑ করেন কি ছার! জামা নষ্ট কইরেন না। আমি ন্যাকড়া আর পানি আনতিছি।

অনতিবিলম্বে ছোট একটা বালতিতে পানি এবং পুরনো টুকরো কাপড় নিয়ে আসে রজব আলি। ইমরুলের হাতে না দিয়ে নিজে পরিষ্কার করতে থাকে বেদিটাকে। ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকে একটা-দুটো করে অক্ষরÑ

সহীদ স্মৃতিস্তম্ভ

এই স্থানের মৃত্তিকায় প্রাণ বিসর্জ্জন

দিয়াছেন

খাজনা বন্ধ এবং দলিল দগ্ধ আন্দোলনের সহীদবৃন্দ।

তাং ১৯৩১ ইং।

বাংলা সন-তারিখ পড়ার মতো অবস্থায় নেই। শহিদদের নামের তালিকা ছিল নিশ্চয়ই। এখন একজনের নামের পাঠোদ্ধারও সম্ভব নয়।

এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ইমরুলের কাণ্ড দেখছিল রজব আলি। উঠে বসে তাকে ঘাম মুছতে দেখে প্রথম কথা বলে সে- কী আছে ছার ঐ জিনিসটাত?

ইমরুল আস্তে বলে- আপনার বয়স কত চাচা? আপনি কি ব্রিটিশ আমল দেখেছেন?

তখন খুব ছোট্ট আছিনু ছার। ঐ আমুলের কথা কিছু কবার পারি না।

সেদিনই সন্ধ্যার পরে উপজেলা প্রেস ক্লাবে গিয়ে ঢুকেছিল ইমরুল।

টিনের চালের ঘর। ইটের দেয়াল-মেঝে। ঘরের মধ্যে একটা ছোট সেক্রেটারিয়েট টেবিল, আর একটা বড় কনফারেন্স টেবিল। সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পাশে গদিআঁটা চেয়ারে বসে আছে দুইজন। আরও গোটা দশেক কাঠের চেয়ার বড় টেবিলটা ঘিরে। সেখানেও বসে আছে ছয়জন। তাকে ঘরে ঢুকতে দেখে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায় মজলিস-জমানো মানুষগুলো। সালাম দেয় ইমরুল। তারপর নিজের পরিচয় জানায়। সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পাশ থেকে একজন উঠে দাঁড়ায় হাত বাড়িয়েÑ ও আপনেই আমারে নতুন ডাক্তার সায়েব। এই কয়দিনেই সুনাম হইছে আপনার। রুগীরা খুব সুনাম করতিছে আপনার। বসেন বসেন!

তার বাড়ানো হাতের সাথে হ্যান্ডশেক করে ইমরুল। অন্যরাও একে একে হাত বাড়িয়ে দেয়। পরিচয় জানায় একে একে। সবাই সাংবাদিক। আর সাংবাদিক মানেই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। ইমরুল একটা চেয়ার টেনে বসার পরে সেক্রেটারি হাঁক ছাড়েÑ কদম মেহমান আসিছে। চায়ের কথা ক!

থাক। চা আমি খেয়েই বেরিয়েছি।

আরে খাইছেন তো কী হইছে। চা জিনিসটা বার বার খাওয়া যায়। আপনে একজন সনমানি মানুষ। প্রতথম পা রাখলেন আমারে গরিবদের ক্লাবে। এক কাপ চা তো আর বেশি কিছু না। আন রে কদম চা আন! 

তারপরে বলেন ডাক্তার সায়েব আপনের জন্য আমরা ইলাকার সাংবাদিকরা কী করবার পারি?

এই রকম কথার জন্যই অপেক্ষা করছিল ইমরুল। সঙ্গে সঙ্গে ১৯৩১ সালের প্রজা বিদ্রোহের কথা তোলে- আমি ঐ সম্পর্কে ডিটেইল জানতে চাই। আপনারা কেউ কি ওটা নিয়ে কখনও কোনো ফিচার করেছিলেন? থাকলে সেটা আমাকে দয়া করে জোগাড় করে দিন।

সভাপতি আবার স্থানীয় কলেজের শিক্ষকও। নামের আগে অধ্যাপক বসান। সে এক ঘটনা ঘটেছিল বটে। কিন্তু এদ্দিন পরে তার কোনো গুরুত্ব তো নাই।

কান ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে ইমরুলের। অনেক কষ্টে রাগ চেপে বলে- এতবড় একটা ঘটনা ঘটেছিল এই এলাকায়! গোটা চলনবিল অঞ্চলের মানুষ শরিক হয়েছিল সেই খাজনা বন্ধ আন্দোলনে। জমিদার-তালুকদারদের নাকের পানি চোখের পানি এক করে দিয়েছিল। শেষে ইংরেজ পুলিশ এসে গুলি ছুড়ে হত্যা করল ছাব্বিশজন মানুষকে। এক বড় একটা গৌরবের ঘটনা তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই সামনে আনা দরকার।

অধ্যাপক-সভাপতি স্পষ্টতই অপমান বোধ করে। মেকআপ দেবার জন্য বলেÑ তা আপনি ঠিকই কইছেন। কিন্তু এইসব ব্যাপারে সরকারের তো কোনো উদ্যোগই নাই। সরকারের উদ্যোগ ছাড়া কি বেশি কিছু করা সম্ভব?

ইমরুল ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে। শান্ত কণ্ঠে বলে- আমি ঐ ঘটনাটার ডিটেইল জানতে চাই। আমাকে যদি সেটা সংগ্রহ করে দেন, খুবই কৃতজ্ঞ থাকব।

ডাক্তার সাহেবের কি লেখালেখির অভ্যাস আছে?

না। ওটা স্রেফ আমার ব্যক্তিগত কারণে দরকার। খুবই দরকার। প্লিজ আমাকে একটু সাহায্য করুন! 

তার কণ্ঠস্বরের আর্তিটা স্পর্শ করে ঘরের সব কয়জন মানুষকে।

একজন এগিয়ে এসে তার পাশের চেয়ারে বসে। বলেÑ আমি কথা দিচ্ছি এক সপ্তাহের মধ্যেই আপনাকে যতটা পারি তথ্য জোগাড় করে দেব। এখন আমাদের এই সস্তা চায়ে একটু চুমুক দ্যান।

তার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকায় ইমরুল। সাংবাদিকদের সম্পর্কে ধারণা আছে তার। তার সিনিয়র কয়েকজন বন্ধু তো এখন ঢাকার ডাকসাইটে সাংবাদিক। কেউ চ্যানেলে, কেউ পত্রিকায়। তাদের জীবনযাপন যে কোনো বড় আমলা বা ব্যবসায়ীর সমানই বিলাসী। ফারুক ভাই আর তিন্নি দিদি তো এর মধ্যেই ঢাকা শহরে বেশ বড়সড় ফ্ল্যাট এবং গাড়ির মালিক। তিনতারা, পাঁচতারা হোটেল ছাড়া কেউ ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার করে না। দেশ-বিদেশে ঘোরে কখনও মিডিয়ার টাকায়, কখনও কোনো ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের টাকায়, কখনও সরকারি টাকায়। ফারুক ভাই বলে- যতদিন ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক চৌর্যবৃত্তি চালিয়ে যাবে, যতদিন সামরিক-বেসামরিক আমলা-পুলিশ দুই নম্বরি টাকা কামাতে থাকবে, যতদিন পলিটিসিয়ানরা পলিটিক্স-ব্যবসা চালিয়ে যাবে, ততদিন পর্যন্ত সাংবাদিকদের হাতে অফুরন্ত টাকা আসতেই থাকবে। ততদিন আমাদের কোনো চিন্তা নাই। যে যত বড় মিডিয়া হাউসে কাজ করবে, তার রেটিং তত বেড়ে যাবে। তারপরে কে কোন বিট কাভার করে, তার ওপর নির্ভর করে প্রাপ্তির পরিমাণ। বাংলাদেশে সাংবাদিকরা এখন যথেষ্ট ধনী এবং পাওয়ারফুল মানুষ।

মফস্সলের সাংবাদিকরাও তাদের রেঞ্জে পাওয়ারফুল। খুব কম পত্রিকাই মফস্সলের প্রতিনিধিদের নিয়মিত বেতন দেয়। যা দেয় তার পরিমাণও সংসার চালানোর উপযুক্ত নয়। কিন্তু দিব্যি খোশহালে থাকে সাংবাদিকরা। বিভিন্ন অফিস, এমনকি থানা থেকেও মাসোহারা আসে সাংবাদিকের নামে। হেড অফিস বেতন না দিলেও কেউ আর রিপোর্টিং ছেড়ে দেয় না।

তার পাশে বসা যুবক সাংবাদিককে একটু ভালোই লাগে ইমরুলের। ধান্ধাবাজি করতে করতে মানুষের মুখে যে চোয়াড়ে-ছাপ পড়ে যায়, তেমন কোনো ছাপ খুঁজে পায় না সে মুখটাতে। নিজের নাম বলে যুবকÑ আমি হাফিজুর রহমান নয়ন। তারপরে জানায় কোন পত্রিকাতে সে কর্মরত।

  চা শেষ করে আরেক দফা সবার সাথে হ্যান্ডশেক করে বেরিয়ে আসে ইমরুল। নয়নও তার সাথে সাথে বেরিয়ে আসে। সিগারেটের প্যাকেট বের করে ইমরুলের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। সে হেসে সম্মতি জানালে তার দিকেও এগিয়ে দেয় প্যাকেট। দু’জনেই সিগারেট জ্বালায়। একগাল ধোঁয়া ছেড়ে নয়ন জিজ্ঞেস করেÑ আপনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের?

হ্যাঁ।

কত তম ব্যাচ?

বলে ইমরুল।

শুনে নয়ন বলে- আপনি আমার বেশ কয়েক বছরের জুনিয়র। আপনাদের ডা. সেলিম আর আমি এক ব্যাচের।

আপনি কোথায় পড়েছেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। জার্নালিজমে।

এবার চমকে যায় ইমরুল। ঢাকা ভার্সিটি থেকে জার্নালিজমে পাস করা একজন মানুষ পড়ে আছে মফস্সলে। উপজেলায় বসে সাংবাদিকতা করছে! ঢাকায় থাকলে তার তো এতদিনে ফারুক-তিন্নিদের পর্যায়ে উঠে যাওয়ার কথা!

তার প্রতিক্রিয়া খেয়াল করেছে নয়ন। সে হাসে। সম্ভবত তার ব্যাকগ্রাউন্ড জানার পরে অধিকাংশ মানুষের প্রতিক্রিয়া একই রকমের হয়। এটা দেখে দেখে সে অভ্যস্ত। হেসে বলেÑ এবার নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করবেন আমি এখানে পড়ে আছি কেন?

ইমরুলও হাসে। না। জিজ্ঞেস করব না। তবে আপনি বললে শুনব।

আমি এলাকায় ফিরে এসেছিলাম রাজনীতি করব বলে। সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতি।

এখন করেন না?

করি। তবে তাকে রাজনীতি করা বলে না। ধরে আছি কোনোরকমে আরকি।

তারপরেই পাল্টা জিজ্ঞেস করেÑ আপনি খাজনা বন্ধ আন্দোলনের ব্যাপারে জানতে চান কেন? ওই ঘটনাটার কথা তো এলাকার মানুষরাই ভুলতে বসেছে। আপনিও কি…

না। আমি রাজনীতি করি না।

তাহলে?

উত্তর দেবে কি না ভাবে ইমরুল। তারপর বলে- ঐ ঘটনাটার সাথে আমার পরিবারের একটা সংশ্লিষ্টতা আছে।

এবার তার দিকে সমীহর দৃষ্টিতে তাকায় নয়নÑ তার মানে, সেদিনের সেই আন্দোলনের শহিদদের কেউ আপনার আত্মীয়?

কুঁকড়ে যায় ইমরুল। বলে- আপনাকে আরেকদিন বলব নয়ন ভাই।

আচ্ছা ঠিক আছে। আমাকে বিদায় নিতে হবে এবার। আমি বামের রাস্তা ধরব। আপনি আপনার মোবাইল নম্বরটা দিন।

৬.

মা এখন আর মোবাইলে কথা শুরু করলে সহজে থামতে চায় না। অথচ এই যন্ত্রটার প্রতি তার অরুচির অন্ত ছিল না। ইমরুল নিজেও মোবাইলে বক বক করতে পছন্দ করে না। কিন্তু এখন মা আর ছেলের সেতুবন্ধ হয়েছে মোবাইল।

দুই-দুইটা উইকএন্ড কেটে গেল। তুই বাড়ি এলি না!

ইমরুল আমতা আমতা করে- নতুন জায়গা একটু গুছিয়ে নিতে সময় লাগছে মা।

তুই যেখানে থাকিস, সেই ডরমিটরিটা কি মোটামুটি বাসযোগ্য?

তা নাহলে বাস করছি কেমন করে?

এসি লাগানো আছে?

এসি লাগে না মা। এ তো ঢাকার মতো বাড়ি আর মানুষে ঠাসা জায়গা নয়। আমাদের বিল্ডিংটা একেবারে ফাঁকা মাঠের মধ্যে। জানালা খুলে রাখলে চারদিক থেকে হু হু করে বাতাস আসে। রাতে ফ্যান বন্ধ করে শুতে হয়।

এই কথাটা সত্যি। প্রায় রাতেই ইলেকট্রিসিটি থাকে না। ফ্যান বন্ধই থাকে।

তোর রান্না করে দেয় কে? আমি এত করে বললাম মান্নানকে সঙ্গে দিয়ে দেই।

মান্নান হচ্ছে আব্বার খাস বাবুর্চি।

আমার রান্না করার বুয়া আছে মা।

কেমন রাঁধে? খেতে পারিস?

প্রথম দুই দিন প্রায় খাবার মুখেই তুলতে পারেনি ইমরুল। খুব ঝাল ছিল। আর তেল-মশলা এতই বেশি ছিল যে মুখটা পুড়ে সেদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

তারপরে সালেহা খালাও কিছুটা ঝাল-তেল কমিয়েছে, ইমরুলের জিভ-মুখও অ্যাডজাস্ট করতে শুরু করেছে। চলে যাচ্ছে এখন। বেশ জোর দিয়েই ইমরুল বলেÑ সালেহা খালা খুবই ভালো রান্না করে মা।

হ্যাঁ তুই বললি আর হলো? না খেতে পাওয়া ঘরের মহিলারা রান্নার কাজ করে। ওরা ভালো খাবার কী আর চেনে যে ভালো রান্না করবে!

মর্মান্তিক সত্যি কথা। কিন্তু এরা আছে বলেই না ঢাকা আর ঢাকার বাইরের লক্ষ লক্ষ চাকরিজীবীরা তৈরি খাবার পেয়ে চাকরি-বাকরি করতে পারছে।

না মা, সালেহা খালা সত্যিই ভালো রান্না করে। ভালো ঘরের মেয়ে। ঠিক প্রফেশনাল বুয়া না আরকি। স্বামী মদ-জুয়াতে সম্পত্তি উড়িয়েছে বলে এখন এই কাজ করতে হচ্ছে।

আহারে!

সালেহা খালার জন্য অকৃত্রিম দরদ মায়ের কণ্ঠে। বলে- তাহলে এক কাজ করিস। তুই ওখান থেকে যখন ঢাকায় চলে আসবি, সঙ্গে নিয়ে আসিস মহিলাকে। আমাদের এখানেই থাকবে। মাসে মাসে বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে দেবে।

সে তখন দেখা যাবে!

আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু আগামী থার্সডেতে অবশ্যই বাড়ি চলে আসবি। নাহলে কিন্তু আমি ওখানে যাব!

না না তোমাকে কষ্ট করে আসতে হবে না। আমিই যাব।

কষ্ট কিসের অ্যাঁ? ছেলে যেখানে থাকে সেখানে যেতে মায়ের কষ্ট হবে কেন? তাছাড়া গেলে আমারও একটা নতুন জায়গা দেখা হবে।

কী আর দেখবে এখানে! দরকার নাই মা। আমি চলে আসব।

বুঝতে পারছি। তুই যে খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই, সেটা আমাদের দেখতে দিতে চাস না।

আমি ভালো আছি মা। সত্যিই ভালো আছি। আমার কাজ আছে এখানে।

তুই কেন আমাকে ছেড়ে গেলি ইমু!

মায়ের কণ্ঠে অনুযোগ। গলা ধরে এসেছে- আমার মেয়েটা থাকে সেই সুদূর অস্ট্রেলিয়ায়। তোর বড় ভাইটা তো ব্যবসা আর কাজ ছাড়া কিছুই বোঝে না। বাপের ধাত পেয়েছে। তোর ভাবি তো বাড়িতে কখন থাকে আর কখন থাকে না আমি টেরই পাই না। তুইও কেন আমাকে ছেড়ে দূরে গেলি বাপ? ওই চাকরি যে আসলে তোর একটা ছুতা তা বুঝতে তো আমাদের কারওই বাকি নেই। তুই কেন গেলি বাপ?

গলা বুজে আসে ইমরুলেরও। নিজেকে সামলাতে কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়। তারপর বলেÑ তুমি ঠিকই বলেছ মা, আমি একটা নির্দিষ্ট কাজ করার জন্যেই এখানে এসেছি। কাজটা শেষ হলেই ফিরে যাব তোমার কাছে।

সত্যিই! খুশিতে ঝলমল করে ওঠে মায়ের কণ্ঠ- তাহলে আমাকে বল কী কাজ? আমি যদি কোনো সাহায্য করতে পারি করব।

বলব মা। তোমার সাহায্য আমার লাগবে। তখন বলব।

আচ্ছা বাবা। একটু শান্তি পেলাম।

রাখি মা এখন?

রাখবি! আচ্ছা! ও হ্যাঁ। নিশি এসেছিল। খুব কান্নাকাটি করল। তুই নাকি ওর সাথে ফোনে ঠিকমতো কথাই বলিস না?

বিরক্তিতে ছেয়ে যায় ইমরুলের মন। চেপে রেখে বলেÑ আচ্ছা পরে কথা বলে নেবো একসময়। এখন ছাড়ি মা।

ফোন ছাড়তে না ছাড়তেই আবার বেজে ওঠে। অচেনা নম্বর। ধরবে কিনা ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত ইয়েস বাটনে চাপ দেয়। ওপার থেকে নয়নের কণ্ঠ ভেসে আসে- ডাক্তার সাহেব, আপনার জন্য কিছু কাগজ এনেছি। খুঁজে বের করেছি আরকি। কোথায় পৌঁছে দেব? খাজনা বন্ধ আন্দোলনের শহিদদের নাম-ঠিকানা সব পেয়েছি।

নয়নকে দেবতার মতো মনে হয় তখন তার। যেমন মনে হতো ফারুক ভাইকে। সাংবাদিক বলতে কেবলমাত্র এতদিন ফারুক ভাইকেই বুঝত ইমরুল। তার কাছে যাওয়া মানেই এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। কিন্তু ব্যবহার একেবারেই অদ্ভুত ফারুক ভাইয়ের। কখন যে কোন মুডে থাকে বলা মুশকিল। একদিনের কথা মনে পড়ে ইমরুলের। আড্ডায় ঢুকতেই ফারুক ভাই খেঁকিয়ে উঠল- তুমি শালা এখানে কোন ধান্দায় আসো?

কয়েক পেগ বাংলামদ পেটে পড়লেই ফারুক ভাই প্রশ্নটা করে ইমরুলকে। করবেই। ইমরুল উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকায় আবার ফারুক ভাই প্রশ্নটা করেÑ তোমাকে জিজ্ঞেস করছি। হ্যাঁ তোমাকেই। আমাদের এই লোয়ার মিডলক্লাস পেটিবুর্জোয়া সার্কেলে তুমি কেন এসে ভিড়েছ চান্দু? স্টাডি করতে এসেছ? দেখতে এসেছ কীভাবে আমরা মানুষ না হয়েও মানুষ নামে জীবন যাপন করি? দেখতে এসেছ আমরা কতজনের কাছে কতরকমভাবে আমাদের পোঁদ বন্ধক দিই? দেখতে এসেছ কত ছোট ছোট অফার দিয়ে আমাদের কিনে নেওয়া যায়? এসব নিয়ে থিসিস লিখবে? ইংরেজিতে? করপোরেট হাউস তোমার থিসিসের ফান্ড করবে। তোমার থিসিসের প্রকাশনা উৎসব হবে পাঁচতারা হোটেলে। মিনিস্টার থাকবে প্রধান অতিথি। তাই না? এই জন্যই তুমি ঘুরঘুর করো আমাদের চারপাশে তাই না?

পল্টনের গলিতে আজিমের ভাতের হোটেলের পেছনের ঘরে রাত এগারোটার পরে বসেছে ওরা। আজিম অনেক পুরনো ভক্ত ফারুক ভাইয়ের। তার বিশ্বাস এই দেড় কোটি মানুষের ঢাকা শহরে যে দুই-চারজন মানুষের বাচ্চা আছে, তাদের মধ্যে ফারুক ভাই একজন। ঢাকা শহরে এখন আর আড্ডা তেমন হয় না। হবে কীভাবে! বসার জায়গাই তো নেই। গিজগিজ করা মানুষ যে যেখানে পেরেছে নিজের দখল কায়েম করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছাড়া মানুষের আড্ডার কোনো জায়গা এখন নেই। সেখানেও এত ভিড় যে পৌষ মাসেও মানুষের গায়ের গরমে ঘাম ঝরে। সেই সময়ে আজিম যে ফারুক ভাইকে এখানে বসার সুযোগ করে দেয় মাঝে মাঝে, তাতেই বোঝা যায় ফারুক ভাইয়ের প্রতি তার শ্রদ্ধার পরিমাণ কত বেশি। এই ঘরটা আসলে তার কর্মচারীদের রাতের শোবার জায়গা। একটামাত্র চৌকি। টেনেটুনে দুইজন শোয়া যায়। অন্যরা মেঝেকে শোয়। অনেকগুলো ফোল্ডিং কাঁথা-বালিশ দেখা যাচ্ছে। চৌকিতে ফোল্ডিং করা কাঁথা-বালিশের গায়ে ঠেস দিয়ে আধাশোয়া হয়ে গ্লাস থেকে বাংলা খাচ্ছে ফারুক ভাই। অন্যদেরও ঢালাও পারমিশন আছে খাওয়ার। যে খাচ্ছে সে খাচ্ছে। যে বাংলা না খাচ্ছে, সে চাট খাচ্ছে মাঝে মাঝে। ফারুক ভাই ছাড়া অন্য তিনজনের জন্যে তিনটে চেয়ার দিয়ে গেছে আজিমের কর্মচারী।

তান্না বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করে- তা কেন হবে ফারুক ভাই! ও তো আমাদের বন্ধু। ও নিজের সোসাইটিতে তিষ্টাতে পারে না। নিজেদের সোসাইটি ওর কাছে ভণ্ডামি আর ক্রাইমে ভরা বলে মনে হয়। তাই ও আমাদের কাছে আসে। মানে আপনার কাছে আসে।

কেন? আমার কাছে কেন আসে? আমি কি পির না সাঁইবাবা? আমার কাছে এলে ওর লাভটা কী?

লাভের জন্যে তো আসে না। আসে আপনাকে পছন্দ করে বলে। আপনার লেখা পছন্দ করে বলে।

আর লেখা! ফারুক ভাই ‘ফুঁ’ শব্দ তোলে ঠোঁটে- লেখার আবার পছন্দ করার কী আছে! তোরা তো জানিস না। আমি তোদের আজ একটা গোপন কথা ফাঁস করে দিচ্ছি শোন। লেখা মানে হচ্ছে বিজ্ঞাপন। সেলফ অ্যাডভার্টাইজমেন্ট। কে নেবে আমাকে নাও! বুঝতে পেরেছিস তো, বিজ্ঞাপন, স্রেফ বিজ্ঞাপন।

ইমরুল বুঝতে পারে না। তবু একটু হাসির চেষ্টা করে। তার হাসি দেখে খেপে ওঠে ফারুক ভাই। একটু চড়া কণ্ঠে বলে- বিশ্বাস হচ্ছে না! আচ্ছা বিজ্ঞাপন যদি সরাসরি না বলিস, না বল। তবে এটুকু তো মানবি যে লেখা হচ্ছে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা?

হ্যাঁ। এই কথাটা খানিকটা মানা যায়। ক্রিয়েটিভ লেখার কথা বাদ দিলে জার্নাল ধরনের বা কলামগুলো তো দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাই তো করা হয়।

গালি দিয়ে উঠল ফারুক ভাই- আমার ইয়ে বুঝেছিস তুই! ক্রিয়েটিভ লেখা আর কলাম লেখা বলে কোনো কথা নেই। এখন আমরা যা কিছু লিখি, সবগুলোরই অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এক। তা হচ্ছে নিজেকে বিক্রির জন্য সর্বোচ্চ দাম পাওয়ার চেষ্টা।

হতাশা-আক্রান্ত মানুষটার জন্য খুব মায়া লাগল ইমরুলের। সুস্থ অবস্থায় এই লোকের সামনে লেখকদের নিয়ে একটা কটু মন্তব্য করলে তাকে বাক্যবাণে ফালা ফালা করে দেয় ফারুক ভাই। আর এখন সে বলে চলেছে- শোন, আমরা লেখা দিয়ে শেখ হাসিনা কিংবা খালেদা জিয়া কিংবা তাদের হাতানাতাদের ইঙ্গিত দিয়ে রাখি যে, আমরা তোমার লোক। তারা ক্ষমতায় এলেই দেখবি তখন পোয়াবারো। ওই যে ইশারাই কাফি! দেখা যাচ্ছে ইশারা অনুযায়ী সেই লেখক হয়ে যাচ্ছে বাংলা একাডেমির ডিজি, জাদুঘরের মহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমির অমুক, অমুক একাডেমির অমুক। তা ছাড়া পদক-পুরস্কার-বিদেশ ভ্রমণ তো আছেই।

এসব কথা বলার দরকার নেই ফারুক ভাই।

বলব না কেন? এবার খেঁকিয়ে উঠল ফারুক ভাই- বলব না কেন? আমি কি কোনো শালাকে ডরাই? আমি কি ওইসব পদের জন্য জিভ থেকে টপটপিয়ে পড়া লালা নিয়ে দৌড়াই?

না দৌড়ান না। সেই জন্যই তো আমরা আপনার কাছে আসি।

এবার ম্লান হাসে ফারুক ভাই। বলে- এসে লাভ নেই। মান্দেলশ্তামরা বেশিদিন জনসমক্ষে বিচরণের সুযোগ পায় না। আমিও পাব না।

মনে মনে রোমাঞ্চ বোধ করল ইমরুল। এখনই বোধহয় ফারুক ভাইয়ের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে কবি মান্দেলশতামের কোনো কবিতা কিংবা তার সম্পর্কে না-জানা কোনো অসাধারণ তথ্য। এই লোভেই না তাদের ফারুক ভাইয়ের পাশে পাশে ঘুর ঘুর করা। কখন যে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসবে স্তোত্রের মতো কবিতার পঙ্ক্তি কিংবা সুসমাচারের মতো মণিমুক্তো মেশানো কথামালা!

কিন্তু ফারুক ভাই অনেকক্ষণ কেটে গেলেও মুখ খোলে না। শ্যামল একটু তাগাদা দেয়Ñ মান্দেলশতামের কথা কী যেন বলছিলেন!

ফারুক ভাইয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো কয়েকছত্র কবিতাÑ

বিদায়, হে সখা, বিদায়ের ক্ষণ মানো,

হে প্রিয় আমার বুকেরই মধ্যে রবে

এ-বিদায় সে তো ললাটলিখনই জানো

নিশ্চিত ফের কোনোখানে দেখা হবে।

বিদায় হে সখা, বাড়াবো না হাত, কবো না কো বরাভয়

খেদ কোরো না কো মোছা ললাটের শোক

মৃত্যু জানো তো নতুন কিছুই নয়,

তবে বাঁচাটাও নতুন বলে না লোক।

তান্না বলেÑ এ তো সের্গেই ইসিয়েনিনের কবিতা।

মুদোচোখেই তার দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকাল ফারুক ভাইÑ শাবাশ ছোকরা, তোর হবে!

তারপরেই দ্রুত সংশোধন করল নিজের কথাÑ না খুব বেশি তোর হবে না। হলে হবে ওর। ইমরুলের দিকে আঙুল তুলে দেখাল ফারুক ভাই।

কেন? ওর হবে না কেন?

হবে না। কারণ তান্নাও আমারই মতো হাঘরে পরিবারের ছেলে। হাঘরে বোঝো? ও বোঝো! আচ্ছা বেশ। তাহলে শোনো, আমাদের মতো পরিবারের সন্তানরা বেশিদূর যেতে পারে না। যেমন ধরো, আজ এই দুই পাত্তর বাংলা মদ খাওয়ার কারণে কাল সকালে আমার বাপের ওষুধ কেনার টাকায় টান পড়বে। আমার বাপের যে কত অসুখ! হার্টের অসুখ, হাই ব্লাডপ্রেশার, ডায়াবেটিস, প্রোস্টেট গ্ল্যান্ডের অসুখ। গত পনেরো বছর ধরে আমার বাপের জন্য প্রতিদিন প্রায় দেড়শ’ টাকার ওষুধ কিনতে হয়। আজ বেহিসাবি খরচটা করে ফেললাম মাল খেয়ে। মাঝে মাঝে এই রকম হয়ে যায়।

খান কেন তাহলে?

এবার একেবারে স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলল ফারুক ভাই। বোঝা গেল মাতলামি তার কেটে গেছে পুরোপুরি। কিন্তু কথার মধ্যে মহাশূন্যের সমান হাহাকারÑ কেন খাই? হঠাৎ অনেকদিন পর পর আমার মনে হয়, আমার অসাধারণ কিছু একটা হবার কথা ছিল। সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমি কোনোদিন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে অনুবাদ করার সুযোগ পাব না। তখন মাঝে মাঝে আত্মহত্যা করার ইচ্ছা জাগে। সেই ইচ্ছাটাকে দমিয়ে রাখার জন্যই মদ খেতে আসি।

কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এলো। ঘরের বাতাস অনেকটাই ভারী হয়ে গেল বিষাদে। এই রকম কথার পিঠে কোনো কথা বলে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া যায় তা ভেবে বের করতে সময় নিচ্ছে সবাই। তান্নাই আবার কথা শুরু করতে পারেÑ যাই হোক, মান্দেলশতামের কবিতা নিয়ে কী যেন বলতে চেয়েছিলেন?

এবার খ্যাপাটে কণ্ঠে কথা বলে ফারুক ভাই- কবিতার আবার আলোচনা কীসের? কবিতা তো কবিতাই। তার কোনো আলোচনা হয় না। বরিস পাস্তেরনাকের কথা মনে নেই তোদের? প্যারিসে বিশ্ব কবিতা কংগ্রেসে কবিতা নিয়ে বলতে উঠে পাস্তেরনাক কী বলেছিলেন? কয়েকটামাত্র কথা। বলেছিলেন- ‘কবিতার আসন সবসময় সর্বোচ্চ গিরিচূড়ায়- আল্পস থেকেও অনেক উঁচুতে। অথচ কবিতার উৎস আমাদের পায়ের তলায় ঘাসের মধ্যে, শুধু কাউকে মাথা নিচু করে দেখতে হবে আর মাটি থেকে তুলে নিতে হবে। এই বিষয়টি এতই সরল যে, সভায় আলোচনা করার মতো নয়।’

আবার অনেকক্ষণের নীরবতা।

ফারুক ভাই আবার কথা বলে- অথচ এই পাস্তেরনাকের ওপর কী নির্যাতনটাই না চালিয়েছে স্ট্যালিন!

রুশ বিপ্লবের সময় সিংহভাগ লেখক-বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে পাস্তেরনাকও ছিলেন বিপ্লবের পক্ষের একজন আপোসহীন কর্মী এবং সমর্থক। কিন্তু লেনিনের মৃত্যুর পরেই পথ হারাতে শুরু করল বিপ্লব। অন্য সব ক্ষেত্রের মতো তখন লেখকরাই যেহেতু স্ট্যালিনের কাজের গলদগুলো সবচেয়ে আগে বুঝতে পারছিলেন, তাই স্ট্যালিনেরও প্রধান টার্গেট ছিলেন লেখকরাই। তখন সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা হলো র‌্যাপ নামে লেখকদের সংগঠন। বলা হলো র‌্যাপের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রলেতারিয় বিপ্লবী সংস্কৃতি গড়ে তোলা। কথাগুলো শুনতে ভালোই। কিন্তু আসলে পেছনে ছিল জবরদস্তি এবং হুমকি। এই সংগঠনে যোগ দিলে সে লেখক হিসেবে বাঁচতে পারবে, তা নাহলে তার জায়গা হবে শ্রমশিবিরে অথবা কবরে। স্ট্যালিনের ঘোষণা ছিল যে, লেখকদের এই সংগঠনে যোগ দিয়ে হয় প্রলেতারিয়েতদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করতে হবে, নইলে সোভিয়েত লেখক হিসেবে নিজের অধিকার প্রত্যাহার করতে হবে। পরে র‌্যাপ থেকে জন্ম নিল সোভিয়েত রাশিয়া লেখক ইউনিয়ন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, র‌্যাপের মাধ্যমে যিনি লেখকদের বাধ্য করছিলেন স্ট্যালিনের পক্ষে কাজ করতে, সেই এভারবাককেও স্ট্যালিনের নির্দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। তো পাস্তেরনাককেও বাধ্য করা হলো সংগঠনে যোগ দিতে। তাকে পাঠানো হলো একটি যৌথ খামার দেখতে। উদ্দেশ্যÑ যৌথ খামার দেখে এসে তিনি এই যৌথ খামার ব্যবস্থার পক্ষে একটি বই লিখবেন। কিন্তু পাস্তেরনাক সেখানে গিয়ে যা দেখলেন, তাতে যৌথ খামার ব্যবস্থার ওপর তার ঘৃণা জন্মে গেল। সেখানে চাষিদের দুরবস্থা দেখে তিনি মানসিকভাবে এতই অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে, প্রায় এক বছর তিনি রাতে ঘুমাতেই পারেননি। পরে মিনস্কতে এক লেখক সমাবেশে তিনি পরিষ্কার বললেন যে, হুকুমমাফিক পাম্প দিয়ে নলকূপে পানি তোলা যায়, কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় না। পাস্তেরনাক তখন আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত লেখক। তাকে প্রাণে মারলে বহির্বিশ্বে প্রচণ্ড প্রভাব পড়বে। কিন্তু স্ট্যালিন তো ছাড়ার পাত্র নয়। পাস্তেরনাককে না মেরে তখন মারা হলো তার প্রিয় বন্ধু কবি মান্দেলশতামকে। মান্দেলশতামকে গ্রেফতার করার কয়েকদিন পরে হঠাৎ একরাত্রে বেজে উঠল পাস্তেরনাকের টেলিফোন। রিসিভার তুলতেই শোনা গেল একটি কণ্ঠÑ কমরেড স্ট্যালিন আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।

শুনে তো পাস্তেরনাক হতভম্ব।

স্ট্যালিনের প্রথম প্রশ্ন ভেসে এলো- মান্দেলশতামকে গ্রেফতার করার পরে তোমাদের কবি-সাহিত্যিক মহল কী বলাবলি করছে বলো তো!

তোতলাতে তোতলাতে পাস্তেরনাক বললেনÑ নাহ্ কেউ কিছু বলছে না। কী বলবে! সকলেই তো ভীষণ ভয়ে ভয়ে আছে।

আচ্ছা! কিন্তু মান্দেলশতাম সম্পর্কে তোমার নিজের কী ধারণা? কবি হিসেবে সে কেমন?

পাস্তেরনাক বললেন- বড় কবি। ভালো কবি। তবে আমাদের গোত্রের নন। তিনি প্রাচীনপন্থি ক্ল্যাসিকাল ধারার কবি; আর আমরা পুরনো সব কাব্যকৌশলগুলো ভাঙতে চাইছি।

তবে মান্দেলশতাম সত্যি সত্যি একজন জিনিয়াস কবি। ঠিক কি না? স্ট্যালিনের প্রশ্ন।

এর উত্তরে কী বলবেন পাস্তেরনাক? কী বলা সম্ভব? আমতা আমতা করে বললেন- এটা তো কোনো বিবেচ্য বিষয় হলো না। কিন্তু আমরা মান্দেলশতামকে নিয়ে এত কথা বলছি কেন, তা বুঝতে পারছি না। আমার অন্য কথা বলার ছিল আপনাকে। অনেকদিন ধরেই বলার সুযোগ চাইছি।

কী কথা? কী নিয়ে কথা?

জীবন ও মৃত্যু নিয়ে।

ঘটাং করে কেটে গেল টেলিফোনের লাইন।

মান্দেলশতামকে আর কেউ দেখতে পায়নি কোনোদিন। আর বরিস পাস্তেরনাক। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরেও তাকে বাধ্য করা হলো সেই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে।

চুপচাপ শুনল ওরা তিনজন। ফারুক ভাই থামতে ইমরুল প্রশ্ন করল নিচুগলায়- তাহলে আমরা সমাজতন্ত্র চাইছি কেন?

ফারুক ভাই খেপে উঠলÑ চাইব না মানে! সমাজতন্ত্র মানে কি শুধু স্ট্যালিনের আমল? আর সমাজতন্ত্র ছাড়া এই দেশের চৌদ্দ কোটি দুপেয়ে জানোয়ারগুলোকে মানুষের স্বীকৃতি কে দেবে? আছে আর কিছু?

একটু ভেবে মাথা ঝাঁকাল ইমরুল- না নেই। সত্যিই নেই।

শ্যামল জিজ্ঞেস করে- আপনি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে একবিন্দুও সম্মান করেন না তাই না?

তার দিকে ধারালো চোখে তাকাল ফারুক ভাইÑ যে সম্মান পাওয়ার যোগ্য নয়, তাকে সম্মান দেখাতে যাব কোন দুঃখে?

গরিব বলে তারা সম্মান পাবে না?

গরিব বলে নয়। গরিব বলে কাউকে অসম্মান করার লোক আমি নই। আমি অসম্মান করি দারিদ্র্যের কারণে তাদের কোনো ইমান না থাকার জন্য।

এ আবার কেমন কথা? ইমান নাই গরিবদের?

হাসল ফারুক ভাই- গরিবদের ইমান থাকা খুব কঠিন রে ভাই! তোর তো অভিজ্ঞতা নাই, তাই জানিস না। তোরা মনে করিস গাঁয়ের গরিব মানুষরা খুব সহজ-সরল। না কথাটা ঠিক নয়। ওরা বোকা। কিন্তু সরল নয়। এই দেশের যে এত দুরবস্থা, তার জন্য কি তোর মানে করিস শুধু দেশের শাসকরাই দায়ী? গরিব ভোটারদের কোনো দায় নেই?

তাদের আবার কীভাবে দায়ী করব!

ক্যান বেছে বেছে সবচেয়ে পোকায় খাওয়া শয়তানগুলোকে ভোট দেয় না ওরা?

প্রতিবাদ করতে গিয়েও থমকে গেল ইমরুল। তাই তো!

ফারুক ভাইকে তখন আবার কথায় পেয়েছেÑ যাও তো চান্দু, যে কোনো আসনে সবচেয়ে সৎ শিক্ষিত যোগ্য লোককে দাঁড় করিয়ে দাও গিয়ে। দেখবে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে নিশ্চিতভাবে।

সবসময় তো হয় না।

সবসময়ই হয়। শোন তোদের বিলাসগাড়ির ঘটনা বলি। উত্তরবঙ্গের একটা ইউনিয়ন। সেই জায়গাকেই আমরা একটা পাইলট এলাকা হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম। বাম দলগুলোর বাছা বাছা কর্মীকে পাঠানো হয়েছিল। একনাগাড়ে ছয় বছর কাজ করা হলো। গড়ে উঠল বিশাল ক্ষেতমজুর আর কৃষক সংগঠন। বিলাসগাড়ি ইউনিয়নে কাজ করা হয়েছিল খুব সায়েন্টিফিক পদ্ধতিতে। পুরো ইউনিয়ন জরিপ করা হয়েছিল। ভোটার সংখ্যা কুড়ি হাজারের মতো। গ্রামবাসীর আর্থ-সামাজিক শ্রেণিবিভাগ, বিগত আন্দোলন-সংগ্রাম অংশগ্রহণের ইতিহাস, শিক্ষার হার, শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের প্রবণতাসহ বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় স্টাডি করে রেজিস্টার তৈরি করা হয়েছিল। সংগঠন হয়েছিল সত্যিই বিরাট। সংগঠনের মাধ্যমে খাসজমি খুঁজে বের করে দখল করা হলো। বিলি করা হলো ভূমিহীনদের মধ্যে। কাবিখা প্রজেক্টের গম চুরি বন্ধ করা হলো। এনজিওগুলোর মহাজনি ঋণ নিয়ে যারা সর্বস্বান্ত হয়েছিল, তাদের পুনর্বাসন করা হলো। ছয় বছরে সংগঠন থেকে সরাসরি বেনিফিটেড হয়েছিল প্রায় সাত থেকে আট হাজার ভোটার। ইউপি ভোটের সময় আমরা বললাম, এবার আপনারা নিজেদের মধ্য থেকে নিজেদের লোককে চেয়ারম্যান-মেম্বার বানাবেন। সবাই রাজি। লোকমান নামের একজনকে চেয়ারম্যান ক্যান্ডিডেট করা হলো। তার নমিনেশন জমা দিতে ইউএনও অফিসে যাওয়ার সময় যত বড় মিছিল হলো, অত বড় মিছিল নাকি ওই এলাকার মানুষ আগে কোনোদিন দ্যাখেনি। তারপর ভোটের রেজাল্ট শুনবি?

বলেন।

লোকমান পেল সর্বসাকুল্যে তিনশো উনিশ ভোট।

শ্যামল থাকতে না পেরে উত্তেজনার চোটে বলে ফেলল- এ কীভাবে সম্ভব?

ফারুক ভাইয়ের মুখে তিক্ত হাসিÑ ভোটের আগের রাতে টাকা খেয়ে সব চলে গেছে বিএনপি-আওয়ামী লীগের ভোটের বাক্সে।

এই রকম অসংখ্য ঘটনা আছে। সেসব থেকে আমার শিক্ষা হচ্ছে, বাংলাদেশের তথাকথিত জনগণের ওপর নির্ভর করে এই দেশে কোনো মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসা সম্ভব নয়।

তাহলে কার ওপর নির্ভর করব?

অম্লান বদনে বলল ফারুক ভাই- জানি না।

আবেগে ইমরুলের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে- তাই নাকি! আপনি কোথায় আছেন নয়ন ভাই? প্রেস ক্লাবে?

না। আমি আছি মুন্সির চায়ের দোকানে। বাজারের উত্তর কোণে। মসজিদটার পাশে। চেনেন আপনি?

সে আমি চিনে নেব। আপনি থাকুন। আমি আসছি এখনই।

৭.

‘আমরা ব্রিটিশ-ভারতীয় সরকারের নামে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক হুকুমনামা জারি করিয়াছিলাম। এরূপ খাজনা বন্ধ করা অবৈধ। জমিদারগণ ইংরেজ সরকারের প্রতিনিধিস্বরূপ প্রজাদের নিকট হইতে খাজনা আদায় করিয়া থাকেন। তাহাদের খাজনা বন্ধ করার অর্থ হইতেছে মহারানি ভিক্টোরিয়ার সনদকে অবজ্ঞা করা। ইহা কিছুতেই হইতে পারে না। প্রজাদিগের যদি কোনো বক্তব্য থাকে, তাহা হইলে তাহারা প্রতিনিধি প্রেরণ করিতে পারে। আমরা তাহাদের বক্তব্য শুনিয়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করিয়া দিতে পারি। কিন্তু তাহারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা গ্রহণ করিবে, ইহা ঘোর অনাচার! তাহা ছাড়া জমিদারদিগের বিরুদ্ধে অভিযোগের কিছুই থাকিতে পারে না। তাহারা প্রজাদিগকে পুত্রবৎ স্নেহ করিয়া থাকেন। এই ব্যাপারে সবার অপেক্ষা বড় সাক্ষী বাঙ্গালার লেখক শিরোমণি শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং। তিনি লিখিয়াছেন, এই প্রদেশের যাহা কিছু ভালো, সবকিছুই বাঙ্গালার জমিদারদিগের দান। তবু মাননীয় কালেক্টর সাহেব চলনবিল অঞ্চলের প্রজাদিগকে তাহাদের বক্তব্য সম্বলিত দরখাস্ত তাঁহার দপ্তরে জমা দিতে অনুমতি দিয়াছিলেন। কিন্তু তাহারা যাহা লিখিয়াছিল, তাহাতে সত্যের লেশমাত্র ছিল না। পরন্তু জমিদারদের পাশাপাশি স্বয়ং ইংরেজ গভরমেন্টকেও তাহারা প্রত্যক্ষ দোষারোপ করিয়াছিল। তখন কালেক্টর হইতে হুকুম আসিল, বিদ্রোহীদের নেতা ছইরউদ্দিনকে সশরীরে গ্রেপ্তার করিয়া মহামান্য আদালতে সোপর্দ করা হউক। এই ছইরউদ্দিন এক ভয়ঙ্কর দস্যু। পুরো চলনবিল অঞ্চল তাহার ভয়ে কম্পমান থাকে। নিয়তির কী পরিহাস! এই ব্যক্তি একদা বাংলা প্রদেশের পুলিশ বিভাগে সেপাই হিসাবে কর্মরত ছিল। সে পুলিশে থাকাকালীন যে সমস্ত ট্রেনিং পাইয়াছিল, সেই ট্রেনিংয়ের জোরেই একটি বিরাট দস্যু দল সংগঠিত করিয়াছে। তাহারা এতই দুর্ধর্ষ যে, চলনবিল অঞ্চলকে নিজেদের স্বশাসিত এলাকা ঘোষণা করিতে চায়।’

‘তো আমি কালেক্টরের নির্দেশ মোতাবেক চলনবিলের হাটে হাটে দফাদার মারফত নোটিশ টাঙাইয়া দেওয়াইলাম। চৌকিদার মারফত ঢোল সহরত করিলাম। সপ্তদিবস সময়ের মধ্যে ছইরউদ্দিন যেন মহামান্য কালেক্টর অফিস অথবা পুলিশ চৌকিতে আসিয়া হাজির হয়। কিন্তু বৃথা! সে আসিল না। তখন তাহাকে গ্রেপ্তারের জন্য ছোট ছোট পুলিশ দল প্রেরিত হইল। কেহই তাহাকে গ্রেপ্তার করিতে পারিল না। একবার প্রায় সে ধরা পড়িয়াই গিয়াছিল। পুলিশের দল তাহাকে বেষ্টন করিয়া ফেলিয়াছিল। কিন্তু তাহার সঙ্গীরা তাহাকে ছিনাইয়া লইয়া চলিয়া যায়। এই ঘটনায় চারিজন কনস্টেবলকে সাসপেনড করা হইয়াছিল। কিন্তু আমি জানি যে তাহারা নিরুপায় ছিল। বিপুল প্রশিক্ষিত দস্যু দলের সামনে চারিজন মাত্র সেপাই কী আর করিতে পারে!’

‘এই পরিস্থিতিতে ঘটিল সবচাইতে ভয়াবহ এবং দুঃস্বপ্নের মতো ঘটনা। ছইরউদ্দিনের নেতৃত্বে একযোগে পুরো চলনবিলের সকল মহাজনের সিন্দুক লুট হইল। একই রাত্রে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়িয়া এই লুটের ঘটনা ঘটিল। সকল জায়গায় নিশ্চয়ই ছইরউদ্দিন উপস্থিত ছিল না। কিন্তু এই ঘটনা যে তাহারই মস্তিষ্কপ্রসূত এবং পরিকল্পিত, এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই। দস্যুরা মহাজনের সিন্দুক হইতে টাকা-কড়ি, সোনা-দানা কিছুই লয় নাই। লইয়াছিল কেবল বন্ধকি দলিলগুলি। কালের পর কাল পুরুষানুক্রমে এলাকার খাতকগণ মহাজনদের নিকট হইতে যে ঋণ এবং দাদন গ্রহণ করিত, সেইসব দাদনের খাতক-স্বাক্ষরিত দলিলগুলি একই রাত্রে লুট হইয়া গেল। সেই রাত্রেই নিকটস্থ কোনো উঁচুস্থানে সেইসব দলিলের বহ্ন্যুৎসব হইয়াছিল। দুই পুরুষ তিন পুরুষ যাবত মহাজনি করিয়া সম্ভ্রান্ত হইয়াছিল যে সকল পরিবার, তাহারা এক রাত্রির অভিশাপে নিঃস্ব হইয়া গেল। দলিল নিশ্চিহ্ন হইলে কে আর ঋণশোধের পরোয়া করে। কারণ দলিল না থাকিলে তো আদালতেও সেই মামলা কার্যবিবরণীতে সন্নিবেশিত হইতে পারিবে না।

‘তখন কালেক্টরেট এবং পুলিশ বিভাগ হইতে আমার উপর দায়িত্ব ন্যস্ত হইল। যে প্রকারেই হউক, এই অসাংবিধানিক প্রজাবিদ্রোহ দমন করিতে হইবে, নিরস্ত করিতে হইবে তাহাদের নেতা ছইরউদ্দিনকে, আর এই দস্যুকে জীবিত অথবা মৃত হাজির করিতে হইবে কালেক্টরের সম্মুখে।

৮.

মিথ্যা কথা! ছইরউদ্দিন ডাকাত আছিল না!

তীব্রস্বরে প্রতিবাদ জানায় হরমুজ আলি। এ কথা বলার সময় এতটাই উত্তেজিত হয়ে পড়ে যে সম্ভব হলে তার ছানিঢাকা চোখ থেকে আগুন ছিটকে পড়ত। তবে তার উত্তেজনার পরিমাণ বোঝা যায় বসে থাকা থেকে সোজা খাড়া হয়ে যাওয়া আর বাতাসে নিজের কম্পমান হাত ঘোরানো দেখে।

নয়ন তাকে বলেÑ সে কথা আমরাও জানি। কিন্তু পুলিশের খাতায় সে ছিল দস্যু। তার নাম থেকে এই কলঙ্ক মুছে ফেলার জন্য চেষ্টা করছি আমরা। আমরা জানি ছইরউদ্দিন ছিলেন কৃষক সমিতির নেতা।

হ্যাঁ। আমারে সমিতি আছিল। বিরাট সমিতি। ২৬৩ গিরামের সমিতি। সেই হাটবারে যখন গুলি কইরা পুলিশ মারল ২৬ জনারে, সেদিন তো হাজার হাজার মানুষের মিছিল। গুলি কর‌্যা পুলিশ হারামীগুলান পলাইছিল ইস্টিমারে। নাহলে মানুষ অগোরে টুকরা টুকরা কর‌্যা বিলের মাছগুলারে খাওন দিত।

হাটের মধ্যে ওই ফলকটা আপনারা লাগিয়েছিলেন?

কীসের কথা কচ্চো?

ওই যে একখান সিমেন্টের বেদি। যেটাতে শহিদদের নাম আর তারিখ লেখা আছে। এখন অবশ্য আর দেখতেই পাওয়া যায় না।

হ্যাঁ। কিষান সমিতিই লাগাইছিল। মওলানা সাব আইছিলেন। তানি ঐডা বসাইলেন। তারপরে দোয়া করলেন।

কোন মওলানা?

ওই যে তর্কবাগীশ।

আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ?

হবার পারে।

হরমুজ আলির খোঁজ পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে নয়নকে। উপজেলা থেকে কমপক্ষে কুড়ি কিলোমিটার দূরে থাকে বৃদ্ধ। রাস্তাও দুর্গম। খানিকটা মোটরসাইকেল, খানিকটা নৌকা, তারপর পুরো চার কিলোমিটার কাদা ঠেলে পায়ে হাঁটা।

জনে জনে কথা বলে নয়ন জেনেছে ওই সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী একজনই কেবল বেঁচে আছে। সে হরমুজ আলি। তখন তেরো-চোদ্দ বছর বয়সের ছেলে। কিন্তু সাথে সাথে থাকত কৃষক সমিতির। ছইরউদ্দিন তাকে দেখে হেসে বলত- বালক বীর।

তার মতো বালক অবশ্য আরও অনেকেই ছিল। তাদের কাজ ছিল গাঁয়ে গাঁয়ে সংবাদ পৌঁছে দেওয়া। ধলগাঁতি ছিল ছইরউদ্দিনের আসল আস্তানা। পাঁচ জমিদারের জমিদারি তখন চলনবিলের এই অংশে। কলকাতার ঠাকুর পরিবার, ঢাকার বাঁড়ুজ্জে পরিবার, সলপের সান্যাল পরিবার, পোরজনার ভাদুড়ী পরিবার, স্থলের পাকরাশী পরিবার।

ঠাকুর পরিবারের জমিদারি! সেখানেও অত্যাচার!

ইমরুলকে অবাক হতে দেখে হাসে নয়ন। বলেÑ জমিদার তো জমিদারই ইমরুল। ঠাকুর পরিবারের সবাই কি আর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন? জমিদারি মানে স্থায়ী আয়। সেই আয় যে যতটা পারে বাড়িয়ে নেয়। তাছাড়া ঠাকুর পরিবারের প্রথম সিংহপুরুষ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর তো এদেশের অনেক অপকর্মের হোতা। এই দেশে নীলচাষ নিয়ে যে বছরের পর বছর আন্দোলন হয়েছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ কষ্ট পেয়েছে, লক্ষ লক্ষ পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছে, সেই নীলচাষ শুরুর দিকে সবচাইতে বড় ওকালতি করেছিলেন মহান রামমোহন রায় এবং দ্বারকানাথ ঠাকুর।

ইমরুলের বিশ্বাস হয়নি। পরে নয়নের ঘরে সুপ্রকাশ রায়ের বইতে তাদের দুই জনের চিঠি পড়েছিল সে। দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন নীলচাষের পক্ষে জোর সুপারিশসহ। তিনি লিখেছিলেন- ‘আমি দেখিয়াছি, নীলের চাষ এদেশের জনসাধারণের পক্ষে সবিশেষ ফলপ্রসূ হইয়াছে। জমিদারগণের সমৃদ্ধি ও ঐশ্বর্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং কৃষকদেরও বৈষয়িক উন্নতি সাধিত হইয়াছে। যে অঞ্চলে নীলের চাষ নাই সেই অঞ্চলের তুলনায় নীলচাষের এলাকাভুক্ত অঞ্চলের মানুষ অধিকতর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করিতেছে। আমি ইহা কেবল জনশ্রুতির উপর নির্ভর করিয়া বলিতেছি না, প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে নিজের অভিজ্ঞতা হইতেই ইহা আমি বলিতেছি।’

হরমুজ আলি বলে- ঠাকুর-ঠুকুর বুঝি না। সব শালা জমিদার আছিল হারামখোর।

খাজনা কি ইচ্ছামতো বাড়াতে পারত তারা? ব্রিটিশের নিয়ম বেঁধে দেওয়া ছিল না?

আর নিয়ম! মাপেই যে আছিল ফাঁকি?

মাপের ফাঁকি মানে?

এইডেই তো আসল জিনিস। ছইরউদ্দিন ধইরে ফেলল। দেখল নলে আছে ফাঁকিবাজি।

নল?

ইমরুলের প্রশ্নের উত্তরে নয়ন জানায়Ñ সেই সময় জমি মাপার ইউনিট ছিল নল। এখন যেমন বিঘা-কাঠা, তখন ছিল নল। বিশেষ করে জরিপের সময় নল ব্যবহার করা হতো।

ছইরউদ্দিন কলো যে নলে ফাঁকি আছে। এক নলে হোবার কথা সাড়ে চব্বিশ ইঞ্চি, কিন্তু এই নলে আছে আঠারো ইঞ্চি। তাহলে যার খাজনা হয় ১ টেকা, তার খাজনা জরিপে হয়া যাচ্ছে দ্যাড় টেকা। বান্ধো শালা জরিপকারী আর পেয়াদাগুলানেক!

এরপরেই হাঁক দিয়ে গান ধরে হরমুজ আলিÑ

                ওরে জমিদারে চুরি করে

                অরে ছইরউদ্দিরে…

                কিষান কয়রে করব বিনাশ

                সকল চোরের গুষ্টি রে…

শুরু হয়্যা গেল বিদ্রোহ।

প্যায়দাগুলানের সামনে ইকটু বেশি ফটর ফটর করিছিল কালিপদ দাস। সে নিখোঁজ হয়া গেল বাড়ুজ্জেগোরে হাট থেকে ফিরার পথে। নিখোঁজ তো নিখোঁজ। জলজ্যান্ত একখান জুয়ান মানুষ, এমনভাবে নাই হয়া গেল য্যান তাঁই কুনোদিন আছিলই না। ছইরউদ্দিন কয় কালিপদরে গুম করিছে বাঁড়ুজ্জে জমিদারের লোক। চিঠি পাঠাও। যদি কালকার মদ্যে কালিপদক ছাড়ান না দেয়, তাইলে আমরা নিজেরা খুঁজবার যাব জমিদার বাড়িত।

এই কথার প্রকৃত অর্থ বোঝেনি বন্দ্যোপাধ্যায় জমিদাররা। তারা ভেবেছিল, এ তো কথার কথা! জমিদারবাড়িতে ঢুকবে কীভাবে চাষাভূষারা!

ঠিক সন্ধ্যার পরপরই হাজার খানেক কৃষক সঙ্গে নিয়ে ছইরউদ্দিন গেল জমিদারবাড়িতে। দাবড়ানি খেয়ে পলিয়ে বাঁচল জমিদারের ডজন খানেক পাইক আর  ভোজপুরি দারোয়ানরা। এবার দশজনের একটা দল ঠিক করে দিল ছইরউদ্দিন। তারা জমিদারবাড়ির সব ঘরে ঢুকে খুঁজবে কালিপদকে।

এটা ছিল ছইরউদ্দিনের একটা চাল। কালিপদকে কি আর জমিদার নিজের বাড়িতে গুম করে রাখবে? কিন্তু দশজন চাষা বাড়ির ভিতরে ঢুকছে, অন্দরমহলে তল্লাশি চালাচ্ছে, জমিদারবাড়ির নারীদের সামনে জমিদারের লজ্জা রাখার জায়গা থাকে কোথায়! জমিদার তখন তড়বড় করে স্বীকার করে যে, কালিপদকে বেঁধে রাখা হয়েছে শল্লামারির কুঠিতে। জমিদারের পরোয়ানা নিয়ে লোক চলল আগে আগে। তার সাথে হাজার সশস্ত্র সঙ্গী নিয়ে ছইরউদ্দিন। উদ্ধার করা হলো কালিপদ দাসকে।

এবার পুরো চলনবিলের মানুষ বুঝে গেছে কৃষক সমিতির শক্তি। দলে দলে মানুষ যোগ দিচ্ছে কিষান সমিতিতে। গ্রামে গ্রামে গায়েনরা গান বাঁধছে ছইরউদ্দিনকে নিয়ে, কিষান সমিতি নিয়ে।

এর সঙ্গে আরেকটা কাণ্ড করল ছইরউদ্দিন। জমিদারকে খাজনা না দিয়ে সোজা চলে গেল সদরের ম্যাজিস্ট্রেট অফিসে। সেখানে আগের নলের মাপ অনুযায়ী নিজের খাজনা শোধ করে রসিদ নিয়ে ফিরে এলো গ্রামে। তার দেখাদেখি সচেতন কৃষকরা একই ভাবে খাজনা জমা দিতে লাগল সদর ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে গিয়ে। জমিদাররা মামলা ঠুকল। রায় গেল তাদের অনুকূলে। কিন্তু ছইরউদ্দিন দমার পাত্র নয়। সে আপিল করল জজ আদালতে। সেখানে হেরে গেল জমিদাররা। আদালত হুকুম দিল জমিদাররা বাড়তি যে খাজনা প্রজাদের কাছ থেকে আদায় করেছে, তা অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে তাদের।

এতটা সহ্য করতে নারাজ জমিদাররা। তারা শুরু করল ষড়যন্ত্র, ইংরেজ অফিসারদের সাথে দেনদরবার। এদিকে বাড়তি খাজনার টাকা ফেরত নিতে রোজ প্রজারা ভিড় জমায় জমিদারের কাচারি বাড়িতে। কিন্তু রোজ তাদের ফিরে আসতে হয় খালিহাতে। তখন ছইরউদ্দিন ঘোষণা দিল যে, যতদিন পর্যন্ত জমিদাররা বাড়তি নেয়া খাজনার টাকা ফেরত না দেবে, যতদিন খাজনা-বহির্ভূত অর্থ আদায় বন্ধ না হবে, ততদিন চলনবিলের কোনো প্রজা জমিদারকে খাজনা দেবে না।

খাজনা-বহির্ভূত আদায় মানে?

ইমরুলের দিকে তাকিয়ে অনুকম্পার হাসি হাসে হরমুজ আলি- তোমরা তো বাপু জমিদারের আমুল দ্যাখো নি। দেখলে বুঝতে পারলেনি যে কত টেকা কত ভাবে উঠে যায় জমিদারের ঘরেত। যেমন ধরো একটা আছিল তহুরি আদায়। বচ্ছরের শ্যাষে যখন হিসাবপাতি করা হয়, তখন সেই হিসাবপাতি যারা করে, সেইসব মুন্সিগুলানেক দেওয়ার জন্য টেকা দেওয়া লাগবি প্রজার। সেই আদায়ের নাম তহুরি।

ইমরুলের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে- মাছের তেলে মাছ ভাজা!

তাইলে আর কচ্ছি কী রে বাপু! তারপরে আছে তোমার বিয়ার খাজনা। জমিদারবাবুর বেটির বিয়া জুড়িছে আরেক জমিদারের ছাওয়ালের সাথে। সেই বিয়ার খরচা বাবদ আদায়। বিয়া তো হলো। তারপরে ধরো ছাওয়ালও হলো। সেই ছাওয়ালের মুখে-ভাত। বাবুরা কত অন্ন-পাসন। সেই অন্ন-পাসনের জন্য বাড়তি টেকা দেওয়া লাগবি প্রজার।

ঘৃণায় মুখ কুঁচকে ওঠে ইমরুলের- ছি!

এইটুক শুন্যাই ছিক্কার। আরও যে কত আছিল রে বাপ!

যেমন? এবার প্রশ্ন করে নয়ন।

পার্বণী। জমিদারের বাড়িত পূজা হবি। সেই পূজাত আসবি কলকেতা-লখনোতির বাইজি। সেই জন্য টেকা দেওয়া লাগবি সকলের। মুসলমানরাও বাদ যাবার পারবি না। তারপরে একখান আছে রসদ-খরচ। জমিদার বছরে একবার ভেট পাঠায় লালমুখা ইংরেজ সায়েবগুলানেক, তারপরে কলকেতাত ছোট লাটের কাছেত, নবাব-বাদশাগের কাছেত। সেই ভেট পাঠানের নাম করে টেকা আদায় চলে ফি বচ্ছর।

এইসব ল্যাঙোট-পরা অভাবী মানুষকে এত টাকা দিতে হতো বছর বছর!

আরে আরও অনেক আছে। পুলিশ-খরচের নাম শুনিছো?

না তো!

মাসে মাসে পুলিশের কেষ্টুবষ্টুরা আসে জমিদারের বাড়িত ফুর্তি করতে। তা তাগের খানাপিনা আমোদ-ফুর্তির খরচ দিতে হয় প্রজাগের। তার নাম পুলিশ-খরচা।

তার সাথে আছে ডাক-খরচা। জমিদারের নাকি রোজ চিঠি পাঠান লাগে সদরে দরবারে। সেইসব চিঠি পৌঁছানের জন্যে ডাক-খরচ। এইডার জন্যেও বছর বছর টেকা গুনতে হয় প্রজার।

রানিমার শখ হছে তীর্থে যাবি ভগমান দর্শনের জন্যে। টেকা দিবি কে? উঠাও প্রজাদের কাছ থিনি।

জমিদার তো লিচ্ছেই। লায়েব ব্যাটা বাদ যাবি ক্যা! তাঁই যখন গাঁয়ে পায়ের ধুলা দেয়, তখন তার হাতে তুলে দেওয়া লাগবি টেকার তোড়া। এইডার নাম নজরানা।

তারপরে আছে ইশকুল-খরচ, গ্রাম-খরচ, ভোজ-খরচ, সেলামি, খারিজ দাখিল।

শুনেই মাথা ভোঁ ভোঁ করছে ইমরুলের।

তার অবস্থা দেখে খ্যাক খ্যাক করে হাসে হরমুজ আলি। আর খালি একখান আদায়ের কথা কই শুনো। ভিক্ষার নাম শুনিছো?

ভিক্ষা মানে সাহায্য? দান-খয়রাত?

এই ভিক্ষা সেই ভিক্ষা না। এই ভিক্ষা হচ্ছে জোর কর‌্যা টেকা আদায়। কী কারণ? না, জমিদারব্যাটা কলকেতাত মাগিবাজি আর ফুর্তি মারাতে যায়া টেকার টান পড়িছে। তখন হুন্ডি নিছে শেঠের গদিত যায়া। সেই ঋণ শোধ করা লাগবি। তো টেকা দিবি কে? প্রজা। জোর করে আদায় করা এই টেকার নাম হচ্ছে ভিক্ষা।

এইসব অত্যাচার বন্ধ করার জন্যই ছইরউদ্দিন ডাক দিয়েছিল খাজনা বন্ধের। আর সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিল চলনবিলের ২৩৬ গ্রামের সকল মানুষ।

৯.

ছইরউদ্দিনকে মেরে ফেলা হয়েছিল, গুলিতে বুক ঝাঁজরা করে দিয়ে।

খান বাহাদুর আব্দুল করিমের ডায়েরি কী বলে দেখার জন্য আবার সেটাকে চোখের সামনে টেনে নেয় ইমরুল।

‘ছইরউদ্দিন ও তাহার দস্যুদলের দৌরাত্ম্য ক্রমেই বাড়িয়া চলিল। তাহারা বিশীর কাচারি বাড়ি লুণ্ঠন করিল। প্রথমে তাহারা ধনী ও সম্পন্ন ভদ্রলোকদিগকে তাহাদের দলে যোগদানের জন্য আহ্বান করিত। তাহারা রাজি হইলে চান্দা লইয়া চলিয়া যাইত। কিন্তু রাজি না হইলেই তাহাদের বসতবাটিতে আগুন ধরাইয়া দিত, এবং লুটতরাজ করিত। এই দস্যুদলের আক্রমণে ভীত হইয়া ভদ্র ও ধনী-মানী লোকগণ পরিবার-পরিজন লইয়া গ্রামত্যাগ করিয়া সিরাজগঞ্জ সহরে আশ্রয় লইয়াছিলেন। কেউ কেউ সেখানেও নিরাপত্তার অভাব বোধ করিয়া পাবনা জেলা সদরে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তাহাদের আবেদন-নিবেদনে গভর্নমেন্টের টনক নড়িল। জমিদারগণ এই দেশে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের প্রতিভূ। তাহাদের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হইলে তাহা গভর্নমেন্টের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হইয়া দাঁড়ায়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং বিপুল সংখ্যক পুলিশ লইয়া বিদ্রোহী গ্রামগুলোতে টহল দিতে শুরু করিলেন। বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে রাজশাহী হইতে আরও অর্ধশতাধিক সশস্ত্র পুলিশ এখানে আগমন করিল। বাংলার ছোটলাটের আদেশক্রমে গোয়ালন্দ হইতে প্রকাশ একটি সামরিক পুলিশ বাহিনীও আনয়ন করা হইল।

‘কিন্তু এত আয়োজনও দুর্বৃত্ত ছইরউদ্দিনের মনে ভীতির সঞ্চার করিতে পারে নাই। আমরা ঘোষণা করিয়াছিলাম যে, চারিজনের অধিক জনতা একত্রিত হইতে পারিবে না। দুর্বৃত্তগণ যাহাতে একত্রিত হইতে না পারে সেই জন্যই এইরূপ নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু এই অবস্থাতেও তাহারা নিজেদের মধ্যে সংযোগ ঠিকই বজায় রাখিত। আমরা পরে জানিতে পারিয়াছি যে, তাহারা মাছ ধরার নামে পলো হাতে বিভিন্ন বিলে ও জলাশয়ে সমবেত হইত, এবং নতুন নতুন দুর্বৃত্তপনার শলাপরামর্শ করিত। আমাদের এইরূপ টহলদারির মধ্যেই তাহারা একই রাত্রে প্রায় ৪০টি গ্রামে দাদনদারদের কুঠি আক্রমণ করিয়া সকল বন্ধকি দলিল ভস্মীভূত করিল। মহাজনের পক্ষে আর সুদের সুদ তস্য সুদ আদায় করা তো দূরের কথা, আসল লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ারও আর কোনো ক্ষীণতম আশাও রহিল না।

‘এই সময় আমরা চর-মারফত সংবাদ পাইলাম যে ছইরউদ্দিন বিলাসপুর হাটে আগমন করিবে। নির্দিষ্ট দিনে ভোর না হইতেই বিপুল সংখ্যক ছদ্মবেশী পুলিশ লইয়া আমি গোপনে পুরা হাট ঘিরিয়া রহিলাম। ঠিক দ্বিপ্রহরের আগে আমাদের গুপ্তচর জানাইল যে ছইরউদ্দিন তাহার প্রায় দশজন সাঙাৎ লইয়া হাটে আসিয়াছে। আমরা তৎক্ষণাৎ আমাদের বেষ্টনী নিñিদ্র করিয়া তুলিলাম। তারপর আমি চোঙ হাতে লইয়া ঘোষণা করিলাম যে ছইরউদ্দিনকে চারিদিক হইতে ঘিরিয়া ফেলা হইয়াছে। সে যদি নিজের প্রাণ বাঁচাইতে চায় তাহলে অবিলম্বে নিরস্ত্র অবস্থায় বাহির হইয়া আসিয়া আত্মসমর্পণ করুক।

‘আমি হাটের দক্ষিণ দিকের প্রবেশ পথের মাথায় দাঁড়াইয়া ছিলাম। দেখিলাম ঘোর কৃষ্ণবর্ণ একজন প্রায় ছয় ফুট লম্বা লোক জটলা হইতে বাহির হইয়া আমার দিকে হাঁটিয়া আসিতেছে। তাহার একটি হাত পেছনে। অপর হাতটি উঁচু করিয়া ধরা। ভঙিতে মনে হইল সে আত্মসমর্পণ করিতেই আসিতেছে। কিন্তু আরও কিছু নিকটবর্তী হইবার পরে আমার সন্দেহ হইল সে একটি হাত কেন পিছনে রাখিয়াছে। নিশ্চয়ই তাহার লুক্কায়িত হাতে কোনো রিভলবার বা অন্য কোনো অস্ত্র আছে। আমি তাই রেঞ্জের মধ্যে আসবামাত্র তাহার বুক লক্ষ করিয়া আমার পিস্তলের ঘোড়া টিপিয়া দিলাম। সে যেন হোঁচট খাইয়া দাঁড়াইয়া গেল। তাহার বুক হইতে গল গল করিয়া রক্ত নির্গত হইতেছে। সে একবার নিজের বুকের দিকে তাকাইল। তারপর আবার আমার দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। আমার সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়া উঠিল। এ কী মানুষ না পিশাচ! এমন পিস্তলের গুলি খাইয়াও যেন তাহার কিছুই হয় নাই। আমি তখন একের পর এক পিস্তলের ঘোড়া টিপিতে লাগিলাম। সে আসিয়া আমার পায়ের সামনে হুমড়ি খাইয়া পড়িয়া গেল।

‘তাহার পেছনের হাতে কোন বস্তু রাখা ছিল তাহা খোঁজ করিবার মতো মানসিক অবস্থা তখন আমার আর অবশিষ্ট নাই।

ছইরউদ্দিনের হাতে ছিল একটি রোল করা কাগজ। একটি দরখাস্ত। বাংলার ছোটলাটের দরবারে পাঠানোর জন্য একটি দরখাস্ত লিখেছিল তারা এই আশাতে যে তিনি জমিদারদের অন্যায় অত্যাচার থেকে চলনবিলের লক্ষ লক্ষ চাষিকে রক্ষা করবেন।

তাহলে সে ওইদিন বিলাসপুরের হাটে কেন এসেছিল? আর তা প্রকাশ্য দিবালোকে কেন?

বিলাসপুরের হাটে যে মুনশি ছিল, পুরো চলনবিল এলাকার মধ্যে একমাত্র সে-ই নির্ভুল বানানে ইংরাজিতে চিঠি লিখতে সক্ষম ছিল। তাকে দিয়ে দরখাস্ত লেখাতেই ছইরউদ্দিন সেখানে এসেছিল।

এর সাথে এটাও উল্লেখ করতে হবে যে দারোগা আব্দুল করিমও সেটা জানত।

জেনেও সে হত্যা করল ছইরউদ্দিনকে! কেন?

প্রমোশন। পুরস্কার। সাহেবদের নেকনজর পাওয়ার আশা। এটা তো প্রমাণিতই যে সে তা পেয়েছিল। তার থেকেই তো তার বংশের উত্তরপুরুষরা আজ এই দেশের নীতি-নির্ধারক মহলের সদস্য।

১০.

ছইরউদ্দিনের ভিটায় বসে আছে ইমরুল।

তার কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। ছিল দুই মেয়ে। তারা দু’জনেই এখন মৃত। ভিটায় আছে মেয়েদের ছেলেরা। ছোট ছোট মাটির ঘর। সামনে ছোট ছোট উঠোন। গেঁড়ি-গুঁড়ি বাচ্চারা উঠোনের মাটিতে খেলছে হাঁস-মুরগির সাথে। ছাগল-কুকুরের সাথে। বোঝাই যায় খুব দুরবস্থায় আছে এই ভিটার সব বাসিন্দা। ছইরউদ্দিনের ছোট মেয়ের পুত্র ষাট পেরিয়েছে। তার দুই মেয়ে। একজন ঢাকায় গার্মেন্টে কাজ করে। আর বড় মেয়েটা, খুব সুন্দরী ছিল, তাকে প্রায় জোর করে বিয়ে করেছিল এলাকার প্রভাবশালী মেম্বারের লুচ্চা পুত্র। বছরখানেক ভোগ করে তাড়িয়ে দিয়েছে। তালাকের নামে বাপের হাতে গুঁজে দিয়েছিল কয়েক হাজার টাকা। খোরপোশ দেয় না এক পয়সাও। এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করার সাহস নাই কারও। আর মায়া, মানে মেয়েটার তো কোনো ইচ্ছাই নাই। প্রচণ্ড ঘৃণা করে সে তার প্রাক্তন স্বামীকে। লেখাপড়া শিখছিল। কিন্তু এসএসসি পাস করা আর হয়ে ওঠেনি। বিয়ের জন্য। এখন আবার পড়ছে। কে কী বলে তার কোনো ধার ধারে না। প্রচণ্ড পরিশ্রম করে মেয়েটা।

তাদের সামনে চায়ের কাপ আর কাঁসার গ্লাসে পানি এনে রাখল মায়াই। তাকে দেখে কেন যেন ইমরুলের মনে হলো ছইরউদ্দিন লোকটাও এই রকমের ব্যক্তিত্বই ধারণ করত। মায়ার দাঁড়ানো, কথা বলা, চলাফেরার ভঙ্গিতে এক দুর্লভ ভিন্নতা। মনে মনে মেম্বারের ছেলের জন্য অনুকম্পা বোধ করে ইমরুল। এই মেয়েকে বশ মানাতে চেয়েছিল বোকা পাঁঠাটা! ঘটে একটু বুদ্ধি থাকলেই যে কেউ বুঝবে, এ মেয়ে অত্যাচার সহ্য করবে দাঁতে দাঁত চেপে, কিন্তু অত্যাচারীকে মেনে নেবে না মন থেকে।

খুব সাবলীল আচরণ মায়ার। গ্রামের মেয়ে বলে কোনোরকম জড়তা নাই। আবার দরিদ্র বলেও কোনোরকম হীনম্মন্যতার প্রকাশ নাই।

তাকে জিজ্ঞেস করে ইমরুল- আপনি কি আপনার পরদাদা ছইরউদ্দিনের কথা জানেন?

জানি।

কী জানেন?

এই প্রশ্নে তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মায়া। আস্তে আস্তে বলেÑ জানি যে তাই আছিলেন একখান মানুষের মুতন মানুষ।

এই একটা বাক্যের মাধ্যমে চারপাশের বাতাসে অমানুষদের জন্য যেন রাশি রাশি ঘৃণা ছড়িয়ে দেয় মায়া। তারপরেই ইমরুলের উদ্দেশ্যে সোজা-সাপ্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়Ñ ছইরউদ্দিনের খবর নিয়া কী দরকার আপনার? কী করবার চান আপনে?

নয়ন উত্তর দেয় ইমরুলের হয়ে- উনি একটা গবেষণা করবেন।

তাতে লাভ?

ছইরউদ্দিনের মতো বীরের কথা জানে না দেশের মানুষ। জানলেও ভুলে গেছে। তাকে আবার মানুষের সামনে হাজির করার জন্য ডাক্তার সাহেব কী পরিশ্রম যে করছেন!

ইমরুল অস্বস্তি বোধ করছিল  নয়ন ভাই যেসব কথা বলছেন, সেগুলো মোটেও তার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এটাও সে বোঝে, নয়ন ভাই যা বলছে, এর অন্যথা বললে লোকে সেই কথা বুঝবে না। সে প্রশ্নটা থেকে দূরে সরে পাওয়ার জন্য প্রশ্ন করেÑ আপনাদের কাছে এমন কিছু আছে… মানে স্মৃতিচিহ্ন, মানে ছইরউদ্দিন সাহেবের ব্যবহার করা কোনো জিনিস?

গরিবের বাড়িত কি টেকসই কুনো জিনিস থাকে? তাছাড়া তাক হত্যা করার পরে পুলিশ আর জমিদারের পাইকরা মিলে ভিটা পুড়ায়া ছাই কর‌্যা দিছিল। কিছুই বাঁচেনি।

না জেনে আবার একটা পুরনো ক্ষতে আঘাত করা হয়ে গেছে ভেবে আরও ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে ইমরুল।

দেশ স্বাধীন হবার পরে আপনারা কোনো অনুদান পাননি?

এবার একটু জোরেই হেসে ফেলে মায়াÑ কীসের অনুদান? আমারে বাড়ির কেউ তো মুক্তিযুদ্ধে মারা পড়েনি।

মুক্তিযুদ্ধেরও আগে তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সেই প্রথম দিকের মুক্তিযুদ্ধের শহিদ ছইরউদ্দিন।

এই প্রথম এ ধরনের কথা শুনছে তারা। মায়ার বাপ একটু আশান্বিত চোখে তাকায়Ñ তাহলে আপনারা কচ্ছেন যে ছইরউদ্দিনের নামে দরখাস্ত করলে কিছু টেকা-পয়সা পাওয়া যাবার পারে? আপনেরা ইকটু দেখপেন চেষ্টা কর‌্যা। হলে বড় উবকার হয়।

কী যে কন না আব্বা আপনে! থামেন তো! সরকারের আশা বাদ দ্যান। যেমন চলতিছে সেইরকমই চলুক আমারে দিনকাল।

উঠতে চায় এবার তারা। নয়ন সঙ্গে আনা ক্যামেরার শাটার টিপতে থাকে। প্রশ্রয়ের হাসি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে মায়া।

বিদায় নেবার সময় ইমরুল বলে- আমার আরও কিছু কথা আছে। কাল কি আসা যাবে?

শশব্যস্ত হয়ে বলে মায়ার বাবা- আরে আপনের এই জল-কাদা ভাইঙ্গা আসার কী দরকার! আপনে কন কখন যাওয়া লাগবি? আমি ঠিক হাজির হয়া যাব।

একটু ইতস্তত করে বলে ইমরুল- আমি মায়ার সাথেও কথা বলতে চাই। মায়া আসতে পারবেন আপনার আব্বার সাথে?

মায়া একটু ভেবে বলে- আমি সকালে মৃধাবাড়ির তিন বাচ্চারে পড়াই। সেইডা সেরে যাবার পারি। কিন্তু আপনি ঠিক কী জন্য ডাকতিছেন আমারে?

ইমরুল নিজেও পরিষ্কার না সে কী বলতে চায়। এখন তো সে-কথা বলা যায় না। বলেÑ একটু কষ্ট করে আসেন, তখনই শুনবেন। আসেন। নাহয় আপনার একটা দিন নষ্টই হলো! তবু আসেন প্লিজ!

রাজি হয় মায়া।

হাসপাতাল কম্পাউন্ডে পৌঁছেই মাকে ফোন করে ইমরুলÑ আমি খুঁজে পেয়েছি মা! আমি ছইরউদ্দিনের বাড়ির লোকদের খুঁজে পেয়েছি।

মা একটু থমকায়। তারপর বলে- এই জন্যই তুই বিলাসপুরে পোস্টিং নিয়েছিলি! এটাই তাহলে তোর সেই বিশেষ কাজ?

হ্যাঁ মা হ্যাঁ।

কী করতে চাস এখন?

প্রায়শ্চিত্ত। আমার পূর্বপুরুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত।

কীভাবে করবি? ওদের হাতে রক্তপণের টাকা দিবি?

একটু থমকায় ইমরুল। আসলে সে তো কোনোকিছু ভেবে রাখেনি। পাল্টা সে-ই জিজ্ঞেস? করে মাকেÑ কী করা যায় বলো তো মা?

ওপারে মাকেও কিছুক্ষণ ভাবিত মনে হয়। একটু দ্বিধার সঙ্গেই মা বলেÑ কী করবি বল! যদি ওদের টাকার খুব দরকার বলে মনে হয়, তাহলে টাকা দেওয়া তো কোনো সমস্যা নয়। যদি ইচ্ছা করিস, বাড়ি তুলে দিতে পারিস। যদি পরিবারে কাজ করার মতো কেউ থাকে, অথচ বেকার, তাহলে তাকে চাকরি দেয়া যায়। আর… আর… আর তো কিছু মনে পড়ছে না রে ইমু!

সবই তো টাকা আর ক্ষমতা সম্পর্কিত হলো মা। অবশ্য আমরা এর বাইরে আর কিছু তো ভাবতেও শিখিনি।

মা একটু লজ্জাই পেয়ে যায় বোধহয়। আমি তো বলেইছি আমার মাথায় বেশি কিছু খেলে না। তোর আব্বার সাথে কথা বলবি? ভাইয়ার সাথে? ওদের ব্যবসা করা মাথা, রাজনীতি করা মাথা, অনেক কিছু ভেবে বের করতে পারে।

ওরা আরও বেশি ভোঁতা এবং সংবেদনহীন কথা বলবে। কিন্তু একথা তো মাকে বলা যায় না। ইমরুল বলেÑ আচ্ছা তুমিও ভাবো, আমিও ভাবি। যদি ভালো কোনো কিছু বের করতে পারি!

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মা বলে- দেখিস তুই ঝোঁকের মাথায় এমন কোনো কিছু দিতে চেয়ে বসিস না যা দেওয়া অসম্ভব।

১১.

পরদিন আউটডোরে বসার কথা ছিল না। সকাল থেকেই মায়াদের আসার অপেক্ষা করছিল ইমরুল। বুকের মধ্যে কেমন যেন এক অচেনা অস্থিরতা। কোনো বইতেও মনোযোগ বসছে না। বাধ্য হয়েই আউটডোরে গিয়ে বসেছে। রোগীর ভিড়ে একটু পরেই ভুলেও গেছে অন্য সব কথা। বেলা এগারোটার দিকে ফরদু মিয়ার পেছন পেছন পরদা ঠেলে মায়া আর তার বাবা যখন ঢোকে, তখন আক্ষরিক অর্থে ইমরুলের টেবিলের চারপাশে মৌমাছির মতো ভোঁ ভোঁ করছে রোগীর দল। এই ভিড় ছেড়ে তাৎক্ষণিকভাবে উঠে পড়া অসম্ভব।

পকেট থেকে চাবি বের করে ফরদু মিয়ার হাতে দেয় ইমরুল। মুখে বলে- আমার আত্মীয়। আমার কোয়ার্টারে নিয়ে যাও।

সঙ্গে কিছু টাকা একটু হাত আড়াল করে গুঁজে দেয় ফরদু মিয়ার হাতে। চাপাস্বরে বলেÑ কিছু নাশতা দিও। আমি এই রোগী কয়টা শেষ করে আসছি।

সেই রোগী কয়টা শেষ করতেই এক ঘণ্টা লেগে যায়।

খুব লজ্জিত ভঙ্গিতে জোরপায়ে ডরমিটরির দিকে হাঁটে ইমরুল। এই-ই প্রথম নিজের ঘরে ঢোকার সময় কেউ একজন দরজা খুলে দেয় তাকে। মায়া নয়, মায়ার বাবা। হোক। তবু তো একটা পরিবর্তন।

পরিবর্তন আরও হয়েছে। বেশ অনেকটাই। পুরো ঘর ঝকঝক তকতক করছে। ঝাড়ামোছা করা হয়েছে নিপুণ ভঙ্গিতে। বিছানার চাদর-বালিশ টান টান সুন্দর করে গোছানো। যে খাবারগুলো ফরদু কিনে দিয়ে গেছে, সেগুলো যেন তারই জন্য টেবিলে সুন্দর করে বেড়ে রাখা।

ইমরুলে মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে আসে- এসব কী?

মায়ার মুখে নির্মল হাসি। বলে- চুপচাপ বসে থাকার অভ্যাস নাই তো। বুঝেনই তো গাঁয়ের মেয়ে আমি। আমি কুনোদিন আপনাদের মতো ভদ্দরলোকের বাড়ি ঢুকিনি। তা-ও সাহস করা হাত লাগাইছি। খুব খারাপ হইছে গুছান?

সত্যি কথাটাই বলে ইমরুল- এখানে আসার পর থেকে আজই প্রথম মনে হচ্ছে এটা একটা বাড়ি।

মৃদু হাসির সাথে প্রশংসাটুকু গ্রহণ করে মায়া। জিজ্ঞেস করে- আপনের রান্ধন করা দেয় কে?

সালেহা খালা।

তার যদি আসার দেরি থাকে আমি আপনের চাল-ডাল ফুটায়া দিতে পারি। ইকটু রুচিবদল হবি তাহলে।

আজ থাক মায়া। আজ বরং আমরা কথা বলি। খুব জরুরি কয়েকটা কথা বলার আছে আমার।

বলেন।

ডাইনিং টেবিলেই বসে তিনজন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করে ইমরুল। একটু পরেই টের পায়, এভাবে চেষ্টা করা বৃথা। সে আসলে গতরাতে প্রায় সারারাতই জেগে জেগে চেষ্টা করেছে, কিন্তু নিজের চিন্তাকেই গুছিয়ে নিতে পারেনি। কাজেই গুছিয়ে কথা বলতে পারার প্রশ্নই ওঠে না। সে তাই প্রায় মরিয়া হয়েই স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর ছেড়ে দেয় নিজের জিভকে। তড়বড় করে বলেÑ আপনাদের বংশের ছইরউদ্দিনকে রিভলবারের গুলিতে খুন করেছিলেন যে পুলিশ অফিসার, তার নাম ছিল আব্দুল করিম। করিম দারোগা নামেই সবাই চিনত তাকে।

মায়া এবং তার বাবা নিশ্চুপ বসে থাকে। প্রতিক্রিয়াহীন। এতদিন পর ছইরউদ্দিনকে কে গুলি করেছিল তার পরিচয় জানাটা আর মোটেই গুরুত্ব বহন করে না তাদের কাছে।

ইমরুল নিজের মতো করে বলে চলে- আব্দুল করিম পরে এই কাজের জন্য ইংরেজ সরকারের কাছে পুরস্কার পায়। প্রমোশন পায়। করিম দারোগা একসময় খেতাব পেয়ে হয় খান বাহাদুর আব্দুল করিম। তার ছেলে মুসলিম লীগের আমলে, মানে পাকিস্তানের আমলে, এমএলএ হয়েছিলেন। আরেক ছেলে অনেক বড় ব্যবসায়ী। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে আব্দুল করিমের এক নাতি প্রথমে আওয়ামী লীগের এমপি, পরে বিএনপির এমপি, পরে জাতীয় পার্টির এমপি, এখন আবার আওয়ামী লীগের এমপি।

এইসব কথা আমারে শুন্যা কী লাভ?

মায়ার প্রশ্ন যেন শুনতেই পায়নি ইমরুল। সে তো মায়াদের লাভের জন্য বলছে না, বলছে নিজের ভার লাঘবের জন্য। সেই তোড়েই সে বলে যায়- এই বিলাসপুরের হাটে ছইরউদ্দিনকে গুলি করেছিলেন যে করিম দারোগা, তিনি ছিলেন আমার পরদাদা।

এবার একটু চমকায় মায়া এবং তার বাবা দু’জনই।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় ইমরুল। সামনে ঝুঁকে কথা বলতে থাকে ওদের আরও ভালো করে শোনানোর জন্যÑ আমি এখানে, এই বিলাসপুরে এসেছি শুধু আপনাদের, মানে ছইরউদ্দিনের বংশধরদের খুঁজে বের করার জন্য।

তা খুঁজে তো পাইছেন। এখন কী করবেন? মায়া বলে কিছুটা লঘুস্বরে।

প্রায়শ্চিত্ত করব। আমার পূর্বপুরুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব।

কীভাবে?

সেটাই তো জানতে চাই। বলুন আমি আপনাদের জন্য কী করতে পারি?

চুপচাপ বসে থাকে মায়া। তার বাবার চোখ চকচক করছে। মনে মনে লোকটা অঢেল টাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে কত টাকা চাওয়া যায় ভাবছে। কত হাজার? দূর হাজার না, লাখের নিচে হওয়া যাবি না।

কিন্তু তাকে তো বটেই, ইমরুলকেও পুরোপুরি হতবাক করে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় মায়া। বলেÑ চলো বাবা আমরা যাই। ডাক্তার সায়েব আরাম করুক।

মানে?

মানে আমরা বাড়িত যাচ্ছি।

তাহলে আপনারা কি আমার পরদাদাকে ক্ষমা করবেন না? কোনো মূল্যেই না?

ঐসব তো কবেই চুক্যাবুক্যা গ্যাছে ডাক্তার সাহেব। আপনে করতে চাইলে একখান কাম করতে পারেন। হাটে ঐ যে শহিদ বেদিডা ছিল, সেইটারে ভালো করে বানায়া দ্যান।

অবশ্যই দেব। আর কিছু চাইবেন না? নিজেদের জন্য, পরিবারের জন্য?

ক্লান্ত কণ্ঠে মায়া বলে- পরিবারে অভাব আছে বটে, কিন্তু সেইডা আর বেশিদিন থাকবি না। আমার ছোট বোইনডা গার্মেন্টে কাম করে। আর আমারও চাকরি হয়্যা গেছে।

কোথায়?

জর্ডানে। গৃহকর্মীর চাকরি।

হা হা করে ওঠে ইমরুলÑ খবরদার ওই চাকরিতে যাবেন না। আরে আরব মানুষগুলোকে তো আপনি চেনেন না। ওরা সব শয়তানের হাড্ডি। আর অসভ্য। আপনার কিছুতেই ওখানে যাওয়া চলবে না।

তাহলে আমি কী করব? কাম তো করা লাগবি আমার।

টেবিলে ঘুরে একেবারে মায়ার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ইমরুল। হঠাৎ সে এমন একটা কাজ করে, যার কথা ঘরের অন্য কেউ তো দূরের কথা, নিজেও স্বপ্নেও ভাবেনি কোনোদিন। সে মায়ার একটা হাত টেনে নেয় খপ করে নিজের হাতের মধ্যে। কাতরকণ্ঠে ভিখারির মতো বলে- আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই মায়া!

বজ্রাহত সময় কাটতে থাকে তিনজনের। কতক্ষণ যে তিনজনই নির্বাক ছিল তা কারও মনে নেই। তবে এবারও সবার আগে নিজেকে ফিরে পায় মায়া। ইমরুলের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে- বড়লোকের খিয়াল। এক বড়লোকের ছাওয়ালের খিয়ালের দাম দিছি একবার। আর পারব না। চলো বাবা আমরা যাই।

১২.

খান বাহাদুর আব্দুল করিমের শেষ ডায়েরিটায় একটা খেদোক্তি ছিল। ‘শুনিয়াছি ঐ দস্যু ছইরউদ্দিন এবং তাহার সহযোগীদের স্মরণে নাকি স্মৃতিসৌধ হইয়াছে। সেই সৌধের সামনে দাঁড়াইয়া লোকে তাহার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানায়। দস্যু হইয়াছে বিপ্লবী নেতা। আর আমার অবদানের কথা কেহ মনে রাখে নাই। আমার প্রমোশন হইয়াছে, ধন হইয়াছে, মান হইয়াছে, কিন্তু শেষ বিচারে জিতিয়া গিয়াছে ছইরউদ্দিনই।’

জাকির তালুকদার : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares