উপন্যাসিকা : নষ্ট সময়ের গল্প : মাহবুবা হোসেইন

মাহবুবা হোসেইন ।।

সাবেরের কোনো কালেই সন্দেহ ছিল না যে, টাকাই সব। টাকাই ধন্বন্তরি। শালা যত সব নখরামি। সাদা টাকা, কালো টাকা। টাকা তো টাকাই তার আবার সাদা কালো কী? নীতি-নৈতিকতা? ফুঃ। জীবনে কম তো দেখেনি? ভোগান্তিও কম ভোগেনি? কীসব দিন গেছে। ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে সোনালি ব্যাংকের তিনশ’ পঁয়ত্রিশ নাম্বার অ্যাকাউন্টে তিন হাজার টাকা জমা দিয়ে আব্বা হাত-পা ঝেড়ে বললেন ‘নে দিলাম সার্টিফিকেট কিনে। সাংবৎসরিক খরচ। আর বাপধন কিছু চাইবে না। চাইলেও পাবে না।’ আর পাবেই-বা কোথা থেকে? এক গোষ্ঠী মুখ। শেফালি, বেণু, সাবের, রফিক, অঞ্জু, মিনু আর বকুল। পাঁচ বোন দুই ভাইয়ের একটা ভজঘট সংসার। নিত্য কিচিরমিচির। বাবা ফুড ইন্সপেক্টর। কাঁঠালের ভাঙা কোষের ওপর ভনভন মাছির মতো চারদিকে টাকা ওড়ে। কেবল ধরলেই হয়; কিন্তু কসিমুদ্দিন শেখের পুত্র মুত্তালেব শেখ মাছি তাড়ানোর মতো দুই হাত নাড়ান আর মায়ের মুখ স্মরণ করেন। খাদ্য বিভাগে চাকরি পাওয়ার পর সালাম করতে গেলে মা মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন ‘বাপ শুনেছি ওই চাকরিটা জুতের না ওইডা না করলে হয় না?’ এমএ পাস মুত্তালেব অশিক্ষিত মায়ের পা ধরে বলেছিলেন ‘মা তুমি শুধু দোয়া করো যেন গোবরে পদ্মফুল হতে পারি।’ পদ্মফুল তিনি হয়ে ছিলেন ঠিকই, তবে বিধ্বস্ত ডাঁটাভাঙা পদ্মফুল। দোমড়ানো-মোচড়ানো পরাজিত। এদিকে ইউনিভার্সিটির সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত ছাত্রটি দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের আগে সোনালি ব্যাংকের তিনশ’ পঁয়ত্রিশ নম্বর অ্যাকাউন্টে উঁকি দিয়ে দেখে বাকি মাত্র পঁচাত্তর টাকা। সামনে দিগন্তজোড়া শূন্যতা। ধু-ধু হাহাকার। হা কাঞ্চন লক্ষ্মীর বাহন কেন তুমি এত চঞ্চলা হে? টিপে টিপে খরচ করেই এই। জীবনটাই তো টিপে টিপে ঝাঁঝরা করে দিলে হে। এখন ভরসা জগত্তারিণী টিউশনি। প্রাণের বন্ধু বেলালই প্রথম পথটা দেখিয়েছিল। উশকো-খুশকো চুল, ঘোলা চোখের ছেলেটা ভাঙা একটা সাইকেল নিয়ে সারাদিন টিউশনি করে বেড়ায়। সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়ো। বাড়ি থেকে এক পয়সাও আসার উপায় নেই। কমলাপুরের কবি জসীমউদ্দীন রোডের ৩ নম্বর গলির ৩৭ নম্বর বাসার রুনাকে দিয়ে শুরু সাবেরের। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে রুনার সাথে ইয়েটাও চলছিল ঠিক। তাতে বেতনের পাশাপাশি বাড়তি কিছু যোগ হচ্ছিল। হাত ধরাধরি, ক্যাফে ঝিলের পর্দা ফেলা কেবিনে চুমুটুমুর সাথে ঝাল চিকেন তন্দুরি। মাঝে মাঝে নতুন শার্ট, হাতঘড়ি। রুনাদের পারিবারিক অবস্থা ভালো। জমছিল খুব। বেতনের সাথে যখন শ’ দুই টাকা যোগ হতো, প্রথম প্রথম খারাপ লাগতো সত্যি। সন্দেহ ছিল না এডিশনটা রুনার বাবা-মার পকেট থেকেই আসছে। পরে অবশ্যি সামলে নিয়েছিল। ভেবেছিল কা তব কান্তাÑপৃথিবীতে কে কার।

সেই উনিশ বিশ বছর বয়স থেকেই সাবের জানে পয়সা সে একদিন করবেই। জীবনকে কোনোভাবেই বাবার মতো টলতে দেওয়া যাবে না। হারানো চলবে না কোনো কিছু, জীবন না, যৌবন না, বার্ধক্যও না। বাবা যা খুইয়েছেন- জীবনকে সিম্পলি আঁকড়ে থেকেছেন। কষা রোগীর মতো আট হয়ে থেকেছেন, ক্ষয়ে গেছেন। ছেলেমেয়েরাও ক্ষয় রোগীর মতো বড় হয়েছে। তাদের শৈশব কৈশোর যৌবন ধর্ম হারিয়েছে, দূর থেকে দাঁড়িয়ে কেবল চোখের পানি ছেড়েছে। জেনেছে পৃথিবীর এই যে আনন্দ-ফুর্তি তা এখন তাদের জন্য নয়, অন্যদের জন্য। তাদেরও হবে একদিন, তবে কবে কে জানে কিন্তু তার নিজের ছেলেদের ক্ষেত্রে তা সে হতে দিতে চায় না। তার জীবন হবে কাছা ঢিলাÑ ইংরাজিতে যাকে বলে লেভিশ। তার জন্য চাই টাকা। শারমিনও তা বুঝে গেছে, তাই চোখ বন্ধ করে থাকে। প্রথম প্রথম বলত ‘কী দরকার, এই তো ভালো আছি।’ যখন সবে বড়লোক হচ্ছে তখন। যখন অনেক পানির মধ্যে পড়ল, বেশি পানির মাছের মতো হুঁশ হারাল। তখন স্কাই ইজ দ্য লিমিট। আরও আরও। তখন শারমিন সব মেনে নিল। শুধু মেনেই নিল না, অর্থই অবধারিত হলো তার জীবনে। সে এখন বড়লোক। বড়লোক সোসাইটিতে মেলামেশা, বড় বাড়ি, দামি ফার্নিচার, দামি দামি শাড়ি-গয়না, ছেলেদের ভালো স্কুল-কলেজে, ভালো রেস্টুরেন্টে, বছরে দুই একবার বিদেশ ভ্রমণ। জীবনটা কিছুই না কেবল আয়েশ আর গল্প, কোথায় খেয়েছে, কোথায় গিয়েছে, কী করেছে, লেটেস্ট বাজারে কী এলো, কোনটা কোনটা তার আছে, কোনটা অচিরেই তার হবে। তবে হ্যাঁ কখনও কখনও খারাপ লাগে না তা নয়। যখন তারই বন্ধুবান্ধব কাউকে নিজের পরিচয়ে নিজের চেষ্টায় বড়ো হতে দেখে, মনে হয় আমি তো ওর মতো হতে পারতাম। আমারও তো কিছু প্রতিভা ছিল, আমিও ভালো গান গাইতাম, নাচতাম। স্কুল-কলেজে পাওয়া প্রাইজগুলোর কিছু কিছু এখনও শোকেসে সাজানো কিন্তু এখন সে কে? একজন বড়লোকের স্ত্রী, দুটো ছেলের মা এবং সমাজের কারও কারও ভাবি? না তার নিজস্ব কিছুই কাজে লাগেনি। অন্তঃসার শূন্য ভিত্তিহীন এক অবিশ্বাস প্রায়ই তাকে কাবু করে রাখে। মনে হয় এই যে এতকিছু সব যেন শূন্যে ভাসছে। একদিন সব হাওয়া হয়ে যাবে। যেমন করে এসেছে, তেমন করে চলে যাবে। অনিশ্চয়তা কাবু করে রাখে তাকে। তাই আল্লাহ খোদায় তার খুব বিশ্বাস। ওমরাহ করেছে কয়েকবার, গত বছর হজ করেছে। হিজাব ধরেছে বেশ কয়েক বছর। দান-খয়রাত করে খুব; তার পরও ব্যথাটা সাময়িক। টাকা সব ভুলিয়ে দেয়- সে ভালো আছে খুব ভালো আছে। এখন আর কোথা থেকে এত পয়সা আসছে সাবের এই প্রশ্ন করে না। করুক যা খুশি তার কী? আর প্রশ্ন করেই বা কী লাভ। উত্তর পাবে কোথায়? এত এত-র কি উত্তর হতে পারে? সাবেরের কাছেই বা কী উত্তর থাকতে পারে? তাই শারমিন চুপ করে থাকে আর বিনা প্রশ্নে এনজয় করে টাকার আরাম।

‘মাছটা কেবল খেলছে। গোত্তা দিচ্ছে, কাছে আসছে; কিন্তু শালা ধরা দিচ্ছে না। বাপধন কত আর খেলবে। নাটাই তো আমার হাতে। ব্যাংকের সব এন্তেমাল পেয়ে গেছি। সেখানে যে চারশ’ কোটি জ্বলজ্বল করছে। এখন কেবল সুতা ছাড়া। কিন্ত সুতা ছাড়তে ছাড়তে যে গিঁট লেগে গেল। এদিকে গুলশানের ফ্ল্যাটের কিস্তি, আশুলিয়ার পঞ্চাশ বিঘার দশ বিঘা, বাড়ির প্রাসাদ, মিরপুরের দশ তলা, সুন্দরী নারীর গালের মতো মসৃণ হওয়ার অপেক্ষায় হাড়গোড় বের করে দাঁত খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। এই দাওটা মারতে পারলে একটা হিল্লে হয়। মেলা পরে আছে তার ব্যাংকে। তাতে কী? ওতে হাত পড়লে বুকের কোথায় যেন লাগে। পার্টি ভালো, নচ্ছার হচ্ছে ওই উকিল ব্যাটা। নচ্ছার উকিলের বাপও ছিল নচ্ছার। একবার কিছু টাকা দিয়ে একটা কেস করিয়ে নিয়ে বৃহস্পতিবার বাকিটা দিয়ে যাব বলে সেই যে কাটল আর দেখা নেই। ডিলটা ছিল অনেক বড়। অনেক দিন এটা মনে হলেই সাবেরের বুকের এক ইঞ্চি নিচে একটা চিড়িক দিয়ে জ্বলুনিটা হাতের দিকে ছড়িয়ে যেত। সেই বাপেরই তো ব্যাটা। কাঠ-কয়লার মতো রং, তায় আবার গাট্টাগোট্টা। কথায় বলে গাট্টা যত ন্যাটা তত। ব্যাটা পার্টিকে কী বোঝাচ্ছে কে জানে? অথচ কোটি টাকার মামলা। উপর-নীচসহ চাওয়া মাত্র টুয়েন্টি পারসেন্ট। তাতেই এত হ্যাঁচড়প্যাঁচড়। পুরো পেমেন্ট দিতে গেলে তো বাপধন ত্রিশ পার্সেন্ট রেটে একশ’ বিশ কোটি টাকার ধাক্কা। সোজা পথ দেখাচ্ছি ভালো লাগছে না?’ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমের রিভলভিং চেয়ার মোচড়াতে মোচড়াতে সাবের এতক্ষণ এই কথাই ভাবছিল। তার তলপেটের কোথায় যেন একটা চাপ চাপ ব্যথা। টাকার চিন্তা মাথায় এলেই আজকাল তার এটা হয়। বারোটায় কাঠ-কয়লাসহ পার্টির আসার কথা। ফাইনাল কথা হবে। এখন বারোটা পনেরো কিন্তু তাদের দেখা নেই। সময়টা বেশ খারাপ। আগের সেই রামও নেই রামরাজত্বও নেই। চেয়ারম্যান ব্যাটা এসেই শুদ্ধতা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা শুরু করেছে। কত দেখলাম। প্রথম প্রথম সবাই এমন করে। কয়েক দিন যাক বাপধন, তারপর সুড়সুড় করে সিস্টেমে ঢুকে যাবে। তখন ভার থাকলেও ধার থাকবে না। পুরান ফ্যানের মতো কেবল ঘ্যাঁটর ঘ্যাঁটর। আওয়াজ বেশি বাতাস কম। কী সময় গেছে তখন। ১/১১-এর ঠিক আগের বছর। তখন আপার সার্কেলে তার পোস্টিং। ফারিয়া কম্পজিটে কী সুন্দর ডিল হলো। সিল্ক স্মুথ। টপ টু বটম। মিডিয়া চেয়ারম্যান স্যারের ড্রাইভার। কোনো হাঙ্কিপাঙ্কি নেই। হইচই নেই। এলো আর গেল। সব ঠিকঠাক। এক লপ্তেই ধানমন্ডির লেক সাইডে ফ্ল্যাট। তখন অবশ্যি ফ্ল্যাটও খুব সস্তা। কত আর ত্রিশ লাখ টাকার ব্যাপার। এখন ফেলে ছড়িয়েও চার কোটি। তখন যদি বুদ্ধি করে আরও দুই চারটা রেখে দিত। এখন আফসোস হয়।

বানের জলের মতো টাকা আসছে মানুষের হাতে। কোথা থেকে আসছে মানুষ জানে না। গার্মেন্টস ব্যবসার পোয়াবারো। বাইরে থেকে সমানে টাকা পাঠাচ্ছে মানুষ। রিয়েল এস্টেটের রমরমা। চারদিকে ইট কাঠ বালুর তাল। ডেভেলপার কোম্পানির প্রজেক্টগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। শহরের চিপাচাপা কোনো জায়গায় বাদ নেই। জমির দাম হু হু করে বাড়ছে। নদীনালা খালবিল সব ভরাট। তৈরি হচ্ছে প্লট। এই চান্সে কত মানুষ যে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল কে বলবে। শত শত টাকার কারবার। মানুষের আর অভাব রইল না। ঢাকার আকাশে-বাতাসে টাকা ওড়ে। শুধু ধরতে জানলেই হলো।

কে জানতো ১/১১ আসবে। ব্যাটা যত নষ্টের মূল। আহ ওইটা একটা বিভীষিকা বটে। হায় হায় এক সকালে উঠে সব কিছু চেঞ্জ। দুই নেত্রী জেলে। আর্মির নিয়ন্ত্রণে সব। মাইনাস টু থিওরি। দুই নেত্রীই মাইনাস। জিরো টলারেন্স। তাবড় তাবড় রাঘববোয়াল টপাটপ জালে ধরা পড়ছে। পাতি মাঝারি ছোট সব তেলাপোকার মতো দিগি¦দিক পালাচ্ছে। সে এক দেখার মতো ব্যাপার। সাবেরেরও তখন কেঁচো অবস্থা। ত্রাহি মধুসূদন, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। মুখ চুন করে শারমিনকে বলেÑ ‘তোমাকে সব লিখে দিচ্ছি। প্রয়োজনে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যাও।’ শারমিন নিষ্ঠুরের মতো উত্তর দেয়Ñ ‘আহারে কত ঠেকা। তোমার দায় আমি নেব কেন? কেন নেব? কাভি নেহি।’ সাবেরের মাথায় আগুন চড়েÑ মনে মনে বকে, ‘আগে যখন বরের বিছানায় গলতে গলতে সব ছিনিয়ে নিতে, তখন ‘আহারে’ ছিল কোথায়? সব বেইমানের জাত।’ তবে ভাগ্য ভালো যে, খারাপ সময় বেশি দিন থাকে না। সাবের হোসেনের নাম আর্মির খাতায় উঠে গিয়েছিল প্রায়। অ্যারেস্ট হয় হয়। কিন্ত ততদিনে ১/১১ এর ধার কমে এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তখন ল্যাজেগোবরে আবস্থা। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। সাবের মাঝে মাঝে ১/১১-কে গাল দেয়। কী… তুলতে পারলি? এত সোজা না? সিস্টেম ইজ সিস্টেম। কত দিন ধরে তৈরি হয়। বললাম আর মুলার মতো পট করে তুলে ফেললাম। বললেই হলো। লেনিন পারল না, মাও সে-তুং পারল না আর তোরা? যত্তসব।

পিঙ্ক সিটির ডুপ্লেক্স বাড়িটা সদ্য কিনেছে সাবের। শারমিনের ভারি পছন্দ হয়েছে। মনের মতো করে সাজাচ্ছে। সাবেরও দিয়ে যাচ্ছে দেদার। বউ খুশ তো সব খুশ। ব্যস্ত থাকুক, ব্যস্ত থাকুক। কোনোদিকে যেন না তাকায়।  তাকাতে না পারে। সাবের তো টাকার পিছে দৌড়ায়। বউকে সময় দেবার সময় কোথায়? থাকুক টাকাপয়সা নিয়ে থাকুক। শাড়ি-গয়না নিয়ে থাকুক। অন্যদিকে তাকানোর সময় যেন না পায়। টাকাপয়সা ঢেলে দিয়ে রাখে সাবের। তা ছাড়া দিতেও তো ভালো লাগে। কার জন্য আর। ওদের জন্যই তো সব। সাবের গাড়ি বারান্দার নিচে থেকেই দেখতে পায় শারমিন ফুলের গাছে পানি দিচ্ছে। সন্ধ্যে হয় হয়। একটু একটু শীত পড়ছে। একটা হালকা কুয়াশার চাদর সামনের লনটার পিছনে দাঁড়িয়ে গেছে। ঘাসগুলোও একটু একটু ভেজা। পিঙ্ক সিটির এই এরিয়াটা কেমন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই সেদিনও এই জায়গা জলা ছিল। চারদিকে নিচু জমি আর পানি। বর্ষাকালে থই থই করত পানি। কিছু লোকাল গরিব মাছ ধরে গুলশান-বনানীর দিকে বিক্রি করত। ছোট ছোট ঘর তুলে থাকত জলাভূমির আইলে। মাদারবাড়ি থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত পুরো এলাকাটা অন্যান্য সময়ে দাম আর হেলেঞ্চায় ঢাকা থাকত। বর্ষায় শাপলা শালুক ফুটত দেদার। জেলেদের বাচ্চারা শাপলা তুলে তুলে মালা গাঁথত। খেলা শেষে রাস্তায় ফেলে যেত দু-একটা। শহর থেকে নির্জনে ঘুরতে আসা প্রেমিক যুগল রাস্তা থেকে তুলে নিত মাঝে মাঝে। শরতে খুব সুন্দর হয়ে যেত জায়গাটা। কাশফুলে ছেয়ে যেত মাইলের পর মাইল। এখনও দিয়াবাড়ির অনেকটা জায়গাই শরতে কাশ ফুলে ছেয়ে থাকে। কী যে সুন্দর দেখায়। কত মানুষ আসে এখানে একটু দম ফেলতে। তবে আর বেশি দিন নয়। মেট্রো স্টেশন হচ্ছে পাশে। এই সৌন্দর্য গেল বলে। প্রয়োজন খেয়ে ফেলছে সব। সৌন্দর্য, কমনীয়তা, মানবিকতা, সুবিবেচনা। সাবেরের খুব খারাপ লাগে। মানুষের এটা একটা মজার ব্যপার। নিজের বেলায় খেয়াল থাকে না। অন্যে করলে লাগে খুব। ভার্সিটিতে পড়ার সময় সাবের মাঝে মাঝে বান্ধবীদের নিয়ে আসত এদিকটায়। তখন এই ডুপ্লেক্সটার কথা চিন্তাও করা যেত না। কে জানত ঢাকা শহরটাই এমন ফুলে-ফেঁপে উঠবে? তখন দোতলা তিনতলা ছোট ছোট ঘরবাড়ি। কোনোরকম চলার মতো রাস্তাঘাট। আশির দশকের পর থেকেই একটা মফস্সল শহর ফুলে-ফেঁপে মেট্রোপলিটন শহর হয়ে গেল। মতিঝিল দিলখুশা হাইরাইজে ছেয়ে গেল। গুলশান বনানী বারিধারা তখন নতুন শহর। অভিজাত এলাকা। বিশাল বিশাল বাড়ির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে দেখতো সাবেররা। কোথা থেকে এই পয়সা আসছে। এরশাদের আমল থেকেই শুরু। এ ব্যাটা গুচ্ছের টাকা ঢালল ঢাকা শহরে রাস্তাঘাট বাঁধ নির্মাণে। কোটি কোটি টাকা বানিয়ে ছেড়েই দিল কিনা কে জানে। ওর পক্ষে সব সম্ভব। মানুষের হাতে টাকা এলো। বিদেশ যাওয়ার ধুম পড়ে গেল। যাদের পয়সা একটু বেশি তারা গেল ইতালি সুইডেন ফ্রান্স আমেরিকা। মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিকে সয়লাব। সাবেরও প্রায় বিমান থেকে নেমে এসেছিল। বাড়ি গেছে। দেখে বাড়ির অবস্থা ল্যাজেগোবরে। রফিকের তিন মাস বেতন বাকি, পড়া বাদ দিয়ে ঘরে বসে আছে। অঞ্জু বেণি দুলিয়ে ঘুরছে। মা কাজ করছে আর নাকের পানি চোখের পানি এক করছে। বাবার প্রতি অভিযোগের শেষ নেই। সাবের শুনতে পেল মিরাজ সৌদি আরব যাবে। সব ঠিকঠাক। সে গিয়ে ধরল আমাকেও নিয়ে চল দোস্ত। দালালকে চেপে ধরল। মিরাজও খুব খুশি দুই বন্ধু একসাথে যাবে। পাসপোর্ট টাসপোর্ট দিয়ে তাদের প্লেনে তুলে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পরে দেখে কক্সবাজার বিমানবন্দরে নামছে। এদিকে দালাল মিয়া লাপাত্তা। মহাজনের গদি থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। অনেকদিন মহাজনের লাল চোখ সাবেরের মাথায় বন বন করে ঘুরত। ঘুমের মধ্যে কত দিন মহাজনের তাড়া খেয়েছে তার ঠিক নেই। তারপর বছরখানেক সাবের আর বাড়িমুখো হয়নি।

সাবের আস্তে আস্তে উঠে এলো দোতলার গাড়িবারান্দায়। পেছন থেকে দেখল পশ্চিমের এক ফালি রোদ শারমিনের ত্বক আর চুল নিয়ে খেলছে। কী সুন্দর লাগছে শারমিনকে। আজ সাবের একটু তাড়াতাড়ি ফিরেছে। এত তাড়াতাড়ি সাধারণত ফেরে না। কত কাঠখড় পুড়িয়েই না উত্তরা ক্লাবের সদস্য হলো সেদিন। এখানে পোস্টিং হওয়ার পর থেকে ক্লাবের ফাইলটা খুঁজছিল সাবের। পেলো আইটি সেকশনে। কিছুই দেখানো নেই ফাইলে। মওকা পেল হাতের কাছেই। বড়শির ল্যাজ লাগিয়ে ক্লাবের উকিল আর বড়কর্তাকে টেনে আনল। মেম্বারশিপের বড় আক্রা এখন। নয় নয় করেও ত্রিশ-চল্লিশ লাখ টাকায় বিকোয়। সাবেরের জন্য আর দাম কী। প্যাঁচেই উঠে এলো মেম্বারশিপ। তারপর থেকে বেয়ারার চেক হয়ে গুলশান ক্লাবের পরিবর্তে উত্তরা ক্লাব হলো তার মেইন ঠেক। জনা চার ইয়ার আর মেহের ঠেকের সঙ্গী। মেহের একটা জিনিস বটে। ইন্সপেক্টর হয়ে ঢুকেছিল। ঘষটাতে ঘষটাতে উপ পর্যন্ত হয়েছে। চাকরি আর বেশিদিন  নেই। ব্যাটা একজন ঘাগু। দুই নম্বরি লাইসেন্স, টাকা পাচার, হাত সাফাই, বদলি, তদবির- কোনো কিছুই কোনো ব্যাপার না। অসম্ভব কথাটা তার ডিকশনারিতেই নেই। শালা টানেও বটে। এমন রত্ন না পেলে কি জমে? তাই প্রায়ই রাত হয়ে যায় ফিরতে। তারপর নিত্যনতুন সুন্দরী সঙ্গী ওটাও সেরে আসে। আজকাল পয়সার এমন কদর। ভালো ঘরের মেয়েরাও। শুধু পয়সা ছড়ালেই চলে। সাবেরের আবার একটা গুণ ভালো। ভালো তাল সামলায়। বাসায় যখন ফেরে, সব ঠিকঠাক। সুন্দরী বউ সেও ম্যানেজ হয়ে যায়। আর হবে নাই-বা কেন, আজ যে শারমিনের গায়ে তেল পিছলায় তা কি এমনই? কী ছিল শারমিন- লম্বা ঢ্যাঙা। মফস্সলের মেয়ে। তবে রঙটা বেশ খোলতাই ছিল এই যা। সবই টাকা, টাকা। টাকার গুণে কাঠের পুতলাও বদলায়।

বিয়ের ক্ষেত্রে প্রায় ধরাই খেয়ে গিয়েছিল সাবের। ইউনিভার্সিটির ফাইনাল ইয়ারে তখন বান্ধবীদের পয়সায় বেশ চলছিল। দুই-তিনজনকে সমানে ম্যানেজ করা কোনো ব্যাপার না। সাবের দেখতে শুনতে ভালো। স্মার্ট। গানের গলাটাও বেশ। কবিতা-টবিতা লেখে। ডাকসুর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একবার স্বরচিত কবিতা পড়ে প্রথম হয়ে গেল। মেডেল ফেডেলও পেলো। নিরু বেলি ফেন্সি তার প্রেমে পাগল। কাউকেই নিষেধ করে না, সবাইকে সে লাইন দিয়ে রাখে। কখন কাকে কাজে লাগে কে জানে। চা-নাশতা-দুপুরের খাবার জীবনে কোনটা না হলে চলে? ওদের পয়সায় ভালোই চলছিল ওসব।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কবিতা উৎসব। বন্ধু লিমনের সাথে গেল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। লিমনের বোন শারমিন তখন রঙিন শাড়ি পরে বেণি দুলিয়ে কলেজে যায়। গানটান গায়। ছাদে চাঁদের আলোয় ছাদে গান শোনালো একদিন। লিমনের আর দুই-একজন বন্ধুবান্ধবও ছিল। শারমিন সাবের পাশাপাশি বসে। হাতে হাত ছুঁয়ে যাচ্ছিল বার বার। শারমিন তখন গলন্তপ্রায়। সাবের চালু মাল। সাবধানে খেলছিল। শেষ রক্ষা হয়নি যদিও। পাকে প্রকারে ওই ঢেঙা মেয়েকেই ঘরে তুলতে হয়েছিল। সে অবশ্যি অনেক পরের কথা।

দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই শারমিনের ঠোঁটের কোণের জোনাকি-তিলসহ বাঁকা হাসিটি আজ তাকে কাবু করে ফেলল। শারমিনকে দেখলে কে বলবে বড় বড় দুই ছেলের মা। সরু কোমর উন্নত স্তন। একটু টিলকায়নি। মাখন মসৃণ ত্বক। হবে নাই-বা কেন? তার পেছনে ফি মাস কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা লগ্নি হয়। পার্লার, জিম, কসমেটিকস, হারবাল, কথায় কথায় শপিং কত কী। এমনি কি আর ওসব হয়? তা হোক। সামনে দিয়ে নড়েচড়ে। জিল্লা না ছড়ালে কেমনে? টাকা কিসের জন্য?

মুস্তাক এসেছিল নাকি আজ? একটা ব্রিফকেস দিয়ে যাওয়ার কথা। আসেনি? শারমিনকে নিজের ব্রিফকেসটা দিতে দিতে বলে সাবের।

‘না তো’Ñ সাবেরের হাত থেকে ব্রিফকেসটা নিতে নিতে শারমিন বলল।

সাবেরের দুই ভ্রুর মাঝখানে চিলতে একটা চিন্তা খেলে গেল। কেসটার কিছু হলো না বোধ হয়। হলে তো এতক্ষণে মুস্তাকের এসে যাওয়ার কথা। মুস্তাক খুবই বিশ^স্ত। ড্রইংরুমের ফ্যানটা ছেড়ে টাই-জুতা খুলতে খুলতে উল্টো দিকের বন্ধ দরজায় চোখ রেখে বলল সাবের ‘ওরা কোথায়?’

‘ওরা কি বাসায় থাকে? একজন গেছে গাজীপুর রাতুলদের বাগানবাড়িতে। রাতে ফিরবে না। আরেকজনের গানের রেকর্ডিং আছে। ফিরতে রাত হবে। সামনে পরীক্ষা তার কোনো খবর আছে?’ ছেলেদের নিয়ে শারমিনের অভিযোগের শেষ নেই। তাদের দুটো ছেলেÑ আরমান ও ইশরাক। আরমান এ লেভেল পরীক্ষা দিয়েছে গতবার। দুই বিষয়ে ফেল। এবার আবার পরীক্ষা দেবে। আশরাক ও-লেভেলের ছাত্র। আজকালকার ছেলেমেয়েরা কেমন যেন বেপরোয়াÑ বাপ-মায়ের ধার ধারে না। যার যা খুশি করছে। সাবেরের বাম পাশটায় কেমন একটা ধাক্কা লাগল। একদলা রক্ত যেন ধক করে সরে গেল। মানুষ হবে তো? ছেলেগুলোকে কিছুতেই হাতের মুঠোয় ধরে রাখা যাচ্ছে না। কেমন পিছলে পিছলে যাচ্ছে। দূর নক্ষত্রের তারা যেন একেকজন। যোজন যোজন দূর থেকে কথা বলতে হয়। সামনের দরজাটা সব সময় বন্ধ। কখনও সামান্য একটু খুললেও অপরিচিতের ধাক্কা এসে লাগে। বন্ধ দরজার ওপারে কী হচ্ছে, ভালো না খারাপ, ভালো না খারাপÑ ভাবতে ভাবতে শারমিনের কথাগুলো আর কানে যাচ্ছিল না। সাবের কায়মনো বাক্যে প্রার্থনা করেÑ ‘হে আল্লাহ ছেলেগুলোকে মানুষ করো।’ তার বাবাও কি চায়নি সে মানুষ হোক? হয়েছে কি? হয়নি কি? সে কেমন ধন্দে পড়ে যায়। বাবাকে সে ভালোবাসে। আর দশটা ছেলের চেয়ে অনেক বেশিই ভালোবাসে। সে জানে না প্রতিবন্ধকতা থেকেই কি এই অফুরন্ত অতৃপ্ত ভালোবাসার জন্ম? যতবার বাবার কথা মনে আসে, ততবার তার চোখে পানি চলে আসে। বাবার পরিবারকে টেনে তোলার জন্য তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না কোনোদিন। কিন্তু বাবা যদি সেই সুযোগ তাকে না দেন, তবে তার কী করার আছে? মনে মনে বাবার ওপর রাগ হয়। আজকে সে যা তার কিছু দায় কি তারও নেই? তিনি কি অস্বীকার করতে পারবেন সেইÑ ‘নেই আখড়ায় খেই ধরতেই’ আজকের এই সাবের? শুরুতে কি সে এমন ছিল? আর দশটা বালকের মতোই তো তার জন্ম। তেমনি ইনোসেন্ট। পারলে আজকেই সাবের নিজেকে পাল্টে ফেলে কিন্তু আর কি সম্ভব? অনেক দূর চলে এসেছে, অনেক পানি গড়িয়ে গেছে, অনেক সময় চলে গেছে। এখন আর সময় নেই, উপায়ও নেই, এখন শুধু সামনে এগিয়ে চলা, নিজেকে নিয়তির হাতে ছেড়ে দেওয়া। খুব অসহায় লাগে সাবেরের। ঠিক ছোটবেলার মতো। ছোটবেলায় ভয় পেলে যেমন বাবার কাছে ছুটে যেত, তেমন করে ছুটে যেতে ইচ্ছা করে। মনে হয় আগের মতো বাবা তাকে তার লুঙ্গির মধ্যে পেঁচিয়ে নিক; কিন্তু সে আর হবার নয়। সাবেরের খুব অসহায় লাগে। সে যে কোনো একটা অবলম্বনের জন্য সে এদিক ওদিক তাকায়। কিন্তু কিছুই খুঁজে পায় না। সাবের আগে যা কখনও করেনি তাই করে হাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সামান্য সময়ের জন্য মাত্র। অল্পতেই নিজেকে সামলে নেয়। ভাগ্যিস শারমিন সামনে নেই। তার জামাকাপড় রাখতে গেছে। শারমিন দেখলে অবাক হয়ে যেত। তাদের জীবনে বটগাছের মতো এই লোকটার এই অসহায় রূপ আগে সে কখনও দেখেনি। সাবের তাই মনে করে। মানুষ তার অনাকাক্সিক্ষত কাজকে সব সময় একটা আবরণে ঢেকে রাখতে চায়। অন্তত ঢেকে আছে ভাবতে ভালোবাসে। মনে করে তার কাজ কেউ দেখছে না। অথচ সবাই সব কিছু দেখে, জানে। জানায় না যদিও সব সময়। সাবের আর তার বাবার সম্পর্কের জটিলতা শারমিনও জানে। না জানার কোনো কারণ নেই। সে বুদ্ধিমান মেয়ে। কিন্তু তা নিয়ে কোনো কথা সে বলে না। কারণ জানে এই প্যাঁচ সে খুলতে পারবে না। ইগো বড় কঠিন জিনিস। সেখানে হস্তক্ষেপ করে কার সাধ্য? শারমিন তাই চেষ্টাও করে না।

এতক্ষণে সাবেরের মনে হলো মুস্তাক আসছে না কেন? আসছে না কেন? কিছু কী হলো? কেউ কি জানিয়ে দিল? কোনো বিপদ? হাত পা মৃদু মৃদু কাঁপতে লাগল সাবেরের। ঘাম দিল শরীরে। ফোন করাও ঠিক হবে না। এসব কথা ফোনে চলে না।

এমন সময় বেলটা বাজল। নিশ্চয় মুস্তাক। ঠিক তাই।

‘স্লামালায়কুম স্যার’।

‘হু’

‘কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি তো?’

‘না স্যার।’

সাবের তাড়াতাড়ি ব্রিফকেসটা হাতে নিয়ে চোখের ইশারায় মুস্তাককে বিদায় দিল। ঝটিতি ব্রিফকেসটা বেডরুমের খাটের নিচে চালান করে দিল।

শারমিন দেখেও না দেখার ভান করে। দৃশটাতে সে অভ্যস্ত। এর পরিণতি ভেবে মাঝে মাঝে ভয় লাগে; কিন্তু প্রতিকারের কথা ভাবতেও ভালো লাগে না। চলছে চলুক না। তার কী দায়।

রাগটা পিড়পিড় করে মাথায় উঠে ডান পাশে ঠিক ভ্রুর ওপর টিকটিক করে বাজতে লাগল।



বাবা আসবেন না। হার্টের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন বেশ কিছুদিন। রফিক বলছিল শ্বাসকষ্টও আছে সাথে। ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন। তবু ঢাকায় আসবেন না। সাবেরের টাকায় কোনো চিকিৎসা নেবেন না। সাবের রফিককে বলেছিল বুঝিয়ে শুনিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসতে। সোজা না করে দিয়েছেন। রফিকের দুই কামরার ঘরে পার্টিশন দিয়ে পড়ে থাকবেন; তবু আসবেন না। রফিক ওয়ালটনে ছোট একটা চাকরি করে। সেলস ম্যানেজার। সাবেরই ওয়ালটনের ফাইল টেনে রফিককে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। যেখানে ঢুকিয়েছিল, সেখানেই আছে আজীবন। তার উন্নতি হয়নি। কী করে হবে। কষ্ট করার চেয়ে সাবেরের টাকার দিকে তাকিয়ে থাকা ঢের সহজ। সাবেরকে সংসারের ছুঁতানাতা জানানো তার একটা কাজ। সেখান থেকে তার প্রাপ্তিযোগ খারাপ না। চলে যায়। এই ব্যাপারে মায়েরও সায় থাকে সব সময়। মা মনে করেন বড় ছেলে হিসেবে সাবেরের সাথেই তাদের থাকার কথা। ভাগ্যের ফেরে যেহেতু রফিকের সাথেই তাদের থাকতে হচ্ছে, ছুঁতায় নাতায় তাকে সাহায্য করাও তাঁর একটা দায়িত্ব। তাই তিনি যে কোনো সুবিধা-অসুবিধা সাবেরকে জানাতে ভোলেন না। ফোন করেই বলেন ‘বাবা সাবের তুমি তো জানো’ …সাবের হেসে দেয়, সে জানে না কী? সব জানে। মায়ের এসব ভণিতা সে উপভোগ করে। বাবাকে সরাসরি কিছু করতে না পেরে এভাবেও কিছু করতে পেরে সাবের খুশি। কিন্তু তারপরও কোথায় যেন একটা অতৃপ্তি। রফিকের ছেলেমেয়ে নিয়ে কষ্টেসৃষ্টের সংসার। সেখানেই বাবা-মা পড়ে আছেন, অথচ কত আদরের সন্তান সে রফিক হওয়ার দুই বছরের আগে সাবের হলো। কী খুশি। দুই মেয়ের পর এক ছেলে। তাও আবার চাঁদের মতো ছেলে। সেই আক্রার সময়ও দশ-বারো কেজি মিষ্টি পাড়া-প্রতিবেশীকে বিলিয়েছিলেন বাবা। যখন সাবেরের বিসিএস হলো, কিছু দুর্নাম আছেÑ সেই ক্যাডারের বাবার মুখে খুশির সাথে একটা কালো ছায়া। তিনি বললেন ‘দেখো বাবা ভালো-মন্দ সব জায়গায়ই আছে। তবে খারাপ জায়গায় ভালো থাকা কঠিন। তবে থাকতে পারলে অমৃত মেলে। আর যদি মনুষ্যত্ব বিসর্জন দাও, তবে আর মানুষ নাম ধারণ করা কেন?’





সাবের ইঙ্গিতটি কি আর বোঝেনি? বুঝেছিল ঠিকই। তার জন্য প্রথম প্রথম কম সংগ্রাম তো করেনি। দিনের পর দিন সংগ্রাম করেছে অসুর শক্তির বিরুদ্ধে। তখন সে আবুজর গিফারি কলেজের লেকচারার। দুই রুমের একটা তিন ঘরের সংসার। সম্পত্তি বলতে কিছু হাঁড়িকুড়ি, একটা তোশক আর একটা মশারি। বজ্জাত মশাগুলা মাঝে মাঝে প্রেম পর্বে ঢুকে যেত। চরম মুহূর্তে ওদের হুল ফোটানো চাই-ই চাই। আরমান এলো কিছুদিন পর।

শারমিন তরকারি কাটাকুটি করে ঘরের কোণের মিটসেফের তলে গুঁজে দিল। অন্য ভাড়াটেদের সাথে রান্নাঘর ভাগাভাগি করতে হয়। দিপুর মার রান্না প্রায় শেষ হয়ে এলো। ক্লাস থেকে দিপু এখনই এসে পড়বে। সে ক্লাস ফোরে পড়ে। তার রাজ্যের খিধে এসেই খাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যাবে। তাই দিপুর মা-ই আগে রান্না করে। শারমিন বঁটিটা রেখে উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে চোখ ঘোলা হয়ে গেল। উপরের ফ্যান, জানালা, বিছানার চাদর সব কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুরতে লাগল। শারমিন সামলাতে পারল না। কোনো কিছু ধরতে না ধরতেই ধড়াম করে নিচে পড়ে গেল। সাবের বারান্দায় বসে পেপার পড়ছিল। আজ ছুটির দিন বলে অফিসে যাওয়ার তাড়া নেই। এইমাত্র বাজার করে এসেছে। আজকাল বাজারের যা হাল। এত দাম সবকিছুর। কোনোটাতেই হাত দেওয়া যায় না। টাকা যেন তেজপাতা। ষোলো শ’ পঞ্চাশ টাকা টিপে টিপেও আধা মাস যায় না। তারপর দিনগুলোকে রাবারের মতো টেনে টেনে পনেরো তারিখকে ত্রিশ তারিখের সাথে মিলানো সে এক প্রাণান্ত চেষ্টা। শারমিনের আবস্থা খুব ভালো ঠেকছে না। কেমন ওয়াক ওয়াক করে সারা দিন। আরেকজন চলে এলো নাকি? সাবের আতঙ্ক বোধ করে। বারান্দায় বসেই সে ধপ শব্দটা শুনতে পায়। ছুটে এসে দেখে শারমিন মেঝেয় পড়ে আছে। সাবের বুঝে গেল যা ভাবছিল তাই। শারমিনকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিতেই সে এই প্রথম খেয়াল করল শারমিন একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এতদিন খেয়ালই করেনি যে বাইন মাছের মতো জ্বলজ্বলে চোখ রক্তশূন্য টাটকিনি মাছের মতো চেয়ে থাকে। রাতের বিছানাতে ওকে খুঁঁজেই পাওয়া যায় না আজকাল। কী আর করা। ষোল শ’ টাকার মধ্যে সংসার খরচ কুলিয়ে বাড়িতেও পাঠাতে হয় কিছু। বাবা এই টাকাটার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকেন। তখন পর্যন্ত সাবেরের টাকা নেওয়া বন্ধ করেননি। রিটায়ার করেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। চার ছেলে মেয়ে এখনও মানুষ করা বাকি। শারমিনের এই আবস্থায় ভাল মন্দ খাওয়াবে কোথা থেকে? ইংরেজিতে ভালো বলে তাও দু-একটা টিউশনি করে চালিয়ে নিচ্ছে।

 ডাক্তার সাবেরকে ডেকে নিয়ে বললেন- ‘বাচ্চা উপরে উঠে আছে। সিজার লাগবে। এখনই ভর্তি করে দিন।’

‘সিজার?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ সিজার।’

সাবেরের মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেল। ডাক্তার কী বলছেন কিছু তার কানে যাচ্ছে না। সে ধরেই নিয়েছিল নরমাল বেবি হবে। ‘শারমিন ছটফট করছে আর তাকে গালি দিচ্ছে, সাবের লেবার রুমে ঢুকে যেতে চাচ্ছে, নার্স আর ডাক্তার তাকে গালি দিয়ে দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে’Ñ এমন একটা সিন তার কল্পনায় ছিল। সিজারিয়ান ব্যাপারটা তার কল্পনায়ই ছিল না তাই জিনিসটাকে সে যেন ঠিক ধরতে পারছে নাÑ একটা পিচ্ছিল জিনিসের মতো পিছলে পিছলে যাচ্ছে।

রাত সারে নয়টায় আরমান হলো। সিজারিয়ান। তখনও ওর নাম আরমান হয়নি। নাদুসনুদুস গোলগাল। একেবারে ফর্সা অক্ষত। সাবের ভেবেই পেল না হাড় জিরজিরে শারমিনের পেটে এত সুন্দর বাচ্চা কী করে হলো। শেষের দিকে শারমিনের পেটটা ছাড়া আর কিছুই দেখা যেত না। আগে কখনও সিজারিয়ান বেবি দেখেনি সাবের। ওর মায়ের সব বাচ্চাই হয়েছে ঘরে। ধাই আসতো। পাড়া-প্রতিবেশী খালাম্মারা আসতেন। একটা ঘরের মধ্যে ছেঁড়া কাপড়, ওয়াল ক্লথ, ব্লেড, গরম পানি, হাসহাস ফিসফিস, নারীদের চাপা পায়ে আসা-যাওয়া। সব মিলিয়ে এক গুমোট পরিবেশ। সাবেরের ভীষণ লজ্জা করত। দুই তিন দিনের জন্য সে কোনো বন্ধুর বাসায় হাওয়া হয়ে যেত। পরিবেশ স্বাভাবিক হলে ফিরে আসত। ফিরে এসে অবশ্যি অন্য রকম লাগত। ছোট একটা ভাই বা বোন। একটা পরিবর্তন। তরঙ্গহীন জীবনে একটু তরঙ্গের ছোঁয়া। একটু অন্যরকম কিছু। অথচ তার ছেলে কেমন রাজার মতো এলো। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না এটা তার ছেলে। হঠাৎ বাবার মুখটা মনে পড়ল। এই সেই বাবা। বাবার অনুভূতি যেন কিছু কিছু ধরতে পারছে সে। মনের কোনায় কোনায় বাবার দুঃখ কষ্ট হতাশা আনন্দ বেদনা একত্রে জমা হয়ে পাতলা টিনের মতো কেঁপে কেঁপে তার একান্ত অনুভূতিগুলোকে একটু একটু নাড়া দিয়ে জাগিয়ে তুলছে। হালকা একটা ব্যথা সাপের খোলসের মতো মনের কোথায় জড়িয়ে আছে। বাবাকে খুব আপন আর কাছের মনে হলো। ভাবল এখনই আব্বাকে ফোন করে খুশির খবরটা জানাতে হবে। তখনই একজন নার্স সাবেরকে একটা বিল ধরিয়ে দিল। বারো হাজার টাকা।  সে যেন চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার কাছে আছে মাত্র এক হাজার পঞ্চাশ টাকা। সে জানত সিজারিয়ানে একটু বেশি টাকা লাগবে; কিন্তু এত টাকা তা তার ধারণার বাইরে ছিল। কোথায় পাবে এত টাকা। কার কাছে চাইবে? সব কিছু কেমন অন্ধকার লাগছে। বিধাতা কেন যে মানুষ সৃষ্টি করে এমন একটা সংগ্রামের মধ্যে ফেলে দেন? তারপর কামড়া-কামড়ি কর, মারামারি কর, জোর করে টিকে থাক। কোনো মানে হয়? হঠাৎ সাবেরের চোখ কুণ্ডুলী পাকানো কাঁথা কাপড়ের ওপর গিয়ে পড়ল। সেখানে তুলতুলে ফর্সা মুখের ওপর ছোট্ট উজ্জ্বল দুটো চোখ আলো খুঁজছে। সাবের বুঝে পায় না ওই চোখ দুটোর সামনে এখন কি শুধুই অন্ধকার? এই রাজপুত্রের মতো ছেলেটা তিল তিল অন্ধকার কষ্টের মধ্য দিয়ে কতদূর আর যেতে পারবে? তার ভেতরের সমস্ত সম্ভবনা কি শুধু সুযোগের অভাবে নষ্ট হয়ে যাবে না? বাবার ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারাটা চোখের ওপর ভেসে ওঠে সাবেরের। নিবিড় অবচেতনের ভেতর থেকে জোরে মাথা নেড়ে বলে ওঠে সাবেরÑ ‘না কিছুতেই না। আমার পথ আর বাবার পথ এক হবে না।’ শারমিন জিজ্ঞেস করল ‘কী, কিছু বলছ?’ সাবের চেতনায় ফিরে লজ্জা পেল। শারমিনের চোখে তাকিয়ে হেসে বললÑ

‘না কিছু না।’

তবে তার প্রতিজ্ঞাটা ভেতরে ভেতরে খেলা করতে লাগল। সে খেয়াল করল নাকের গোড়া থেকে একটা চিন চিন ব্যথা আস্তে আস্তে মাথার ডান পাশ দিয়ে লতিয়ে উঠছে। সে যখন কোনো প্রতিজ্ঞা করে বা জিদ করে, এই চিনচিনে ব্যথাটা টিকটিক করে বাজতে থাকে।

শারমিনকে হাসপাতালে ভর্তি করে সাবের সাত দিন ছুটি নিয়েছিল। তিন দিনের দিন আরমান হলো। ছুটির আরও চার দিন বাকি। তার পরও পরের দিন সাবের অফিসে গেল। সে তার রুমে চোখমুখ আন্ধকার করে বসে আছে। একরাশ চিন্তা তার কপালে। ক্ষণে ক্ষণে শারমিন আর ছোট বাচ্চাটার কথা মনে পড়ছে। খুব অসহায় লাগছে নিজেকে। ঢাকা শহরে তার এমন একজনও নেই যার কাছে এতগুলো টাকা ধার চাওয়া যায়। কান্নার একটা দলা তার কণ্ঠার কাছে এসে আটকে আছে। এমন সময় তার সুপারভাইজার দরজা খুলে একবার উঁকি দিল। একটু পর সে একটা ফাইল নিয়ে এসে উপস্থিত। ‘স্যার এইটাতে সই করেন।’ সাবের অবাক হয়ে বললে ‘আমি তো ছুটিতে।’ ‘আজ থেকে আপনার ছুটি ক্যান্সল।’ সাবেরের সুপারভাইজার আরিফ সাহেব বয়স্ক লোক। ভারিক্কি সবজান্তা। কোন কিছুই তাকে বলে দিতে হয় না। সব যেন আগে থেকেই জানে। ছেলেমানুষ বসকে ঠিক বস হিসেবে ট্রিট করে না। পিতৃসুলভ স্নেহে আগলে রাখে। দীর্ঘ চাকরি জীবনে কত রকম বস পার করল। সেই সমস্ত অভিজ্ঞতা তার চলনে বলনে অবয়বে। সাবের ফাইলটা সই করে সরাতে গিয়ে দেখে তার নিচে একটা হলুদ খাম। সে প্রশ্নবোধক চোখে আরিফ সাহেবের দিকে তাকায়। তার চোখের তারায় বিস্ময়। আরিফ সাহেব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে ‘স্যার বিশ আছে। আগে তো আপনার বাচ্চাটাকে বাঁচান আপনি বাঁচুন তারপর অন্য কথা।’ আরিফ সাহেব ফাইলটা তুলে নিয়ে পান চিবাতে চিবাতে চলে গেলেন। সাবের খামটা হাতে নিয়ে বিব্রত ভঙ্গিতে বসে রইল। এখন সে ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। হাসপাতালের বিলটা তখনও তার পকেটে উষ্ণ হয়ে আছে। সাবের একবার পকেটে হাত দিল। নিরুপায় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। তারপর আবার অসহায় ভঙ্গিতে বসে পড়ল। বাবার মুখটা একবার মনে পড়ল তারপর সেই কচিমুখটা। সাবের খামটা পকেটে পুরে হাসপাতালের দিকে রওনা দিল। এবার আর রিকশা নিল না। একটা সিএনজি নিল যেন হাসপাতালে উড়ে যেতে পারে। সিএনজিতে বসে বিবেকের দংশনের সাথে পরিত্রাণের আরামও লাগতে লাগল তার। আরামে না ক্লান্তিতে কে জানে এক সময় চোখ বুজে এলো সাবেরের। হুঁশ ফিরল ড্রাইভারের ডাকেÑ ‘স্যার এসে গেছি।’ চোখ খুলে সাবেরের এত খুশি লাগতে লাগল যে, দুইশ’ পঁচিশ টাকা ভাড়ার জায়গায় তিনশ’ টাকা দিয়ে দিল। ড্রাইভার ভাংতি দিতে গেলে চোখের ইশারায় রেখে দিতে বলল। পকেট আজ তার গরম। আহ কী আরাম। টাকার আরাম। এত আরাম  সে অনেক দিন বোধ করেনি। খুশিতে সে ড্রাইভারের সাথেই প্রায় হ্যান্ডসেক করে ফেলে।

মুত্তালেব সাহেব দূর থেকে দেখলেন টয়োটা করোলা গাড়িটা বড় রাস্তা থেকে মোড় ঘুরে পাউন্নার দোকানের পাশ দিয়ে বাসার দরজায় এসে থামল। তিনি বুঝলেন সাবেরের এবারের আসার উদ্দেশ্য গ্রামে প্রাসাদ নির্মাণ। বেশ কিছুদিন থেকেই ইট কাঠ বালুর স্তূপ জমছিল বাড়িতে। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে মানুষ দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করছিল- কী হবে এখানে। একটা মচ্ছব, কিছু হবে মুত্তালেব সাহেব বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু সরাসরি ছেলেকে তিনি কখনও কিছু জিজ্ঞেস করেন না বলে সঠিক কিছু জানেন না; তাই স্পষ্ট করে কোনো উত্তর দিতে পারেননি। আগে সাবের কিছু একটা করতে গেলে মুত্তালেব সাহেবের সাথে আলাপ করতে চেষ্টা করত কিন্তু মুত্তালেব সাহেবের অনুচ্চারিত বিরক্তি ও অনীহা সেই চেষ্টায় সে ইদানীং ইস্তফা দিয়েছে। মায়ের সাথে নিশ্চয় আলাপ করে কিন্তু বাবা এসব পছন্দ করেন না বলে মাও তার কাছ থেকে লুকায়। রোকেয়াকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘কি গো তোমার বড়লোক ছেলের এবারের মতলবটা কী?’ রোকেয়া ঝাঁজিয়ে উঠেছিল- ‘আমি কী করে জানব। তোমার ছেলেকে তুমি নিজে জিজ্ঞেস করতে পারো না? আর যদি কিছু করোই সবার ভালোর জন্যই করবে। তোমার সব সময় নখরামি।’ সাবের গাড়ি ছেড়ে বারান্দায় উঠে এলো। তিনি দেখেও না দেখার ভান করলেন। সাকসেসফুল ছেলে বাসায় এলে একজন সফল বাবার যে রকম গর্ব হওয়ার কথা, তার কিছুই হচ্ছে না। কেমন একটা বিতৃষ্ণা মনটা দখল করে নিয়েছে। কেন তার এমন হয় তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না। বর্তমান যুগে কত মানুষের ছেলেই কতরকমভাবে বড়লোক হচ্ছে। ন্যায়-অন্যায় এখন আর কে দেখে। গর্ব করে বলে আমার ছেলে এখানে বাড়ি করেছে, গাড়ি করেছে। কীভাবে করেছে তা কোন বিষয় নয়। ছেলেমেয়েরা কষ্টহীনভাবে বেঁচে আছে এতে যেন তাদের আনন্দ। নিজের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা জীবনটা ছেলেমেয়ের মধ্যে না দেখতে পেয়েই স্বস্তি। এত খুঁটিয়ে দেখার কী দরকার? কিন্তু মুত্তালেব সাহেব বুঝে পান না একটা নীতি-নৈতিকতাহীন জীবন নিয়ে মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকতে পারে?

সাবের বাবাকে সালাম করে জিজ্ঞেস করলÑ ‘কেমন আছেন আব্বা।’ মুত্তালেব সাহেব সংক্ষেপে জবাব দিলেন ‘ভালো’। কিন্তু পত্রিকা থেকে চোখ তুললেন না। বাবার দিকে সরাসরি চাইতে সাবেরেরও কেমন লজ্জা করল। মায়ের সাথে সাবের অনেক সহজ। মায়ের এমন কোনো ইনহিবিসন নেই। তিনি কষ্টে কষ্টে জীবন থেকে শিখেছেন অনেক। তিনি জানেন যা প্রয়োজন তা প্রয়োজনই। কেউ তা হাতে তুলে দেবে না। কায়দা-কৌশল করে নিজেকেই জোগাড় করে নিতে হবে। তিনি ভীষণ বাস্তববাদী। এই জন্য বাবার সাথে কোনোদিনই তার বনিবনা হলো না।

 আসার সাথে সাথেই নাতিরা দাদিকে জড়িয়ে ধরেছে। শারমিন ভেতরে গিয়ে দেবর-ননদের সাথে জমিয়ে ফেলেছে। ঢাকা থেকে নেওয়া কাপড়চোপড় দেখছে সবাই মিলে। শারমিন খুব বুদ্ধি রেখে চলে। সে জানে তার তো কোনো অভাব নেই, একটু ছড়ালে ছিটালে ক্ষতি কী? এতে দেবর-ননদগুলো তার বশংবদ হয়ে থাকবে। তাছাড়া সবাইকে নিয়ে চলার মধ্যে একধরনের আনন্দ আছে না? সে বুঝেছিল তাদের মানুষ করতে কয়েক বছর মাত্র কষ্ট। তা না হলে সারাজীবনই টানতে হবে। সারাজীবনই কষ্ট। মেয়ে জীবনে তার এক ভাইয়ের বউ দিয়ে ওরা বেশ কষ্ট পেয়েছিল। সেই কষ্টটাও মনে থেকে গেছে। সব মিলিয়ে সে সবার সাথে মিলে থাকতে চায়। বাড়ি যাবার কথা হলে সেই সবার আগে লাফায়। সমান সমান দেবর ননদদের সাথে তাই তার খুব খাতির। তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। ননদগুলোকে মোটামুটি বিয়ে দিয়েছে। একমাত্র দেবর রফিককে ওয়ালটনে ঢুকিয়ে দিয়েছে সাবের। সে বিয়ে করেছে। তার এক ছেলে এক মেয়ে। থাকে মানিকগঞ্জ শহরের কাছে দুই কামরার একটা ভাড়া বাসায়। ওরা আজকে বাড়িতে আসবে বলে ভাই বোনেরা সব একত্রিত হয়েছে। কিন্তু ইদানীং শারমিন বুঝতে পারছে এই অবস্থা আর বেশিদিন টিকবে না। যেদিন থেকে সাবের টাকা ধরতে শুরু করেছে, সেদিন থেকেই এই সম্পর্কের আলগা হওয়া শুরু এবং বাড়িতে দালান করা শুরু করা থেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম। শ^শুর মশাই বিষয়টাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। তার যুগ যে আর নেই, সেটা তাঁকে বোঝায় কার সাধ্য। সময় তার নিজের গতিতে চলবে থামাবে কে? শাশুড়িকে তাই তার ভালো লাগে, কত প্রাক্টিক্যাল। জীবনটাকে উনি দেখেন সহজভাবে। সংসারে কোনো অভাব-অনটন থাকবে না, হাসবেন খেলবেন জীবনটা চলে যাবে। এত জটিলতার কী আছে? এ জন্য মাকে সবাই এত ভালোবাসে। শুধু ছেলেমেয়েরাই নয়। পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধব গরিব আত্মীয়স্বজন সবাই। সাবেরের পয়সা হওয়ার পর এই যে হাত খুলে তিনি দান-খয়রাত করতে পারছেন তাতেই তিনি খুশি।

খাওয়া-দাওয়ার পরপরই সাবের ঠিক করল রওনা দেবে। তার আগে কন্ট্রাক্টর ও মিস্ত্রির সাথে বসে কীভাবে কাজ শুরু করবে প্ল্যান ধরে ধরে সব বুঝিয়ে দিল। ঢাকার নাম করা এক আর্কিটেক্ট বাড়ির ডিজাইন করেছে। সাবের নিশ্চিত বাড়িটাতে থাকতে যেমন আরাম হবে, তেমনি দেখতেও। গ্রামের মানুষ এমন আর আগে কখনও দেখেনি। তাক লেগে যাবে সবার। মনে মনে সে তাই চায়। মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা দূর বেশী নয় তবুও যে জ্যাম থাকে। সকাল সকাল রওনা না দিলে ট্রাফিক জ্যামে বাসায় ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। আজ শনিবার কাল আবার অফিস। তার ড্রাইভার জামাল রাতের দিকে আবার চোখে একটু কম দেখে।

খাওয়া-দাওয়া শেষে মুত্তালেব সাহেব সবার সাথে ড্রয়িংরুমে এসে বসলেন। তিনি সাবেরের সাথে একান্তে কথা বলতে চান। সবাই উঠে গেল, কারও বুঝতে বাকি থাকল না যে, পিতা-পুত্রের কী কথা হবে। পিতা-পুত্রের যুগ যুগের দ্বন্দ্বের পরিণতি কী হয় কে জানে; কিন্তু মুত্তালিব সাহেবের সংসারে এই দ্বন্দ্ব একটা বিপর্যয় হয়ে আসে। শুধু পিতা-পুত্র ছাড়াছাড়িতেই নয়, ক্রমান্বয়ে মাতা-পুত্র, ভাইবোনেরও ছাড়াছাড়ির কারণ হয়। মৌচাকের মতো একটা সংসার থেকে পাত্রপাত্রীরা অনিচ্ছাকৃতভাবে ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে থাকে।

মুখোমুখি বসা পিতা-পুত্র। দু’জনেই চুপ, যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। মুত্তালেব সাহেব ছেলের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে ছেলের মাথার ওপর দিয়ে দূরে তাকিয়ে বললেনÑ

তুমি আর আমাকে টাকা পাঠিও না।    

কেন জানতে পারি?

তার উত্তর তুমি আমার চেয়ে ভালো জানো।

আর তোমার প্রাসাদ তুলতে আমার এই ঘরটা ভাঙা পড়বে। আমি রফিকের ওখানে চলে যাচ্ছি। আর গ্রামে ফিরব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সাবেরের মুখটা ছাইয়ের মতো কালো হয়ে গেল। হৃৎপিণ্ডের মধ্যে পাকিয়ে ওঠা কষ্টটা চোখের কন্দরে ঝরে পড়ার জন্য আঁকুপাঁকু করতে লাগল। সাবের আপ্রাণ শাসনে বন্দি করে রাখল। এত আপমান সে আর কোনোদিন হয়নি।

‘ঠিক আছে’ বলেই গাড়িতে গিয়ে বসল। মা কাছে ছিলেন না। ছেলেকে নাতিদের লাউটা, কলাটা, মুলাটা কী দেবেন- এই কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তার ছেলে আবার লাউপাতা দিয়ে নোনা ইলিশ খেতে ভালোবাসে। অনেকগুলো নোনা ইলিশ বসিয়েছেন। এখন লাউপাতা কাটছেন ছেলের সঙ্গে দেবেন। মা কাছে থাকলে কি হতো কে জানে? গাড়িতে বসেই সাবের ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। শারমিন এই কান্নার অর্থ জানে। তাই কোনো কথা বলল না, সান্ত্বনা দেবারও চেষ্টা করল না। কিন্তু কী একটা হারানোর তীব্র ব্যথায় স্তব্ধ হয়ে রইল। কী হারাল যেন ধরতে পারছে না; কিন্তু কিছু একটা যা খুব দামি।

তারপর থেকে সাবের আরও বেপরোয়া হয়ে গেল।

কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি মুত্তালেব সাহেবের। জ্যৈষ্ঠের গরম। গরমটা কালরাতে যেন জেঁকে বসেছিল। রফিকের দুই কামরার বাসায় দক্ষিণের ভালো ঘরটাই তাঁকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েকদিন থেকে ফ্যানটা কাজ করছে না। ঘটর ঘটর করে ঘোরে কিন্তু বাতাস হয় না। রফিককে বললেই ঠিক করে দেবে কিন্তু বলতে ইচ্ছা হয় না। তাকে আর কত বলবে। সীমিত সামর্থ্যরে মানুষ ছেলেমেয়ে নিয়ে হিমশিম। তবুও তো বাবা-মা দু’জনকে পালছে। বউটা ভালো তাই দুরছাই করে না। রোকেয়া বলে এই ভালোত্বের মধ্যেও নাকি পলিটিক্স আছে। রফিকের বউ হেনা নাকি শারমিনকে জেলাস করে। সে দেখাতে চায় শারমিনদের টাকা থাকলে কী হবে মন নেই। তাদের টাকা নেই কিন্তু মনটা তো আছে? কী জানি মেয়েদের চোখে কত কিছুই না পড়ে। হেনা যত কিছুই করুক, রোকেয়া কেন কে জানে শারমিনকেই বেশি পছন্দ করে। মানুষ মাত্রই কি টাকার বশ? হবে হয়ত। যাই হোক হেনা স্বল্প সামর্থ্যের মধ্যে তাদের যত্নআত্তিই করে। মুত্তালেব সাহেব ভাবেন কত আর বলবেন রফিককে? কোনো সুবিধা-অসুবিধা নিয়েই মুত্তালিব সাহেব উচ্চবাচ্য করেন না, কারণ তিনি জানেন কিছু বললেই আবেদন জায়গা মতো পৌঁছে যাবে। তিনি তা চান না। রোকেয়া ইনিয়ে-বিনিয়ে সাবেরকে বলবে। রফিকও তাতে সায় দেবে। সাবের মচ্ছব শুরু করবে যা তার একদম ভালো লাগবে না। তাই সব অসুবিধা নিয়েই তিনি কাল যাপন করেন, কাউকে কিছু বলেন না। কেউ দেখে যদি তার সমাধান করে তবে ঠিক আছে, নিজে থেকে কিছু বলেন না।

রোকেয়া সারা রাত বাতাস করেছে আর গজ গজ করেছেÑ তিনি নীরবে ছটফট করেছেন। তাই আজ খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। মানিকগঞ্জ শহরের বাইরে এই জায়গাটা এখনও বেশ ফাঁকা কিছু কিছু বাড়িঘর উঠছে। সামনে-পিছনে বেশ কিছু জায়গা নিয়ে বাড়িগুলো তাই উঠতে পারছে। রফিকের এই ভাড়া বাড়িটার সামনে বেশ কিছুটা জায়গায় বড় বড় গাছগাছালিতে ভরা। পাশে একটা শান বাঁধানো পুকুর। কোন বড়লোক জায়গা কিনে গাছ লাগিয়েছিল। মাঝে মাঝে এসে থাকবেন বলে দুই রুমের সেমিপাকা একটা বাড়িও বানিয়েছিলেন। কিন্তু কল্পনার সাথে বাস্তবতা অনেক সময়ই মেলে না। পরে ভদ্রলোক জায়গাটার রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে বাড়িটা ভাড়া দিয়ে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আজান  দেবে। মুত্তালেব সাহেব খালি গায়ে একটা গামছা কাঁধে পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ালেন। গরমের দিন হলেও এই ভোরে পুকুর থেকে কুয়াশার মতো একটা শীতল বাতাস উঠে আসছে। মুত্তালেব সাহেব খুব আরাম বোধ করলেন। হঠাৎ তার পায়ের কাছে বেশ বড় একটা পাকা আম ঝরে পড়ল। আমটার হলুদ রং তার দৃষ্টি কেড়ে নিল। আমটার দিকে তাকিয়ে মুত্তালেব সাহেবের আরেকটা দিনের কথা মনে পড়ে গেল। তখন গ্রামে থাকেন। রফিকের এখানে উঠে আসেননি। তার দুই ছেলে পাঁচ মেয়ের মধ্যে বড় শেফালি, তারপর বেণু। সাবের রফিকের পর আঞ্জু, মিনু আর বকুল। তখন বোধ হয় শেফালির বিয়ে হয়ে গেছে। বেণুর বিয়ে ঠিকঠাক। এক সকালে সাবেরকে নিয়ে মর্নিং ওয়াকে বের হয়েছেন। সাবেরের বয়স কত হবে তখন বারো- তেরো? ছুটিতে বাড়ি এলেই তার কাজ ছিল ছেলেদের নিয়ে মর্নিংওয়াকে বের হওয়া, যাতে ছেলেরা প্রকৃতি  চেনে, গাছগাছালি চেনে, পশু-পাখির প্রতি দয়া-মায়া হয়, দেশকে ভালোবাসে। সেদিন হাঁটতে হাঁটতে হারাধন মল্লিকের বাগানবাড়িটার কাছে চলে এসেছেন। ঠিক আজকের মতো একটা বড় পাকা আম গাছ থেকে পড়ল। সাবের দৌড়ে গিয়ে আমটা কুড়িয়ে নিয়ে এলো। আনন্দে তার চোখ চকচক করছে। মুত্তালেব সাহেব ছেলের হাত থেকে আমটা নিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তিনি বললেনÑ ‘এই বাগানটা কার বলতো বাবা?’

‘হারাধন মল্লিকের।’

‘এই বাগানে তোমার কোনো অধিকার আছে?’  

‘সাবের মাথা নাড়ল। মুখে বলল- ‘না বাবা।’

‘এই আমে তবে কি তোমার কোনো অধিকার জন্মায়, যতই ঝরে পড়ুক না কেন?’

‘না বাবা।’

‘যাও আমটা জায়গা মতো রেখে আসো। শোনো বাবা, আল্লাহর নিয়ম দ্বারাই সমাজ পরিচালিত হয়। সেখানে প্রত্যেকের আধিকারের সীমা নির্দিষ্ট করা আছে। নিজের সীমা লঙ্ঘন করা মানে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা। আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। সমাজও না- এই কথাটা সব সময় মনে রাখবা। এইটা মনে রাখলে জীবনে ঠকবা না। মানুষ ঠকবে না তোমার দ্বারা। মানুষ তোমাকে পছন্দ করবে, সমাজ তোমাকে পছন্দ করবে। মানুষ যাকে পছন্দ করে, আল্লাহ তাকে পছন্দ করেন। আর মানুষ কখন নিজে ঠকে, অপরকেও ঠকায় জানো- যখন লোভ করে, নিজের সীমা অতিক্রম করে। যাও আমটা এখন রেখে আসো।’ সাবের আমটা রেখে এলো ঠিকই, কিন্তু ফিরতি পথে সারা রাস্তা গুম হয়ে থাকল।

সাবেরের কথা মনে হতেই মুত্তালেব সাহেবের মনটা খারাপ হয়ে গেল। একটা ব্যর্থতা বোধে ছেয়ে গেল মনটা। না শতচেষ্টা করেও ছেলেটাকে মানুষ করতে পারলেন না। এই ছেলেটার ওপরই তার ভরসা ছিল সব চেয়ে বেশি। ছেলেটা মেধাবী ছিল। অন্য ছেলেমেয়েগুলো মাঝারি। তাই বেশি দূর এগোতে পারেননি। মেয়েগুলোকে বিয়ে দিয়েছেন কোনোরকমে। আছে ভালোই। কিন্তু তিনি যতটুকু আশা করেছিলেন কিছুই হলো না। সাবেরের ওপর ভরসা ছিল সবচেয়ে বেশি, সে-ই বখে গেল। টাকার পেছনে ছুটল শেষ পর্যন্ত। সততা বজায় রাখতে পারল না। আফসোস। অথচ সৎ থাকলে, আদর্শবান হলে কত দূরই না যেত ছেলেটা। মুখ উঁচু করে থাকত। বুঝল না ছেলেটা। এর পরিণতি ভালো নয়। তিনি জানেন কিছুতেই এর পরিণতি ভালো হতে পারে না। তিনি দেখতে পাচ্ছেন। এত অনাচার কী করে বিধাতা পুরুষ সহ্য করবেন? মুত্তালিব সাহেব আতঙ্কবোধ করলেন। তার গায়ে কাঁটা দিলো। যেদিন গায়ে সাবের প্রাসাদ তুলল সেদিনই তিনি গ্রামের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছেদ করে রফিকের এই দুই কামরার বাসায় এসে উঠলেন। তিনি জানেন সাবেরের ওই প্রয়াস তার আরাম-আয়েশের জন্যই; কিন্তু সে কি জানে না তিনি কী চান? জেনেও কেন এই অপমান বারবার? মনে মনে তার রাগ উঠে গেল; কিন্তু সুবেহ সাদিকের এই শান্ত-সমাহিত সময়ে তিনি ছেলের ওপর রাগ করতে চান না। তাতে ছেলের অমঙ্গল হবে। তিনি ধীরে ধীরে পুকুরে নেমে অজু করলেন। সিঁড়ির শান বাঁধানো পাটাতনে গামছা বিছিয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে ছেলের মঙ্গল কামনায় দুই রাকাত নামাজ পড়লেন। সেখানে বসেই তিনি দীর্ঘ মোনাজাত করলেন। বসে বসে কাঁদলেন। তার দু’চোখ দিয়ে পানি পরতে লাগল। বললে ‘হ্যাঁ আল্লাহ আমার ছেলেটাকে হেদায়েত করো। সে মোহের ঠুলি পরে আছে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছে। নাদান বাচ্চা তাকে ফিরাও, আল্লাহ তাকে জ্ঞান দাও। সীমাবদ্ধ জ্ঞানের আধিকারী আশরাফুল মাকলুকাত মোহের বসে হিতাহিত জ্ঞান হারায়। একমাত্র তুমিই পারো সেই মোহ থেকে সঠিক পথনির্দেশ করতে। হ্যাঁ আল্লাহ আমি পাপি-তাপি তবুও আমার এই উত্থিত হাতের উছিলায় তুমি আমার ছেলেটাকে হেদায়েত করো।’ তিনি মোনাজাত শেষ করে চোখ মুছলেন। মনে মনে বললেন ‘আমার মৃত্যুর আগে কি আমি তার পরিবর্তন দেখে যেতে পারব?’ তিনি তীব্র প্রত্যাশা নিয়ে বসে রইলেন। তার সেই  প্রত্যাশা ছিল পিতার বিশুদ্ধতম প্রত্যাশা।

মুত্তালেব সাহেব সব গুছিয়ে হাসপাতালের বেডে বসে আছেন। তিনি রফিকের অপেক্ষা করছেন। সে এলে তিনি বাড়ি চলে যাবেন। এনজিওপ্লাস্টি করাবেন না। রফিক কাল রাতে ঢাকা গেছে। তিনি জানেন কেন রফিক কাল ঢাকা গেছে। তিনি জানেন কার টাকায় তার অপারেশন হবে। ওই টাকায় তিনি কিছুতেই অপারেশন করাবেন না। তার স্ত্রী রোকেয়া গুম হয়ে পাশের বেডে বসে আছেন, তিনি ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছেন। একটু আগে তাকে বুঝাতে গিয়ে রাম ধমক খেয়েছেন। তিনিও রফিকের অপেক্ষা করছেন আর ভিতরে ভিতরে মুত্তালেব সাহেবের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছেনÑ মুরোদ নাই কিল দেয়ার  গোঁসাই। হু, ত্যাজ কত? পাছায় ছাল নাই মির বাঘা নাম। রাগ হলে রোকেয়ার কেবল শ্লোক মনে পড়ে। ওগুলো মনে মনে আউড়িয়ে তিনি কিছুটা আরাম বোধ করেন, তা না হলে যে চিড়িয়ার সাথে পড়েছেন কবেই চিত্তির হয়ে যেতেন। তিনি কপালে করাঘাত করেন আর শ্লোক আওড়ান। সারা জীবন জ্বালানো পোড়ানো এই লোকটাকে তিনি একদম সহ্য করতে পারেন না। আবার তার দৃঢ়তা, নীতি-নৈতিকতা, বিশুদ্ধ জীবন যাপনের আকর্ষণও এড়াতে পারেন না। তাকে তিনি শ্রদ্ধা না করে পারেন না। ভালোওবাসেন হয়তো। কিন্তু এই লোকটার সাথে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে তিনি ক্লান্ত, তিক্তবিরক্ত। রফিক বাবাকে হসপিটালে ভর্তি করেই ঢাকা যাবার একটা উছিলা খুঁজছিল। এনজিওপ্লাস্টি করতে হবে শুনেই সে আর দেরি করেনি, খুব ভোরে সাবেরের ডিওএইচএসের বাসায় গিয়ে উঠল। রফিককে দেখেই সাবের ভয় পেয়ে গেল। বাবার নিশ্চয় কিছু একটা হয়েছে। বাবাকে ম্যানেজ করতে পারে না বলে তাঁর বিষয়ে সাবের সব সময় কাঁটা হয়ে থাকে।

কিরে এত সকালে?

‘আর কইয়েন না ভাইজান। কাল সারারাত আব্বা একদম ঘুমাতে পারেন নাই। খালি অস্থির অস্থির করছেন। বুকে ব্যথা। কোনো কিছুতেই কিছু হয় না। বাধ্য হয়ে মানিকগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার এনজিওগ্রাম করলেন। তিনটা ব্লক। দুইটা হানড্রেট পারছেন্ট, একটা সিক্সটি পারছেন্ট। ডাক্তার বলল, এখনই অপেরাশন করা লাগবে। স্টান্ট করতে হবে। টাকা জোগার করুন। আমার কি আর মাথা ঠিক থাকে। আব্বা বলে কথা। আম্মাকে হাসপাতালে বসিয়ে রেখে ছুটে আসছি।’ রফিক সাবেরের দুর্বলতা জানে তাই এই বিস্তারিত বয়ান।

সাবের অস্থির হয়ে বলল ‘তুই তাড়াতাড়ি নাশতা কর। আমি যেতে পারলে ভালো হতো কিন্তু তার তো আর উপায় নাই। আমি এখনই টাকা দিচ্ছি তুই আর দেরি না করে এখনই রওনা হয়ে যা। পারলে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঢাকা আনতে পারিস কিনা দেখ।’ সাবের তড়িঘড়ি টাকা আনতে উপরে চলে গেল। রফিকের তেমন তাড়াহুড়া দেখা গেল না, সে আস্তে ধীরে নাশতা করল। শারমিনের সাথে পরিবারের বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করতে লাগল। শারমিন যেহেতু পরিবারচ্যুত, তাই এই পরিবারের প্রতি তার মস্ত কৌতূহল। সেও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জিজ্ঞেস করতে লাগল। এমনকি সম্প্রতি বেণুর যে ছেলে হয়েছে, কার মতো হয়েছে দেখতে? বেনুর স্বামী যে কালো, তার মতো হলে তো সেরেছে। সাবের মোটা একটা খাম নিয়ে দোতলা থেকে নেমে এলো। রফিককে তাগাদা দিয়ে বলল ‘তুই আর দেরি করিস না। ট্রেনে-বাসে যাওয়া ঠিক হবে না। দেরি হয়ে যাবে। তুই এক কাজ কর একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে যা তাড়াতাড়ি হবে।’ সাবেরকে খুব উদ্বিগ্ন দেখচ্ছে। রফিক ব্যস্ততা দেখিয়ে বললÑ ‘এখনই যাচ্ছি।’ সে চট জলদি রওনা দিয়ে দিল।

রফিক আসার আগে নার্স মুত্তালেব সাহেবকে বুঝাতে চেষ্টা করছিল।

‘চাচা অপেরেশনটা করিয়ে নিলেই পারতেন। এটা আপনার করা দরকার।’

‘কেন দরকার কেন? এটা করলেই কি আমি অমর হয়ে যাব? কোনো দিন মরব না?’

‘না তা নয় কিছুদিন তো বেঁচে থাকবেন। তাই বা কম কিসে। মরে গেলেই তো সব শেষ। এই সুন্দর পৃথিবীটা আর দেখা হবে না। আপনার ছেলেমেয়ের মাথার ওপর কোনো ছাদ থাকবে না। তারা স্নেহ বঞ্চিত হবে।’

মুত্তালেব সাহেব খেয়াল করেছেন জীবন-মৃত্যুর কাছাকাছি থাকে বলেই হয়তো নার্সরা খুব সুন্দর করে জীবনের গূঢ় কথাগুলো বলতে পারে। কিন্তু এই কথাগুলোতে ভুলবার মতো মুত্তালেব সাহেবের জীবন এত সুন্দর নয়। তিনি জবাব দিলেন ‘বাঁচলাম তো অনেক দিন আর কেন?’ মাঝখান দিয়ে রোকেয়া ফুট কাটলেন, ‘তবে তো তিনি বাঁচেন। আমাদের ভাসিয়ে দিতে পারলে তিনি খুশি।’

‘আমার জন্য তোমার কি আটকাবে রোকেয়া? আমি গেলেই তো তোমার সুবিধা। আর কোনো বাধা থাকে না।’

ইঙ্গিতটা আর কেউ না বুঝলেও রোকেয়া বুঝলেন। রফিক থাকলে বুঝত কিন্তু নার্স বুঝল না। সে বলল

‘কী যে বলেন চাচা। পরিবারের একেকজন মানুষ কত গুরুত্বপূর্ণ আর ঘরের গার্জিয়ানের তো কথাই নেই।’

মুত্তালেব সাহেব চুপ করে রইলেন। এমন সময় রফিক রুমে ঢুকল। নার্সের দিকে তাকিয়ে বললÑ

‘আপনারা রেডি? আমি সব ঠিক করে এসেছি।’

নার্স বিব্রত ভঙ্গিতে বললÑ ‘আমরা তো রেডি কিন্তু দেখেন না চাচা কিছুতেই অপারেশন করাতে রাজি হচ্ছেন না।’

রফিক এতক্ষণে খেয়াল করল বাবা সবকিছু গুছিয়ে বসে আছেন। সে প্রমাদ গুনল। একবার না হলে তো আর হাঁ হবে না। সে বাবার দিকে তাকাল। সেখানে অর্থ দৃঢ়তা। সে মাথা নাড়তে নাড়তে বললÑ

‘ঠিক আছে চল। আমি গাড়ি ডাকছি। তারপর কিছু হলে আমাকে দুষতে পারবি না।’

ইরফানকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শারমিন অস্থির হয়ে ঘরময় পায়চারি করছে। তার হাতে একটা তসবি। সাবের ফোনের পর ফোন করে যাচ্ছে। তার যত কানেকশন আছে সব জায়গায় নক করছে। তার কানেকশনের পরিমাণও কম নয়। তার লাইনে টিকতে হলে বড় বড় কানেকশন রাখতেই হয়। এখন কথা বলছে প্রাই মিনিস্টারের পিএস-১ এর সাথে। কিন্তু তার পরও ট্রেস করতে পারছে না। ইরফানের বন্ধুবান্ধবের কাছে থেকে যেটুকু জানা যায়Ñ বনানী ব্রিজের কাছ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকে কয়েকজন একটা মাইক্রোবাসে ইরফানকে তুলে নিয়ে গেছে। শারমিন কয়েকদিন থেকে ছোট ছেলেটার পরিবর্তন লক্ষ্য করছিল। ক্রমেই তার রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে। সারা দিন গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় কোথায় যায়, কী করে। স্লিপ ওভারের নামে প্রায়ই বাইরে থাকে। ফিরে এসে পড়ে পড়ে ঘুমায়। সব সময় ঢুলো ঢুলো। কথাও কেমন জড়ানো। কিছু বলতে গেলে গলা চড়ায়। টাকা-পয়সা চাইতেই থাকে, না দিলে ভাংচুর করে। সাবেরকে বললে সাবের মারতে ধরতে যায়, তাতে আরও বিপদÑ হিতে বিপরীত হয়। দিনের পর দিন ছেলে বাসায় ফেরে না। আরও অশান্তি। যা শোনা যায় আজকাল। এই বয়সের ছেলেরা আকছার সুইসাইড করে, নয় আইএস-এ যোগ দেয়। মাগো। ভয়ে শারমিনের হাত-পা পেটের ভেতর ঢুকে যেতে চায়। এই ভয়ে শারমিন আজকাল অনেক কিছু সাবেরকে জানায় না, লুকায়। জানলেই-বা সাবের কী করতে পারত? ছেলেরা আর তাদের বশে নেই। শারমিনের মাঝে মাঝে মনে হয় টাকাই যত অনিষ্টের মূল। টাকা না থাকলে কষ্ট হতো; কিন্তু এই অশান্তি হয়তো হতো না। ছেলেরা বুঝে গেছে তাদের বাবার টাকা আছে, চাইলেই পাওয়া যায়। তাদের কীভাবে থামায়?

কিছুদিন আগে বড় ছেলে আরমান করল আরেক কাণ্ড। সেটা সামলাতে না সামলাতে আবার এই। সে এক মন্ত্রীর মেয়েকে নিয়ে ভেগে গেল। মন্ত্রীর সুন্দরী মেয়ে এ লেভেলের বখে যাওয়া ছেলের সাথে ভেগে গেছে, মন্ত্রী মহোদয়ের প্রেস্টিজ থাকে কোথায়? তিনি সাবেরকে সুদ্ধ গায়েব করে দেন আরকি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সেই ঝামেলা ঠেকানো গেছে। আজ আবার আরেকটা।

সাবের মাত্র বাথরুমে গেছে, এমন সময় ফোনটা এলো। পাজামার ফিতা লাগানোর সময় পেল না সাবের। ফিতার মুখটা বাঁ হাতে ধরে ডান হাতে ফোনটা কানের কাছে ধরল। শারমিন কান খাড়া করে এসে দাঁড়ালো। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। ছোট ছেলেটাকে নিয়ে কত কথাই না তার মনে পড়ছে। কোল ঘেঁষা ছেলে, এই সেদিন এতটুকু ছিল। কবে বড় হয়ে গেল। বড় না হলেই ভালো ছিল। তা হলে আর এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হতো না। ডিবির কাছ থেকে ফোনটা এসেছে। ডিবির একজন ইন্সপেক্টর ফোন করেছে। সে খবর দিল ইরফান তাদের কাছে আছে। ইয়াবাসহ তার এক বন্ধুর সাথে সে ধরা পড়েছে। সাবের যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। তাও তো একটা খবর পাওয়া গেছে। মানুষ অপেক্ষাকৃত ভালোটা নিয়েই বাঁচতে চায়। তাও ভালো যে, হারিয়ে যায়নি বা গুম হয়ে যায়নি। শারমিন উচ্চস্বরে কাঁদতে কাঁদতে সাবেরের পাশে এসে বসল।

মানিকগঞ্জ থেকে অচেতন অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে করে মুত্তালেব সাহেবকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। তাকে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রোকেয়া খাতুন আর রফিক সাথে এসেছে। অন্যদের খবর দেওয়া হয়েছে। মুত্তালেব সাহেবের অবস্থা ভালো না। ছেলেমেয়েরা রওনা দিয়ে দিয়েছে। ছোট মেয়ে বকুল থাকে দিনাজপুরে। তার আসতে একটু দেরি হবে। মুত্তালেব সাহেব লাইফ সাপোর্টে আছেন। তার অবস্থা ভালো নয়। তিনি এখন আর জানতে পারছেন না, অভিজাত হাসপাতালে তার পেছনে কত টাকা খরচ হচ্ছে, কে তার জোগান দিচ্ছে। তিনি এসবের এখন অনেক ঊর্ধ্বে। সাবের বানের পানির মতো দেদার টাকা খরচ করছে। এতদিন সে যা করতে পারেনি, এতদিন পরে তা করার সুযোগ পেয়ে সে যেন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য- দরকার হলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাবে। যত টাকা লাগে বাবাকে ভালো করে তুলতেই হবে। সাবের, রফিক, রোকেয়া খাতুন ও শারমিন অ্যাপোলোর সুসজ্জিত ওয়েটিংরুমে বসে আছেন। একজন নার্স এসে খবর দিল মুত্তালিব সাহেবকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তা কাজ করছে না। কেউ একজন এসে সিদ্ধান্ত নিক লাইফ সাপোর্ট খুলে দেবে কি-না। সাবের উঠে দাঁড়াল। নার্সের পেছন পেছন আইসিইউর দিকে পা বাড়াল। পেছনে কান্নার রোল। পা তার গেঁথে গেঁথে যাচ্ছে। কিছুতেই এগোতে পারছে না। সাবের বুঝে উঠতে পারছে না কেমন করে দাঁড়াবে অনিচ্ছুক এক পিতার সামনে, হোন না তিনি মৃত।

মুত্তালিব সাহেবের লাশ নিয়ে আসা হয়েছে সাবেরের ডিওএইচএস বারিধারার প্রাসাদোপম বাড়িতে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীতে ভরে গেছে বাসা। মুত্তালেব সাহেবের পূর্ব ইচ্ছামতো তার লাশ নিয়ে যাওয়া হবে মানিকগঞ্জে। তার প্রস্তুতি চলছে। লাশ গোসল দেওয়া হয়েছে বনানী কবরস্থানে। এমন সময় কেউ একজন এসে খবর দিল দুদক থেকে একজন ডেপুটি ডিরেক্টর পুলিশ সাথে নিয়ে এসেছেন ওয়ারেন্ট নিয়ে। তারা অবশ্যি জানতেন না যে, এই মাত্র একজন নীতিবান পিতার মৃত্যু হয়েছে, যার পুত্র দুর্নীতির দায়ে দুদকের ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। যাকে তারা ধরতে এসেছেন। বেশ কয়েকদিন থেকেই দৈনিকগুলোতে সাবেরের বিস্ময়কর সম্পদের হিসাব বের হচ্ছিল। দুদকে গিয়ে বেশ কয়েকবার সাবেরকে পারসোনাল হিয়ারিংও দিতে হয়েছে। পিতার এই অবস্থায় সাবের এসব কিচ্ছাকাহিনির দিকে বেশি নজর দিতে পারছিল না। বিধ্বস্ত সাবের সারেন্ডারের ভঙ্গিতে দোতলা থেকে একতলার লাক্সারি ড্রইংরুমে নেমে এলো। পৃথিবীতে তার যুদ্ধ ছিল একজনের সাথেই। সে তার জন্মদাতা পিতা। আজ তার সেই যুদ্ধ শেষ। পরাজয়কেও নয়। আজ সে কাউকে, আর কোনো কিছুকেই পরোয়া করে না।

মাহবুবা হোসেইন : কথাশিল্পী 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares