ভ্রমণ : এসপানিওলার গুলিবিদ্ধ হেলিকপ্টার ও অপিওড এপিডেমিক : মঈনুস সুলতান

Digital StillCamera


মঈনুস সুলতান ।।

ব্যাক রোড ধরে হাল্কাচালে ড্রাইভ করতে করতে আমি আমেরিকার আদিবাসীদের গ্রাম সান ইদেলফনসো পোয়েভলোর স্বায়ত্তশাসিত- বলা চলে অনেকটা সার্বভৌম- পরিসর অতিক্রম করে এগিয়ে যাই সামনে। ওয়েস্ট আফ্রিকা ছাড়ার কাঁটায় কাঁটায় ছয় মাস পর আমার এ গাড়িটি সিয়েরা লিয়ন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ফে শহরে এসে পৌঁছেছে। গাড়িখানা লজজড় এবং মেজাজি, অর্থাৎ মুড খারাপ থাকলে বেগড়বাই করার খাসিলত আছে। বহু বছরের পুরোনো এ বাহনটিতে এখনও লেগে আছে সিয়েরা লিয়নের লালচে ধুলোবালি। এটি যে শ্লথগতিতে আগুয়ান হচ্ছে, এতেই আমি খুশিতে বাগবাগ। সামনে ধূসরিত মরু পরিসর অতিক্রম করে দিগন্তজুড়ে ফুটে ওঠে সাংগ্রে দে খ্রিস্ত পাহাড়ের জগদ্দল ল্যান্ডস্কেপ। আজ আমি রওনা হয়েছি এসপানিওলা শহরের উদ্দেশে।

সান্তা ফে থেকে সামান্য দূরে এসপানিওলা শহরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও অর্থনীতির নিরিখে এ আবাসিক এলাকাটি হিস্পানিক কৌমের গরিব- গুর্বাদের বাসস্থান হিসেবে পরিচিত। ১৫৯২ সালে এ অঞ্চল মেক্সিকো থেকে আগত স্প্যানিয়ার্ডরা দখল করে ‘নুয়েবো মেহিকো’ নাম দিয়ে আমেরিকান আদিবাসীদের হটিয়ে শহরটির গোড়া পত্তন করেছিল। তারপর মার্কিনরা নুয়েবো মেহিকো স্রেফ গায়ের জোরে করগতলগত করে নিউ মেক্সিকো নাম দিয়ে নতুন একটি রাজ্যের পত্তন করলে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের সুবিধার জন্য স্থাপন করা হয় রেল রোড। ১৮৮০ সালে হাল জমানার এসপানিওলা শহরটি গড়ে ওঠে রেলবাহিত ব্যবসা-বাণিজ্যের ঠেক হিসেবে।

ড্রাইভ করতে করতে সড়কের পাশে পেল্লায় একটি ক্লিফ ফর্মেশনের দিকে নজর পড়তেই পাথুরে জগদ্দলটি সরেজমিন না দেখে আগ বাড়তে ইচ্ছা হয় না। ব্যাক রোডে ট্রাফিক বলে কিছু নেই, পথের পাশে নুড়িপাথর ছড়ানো জায়গা প্রচুর, তাই সাইড করে পার্ক করতে কোনো অসুবিধা হয় না। খানিক হেঁটে আমি পাথরের আচানক স্থাপত্যকলাটির তলায় এসে দাঁড়াই। মরচে পড়া বাদামি রঙের শিলা থেকে ফট ফট শব্দে উড়ে যায় মরুভূমিতে প্রবাসী হওয়া মেক্সিকোর এক ঝাঁক নীলচে-ধূসর ঘুঘু। ক্লিফ ফর্মেশনটির ঠিক মাঝ বরাবর কিছুটা লম্বাটে গোলাকার বৃহৎ একটি ফোঁকর। আমি পাথর বেয়ে খানিক উপরে উঠে প্রাকৃতিক এ জানালা দিয়ে ওদিকের আকাশছোঁয়া দিগন্ত নিশানা করে তাকাই। গাছপালাহীন প্রান্তরে একাধিক চার্চ-টাওয়ারের ক্রুশ চিহ্ন, কবরগাহ ও পুরোনো দিনের রেলওয়ে স্টেশন নিয়ে এসপানিওলা শহরটির আউটলাইন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জায়গাটি দারুণ রকমের জনহীনতায় এমন মৌনভাব ধারণ করে আছে যে, এখানে দু’দণ্ড বসে যেতে বাসনা হয়।

পাথরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসতেই করোটিতে ফিরে আসে আমার সুহৃদ সানতসের প্রসঙ্গ। এ মুহূর্তে আমি সিনিওর সানতসের সন্ধানে রওনা হয়েছি এসপানিওলা শহরের দিকে। পবিত্র ধর্মগ্রন্থে মানব জাতিকে যে রকম বিভক্ত করা হয়েছে কেতাবি ও অকেতাবি হিসেবে, অনেকটা সে কায়দায় নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে জনবিভাজনের রূপটি হচ্ছে- লিগ্যাল ও ইললিগ্যাল। এ ফর্মুলা অনুযায়ী আমি এখানকার লিগ্যাল বা বৈধ বাসিন্দা। আমার সুহৃদ সানতসের প্রশাসনিক তকমা হচ্ছে ইললিগ্যাল ইমিগ্রান্ট বা অবৈধ অভিবাসী। পেশায় সিনিওর সানতস হ্যান্ডিম্যান, কারও ঘরদুয়ারে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের কলকব্জা বিকল হলে তিনি তা মেরামত করে দেন। এ ছাড়া সাইড বিজনেস হিসেবে তিনি হাউস ক্লিনিংও করে থাকেন। তাঁর মজুরি- বৈধভাবে যারা এ ধরনের কাজ করে তাদের চেয়ে অনেক কম। আমার কৃপণ বলে পরিচিতি আছে, তাই সান্তা ফে’র যে কটেজে আমি বসবাস করছি, ওখানে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সিনিওর সানতসকে এত্তেলা দিই। তিনি তুলনামূলকভাবে অতি অল্প পারিশ্রমিকে আমার মুশকিল আসান করে দেন। একটি জং ধরা ভ্যানগাড়িতে তাঁর টুল-কিট ও নানা রকমের যন্ত্রপাতি নিয়ে সানতস ঘুরে বেড়ান। প্রয়োজনে রাতের বেলা গাড়ির পাটাতনে স্লিপিং ব্যাগ পেতে নিদ্রা যান। তবে এসপানিওলা শহরে বাসরত এক মেক্সিকান বৈধ অভিবাসীর পরিবারের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়েছে। উইকএন্ডে সিনিওর কাজ করেন না। তিনি এ অবসরটুকু কাটান মেক্সিকান পরিবারটির সাথে।

সিনিওর সানতসের পিতা আটের দশকের মাঝামাঝি মেক্সিকোর টিহুনা শহর থেকে অবৈধভাবে এসে ঢোকেন ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো শহরে। পিতার অভিবাসী হওয়ার অনেক বছর পর কিশোর সানতস নিশিরাতের অন্ধকারে নদী সাঁতরে সীমান্ত অতিক্রম করে ঢুকে পড়েন যুক্তরাষ্ট্রের জনহীন এক মরুভূমিতে। দিন তিনেক অচেনা ডেজার্টে পায়ে হেঁটে ট্র্যাক করার পর, খাদ্য ও জলের অভাবে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন একটি কাঁটাঝোপের তলায়। একজন র‌্যাটল সাপ শিকারি উদ্ধার করে তাঁকে নিয়ে আসে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের সান্তা ফে শহরে। তো এ শহরেই তিনি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বাস করতে শুরু করেন। একবার সান ডিয়েগোতে গিয়ে পিতাকেও খুঁজে বের করেছিলেন। কিন্তু ততদিনে তাঁর পিতার ভিন্ন একটি সংসার হয়েছে। দুটি শিশুসন্তান নিয়ে সৎমা পরিবার চালাতে গলদঘর্ম হচ্ছেন, কারণ পিতা মারাত্মকভাবে অ্যালকোহলিক। তো বেহেড মাতাল পিতার সংসারে তাঁর স্থান হয়নি। সানতস সান্তা ফে’তে ফিরে উপার্জনে মনোযোগ দেন। তাঁর বয়স চৌত্রিশ, নিজের কোনো সংসার হয়নি। তবে মেক্সিকোয় ফেলে আসা জননী, চার ভাইবোন ও দাদির একান্নবর্তী পরিবারকে তিনি ফি মাসে টাকা পাঠিয়ে জিইয়ে রেখেছেন।

সিনিওর সানতস সুযোগ পেলে গালগল্পে মেতে উঠতে পছন্দ করেন। মানুষটি ব্যতিক্রমী রকমের বন্ধুবৎসল। পরিচিতজনদের সাংসারিক প্রয়োজনে তাঁকে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে দেখেছি একাধিকবার। আমার কটেজে ছুটা কাজ করতে এলেই ভারি সুন্দর করে জানতে চান, ‘এসটাস বিয়েন, নেসেসিতো আলগো, পোয়েডে আয়ুদারতে? বা সব কিছু ভালো চলছে তো? কোনো কিছুর দরকার আছে কি? আমি কি কোনোভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’ আমি স্বপাকে আহার গ্রহণ করি। রান্নার উপকরণ হিসেবে আদা ও গরম মসলা কোনো দোকানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সমস্যা শুনে ওই দিন বিকেলবেলা সানতস এসে হাজির হন আদা ও এক প্যাকেট এলাচি নিয়ে। বিনিময়ে কোনো টাকা-পয়সা নিতে চান না। তবে আমি এক পেয়ালা কফি অফার করলে তিনি তা পান করতে করতে আমি যে বছর দুয়েক মেক্সিকো সিটিতে বাস করেছি, তার বিস্তারিত বয়ান শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, মেক্সিকোর ওহাকা অঞ্চলের মানুষ তিনি, শৈশবে স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে সিওদাদ মেহিকো বা মেক্সিকো সিটিতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতে যাবেন। কিন্তু গরিবি হালতের জন্য লেখাপড়া তেমন একটা করতে পারেননি। বৈধ কাগজপত্র তাঁর নেই, সুতরাং এ জন্মে হয়তো আর কখনও মেক্সিকো সিটিতে যাওয়া হবে না। আমি প্লেয়ারে ‘মারিয়াচি মেহিকানিসমো’ নামে পরিচিত মেক্সিকোর লোকগীতির সিডি চড়ালে মাথা দুলিয়ে তিনি সঙ্গীত উপভোগ করতে করতে ফের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘এসটা মুসিকা টকা মি কোরাজান, বা এ গানের ধ্বনি আমার হৃদয় স্পর্শ করছে।’ এসব গান হালফিল ইউটিউবে পাওয়া যায়। কিন্তু সিনিওর সানতস ইন্টারনেটের বিষয়-আশয় তেমন একটা বুঝতে পারেন না। তো আমি কয়েকটি মেক্সিকান সঙ্গীতের সিডি তাঁকে উপহার দিলে তিনি উষ্ণ হাগে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। আমি তাঁর চোখে আর্দ্রতা দেখতে পাই।

সিনিওর সানতসের সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতার কথা ভাবতে ভাবতে ক্লিফ ফর্মেশনের তলা থেকে ফিরে ফের গাড়ি স্টার্ট দিই। মিনিট দশেকের ভেতর এসে পৌঁছি এসপানিওলা শহরে ঢোকার মুখে একটি পার্কে। ঘড়িতে বাজছে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে ৯টা। এ সময় ঠিক এই পার্কটিতে সিনিওর সানতসের দাঁড়িয়ে থাকার কথা। আমি গাড়ি থেকে নেমে তাঁর তালাশে এদিক ওদিক তাকাই। এই এলাকায় এক সময় বাস করত আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন গোত্র। তাঁদের সংস্কৃতির স্মারক হিসেবে পৌরসভা পার্কটিতে স্থাপন করেছেন পাঁচটি টিবি বা এক ধরনের তাঁবু। টিবিগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে লে-রাইডার বলে পরিচিত সত্তর-আশি বছরের পুরনো তিনটি ভিনটেজ মোটরকার। হিস্পানিক কৌমের যুবকদের মাঝে লো-রাইডার মোটর কারগুলোর কদর প্রচুর। তরুণরা হাতে পয়সা এলেই খরিদ করে জংধরা লজজড়- বয়সের ভারে অচল ভিনটেজ লো-রাইডার কার। এসপানিওলা শহরের কিছু গ্যারেজে তৈরি হয় এসব গাড়ির খুচরা পার্টস। ছেলেরা ভিনটেজ গাড়িগুলো সারাই করে উইকএন্ডে তাতে চড়ে নাকি তাদের বান্ধবীদের সঙ্গে ডেটে যায়। এ আচরণ নিয়ে পত্রপত্রিকায় আমি ফিচার পড়েছি। বলা হয় যে, এসপানিওলা শহরটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের লো-রাইডার ভিনটেজ গাড়িগুলোর রাজধানী বিশেষ। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি এসব গাড়ি খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণের বিশেষ আগ্রহ বোধ করি না।

মিনিট দশেক কেটে যায়। সিনিওর সানতস এসে হাজির হন না। গড়পড়তা আমেরিকানদের মতো সময়নিষ্ঠ তিনি নন। তাই অপেক্ষা করতে করতে আমি আজ তাঁর সাথে সাংগ্রে ডে খ্রিস্ত পাহাড়ের ভেতর-মহলে প্রায় লুকিয়ে রাখা গুলিবিদ্ধ যে হেলিকপ্টারটি দেখতে যাচ্ছি, তার প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবি। জোসেফ মরগান নামে এয়ারফোর্স থেকে অবসরপ্রাপ্ত এক শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সান্তা ফে এলাকায় ফোর্ড ট্রাইমোটর নামের অনেক বছরের পুরনো ভিনটেজ একটি এয়ারক্রাফট উড়ান। ট্রাইমোটর  প্লেনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের যশস্বী গাড়ি নির্মাতা হেনরী ফোর্ড নির্মাণ করেছিলেন ১৯২৫ সালে। এ ধরনের মোট ১৯৯টি বিমান তৈরি হয়েছিল। এগুলোর দু-চারটি নমুনা পৃথিবীর নানা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। একটি ভিনটেজ ট্রাইমোটর জোসেফ মরগান স্বয়ং পাইলট হিসেবে ফ্লাই করছেন। তার উড়োজাহাজটিকে তিনি আদর করে টিন-গুজ বা ধাতব-রাজহাঁস নামে ডাকেন। পয়সার বিনিময়ে মাত্র আটজন প্যাসেনজার নিয়ে টিন-গুজটি উড়ে যায় সাংগ্রে ডে খ্রিস্ত পাহাড়ে উপর দিয়ে রকি মাউন্টেনের প্রান্ত-অবধি। যারা টিন গুজে উড়েছেন, তারা শিংগাল হরিণ-চরা পাহাড়ি উপত্যকা পর্যবেক্ষণের প্রশংসায় আত্মহারা হন হামেহাল।

আমি টিন-গুজের প্যাসেনজার হওয়ার জন্য মরগান সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানতে চান- আমি নিকট অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কোথাও ভ্রমণ করেছি কিনা। জবাবে আমি সিয়েরা লিয়নে আমার বসবাসের কথা উল্লেখ করি, মরগান ইবোলা সংক্রমণের অজুহাত দেখিয়ে আমাকে তার টিন-গুজে ওড়া থেকে বঞ্চিত করেন। আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি, সিয়েরা লিয়ন ছাড়ার সময় এবং যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর আমি বিশদভাবে মেডিকেল চেকআপ করিয়েছি। আমার শরীরে ইবোলার জীবাণু নেই বলে ডাক্তাররা ক্লিয়ারেন্স দিয়েছেন। আমি ইবোলা-মুক্ত বলে ডাক্তারের দেওয়া সনদের স্ক্যান করা কপি ইমেইলে এটেস্ট করে পাঠানোর প্রস্তাব দিই। কিন্তু ভবি ভোলার পাত্র নন, মরগান রূঢ়ভাবে আমাকে টিন-গুজে উড়তে দিতে অসম্মতি জানান।

বিষয়টি আমাকে দারুণভাবে খাজুল করেছিল। ঝিম ধরে চুপচাপ কটেজের ব্যালকনিতে বসে ছিলাম। ওই দিন সিনিওর সানতস আমার কটেজের কিচেনে অভেন-স্টোভ মেরামত করছিলেন। ঘটনাটি জানতে পেরে বিচিত্র কিছু তথ্য দিয়ে তিনি আমাকে চমকে দেন! জোসেফ মরগানের কটেজে তিনি প্রায়ই নানা ধরনের ছুটা কাজ করেন। মরগান নাকি আফগানিস্তানের পানশির থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে নির্মিত একটি গুলিবিদ্ধ অ্যাটাক হেলিকপ্টার কিনে এনেছেন। যুদ্ধে জখম হওয়া হেলিকপ্টারটি তিনি সাংগ্রে ডে খ্রিস্ত পাহাড়ে তার বাইশ একরের প্লটে সিমেন্টের প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে স্থাপন করেছেন । জায়গাটি জংলা ও রিমোট। ওই দিকে আমেরিকার আদিবাসীদের পোয়েভলো বা গ্রাম থাকার ফলে ওসব জায়গায় নিউ মেক্সিকো পুলিশের ঢুকে পড়ার আশঙ্কা কম। কারণ পোয়েভলোগুলো মূলত স্বায়ত্তশাসিত, বলা চলে অনেকটা সার্বভৌম। ওখানে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের পুলিশের ঢুকে পড়ার আইনি অধিকার নেই। ফেডারেল সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হয়তো ওদিকে প্রয়োজনে ঢুকতে পারবে, তবে তাদেরও আদিবাসীদের প্রশাসনিক অথরিটির কাছ থেকে পার্মিশন নেওয়ার ঝামেলা  পোহাতে হবে। হেলিকপ্টার চত্বরে মরগান খোলা আকাশের তলায় একটি পাথরের ফায়ারপ্লেস বানিয়েছেন। তা ঘিরে পূর্ণিমা রাতে বসে মুনলাইট ক্যাম্পফায়ারের মাহফিল। সিনিওর সানতসের কাজ হচ্ছে ক্যাম্পফায়ারের পর ওখানে গিয়ে ছাই ইত্যাদি পরিষ্কার করা, এবং শুকনা কাঠের বান্ডেল পরবর্তী মজমার জন্য মজুত করে রাখা। এ ছাড়া ফায়ারপ্লেসের পাশে জঙ্গলে আছে ওপেন এয়ার শাওয়ারসহ বাথরুম ইত্যাদি। সানতস এসবেরও তদারক করে থাকেন।

হেলিকপ্টার চত্বরের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে সানতস গলার স্বর নামিয়ে এনে ফিসফিসিয়ে বলেন, মুনলাইট ক্যাম্পফায়ারে জোফেস মরগান নাকি আমোদ-প্রমোদের জন্য জোছনা রাতে জড়ো করেন কয়েকটি হিস্পানিক কন্যাকে। মেয়েগুলো মেক্সিকো থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান। হেলিকপ্টারটির দেয়ালগুলোও মরগান সাজিয়েছেন চাইল্ড পর্নোগ্রাফির রুচিবর্জিত চিত্রাদি দিয়ে। আমি তাঁর সঙ্গী হয়ে ওখানে গিয়ে চাপলিশে হেলিকপ্টারের একটি ছবি তুলতে চাইলে সিনিওর সানতস রাজি হন। আজকে তিনি সাংগ্রে ডে খ্রিস্ত পাহাড়ে হেলিকপ্টারের গোপন আস্তানায় আমাকে নিয়ে যাবেন- এ রকমের কথা দিয়েছিলেন। টিবি ও লো-রাইডার ভিনটেজ মোটরকারে শোভিত পার্কে তাঁর দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল!  আরও মিনিট কয়েক অপেক্ষা করে অধৈর্য হয়ে আমি তাঁকে টেক্সট করি। জবাবে তিনি একটি অ্যাড্রেস দিয়ে আমাকে ওখানে যেতে বলেন।

এসপানিওলা শহরের প্রান্তিকে সানতসের দেওয়া ঠিকানা খুঁজে পেতে সমস্যা হয় না। কাঠের বাড়িটির সর্বত্র নিম্নবিত্ত হিস্পানিক সংস্কৃতির ছাপ। ছাদ থেকে ঝুলছে মেক্সিকান পালাপার্বণে ব্যবহৃত কাঁচি দিয়ে কেটে নকশা করা রঙিন কাগজের ঝলমলে স্কোয়ার। দুয়ারে নক করতেই ছিমছাপ গোছের ফর্সা এক নারী দুয়ার খুলে দেন। আমি তাঁর চোখমুখে জমে থাকা বিষাদ দেখতে পেয়ে চমকে উঠি। মনে হয়, এ নারী একটু আগে জননী মরিয়মের থানে প্রার্থনা করতে করতে অজর হয়ে কেঁদেছেন। আমাকে কিছু বলতে হয় না। মনে হয়, তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি ‘বিয়েনবেনিদো সিনিওর’ বলে আমাকে ওয়েলকাম করে নিজের পরিচয় দেন, তাঁর নাম সিনিওরা মারিয়া। আমি তাঁর বাড়িয়ে দেওয়া হাত স্পর্শ করতেই তিনি মৃদুস্বরে বলেন, ‘সানতস এসতা এসপারানডো এন এল পাটিও তারসেরো, বা সানতস তোমার জন্য ব্যাকইয়ার্ডে অপেক্ষা করছে।’ সিনিওরা মারিয়ার হাতের ইশারা অনুসরণ করে আমি চলে আসি কাঠের বাড়িটির পেছনের আঙিনায়। দেখি, সানতস দোলনার ফ্রেমের সামনে ছোট্ট একটি মেয়ের সঙ্গে স্নেহময় খেলায় মশগুল হয়ে আছেন। আমাকে দেখতে পেয়ে খেলা থামিয়ে ছোট্ট মেয়েটিকে কোলে তুলে নিয়ে তিনি আমার সাথে খুব উষ্ণভাবে হাত মিলান। কথাবার্তায় জানতে পারি, বাচ্চাটির নাম ভেরোনিকা। ডিভোর্সপ্রাপ্ত সিনিওরা মারিয়া তাকে নিয়ে একাই এ বাড়িতে থাকেন। এখানকার একটি কামরা সানতস সাবলেট নিয়ে রেখেছেন। যখন কাজের চাপ থাকে না, তখন এ বাড়িতেই তিনি বিশ্রাম করেন।

আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে হয় না। ভেরোনিকাকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে সানতস যেন মারাত্মক কোনো অপরাধ করেছেন, এ রকম কাঁচমাচু ভঙ্গিতে বলেন, ‘লো সিয়েনতো মুচো সিনিওর সুলতান… আই উনা প্রবলেমা.., বা যারপরনাই দুঃখিত সুলতান সাহেব, একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে।’ আমি বিরক্তি চেপে মনোযোগ দিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা শুনি। না, হেলিকপ্টারের চত্বরে আমাকে নিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, তিন দিন আগে জোসেফ মরগান জংলা জায়গাটির গাছের ডালে, হেলিকপ্টারের ব্লেড সর্বত্র ক্যামেরা লাগিয়েছেন। তাঁকে জানানো হয়েছে যে, সিকিউরিটি কোম্পানির ট্রেনিংপ্রাপ্ত একজন এজেন্ট ক্যামেরা থেকে প্রাপ্ত ভিজ্যুয়াল ডাটা বিশ্লেষণ করে সারাক্ষণ মুনলাইট ক্যাম্পফায়ারের থানটিকে নজরে রাখছেন। তিনি আমার দিকে অপরাধীর বোবা চোখে তাকিয়ে থাকলে আমি যুগপৎ বিব্রত ও হতাশ হই। বুঝতে পারি, মরগানের মুনলাইট ক্যাম্পফায়ার নিয়ে লেখার সম্ভাবনা পকেটের ফুটো হড়কে গলিয়ে পড়া আধুলির মতো চিরতরে হারিয়ে গেল। সিনিওর সানতস ফের ক্ষমা চান। আমি কিছু বলি না, তবে বেজায় খিন্ন লাগে।

সিনিওরা মারিয়া ব্যাকইয়ার্ডে এসে ম্লান হেসে এবার ইংরেজিতে বলেন, ‘কামঅন ওভার অ্যান্ড হ্যাভ অ্যা কাপ অব কফি। সান্তা ফে থেকে ড্রাইভ করে এসেছো, ভেতরে এসে বসো, এক পেয়ালা কফি খেলে তোমার ভালো লাগবে।’ আমি সিনিওর মারিয়ার পেছন পেছন তাঁর সিটিংরুমে ঢুকতে ঢুকতে তার ওয়েলকামিং আচরণ নিয়ে ভাবি। পুরোনো রঙচটা স্প্রিং ধামসে যাওয়া সোফায় আরাম করে বসার জন্য তিনি যেভাবে আমার দিকে একটি কুশন বাড়িয়ে দেন, তাতে তাঁকে অনেকদিন পর দেখা হওয়া প্রিয় খালাতো বোনের মতো অন্তরঙ্গ মনে হয়। সিনিওরা মারিয়া কিচেনে গেলে আমি সিটিংরুমের ডিটেইলস খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করি। কামরাটির সর্বত্র ছড়ানো ভেরোনিকার খেলনা ও শিশুতোষ বইপত্র। দেয়ালের কাছে একটি কফি- টেবিলে জননী মরিয়মের প্লাস্টার অব প্যারিসে গড়া মূর্তি। তার নিচে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর প্রতীক। ঠিক তার তলায় ট্র্যাক স্যুট পরা একটি কিশোরের ফটোগ্রাফ। ছবিটির কাছেই জলভরা বাটিতে রাখা লাল গোলাপ। আলোকচিত্রে বালকটি ব্যায়ামের ভঙ্গিতে যেভাবে দু’দিকে তার বাহু প্রসারিত করে রেখেছে, তাতে তার দাঁড়ানোর আদলে তৈরি হয়েছে যেন আরেকটি ক্রুশকাঠের চিত্ররূপ।

আমি জননী মরিয়মের থানে কিশোরের ফটোগ্রাফটি নিবিড়ভাবে স্টাডি করছি বুঝতে পেরে, সিনিওর সানতস কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘মারিয়ার ছেলে হেকটর, অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা, খুব ভালো বাস্কেট বল প্লেয়ার ছিল, তোমাকে পরে সব খুলে বলবো।’ সিনিওর সানতস এবার ভেরোনিকাকে নিয়ে সিটিংরুমের এক কোনায় বসে পাজলের পিসগুলো জড়ো করে একটির সাথে আরেকটি যুক্ত করার খেলায় মেতে ওঠেন। আমি কাচভাঙা শোকেসের দিকে তাকাই, ওখানে বেশ কয়েকটি রুপার শিল্ড ও কাপ মৃত এক বালকের স্মৃতিতে জানালা দিয়ে এসে পড়া রোদে ঝলমল করছে।

সিনিওরা মারিয়া ট্রেতে করে কফি নিয়ে ঢোকেন। সাথে ভাপা পিঠার মতো ধোঁয়া ওড়া তপ্ত তমালে। সানতস ট্রে থেকে এক কাপ কফি তুলে নিয়ে ভেতরের কামরায় চলে যান। সামনা-সামনি সোফায় বসে মারিয়া কফিতে চুমুক দিয়ে ম্লান হেসে বলেন, ‘সানতস বলেছে তুমি রাইটার, হেলিকপ্টার নিয়ে লিখতে চেয়েছিল। স্যরি, সে তোমাকে আজ হতাশ করল।’ প্রতিক্রিয়ায় আমি ‘ইটস অলরাইট সিনিওরা’ বলে তাঁর দিকে তাকাই।’  দেখি, মারিয়া ঘাড় হেলিয়ে তাঁর প্রয়াত কিশোর পুত্রটির ছবির দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি গ্রীবা বাঁকিয়ে ফের আমার চোখে চোখ রেখে বলেন, ‘দেয়ার আর ডিসঅ্যাপয়েন্টমেন্টস ইন লাইফ, সানতস আমাকেও অনেকবার ডিসঅ্যাপয়েনটেড করেছে।’ আমি মৃদু স্বরে বলি, ‘আই আন্ডারস্ট্যান্ড সিনিওরা’, তখনই তাঁর মুখের অভিব্যক্তি আমার করোটিতে সংরক্ষিত স্মৃতিতে তোলপাড় তোলে। মনে হয়, ম্লান এ মুখখানা কোথায় যেন কোন জাদুঘরে আমি অনেকবার নিবিড়ভাবে অবলোকন করেছি।

হেলিকপ্টারের চাতালে যেতে না পাওয়ার হতাশা আমার মনে গুমরাচ্ছিল, তাই চুপচাপ কফি পান করি। সিনিওরা মারিয়া বা সানতসের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ না জমিয়ে অতঃপর ‘আদিওস’ বলে বিদায় নিই। মারিয়া চৌকাঠের তলায় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমার কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘মন খারাপ করে এখনই সান্তা ফেতে ফিরে যেয়ো না। সানতস তোমাকে এসপানিওলা শহরের সিটি সেন্টারে নিয়ে যাবে। একটু ঘোরাঘুরি করো। লেখার উপকরণ কিছু না কিছু হয়তো পেয়ে যাবে।’ তাঁর মন্তব্যে এমন একধরনের আন্তরিকতা ছিল যে, কেন জানি আমার মন ছুঁয়ে যায়। সানতসের সঙ্গে সিটি সেন্টারের দিকে হেঁটে যেতে যেতে ফিরে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মারিয়ার দিকে তাকিয়ে আমি হাত নাড়ি এবং ফের তাঁর মুখে কোথাকার কোন জাদুঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা কোন তৈলচিত্রে প্রায়-প্রৌঢ় অজানা এক নারীর মুখের বিষাদগ্রস্ত অভিব্যক্তি যেন ঝলসে ওঠে।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে আসি হিস্পানিক কৌমের কবরস্থানের কাছে। যিশুখ্রিস্টের বড়সড় একটি মূর্তির তলায় রট-আয়রনের ফেন্স দেওয়া কবরগুলোতে প্লাস্টিকের রঙচঙে ফুলের প্রচুর তোড়া সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। সিনিওর সানতস পথের পাশে দু-পা এগিয়ে গিয়ে যিশুর মূর্তির দিকে তাঁর গলায় ঝুলানো ক্রুশ চিহ্নটি তুলে ধরে মৃদু স্বরে প্রার্থনা করেন। আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে হয় না, তিনি ফের হাঁটতে হাঁটতে বলেন, ‘এ গোরস্তানে আমরা মরিয়ার ছেলে হেকটরকে গোর দিয়েছি। সে চলে যাওয়ার পর থেকে আমি আর কখনও মারিয়ার মুখে হাসি দেখিনি।’ আমি এবার কৌতূহল চাপতে না পেরে সরাসরি জিজ্ঞেস করি, ‘কে লে পাসো আ সু ইহো বা মারিয়ার ছেলেটির কী হয়েছিল?’ জবাবে সানতসের কাছ থেকে যা শুনি তা হচ্ছেÑ বারো বছর বয়সে হেকটর বাস্কেট বল খেলতে গিয়ে প্রথম পায়ে আঘাত পায়। চিকিৎসায় ভালো হলে সে ফের খেলতে শুরু করে। বয়স যখন সাড়ে তেরো তখন পায়ের ঠিক যে জায়গায় সে আঘাত পেয়েছিল, সেই জায়গায় ফের ফ্র্যাকচার হয়। চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সুস্থ না হলে ডাক্তাররা সার্জরি করেন। খানিক ভালো হয়ে সে আবার খেলতে শুরু করে, কিন্তু খেলার পরপরই ফিরে আসত মারাত্মক রকমের পেইন নিয়ে। ডাক্তাররা অপিওড বলে আফিমের সারাৎসার থেকে প্রস্তুত একটি পেইন কিলার দেন। তা সেবন করে হেকটর খেলা চালু রাখে আরও কয়েক মাস। কিন্তু ছেলেটিকে অপিওডের অ্যাডিকশনে পেয়ে যায়। নেশাগ্রস্ত আচরণের জন্য সে বাস্কেট বলের টিম থেকে বাদ পড়ে। তখন হেকটর তার মা মারিয়াকে ব্ল্যাক মার্কেটে অপিওড কেনার পয়সার জন্য চাপ দিতে শুরু করে। মারিয়া পয়সা না দিলে ছেলেটি তার চুল ছিঁড়তো, দেয়ালে মাথা আঘাত করে ফাটিয়ে রক্ত ঝরাতো। তো এ রকম অপিওড নিতে নিতে একদিন মাদকের ওভারডোজে তার মৃত্যু হয়। ‘ফুয়ে মুই ত্রিসতে ই ট্যাজিকো সিনিওর সুলতান বা ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক ও ট্র্যাজিক,’ বলে সানতস দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

এসপানিওলা সিটি সেন্টারের ছিরি-ছাদ বলতে কিছু নেই। বেশ কিছু পুরোনো মডেলের গাড়ি জনহীন সরণিতে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে, দেখে মনে হয় এগুলোর কোনো গন্তব্য নেই। ঘুরে বেড়ানোর ব্যাপারে আমার আগ্রহ মিইয়ে আসে। তখনই পুরোনো দিনের গানের কলিটি স্মৃতিতে ফিরে আসার মতো সিনিওরা মারিয়ার মুখের বিষাদগ্রস্ত অভিব্যক্তির মর্মার্থ আমার মনে পরিষ্কার হয়। এ বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে ধ্রুপদী জমানার চিত্রকররা যুগ যুগ ধরে ছবি এঁকেছেন। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ক্রুশবিদ্ধ মরদেহ চাক্ষুষ করে জননী মরিয়মের চোখমুখে ফুটে উঠেছিল ঠিক এ রকমের মর্মস্পর্শী বিষাদ।

আমরা একটি ভক্সওয়াগন মাইক্রোবাসের তলায় গোটা চারেক হুলো বিড়ালকে বসে থাকতে দেখি। মার্জারগুলো একচিলতে ছায়ায় যেন সম্মোহিত হয়ে বসে আছে। গাড়িটির পেছনে মিলিটারি হ্যাটে রোদ ফিরিয়ে খিন্ন মুখে ফুটপাতে বসে আছেন গৃহহীন প্রৌঢ় একজন সৈনিক। তিনি হাতে ধরে আছেন কার্ডবোর্ডের ফলক, তাতে মার্কার দিয়ে লেখা গাল্ফ ও কসোবো যুদ্ধে তাঁর শরিক হয়ে আহত হওয়ার সংবাদ। আমি সন্দেহপ্রবণভাবে তাঁর দিকে তাকালে, তিনি যেন মাইন্ড-রিডিংয়ের জাদুবলে আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে ওয়ালেট থেকে বের করেন তাঁর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকের আইডি। আমি তাঁর হাতে একটি ডলার তুলে দিই। অসন্তুষ্ট হন তিনি, বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচের দিকে নামিয়ে সঙ্গমের ইঙ্গিত করে চোখমুখ খিঁচিয়ে বলেন, ‘দিস ফাকেন ডলার উইল নট বি এনাফ টু বাই ওয়ান অপিওড, ডু ইউ নট আন্ডারস্ট্যান্ড আই অ্যাম সাফারিং উইথ ফাকিং পেইন।’ আমি তাঁর মন্তব্যকে আমলে না এনে সামনে বাড়ি।

ফুটপাতের ওপর মসলাদার মেক্সিকান খাবারের দাগ লাগা স্টাইরোমের বক্সে কে যেন পানি ভরে রেখেছে। তা ঘিরে হলুদ ঠোঁটে জল খাচ্ছে গোটা ছয়েক নাম না-জানা পাখি। আমি স্ন্যাপ শট নেওয়ার জন্য ক্যামেরা বাওছাও করলে ডানার পতপত শব্দে রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটিয়ে খেচরগুলো ছিটকে যায় চতুর্দিকে। আমি ও সানতস কদম কয়েক সামনে গিয়ে বাঁক ফিরি। মোড়ে সিমেন্টের চাতালের ওপর পার্ক করা বেজায় বিচিত্র একটি লো-রাইডার ভিনটেজ কার। গাড়িখানার বডিতে রং-তুলি দিয়ে অজস্র ছবি এঁকে ছোট ছোট ফিগারিন জাতীয় মূর্তি- বোধ করি সুপার গ্লু দিয়ে সেঁটে এমন হালতে ডেকোরেট করা হয়েছে যে, আমার মুখ দিয়ে আলটপকা বেরিয়ে যায়, ‘দিস ইজ ইনডিড অ্যা ভেরি স্ট্রেঞ্জ লুকিং কার!’ আমার অবাক হওয়াজনিত বচনটি লুফে নিয়ে জবাব দিতে এগিয়ে আসেন বাহনটির চড়নদার। হিস্পানিক উচ্চারণে তিনি জানান, তাঁর প্রিয় এ লো-রাইডারটি আদতে একটি আর্ট কার। আগামী সপ্তাহে গাড়িখানা তিনি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ক্যালিফর্নিয়ায় আর্ট কারের প্রদর্শনীতে দেখানোর জন্য। বলি, ‘সিনিওর, ইউ মাস্ট লাভ ইয়োর কার।’ দারুণ আহ্লাদে তিনি সিনায় ক্রুশ চিহ্ন এঁকে প্রার্থনার ভঙ্গিতে নতজানু হয়ে জবাব দেন, ‘অ্যাজ অ্যা ম্যাটার অব ফ্যাক্ট আই ওয়ারশিপ মাই কালারফুল কার।’ মূর্তিপূজকদের বিষয়-আশয় সম্পর্কে আমি ব্যাপকভাবে ওয়াকিবহাল। তবে গাড়িপূজকের সঙ্গে আমার মোলাকাত জীবনে এই প্রথম! তো এ ব্যাপারে বাতচিতকে দীর্ঘায়িত না করে চড়নদারের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে ইশারায় তাঁর সৃষ্ট বাহনের আরেক দফা তারিফ করে সামনে বাড়ি।

সিনিওর সানতস ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পড়ে মুখখানা ছিঁচকে অপরাধীর মতো কাঁচুমাচু করে বলেন, ‘পোয়েডো ইনভিতারতে আ ভেনির আকি এল ভিয়ারনেস সানতো? বা আপনাকে কী গুড ফ্রাইডের দিনে এখানে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারি, সিনিওর সুলতান?’ গুড ফ্রাইডের পরবে এসপানিওলা শহরের গোল চত্বরে নাকি জড়ো হবে লো-রাইডার মোটর কারগুলোর চড়নদার তরুণরা। সোমও মেয়েরাও সাজগোজ করে দাঁড়িয়ে থাকবে ফুটপাতে। ভিনটেজ কার অতি ধীরে ড্রাইভ করে চক্কর পাড়তে পাড়তে, যুবকরা অনুধাবন করার চেষ্টা করবে যুবতীদের চোখের ইঙ্গিত ও দেহের ভাষা। কোনো নারীর মুখে সম্মতির আলামত ফুটে উঠলে নির্দিষ্ট গাড়িটি ব্রেক কষবে। মেয়েটিকে তুলে নিয়ে যুগল যাবে সাংগ্রে দে খ্রিস্ত পাহাড়ের উপত্যকায় জয় রাইড বা যুগল অভিসারে।

আমি গুড ফ্রাইডের দাওয়াতে ঠিক উদ্দীপ্ত বোধ করি না। তবে হেঁটে যেতে যেতে ফুটপাতে বসে থাকা আরেকজন হোমলেস নারীর দিকে আমার চোখ চলে যায়। ওই নারী মুখ আড়াল করে কার্ডবোর্ডের ফলকটি তুলে ধরেন। তাতে লেখা, ‘ব্যাকপ্যাক ওয়াজ স্টোলেন, ক্যান ইউ হেল্প?’ এ নারী সিনিওর সানতসের পরিচিত। এঁর নাম জোসেফিনা। ইনিও মারাত্মকভাবে অপিওড অ্যাডিক্ট। বছর তিনেক আগে তাঁর কিশোরী-কন্যা আলেহান্দ্রা অপিওডের ওভারডোজ নিয়ে সুইসাইড করে। জোসেফিনা ব্যাকপ্যাক চুরি হওয়ার মিথ্যা তথ্য কার্ডবোর্ডে লিখে ফুটপাতে বসে থাকেন। পাঁচ-সাত ডলারের ভিক্ষা জুটে গেলে তিনি তাজা একটি গোলাপ কিনে নিয়ে মেয়ে আলেহান্দ্রার কবরে যান।

কবর গাহের পাশ দিয়ে ফিরতে ফিরতে আমি যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি ঘটে চলা অপিওড এপিডেমিক নিয়ে ভাবি। ফার্মাসিটিউক্যাল কোম্পানিগুলো অত্যন্ত অ্যাগ্রেসিভভাবে অপিওডের ব্যথানাশক গুণাবলি নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে, ডাক্তাররা সামান্য বিষবেদনার প্রতিষেধক হিসেবে অপিওড প্রেসক্রাইব করে চলছেন। গেল এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সত্তর হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে ড্রাগ ওভারডোজে। এ সত্তর হাজারের মধ্যে ৪৭,৬০০ জনের মৃত্যু হয়েছে অপিওড ওভারডোজে। বলা হচ্ছে, প্রতি এগারো মিনিটে একজন মানুষের জানের খতরা হচ্ছে অপিওডজনিত দুর্ঘটনায়। এ সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে এইচআইভি এইডস বা আফ্রিকায় ইবোলায় মৃতদের চেয়ে অনেক বেশি। স্থানীয় পত্রপত্রিকার বরাত দিয়ে জানা যাচ্ছে, এই এলাকায় গত এক বছরে ওপিওড ওভারডোজে মৃত্যু হয়েছে একশ’ মানুষের। কেবলমাত্র এসপানিওলা শহরের ১৩ কিশোর-কিশোরীর মৃত্যু এই পরিসংখ্যানের অন্তর্ভুক্ত।

সিনিওর সানতসের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি খিন্ন মনে গাড়িতে উঠি। সান্তা ফের দিকে ফিরে যেতে যেতে অনুভব করি, আমার মন থেকে গুলিবিদ্ধ হেলিকপ্টার নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে না পারার খেদ ইরেজারের ঘঁষায় কাঠপেন্সিলের দাগের মতো মিটে গেছে। লো-রাইডার কারে চড়ে যুবক-যুবতীদের যুগল ভ্রমণের ব্যাপারেও আমি আগ্রহ বোধ করছি না। তবে আরেকবার যদি এসপানিওলা শহরের আসার সুযোগ হয়, তাহলে আমি গোরস্তানে খানিকটা সময় কাটাতে চাই। ফলক থেকে অপিওডের অপঘাতে মৃত কিশোর-কিশোরীদের নাম জোগাড় করে তারপর সানতস বা মারিয়ার সাথে কথা বলে দেখবÑ যদি তাদের যাপিত জীবন সম্পর্কে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারি। বছর কয়েক আগে আমার সন্তানটি ছিল তাদের সমবয়সী, তাই এদের ঝুঁকিপূর্ণ লাইফস্টাইল সম্পর্কে বিশদভাবে জানাটা আমার কাছে প্রায়োরিটি হয়ে ওঠে।

মঈনুস সুলতান : ভ্রমণ-সাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares