রশীদ হায়দার ।।

দুপুরে খেয়ে বেসিনে হাত ধোয়ার সময়ই ফোনটা বেজে ওঠে। এই অসময়ে কে ফোন করতে পারে ভাবতে ভাবতে হাত ধোয়া শেষে ফোনের কাছাকাছি যেতেই বন্ধ। বেল সাহেবের এই আবিষ্কারটির ওপর আমার একটা প্রচণ্ড দুর্বলতা আছে। কে না কে, কোথা থেকে কোন প্রয়োজনে ফোন করছে ভাবলেই আমার ভেতরে একটি শিহরণ হয়। ফোন না তোলা পর্যন্ত বা ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিটি আদম না হাওয়ার দলের সে বিষয়বৃত্তান্ত দ্রুত ঘুরপাক খায় আমার মস্তিষ্কের কোষে কোষে। মনে মনে কামনা করি ওটা যেন হাওয়া দলেরই হয়। মানুষের কী বিচিত্র অভিলাষ, যে-কোনো বিষয় বা ঘটনা যেন তার মনোগত হয়, সেদিকটায়ই তার আগ্রহ থাকে।

আমিও এই ফোনটির ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠি। কেন কে, কোথা থেকে কিংবা কেনই-বা ফোন করে শেষে না পেয়ে রেখে দিলো, ভাবছি দেখে আনু জিজ্ঞাসা করে, কে ফোন করেছিল।

হাওয়া।

মানে! কোনো মেয়ে?

ফোনটা তোলার আগেই যখন থেমে গেল, তখন বিবি হাওয়া না বাতাস হাওয়া তা বুঝব কী করে?

আনু, অর্থাৎ আনিসা মানে আমার স্ত্রী শুধু বললেন- ও ও!

আমি অপেক্ষা না করে ঘরে যেতে যেতে বললাম,

এর পর এলে তুমিই ধরো।

মিনিট সাত আট যায় আর ফোন আসে না। ভেবে নিই ওটি আর আসবে না। যার দরকার সে আবার করবে, না করলে না করবে। আমার কী?

কিন্তু স্বস্তি মেনে বিষয়টিকে মন থেকে মুছেও ফেলতে পারছিনে, বুঝতে পারছি মনে একটা খচখচি কাজ করছে। প্রতিটি মুহূর্তে সুসংবাদ হয়, আবার  উল্টো চিত্রের কথাও শুনেছি, জেনেছি। ভাত খাওয়ার পর একটা পান খাওয়া বহুদিনের অভ্যাস। এখন এই চরম দুঃসময়ে পানের সাথে সিগারেটের পরিমাণটাও বেড়ে গেছে। মানুষের অসহায়ত্বে কোন জিনিস মানবিক শান্তি ও স্বস্তির অবলম্বন হতে পারে তা আমার মাথায় খেলে না।

বারবারই মনে হচ্ছে, কে ফোনটা করল, কেনই-বা করল। সহসা একটা সম্ভাব্য কারণ মনে পড়ায় মনটা বেশ হালকা লাগে। ফোনটি নিশ্চিয়ই ভুল নম্বরে এসেছে এটা মনে করেই সে আর করেনি। আমার চিন্তার বাক্যটিও শেষ হয়নি। আবার ফোন বেজে ওঠে। আনুকে আগেই বলে রেখেছিলাম বলে দ্রুতপায়ে আর এগিয়ে গেলাম না, এর মধ্যেই শুনি আনু বলছে,

হ্যালো

ফোনের ওপাশে কী কথা হলো শুনতে পাইনি, তবে আনুর কথা শুনে মনে হলো ওপাশ থেকে জানতে চাইছে এটা আমার বাসা কিনা?

হ্যাঁ, এটা ওনারই বাসা কিন্তু আপনি কে?

আমি ততক্ষণে আনুর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলি, ফোনটা দাও।

ফোনটা কানে চেপে কয়েকটা মুহূর্ত অপেক্ষা করি। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আর কোনো কথা বা প্রশ্ন আসে না। ধরে নিই আমিই যে ফোনটা ধরেছি তা নিশ্চিত হতে। শান্ত গলায় বলি,

আপনি কে বলছেন?

উল্টে অপর প্রান্ত জানতে চায়,

আপনি কি হামিদ সাহেব বলছেন?

দিনকালের কথা চিন্তা করেই বললাম,

দেখুন ফোনটা করেছেন আপনিই। পরিচয়টা না জানলে আপনার সঙ্গে কথা বলব কিনা তা ভাবতে হবে।

মনে হলো অপর প্রান্ত একটু থমকে গেছে। পরে কণ্ঠস্বরটি খুবই মোলায়েম করে জানায়, দেখুন, আমি আপনাকে চিনি। বেশ ভালোভাবেই চিনি, তবে সামনা-সামনি পরিচয় হয়নি কখনও।

জানতে চাই- আপনি আমার ফোন নম্বর পেলেন কীভাবে?

হেসে ফেলে অপর প্রান্ত। হাসির রেশটা গলায় রেখে জবাব দেয়- আপনাদের মতো মানুষদের ফোন নম্বর পেতে তেমন কষ্টই করতে হয় না।

এবার আমার হাসার পালা। আমিও গলায় হাসিটা চেপে রেখেই বললাম- আমাদের মতো মানুষ, মানে?

অবশ্যই। আপনারা সমাজের মাথা। আপনাদের মতো লোকদের কাছেই তো জনগণ আসে, পরামর্শ নেয়, নেয় না বলুন!

কথাটা মিথ্যে বলেনি ফোনের অপর প্রান্ত। মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় বহু জায়গায় বক্তৃতা করেছি, টেলিভিশনেও দেখিয়েছে অনেকবার, মিছিলের একেবারে সামনের সারিতে ব্যানার হাতে ধরেছি, কাগজের ছবিতেও তার প্রমাণ রয়েছে। খ্যাতি পরিচিতি তো পায়ে হেঁটে আসে না, তাকে হেঁটে হেঁটে মাইকে গলা ফাটিয়ে জানান দিয়ে দিয়ে আনতে হয়।

নেতা হওয়ার কথা কোনোদিন চিন্তা করিনি, সেই কলেজ বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময় কোনো আন্দোলন টান্দোলনেও যাইনি, তবে হলে ছাত্রলীগের মিটিংয়ে দুই একবার বক্তৃতা করে এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয়নি, ভবিষ্যতে রাজনীতি করলে নিশ্চয় খারাপ করব না। সবাই তো আর শেখ মুজিব হয় না। ফোনের অপর প্রান্তের মানুষটিকে এবার একটু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে জাগছে। বলছে আমাকে চেনে, জানে, এমনকি আমার বাসাও তার চেনা। মন শক্ত করে তাকে আসতে  অনুমতি দিলাম।

তবু খচ্খচ্ করতেই থাকে। বেশ কিছু খবরও কানে এসেছেÑ বহু আপনজন, নিকটাত্মীয়-স্বজন, এমনকি ভাইও ভাইকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করেনি। রাতে বিছানায় বারবার এপাশ ওপাশ করছি দেখে বউ জেগে যায়। জানতে চায়- কী হয়েছে তোমার? ছটফট করছ কেন?

না, কিছু না। ঘুম আসছে না।

তা বুঝতে পারছি। তবে এ রকম ছটফট তো করো না।

তখন বউকে সব খুলে বলি। শুনে গম্ভীর গলায় বলে- তাকে চেনো না, জানো না, অথচ বাসায় আসতে বললে?

কিন্তু সে তো আমাকে চেনে,  আমার বাসাও চেনে। আসবেন না বললে কি শুনবে?

বউ শুধু হুঁ বলে পাশ ফিরে শোয়।

আমি কখন ঘুমিয়ে গেছি বলতে পারব না। দেখলাম জানালার ফাঁক দিয়ে যে আলো ঢুকেছে তাতেই স্পষ্ট হয় সূর্য নিশ্চয়ই দশ-বারো হাত উঠে গেছে। অন্যদিন হলে বেলা বিশ-পঁচিশ হাত না উঠলে আমি উঠিই না। কিন্তু সূর্যের আলোর পরিবর্তে টেলিফোনের অপর প্রান্তের সেই লোকের কথা মনে পড়ে- সে আজ আসবে। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠি। যেন সে এসে গেছে। চোখে পড়ে বউ পাশে নেই। আগেই বিছানা ছেড়েছে। আর দরজায় চোখ পড়তেই দেখলাম বউ সকালেই স্নান সেরে ঘরে ঢুকছে। মাথায় কাপড়। তখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়। আনু সকালে উঠেছিল নামাজ পড়ার জন্য।

শুধু বলেÑ বাকি রাত আমি ঘুমাইনি। কী হবে গো?

আনুকে আমি বিষয়টি জানাতে চাইনি, এমনকি বুঝতেও দিতে চাইনি আজ আমি নিজেই এমন একজনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি যে, সে আমার শত্রু না মিত্র। সত্য চেপে রাখার আনন্দ ও বেদনা দুটোই আছে, কিন্তু এটা কোন সত্য, সেই সত্য সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আনুর প্রশ্নে শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। দেখি ওর মুখেও ভয়ের ছাপটা স্পষ্ট। শান্ত গলায়, সান্ত্বনা দেবার জন্য শুধু বলি- আল্লাকে ডাকো। এ ছাড়া আর কী বলব।

হুঁ।

দু’জনই বুঝতে পারি আমরা একে অপরের ওপর নির্ভর করতে চাইছি। আনন্দ বা সুখের সময় হলে সময়ের সদ্ব্যবহার হয় শারীরিক মিলনের মধ্য দিয়ে; কিন্তু এখন?

কী করে এখন তা সম্ভব? শরীরই সাড়া দিচ্ছে না। স্পষ্ট বুঝতে পারছি সময়ই সময়ের প্রয়োজন ঠিকই মিটিয়ে নেয়। আমি সময়ের কাছেই আত্মসমর্পণ করি। আনুকে আর কিছুই বলতে পারিনে। সময় যায় না কাটে তাও অনুভবে ধরা দেয় না। একেই বুঝি বলে মৃত্যুশঙ্কা। একটু পরেই বুঝতে পারি আমার সিগারেট খাওয়ার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। দিনে পাঁচ-সাতটা থেকে চৌদ্দ, পনেরো; মনে হয় কুড়িটার পুরো প্যাকেটই এখন সান্ত্বনার সাথি। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে দিনের অসময়েই কখন যেন ঘুমিয়ে যাই। মনে পড়ে না। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি বলতে অপারগ। হাতে ঘড়ি দিয়ে কোনোদিনই ঘুমাই না। ঘড়ি থাকে বিছানার বিপরীতে একটা টেবিলে। আমার প্রিয় টেবিল। দাদার আমলের। শিশু কাঠের। এটার বয়স আব্বার হিসাবে আশি-টাশি হবে। টেবিলের বয়সের চাইতে কাঠের নামই বেশি মজার। নাম না শুনলেও গাছটা যে বুড়িয়ে গেছে এটা যেমন শুনেছি, তেমনি দেখেছিও। আমাদের ধানের ভাঁড়ার ঘরের পেছনেই যে বেলে আমগাছে বলা যায় আমের ভারে যেমন গাছের ডালপালা নুয়ে পড়ে, তেমনি বেশ কয়েক বছর পর দেখি আমের ভরা মৌসুমেও সে ডালগুলোই সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাতে কোনো মুকুল আসে না, আমও দেয় না।

নিজেকেই জিজ্ঞেস করি- কখন আসবে আমার অতিথি?

আসবে আসবে। তার গরজেই আসবে।

হ্যাঁ বুঝি তার গরজেই আসবে, তবে গরজটা যেমন আমার কাছে স্পষ্ট নয়, তেমন মৃত্যু ভয়টাও উড়িয়ে দিতে পারছিনে। আমি জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকে কখনও আকাশে মেঘের আনাগোনা দেখিÑ রং বদলানো, গাছে পাতারা বাতাসে দুলে দুলে সুখের কথা কয় না, আনন্দেও গান গায়। আমার ধারণায় ওরা আমার মৃত্যুর কথাই বলছে। এখন তো মৃত্যু ঘুড়ি ওড়ানোর পর্যায়ে চলে গেছে। জানি, পালানোর চেষ্টা বৃথা, কারণ এই মুহূর্তে বড় চর বাতাস।

ঘরের জানালা থেকেই দেখলাম বাসার অদূরে জলপাই রঙের একটা জিপ থামল। বাসার সদর গেটে না, থেমে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ানো দেখে মনে খটকা লাগে। কেন এই দূরত্ব? জিপ থেকে ড্রাইভার বাদে নামল চারজন। দু’জন সেনাবাহিনীর পোশাকে, অন্য  দু’জনের একজন কালো প্যান্ট ও হাফ হাতা নীলচে শার্ট, আরেকজন পায়জামা-পাঞ্জাবি, মাথায় কিস্তি টুপি। তারা কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে সোজা আমার বাসায় এসে দরজায় কড়া নাড়ে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করলে যদি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে যায়, সেই ভয়ে দরজা খুলেই প্রথমেই এক মিলিটারিকে বলি- আসসালামু আলাইকুম।

সালামের পুরো জবাব পেলাম না। শুনলাম-

ওয়ালে, ওয়ালে।

আরেক মিলিটারিকেও একই সৌজন্য দেখালে সে হাঁ না কিছুই না বলে আমাকেই ঠেলে ঘরের মাঝখানে এসে বলে- তুমিই কি সেই…

সঙ্গে সঙ্গে কিস্তি টুপি বলে ওঠে- জ্বি স্যার। জ্বি স্যার। উনিই উনি।

তার তীক্ষè আগুনভরা চোখ আমার গা পুড়িয়ে দিচ্ছে। সে হয়তো গায়ে জ¦ালাধরা বিশ^াসই করতে পারছে না আমার মতো একটা পুঁচকে ভেতো বাঙালি পাকিস্তানের মতো একটি শক্তিমান সেনাশাসিত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে। হ্যাঁ, আমি মিটিং মিছিলে গায়ে জ¦ালাধরা বক্তৃতা করেছি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তাদের বিরুদ্ধে একটা গুলি কেন, সামান্য একটা ভাঙা কাচের টুকরোও ছুঁড়িনি। গুলি তো নয়ই, তাতেই এত রোষ, সত্যি সত্যিই তা করলে আমাকে আমারই ঘরে এতক্ষণ বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেবার কথা। দুই মিলিটারি একজন চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে মৃদু হেসে উর্দু নয়, পশতু না পাঞ্জাবি ভাষায় কী যেন বলে বাঙালি হাফহাতা শার্টকে বলে- চল অন্য ঘরে দেখা যাক।

আমাকেই আগে যেতে বলা হলো। কাঁপা কাঁপা পায়ে গেলাম। ঘরের মাঝখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকেই দেখি দুই বাঙালিও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে; আর দুই মিলিটারি ঘরের ছাদ, ফ্যান, এ কোণা, সে কোণা, এমনকি বুট পায়েই খাটে উঠে আলমারির মাথা দেখে, মেঝেয় নেমেই ঘরের উত্তর-পশ্চিম কোণায় চলে যায়। আমি অবাক হয়ে দেখি, সে গিয়ে হাত বাড়ালো সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো নজরুলের ছবির দিকে। উর্দুতেই জানতে চায়- এটা কার ছবি? এত যত্ন করে বাঁধিয়ে রেখেছো?

আমি ভাঙা ভাঙা উর্দু দিয়ে বোঝাতে চাই- উনি একজন বড় কবি, ভারতের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় জন্ম।

আমার মুখের কথা থাবা মেরে কেড়ে নেয় এক মিলিটারি।

কী! কী বললে? ভারতে জন্ম?

হ্যাঁ। যখন জন্ম তখন তো ইংরেজ আমল…

ঘর কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে  ওঠে-

স্টপ! থামাও তোমার বক্তৃতা। ভারতের কবি! হিন্দু?

না, না, পাক্কা মুসলমান।

বলার সাথে সাথে রাইফেল তাক করে আমার দিকে। বলে- মুসলমান হলে দাড়ি কোথায়? মাথায় টুপিই বা নেই কেন?

মিলিটারির সাথে দুই বাঙালির একজন শুধু বলে- স্যার স্যার, উনি খাঁটি মুসলমান।

তুমিও ওই ভারতীয় কাফেরের হয়ে দালালি করছ? হুঁ। খাঁটি মুসলমান! খাঁটি বা পাক্কা মুসলমান কেবল পাকিস্তানেই জন্ম নেয়। মানো?

এবার আমার বুকের কাঁপুনি সত্যিই বেড়ে যায়। নজরুলের পাশেই তো রবীন্দ্রনাথের বাঁধানো ছবি। তার নামই তো বলে দেয়- তিনি মুসলমান নন। তার প্রশ্ন মানতে গেলে এখনই আমি তার রাইফেলের শিকার হব। কিন্তু কী করে যে ব্যাপারটি ঘটে গেল তা বোঝার আগেই দেখি মিলিটারিদের একজন চোখের পলকে কোমর থেকে পিস্তল বের করে ঠা ঠা করে গুলি করছে নজরুলকে। ফ্রেমের অচল নজরুল বুলেটের আঘাতে আঘাতে অনেক হয়ে মেঝেয় ছড়িয়ে পড়ল। দেখলাম একটা গুলি লেগেছে মুখের পাশে। কানের ঠিক নিচে। এই ছবিতে নজরুলের মুখটা হাসি-হাসি। গুলির কারণেই কিনা জানি না, নজরুলের হাসিটা আরও চওড়া হয়ে যায়। দেখে আমার মনের খুশিটাও হঠাৎ বৃদ্ধি পায়।

এবার রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পালা। পিস্তল হাতেই অনেকক্ষণ সে রবীন্দ্রনাথের দিকে চেয়ে থাকে। এক সময় খেয়াল করি সে একবার তাকায় আমার দিকে, আরেকবার কবির প্রতি। সেই তাকানোয় মিলিটারির রুক্ষতা নেই। সে রবীন্দ্রনাথের দাড়িতে হাত, বাবরি চুলের প্রতিটি ডগা স্পর্শ করছে। স্বাভাবিক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চায়- ইনি কে?

আমাদের আত্মীয়।

হুঁ। নাম কী?

রবিউল হোসেন।

উনি কী করেন?

উনি বেঁচে নেই।

ও সরি! সরি! তুমি কি তাকে দেখেছো?

না। আমার জন্মের বছরই তার মৃত্যু হয়।

আমি স্বচক্ষে দেখিনি বলে চুক চুক করে খানিক দুঃখ প্রকাশ করে বলে,

দেখে মনে হয় খুব আল্লাহ রসুলওয়ালা পরহেজগার মানুষ ছিলেন।

জ্বি, জ্বি!

এইবার সে আসল কথাটা বলে,

এই খোদাবন্দ মানুষটার জন্য তুমি বেঁচে গেলে।

রশীদ হায়দার : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares