হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি : নাজিব তারেক

নাজিব তারেক ।।

বয়স তখন নয়-দশ। ছোটদের বিশ্বকোষ নামে পাঁচ খণ্ডের গ্রন্থ হাতে এলো। বিশ্ব যেন হাতের মুঠোয়। বড় ভাইবোনেরা ছবি আঁকে, আমিও মাঝে মাঝে। তবে আমি পড়ি। পড়াতেই আনন্দ। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে লেখার পাশের ছবি দেখি। পড়াটি যেন আরও আরও খোলতাই হয়। তো এই ছোটদের বিশ্বকোষ গ্রন্থে একটি অধ্যায় হচ্ছে ভারতীয় চিত্রকলা। সেখানে নামিদামি চিত্রকরদের ছবির রেখালিপি আছে, কালো রেখা ও বিন্দুতে আঁকা। অবন ঠাকুর, যামিনী রায়ের নাম জানি বড় বোনের কারণে, নানার ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার প্রবাসী বা অনুরূপ পত্রিকার পাঠক হচ্ছে বড় বোন। আর তিনি হচ্ছেন যথার্থ শিল্পী, মানে রবীন্দ্রনাথের ‘দেখা ও দেখাবার আনন্দই শিল্প’ ধারণার বাস্তব উদাহরণ। যা তিনি পড়েন, দেখেন তা তার অন্যের সঙ্গেও ভাগ করে নিতে হবে। কিন্তু তিনি যা দেখেন, পড়েন তার ভাগ নেওয়ার মতো লোকের অভাব। আমি কি ভুলে যেন তার দেখবার পড়বার ভাগীদার হয়ে গেলাম। সে সূত্রেই প্রবাসী, মোহাম্মদি, ইত্যাদির পাতায় অবন, গগন, অতুল, যামিনীসহ অনেকের সাথেই পরিচয়।

তাঁরা আছেন এবং আরও একজনের ছবিও বিশ্বকোষের পাতায় আছে। এতই হতবুদ্ধিকর সে ছবি যে, নামটাই দেখতে ভুলে গেলাম। বিশ্বকোষ পড়ি আর মাঝে মাঝেই সেই ছবি দেখি। সে ছবি দেখি আর বিশ্বচিত্রকলা অধ্যায়ে পিকাসো নামে আর একজনের ছবি দেখি। পিকাসোর ছবিটি পিকাসোর বড়বোন না বললে হয়তো এটারও নিচে নাম দেখতে ভুলে যেতাম কিংবা পিকাসো নিয়ে দু-এক ছত্র ছিল বলেই হয়তো পিকাসোর নাম দেখা হয়েছিল। নিয়তি আমায় টেনে নিলো এ পথে।

চারুকলার ছাত্রত্ব নেওয়ার কোনো শখ বা ইচ্ছে আমার কোনো কালেই ছিল না। বড়রা ছবি আঁকে এবং তাদের ধারণা আমিও আঁকতে পারি, সে ধারণাই কী করে স্কুল সহপাঠী থেকে রাজশাহী শহরের ‘বুকস প্যাভিলিয়নের’ মামার (সহপাঠীরা মামা বলে ডাকতো তাই) হলো, তা এক রহস্য। তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত জয়নুল ও অন্যান্য গ্রন্থ (ক্যাটালগ) আমায় গছিয়ে দিলেন এবং তা বাকিতে, যদি আমি মূল্য পরিশোধ করি তাহলে, নইলে মূল্য পরিশোধ করতে হবে না। মসজিদ সেক্রেটারি পিতা, সামাজিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে যিনি তার বড় মেয়েকে আর্ট কলেজে ভর্তি হতে দেননি বলে ছোট মেয়েকে নাচ শিখতে দিতেও আপত্তি করছেন না, তিনি এসব বই দেখে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা করলেন। তো মামা সে মূল্য পেয়ে আরও কিছু বই দিলেন উপহার হিসেবে। সেখানে ভারতীয় ললিতকলাও ছিল। সেখানেই দেখা হলো যোগেন, স্বামীনাথন ও রামেশ্বর ব্রুটার সাথে।

যাঁরা ছিলেন, যাঁরা আছেন

জয়নুল ও অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন মুর্তজা বশীর, কাজী আব্দুল বাসেত আর ছিল নবীন চারুকলার একখান ক্যাটালগ, আর তাতে ছিলেন মমিনুল রেজা। পত্রিকার পাতায় কাইয়ুম চৌধুরীকে চিনতে শিখেছি, স্কুল পাঠ্যে হাশেম খান। আর একবারেই শৈশবে, সেই বিশ্বকোষের কালে কিশোর বাংলার পাতায় ছিলেন আফজাল হোসেন। আবদুল্লাহ আল মুতীর হাত ধরে শওকাতুজ্জামান ও ফরিদা জামান। ব্যাংকের ক্যালেন্ডারে চেপে কামরুল হাসান ও রফিকুন নবীকে চেনা হলো। আর ছিলেন সোভিয়েত আঁকিয়েরাÑ প্রগতি ও রাদুগাঁর বই হয়ে।

সীমানা পেরিয়ে

বই ভ্রমণের অভাব পূরণ করে, সৈয়দ মুজতবা আলীর এ কথাটি আমার জন্য শতভাগ সত্য। চারুকলার ছাত্রত্ব নেওয়ার আগেই এসএসসি পরীক্ষা চলাকালেই বুকস প্যাভিলিয়নেই পাওয়া গেল সৈয়দ আলী আহসানের শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য এবং আবুল মনসুরের শিল্পী দর্শক সমালোচক। সৈয়দ আলী আহসান পরিচিত করালেন ক্যানদিনিস্কি, পল ক্লে ও মাতিসের সাথে।

যে আমি গ্রাম ছাড়া এই রাঙামাটির পথে

কামরুলের জলরং, ক্যালেন্ডারের পাতায় পাতায় যে জলরং তা আমায় জলজ বাংলায় ভাসিয়েছে, আজও ভাসছি। গড়াই নদী পেরিয়ে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে নতুন পিচঢালা পথে আমরা পাঁচজন চলেছি শিলাইদহ কুঠিবাড়ি দেখতে। হিন্দু কবি এবং জমিদার রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি কী এমন দেখার বিষয় তা আমার মাথায় ঢুকছে না, হ্যাঁ জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা তিনিÑ এটা একটা ভাববার বিষয় বটে। বন্ধু লিনের শখ, তাই যাচ্ছি আর কি! বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত দেখে মন কিছু হালকা হয়েছে, নিজের মনেই গেয়ে উঠলামÑ গ্রাম ছাড়া এই রাঙা মাটির পথ… তো দেয়ালে ঝোলানো জমিদার বাবুর বিবিধ ফটোগ্রাফ। ফাঁকে ফাঁকে কিছু ফটোগ্রাফ, কেয়ারটেকার কাম গাইড জানালেন এগুলো রবি বাবুর আঁকা! হলদে দেয়ালে ঝোলানো সাদাকালো সব ছবিই যেন রঙিন হয়ে উঠল। জলজ বাংলা যেন মহাসমুদ্র হয়ে ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীর বন্দরে বন্দরে। রবীন্দ্রনাথের হিন্দুত্ব কিংবা জমিদারিত্ব কোথায় হারালো সে আমি জানি না, শুধু জানি আমি হারিয়ে গেলাম হাজার বছরের পথে…

মাটি খুঁড়ে তুলে আনি বিবিধ রতন

১৯৯০, ১৯৮৮ থেকে ৯০। চারুকলা পাঠাগার এক বিশাল খনি। আঁতেল অভিধা জুটে গেছে এ খনি শ্রমিকের। ভ্যানগগ, পিকাসো, ক্লি, ডালি আর হুসেনের নাম জুড়ে গেছে আমার নামের সাথে। বিরক্ত ভীষণ বিরক্ত আমি। জি এস কবীর হেসে বললেনÑ রাগছিস কেন? তোর সাথে তুলনা হচ্ছে যাদের নাম তারা সব বিশ্বখ্যাত।

খিলগাঁও গার্লস স্কুলের পাশ থেকে রেলগেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আলতামিরার নারী চিত্রকর কিংবা গ্রামবাংলার ঘর লেপা নারীর কথা মনে ভেসে এলো, রাতের তারার আলোয় জানলাম ‘হাজার বছর ধরে পথ হাঁটিতেছে আমি’ সেখানে দেখা হয়েছিল কতজনার সাথেই। গল্প জমেছিল তাদের সাথে যারা আমার মতো।

জয়নুল ও সাঁওতাল রমণী

ক্যামেরা ও মুদ্রণযন্ত্র চিত্রকলাকে দু’ভাগে ভাগ করে ফেলেছে- মিউজিয়ামের দেয়ালে ঝোলানো চিত্রকলা অথবা মুদ্রিত চিত্রকলা। ইদানীং চিত্রকলা হচ্ছে তিন প্রকারÑ মিউজিয়াম, মুদ্রিত ও অনলাইন। দর্শক ভোক্তা হিসেবে আমি মুদ্রিত ও অনলাইন রসিক। মিউজিয়াম দেখার সুযোগ আমার নেই, ইউরোপে জন্ম না নেওয়ার এটাই বাস্তবতা। আমি আমার এই সীমাবদ্ধতাকে উপভোগ করি। বই, পত্রিকা, ক্যালেন্ডার, পোস্টার, কার্ড, স্টিকার, ইত্যাদি আমার কাজে তাই মিউজিয়াম ভ্রমণের সমান। জয়নুলের এ ছবি দুটি প্রথম দেখি শিল্পকলা একাডেমি প্রকাশিত Zainul Abedin গ্রন্থে। পাশাপাশি দুই পৃষ্ঠা ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ছবি। দুটোই ১৯৫১ সালে আঁকা। জল রঙে। যদিও জল রঙে আঁকা কিন্তু তৈলরঙের ঢঙে। এটা জয়নুলের নিজস্ব টেকনিক অথবা স্টাইল। জয়নুলের আর সব ছবির মতোই এটারও পরিপ্রেক্ষিতের দিগন্ত বিন্দু ছবির উপরের অংশে, অর্থাৎ শিল্পী ছবির অবয়বগুলোকে দেখছেন কিছুটা নিচু থেকে। ফলে ছবির মধ্যে চরিত্রগুলো বিশাল আকার ধারণ করছে। একই গুণ আমরা কালিঘাটের পটচিত্রে দেখতে পাই, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রেও এ গুণ বিরাজমান। যেন আমরা আকিরা কুরশাওয়ার সিনেমার কোনো স্টিল দেখছি। পিকাসো ও মাতিসের কিছু ছবিতে এ রকম দৃষ্টিকোণ দেখা গেলেও ইউরোপীয় চিত্রকরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এটা দেখা যায় মাইকেল এঞ্জেলো, এল গের্কো, রেনোয়া ও চিরিকোর ছবিতে। তাত্ত্বিকভাবে দেবতার ছবি আঁকবার ক্ষেত্রে ভারতীয় ষঢ়ং-এর নির্দেশনা এরূপ হলেও অবনঠাকুরের ভারত মাতা চিত্রে আমরা এ দৃষ্টিকোণটির ব্যবহার প্রাচীন ভারতীয় দেবচিত্রের তুলনায় অধিক পাই। রবি বর্মার চিত্রেও এই দৃষ্টিকোণ পাওয়া যায়। পট কিংবা নন্দলালের মোটা কালো রেখা, গের্কো, মাতিস ও জার্মান এক্সপ্রেশনিস্টদের ক্যানভাসে রঙ লাগানোর সচলতা ও চীন-জাপানের স্বল্পতা ও শূন্যতা মিলে যা দাঁড়ায় তা জয়নুল। অনন্য জয়নুল। জলরঙের স্বচ্ছতাকে না ক্ষতিগ্রস্ত করেও তাকে তেলরঙের তুলিতে ব্যবহার জয়নুলের আগে কেউ করেনি, পরে কি কেউ করেছে?

 যে সাঁওতালদের দেখছি শৈশব থেকে। জয়নুল তাদের আমার সামনে উপস্থিত করলেন ‘অভূতপূর্ব গ্লামার’ সহযোগে। যাহা কামকে জাগ্রত কওে, তাহাই শিল্প।

মৃত্যু ও আগুন

সৈয়দ আলী আহসানের শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য বইয়ে যে ক’টি ছবি ছিল তার মধ্যে পল ক্লির মৃত্যু ও আগুন ষোলো বর্ষীয় আমাকে সবচেয়ে বিস্মিত করেছিল। চটের ওপর তেল রঙে আঁকা এ ছবি নির্মাণের অনন্যতা আজও আমায় বিস্মিত করে। ছয় বছর ধরে অসুস্থ, মৃত্যুপথযাত্রী ক্লির এ ছবি খুবই পরিচিত শিশুসুলভ রূপাঙ্কনেই আঁকা। বিশ্বযুদ্ধ, অসুস্থতা- সব মিলিয়ে ক্লি যেন মৃত্যুকেই আহ্বান জানাচ্ছেন, মুক্তির উপায় ভাবছেন! আসলেই কি তাই? না, রঙ ও বিন্যাস কিন্তু বলছে ভিন্ন কথা। মধ্য ভাগে বিশাল মুণ্ডুটি, ইংরেজি Death, জার্মান মৃত্যু D এর Tod সদৃশ্য, সেখানে চোখ ও মুখ কি আমাদের কোনো ভুতুড়ে অনুভূতি দেয়, না এক কৌতুকের আভাস দেয়? ডান হাত হয়ে জার্মান মৃত্যু Tod এর T ধরে আছে O কিংবা পূর্ণ চাঁদকে, পূর্ণিমাকে কি করে অস্বীকার করি। বাম পাশের যে মনুষ্য অবয়ব সে কি আঘাত করছে মাথায়, নাকি অন্য কিছু? আর একদম মাথার ওপরের তিনটি দাগ? ভারতীয় ভাবনার আমি কি চিতার আগুনে চড়ে স্বর্গলোকে যাত্রাকেই দেখি এ চিত্রে? যতই দেখেছি তাকে ততই মনে হয়েছে ক্লি ইউরোপের মাটিতে ভারতীয় চিত্রকর।

চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে

আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। হ্যাঁ, জাতীয় সঙ্গীতের বাইরে এটুকুই রবীন্দ্রনাথ। বড় বোন রবীন্দ্রসঙ্গীত ভক্ত, বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ পড়ছে, ছোট ভাইটিকে পড়াচ্ছে। গান শিখতে গেলে রবীন্দ্রনাথ দুই লাইন শিখতেই হয়। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ কবিতা বা নাটকে আছেনই। কিন্তু আমার বা আমার মতো অজস্রের কানে মন্ত্রপাঠের মতো বলা হচ্ছেÑ এ হিন্দু কবি, তাকে বর্জন করো। এ রকম আরও কত কথা। এসবের উল্লেখ কেন করছি বারবার? করছি এ কারণে যে, অজস্রের অজুত ঘৃণা ও মিথ্যাচারের বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং জবাব। আমার এগারো বছরের পুত্রের বাক্যেÑ রবীন্দ্রনাথ মানে বাংলা ভাষা।

ছবি যা আঁকি তা শিল্পী হওয়ার জন্য নয়, আঁকতে পারি তাই বন্ধুদের সাথে বিবিধ বেড়ে উঠবার আমিও সঙ্গী। সেখানে দক্ষ হওয়ার কোনো চেষ্টা বা ইচ্ছা নেই। রবীন্দ্রনাথ সে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখেÑ হও দেখি অদক্ষ, কতখানি পারো! পল ক্লি ব্যতীত আর কেউ এ সংকটকে মোকাবেলা করেছেন বলে মনে হয়নি। এ যেন সক্রেটিসের ‘আমি জানি আমি জানি না’। আলতামিরা গুহাচিত্র থেকে ইউরোপীয় রেনেসাঁর যে যাত্রা তা প্রতিচ্ছায়াবাদী চিত্রকলা হয়ে ব্রাক-পিকাসোর কিউবিজমে এসে থমকে দাঁড়ায়। প্রকাশবাদ হয়ে পপ ও অপ-এ এসে ঠেকেছে যা। পুরো এই যাত্রায় দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। চীন কিংবা জাপান কিংবা পারসিক চিত্রকলা কিংবা আফ্রিকার ভাস্কর্য, ভারতের লোকচিত্র, সর্বত্রই দক্ষতার যে সাধনা সেখান থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলেন রবীন্দ্রনাথ ও জার্মান প্রকাশবাদী বা Expressionist-রা। না আজও কেউ রবীন্দ্রনাথের ধারেকাছেও নেই! পল ক্লি, মাতিস, মুংখ, ককোচকা, কিচনার, নোলডে, ডাবাফেট কিংবা হালের এ আর পেঙ্ক, জিন মিশেল বাসকিয়াতও নয়।

যে অদ্ভুত মগজের গভীরে আছে, যে অদ্ভুত বেড়ে উঠছিল সে অদ্ভুত চোখের সামনে যখন উপস্থিত হলো আমি নিজেই নিজের কাছে অচেনা হয়ে গেলাম। এরপর হাতড়ে বেড়ানো, নিজেকে খোঁজা। তার গান কিংবা কবিতা কিংবা নাটক এমন কি প্রবন্ধও তার ছবির মতোই অদ্ভুতের সন্ধান। যাকে আমরা বেড়ে ওঠা বলি, কিশোরের বেড়ে ওঠা, যুবকের বেড়ে ওঠা, প্রৌঢ়ের বেড়ে ওঠা। রবীন্দ্রনাথ তাই মানুষ হয়ে ওঠার প্রশ্নে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, সে সাধারণ কী অসাধারণ।

রবীন্দ্রনাথের রেখারা একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকে, রঙ রেখার সাথেই এমন করে মিশে যায় যে, সাদা কালো আলোকচিত্রে একই ছবি ভিন্ন এক ছবি হয়ে যায়। অবয়ব বা ফর্ম যা দেখছি তা থেকে কল্পনার ডানা মেলে অন্য অবয়বে পরিণত হতে চায়। না এটা ইউরোপীয় ‘দৃষ্টি বিভ্রমে’র যে নির্মাণ ব্যাকরণ সে রকম নয়। এটা শরতের মেঘের রূপ বদলে যাওয়ার মতো। যা দেখছি তাই কি, নাকি যা ভাবছি তা! রক্ত করবীর রাজার যে রূপহীনতা, ক্ষমতার যে আড়াল তা পাণ্ডুলিপির কাটাকুটি হয়ে জগৎকেই আবিষ্কার করল। জগৎ যে ধরা পড়ে রূপে। রাজা যখন রূপে এলেন তখন তিনি ক্ষমতাহীন, সাধারণ এবং অসহায়।

স্মরণের অধ্যবসায় বা সাধনা

ছবির বাঁদিকে এক বেদি যেখানে একটি কমলা রঙের পকেট ঘড়ি, যা পিঁপড়াক্রান্ত। তার পরেই একটি নরম হয়ে যাওয়া গলে পড়তে থাকা ঘড়ি, বেদির উপরেই এক মৃত গাছের শাখায় আরও একটি নরম ঘড়ি ঝুলে আছে, গাছের আড়ালে এক টেবিল উপরিতল আকাশের প্রতিচ্ছায় ধারণ করে বেদি। গাছ ও গাছের ডালের ইঙ্গিত অনুসরণ করে আমাদের চোখ দিগন্তে না হারিয়ে চলে যায় রুক্ষ পাথুরে পাহাড়ে যা দাঁড়িয়ে আছে এক জলধারে কি সমুদ্রবক্ষে। এর পরই আমরা আবিষ্কার করি বেদির পাশেই নরম ঘড়ির নিচে একটি প্রায় গলে যাওয়া মনুষ্য মুখাকৃতি। বেদি ও ভূমির অধিকাংশই ছায়াচ্ছন্ন। সবুজ প্রাণহীন। বাদামি, পোড়া বাদামি। পড়ো ভূমি।

চওড়া ১৩ ইঞ্চি উচ্চতা সোয়া ৯ ইঞ্চি। ছোট একটা ছবি এলোমেলো করে দিলো ইউরোপের দেখবার চোখকেই। শিরোনামে আর এক ধাক্কা। স্মরণের সাধনা (Persistence of Memory)। যে পরিপ্রেক্ষিত ইউরোপীয় চিত্রকলার গর্ব বা শক্তিমত্তা তা নিপুণ দক্ষতায় অক্ষত কিন্তু বস্তুর যে রূপকে আগুপিছু করে দেখবার উপর-নিচ করে দেখবার কৌশল এই পরিপ্রেক্ষিত সে বস্তুই তার পরিচিত অবয়বে নেই। গলে যাচ্ছে সময়। সময়কে ধরেছি যে ঘড়িতে, তা এখন পিঁপড়ের খাবার। স্বয়ং চিত্রী অথবা মানুষ তার স্থিতিস্থাপকতার যে বিশ^াস তা থেকে বিচ্যুত হয়ে তারই পরিধেয় কাপড়ের মতোই নমনীয়। কাপড় বা পোশাক সভ্যতার পরিচয়। ছবির আকারটিও এখানে বিশেষভাবে বিবেচনার বিষয়। আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটির প্রয়োগ যেন ছোট ক্যানভাসে বিশাল স্পেস তৈরির প্রয়াসে। দালি এ চিত্রকর্মটি নিয়ে কিছুই বলেন না। দর্শক নিজ কল্পনায় নিজেই হয়ে ওঠেন জগতের ব্যাখ্যাতা।

আমরা বস্তু ও প্রাণী মনে রাখি। আমরা স্থান মনে রাখি। আমরা মানুষ বা ব্যক্তিকে মনে রাখি। আমরা ঘটনা মনে রাখি। আমরা আসলে স্রেফ সময়কে মনে রাখি। এই স¥রণ রাখা বা স¥রণ রাখবার চেষ্টা, ইচ্ছা কতটা প্রাকৃতিক কতটা মানবিক?

মানুষ ইতিহাসের সন্তান। মানবেতরের ইতিহাস তার জন্ম-মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মানুষ মৃত্যুহীন যখন সে ইতিহাসের ছাত্র।

শিল্পীর স্বাধীনতা প্রসঙ্গে…

জগতের সকল বিখ্যাত চিত্রকর্মই কোনো না কোনো পাঠ বা ‘Text’-এর চিত্রায়ণ। আলতামিরার পর সেটা মিসর চিত্র হোক কিংবা গ্রিক রোমান কিংবা রেনেসাঁ এবং কিংবা মুঘল কিংবা বেঙ্গল স্কুল। ইউরোপের আধুনিকতা বিশেষত প্রতিচ্ছায়াবাদী চিত্রকলা আলতামিরার চিত্রকরদের মতোই স্বাধীন হয়ে উঠল। ভিঞ্চির মোনালিসা যদি হয় আলতামিরার মতো স্বাধীন তো ‘গোয়ের্নিকা’ হচ্ছে ‘ঞবীঃ’-এর চিত্রায়ণ, যা আবার অঙ্কিত হচ্ছে আধুনিকতার বিশাল স্বাধীন আকাশের নিচে। প্রথমত একটি ফরমায়েশি কাজের সূচি বা বিষয় বদলে যাওয়া ও রাজনৈতিক প্রচারপত্র হিসেবে তার সাফল্যই গোয়ের্নিকার খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার মূল। এর বাইরে এসে চিত্রকলা বা শৈল্পিক আলোচনায় গোয়ের্নিকা এক ধাঁধাঁই বটে। কিউবিজমের সকল কলা- কৌশল পিকাসো এ ছবি আঁকবার আগেই তার বিবিধ ছবিতে দেখিয়ে দিয়েছেন। বলা যেতে পারে  গোয়ের্নিকা হচ্ছে ছোটদের জন্য কিউবিজম ক্লাস বা ‘Text’-এর চিত্রায়ণে কী করে কিউবিজম ব্যবহার করা যেতে পারে তার ছাড়পত্র।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ, ফ্যাসিস্ট নেতাদের অনুরোধে গোয়ের্নিকার ওপর জার্মান বোমারু বিমানের বোমা হামলা ও জনপদটির ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং তা নিয়েই পিকাসোর এ অঙ্কন। যদি রিপাবলিকানরা বিশ্ববাণিজ্য মেলার জন্য পিকাসোকে একটি কাজের ফরমায়েশি না দিতেন, যদি জুয়ান লিয়েরা পিকাসোকে তার পরিকল্পনা বদলে গোয়ের্নিকা নিয়ে ভাবতে অনুরোধ না করতেন তবে কি এ ছবি আঁকা হতো? না।

জয়নুল যে স্বাধীনতায় দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা এঁকেছিলেন পিকাসো সে রকম স্বেচ্ছাসেবী অবস্থানে ছিলেন না। উল্টো তার ওপর চাপ ছিল ফরমায়েশির চাওয়া পূরণ করবার। পিকাসো চাওয়া পূরণ করেই সফল। এ হচ্ছে ‘ক্লায়েন্ট ও ক্রিয়েটিভের’ মেলবন্ধন। তাহলে পিকাসোর গোয়ের্নিকার সার্থকতাটি কোথায়? নির্মাণে, এ ছবিটি আঁকতে গিয়ে যে অজর অনুশীলন, সেখানে। মানুষই একমাত্র প্রাণী যাকে অনুশীলনের মধ্য দিয়ে মানুষ হয়ে উঠতে হয়। গোয়ের্নিকা হচ্ছে ছোটদের জন্য কিউবিজম ক্লাস বা ‘ঞবীঃ’-এর চিত্রায়ণ করতে কী করে কিউবিজম ব্যবহার করা যেতে পারে তার ব্যাকরণ।

নিজের সাথে কথা

আগেই বলেছি চারুকলার ছাত্রত্ব নেওয়ার কোনো শখ বা ইচ্ছে শৈশবে আমার ছিল না। অর্থাৎ শিল্পী হওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি কিংবা স্বপ্ন আমার ছিল না। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত! রাজনীতি-রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার। ছাত্রত্বের প্রথম বছরটি তাই কেটে গেল চারুকলা পাঠাগার ও মিছিলে। দ্বিতীয় বছরে অগ্রজ-সতীর্থ শহীদ কবির লিটনের সাথে এক সকালের কথোপকথনের ফলস্বরূপ প্রথম বারের মতো ক্লাসে উপস্থিত হলাম ক্লাস করবো বলে। সেটা ছিল মডেল ড্রইং ক্লাস। সে ক্লাসের মার্কশিট আমায় সেরা ছাত্রের মর্যাদা দিলেও যে সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিলো, তা ছিল আমার জন্য অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। আমি ভাবনাক্রান্ত হলাম। এমন ভাবনাকালে পরিপ্রেক্ষিত ক্লাস শুরু হলো। অধ্যয়নের বিষয় হিসেবে বেছে নিলাম সেই টেবিল টেনিস টেবিলটি, যেখানে বসে লিটন ভাইয়ের সাথে আলাপের পরিপ্রেক্ষিতেই ক্লাসে উপস্থিত হয়েছি। পরিপ্রেক্ষিতের মাপজোখের হিসাব-নিকাশ করতে করতে জানা হলো, পরিপ্রেক্ষিতের আবিষ্কার ইউরোপীয় চিন্তাশীলতাকেই বদলে দিল। প্রথম বারের মতো বস্তুবাদী যুক্তিশীলতার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো মননে। কয়েকশ’ বছরেই পৃথিবী হয়ে উঠল গোল। কিন্তু করুণা কিংবা হিংস্রতায় মানুষ সেই আদি অকৃত্রিম প্রাণীটিই রয়ে গেছে, রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ। পেন্সিলে আঁকা টেবিল তাই হলে বসে জলরঙের ছোঁয়ায় বদলে গেল।

আমি জানলাম আমার শিল্পী হওয়া না-হওয়াটি প্রকৃতি বা নিয়তির ইচ্ছে। আমি শুধু সে ইচ্ছেকে আবিষ্কার করতে পারি, চর্চা করতে পারি। সেটাই ‘আমি’ বা নিজ। মানুষের মৃত্যুর জন্য ইতিহাসের কাল, নিয়তি ও সে নিজে দায়ী (কার্ল মার্ক্স)। আর আদি মানব কিংবা সক্রেটিস কিংবা বাংলার বাউল বারবার জানাচ্ছে- নিজেকে জানো। কিন্তু জ্ঞানী দর্শকরা তরুণের ছবিতে সাদৃশ্য খুঁজছেন বিশ^ (আসলে ইউরোপ) চিত্রকলার। তাই সকলেই এ ছবিতে খুঁজে পেলেন দালির ছায়া। অনেকেই এ ছবিকে দেখলেন চারুকলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির বয়ান হিসেবে। দালি আর পরাবাস্তববাদ ঘেঁটে পাওয়া গেল চিরিকো, ম্যাক্স আর্নস্ট, পল দেলভক্স, রেনে ম্যাগ্রিত। কে আমার স্বজন? তিন বছুরে এক শিশু পরপর সাত বিকেল এ ছবির দর্শক হয়ে উপস্থিত হলে জানা গেল চিত্রকর একজন ভূত আঁকিয়ে।

হুসেনের সাথে দেখা

এশীয় চারুকলা দ্বিবার্ষিক, শিল্পকলার গ্যালারিতে ভারতীয় অংশে আত্ম-প্রতিকৃতি নামে এক তৈলচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ, নেম ট্যাগে শিল্পীর নাম লেখা মকবুল ফিদা হুসেন। দিনাজপুর শহরের এক ছোট্ট পত্রিকার দোকানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত দেশ পত্রিকা পাওয়া যায়। সেটা ১৯৮৭। সেখানে এক প্রচ্ছদ দেখে সেই আত্মপ্রতিকৃতির কথা মনে এলো, হাতে নিয়ে দেখি ‘হুসেন’ সংখ্যা। পড়ি, দেখি আর ভাবি আগে কোথায় দেখেছি তার কাজ? মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটি রেখাচিত্র যেন চিৎকার করে সতেরো বছরের আমায় বলে উঠল দেখেছিস দেখেছিস। নিরাপত্তা গ্রিলের তালা লাগিয়ে মা শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বললাম খোলো, তাড়াতাড়ি খোলো। মা তালা খুলে দিলে এক ছুটে বৈঠকখানার পারিবারিক বইয়ের আলমারি থেকে বের করলাম ছোটদের বিশ্বকোষ, সূচি দেখে খোঁজা শুরু করলাম। ছোটাছুটির শব্দে পাশের ঘরে বাবার ঘুম ভেঙে গেছে। মা তাই বললেন তোর ঘরে নিয়ে যা, সেখানে গিয়ে দেখ। বহু বছর পর ছোটদের বিশ্বকোষ হাতে নিয়ে আমি উঠোন পেরিয়ে নিজ ঘরে চললাম। মাকে বাবা বলছেন- ওর ঘরে পানি আর কিছু খাবার দিয়ে আসো, আজ রাতে ওর ঘুম হবে না। কিছু পরে মা পানি আর খাবার টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন- বেশি রাত জাগিস না।

আমি পাতা উল্টে চলেছি। পুরো বিশ্বকোষই আবার দেখা হয়ে গেল প্রায়। অবশেষে পাওয়া গেল তাকে! হ্যাঁ, ছবির নিচে লেখা আছে হোসেনের নাম।

নাজিব তারেক : চিত্রকর ও লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares