সাঈদ আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের বড় গল্প

ভাত-পানি খেয়ে উঠতে না উঠতেই শরীরজুড়ে চেনা অস্বস্তিটা টের পায় মুনিরা। মাঝে ক’দিন ছিল না। আবার বোধহয় শুরু হলো। মুখের ভিতর পাতলা পানি জমছে। কেমন টক টক। পেট গুলাচ্ছে। শরীর ঘামছে। বমিটা যেন সারা শরীর কাঁপিয়ে বের হয়ে আসতে চাইছে মুখ দিয়ে। দ্রুত পায়ে উঠানে গিয়ে বসে পড়ে মুনিরা। বমি করে, ওয়াক ওয়াক শব্দ তুলে। হজম না হওয়া খাবার সব বের হয়ে আসে। বমি করার ধকলে হাঁপায় মুনিরা। হাঁ করে বড় বড় শ^াস নেয়।

ইছারউদ্দিনের খাওয়া শেষ হলে মুনিরা খেতে বসেছিল।

অন্যদিনের চেয়ে আজকে বেশ দেরি হয়েছে খেতে। আজ রান্নাই করেছে দেরিতে। ঘুম থেকে উঠেই টের পেয়েছে মুনিরা, শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে। কী জানি, জ¦রটর আসছে বোধহয়। সকাল থেকে শুয়েই ছিল। দুপুরের আগে আগে উঠে রান্না করেছে। একা হলে মুনিরা আজ রান্নাই করত না। হয়তো দু’মুঠ চিঁড়া চিবিয়েই দিন পার করে দিত। আসলে কিছুই খেতে ইচ্ছেও করছিল না। তাই সকাল থেকে এই দুপুর গড়িয়ে যাওয়া তক কিছুই মুখে দেয়নি। শুয়ে থাকতেই যেন ভালো লাগছিল। কিন্তু, বাপটা ক্ষেত থেকে তেতে-পুড়ে এক পেট ক্ষুধা নিয়ে  ফেরে। সেই কোন সকালে আগের রাতের পানি দেওয়া একমুঠ ভাত খেয়ে যায় ক্ষেতে কাজ করতে। সূর্য মাথায় নিয়ে কাজ করে দুপুর তক। শীত হলেও এই ক’দিন যেন রোদের তাপটা বেশিই। …বাড়িতে আর কেউ নেইও, যে  গোছগাছ করে ক’টা চাল ফুটিয়ে দেবে। বাপের কথা ভেবেই বিছানা ছেড়ে রান্নার জোগাড় করেছে মুনিরা। সব সেরে রান্নাঘর থেকে বের হতে দুপুর গড়াল। সারাদিন না খেয়েও কেন জানি ক্ষুধা বোধ করছিল না মুনিরা। কিন্তু তার শরীরের ভেতরে যে আরেকটা শরীর বেড়ে উঠছে। তাকে আর কতক্ষণ কষ্ট দেবে! তাই জোর করেই ভাত ক’টা খেয়েছিল। কিন্তু পেটে রইল কই সে ভাত!

মুনিরা, বমি করলি নাহি? ইছা খাওয়ার পর একটু গড়াচ্ছিল। উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চায়।

হ আব্বা। বমি অইছে। মাছটা খাওন বোধঅয় ঠিক অয় নাই।

শইল খারাপ লাগতাছে? আমু আমি?

তুমি বাইরে আওনের দরকার নাই। উডানে বাতাসে বইয়্যা থাকলে উট্টু পরেঅই শইলডা ঠিক অইয়্যা যাইব। 

বমিটা করে একটু যেন ভালো লাগে মুনিরার। তবে, শরীরটা একটু একটু ঘামছেই। ক্লান্ত লাগছে খুব। মাথার ভেতরে ঝিমঝিম। বুকের ভেতরে ধড়ফড়। ভারী শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না। আবার গিয়ে শোবে কিনা, ভাবে মুনিরা। এদিকে বাড়ির সব কিছুই বেগোছ হয়ে আছে। রান্নাঘরে হাঁড়ি-বাসন, বিছানা-বালিশ। সব দু’দিন ধরে এলোমেলো পড়ে আছে। উঠানটাও ঝাঁট দেওয়া দরকার। কিন্তু ভারী শরীরের আলসেমিটা যাচ্ছেই না।

মুনিরা বুবু, তোঙ্গ লাইগ্যা একটা খবর আছে।

ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় মুনিরা। উঠানের কোণে নিমগাছের গোড়ার কাছে হাসেম দাঁড়ানো। তাকে দেখে উঠে দাঁড়ায় মুনিরা। ঈষৎ স্খলিত বসন ঠিকমতো গায়ে জড়ায়।

ও হাসেম! কী খবর রে!… আইয়্যস না ভাই। ভিত্রে আইয়্যা ব।

না গো বুবু। অনে বঅনের সময় নাই। ক্ষেতেত্তে ফিরতাছি। বাইত গিয়া গোসল কইরা ভাত খামু।… তোমারে আর ইছা চাচারে রবিউল ম-লের বাইত যাইতে কইছে। রবিউল ম-লের উডানঅ সালিশ বইতাছে। তোমার বলে বিচার হইব।

মুনিরার বিচার! কী দোষডা করছে মুনিরা? বলতে বলতে ইছা উঠানে এসে দাঁড়ায়।

কী জানি! আমারে পাঠাইল তোমারে আর মুনিরা বুবুকে খবর দিতে। আসরের নামাজের পর যাইত কইছে।

কী বিষয়, হোনস্ নাই কিছু? ইছা জানতে চায়।

আমি কামলা মানুষ, আমি কি অত কিছু জানি চাচা! তই, হুনলাম গেরামের সবাই-ই বলে আইব। কানাঘুষায় যা হুইন্না আইলাম, মনে অইল…

থামলি কিয়ারে? কী মনে অইল তর হাসেম?

মনে অইল, মুনিরা বুবুর পেটের বাচ্চাটার বিষয়ে কিছু কইব।… আমি যাই চাচা। তুমি মুনিরা বুবুরে লইয়্যা তাড়াতাড়ি আইয়্যা পইড়।

এইডা আর নতুন কী কথা! পত্যেক দিনই কয়, আমার বিচার করব, আমার বিচার করব। তাগ বিচার মানে কে! মুনিরা ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে।

আমারে কইল যাওনের সময় তোঙ্গরে খবরডা দেওয়নের লাইগ্যা। এর লাইগ্যা আইছিলাম। এইবার কিন্তু মনে অইল গেরামের সবাই এক অইছে। তোমরা যাইঅ। দেখো কী কয়। …আমার কথায় আবার কিছু মনে কইর না বুবু। আমি ভালা মনে কইরাঅই তোমারে যাওনের কথাডা কইছি।

নারে হাসেম, তর আর দোষ কী। তুই না কইলে আরেকজন খবর দিতে আইত।…আইচ্ছা, তুই যা। ক্ষেতেত্তে তাইত্তা পুইড়া আইছত। দেহি ভাবনা চিন্তা কইরা, কী করণ যায়।

হাসেম চলে গেলে ইছা অসহায় দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকায়। তরে এত কইরা কইলাম, কানে তুললি আমার কথা! হেতারা গ্রামের মাথা, না গিয়াদ উপায়ও নাই।

আব্বা, তুমি এত ভাইব্য না। আমার বাচ্চা আমি মারমু না জন্ম দিমু হিডা আমার ইচ্ছা। আমরা কারও খাই না পরি! যে তাগ সব কথা আঙ্গরে মানতে অইব।

হোন ছেড়ি, গেরামে থাকলে তাগ কথা মাইন্যাঅই থাকতে অইব। আঙ্গ টেহাও নাই গায়ের জোরও নাই। পুরা গেরামঅ আঙ্গ কথা কওনের একজন লোক পাইতি না ।

না পাইলে না পাইলাম। মাথার উপ্রে আল্লা আছে। আল্লা জানে, আমি কোন অন্যাই করি নাই।

অন্যাই করছস হিডাদ আমিও কই না। কিন্তু অনে যে পণ কইরা রইলি পেডের বাচ্চাডা রাখবিঅই, সমস্যা হেনই।… বাপের পরিচয় কী দিবি বাচ্চার? ভবিষ্যৎ বইল্লাওঅদ একটা কথা আছে।

বাচ্চা না অয় বড় অইব আমার পরিচয়েঅই। আর ভবিষতের কথা ভবিষতে ভাবমু। …তোঙ্গ কথায় আমি পেডঅ যে বাচ্চা বড় অইতাছে তারে মা অইয়া মারতে পারতাম না। একটা জীবনে খুন করতে পারতাম না।

দেখ বিচারে কী অয়। রবিউল কী রায় দেয় আল্লায় জানে। তর দাদার কালের থাইক্যাঅই তার বাপের লগে আঙ্গ শত্রুতা। হেই ঝাল অনে মিডাইব দেহিস!

তুমি এত ভাইব্য না ত আব্বা। বাচ্চারে যহন রাখতে চাইছি তহন কপালে যে দুর্ভোগ আছে হেইডা জানিঅই। … যাই উট্টু শুইয়া থাহি গা। শলীলডা কেমন জানি করতাছে। 

বিপদ যে আসছে তা আন্দাজে ছিল। তার জন্য মনে মনে প্রস্তুতও ছিল মুনিরা। যত যাই-ই হোক, ইছাও জানে যে, পেটে পাকিস্তানিদের ঔরসজাত বাচ্চা নিয়ে ফেরাটা গ্রামের লোক ভালো চোখে দেখবে না। তাহলেও, মেয়েকে সে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে রেখেছে। জোরাজুরি করলেও মুনিরাকে বাধ্য করেনি বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার জন্য। যদিও বলেছে বহুবার, পাকিস্তানিদের অপবিত্র বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলার জন্য। বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে রাখার ফল যে খুব একটা ভালো হবে না সেটা মুনিরাও জানে। কিন্তু মা হয়ে মুনিরা পারেনি পেটের সন্তানকে মেরে ফেলতে। তার মনে হয়েছে, তার পেটে যে বেড়ে উঠছে সে একটা নিষ্পাপ প্রাণ। একটা নিষ্পাপ বাচ্চাতো কোনো অপরাধ করেনি। মুনিরা কেন জানি ঘৃণা করে গর্ভের বাচ্চাটাকে মেরে ফেলতে পারছে না। 

উঠানটা বিশাল আকারের! গিজগিজ করছে মানুষ। কোত্থেকে এলো এত মানুষ! এই গ্রামে এত মানুষ বাস করে! মুনিরা উঠানের প্রান্তে দাঁড়িয়ে অবাক হয়। উঠানের চারপাশে মানুষ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরের দিকে বসে আছে কেউ কেউ। দাঁড়ানো মানুষের ফাঁকে তাদের পিঠ দেখা যায়।

উঠানটা রবিউল ম-লের। মাঝামাঝি অবস্থানে কাছারি ঘর। সে ঘরের দরজার কাছে সারি সারি কাঠের চেয়ার পাতা। চেয়ারে গ্রামের গণ্যমান্যরা বসা। মাঝের চেয়ারে বসেছে রবিউল ম-ল। রবিউলের ফর্সা চেহারা। মাথায় ধবধবে সাদা চুল। হাতে সবসময় রুপা বাঁধানো লাঠি। বড় বড় চোখ দুটোতে ক্রূরতা।

গ্রামের সবাই বোধহয় এসেছে। কেউ এসেছে কৌতূহলে, কেউ মুনিরার অপরাধের বিচারের সমর্থনে। বাচ্চা-বুড়ো, পুরুষ-নারী। সবাই ভিড় করেছে উঠানের চারপাশ ঘিরে। ফিসফাস কথা ভাসছে চারপাশে। ইছা আর মুনিরাকে দেখে গুঞ্জন থেমে যায়।

মানুষের ফাঁক গলে মুনিরা আর ইছা চেয়ারের কাছাকাছি গিয়ে বসে। মাটিতে। মুনিরার মাথায় বড় ঘোমটা। মুখও প্রায় ঢেকে আছে শাড়ির আঁচলে। ইছারের চোখে মুখে দুশ্চিন্তা। কানাঘুষায় শুনেছে, মুনিরা ফেরার ক’দিন পর থেকেই গ্রামের লোকেরা মিলে মুনিরার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আলোচনা করছে। সেটা যে সত্যি সত্যি বাস্তবায়িত হবে ভাবেনি ইছা। কী জানি সবাই মিলে কী সিদ্ধান্ত নেয়! সিদ্ধান্ত কি আর সবাই মিলে নেবে! রবিউলের কথার উপরে কেউ কথা বলবে না। একা রবিউল যে রায় দেয় তা-ই গ্রামের সবাই মেনে নেবে। ভেবে ইছারের দুশ্চিন্তা যেন আরও বাড়ে। গ্রামের লোক মিলে যা সিদ্ধান্ত নেয়, তাই হয়তো মেনে নিতে হবে তাদের। মুনিরাকে কত বুঝিয়েছে ইছা। মেয়েটা কথা শুনলই না। পশুদের বাচ্চাটাকে বাঁচিয়েই রাখল।

 লোকজন কিছুক্ষণ চুপচাপ ছিল। মুনিরা আর ইছার এসে বসার পর একটু একটু করে আবার ফিসফাস শুরু হয়।

রবিউল উঠে দাঁড়িয়ে হাতের লাঠি দিয়ে বাতাসে আঘাত করে। লোকজন ফের নীরব হয়ে যায়। তাদের চোখে মুখে ফুটে উঠে ভয় এবং অপেক্ষা।

চুপচাপ কাটে কিছুক্ষণ। রবিউল একবার সমবেত লোকের দিকে তাকায়। পরে, মাটিতে তার পায়ের কাছাকাছি বসা ইছা আর মুনিরার দিকে তাকায়। বলে, ইছা, তুই আর তর ঝিয়ে আইতে দেরি করায় আমরা সবাই মিল্যা মুনিরার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়া নিছি। গ্রামের সব লোকও আঙ্গ সিদ্ধান্তের লগে একমত। …কি, তোঙ্গ কারও কোনো কথা আছে? রবিউল উঠান জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের কাছে জানতে চায়।

কেউ কোনো শব্দ করে না।

রবিউলের পাশে বসা আকবর বলে, না না, তোমার সিদ্ধান্তের উপর আঙ্গ কারও কোনো কথা নাই। কী মিয়ারা, তোমরা কোনো কথা কও না ক! আছে কারও কোনো আপত্তি?

লোকেরা চুপচাপই থাকে। কোনো শব্দ কেউ করে না। আকবর ফের বলে, দেখছো! কইতাছি না, আঙ্গ কারো কোনো কথা নাই।

খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে রবিউল বলে, যাক বুঝা গেল, গেরামের সবাই আঙ্গ লগেই আছে। আঙ্গ সিদ্ধান্তের বাইরে কারও কোনো কথা নাই।

রবিউল ভূমিকা শেষ করে সালিশের সাব্যস্ত রায় ঘোষণা করে। সমবেত লোকেরা নিঃশব্দে শোনে সে রায়। শোনে ইছা আর মুনিরাও।

রবিউল বলে, সমাজের মাথারা মিল্যা সিদ্ধান্ত নিছে, অবৈধ সন্তান পেডঅ রাখনের অপরাধে পাক সেনাগঅ দারা নষ্ট মুনিরার চুল কাইট্যা, মোহ চুন কালি মাইখ্যা গেরামেত্তে বাইর কইরা দেওয়া অইব। কেউ যুদি মুনিরারে বাড়িত জাগা দেয়, তইলে তারে একগইরা করা অইব।… সমাজের ভালার লাইগ্যাঅই এই সিদ্ধান্ত। আমরা চাই না গেরামের আর সব মাইয়্যারা মুনিরারে দেইখ্যা বিপথে যাউক।… গেরামে ফিরনের পর পর, এর আগে বহুতবার মুনিরারে কওয়া হয়েছে পেটের সন্তান নষ্ট করার লাইগ্যা। অভিজ্ঞ দাই হনুফা সহজেই কাজটা করতে পারত। কিন্তু মুনিরা রাজি হয় নাই সে প্রস্তাবে। এখন, স্বাধীন দেশে মুনিরার জারজ সন্তান প্রসব গ্রামের কেউ মাইন্যা নিতে রাজি না।

রায় শুনে মুনিরার পিতা ইছারউদ্দিনের চোখের পানিতে দাড়ি ভিজতে থাকে। ইছা নিঃশব্দে কাঁদে। শব্দ করার সাহসটাও পায় না। সে জানে, আজ তার পক্ষে কেউ কথা বলবে না। যে-ই মুনিরার পক্ষ নিয়ে কথা বলবে, তারই গ্রামে বাস করা দুষ্কর হয়ে যাবে। 

সংগ্রামের বছর দেশ রক্ষায় নিয়োজিত শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিল রবিউল। আশপাশের সব গ্রামে তার সহায়তায় পাকিস্তানিরা নিরীহ লোকদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছে। সে এবং তার সাথের লোকেরা পাকিস্তানিদের সব রকম সহায়তা করেছে। আশ্রয় দিয়েছে। খাদ্য জুগিয়েছে। গরুটা খাসিটা মুরগিটা ধরে ধরে পাঠিয়েছে আর্মিদের ক্যাম্পে। অল্পবয়সী মেয়েদের জোর করে বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে, দিয়ে এসেছে হায়েনাদের কাছে। অনেকের সন্দেহ, এই গ্রামেও পাকিস্তানিদের রবিউলই নিয়ে এসেছিল। যদিও কেউ জোর দিয়ে সে কথা বলতে পারে না।

দেশ স্বাধীন হয়ে আলাদা হয়েছে দেখতে দেখতে দু’মাস হয়ে গেল। গত একটা মাস রবিউল পাশের গ্রামে তার মেয়ের বাড়িতে ছিল। যদিও গ্রামের সবাই জানে, আসলে এই কয় দিন মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে সে গ্রামে ঢোকার সাহস পায়নি। তাহলেও, এখন আর সে কথা বলার সাহস কারও নেই। কী বিত্তে, কী প্রভাব-প্রতিপত্তিতে সে এখন গ্রামের সর্বেসর্বা। তার কথার বাইরে যাবে, কোনো সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলবে এমন সাহস কারও নেই।

স্বাধীনের আগে রবিউল ম-ল ছিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। মুসলিম লীগের রাজনীতি করত। আশপাশের গ্রামগুলোতে তার প্রভাব ভালোই ছিল। এখন সে দল বদলে নতুন দলের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে। গ্রামে যে কোনো ঝগড়া-বিবাদে মধ্যস্থতা করে রবিউল। সালিশিতে প্রধানের ভূমিকা পালন করে।

মুক্তিযোদ্ধারা তো আসলে বেশিরভাগই গরিব। খেটে খাওয়া মানুষ। পরের জমি বর্গা করা মানুষ। তাঁরা জীবিকার জন্য রক্ত পানি করা পরিশ্রম করে দিনমান। অনেকেই যুদ্ধে অঙ্গ হারিয়ে গলগ্রহ হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ঘর সম্পদ সব হারিয়েছে। দেশকে স্বাধীন করে তাঁরা নিজেদের নিয়ে, নিজেদের পরিবার নিয়েই ব্যস্ত এখন। এই ফাঁকে রবিউল যে কখন আবার গ্রামে ফিরেছে, ফিরেই স্বভাব মতো অল্প ক’দিনের মধ্যেই কীভাবে কীভাবে আবার আগের মতোই প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে গ্রামে, ব্যাপারটা তেমন করে কেউ খেয়াল করেনি।

রবিউলের বংশ বড়। অর্থ বিস্তর। জমিজমা বেশুমার। বুদ্ধি কুটিল। চেহারায় হিং¯্রতার সাথে সাথে আছে গাম্ভীর্য। লম্বা শক্তপোক্ত দেহ। বলতে হয়, স্বভাবে এক ধরনের সম্মোহনও আছে তার!  সহজেই লোকজন তার কর্তৃত্ব মেনে নেয়। ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্যও হয়।

আজকের রায় যে রবিউলের মর্জিমতো হয়েছে, সে আন্দাজ সহজেই করা যায়।

সবাইকে অবাক করে মুনিরাই মুখ খোলে। উঠে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে বলেÑ আমি এমন সালিশ মানি না। কই ছিলেন আপনারা হেই দিন, যেই দিন আমারে পাকিস্তানি পিশাচরা ধইরা লইয়্যা গেল! আমার মারে, ছোডু ভাইটারে আপনাগ চোখের সামনে কুত্তার মতো গুলি কইরা মারল! গেরামের অত অত যুবতী মাইয়্যাগঅ ধইরা নিয়া গেল।…কতজনের ঘরবাড়ি জ¦ালাইয়্যা দিল! তখন কই আছিলেন আপনেরা!  হু, কই আছিলেন? অনে আমি গেরাম থাকলে আপনাগ মান যায়।… কিয়ারে, আমি এই গেরামে জন্মাই নাই? আমার বাপ-দাদার বাড়ি এই গেরামে না? এই গেরামে বাস করার আমারঅ অধিকার আছে।

ওই ছেড়ি, চুপ কর তুই। বেহায়া মাইয়্যা! লজ্জা থাকলে তুই গেরামের মাইনষেরে মুখ দেহাস কেমনে! তুই নষ্ট, পাঞ্জাবিরা তরে নষ্ট করছে। পেডঅ বাচ্চা নিয়া তুই গ্রামে ফিরা গ্রামের পরিবেশ নষ্ট করছস। তুই গ্রামে থাকতে পারবি না। এইডাঅই আঙ্গ সিদ্ধান্ত। তর বাপেও তরে রাখতে পারব না বাড়িত। রাখলে তর বাপের গেরাম ছাড়ন লাগব।

নষ্ট! কীয়ের নষ্ট। আমারে নষ্ট কইতে আপনেগ মুখে বাধল না। পাঞ্জাবিরা আমারে নষ্ট করত পারে নাই, নষ্ট করছেন আপনেরা। নষ্ট করছে এই গেরামের মাইনষে।…আপনেরা কে আমার বিচার করার? এত এত ছেড়িগ ইজ্জত নিল পাঞ্জাবি কুত্তারা, তখনত তাগ বিচার করতে যান নাই।

আমরা কার বিচার করমু না করমু তরে জিজ্ঞাস কইরা করমু? অই ফজলু, অত কথার কাম কী। সালিশে যা সাব্যস্ত হইছে তাই কর। আঙ্গ কাজকাম আছে। এন বইয়্যা রাইত পার করলে অইত না। মুনিরারে গাছের লগে বাঁন। চুল কইট্যা, মুখ চুন-কালি মাইখ্যা, গেরামেত্তে বাইর কইরা দে।

ইছা রায় শোনার পর থেকেই বসে বসে চোখের পানি ফেলছে। এতক্ষণে উঠে দাঁড়িয়ে মুখ খুলে বলে, আপনারা আমার একটা কথা হোনেন।… আমার ঝিয়েদ কোনো অন্যাই করে নাই। মুনিরাদঅ ইচ্ছা কইরা আর্মিগ ক্যাম্পে যায় নাই। আপনেগ চোখের সামনে দিয়াইদঅ হেই সময় ধইরা নিয়া গেল মুনিরারে। ধইরা নিয়া গেল গেরামের সব জুয়ান জুয়ান মাইয়্যাডিরে।… আমার পুতটারে …বউটারে গুলি কইরা মারল। আপনেগ চউখ্যের সামনেইদ।…কই, তহনদ আপনেরা উট্টু প্রতিবাদও করলেন না। পারতেন না আপনেরা হগলতে মিল্যা তাগরে গেরামে ঢুকতে বাধা দিতে? গেরামঅ কত বড় বংশ আপনেগঅ, কত ক্ষমতা! আপনেরা চাইলেঅই পাকিস্তানিগ হেইদিন বাধা দিতে পারতেন। বাধা দিলেদঅ গেরামে এত এত ক্ষয়-ক্ষতি অইত না। 

ওই ইছার, কেমন কথা কস তুই! তর পুতেরে বউরে মারছে হেই দোষ কি আঙ্গ? আমরা কি কইছি গিয়া পাঞ্জাবিগরে তর বউরে মারতো, পুতরে মারতো। এই গেরামে আইত? রবিউলের ডান পাশে বসা, তার চাচাতো ভাই সোবাহান ধমকের সুরে বলে।

দোষ আপনেগঅই। আপনেরাইতো কুত্তার বাচ্চাডিরে গ্রামে নিয়া আইছিলেন। মোড়ামুড়ি করতে করতে মুনিরা বলে।…ততক্ষণে মুনিরাকে পিছমোড়া করে গাছের সাথে বাঁধা হয়েছে।…আহত সাপিনীর মতো ফোঁস ফোঁস করে সে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলে, বেজন্মা কুত্তাডি আঙ্গ গ্রাম চিনত, গেরামের কারও বাড়ি চিনত? আপনারাঅইদ তাগরে লইয়্যা বাড়ি বাড়ি নিয়া গেছেন।

এই হারামজাদি, আঙ্গ কাউরে দেখছসত তুই? রবিউল হাতের লাঠি দিয়ে বাতাসে আঘাত করে বলে।

সবাই জানে তাগ পিছনে কারা ছিল?…খালি আমি কা, পুরো গেরামের কে না দেখছে আপনেগরে। আপনে, আপনের ভাই আরশাদ, রমজান, আপনের পুত মতি-এই চাইরজনে মিল্যা যুদ্ধের সময় এই গেরামে, আশেপাশের গেরামে কী করছেন সবাই দেখছে। অনে আপনের ভয়ে কেউ মুখ খুলতাছে না।…বশির চাচাদ বইয়্যা রইছে আপনের পাশেই। …কীঅ চাচা, কন না, আপনে দেহেন নাই, এই রবিউল ম-ল কুত্তার বাচ্চাডিরে বাড়িত বাড়িত নিয়া গেছে?…খাসি, মুরগি, জুয়ান ছেড়িÑ যা পছন্দ অইছে লইয়্যা গেছে।… গেরামের পশ্চিমপাড়ায় হিন্দুগ বাড়িডি পুড়ছে কে? তাগ সোনা গয়না লুট করছে কে? গোলার সব ধান কে লুট করছে? জোর কইরা জমি নিজের নামে লেইখ্যা লইয়্যা তাগ বাইত মিলিটারি শুয়োরের বাচ্চাগরে কে ডাইক্যা আনছে। …আহারে! ঘরে আগুন দিয়া কত্লা মাইনষেরে জীবন্ত পুইড়া মারছে। …আর কুত্তার বাচ্চারা, শুয়োরের বাচ্চারা ক্যাম্পে আঙ্গ উপরে কী অত্যাচার করছে হিডা আমি জানি। হেই অত্যাচার আপনেগঅ কল্পনারঅ বাইরে!

তরত সাহস কম না! কেউ কিছু বলার আগেই রবিউল ম-লই হুঙ্কার দেয়। পাঞ্জাবিগ বাচ্চা পেটে নিয়া বাড়ি ফিরছস। আবার গ্রামের মানুষের নামে উল্টাপাল্টা কইতাছস।…হইছে, অত কথার কাজ নাই। বিচারে যা সাব্যস্ত হইছে তর তাই মানতে হইব।

আমিদ আগেই কইছি, আপনেগ বিচার মানি না। আপনেগ জোর আছে, ক্ষমতা আছে… যা ইচ্ছা করতে পারেন। আমার বাপ গরিব, তারদঅ কোনো শক্তি নাই যে আপনেগরে বাধা দিব। বড় একটা ভাই নাই, গেতিগুষ্টিত কেউ নাই যে আপনেগ অন্যাইয়ের বিরুদ্ধে কথা কইব।…আমার পেটের বাচ্চারে আমি জন্ম দিমুঅই। আপনেরা বাড়াবাড়ি করলে আমি পুলিশের কাছে যামু।…যে আমার পেডে আছে তারদঅ কোনো দোষ নাই।

যাইস তর পুলিস বাপের কাছে। দেহি যাইয়্যা কী করস তুই আঙ্গ। তরদ লাজ লজ্জা নাই। নাইলে তর মতন আর যারা আছে তারা কি পেডে বাচ্চা লইয়্যা বুক ফুলাইয়্যা বাইত ফিরছে। … পেট খালাস কইরা বাড়ি ঢুকছে। নাইলে গলায় দড়ি দিয়া মরছে।

আমি মরতাম কা! আমি মরার কথা স্বপ্নেও ভাবি না। আপনের মত খারাপ মানুষ যুদি পিথিবীতে বাঁইচ্যা থাকতঅ পারে, আমার মতো মানুষ পারত না কিয়ারে? আমিদঅ কোন অপরাধ করি নাই।… গেরামের সব মানুষঅই এইডা জানে। কিছু কয় না খালি আপনের ভয়ে। এই যে বিচার বসাইছেন আমার, কেউ কোনো কথা কয়! খালি আপনে একলাঅইদ যা কওনের কইলেন।

এই ছেড়ি, তুই এত কথা কস কা।…রবিউল ম-লের পায়ের কাছে পাশে বসা হাফিজউদ্দিন হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়। এত্তডি মুরব্বির মুখের উপ্রে বেয়াদবের মতন কথা কওয়া শুরু করছস। একবারদ মাফও চাইলি না।

আমি অপরাধটা কী করলাম যে আপনেগ কাছে মাফ চামু! কন আমার অপরাধডা কী? আমি কি মিলিটারিগ ক্যাম্পে ইচ্ছা কইরা গেছিলাম।… পেডের বাচ্চাডাঅইদ সমস্যা? যার কোন অপরাধ নাই, তারে কিয়ের লাইগ্যা শাস্তি দিতাম। গেরামে ফিরনের পর থাইক্যা যে যেমন পারেন গালমন্দ কইরা আপনেরা আমারে যে শাস্তি দিতাছেন, এর বেশি আর কী দিবেন। আমি বেশ্যা, খানকি, নষ্টÑ আরও কত কী! বুড়া বাপটারেও আপনেরা ছাড়েন নাই। তারেঅ পথে-ঘাটে আকথা কুকথা হোনান। বলতে বলতে হাঁপাতে থাকে মুনিরা। … আমার আর কিছু কওনের শক্তি নাই। কিছুক্ষণ পর বলে মুনিরা। আপনেগ বিচার আমি মানি না। আবারও কই, আপনেগ বিচার আমি মানি না। আপনেরা যা ইচ্ছা করেন। 

এই তরা খাড়ইয়া খাড়ইয়া কতক্ষণ তামশা দেখবি? রবিউল হঠাৎ পাশে দাঁড়ানো ছেলেদের উদ্দেশে চিৎকার করে। সালিশের রায় হুনোছ নাই।

রবিউলের চিৎকারে সারা উঠান কেঁপে ওঠে। মাথার উপর নারিকেল গাছে বসা দাঁড়কাকেরা চিৎকার করতে করতে বাসা ছেড়ে উড়ে যায়। 

 লোকজন আর দেরি করে না। ঘোমটা ফেলে, একজন মুনিরার মুখে মিশানো পাতিলের কালি আর চুন মাখিয়ে দেয়। কাঁচি দিয়ে মুনিরার লম্বা গোছা গোছা চুল কেটে ফেলে। কেউ একজন বাঁধন খুলে অকস্মাৎ পেছন থেকে লাথি দেয় মুনিরাকে। টলে পড়তে পড়তে দাঁড়িয়ে যায় মুনিরা। ইছার মেয়েকে ধরতে এগিয়ে যেতে চাইলে কয়েকজন পেছন থেকে তাকে ধরে রাখে।

চেয়ারে বসা একজন ইছাকে শাসায়। দেখ ইছা, তর ঝিয়ের পথ তর ঝিয়েরে দেখত দে। ঝিয়ের অপরাধ কা তুই নিজের কান্দে নিবি।… আমি নিজেওদ হুনছি, কতবার তুই কইছত মুনিরারে পেডের বাচ্চাডা নষ্ট করতে। তর কথাওদ হোনল না। অনে, গেরামের মাথারা মিল্যা সিদ্ধান্ত নিছে তর ঝিয়েরে গেরামে থাকত দিত না। তুই যদি ঝিয়ের পক্ষ্য লস, তরেও ঝিয়ের লগে গেরাম ছাড়তে অইব। … অনে তুই বুইঝ্যা দেখ কী করবি।

ইছা আর নড়ে না। নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে দেখে মুখে চুনকালি মাখা, চুলকাটা মুনিরাকে লোকজন ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে।

যেতে যেতে মুনিরা ঘুরে দাঁড়ায়। হঠাৎ হাত ঝাড়া দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে, দৃঢ় পায়ে হেঁটে উঠানের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়। মাথা উঁচু করে সকলের উদ্দেশে বলে, এই গেরামে আমার জন্ম। আপনেগ মাঝে আমি বড় অইছি। বাপ ছাড়া আপনেরা আমার রক্তের কেউ না। তঅ, আমি আপনেগঅ কেউরে ভাই, কেউরে চাচা, কেউরে খালু, কেউরে মামার মতন দেখছি। কেউরে চাচি, কেউরে বুবু, কেউরে খালা, কেউরে নানি ডাকতাম। বা-ভাইয়ের চেয়ে কম আপন মনে করি নাই আপনেগরে। … যুদ্ধের আগেদঅ আপনেরা আমার আপনঅই আছিলেন। আউজ্জা আমার উপ্রে বিনা দোষে এতবড় অন্যাই করল রবিউল ম-ল. আপনেরা কেউ উট্টু প্রতিবাদঅ করলেন না।   সবাই মিল্যা প্রতিবাদ করলে রবিউল পারত আপনেগন বিরুদ্ধে যাইতে? এই দেশের মানুষের প্রতিবাদে দেশ ছাইড়া যায় নাই পাকিস্তানি কুত্তারা। গর্তেনগিয়া লুকায় নাই রবিউলগঅ মতন বেইমানরা।

অই হারামজাদি মাগি, আমার সামনে খাড়অইয়্যা আমারে তুই গালিগালাজ করতাছস! তর কইলজাডাঅ কম বড় না। সবাই চুপ করে মুনিরার কথা শুনছিল। হঠাৎ রবিউল চিৎকার করে উঠে। 

মুনিরা হঠাৎ গায়ের সমস্ত জোর গলায় জড়ো করে চিৎকার করে উঠে,অই বেইমান, হারামির বাচ্চা, আমি হারামজাদি অইলে তর মায় কী! তর মতন কুত্তারে যে জন্ম দিছে সে কী!… আউজ্জা না অইলেঅ দেহিস, একদিন এই গেরামেঅই তর বিচার অইব। আমার উপ্রে যে অন্যাই করছস, তার ফল পাবি।

অই তরা খাড়ইয়্যা রইলি কা! বেশ্যাডারে গেরামেত্তে বাইর কর। বলতে বলতে রবিউল নিজেই এগিয়ে আসে মুনিরাকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য। কাছাকাছি আসতেই মুনিরা হঠাৎ রবিউলের মুখ লক্ষ্য করে থুতু ছুড়ে মারে। থুতু রবিউলে মুখে কপালে লাগে।

থুতু দিয়ে আর দাঁড়ায় না মুনিরা। হতভম্ব রবিউল কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুনিরা লোকজনকে ঠেলে পথ করে বের হয়ে যায় উঠান থেকে। বের হয়ে হাঁটতে থাকে হনহন করে।

দুই

বটগাছের তলে চুপচাপ বসে আছে মুনিরা। মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে তার শরীর। বোধহয় শীতেই। মাঘ মাস শেষ হয়ে গেলেও আজকে শীতটা পড়েছে জবর। মুুনিরার গায়ে পাতলা শাড়ি। শেষ বিকেলের ঠান্ডায় শাড়িটা শীত আটকাতে পারছে না। 

গ্রামের সীমানায় তিন রাস্তার মোড়ে বটগাছটা। কত পুরনো কে জানে! জন্ম থেকেই গাছটাকে এতবড় দেখে আসছে মুনিরা। চারপাশে আঁধার নামছে দ্রুত, শীতের বিকেল শেষ হয়ে আসছে। মুনিরারও চোখের সামনে শুধু আঁধার এখন। বুঝে গেছে মুনিরা, গ্রামে আর তাকে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

আজকে তার গ্রামের লোকেরা যে অপমান করল তাকে, এরপর আর নিজের ভেতরে বেঁচে থাকার শক্তি যেন পাচ্ছে না মুনিরা। পাঞ্জাবিদের অত্যাচারের চেয়েও আজকের অপমান বেশি বাজছে বুকে। উঠানভর্তি এত এত মানুষ, কেউ টুঁ শব্দটাও করল না। নিজের গ্রামের মানুষ সব। যাদের মাঝে মুনিরা হেসে-খেলে বড় হয়েছে। অথচ মুনিরা যে নিরপরাধ গ্রামের কে না জানে। পাকিস্তানি পিশাচরা তো আর লুকিয়ে আসেনি। …সালিশ দেখতে আসা লোকজনের মধ্যে নুরু চাচাকেও দেখেছে মুনিরা। নুরু চাচার মেয়ে হামিদাকে মুনিরার সাথেই গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল আর্মিরা। অবশ্য তাকে অন্য কোনো ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছিল বোধহয়। হামিদা বেঁচে ফেরেনি। তার ভাগ্যে কী ঘটেছে কেউ জানে না। সেই নুরু চাচাও রবিউলের কথার কোনো প্রতিবাদ করল না!

গ্রাম থেকে বের হওয়ার পর থেকেই মুনিরার মনে হতে থাকে, এত অপমান, এত লাঞ্ছনার পর বেঁচে থাকার কি দরকার! এর চেয়ে মরে যাওয়াই হয়তো ভালো। চারপাশের ঘনায়মান সন্ধ্যা, কুয়াশা আর খাদ্যের সন্ধানে যাওয়া ফিরতি পাখিরাও যেন তাকে ঘৃণা করে। মুনিরার তাই মনে হয়। কী হবে মাথার উপরের বটগাছে পরনের শাড়িটা বেঁধে ঝুলে পড়লে? কারও কিছু যায় আসে না তার মৃত্যুতে। কেউ এক ফোঁটা চোখের জল ফেলবে না, কেউ তার জন্য একটু শোক করবে না। … দেশের মানুষ, গ্রামের মানুষ, পরিবার- সবার চোখেই মুনিরা আজ অপাঙ্ক্তেয়।   

পাপের চিহ্নসহ তাকে আজ গ্রামছাড়া করতে পেরে সবাই বোধহয় দায় থেকে মুক্ত হলো। তার বড় বোনের তো বিয়ে হয়েছে নিজের গ্রামেই। শ^শুরবাড়ি আর বাপের বাড়ি এক ডাকের পথও না। সে কি আর জানে না মুনিরাকে সালিশ ঢেকে অপমান করে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে? এতক্ষণ তার কানে খবরটা না পৌঁছানোর কথা না। কই, মনজুরা তো একবার ছোট বোনটার খোঁজও নিল না। যুবতী একজন মেয়ে সে, এই শীতের সন্ধ্যায় কোথায় যাবে, কে আশ্রয় দেবে তাকে। রক্তের বোন, মায়ের পেটের বোনটাও ভাবল না একবার!

অগণিত মৃত্যু, নদী নদী রক্ত, শত শত মেয়ের ইজ্জত আর সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হলো দেশ। মুনিরাকে নারী জীবনের সবচেয়ে বড় ত্যাগটাই তো করতে হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ফল মুনিরা ভোগ করতে পারছে কই! … আরও আরও হতভাগ্য মেয়ের কপালেও কি তার মতোই লাঞ্ছনা জুটেছে? মুনিরার একবার মনে হয়, সেদিন যদি আর্মিরা তাকেও মেরে ফেলত, তাহলে আজ নিজের গ্রামে, নিজের লোকেদের কাছ থেকে এত অপমান প্রাপ্য হতো না। এভাবে নিজ গ্রামের লোকের কাছে অপমানিত হওয়ার চেয়ে আর্মিদের হাতে মরণ হলেই বোধহয় ভালো হতো।

এখন মনে হচ্ছে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই সহজ। তার বোধহয় আরও অনেকের মতো মরে যাওয়াই ভালো ছিল। স্বাধীন দেশে ফিরে এতটা লাঞ্ছনা প্রাপ্য ছিল তার! জানলে গ্রামেই ফিরত না মুনিরা। পুনর্বাসন ক্যাম্পে বা অন্য কোথাও চলে যেত। বাড়ি ফিরে গেলে বাপ-ভাইয়েরা ঘরে ঠাঁই দেবে না বলে, অনেক মেয়েই তো গেছে এমন।

মৃত্যু! মৃত্যুতে সব সমস্যার, সব অপমানের, সব অবহেলার সমাপ্তি হয়। যারা আর্মিদের অত্যাচারে মরে গেছে, তারা আসলে বেঁচেই গেছেÑ মনে হয় মুনিরার। বেঁচে গেছে, নিজের দেশের নিজের লোকদের অত্যাচার থেকে।  গ্রামের লোকেরাও হয়তো তাই চায়। যেন অপমানে অপমানে মুনিরা মৃত্যুকে বেছে নেয়।

কিন্তু না। মরবে না মুনিরা। মরবে বলে তো গ্রাম ছেড়ে বের হয়ে আসেনি। বাঁচার তৃষ্ণা তার বুকে প্রবল। পরাধীনতার শৃঙ্খলেই যখন মরেনি, তখন স্বাধীন দেশে সে মরবে কেন!

ক্যাম্পে যখন তাদের ধরে নিয়ে গেল, অনেক মেয়ে সুযোগ পেলেই আত্মহত্যা করেছে। একজন দু’জন আত্মহত্যা করার পর পাকিস্তানি আর্মিরা সতর্ক হয়ে গেছে। লাঞ্ছিত অত্যাচারিত মেয়েরা কত সুযোগ খুঁজেছে। কিন্তু পশুরা তাদের মরার সুযোগটুকু দেয়নি। ওড়না পেঁচিয়ে যে মরবে, সে উপায়ও ছিল না। ওড়না দূরে থাক, ক্যাম্পে গায়ে তো কাপড়ই রাখতে দিত না তাদের। আবার অনেক মেয়েকে আর্মিরাই মেরে ফেলেছে। মেরে বস্তায় ভরে নিয়ে গেছে কোথাও!…কী দুর্বিষহ দিন গেছে তাদের। কত অপমান, কত নির্যাতন, কত গ্লানির মধ্যে দিন কেটেছে তাদের!…মুক্ত হতে পারবে সে আশা কেউ করেনি তারা। সকলেই বোধহয় মৃত্যুকে কামনা করত। কিন্তু মুনিরা একবারও ভাবেনি মৃত্যুর কথা। শুধু বেঁচে থাকতে চেয়েছে সে। অত অপমানেও কেন জানি তার বাঁচার আকাক্সক্ষা মরেনি। চোখের সামনে অত অত্যাচার দেখে, নিজে বারবার অত্যাচারিত হয়েও বাঁচতেই চেয়েছে সে। মরতে চায়নি।

তবে, আজ কেন মরবে মুনিরা! কপালের ফেরে এক যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরে আরেক যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে সে। যতদিন জীবন আছে, যুদ্ধ করেই যাবে। হয়তো জয় তার নাও হতে পারে। তাহলেও, হার মানবে না মুনিরা। সামনের আবছা আঁধারের দিকে তাকিয়ে মনের সংকল্প দৃঢ় করে মুনিরা।

সন্ধ্যা হয় হয়। চারপাশের আলো কমছে। পাখিরা উড়ে উড়ে ফিরছে তাদের কুলায়। মুনিরা কী করবে, কোথায় যাবে কিছু ভাবতে পারছিল না। বাড়িতে ফিরে যাওয়া ঠিক হবে না। ইছার কাছে গেলে সেও আশ্রয়হীন হবে।

মুনিরা দেখে ঘনায়মান আঁধারের মধ্যে কে যেন হেঁটে আসছে। মুনিরার মনে একটু আশার আলো ঝিলিক দেয়। শফিক ভাই নাতো! নাহ, শফিক ভাই না। লোকটা আরেকটু এগুতেই অবয়বে মুনিরা বুঝে, তার বাপ ইছা। মুনিরা উঠে দাঁড়ায়।

মারে, আমার লগে বাড়িত্ ল। গেরামের মানুষ তরে তাড়াইছে তই কী অইছে। আমি তর বাপ, আমি কি তরে তাড়াইতে পারি। গেরামের সবাই জানে, তর কোন অপরাধ নাই। তঅ তারা তর লগে এতবড় অন্যাইডা করল।… লরে মা, আমার লগে বাড়িত ল।

না আব্বা। আমি গেলে তারা আপনেরেঅ বাইত থাকতে দিত না। আপারেঅ মন্দ কথা কইব।

আমি একলা মানুষ। আমার আর বাড়ি কী ঘর কী! তুই না থাকলে বাড়িতে আমি থাইক্যাঅই কী করমু। …আইচ্ছা, এক কাজ কর। তুই না হয় রহিমাগ বাড়িত্ যা। কয়ডা দিন না অয় রহিমার বাড়িত্ থাইক্যা আয়। এই ফাঁকে আমি দেহি গেরামের মাইনষে বুঝাইজ্যা কিছু করতে পারি কিনা। …তর হুপুয়ে তরে অনেক পছন্দ করে। গেলে ফালাইয়্যা দিত না।। … একলা যাইতে পারবি, না আমি দিয়া আমু? এদিগে রাইতঅদ অইয়্যা আইল। রাইতের বেলাদ আমি আবার চউখ্যে দেহি না ঠিকমতো।

পারমু একলা যাইতে। কতইদ গেছি। দূরদঅ বেশি না।… কিন্তু হটাৎ কইরা যাওন ঠিক অইব? কতদিন আসা যাওয়া নাই। তাও আবার এই হাইঞ্জাবেলা?

ঠিক বেঠিক, সন্ধ্যা আর রাইত কী। বিপদে পইড়াইদ যাইতাছস। … তই গিয়াঅই সব কিছু কইয়া দিস না। কিছু যদি কইতেই অয়, রাইখ্যা ঢাইক্যা লুকাইয়্যা ছাপাইয়্যা কইস।

কিছু কওন লাগব! আমারে দেইখ্যাঅই বুঝব।

ইছা হঠাৎ মুনিরার হাত আঁকড়ে ধরে। বলে, মারে, তর এই বুড়া বাপটারে মাফ কইরা দিস। দেশের লাইগ্যা নিজে যুদ্ধে যাইতে পারলাম না। তর লাইগ্যাও কিছু করতে পারলাম না। … অনে গেরামের মাইনষে, সমাজের মাইনষে তরে ঘিন্না করলেও, একদিন দেহিস তগ সম্মান ঠিকঅই বুজব মানুষ। এত ত্যাগ করছস তরা। তার মূল্য একদিন ঠিকঅই পাবি।… তুই অ¯্র লইয়্যা যুদ্দ না করলেও, তর যুদ্দডাও বড় যুদ্দ। … তুই অনে যা তইলে। রাত অইতাছে। অমাবস্যার রাইত, বেশি দেরি করলে আবার কোন বিপদে পড়স। না, তরে আর অমাবস্যার ভয় দেহাইয়্যা কী অইব। তর জীবনডাইদ অনে অমাবস্যা।

আব্বা, তুমি মনে কষ্ট রাইখ্যো না। তুমিদ আর আমারে নষ্ট বইল্যা ঘিন্না কইরা দূরে সইরা যাও নাই। এই সমাজ আমার লগে অন্যাই করছে। অন্যাই করছে গেরামের মানুষ। কিন্তু তুমি দেইখ্যে আব্বা, আমি ঠিকইঅই বাঁচমু। মাথা উঁচা কইরাইঅই বাঁচমু। মরার অইলে মিলিটারিগ ক্যাম্পেঅই মরতাম। তাগ এত অত্যাচারেও যহন মরি নাই, তহন সহজে আমি হাল ছাড়তাম না। আমার লাইগ্যা তুমি চিন্তা কইরো না। …রাইত অইয়্যা আইতাছে। তুমি বাইত যাও। বেশি রাইত অইলে পথ দেখবা না। গাতায় গোতায় পইড়া আত পাও ভাঙব।

মারে, যাওয়ার আগে তরে একটা অনুরোধ করি। পারলে, পেডের বিষটা বাইর অওয়া মাত্র ফালাইয়্যা দিস।

আব্বা, জীবনডাদ আমার পেডেঅই বড় অইছে। মা অইয়্যা এমন কাজ কেমনে করমু। নিষ্পাপ একটা জীবন। আর ফালাইয়্যাঅই যুদি দেই তইলে আর অপমান অইয়্যা গেরামেত্তে বাইর অইলাম কা!

আমার অনুরোধ আমি করললাম। তুই যা মনে অয় করিস।…আর দেরি করিস না। আল্লার নাম লইয়্যা রওয়ানা অ।

মনিরা যখন পৌঁছল তখন বেশ রাত হয়েছে। গ্রামের মসজিদে এশার আজান হচ্ছে । চারপাশ গাঢ় কুয়াশায় আবছা হয়ে যাচ্ছে ক্রমেই। মুনিরা খুব কুণ্ঠিত পায়ে রহিমাদের উঠানে পা রাখে। খোলা মাঠ ধরে এসেছে বলে, সারা শরীরে জারটা জড়িয়ে আছে। ঠক ঠক করে কাঁপছিলো মুনিরা। স্থির হয়ে দাঁড়িয়েও থাকতে পারছে না। পা কাঁপছে। শরীর টলছে। এতক্ষণ কীভাবে যে হেঁটে এলো এতটা পথ, সে শুধু মুনিরাই জানে।

এই বাড়িতে সে যে আগে আসেনি তা নয়। এসেছে। বহুবারই এসেছে। তবে, সেই আসায় আর এখনকার আসায় বিস্তর ব্যবধান। তখনকার আসায় ছিল খুশি। ছিল আত্মীয় মিলনের আনন্দ। আর আজ! আজ যেন ছোট উঠানটা পেরিয়ে ঘরের কাছে পা যেতেই চাচ্ছে না মুনিরার। আজ সে নিজের গ্রাম থেকে বিতাড়িত। সমাজের কাছে নষ্ট। রহিমা ফুপুরা তাকে কীভাবে গ্রহণ করবে কে জানে! সে আপাতত জেরার হাত থেকে বাঁচার জন্য মাথায় ভালো করে ঘোমটা দেয়। বেঢপ শরীরটাও ভালোমতো ঢাকে। আঁচলে মুখ ঘষে ঘষে মুছে নেয় । কে জানে, লাঞ্ছনার চিহ্ন মুখে রয়েই গেল কিনা!

উঠানের কোণে রান্নাঘরে আলো দেখা যাচ্ছে। বোধহয় রাতের রান্না হচ্ছে। ছ্যাঁক ছোঁক আওয়াজ কানে আসছে। ঝাঁঝালো একটা গন্ধ এসে লাগছে নাকে। মৃদুস্বরে কারা কথা বলছে। বোধহয় রহিমা ফুপুর গলা শোনা গেল। মুনিরার শরীরটা কেমন ঝিমঝিম করছিল। পেটে চিনচিনে ব্যথা। কুণ্ঠিত পায়ে এগিয়ে যায় ও।

রহিমা ইছারের আপন বোন নয়। চাচাতো বোন। সে রান্নাঘরের দরজায় মুনিরাকে দেখে বেশ অবাক হয়। কুপি হাতে এগিয়ে এসে বলে, কিরে মুনিরা, এই অসময়ে তুই! কইত্তে আইলি। আর তর এই অবস্থা কা? মোহঅ কী অইছে! রহিমা মুনিরার মুখের সামনে কুপি এগিয়ে আনে।…শীতেদ শইল কাঁপতাছে তর! যা, ঘরে যা।

আমারে উট্টু শুইতে দেও হুপু। বাইত্তে আইট্টা আইছি। শইলডা কেমন জানি করতাছে।

শেফালিগ, চেঁচিয়ে বলে রহিমা। তর বইনরে নিয়া শোয়া।… মনিরা, কোন অগটন গটে নাইতো মা? ইছার ভাই, মনজুরা সব বালাদঅ?… এহ্ শীতে হাত কেমন ঠান্ডা অইয়্যা গেছে তর!

না হুপু, তাগ কোন বিপদ আপদ অয় নাই। বালাঅই আছে সবাই।… উট্টু জিরাইয়্যা লই। কমু আমি সব। চেষ্টা করেও কণ্ঠের বিষণœতা লুকাতে পারে না মুনিরা। পা দুটোও যেন শরীরের ভার বইতে পারছে না। কেমন কাঁপছে পা দুটো। ভয় হয় মুনিরার, হঠাৎ না আবার অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায়।

  কোনো বিপদ আপদ না অইলে, এই অসময়ে তুই! চিন্তিত গলায় বলে রহিমা।…আইচ্ছা, তুই গিয়া শো মনিরা, চুলায় তরকারি বসাইছি। তরিকারিডা চুলাত্তে নামাইয়্যা আইতাছি আমি।

রহিমা রান্নাঘরের স্বল্প আলোতে তরকারি নাড়তে নাড়তে ভাবে, এই অসময়ে কেন মুনিরা এই বাড়ি এলো! চেহারা দেখে মনে হয় অনেক কান্নাকাটি করেছে। চুল এলোমেলো। মুখে কালো মতো কী যেন। দেখে তো মনে হচ্ছে মেয়েটা গর্ভবতী। মুনিরার তো বিয়ে হয়নি। তাহলে! নাকি এর মধ্যে বিয়ে হয়ে গেছে?…নাহ্, দাওয়াত না পেলেও খবর তো অন্তত পেত। দূর তো আর বেশি না। এক গ্রাম পরেই তার বাপের বাড়ি। আর বিয়ে হলেও, এত তাড়াতাড়ি এত বড় পেটতো হওয়ার কথা না।  সেদিন মাত্র মেয়েটা ফিরে এলো আজরাইলের হাত থেকে।… আচ্ছা, মুনিরাকে তো মিলিটারিরা ধরে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছিল। সেখানে তো মেয়েদের অনেক অত্যাচার করা হয়েছে, সবাই জানে। তাহলে কি সেখান থেকেই মুনিরার পেটে… দুশ্চিন্তাটা রহিমার মনে পাক খেতে থাকে।

আম্মা, মুনিরারে বড় ঘরে শোয়াইয়্যা দিয়া আইছি। … তোমার রান্নার কদ্দূর? মুনিরাঅদ আঙ্গ লগে খাইব মনে অয়।  আর কয়ডা বাত রান্ধন লাগব।

চিন্তা করিস না। বাত বেশিই রান্ধা আছে।  মুনিরায় খাইলেঅ অইয়্যা যাবগা।

আম্মা, একটা ব্যাপার খেয়াল করছ? মুনিরার মনে অয় বাচ্চা অইব। বিয়া অইল কবে মুনিরার। জানলাম নাদঅ।

রহিমা সহসা কোন উত্তর দেয় না। মোটা একটা ন্যাকড়া দিয়ে চুলা থেকে হাঁড়ি নামায়। ঢাকনায় লেগে থাকা ছাই আর ফ্যান ন্যাকড়ায় মুছে। কুপির স্বল্প আলোয় রান্নাঘরের বেড়ায় তার হাতের ছায়া নড়ে চড়ে। … মনেদঅ অয় না বিয়া অইছে। মুনিরার বিয়া অইলে দাওয়াত দিত না ইছা ভাইয়ে। অবইশ্য গ-গোলের সময় কত মাইয়্যারঅই লুকাইয়্যা চুরাইয়্যা বিয়া অইছে। মুনিরারঅ যুদি বিয়া অইয়্যা থাহে…। মনে অয় না অইছে। মুনিরারে মিলিটারিরা ধইরা লইয়্যা গেছিল। হুনছিলাম আটকাইয়্যা রাখছিল।

হ, এমন অইদঅ হুনছিলাম আমরা! পেডের বাচ্চাডা তইলে…

ছেড়িডা কওয়া নাই বাওয়া নাই আৎকা কিয়ারে আমগ বাইত আইয়া উঠল কে জানে! …আমরঅ মনে অয় মিলিটারিগ অত্যাচারের কারণেই পেডে বাচ্চা মুনিরার!

বিষয়ডা যুদি মিছা না অয়, তইলেদ বিপদের কথা। পরশু না বকুলরে দেখতে আওনের কথা। তারা যদি এইসব হোনে?

বালা কথা মনে করছস শেফালি। … ছেড়াগ বাপ মায় এইসব হুনলে, ছেড়ারে এনঅ বিয়া করাইতে রাজি অইবঅ!… কী বিপদে পড়লাম, কছে। দেহি, তর বাপের লগে কথা কইয়্যা। … তরকারিঅ মনে অয় অইয়্যা আইছে। তুই তরকারিডা লইয়্যা ঘরে যা। সাবধানে যাইস। ঝোল টোল পইড়া না আবার শইল পুড়ে। আমি ভাতটা লইয়্যা আই।

 খেতে বসে সবাই মিলে বিষয়টা আলাপ করে। অবশ্য চাপাস্বরেই। তাহলেও, মুনিরা পাশের ঘর থেকে সবই শুনতে পায়। শুনতে না পারার কথা না। বাধা বলতে মাঝে দরমার বেড়া।

আপনেরেদঅ সবঅই কইলাম। অনে কী করি কন? রহিমা স্বামীকে বলে।

ফুপা বলে, দেহো, মুনিরার কী দোষ। আমিদঅ তার কোন দোষ দেহি না। সে তো আর ইচ্ছা কইরা মিলিটারিগ কাছে যায় নাই। এমনদ আঙ্গ শেফালি বা বকুলের লগেও অইতে পারত।

বাপ অইয়্যা এই সব কী অলুক্ষণে কথা কন আপনে!

খারাপ কী কইলাম! যুদ্ধের সময় সারা দেশে এমনদ শত শত ছেড়িগ কপালে ঘটছে। আল্লার কাছে হাজার শুকুর যে আমগ মেয়ের কপালে এমন কিছু অয় নাই।… মাইয়্যাডায় আইছে কইদিন থাকুক। এমন রাইতেরবেলা যহন একলা একলা আইছে, নিশ্চই বড় বিপদে পইড়াঅই আইছে। শইলডাও বোধহয় বেশি ভালা না। খাইতে বইস্যা উইঠ্যা গেল গা।

আপনে পরের ঝিয়ের লাইগ্যা এত ভাবলেন, নিজের ঝিয়ের লাইগ্যা কিছু ভাবলেন না। পাত্রপক্ষ যুদি বকুলরে এইসব শুইন্যা পছন্দ না করে?

এইম্নে অপছন্দ করতেঅই পারে। কিন্তু এইসব শুইন্যা অপছন্দ করার কী আছে। … মুনিরারেদ আর বিয়া করতাছে না। দেখতে আইতাছে বকুলরে। তারে পছন্দ অইলে বিয়া করব, না অইলে  নাই।…আঙ্গ বাড়িত মেমান কে আইল না আইল, এই খোঁজখবর তারা পাইব কই থাইক্যা! মুনিরা থাহে আরেক গেরাম,  তোমার চাচাতো ভাইয়ের ঝি। তার জীবনে কী দুর্ঘটনা ঘটল না ঘটল এইসব খবর তারাই বা জানব কেমনে?

এইসব খবর চাপা থাহে না। যেমনে হোক জাইন্যা যায় মানুষে। গ্রামে আঙ্গ শত্রুর অভাব আছে। দেহেন সকাল অইলে আপনের বড় ভাইয়ের বউঅই কথাটা সাত গেরামে রটাইব। গেরামে ঢুকার আগেঅই ছেলে পক্ষ সব জাইন্যা যাইব। এই সম্বন্ধটা বেশ ভালা। এন বিয়াডা অইলে বকুলের জীবনডা সুন্দর অইব। আঙ্গ কোনোভাবেই ঝুঁকি নেওয়া ঠিক অইব না… আমি ভাবতাছি অন্য কথা। মুনিরা আঙ্গ বাইত কা আইল! … তাগ বাইত মনে অয় কোন ঝামেলা অইছে। মুনিরার চোখমুখও দেখলাম কেমন ফোলা ফোলা। খাইলঅ না ঠিকমতো।

মুনিরা তোমার ভাইয়ের মেয়ে। আমার চেয়ে তার লাইগ্য দরদ তোমারই বেশি থাকার কথা। তারপরঅ আমি আগ বাড়াইয়্যা একটা কথা কই। মায়্যাডটা এই অসময়ে শীতের মইধ্যে যহন এই বাইত্ আইছে, থাকুক কয়ডা দিন। হয়তো গেরামে কোন ঝামেলা অইছে। নাঅইলে রাইতে কা আইল! তাঅ একলা।

আমিও তাই ভাবতাছি। নিশ্চই কিছু ঘটেছে। মুনিরা ঘুমায় কিনা কে জানে। সকাল না অইলেদঅ সব জানাঅ যাইতাছে না।

হউক সকাল। কই কী কয়ডা দিনও যাউক। তারপর না হয় ধীরেসুস্থে কথা কও মাইয়্যাডার লগে।

মাথা খারাপ না অইলে কেউ এমন কথা কয়! মুনিরারে এই বাইত থাকতে দিলে আঙ্গ মাইয়্যার কপালডা পুড়ব। যেমনেঅই হোউক বুঝাইয়া শুনাইয়া মুুনিরারে সকালেই বিদায় করতে অইব। আরেকজনের মাইয়্যার লাইগ্যা আমরা নিজেগঅ মাইয়্যার জীবন নষ্ট করার ঝুঁকি নিতে পারি না।

মুনিরা পাশের ঘর থেকে সবই শুনে। বুঝতে পারে, এখানে তার ঠাঁই হবে না। সিদ্ধান্ত নেয় সকালে উঠেই চলে যাবে এ বাড়ি ছেড়ে। তার জন্য যদি সত্যি সত্যি বকুলে বিয়ে ভেঙে যায়! যেতেই পারে। তার নিজের গ্রামের লোকেরাই যখন মনে করে সে অপরাধী, তাহলে আত্মীয় করতে আসা অচিন কেউ এ বাড়িতে তার আসাটাকে অপরাধ হিসাবেই নিতে পারে।

কিন্তু কোথায় যাবে, ভেবে পায় না মুনিরা। চকিতে একবার শফিকের কথা মনে হয়। তবে, পরক্ষণেই বাতিল করে দেয় চিন্তটা। শফিক ভাইতো এক গ্রামেরই ছেলে। মুনিরার খবর কি আর জানে না! সব জেনেও যেহেতু দেখা দেয়নি, মুনিরার সেধে তার কাছে যাওয়াটার ঠিক হবে না। তা ছাড়া একবারতো গিয়েছিল। … আগামীকালের কথা মুনিরা আর বেশিক্ষণ ভাবে না। এত বড় পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও তার জায়গা হবেই। এতবড় বিপর্যয় থেকে যখন বেঁচে আসতে পেরেছে, তখন বেঁচে থাকতে পারবে। নিজেকে প্রবোধ দেয় মুনিরা। পারতে হবেই। প্রয়োজনে না হয় ভিক্ষা করবে। তবু, পেটে যে আছে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।

সকালে উঠে ফুপু রহিমাকে সব কথাই বলে মুনিরা।

হুপু, আব্বার কথায় আমি আপনেগ বাইত আইছিলাম। আমি রাইতে শুইয়্যা শুইয়্যা আপনেগ আলাপ হুনছি।  আপনেগ অসুবিধা কইরা আমি থাকতাম না আপনেগ বাইত। মিলিটারিগ ক্যাম্পে থাকার কারণে আঙ্গ গেরামের মাইনষে আমারে সালিশ কইরা গেরাম থাইক্যা বাইর কইরা দিছে। আমার অপরাধ, আমারে পাকিস্তানি মিলিটারিরা ধইরা নিয়া গেছে। আটকাইয়্যা রাখছে। অত্যাচার করছে। আমার পেটে পাকিস্তানিগ বাচ্চা।  আপনেগরে আপন মানুষ মনে কইরাঅই আইছিলাম। আইয়্যা দেখলাম, আপনেরা আমারে আর আপন ভাবেন না। যাউক, আমার কারণে বকুলের বিয়ার সম্বন্ধ নষ্ট ওউক আমি চাই না। কুয়াশা সইরা পথটা পরিষ্কার অইলেঅই আমি যামুগা।

মুনিরাগ মা, আঙ্গ উপ্রে রাগ করিস না। রহিমা  মুনিরার কাঁধে হাত রেখে বলে। তরেদ নিজের ঝিয়ের মতোই দেহি। তর কষ্টে আমারও কষ্ট লাগতাছেরে মা। কিন্তু কী করমু ক। বকুলের এইবারের সম্বন্ধডা অনেক ভালা। কোনোভাবে যদি তারা জানে যে, বকুলের বইনেরে মিলিটারিরা ধইরা নিয়া গেছে, সম্বন্ধটা বাতিল কইরা দিতো পারে।… মারে, সবঅই কপাল! নাইলে আউজ্জা, তরঅদ কত ভালা ভালা বিয়ার সম্বন্ধ আওনের কথা।  আঙ্গ বুকুলের চেয়ে কত সুন্দর তুই। খালি বকুল কা, দুই দশ গেরাম ঘুরলে তর মতো সুন্দর ছেড়ি মিলব! কপালের ফেরে তর আউজ্জা এই অবস্থা।

রহিমা আরও কী সব বলছিল। মুনিরা শোনে না। কুয়াশার মধ্যে দিয়েই হেঁটে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। রহিমাদের বাড়ি পেছনে ফেলে হাঁটতে থাকে গম ক্ষেতের আল ধরে।

বকুল তার সমবয়সী। আগে এ বাড়ি এলে কত গল্প করত তার সাথে। এমনও হয়েছে কথায় কথায় রাত পার করে দিয়েছে দু’জনে। অথচ, এবার একটা কথাও বলল না। তাকে দেখেও যেন দেখল না। জানতে চাইল না একবারও, কেন সে রাতের বেলা তাদের বাড়িতে এলো। আজকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে ওকে। হয়তো পছন্দও করবে। বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি, নিজের সংসারে চলে যাবে বকুল। নিজের সংসার! সব মেয়েই একটা সময়ের পর নিজের সংসারের স্বপ্ন দেখে। মনে মনে সে সংসারকে সাজায়-গোছায়। মুনিরাও কি তেমন স্বপ্ন দেখেনি? দেখেছে। বাস্তবের পুরুষ শফিককে নিয়েই মুনিরা স্বপ্ন দেখেছে। দুঃস্বপ্নের দিনগুলো তার জীবনে না এলে এতদিনে হয়তো স্বপ্নগুলো বাস্তব হয়ে যেত। শফিকের বাড়িতেই হয়তো বউ হয়ে যেত মুনিরা। রহিমা মিথ্যে বলেনি। মুনিরার মতো সুন্দরী দশ গ্রামেও খুঁজলে পাওয়া যাবে না। সে সৌন্দর্যই বুঝি কাল হলো মুনিরার জীবনে। মাত্র সতেরো বছর বয়সেই সমস্ত স্বপ্ন হারিয়ে গেল জীবন থেকে।

তিন

কখন যে রোদ উঠেছে! হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায় উঠে পড়েছে মুনিরা! এত জোরে হাঁটছিল, শীতটা যেন টেরও পায়নি। আসলে ও নিজের অজান্তেই রহিমাদের চোখের বাইরে চলে যেতে চাচ্ছিল। পুরো গ্রাম জেগে ওঠার আগেই, কুয়াশার আবডালে লুকিয়ে লুকিয়ে চলে যেতে চাচ্ছিল। চাচ্ছিল যেন গ্রামের আর কেউ তাকে না দেখে।  কিন্তু রাস্তায় উঠেই মনে হয় পালিয়ে কোথায় যাবে! কোথায় থাকবে লুকিয়ে! এই সমাজ, এইসব মানুষÑ এদের বসবাসতো সারা দেশেই। নিজের গ্রামের মানুষ আর রহিমার মনোভাব তো ভিন্ন নয়। মানুষ দুই পদের হলেও মুনিরার ব্যাপারে চিন্তা একই। সে এখন সবার কাছেই আপদ।

বলতে গেলে রাতেও কিছু খায়নি। সে কারণেই বোধহয় এই সকালেই ক্ষুধায় পেট চিনচিন করছিল মুনিরার। সাথে কোনো টাকা-পয়সাও নিয়ে আসেনি যে কিছু কিনে মুখে দেবে। ঘটনার আকস্মিকতায় হয়তো ইছাও ভুলে গেছে মেয়ের হাতে কিছু টাকা পয়সা দিতে। না হলে বাড়িতে শ’ দুয়েক টাকাতো ছিলই বিপদের জন্য জমানো। কী জানি, হয়তো ইছা ভেবেছে রহিমাদের বাড়িতে মুনিরা আদরেই থাকবে। ইছা হয়তো নিশ্চিন্ত মনেই বাড়ি ফিরে গেছে। ভেবেছে হয়তো রহিমাদের বাড়িতে আপাতত মুনিরার আশ্রয় হলো। নিজের জন্য না, পেটেরটার জন্যই মুনিরার বেশি চিন্তা হচ্ছিল। না খেয়ে কতক্ষণ থাকবে। দিনতো মাত্র শুরু হলো। সারাদিন কাটবে কীভাবে?

যতই ভাবতে না চাক, ভাবনা মুনিরার মনে আসছেই। আজকের দিন কীভাবে কাটবে? কালকে কীভাবে কাটবে? আর তার পরের দিনগুলো? ভাবতে ভাবতে হাঁটতে হাঁটতে ফের গ্রামের সীমানার বটগাছটার নিচে চলে আসে মুনিরা। ক্লান্ত শরীর নিয়ে গাছটার ঝুরির কাছে বসে পড়ে। বসে মাটিতেই। তবে, এখানে বেশিক্ষণ বসে থাকা ঠিক হবে না। বোঝে মুনিরা। পথের ধারেই বটগাছটা। গ্রামের লোকেরা এ পথেই বাজার-সদাই করতে যায়। আর কিছুক্ষণ পরেই তাদের চলাচল শুরু হবে। গ্রামের লোকেরা তাকে দেখলে নিশ্চয়ই টিটকারি দেবে। মুনিরার ইচ্ছে করছে পরিচিত আওতা থেকে দূরে কোথাও চলে যেতে। পালিয়ে যেতে বিষাক্ত মানুষগুলোর নিঃশ^াসের গ-ি থেকে। কিন্তু যাবে কোথায়?

আর চাইলেই কি যেতে পারবে পালিয়ে? সেদিনও তো পালাতে চেয়েছিল মুনিরা।

সেদিন ছিল শুক্রবার। পবিত্র জুমার দিন।

ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন মিলিটারির দলটা যখন গ্রামে ঢুকল, তখন চারদিকে বৃষ্টিধোয়া দুপুর যেন ঝকঝক করছে। ওদের সাথে দু’জন লোক বাড়ি দেখিয়ে দিচ্ছিল। তারা পাশের গ্রামেরই। একজনকে মুনিরা মুখ-চেনায় চেনেও।

খানিক আগেই শেষ আগস্টের বৃষ্টি হয়েছে। সে কারণে চারপাশ ভেজা ভেজা। গাছের পাতাগুলো চকচক করছে। আকাশটা ঝকঝক করছে। কিন্তু আকাশের অই ভাব রইল না। কালো হয়ে গেল ধোঁয়ায়। গাছের সতেজ পাতারা মলিন হয়ে গেল আসন্ন বিপদের আশঙ্কায়। গ্রামের সমস্ত ঘর-বাড়িতে জ¦লে উঠল আগুন। লেলিহান শিখা উঠে গেল গ্রামের নারিকেল গাছের মাথায়। বাবুই পাখিরা বাসা ছেড়ে ছানা-পোনা রেখে জীবন নিয়ে পালালো। এখানে ওখানে শুরু হলো হৈচৈ। চিৎকার। আহাজারি। মানুষজন দৌড়াচ্ছে গ্রাণভয়ে। চারপাশ থেকে টাস টাস গুলির আওয়াজ কানে আসছে।

মিলিটারিরা গ্রামে ঢুকেই সাথের দু’জন লোক যে যে বাড়ি দেখিয়ে দিচ্ছিল, বেছে বেছে সেসব বাড়িতে আগুন দিচ্ছিল। যে বাড়ির ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গেছে সেসব বাড়িতে আগুন দিচ্ছে পশুরা। যে বাড়ির লোক আওয়ামী লীগ করে সেসব বাড়িতে আগুন দিচ্ছে পশুরা। যে বাড়িতে অল্পবয়সী মেয়ে আছে সেসব বাড়িতে ভাংচুর করছে পশুরা। ঘরের লোকদের টেনে টেনে বাইরে এনে গুলি করে মারছে। বিশেষ করে জোয়ান পুরুষদের। 

পিশাচরা আগুন দিতে দিতে এগোচ্ছে। গুলি করতে করতে এগোচ্ছে। সামনে কাউকে পেলে মাটিতে ফেলে বেয়নেট দিয়ে খোঁচাচ্ছে। কেউ দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেই গুলি করছে। ঘর থেকে টেনে টেনে মেয়েদের বের করে সকলের সামনেই চড়াও হয়ে অত্যাচার করছে। কোনো কোনো মেয়েকে টেনেহিঁচড়ে গ্রামের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। লোকজন প্রাণভয়ে যে যেদিকে পারে দিগি¦দিক ছুটছিল। মুনিরা খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখছিলো ওদের তা-ব। দেখছিল আর স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল। পশুরা ওদের পাড়ার দিকে আসতেই হুস হয় ওর। দৌড়ে এসে বাড়ি ঢোকে। 

ঘরের ভেতরে মুনিরা বাপ-মা আর ছোট ভাইসহ ভয়ে কাঁপছিল। ওরা ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ পায় না। বের হতে হলে পিশাচদের সামনে দিয়েই বের হতে হয়। পাকি পিশাচরা এক সময় ওদের বাড়ির কাছে চলে আসে। ততক্ষণে মুনিরা ধানের গোলার নিচে গিয়ে লুকিয়েছে। মা ছোট ভাইটাকে বুকে চেপে দরজার পেছনে লুকিয়ে জোরে জোরে আল্লাহকে ডাকছে। মিলিটারিরা বাইরে থেকে বন্ধ দরজায় জোরে জোরে লাথি দেওয়া শুরু করছে।

লাথির আঘাতে এক সময় দরজা ভেঙে পড়ে। সাত-আটজন প্রবেশ করে ঘরে। সাথে শান্তি কমিটির দু’জনও। কারও হাতে অস্ত্র, কারও হাতে লাঠি। ওরা ঘরে ঢুকেই জিনিসপত্র ভাঙতে থাকে। একজন ইছার কপালে বন্দুক ধরে জিজ্ঞেস করে, তোমহারা লাড়কি কাহা হ্যায়? তুমহারা জওয়ান লাড়কি?

ইছা মিলিটারিদের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, মিথ্যাই বলে, ঘরে আমার কোনো জওয়ান মাইয়্যা নাই বাবারা। আমরা দুই বুড়াবুড়ি ছুড ছেলেডারে লইয়্যা থাহি। এক মাইয়্যা আছিল, তার বিয়া অইয়্যা গেছে।

স্যার, ইয়ে বুড্ডা ঝুট বোলতা হ্যায়। ঘরমে উসকো ইক জওয়ান লাড়কি হ্যায়। শান্তি কমিটির একজন বলে।

শালে বুড্ডা, তুম ঝুট বোলতা হ্যু মেরে সাথ? বাতাও কাহাহে তোমহারা লাড়কি? বলতে বলতে রাইফেলের বাঁট দিয়ে ইছাকে মারতে থাকে একজন।

মিলিটারিরা আর শান্তি কমিটির দু’জন ঘরের আনাচ-কানাচ খুঁজতে শুরু করে। ঘরের জিনিসপত্র ছুড়ে ছুড়ে ভাঙতে থাকে। ওলটপালট করে সবকিছু।

লুকিয়ে কাজ হয় না। মুনিরাকে ঠিকই খুঁজে পায় ওরা। একজন টেনে ধানের গোলা থেকে তাকে বের করে। মুনিরাকে দেখে পিশাচরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

একজন ইছাকে লাথি দিয়ে দূরে ফেলে দেয়। মুনিরার মা আম্বিয়া একজনের পা জড়িয়ে ধরতে গেলে তাকে গুলি করে। রক্তের মধ্যে নিথর হয়ে আম্বিয়া পড়ে থাকে। ছোট ভাইটা দরজার পেছনে লুকিয়ে ছিল, মিলিটারিদের একজন তাকে বের করে। ঘরের বাইরে নিয়ে গিয়ে উঠানের শক্ত মাটিতে আছাড় দেয়। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন মিলিটারি ছোট্ট দেহটার বুকের ওপর বুট দিয়ে চেপে ধরে। ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে পড়ে দেহটা।

মুনিরা অবিশ্বাস্য চোখে সব দেখে। …এত সহজে মানুষকে মেরে ফেলা যায়! এত সহজে! এত নিষ্ঠুরতার সাথে একটা শিশুকে মারা যায়। এত অবহেলায়। বিনা দোষে! মা আর ভাইকে চোখের সামনে মরতে দেখেও মুনিরা কাঁদতে ভুলে যায়। ভয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। পিপাসায় গলার ভেতরটা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে যেন। কোনো শব্দ করতে পারছিল না মুনিরা। আতংকে  চোখের পলকও ফেলতে পারে না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে সব। ইছারউদ্দীন তখনও মিলিটারিদের পায়ে ধরে কাঁদছে।

মিলিটারিদের দু’জন মুনিরাকে মাটিতে ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর ওপর। মুনিরা মা ভাইয়ের জন্য শোক করার সুযোগও পায় না। বাপের চোখের সামনেই একের পর এক পিশাচরা তার ওপর ওঠে আর নামে।…ওঠে নামে। ইছার মিলিটারিদের পা জড়িয়ে ধরে আর কাঁদে। অত্যাচরিত হতে হতে  জ্ঞান হারানোর আগে মুনিরা দেখে তাদের ঘরের চালে আগুন জ¦লছে দাউ দাউ করে।

জ্ঞান যখন ফেরে, মুনিরা দেখে তার হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। ঘরের মেঝেতে কাত হয়ে পড়ে আছে। ঘরটা ছোট। ভেতরটা প্রায় অন্ধকার। আবছা আঁধারে দেখা যায়, আরও অনেক মেয়ে আছে সে ঘরে। গোঙানির শব্দ আসছে। কেউ বোধহয় কাঁদছে নিচুস্বরে। বেশিরভাগ মেয়েরই হাত উঁচু করে ঘরের আড়ার সাথে ঝুলিয়ে রাখা। এলোমেলোভাবে পড়ে আছে কেউ কেউ। সব মিলিয়ে বিশ-বাইশ জন মেয়ে হবে। এখানে ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কারও কারও গায়ের কাপড় ছিন্নভিন্ন। কারও ঊর্ধ্বাঙ্গ উদোম, নি¤œাঙ্গে পেটিকোট। কারও কারও গায়ে কোনো কাপড়ই নেই। বিবস্ত্র।

ব্যথায় শরীর নড়াতে পারে না মুনিরা। অসহ্য যন্ত্রণায় শরীরের নিচের দিকটা যেন অসাড় অসাড় লাগছে। মুনিরার মনে হয় ভারী মুগুর দিয়ে কেউ তার শরীরকে পিটিয়েছে। স্তনে প্রচ- ব্যথা। ঠোঁট কেটে ফুলে আছে। চোখের ভেতর খচখচ করছে। বোধহয় বালু আটকে আছে।

মুনিরা শুয়ে শুয়েই দেখে, সকলের চোখের সামনেই দু’জন মিলিটারি একজন বয়স্ক নারীর ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। প্রাণপণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে সে হতভাগ্য নারী। কিন্তু আরও দু’জন মিলে সে নারীর হাত আর পা বুটের নিচে চেপে রেখেছে। অসহায় নারী বুটের নিচে চাপা পড়ে নড়তে পারছে না। শুধু মুখ দিয়ে চিৎকার করছে। মরণ চিৎকারে ঘরটাও যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। সকলের চোখের সামনে পালাক্রমে চারজনই ওই নারীকে নির্যাতন চালায়। ততক্ষণে নির্যাতন সইতে না পেরে জ্ঞান হারিয়েছে সেই নারী।

এরপর থেকে প্রতিদিনই এমন দৃশ্য দেখে মুনিরা। দেখে আরও আরও বন্দি মেয়েকে। ওদের চোখের সামনে যখন যার ইচ্ছা মিলিটারিরা এসে মেয়েদের ধর্ষণ করে যাচ্ছে। ইচ্ছা হলে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করছে খোলা দেহ। বন্দিদের মধ্যে আছে ছয় বছরের মেয়েও। আছে পঞ্চাশ বছরের নারী। 

বেশিরভাগ সময়ই মেয়েদের হাতের বাঁধন খোলা হয় না। বাঁধা অবস্থায়ই মেয়েরা মল-মূত্র ত্যাগ করে। বন্দী মেয়েদের পায়খানা-প্রস্রাব আর রক্তে ঘরটা সয়লাব। ছোট ঘরটার ভেতরে সব সময় দুর্গন্ধ জেগেই আছে। সেসবের ওপর ফেলেই পিশাচরা মেয়েদের অত্যাচার করে।

দিনে একবার খাবার দেওয়া হয় তাদের। খাওয়ার সময় দয়া করে মেয়েদের হাতের বাঁধন খোলে ওরা। সে খাবার দেওয়া হয় মেঝেতে ঢেলে বা টিনের থালায়। কোনোদিন শুকনো রুটি আর ডাল। কোনোদিন একমুঠ ভাত আর ডাল। সে ভাত আর ডালেও থাকে পোকা। তাই কত আগ্রহ করে খায় মেয়েরা। এত অপমান, এত অত্যাচার, এত দুঃখ এত বেদনাÑ তাহলেও, তাহলেও মানুষের ক্ষুধা পায়! গোগ্রাসেই সে খাবারটুকু খায় সবাই। কারও কারও দু’হাত বাঁধাই থাকে। হাত বাঁধা অবস্থায়ই মেঝে থেকে চেটে চেটে খাবার খায় মেয়েরা।…খায় জীবন বাঁচাতেই। জীবন! আসলে যে কোনো পরিস্থিতিতেই আপন জীবন রক্ষা করতে চায় মানুষ।

দিনের পর দিন চলে ওদের অত্যাচার। এক দিনের জন্যও রেহাই পায় না কোনো মেয়ে। অন্ধকার ঘরে বেঁধে রেখে প্রতিদিন মেয়েদের শরীরের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায় মিলিটারিরা। এক একজন মেয়েকে সাত-আটজন মিলিটারি ধর্ষণ করে। অজ্ঞান হওয়া পর্যন্ত ধর্ষণ করে।… ইচ্ছে হলে কোনো মেয়ের স্তন কেটে নিচ্ছে বুক থেকে। কামড়ে কামড়ে বুকের মাংস, গালের মাংস ছিঁড়ছে। পাছার মাংস যেন খেলাচ্ছলে চাকু দিয়ে কেটে ফালা ফালা করে। ধর্ষণ করতে কোনো মেয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে সবার সামনেই বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, যোনিতে বা গুহ্যদ্বারে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে গুলি করে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে দেহ।… নির্যাতন করতে করতেও কোনো কোনো  মেয়েকে ওরা মেরেও ফেলছে। বস্তায় ভরে নিয়ে যাচ্ছে সেসব মৃত মেয়েদের দেহ। তার স্থলে আবার নতুন মেয়েদের এনে বেঁধে রাখছে। মেয়েদের মরণ চিৎকারে সবসময় ভারী হয়ে থাকছে ঘরের বাতাস।

কারওরই আর পরনের পোশাক ঠিকঠাক ছিল না। ছিঁড়ে শতখান। পশুরাই ছিঁড়েছে সব কাপড়। শাড়ি অনেক আগেই সরিয়ে নিয়েছে। যদি কোনো মেয়ে শাড়ি ঘরের আড়ায় পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দেয়। কেউ কেউ শুধু পেটিকোট জড়িয়ে রেখেছে শরীরের নিচের অংশে। কারও কারও গায়ে কোনো কাপড়ই নেই।

আহ, কী যে অত্যাচার পশুরা করেছে নিষ্পাপ মেয়েগুলোর ওপরে। সেসব মনে হলে এখন মুনিরারই অবিশ^াস্য মনে হয়। মনে সংশয় জাগে, আসলে কি মানুষ অমন নৃশংস হতে পারে!… মুনিরার পাশেই বাঁধা ছিল একটা অল্প বয়সী মেয়ে। ষোলো কী সতেরো বছর হবে মেয়েটার বয়স। পশুদের উপর্যুপরি ধর্ষণে মারা যায়। পশুরা বন্দী মেয়েদের চোখের সামনে মেয়েটার দেহ নামিয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে টুকরা টুকরা করে। পশুরা মেয়েটার পবিত্র দেহতে ছুরি চালাচ্ছিল আর জোরে জোরে হাসছিল। টুকরো করা শেষে একটা বস্তায় ভরে পশুরা মেয়েটার খ-িত দেহ নিয়ে চলে যায়।

আর একটা হাত বাঁধা ছোট মেয়ে, পশুদের ধর্ষণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। মেয়েটার বয়স দশের বেশি হবে না। অত ছোট মেয়ে কি আর পারে জোয়ান চারজন পশুর সাথে! …ছয় সাতজন সেনা মিলে তার কচি দেহের ওপর অত্যাচার করে। মেয়েটার দু’পা বেয়ে অঝোরে রক্ত পড়ছিল। এই অবস্থায় পশুদের দু’জন মিলে মেয়েটাকে দাঁড় করায়। …তারপর যা হয়, সে কথা মনে হতে দিনের প্রকাশ্য আলোতেও ভয়ে কেঁপে ওঠে মুনিরার সারা দেহ। গায়ে কাঁটা দিয়ে সারা গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়।…বন্দি মেয়েদের চোখের সামনে পিশাচরা হাসতে হাসতে কচি মেয়েটার দু’পা দু’জনে ধরে দু’দিক থেকে টেনে চড়চড়িয়ে ছিঁড়ে ফেলে। আহারে কী বুক ফাটা আর্তনাদ যে মেয়েটা করেছিল। সে কান্নার শব্দে এখনও যেন বুক কেঁপে উঠল মুনিরার। ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মুনিরা।

ছোট মেয়েটাকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর থেকে সবাই কেমন ভয় পেয়ে যায়। পশুদের অত্যাচারে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে না। নীরবে সয়ে যায় নির্যাতন। 

নির্যাতনে, অনাহারে কত মেয়ে যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে! পাঁচ মাস চোখের সামনে কত কত মৃত্যু দেখল মুনিরা। কত অত্যাচার সইল। তারপরও, তারপরও মুনিরা মরার কথা ভাবেনি। ভাবেনি একবারও। শুধু বেঁচে থাকার কথা ভেবেছে। প্রাণপণে চেয়েছে বেঁচে থাকতে। 

সে বেঁচে থাকার মাসুল কি সারা জীবন দিয়ে যেতে হবে মুনিরাকে? কে জানে হয়তো বাকিটা জীবনই বেঁচে থাকতে হবে অপমান আর লাঞ্ছনাকে সাথে নিয়ে।

চার

নতুন একটা দিন শুরু হচ্ছে। চারদিকে আলো বাড়ছে। কিন্তু মুনিরা নিজের জীবনের চারপাশে কোনো আলো দেখতে পাচ্ছে না। শুধু অন্ধকার। অন্ধকারই যেন তার চারপাশ, তার জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। কী করবে, কোথায় যাবে ঠিক ভাবতেও পারছিল না মুনিরা।

সকাল থেকে বটগাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে থাকে মুনিরা। বসে থাকে মুখ ঢেকে। ঝুরির আড়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। সকাল গিয়ে দুপুর হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যাও হয় হয়। মুনিরা ওঠে না। ভুলে যায় খাওয়ার কথা। উঠে কোথাও যাওয়ার কথা। আকণ্ঠ পিপাসা নিয়ে বসেই থাকে। ওর কেমন ঘোর ঘোর লাগে। চোখের সামনে সবকিছু যেন তরল হয়ে ভেসে ভেসে বেড়ায়। গায়ে বোধহয় ভালোমতই জ¦র এসেছে।

মাথার ওপর চড়–ইয়ের দল দারুণ হল্লা করছে। বটের ঝুরিতে মাথা ঠেকিয়ে মুনিরা আকাশ পানে তাকায়। পড়ন্ত সূর্যের লালিমা নিয়ে পশ্চিমের আকাশ কেমন মায়াবী হয়ে আছে। যতদূর চোখ যায় সামনে গমের ক্ষেত। বাতাসে তিরতির করছে গমের পুরুষ্টু শীষ। দুটো ফিঙ্গে ওড়াউড়ি করছে গমের ক্ষেতের ওপর। এসব দেখে মুনিরার মনে হয়, জীবন কী সুন্দর! মানুষই তাকে অসুন্দর করে। কদর্য করে। বিষাক্ত করে।

পথে এখন লোক চলাচল নেই বললেই চলে। ধীরে ধীরে মুনিরা উঠে দাঁড়ায়। গায়ে কাঁটা দিলে কেঁপে ওঠে শরীর। জ¦রে না শীতে, ঠিক বোঝে না।

মটুপি গ্রামের দিক থেকে কারা যেন আসছে। মৃদু হাসি আর কথা শোনা যায়। ভালোমতো দেখার জন্য মুনিরা পথের মাঝে গিয়ে দাঁড়ায়।

বেদেরা আসছিল। দল বেঁধে। বেদেনীরা গা দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটছে। মাথায় চূড়া করে বাঁধা চুল। হাতে সাপের ঝাঁপি। পিঠে কাপড়ে বাঁধা বাচ্চা। পুরুষদের হাতে বীণ। কারওর হাতে সাপের ঝাঁপি। সংখ্যায় পুরুষের চেয়ে মেয়েরাই বেশি। বেদেনীরা কলকল কথা বলছিল। হাসছিল। ঢলে ঢলে পড়ছিল। একজন আরেকজনের গায়ে। বোধহয় সাপের খেলা দেখিয়ে ফিরছে সবাই।

মুনিরা অলস চোখে বেদেদের দেখে। ওরা থাকে নদীর তীরে। গোমতীর চরে। নৌকার ছইয়ের মতো ঘরেই ওদের ঘর-সংসার। বেদে হলেও অন্যদের মতো এরা ঠিক যাযাবর প্রকৃতির নয়। বছরের পর বছর চরেই থাকে। অবশ্যি বর্ষাকালে পানি বাড়লে ছইগুলো নৌকায় লাগিয়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। তাবিজ-কবজ বেচে। সাপ ধরে সাপের খেলা দেখায়। বউ-ঝিদের হাতে পিঠে শিঙ্গা লাগিয়ে দূষিত রক্ত বের করে। স্বামী বশীকরণের তাবিজ বেচে। আলতা-চুড়ি এসবও বেচে। মুনিরাদের গ্রামে বহুবার এসেছে ওরা। দেখা যাচ্ছে ওদের মধ্যে দু-একজন মুখ চেনাও আছে মুনিরার।

তেমনই একজন মধ্যবয়স্ক বেদেনী মুনিরাকে দেখে দাঁড়িয়ে যায়।

কীগো বেডি? কে তুমি? এই হাইঞ্জাবেলা এনঅ খাড়অইয়্যা রইছ?…তোমারে দেহি চিনা চিনা লাগে! তোঙ্গ বাড়ি মটুপি গেরামে না?

মুনিরা কোনো জবাব দেয় না। চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তবে মুনিরা বেদেনীকে চিনতে পেরেছে। বেদেনীর নাম মালতী। তার কাছ থেকে বহুবার লাল কাচের চুড়ি কিনেছে। এর সাথে তার মায়ের বিশেষ খাতির ছিল। তবে, সে কথা মুনিরা বেদেনীকে বলে না। হাবভাবেও প্রকাশ করে না যে সে বেদেনীকে চেনে।

তবে বেদেনী তাকে চেনে। ঠিকভাবেই চেনে।

তোমার নাম মুনিরা। ঠিক না? তোঙ্গ বাইত কত গেছি। তোমার মায়দঅ আমারে খুব ভালোবাসে। স্বাধীনের পর আর তোঙ্গ গেরামে যাই নাই। আউজ্জাঅই পরথম গেলাম। ফিরতাছিদঅ তোঙ্গ গেমামেত্তেঅই। তই তোঙ্গ বাইত কিন্তু যাওনের সময় পাই নাই। …তোমার কী অইছেগো বেডি? এই নাওঅ রাইত নাওঅ দিনে বটগাছের তলে খাড়অইয়্যা রইছো? জিন ভূতের ভয় নাই তোমার! জাননা, এই গাছটার বদনাম আছে। বয়সী মাইয়্যা অইয়্যা তুমি যমের দুয়ারে খাড়অইয়্যা রইছো! গাঅদ একটা শীতের কাপড়অ নাই। কারঅ লাইগ্যা অপেক্ষা করতাছ নাহি?… কীগো বেডি, কথা কও না কা?…তুমি মুনিরাঅইদ, নাহি? আরেকটু কাছে এসেই আঁৎকে ওঠে মালতি, কী অইছেগো বেডি! তোমার এই অবস্থা কা! চোউখ মুখ কেমন ফুলা ফুলা লাগে। শইল কি খারাপ নাহি?

মুনিরা নিঃশব্দ, তাকিয়ে থাকে মালতির দিকে। বেদেনীর এত প্রশ্নের জবাবেও কোন কথা বলে না। বহুদিন এমন আদরমাখা কথা কারও কাছ থেকে শোনেনি মুনিরা। মিলিটারি ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে ওর সাথে এত নরম সুরে কেউ কথা বলেনি। ইছা তাকে ভালোবাসে ঠিকই। কিন্তু ক্যাম্প থেকে ফেরার পর ইছা ভালো করে মেয়ের দিকে তাকায়নি। কাছে বসিয়ে কোনো সময় মুনিরার মনের দুঃখের কথা জানতে চায়নি। নিজের অজান্তেই ওর দু’চোখ জলে ভরে ওঠে।

বুঝছি, মালতী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তোঙ্গ গেরামেত্তেইদ আইলাম। তোমার কথাঅই তাইলে বলাবলি করতাছিল হগলতে। মাগো, আমার বইনঝিডারেও ধইরা নিয়া গেছিল হারামির বাচ্চারা। … তুমিদ ত বাঁইচ্চা ফিরা আইছ। বইনঝির লাশটাও পাই নাই। হুনছি, আর আর লাশের লগে মাইয়্যাডার লাশও একটা গর্তে চাপা দিছে। লওগো মা, আঙ্গগ লগে লও। আঙ্গগ লগেঅই থাইক্যো যতদিন না একটা ভালা ঠিকানা পাও। সরদার আঙ্গ খুব ভালা মানুষ। তোমারে আঙ্গ কাছে ঠাঁই দিব। তাড়াইয়্যা দিব না। … তই, একটা কথা, আমরা কইলাম হিন্দু মা! সাপ লইয়্যা আঙ্গ কারবার। আঙ্গ লগে তোমার আবার খাওয়া চলার অসুবিদা অয় কিনা!

মালতী মুনিরার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। গায়ে হাত বুলিয়ে কথাগুলো বলছিল। মুনিরা মালতীর স্পর্শে যেন মায়ের আদর পায়। সিদ্ধান্ত নেয়, বেদেদের সাথে যাবে। ধীরে ধীরে বলে, আপনেগ সমস্যা না অইলে আমার অসুবিদা অইত না।

তুমি কী কইতে চাইতাছ, আমি বুজ্জি। নাগো মা, আঙ্গ তেমন সমস্যা নাই। আসলে বড় জাতের হিন্দুরা আঙ্গরে ঠিক হিন্দু মনে করে না। তাগ বাইতঅ আঙ্গরে ঢুকতে দিতে চায় না। সাপের খেলা দেখলে বাড়ির বাইত্তেঅই দেহে। লওগো মা। বহুত কতা অইছে। রাত অইয়্যা যাইতাছে। সবাই খাড়অইয়্যা রইছে। যাওন দরকার।

মুনিরা আর কিছু ভাবে না। বেদেদের ছোট দলটার সাথে রওনা হয়।

দুপুরবেলা। বয়স্ক দু-একজন ছাড়া প্রায় সবাই বের হয়েছে। নৌকার ছইয়ের মতো চালওয়ালা ছোট ছোট ঘরগুলো এখন খালি। ভেতরের ময়লা কাঁথা, তেল চিটচিটে বালিশ সামনের খোলা জায়গাটায় ঘাসের ওপর রোদ পোহাচ্ছে। চার-পাঁচ বছরের কালো ছোট একটা ছেলে বাক্সের ভেতর থেকে বের হওয়া হলুদ-কালো ডোরাকাটা সাপের লেজ ধরে টানছে। ছেলেটার কোমরে কালো একটা কায়তনে ঘুঙুর বাঁধা। ছেলেটা নড়লে ঘুঙুরটা বাজে শব্দ করে। সাপটা ছাড়া পাওয়ার জোর চেষ্টা করছে। ছেলেটা লেজ ধরে টানছে। শেষ পর্যন্ত সাপটা পরাজিত হয়ে বাক্স থেকে বের হয়ে আসে। ছেলেটা সাপটাকে নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে এক সময় খেলা থামিয়ে দেয়। মুনিরার দিকে চোখ পড়াতে বড় বড় চোখ মেলে অবাক দৃষ্টিতে মুনিরাকে দেখে।

ক’দিন ধরেই সাপগুলোকে দেখছে মুনিরা। সাপের সাথেই এদের উঠবস। খাওয়া-শোয়া। যখন তখন সাপ কোলে নিয়ে আদর-সোহাগ করছে। মুখের কাছে এনে চুমু খাচ্ছে। গলায় পেঁচিয়ে ঘুরছে। এসব দেখে ঘৃণায় ভালোমতো খেতেই পারছে না মুনিরা। খেলেই বমি হয়ে যাচ্ছে। শরীর শুকিয়ে গেছে অনেকখানি। চোখ কোটরে। গাল বসে গেছে। পেটটাই যা চোখে পড়ে পুরো শরীরে। রাতে ঘুমও হয় না ঠিকমতো। তা শরীরের আর দোষ কী! ক’দিন আগে এত বড় অসুখটা গেল! এখনও শরীর থেকে তার ধকল যায়নি।

এখানে আসার পর পরই বেশ ক’দিন জ¦রে ভুগেছিল মুনিরা। শরীর একেবারে বিছানায় পড়ে গিয়েছিল। দিন- রাত কেমন আচ্ছন্নের মধ্যে দিয়ে গেছে। সে ক’দিন মালতী জীবন দিয়ে সেবার করেছে তার। মুখে তুলে খাইয়েছে। গা মোছা, মাথায় পানি দেওয়া, বমি সাফ করাÑ সব করেছে মায়ের মমতা দিয়ে। এখনও পুরোপুরি ঠিক হয়নি শরীর। হাঁটতে গেলে দুর্বল লাগে। গা কাঁপে। মুনিরার নিজের জন্য না যতটুকু চিন্তা, তার চেয়ে বেশি চিন্তা গর্ভের বাচ্চার জন্যই। ক’দিন ধরে খেতেই পারছে না একেবারে। গর্ভের বাচ্চাটাও ঠিকমতো খাবার পাচ্ছে না হয়তো। মাঝে মাঝে যেন ভেতরে প্রাণের স্পন্দন টের পায় না মুনিরা। তখন কেমন ভয় ভয় লাগে তার। যার জন্য এত অপমানিত হয়ে গ্রাম ছাড়া হলো, সে শেষ পর্যন্ত বেঁচে রবে তো?

ছোট বাচ্চাটার কাছে সাপ দেখেও ঘৃণা আর ভয়ে কুঁকড়ে যায় মুনিরা। কিন্তু বাচ্চাটা কেমন সাপটাকে নিয়ে খেলছে আবার! গায়ের রঙ কুচকুচে কালো বাচ্চাটার। বড় বড় কালো সুন্দর চোখ।  ছেলেটাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে মুনিরা। স্বাস্থ্যবান ছেলেটাকে দেখতে দেখতে কোলে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে। তার পেটে যে বাচ্চা আছে, সে জন্মালে কি এমন মায়াই লাগবে? সবাই যাকে ঘৃণা করছে, যার আগমনে পৃথিবীর কেউ খুশি নয়, তাকে দেখে মুনিরারও কি মায়া উথলে উঠবে? আচ্ছা তার ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে? দেখতে কেমন হবে সে? তার মতো হবে, নাকি পাকিস্তানি কারও মতো দেখতে হবে? ভাবনাগুলো মুনিরার মনে কেমন পাক খেতে থাকে।

আসলে গর্ভস্থ শিশুটাকে যে মুনিরা খুশি মনে মেনে নিয়েছে, তা নয়। লোকেরা হয়তো তাই মনে করছে। শিশুটা যত যাই-ই হোক, পাকিস্তানিদের রক্তের। সেই সব পাকিস্তানি, যাদের দিনের পর দিন অত্যাচারের শিকার ছিল মুনিরার মতো শত শত অসহায় নারী। বাচ্চাটা তো সে অত্যাচারেই ফসল। সে কী করে মুনিরার প্রিয় হবে!

স্বাধীনতার পর মুক্তি পেয়ে মুনিরা অনেকবার ভেবেছে বাচ্চাটা নষ্ট করবে। পারেনি শেষ পর্যন্ত। পারেনি পাকিস্তানিদের অত্যাচারের চিহ্ন শরীর থেকে মুছে ফেলতে। তার মাতৃত্ব বাধা হয়ে উঠেছে।

এ ছাড়াও কারণ আরও আছে।

গ্রামের লোকেরা তার অনাকাক্সিক্ষত মাতৃত্বের সব দোষ তার কাঁধেই চাপিয়েছে। যেন মুনিরা সাধ করেই আর্মিদের ক্যাম্পে গিয়েছে। যেন মুনিরা সাধ করে তাদের বাচ্চা পেটে নিয়ে ঘুরছে। গ্রামের মাথারা,পরিচিত মা-চাচিরাও, এমনকি সখীরাওÑ সবাই তাকে ঘৃণা করা শুরু করল। কোনো বাড়িতে গেলে তাকে কেউ বসতে বলত না। তার সাথে কেউ কথা কইতে চাইত না। মুনিরা যেচে বললেও, কথা কইতে চাইলেও, কাজের অছিলায় উঠে চলে যেত। গোসল করতে গেলে আগে যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গতর-পা ঘষতে ঘষতে তার সাথে গল্প করতে করতে বেলা বাড়িয়ে দিত, তারা এখন তাকে দেখে গোসল না করেই উঠে যায়। টিউবওয়েলে পানি আনতে গেলেও মালিক বাধা দিতে শুরু করল।

এক সময় মুনিরার মন বিদ্রোহ করল। ঠিক করল, বাচ্চাটাকে জন্ম দেবে। আর বাচ্চটাতো কোনো অপরাধ করেনি। না কোনো অপরাধ করেছে মুনিরা।

অথচ, সবাই ভাবে অপরাধটা তারই।

শফিকের কাছে গিয়েছিল এর মাঝে একদিন। শফিক তাকে ভালোবাসত। সেই দাবিতেই গিয়েছিল। না, ঠিক আশা করেনি এত কিছুর পর শফিক তাকে গ্রহণ করবে। তাহলেও মনের কোণে কোথাও কি একটু আশা অবশিষ্ট ছিল না? ছিল না, সে কথা জোর দিয়ে অস্বীকার করতে পারে না মুনিরা। কিন্তু মুনিরা ভুল ভেবেছিল। মুনিরা বলেছিল শফিককে, শফিক ভাই তুমিদঅ আমারে পছন্দ করতা। জানি না এত কিছুর পরে আর পছন্দ কর কিনা! পার না আমারে বিয়া করতে?

বিয়া!

আমিদঅ এমন কোনো অপরাধ করি নাই। আমার জীবনে যা ঘটছে তা আমার দুর্ভাগ্য! শত শত মাইয়্যাগ জীবনে এমন ঘটছে। তারা কি আর স্বাভাবিক জীবন পাইত না?

দেখ্ মুনিরা, তরে আমি পছন্দ করতাম। অনেও করি। ভালোবাসি অনেঅ।… কিন্তু তরে কেমনে বিয়া করি ক! তরে বিয়া করলে আমি গেরাম থাকতে পারমু?

তুমি এক সময় আমারে কত কইতা বিয়ার কথা!… শফিক ভাই, না অয় আমরা দূরে গিয়া সংসার করলাম।

তা কি অয়, ক? আমার বাপ-মা আছে। আবিয়াতা বইন আছে। তাগ পতি আমার দায়িত্ব আছে না। সব ছাইড়া তরে বিয়া করা আমার পক্ষে সম্ভব না মুনিরা। মায় মাইন্যা নিব না। বাপে মাইন্যা নিব না। সমস্যা আরও আছে। সবচে বড় কথা, তর পেডে একটা পরিচয় ছাড়া বাচ্চা বড় অইতাছে।

আমার আন্দাজ আছিল তুমি এমন কথাঅই কইবা। তুমি একজন মামুলি মানুষঅই। আর পাঁচজনের মতোই অনেক অনেক সাধারণ মানুষ। খালি খালি আমি তোমারে বড় মনের মানুষ মনে করছিলাম।… তোমার কাছে একটা কথা জানতে চাই শফিক ভাই। আইচ্ছা কও তো, আমার পেডে যে বাচ্চাটা তার দায় কি খালি আমার?

তর অপরাধ না অইলেও, পেডে বাচ্চাটা রাখা তর উচিত অয় নাই।

আচ্ছা ধর, আউজ্জাঅই আমি বাচ্চাটারে মাইরা লাইলাম। এর পরে তুমি আমারে বিয়া করবা।

আবার বিয়ার কথা আইয়্যে কা?

আমি জানতাম তোমার উত্তরডা এমন ধারাঅই অইব।

আর কোনো কথা বলেনি মুনিরা। ফিরে এসেছিল শফিকের কাছ থেকে।

কিগো মা, হেই কোন সময়ত্তে দেখতাছি, চুপচাপ বইয়্যা রইছ। শীতের দিন, ছায়া ছাইড়া রইদে আইয়্যা বও না। রইদাটা গায়ে লাগলে দেখবা মনডাও ভালা লাগতাছে। আইয়্যো গো মা, আমার কাছে আইয়্যা বও।

মমতাময়ী বৃদ্ধার ডাক উপেক্ষা করতে পারে না মুনিরা। কাছে গিয়ে বসে। বৃদ্ধা খোলা জায়গাটার একপাশে বাঁশের ডালায় কালো কালো তেঁতুল রোদে দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে। মুনিরা গিয়ে তার কাছে বসে। ছোট কালো ছেলেটা কখন চলে গেছে! হয়তো মুনিরার মনোযোগ না পেয়েই।

নেওগো বেডি, উট্টু তেঁতুল খাও। মুখের রুচি ফিরব।… তুমি সাপেরে অনেক গিন্না কর, না?  খাইলেই কেমন বমি কর। কেমন ডরে ডরে চলাফেরা কর! সাপেরা ক্ষতি না করলে কিছু কয় না। আর এনের সব সাপইঅদ পালা। বিষদাঁত তোলা। কিছু কয় না।… কয়দিন থাহো, দেখবা ডর করব না আর। তুমি সারাডা দিন কেমন মনমরা থাহো। দেইখ্যা খারাপ লাগে। যে দোষে তোমারে গেরাম ছাড়া করছে তোঙ্গ গেরামের মাইনষে, হেই দোষতো তুমি কর নাই মা। এইডা ভাইব্যাঅই মনে বল আনবা। … আমি বাইদ্যানি অইলে কী অইব, সেলাই-ফোঁড়াইয়ের কাজও জানি। অনেদ বয়স অইছে, সাপ খেলা দেহাইতে বাইর অই না। তাবিজ কবজ বেচতেও বাইর অই না। বেশি আঁটলে মাজা বিষ করে। বইয়্যা বইয়্যা কাঁথায় নকশা তুলি। ভালা দামঅই পাওয়া যায়। চউখ্যের জ্যোতি যতদিন আছে, ততদিনঅই করতে পারমু। বহরের কেউতো আর কাজডা শিকল না। তুমি শিকতে চাইলে শিকাইতে পারি। বিদ্যা বিফলে যায় না। … সারাদিনদ বইয়্যাঅই তাহো। একটা কাজ শিকলা। সময়ডাঅ কাটব। মনডাঅ ভালা থাকব।

মুনিরা খেয়াল করে দেখে বৃদ্ধার কোলে একটা সবুজ পাতলা কাঁথা। তাতে সুইয়ের ফোঁড়ে লাল লাল ফুল তুলছেন। মুনিরা তাকিয়ে তাকিয়ে বৃদ্ধার কাজ দেখে। কিন্তু মন থেকে ও কাজ করার কোনো আগ্রহ পায় না।

সন্ধ্যার পর পর বেদেদের পল্লী হয়ে যায় অন্যরকম। অন্ধকার রাতে ছৈয়ের মতো ঘরগুলোতে জ্বলে মোটা শিখার কুপি। মেয়েরা পুরুষরা চলাচল করে কুপি হাতে। একটু দূর থেকে মনে হয় যেন বড় বড় জোনাকি যাচ্ছে মাঠের মধ্য দিয়ে। হঠাৎ হঠাৎ বীণ বাজানোর শব্দ শোনা যায়। কেমন সাপ খেলানো সুরে বীণ বাজায় বেদেরা। কী জানি কেন, বীণের শব্দ শুনতে শুনতে মুনিরার মন বিষণœ  হয়ে যায়।

লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Pinterest
Instagram