পারা ও পারাহীন আয়নায়

জাহিদ হায়দার

গৌরচন্দ্রিকা শব্দটি আমার ভালো লাগে। তার মধ্যে কারও কারও জন্য প্রবেশাধিকারের খোরাকি আছে। বিষয়ঘরে যাবার ইচ্ছামাফিক অবসর আছে। গৌর একটি বিশেষণ, অর্থ : ফরসা বা উজ্জ্বল বর্ণবিশিষ্ট। বিশেষ্য হলো চৈতন্যদেব। গৌরচন্দ্রিকার একটি অর্থ: পালাগানের ভূমিকাস্বরূপ চৈতন্যদেবের বন্দনা; অন্য দুটি হচ্ছে মুখবন্ধ বা ভূমিকা। ‘চন্দ্রিকা’ অর্থ চাঁদের কিরণ। তা হলে ‘কিরণ’ এখানে বন্দনা। ইঙ্গিত ও কূটাভাসের অধিকারভুক্ত শক্তি বোধগম্য। সহনমাত্রার সুযোগ নিয়ে বলতে পারি, চৈতন্যশ্রী না থাকলে কেউ দেব হতে পারেন না। কবিও হতে পারেন না। অবশ্যি কবি দেবতা নন, সময়ের পারা ও পারাহীন আয়নার সামনে দাঁড়ানো একটু অন্যরকম ভাবুকতার চিন্তাশীল মানুষ মাত্র। এবং অন্যান্য মানুষের সঙ্গে কবিও ক্রমবর্ধমান অসহায়ত্বের একজন জাতক। কবির বা শিল্পীর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু অতৃপ্তি। যথাশব্দ, যথারং-এর ব্যবহার পরিমিতি না পেলে কবিতা, গল্প বা চিত্রকলা খাদের কিনারে পড়ে থাকা আবর্জনা।  

চন্দ্রিকার সঙ্গে চন্দ্রাহত বলা চলে না। চন্দ্রাহত শব্দের অর্থ পাগল। যা কমবেশি সবাই। প্রকাশ্যে আচরণের সব ঠিকমতো করলেই একজন মানুষের মানসিকতা সুস্থ নয়। কারও গোপনে চলাফেরার হিসাব মেলালে দেখা যাবে, তার পাগলভাব অন্য দৃশ্যগদ্য। কবিদের মধ্যে কিছু পাগলামি আজও রাষ্ট্র, সমাজ এবং উভয় লিঙ্গের মানুষরা ভালোভাবেই সহ্য করে। কবিরা তার সুযোগও নেন। তবে সুযোগের মাত্রা, স্বাধীনতার পরিধি ভাঙলে, বেশি প্রয়োগ করলে, স্বেচ্ছাচারিতা হয়।

‘পৃথিবীর প্রথম কবি কে?’ বলা হয়, দস্যু রতœাকর ওরফে বাল্মীকি, বরুণের পুত্র, হতেও পারেন। আমার মনে হয়, অনেক অনেক বছর আগে যিনি প্রথম এক অদৃশ্য পরম শক্তি ঈশ্বর-সম্পর্কিত ধারণাটির কথা, পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবীর কথা ভেবেছিলেন, বলেছিলেন, সেই নাম না জানা মানুষই প্রথম কবি। আমাদের জানাশোনা সবচেয়ে মেধাবী, জ্ঞানবান বা প্রজ্ঞাশীলদের সম্মিলিত মেধার থেকে হাজার গুণে সৃষ্টিশীল ছিলেন ওই কবি। ভেবে দেখুন, চিন্তা ও কল্পনার কোন দিগন্তস্পর্শী মাত্রায় পৌঁছালে বলা সম্ভব, ঈশ্বর, যিনি মানুষ ও অন্যান্য দৃশ্যমান যা-কিছু আছে তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎসহ সব কর্মকা-ের পরম নিয়ন্ত্রক। ভূয়োদর্শনের মাটিতে দাঁড়িয়ে হয়তো অন্য একজন কবি বলেছিলেন, মানুষের আইডেনটিটির শেকড়, প্রথম মানব-মানবীর গল্প। প্রত্যেক কবি চেষ্টা করেন, নিজের বিশেষ আইডেনটিটি তৈরি করতে, যা বংশতালিকানির্ভর নয়। যা করতে হয়, কবির নিজের যোগ্যতার মানসম্পন্ন শ্রমিকতায়।      

কবিতার জন্য কবির মনীষা এবং বিশেষ সহনযোগ্য চালাকি সেই সীমা পর্যন্ত গ্রাহ্য, যখন তাঁর কবিতার গুণগত মান পাঠক ও কবিতার বিশ্লেষকদের চন্দ্রাহত করে। কবিতা কতদূর পর্যন্ত স্বাধীনতা নিতে পারে? এরকম প্রশ্নের  উত্তর হতে পারে, তা নির্ভর করে কবিতাটিকে কবি কতটুকু স্বাধীনতা দেবেন, কেননা তিনিই নিয়ন্ত্রক। যে বিষয়ে লিখবেন তার জন্য যথাশব্দের সমবায় কবি যদি যথামতো না করতে পারেন, তা হলে বুঝতে হবে, অতিকথনে শব্দের, বিষয়ের ও শৈল্পিকশৈলীর  পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। শাদা কাগজের কৌমার্য হরণ এক কঠিনতম কাজ।

কবিতা কি যুক্তিকে ধারণ করে? প্রশ্নের মান বালকস্বভাবের। ‘কারণ’, ‘অতএব’, ‘যেহেতু’ ইত্যাদি বিশেষ্য ও অব্যয় যুক্তিবিদ্যার জন্য ভালো, কবিতার জন্য আবর্জনা। যুক্তির ক্ষমতা নেই কবিতা পড়ার বা বোঝার। কবিতা অংক কষে না। এক যোগ এক, অংকবিদ বলবেন, ‘হলো দুই।’ কবি বলতে পারেন, ‘ফল, তোমার আমার প্রেম।’  

এখানে আমি যা  বলছি এবং বলবো, হয়তো খুঁজলে দেখা যাবে, হাজার বছর আগে বা নিকট সময়েই কোনো একজন এসব কথা তার মতো করে বলে গেছেন। এখানে আমি বলছি আমার মতো করে। তার পরও কথা বলার দায় বলে যে-ভারবহ দৃশ্য-অদৃশ্যমান সমাচার আছে, তাকে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। সময়ের নিরন্তর ঢেউ থেকে প্রত্যেক মানুষের আদায় করবার দায় থাকে। সময়কে দেওয়ারও দায় থাকে। সময় সবসময় নিজনির্মিত ধারালো ব্লেড, যা কখনও মর্চের পীড়নে ক্ষয় হয় না, নিয়ে প্রয়োজনের হিসাব রেখে ঘুরে বেড়ায়। অমোঘ-দায়-এর চোখমুখ, হাতপা, স্বর এবং জাগরণ ও নিদ্রার নির্মাণ, প্রত্যেকে তার যোগ্যতা মতো করে। যারা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত বা কোনোভাবে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের দায় বেশি। আমার দায় সম্পর্কে নিজের বোধবুদ্ধির পথরেখায়, আমি যতটা পারি, পা ফেলি সচেতনভাবে। যদিও সচেতনভাবে কখনও কখনও বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতের সামনে অসচেতনতার দাস হতে ভালো লাগে। : ‘মাধবীলতার বাহুবন্ধন, দাসত্ব আনন্দের।’

কবির প্রথম দায়বদ্ধতা মানুষের কাছে, তারপর কবিতার কাছে। যে-জন মানুষকে চরম তুল্যমূল্যের শীর্ষে রাখতে পারে না, তার দ্বারা অন্য কাজ হতে পারে, কবিতা বা অন্য শিল্পকর্ম হবে না। ব্যক্তিমানুষের কাছে কবিতার কী দায়বদ্ধতা আছে? আছে। আর তা শুধুই ব্যক্তিগত। ব্যক্তিকে শ্রেয়বোধের সমষ্টির অংশ হতে কবিতা কিছু সহযোগিতা করে মাত্র। ওই সহযোগিতার ফলে ব্যক্তির মধ্যে বিবেক ও মানবিকতার একটি আলোচিহ্ন তৈরি হবার সম্ভাবনা থাকে। সব শিল্পকর্মের একটি প্রধান লক্ষ্য হলোÑ ভালোমন্দের শব্দরূপ বা চিত্ররূপের মাধ্যমে, মানুষের চিন্তাচেতনাকে মানবিকতা ও সুন্দরের দিকে এগিয়ে দেওয়া। 

রাষ্ট্র ও বৃহত্তর সমাজের কাছে কবিতার দায় নেই। রাষ্ট্র ও সমাজ কবিতা নিয়ে চিন্তাও করে না। রাজনীতি ও অর্থনীতি মানুষের কর্ম ও জীবনপন্থা নিয়ন্ত্রণ করে। কবিতায় বিপ্লবের কথা পড়তে, শুনতে ভালো লাগে। পড়া ও শোনার পর পাঠক ও শ্রোতা বিপ্লব করবার জন্য মিছিলে যায় না। যে-কোনো দেশের বিজয়ের ইতিহাস পড়ে দেখুন, বলবার মতো কোনো ভূমিকা কবিতার নেই। বিপ্লব বা রণাঙ্গন নিয়ে যেসব  কবিতা লেখা হয়েছে, তা কবিরা লিখেছেন নিরাপদ অবস্থানে থেকে। কবিদের পলায়ন মনোবৃত্তি চোরের থেকেও দক্ষ। সামরিক শাসনের সময় কবিরা কেন প্রেমের কবিতা বেশি লেখেন?

কেন যেন মানুষ শিল্পসৃষ্টিকারীদের বিবেক ও কর্মচর্চার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের ব্যবহৃত ভাষা, রং, সুর, আচরণ সাধারণ মানুষকে বাঁচা ও চলার স্বপ্ন দেখায়। যা সভ্যতার নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কবি বা শিল্পীর কাজকে যে-দেশের মানুষ বোঝে না, বুঝতে আগ্রহী নয় বা মর্যাদা দেয় না, সে-দেশের মানুষ সভ্য নয়। অবশ্যি সভ্য হওয়ার জন্যে শুধু কবিতা পড়লে বা শিল্পীর  শিল্পকর্ম দেখলেই ওই পথ ধরে সামনে যাওয়া যাবে না, সঙ্গে যথাযথ শিক্ষাও থাকতে হবে। শিক্ষা মানুষকে কী করে, কী দেয়, তার ইতিহাস ধারণ করে সভ্যতার আয়না।

আমাদের চাওয়াগুলো চলিষ্ণু মেঘনির্ভর   

আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, ‘আমার লেখক হয়ে ওঠার কথা’, ‘কীভাবে লেখার মতো কাজটি করি’, ‘লেখায় কী বলতে চাই’, ‘কেন লিখি’ ইত্যাদি। আমি খুশি, কারণ, আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়নি, ‘কবিতা কী?’ যদি চাওয়া হতো বলতাম : ‘মানুষ সবকিছুর সংজ্ঞা খোঁজে। নিজের পছন্দমতো সংজ্ঞা তৈরি করে নেয়। কবিতা বিশেষ্যবাচক শব্দ। প্রায় সব বিশেষ্যর একটি আপাত গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা আছে। কিন্তু কবিতার সর্বমান্য সংজ্ঞা এখন পর্যন্ত মেঘবিলাসী এবং অনির্দিষ্ট। কবিতার জন্য দীক্ষিত প্রত্যেক পাঠকের নিজস্ব একটি সংজ্ঞা আছে। এবং সব ক্রিয়াপদ, নামপদ, বিশেষ্য, বিশেষণের সামনে মানুষ চিরভিখারী। কেউ যদি বলে : ‘কবিতা জোছনায় বা রৌদ্রে হেঁটে বেড়ানো এক ভূত, এক পরী, এক মাতাল।’ তার বোঝার গ্রহণে লবণ ছিটাবার আমি কে? কথা তখনই কবিতা, যখন কথক ও শ্রোতা নিজের চিন্তাচেতনার আয়নায় একটি প্রতিবিম্ব দেখে।  এবং ওই প্রতিবিম্বের সঙ্গে মেলাতে পারে নিজের সত্তার কোনো না কোনো জাগরণ।

মনে রাখা প্রয়োজন, আধুনিক বা সমকালীন কবিতা অলংকারশাস্ত্রের কাছে আর দায়বদ্ধ নেই। ‘অলংকার’ মানে যথেষ্টীকরণ, ‘অলম’-এর অর্থ যথেষ্ট। যথেষ্টর ভার কবিতা বা অন্যান্য শিল্প, এমনকি মানুষ ও একটি সর্বশক্তি ধারণ করা যন্ত্রও বহন করতে অপারগ। উপমা, প্রতীক, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, রূপক ইত্যাদি না থাকলেও একটি উত্তম কবিতা হতে পারে। হয়তো একটি শুকনো পাতার বর্ণনা কবিতায় বলা হলো, ওই বর্ণনা যদি কোনো মানুষের চিন্তাকে প্রশ্ন করে বা একটি স্মৃতির সত্তা দেখায়, সঙ্গ দেয়, তা হলে বলতে হবে, কবিতাটি ভালো।

‘কবিতায় কি একটি গল্প বা গল্পের দূরতম ছায়া থাকতেই হবে?’ কখনও কখনও তরুণ কবিদের সঙ্গে আড্ডার সময় আমার কাছে এমত প্রশ্ন  কেউ কেউ করেছেন। আমার উত্তর ছিল : ‘থাকতে হবে। প্রতিটি প্রাণীর জীবনযাপনের ইতি ও নেতিবাচক গল্প আছে। রূপকথা আছে। কবিতার পাঠক কবিতায় একটি গল্প খোঁজে। এ-পর্যন্ত লিখিত শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর গল্প কবি তাঁর নিজের বিশেষ শিল্পশৈলী অক্ষুণœ রেখে লিখেছেন বা বলেছেন বলে আজও আমরা পড়ছি। এখানে ‘আর্টিসট্রি’ ও  ‘স্টাইল’, শব্দ দুটি মনে রাখতেই হবে।’

সে-সব বিষয় জানতে চাওয়া হয়েছে তা যৎপরোনাস্তি কঠিন। আত্মজিজ্ঞাসার দায় মাথায় নিয়ে কথা বলা আর জল, খাদ্য, ছাতা, তাঁবু, আত্মরক্ষার অস্ত্র এবং পথের মানচিত্র ছাড়া সাহারায় পথ চলা একই ব্যাপার। চেষ্টা করব স্বীকারোক্তিতে যথাযথ থাকতে। যদিও, প্রায় সবাই মেনে নেয়, কবিদের মিথ্যায় শিল্প থাকে। শিল্পে শিল্পিত রংবিন্যাস মান্য, অধিক চতুরতা শিল্পহীন।

কেন লিখি? এই প্রশ্ন আমাকে হাসতে সাহায্য করে। ‘কেন তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে?’, ‘কেন এখন বৃষ্টিতে হাঁটতে ইচ্ছে করছে না?’, ‘ক্ষুধা কেন মুক্তি দেয় না?’, ‘সব চুম্বন অসমাপ্ত থাকে কেন?’, ‘কেন ডিম মুখে নিয়ে পিঁপড়ের যাওয়া, আমাকে একরকমের শান্তি দেয়’ ইত্যাদি প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা মীমাংসাহীন। এসব ক্ষেত্রে মীমাংসায় গেলে স্থবিরতা আসে, মৌলবাদিতা পেয়ে বসে। কে চায় বেঁচে থেকে যযাতির স্থবিরতা গ্রহণ করতে?

‘কেন লিখি?’ একটা জবাব তো দিতে হবে। আরশোলা উল্টে গেলে তার পাগুলো শূন্যতাকে সহায়হীন হয়ে খামচায়, যদি পায়ের সঙ্গে কোনো বস্তু লেগে যায়, তা হলে সে আবার চলার ভূমি পাবে। আমার মনে হয়, লেখক চলমান সময় ও বিরূপ অবস্থার মধ্যে এক উল্টেপড়া আরশোলা। আমি লিখি, কারণ, যদি আমার লেখার চোখ-মুখ-হাত-পা-মাথা-হৃদয়-উদর- জননইন্দ্রিয় খামচে খামচে শূন্যতার মধ্যে সেই ভূমি বা মাটি খুঁজে পায় বা তৈরি করতে পারে, তা হলে সেখানে প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রমূলক বিবিধ অন্যায়ে পিষ্ট মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্যভাবে সহনীয় একটি পৃথিবীর রূপ পাওয়া যেতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে, কথাগুলো কেবল আমার মনে হওয়া। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ আমাকে উপরযুক্ত (বোল্ড পয়েন্টে চিহ্নিত) বিষয়গুলো সম্পর্কে বলবার সুযোগ দিয়েছে, কর্তৃপক্ষকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। নিচের কয়েকটি স্তবকে, হয়তো আগে পরে হবে, বিষয়গুলো সম্পর্কে কিছু বলবার চেষ্টা করব। প্রচেষ্টা ব্যতীত জাগরণ কপট নিদ্রার নামান্তর।

একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। একজন মানুষের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবার আগে ওই মানুষটি সম্পর্কে আমাকে জানানো হয়, লোকটি বেশ বোকা। ‘কীভাবে বুঝলে বোকা?’ উত্তরে জানলাম, রাতে সে নদীতীরে ঘুরে বেড়ায়, কখনও কখনও ঢেউয়ে দুই পা ডুবিয়ে পূর্বদিকে তাকিয়ে থাকে, ভোরের মৃত্যু দেখে। কিন্তু লোকটি পাগল না। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘তুমি এমন করো কেন?’ উত্তর এসেছিল, ‘ভালো লাগে।’ গ্রামের মানুষ মনে করে, লোকটির মধ্যে কিছু একটা আছে। ‘কী আছে?’ জানতে চাইলে শুনলাম, ‘মনে হয় ইশারা পায়।’ সব মানুষের মনেই কোনো না কোনো কড়ার নাড়া পড়েই। কেউ তাতে সাড়া দেয়। কেউ বোঝেই না বা নিজের চেতনার মধ্যে কিছুই শোনেই না। যারা শোনে বা বোঝে তাদের মধ্যে কেউ কেউ ওই কড়া নাড়ার ধ্বনিকে জীবনের জন্য শব্দরূপে বা রঙের মিশ্রণে প্রকাশ করে।

নদীতীরে ঘুরে বেড়ানো মানুষটার ঘটনা বলে আমি কি ধৃষ্টতা দেখালাম? কোনো কোনো ধৃষ্টতায় কিছু ঔজসিক অহংকার থাকা ভালো। নিজের পদক্ষেপের চিহ্ন বিচার করবার সামর্থ্য অর্জন করা যায়। কবির চিন্তাচেতনার মধ্যে, মনে হয়, একটি ইশারাবিদ্যুৎ কাজ করে। যা বাস্তব ও দূরতর না-দেখা আলো বা অন্ধকার থেকে কবির চিন্তার পর্দায় ঢেউ তোলে। 

কবির বলার প্রবণতা কেমন? এই প্রশ্ন যখন করা হয়, প্রশ্নকারীকে মনে রাখতে হবে, কবি কোন দেশ ও সমাজের এবং কোন প্রাকৃতিক পরিম-লে আছেন। যদিও এখন অক্ষরজ্ঞানহীন সহজ সরল একজন মানুষকেও, শিক্ষার কোনো সুযোগ না দিয়ে, বিশ^গ্রামের বায়ব্য বাসিন্দা করে তোলার জন্যে বিশেষ চতুর কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। তার মাটিকে, তার প্রতিদিন দেখা আকাশকে তার জীবনজগৎ থেকে ভুলিয়ে দেবার প্রতিযোগিতা চলছে, সামনে দেওয়া হচ্ছে কোকা-কোলা ও ইন্টারনেটের জাল, তার দেশের কবির বলার প্রবণতা কেমন হবে? আমার বোঝা ভুল হতে পারে, কিন্তু আমি দেখেছি, বিশ^বিদ্যালয় পার করা অনেক বই পড়া মানুষও কলোনিয়াল হ্যাঙওভারে দোলে। আসলে আমরা এখনও জাতিগতভাবে অক্ষরজ্ঞানের কাছাকাছি একটি সমাজ, শিক্ষিত নই। নগর বানানো হয়েছে, যদিও আমরা এখনও গ্রাম্য নাগরিক। এরকম একটি অবস্থা-ব্যবস্থার মধ্যে কবিতা  লেখা, হয়তো বা পাপ করার নামান্তর।

আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলের কবিতায় গীতের প্রভাব বেশি। কারণ আমাদের প্রকৃতি। আমাদের মানুষ। বাংলার মানুষের হৃদয়ে দয়া বাস করে। এই দয়ার বোধ এই দেশের নদী থেকে জাত। সবুজ থেকে উৎসারিত। আমার কবিতার মধ্যে গীতের, গদ্যের নাকি শব্দের সংসারশ্রীহীনতার  প্রভাব জায়মান, তা বিচারের দায় পাঠকের।

আমি নিশ্চিত, আমার সামনে যে সারস্বত সমাজ বসে আছে, তার প্রতিনিধিবর্গ কম-বেশি জানেন, একজন কবি, বিশেষ করে ‘লেখায় কী বলতে চাই’ এই অংশে কী কী বলতে পারেন, কতদূর বলতে পারেন। কেননা, ওই বলতে চাওয়ার স্বরূপ তার লেখার মধ্যেই থাকার কথা। যদি বলি, ‘কিছুই বলতে চাই না, শুধু নিজের ক্ষরণ, অন্বেষণ আর আশ্রমিক ছায়ার নির্মাণের কথা মানুষের সামনে বলি।’ শ্রোতা তার জিহবায় মৃদু শব্দ তুলে বলতে পারেন, সেটাও একটা বলা। বলা যখন শেষ হয়, প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বলার খোলস ধুলোয় পড়ে আছে, সার বলে কিছু নেই। আমার কবিতার মধ্যে যদি কিছু পাওয়া যায়, তা হবে আমার শ্রমিকতায় অর্জিত শেকড়-সত্তা।

মনে রাখা প্রয়োজন, জীবনযাপনের মধ্যে দেখতে পাওয়া সব বিষয়ে, প্রায় সব কথা, মানুষের যোগ্যতা অনুযায়ী মানুষ বলে ফেলেছে। এই মরজগতের বুদ্ধিমান বলে দাবিদার প্রাণিকুল, দেখা গেছে, ২০ থেকে ২২টি বিষয়ের মধ্যে ঘুরপাক খায়। দাগ মোটা করে যদি হিসাব করা যায়, তা হলে প্রথমে আসে জীবন আর শেষে মৃত্যু। এই দুই সূর্যদীপিত সত্যের মধ্যে, এই সময় পর্যন্ত মানুষ নিজেকে, অপরকে, পরিপার্শ¦কে, নিকট ও দূরত্বকে, নির্মাণ ও ধ্বংসকে, প্রেম, না-প্রেম, ভালোবাসা, হত্যা, আত্মহত্যা, বীজবোনা, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, বিপ্লবী কর্মধারা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আগুন জ্বালানো-নেভানো এবং বন্ধুত্বকে বুঝে ওঠা ইত্যাদি বোঝাবার জন্য যত শব্দ আবিষ্কার করেছে, যতরকম শব্দ-সংসারের অভিধান তৈরি করেছে, তা শুধু ওই বিষয়গুলোকে বলে যাবার চেষ্টা করে। মানুষের ব্যবহারিক এবং অব্যবহারিক বুদ্ধি সারাক্ষণ তৃষিত বলে, মানুষ মনে করে, কাজ করা, কথা বলা কখনও শেষ হবে না। কবিতা লেখাও শেষ হবে না। দুজন নারী-পুরুষ মুখোমুখি বসে আছে, নৈঃশব্দ্য সঙ্গ দিচ্ছে তাদের, তারা কথা বলছে না, কথাহীনও  নয়। ‘আকাশ নেমেছে দুজনের চোখে/নক্ষত্র বলছে, কবিতা পড়ছি।’  

একজন কবি ওইসব বলবার জন্য কিছু অক্ষরের সামান্য গাঁথনিকার মাত্র। বুননে সৃষ্ট চিন্তা, কল্পনা আগামী দিনের সময়ে কতটুকু গৃহীত হবে, তার হিসাব যে-কবি তাঁর জীবিতকালেই করেন, মনে হয়, তিনি আকাট মূর্খ। আমার মূর্খতায় আমার আস্থা আছে।

বিকল্প ছিল না ব’লে

সব সঞ্চয় দিয়ে সারাদিন নেড়েছি কড়া 

শর্ত মেনে কেউ কখনও কবি হয় না। কবি হবার পর শব্দশাসিত জায়মান এক শর্ত থাকে, যা নীরব পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে, যা আকাশ আর সমুদ্রের মোহনাদিগন্তে জাহাজ ভাসাবার অঙ্গীকারে ঋদ্ধ। অঙ্গীকার শব্দটি শর্তশাসিত। কিন্তু কবির জন্য সে এক অ-শৃঙ্খলিত শাসন।

চারদিকেই আছে ভাষিক উপাদান ও বিষয়।  গৌণ ও মুখ্য কাজের মধ্যে পূর্ণতাস্পর্শী পথের খোঁজ করতে হয়। সেখানে কৌশল, শৈলী, প্রকরণের সঙ্গে লেখকের রন্ধনশালা সঠিক রাখবার প্রয়োজন আছে। কিন্তু নিজকীয়কে প্রতিনিয়ত অতিক্রম করতে না পারলে কোনো মানুষ সৃষ্টিশীল হতে পারে না। কেউ যদি বলে, ঈশ^র নামের চিন্তার কাজ এক অজানা সময়ে ছিল সৃষ্টিশীল, তাঁর পরবর্তী কাজ পৃথিবী ও মানুষের বিলুপ্তির পর, বক্তাকে দোষ দেওয়া যাবে না । অর্থাৎ ঈশ^র নিজেকে অতিক্রম করতে ব্যর্থ।  যদিও তাঁর বিপুল কাজের রহস্য এখনও অনুদ্ঘাটিত। 

কেউ কেউ জানেন, বিষয়টিকে আমিও মানি, বিষয় নির্বাচনে লেখকের স্ববিরোধিতা, শুধু লেখার জন্য, জীবনের দর্শনের জন্য নয়, লেখার ইতিবাচক ফল দেয়। লেখালেখির ইতিহাস বলে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে লেখকের বিবাদ ভালো এবং মানসম্পন্ন সাহিত্য প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের গুণগান করে না। আরও একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, যখনই বলা হয়, স্বপ্নপূরণ হয়েছে, তার অর্থ স্বপ্নেরও একটি বস্তুভিত্তিক সীমা আছে। কবি ও কবিতা কোন সীমা অতিক্রম ক’রে একটি স্পর্শ ও অনুভবযোগ্য স্বপ্নঢেউ নির্মাণ করবে তার জ্যামিতি রক্ষা করা কঠিন। 

বলা হয়ে থাকে, লেখকের লেখা বহন করে তার আত্ম, কর্ম ও চিন্তাপরিচয়। কথাটির সঙ্গে দ্বিমত করবার সুযোগ নেই। লেখক যা যা লিখে গেছেন বা লেখেন, সে-সবের সুন্দর এবং অসুন্দর নগ্নতার দায় এবং তা থেকে চিত্রিত ভাষ্যকে লেখক কোন স্পর্ধায় এড়াবে? সব কথা তো  শব্দের শৃঙ্খলা আর বিশৃঙ্খলায় তাঁরই নির্মাণ। কবির ব্যবহারিক জীবন চতুরতা করতে পারে কিন্তু কবিতায় ব্যবহৃত শব্দ, বিষয়, নির্মাণ চতুরতা অপছন্দ করে।  

কথা পুরোনো, ‘কোনোকিছু থেকে মানুষের মুক্তি নেই।’ একটি ভালো-মন্দ অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার পর আর একটি মাকড়সা-নির্মিত অথবা জোসনাপ্লাবিত অবস্থার জালে মানুষ আটকে পড়ে। মানুষের কিছু বুদ্ধি আছে বলেই নিরন্তর চেষ্টা করে অন্যরকম মুক্তির পথ বের করতে। মুক্তির স্বরূপ শতপ্রকার। হয়তো কবিতা আমাকে একটি আপাত মুক্তির পথ দেখায়। কিছু মানুষ কবিতা লিখে বা পড়ে মুক্তি খোঁজে। ওই পথ খোঁজার জন্য মানুষ তর্ক করে, বিবিধ উৎপাদনে ব্যস্ত থাকে, বুদ্ধিচর্চা করে, হাসে, কাঁদে, জৈবিক উল্লাসে ঘর্মাক্ত হয়। শস্য ও সন্তানের মুখ না দেখলে মনে করে আগামীদিনের সকাল অন্ধকার। ভবিষ্যৎবুনন ঠিক হলো না। সত্য ও মিথ্যার দুই পাত্রে ইতি ও নেতির মেঘ ও রৌদ্র একাকার। একটি মানুষের ও একটি ইঁদুরের সত্য ও মিথ্যাবিষয়ে, বাঁচার অবস্থানে খুব একটা পার্থক্য নেই। সব প্রাণীর আছে সত্য ও মিথ্যার আড়াল। কবিদের কিছু বেশি, তবে তা কুয়াশাপীড়িত রৌদ্রপাপড়ি দিয়ে ঢাকা। মুক্তি, সুখ, শান্তি  প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত হিসাবের মাপকাঠির সীমারেখায় গৃহীত।

‘মানুষের জন্য কবিতার ভূমিকা কী?’ ‘কবিতা কি বেঁচে থাকবে?’ ‘কবিতা কী করে?’ ‘সাহিত্যের নদীতে, সমুদ্রে, এঁদো ডোবায় কবিতা না থাকলে কি ক্ষতি বা লাভ হতো?’ ‘আর কাজ পেলে না, কবিতা লেখ?’ এসব প্রশ্নালোচনা শত শতবার, অনেক সময় নিয়ে করবার পরও, প্রশ্নকারী ও উত্তরদাতা অতৃপ্ত থাকেন। মানুষ, কিছু বুদ্ধি থাকার কারণে, ব্যয় ও অব্যয়-বিষয়ক ধ্যান-ধারণার কাছে সবসময়ই অসহায়।

সবাই নয়, কেউ কেউ কবিতা পড়ে। বিশেষ রকমের অতৃপ্তির প্ররোচনা আছে বলেই বেঁচে থাকাকে অর্থবহ করবার জন্যে মানুষ নতুন পথ ও পন্থা খোঁজে সবসময়।  কেউ কবিতা পড়ে, কেউ চিত্রকলা দ্যাখে, গান শোনে, ফসল বোনে, একশ’ টাকা বারবার গোনে, হিমালয়ের শীর্ষে উঠে আকাশ দেখে, কেউ অদৃশ্যর কথা শুনতে ভালোবাসে। ওগুলি একধরনের আশ্রম, সেটা সাময়িক হতে পারে। নিজের শ্বাসের সত্যতা  বা মিথ্যা দিক খোঁজার অবলম্বন হতে পারে। জীবনের স্বপ্ন, যুদ্ধ ও চিন্তাচেতনাকে মানুষ তারই সৃষ্ট প্রেক্ষিত থেকে দেখতে বা বুঝতে আগ্রহী। যদি, কিন্তু, হয়তো, অথবা এই শব্দগুলো দার্শনিকতার সক্রিয় দোলাচলে পূর্ণ। মানুষ ওগুলোর দাস। একটি কবিতা পড়বার পর, যদিও উত্তম কবিতা কখনওই পড়ে শেষ করা যায় না, কবিতাটির বিষয় পাঠককে ওই ‘যদি’, ‘কিন্তু’, ‘হয়তো’ এবং ‘অথবা’র মধ্যে নিমজ্জিত করতে পারে। তখন পাঠক নিজের সহায় ও অসহায়ত্বের ঢেউয়ে ভেসে আনন্দ পায়। সুন্দরের সামনে বোকা হয়ে যাবার আনন্দ। কবিতায় দার্শনিকতা ততটুকুই মান্য যতটুকু সত্য, মিথ্যা ও জীবনের ঘাম, জীবন ধারণ করতে পারে। কবির ব্যক্তিগত দার্শনিক চিন্তা তাঁর কবিতায় প্রতিবিম্বিত হতে পারে, না-ও পারে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি : আমি ঈশ^র-বিষয়ক প্রসঙ্গে অজ্ঞেয়বাদী।  

আমি যতদূর বুঝতে পারি, কবিতা আর আগের মতো পড়া হয় না। বেঁচে থাকার যুদ্ধ মানুষকে কোনো অবসর দিতে চাইছে না। কবিতা পড়তে সুন্দর ব্যক্তিগত অবসর প্রয়োজন। যা এক কঠিন তপস্যাতুল্য কাজ। পৃথিবীর সর্বত্রই অল্পসংখ্যক মানুষ কবিতার পাঠক। তাদের জন্য কবিতা বেঁচে থাকবে। কবিও থাকবে। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কবি একাকী সন্ন্যাসী। পাঠকও তার কাছাকাছির জাতক।

‘কোন শ্রেণির মানুষ কবিতা পড়ে?’ এই প্রশ্ন যদি করা হয়, আমার অভিজ্ঞতা বলে, উচ্চবিত্তরা কবিতা পড়ে না। কবিতা একটি উত্তম শিল্পকর্ম, শুধু এই তথ্যটুকু তারা রাখে এবং সময় ও সুযোগমতো, নিজেদের কালচার্ড বোঝাবার জন্য বিশেষ আসরে বলে থাকে, ‘কবিতা ভালো লাগে।’ নি¤œবিত্তের বেঁচে থাকবার যুদ্ধই প্রধান। কবিতা ওই শ্রেণির মানুষকে কিছু দেয় না। তারা পড়তে যাবে কেন? আর মধ্যবিত্ত হচ্ছে কবিতার মতো অমীমাংসিত এক সুবিধাবাদী অব্যয় এবং সর্বদা এক পরিবর্তিত পোশাক। মধ্যবিত্তদের মধ্যে কিছু মানুষ কবিতার বই কেনে, প্রায় সবসময় পরাজিত চিন্তা ও জীবনের জন্য ভীত বলে, কবিতা পড়ে একটু আনন্দ খোঁজে। ‘সঙ্গম বাঁচায় প্রেম’, মনে করে পূর্ণিমা দেখে, হাসে।

‘সব আলাপ বা কথা একধরনের কবিতা।’ কবিরা এরকম দাবি করতে ভালোবাসেন। এবং বলেন, ‘সবসময় কবিতায় মাত্রামাপা ছন্দ থাকবার দরকার নেই।’ প্রকৃতির মধ্যে যে-ছন্দের চলাচল আমরা দেখি সেখানে জীবন ও যাপন নিজের প্রয়োজনে সারভাইভ করবার জন্য একধরনের কম্প্রোমাইজ করে। জীবন সেখানে সৌন্দর্য খোঁজে, আশ্রয় খোঁজে, শান্তি এবং অশান্তিও খোঁজে। তাদের পাশাপাশি অবস্থান আছে বলেই বাঁচাকে যথার্থ করতে ইচ্ছে করে। তার মধ্যে কবিতা কতটুকু ব্যক্তিকে পরমার্থ দেয় তা বিবেচ্য হতে পারে। কবিতা ও তার পাঠক অনেকরকম। কবিও অনেকরকম। সৌন্দর্যের উপভোগপিয়াসীও অনেকরকম।

কবির গায়ে ছাপ মেরে দেওয়া হয়। কবির কবিতা পড়ে বলা হয়, তিনি মার্ক্সিস্ট কবি বা রাজনৈতিক বা বিপ্লবী, কেন না তিনি মানুষের অধিকারের কথা লিখেছেন। মনে করা হয়, মার্ক্সিস্ট হলেই বিপ্লবী। কিন্তু বিপ্লবী মানেই মার্ক্সিস্ট নন। প্রতিটি মানুষই তার মতো করে বিপ্লবী। কেউ প্রকাশ্যে, কেউ নিজের ক্ষরণের বিরুদ্ধে। যে-কৃষক চৈত্রপোড়া মাটি চাষ করছেন, মাটিকে উর্বর করে বীজ বুনছেন, ফসল করছেন, নিজের ও অন্য মানুষের মুখের কাছে খাদ্য নিয়ে যাচ্ছেন, তিনিও বিপ্লবী। অমুক রোমান্টিক কবি, সে পরাবাস্তববাদী, অমুক নিও-রোমান্টিক, তিনি গীতিকবি কিন্তু কখনও কি বলা হয়, অমুক গণতান্ত্রিক কবি? শেষতম অভিধা আমি শুনিনি। কোনো কিছুর ওপর কোনো ছাপ না থাকলে, মানুষ ওই কোনোকিছুকে গ্রহণ বা গ্রাহ্য করতে চায় না। নামও প্রতিটি মানুষের জন্য একটি ছাপ। ছাপের বহুবর্ণ চিহ্নের কাছে মানুষ আনত। আমার রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা সোশ্যাল- ডেমোক্রেটিক। যদি বলি, ‘আমি গণতান্ত্রিক বা সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাট পোয়েট।’ আমাকে আমার নিজের দেওয়া উপাধি দেখে, পাঠক বা কোনো প-িত আমার কবিতার মধ্যে খুঁজতে থাকবেন, কোন শব্দে, কোন বিষয়ে, বলার কোন টোনে এই কবি আসলেই গণতান্ত্রিক নাকি সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাট।

আমি মনে রাখি : বর্গ, প্রেক্ষিত ও সামগ্রিক অবস্থান নির্ধারণের মাপকাঠিতে সব বিষয়ই আপেক্ষিক। তার ভস্মীকৃত রসায়ন থেকে কবিতার এবং কোনো শিল্পর মুক্তি নেই। 

আমি যতটুকু বুঝি, কবিতা মানুষের বিভিন্ন রকম অধিকার পাবার কথা বলে। সংকটের, স্বপ্নের মাত্রা বোঝাতে চেষ্টা করে, দেখাতে চেষ্টা করে। বাঁচার অধিকারের বহুমাত্রিক রূপ থাকে, চাহিদা থাকে। প্রতিটি কবিতা ওই চাহিদার কমবেশি জোগান দেয়। বাঁচার কথা, সাম্যের কথা, প্রেমের কথা, বিপ্লবের কথা, আত্মহত্যার কথা যা-ই কবিতার বিষয় হোক না কেন, সবই তো মানুষের অধিকারের জন্য, পথ চলার জন্য, সঠিক পথ বোঝার জন্য। আমার কবিতায় ওই চিন্তা-চেতনার প্রকাশ যদি না ঘটে, তা হলে কিছু করার নেই। আমরা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারি না, কতটুকু সংগতি বা সংহতি হলে, জীবন একটি প্রায় সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবান রূপ পেলে, বলা যেতে পারে, ‘স্থিতি, পেয়েছি নীল আলোক।’   

প্রতিটি মানুষের নিজের শিল্পচিন্তা আছে। এই চিন্তার সঙ্গে আর্টের শৈলী বোঝার সম্পর্ক নেই। আর্ট দেখে বা করে আনন্দ পাবার সম্পর্ক আছে। দেখবেন, একজন খুচরা পানবিক্রেতা দোকানে পান সাজান হৃদয়ের আকারে বা হার্টের চিহ্নে। বিক্রেতা মনে রাখেন না, একজন পুরুষ ওই চিহ্নটি কাগজে লাল কালিতে এঁকে সুগন্ধি-সুযোগে একজন নারীকে দিলে কী অর্থ দাঁড়ায়। তাঁকে যদি অর্থটি বলা যায়, তিনি হয়তো মায়াজড়ানো হাসিতে সাজানো পানের দিকে তাকিয়ে বলবেন, ‘সোন্দর লাগে।’ বিক্রেতার কবিতা ওই শায়িত নন্দনে।

একটি স্বীকারোক্তির মধ্যে যা যা থাকে তার সত্য ও মিথ্যা সমকালে সবসময় ভিত্তি পায় না। কোনো একসময় তা পেতেও পারে। এখন প্রায় সকলেই জানে, আধুনিকতার কাল শেষ হয়ে গেছে। ‘ক্ল্যাসিক’, ‘মডার্ন ক্ল্যাসিক’-এর পর এখন আমরা লিখছি ‘কনটেমপোরারি লিটারেচার’। সমকাল তো সবসময়ই ছিল। আগামীতেও থাকবে। ‘উত্তর আধুনিকতার’ কথা বলছি না। কথাটি ধাঁধাঁ ও বাচালতায় পূর্ণ। বিতর্কসঞ্চারী। সমকালে রচিত সাহিত্যের বিশেষ উচ্চতার শিল্পমান ও জীবনগ্রাহী যোগ্যতা যদি থাকে, তা হলে চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর পরে তা ‘মডার্ন ক্ল্যাসিক’ হতে পারে। এবং স্বীকৃত ও অবিসম্বাদী মানসম্পন্ন যে সাহিত্য তা ‘ক্ল্যাসিক’। উদাহরণ দেওয়া হয় প্রাচীন গ্রিক ও লাতিন সাহিত্য সামনে রেখে। অনেক ক্ল্যাসিক গ্রন্থের নাম বলে আপনাদের ক্লান্ত করবো না। নিত্য ব্যবহারিক আসবাবের  থেকে একটি উদাহরণ বলছি, খাবার টেবিল গুণগতমানে সব থেকে ভালো কাঠের, ক্ল্যাসিক; উপরের স্তরে কাচ বসালে ফ্যাশন। সাহিত্যে ফ্যাশনের মাত্রা বাড়ছে। কবিতাও তার থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।  ফ্যাশন প্যারেডে বিড়াল-ধরনে হেঁটে যে পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, যা তিন মাস থেকে ছয় মাস পর্যন্ত বাজারে থাকবে, ওই পণ্য সব বিড়াল পরে না। কবিতা তিন বা ছয় মাসের জন্য পণ্য নয়।

কবির বেঁচে থাকার সময়, না-দেখা সময়, যাকে অতীত বলা হয় এবং আগামীদিনের সময় অর্থাৎ ভবিষ্যৎ, এই তিন প্রবাহের মধ্যে শুধু কবির বেঁচে থাকবার বর্তমানে যা যা ঘটছে তার দাস, শিকার ও চিন্তামাফিক বিচারক হয়ে কবিকে অতীত ও ভবিষ্যতের কথাও বলতে হয়। কবির কাছে মানুষ ইতিবাচক স্বপ্ন আশা করে, কেন করে আমার অজানা। আশা-নিরাশার নির্মাতা মরজীবীকে সাময়িক সেবা দিতে পারে। ‘দুজন সেবক-সেবিকা জল দেয় গোলাপে, পাথরে।’

তোমার প্রশ্ন নেই

সম্মুখ নেই তোমার

উপরযুক্ত কাব্যবাক্য থেকে আমাদের চিন্তাচেতনার মধ্যে যদি কোনো প্রশ্ন দেখা দেয় বা বোধের অংশে কড়া নাড়ে, তা হলে বোঝার অবকাশ থাকে, মানুষের যাত্রায়, পথ চলায় প্রশ্নই চিন্তার বহুবিধ মাত্রাকে সম্মুখের আলোকরেখা দেখায়। যার চারদিকে কোনো বস্তু নেই, তার সম্মুখ নেই, পেছনও নেই। দিগন্তরেখার দাস সে-জন। তখন সম্মুখ ও পেছন-বিষয়ক ধারণা শূন্যতার নামান্তর। প্রশ্ন সত্য ও মিথ্যাকে উদ্ধার করে। সত্য বাস্তবসান্ত¡নামূলক একটি অবস্থামাত্র। তাকে মানুষ আবিষ্কার করেছে সংঘাত ও যাপনের রক্তাক্ত ঝঞ্ঝার মধ্যে। মিথ্যাকেও তাই। কবিতার শেকড়মূলে ওইসব খুঁজতে যাওয়া অবান্তর। কবি বলতে পারেন, ‘ওই শূন্যতার পথ ধরে তোমার কাছে যাওয়া অবান্তর নয়।’ ঊর্ধ্বকমার দেয়ালে আটকে পড়া বাক্যে ‘তোমার’ শব্দটির অর্থ হতে পারে, একজন মানুষ, একটি নদী, একটি গাছ বা শেকড়, বা একটি সোজা পথ।

এই কথাপালার শেষ পর্যায়-নির্মাণে আমার কয়েকটি কবিতা আছে। লেখায় কী বলতে চাই, এবং ওই কী’র সমবায়ে একটি সম্পন্ন চিত্র পাওয়া যায় কিনা, আমি গণতান্ত্রিক কবি কিনা, ইচ্ছে হলে দেখবেন।

উপরে এবং পরে বলা পর্বগুলোর সমবায়ী আশ্রম এই বক্তৃতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রা দেবে আশা করি। অবশ্য এ কথা সত্য, আমার রচিত মাত্রা সবার কাছে গৃহীত না-ও হতে পারে। কোনো নির্মিত মাত্রা কখনও একজনকে, কখনও অনেকের চিন্তাকে পরাধীন করে, স্বাধীনভাবে চিন্তা করবার পথও তৈরি করে, মাত্রাকে অতিক্রম করবার প্রেরণাও জোগায়। তখন প্রশ্ন তৈরি হয় এবং হয় না। প্রেরণার পেছনে কথা, চিন্তা, চেতনা, কর্ম এক পরিধির মধ্যে বা বাইরে নিরন্তর ঘুরতে থাকে। মাত্রার আচার-আচরণ বিবিধ জ্যামিতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষালব্ধ সু ও দুরবস্থা থেকে তৈরি হয়। ‘জ্যা’ হচ্ছে সেই সরলরেখা যা বৃত্তের পরিধিকে দুই বিন্দুতে স্পর্শ করে। আর ‘মিতি’র অর্থ পরিমাপ বা জ্ঞান। জ্ঞানের যথাযথ পূর্ণতা না হলে প্রজ্ঞাবান হওয়া সম্ভব নয়। পরিমাপ ও জ্ঞান পরিমার্জনা দাবি করে। পরিমার্জনার শ্রমিকতা থেকে মুক্তি না নেওয়া উপকারী। বিন্দু, বৃত্ত, পরিধি, সরল ও বক্ররেখা সম্পর্কে একজন কবির বোধবুদ্ধি পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। অংকের শুদ্ধতাবোধ কবিকে অর্জন করতে হয়। কিন্তু অংকের নাছোড় দৃঢ়বন্ধন কবির জন্য গরাদ। 

পড়শি শব্দের সাক্ষাৎ, কথাবার্তা, ইঙ্গিত, রূপক, অলংকার, চিত্রকল্প ইত্যাদির সমন্বয়ে শব্দ ও বিষয় উত্তম কবিতার মাত্রা পায়, কবিতার বাড়ি তৈরি করে। সেই বাড়িতে পাঠক থাকতে পারেন, নাও পারেন। ইচ্ছে। পাঠকের একাকিত্বের সৌন্দর্যকে, ব্যথাকে রচিত কবিতা বা যে-কোনো শিল্প যদি সঙ্গ না দেয়, তবে ওই কবিতা বা শিল্প ব্যর্থ। ‘ক্যাথারসিস’ শব্দটি মনে রাখা প্রয়োজন।

আমার কাছে আমি এখনও কবিতা গড়া ও ভাঙার পর্বে বিভাজিত এক প্রতিদ্বন্দ্বী মাত্র। জীবনীয় সত্তার অর্জন এবং না-অর্জন, এই দুই মেরুর শিকার হয়ে বাঁচতে চেষ্টা করছি। কে না করছে? এবং গত চল্লিশ বছর ধরে, আমার শ্রম কোন আলোকরেখার প্রয়োজনীয় আখ্যান-আধারে, যার মধ্যে অবশ্যই পড়ে বেঁচে থাকবার সকল রকম উত্থান-পতন, সেখানে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি এবং সমাজের শ্রেয় ও অন্ধকারনীতি বেতের জঙ্গলের মতো জড়াজড়ি করে আছে; কবিতার সুন্দর শরীর নির্মাণে কতখানি স্পষ্ট করেছে স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণের ঘোষ, অঘোষ, অল্পপ্রাণ এবং মহাপ্রাণের পরিমিত ব্যবহার, তা দেখতে হবে।

‘কবি কতটুকু দেখবে বা দেখাবে?’, সে-প্রশ্ন যদি আসে, উত্তর হতে পারে, খড়কুটো আর সুন্দরীর প্রতি সমশ্রদ্ধা থাকা বাঞ্ছনীয়। দুই প্রতিভাসই কথা বলে, একজন নীরবে, অন্যজন উচ্চারণে। আমার ব্যবহৃত শব্দের কর্মশরীর ব্যবচ্ছেদের নিষ্ঠায় আমি শ্রীর কতখানি শীলতা গড়তে পেরেছি তা হয়তো দেখবেন আগামীর কোনো এক পাঠক। যদি কেউ না দেখেন, বুঝতে হবে, আমি যা করবার চেষ্টা করেছি তার মধ্যে আগামীদিনের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো রসদ ছিল না। মানুষ সবকিছুর মধ্যেই নিজের বসন খোঁজে। তৃষ্ণাকে পোড়াবার জল খোঁজে।

সম্ভবত কেউ কেউ জানে, যে লেখা, কথা, চিত্রশিল্প, সঙ্গীত পাঠকের, শ্রোতার, দর্শকের  চিন্তার স্তরে প্রশ্ন করে না, সেইসব কর্ম পড়তে নেই, শুনতে নেই, দেখতে নেই। আমার কাজ যদি কিছু চিন্তা করতে সহযোগিতা না করে, তা তখন আবর্জনা। তবু মানুষ দেখে, পড়ে ও শোনে, আমার নয়, হয়তো অন্যের। চিন্তারুচি, শ্রবণরুচি, পাঠরুচি, বসনরুচি, খাদ্যরুচি, সঙ্গরুচি, কথারুচি এবং গ্রহণ ও ত্যাগরুচি যথার্থ না হলে, মন-মানস-ব্যবহার নাকি অভিজাত হয় না। কবিতা বা অন্যান্য শিল্প মানুষকে বিশেষ রুচি গঠনের একটি পর্যায় পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। কিন্তু সব মানুষ তো অভিজাত হওয়ার চেষ্টা করে না। হয়ও না। প্রান্তিকের সংখ্যা বেশি। বেশিরভাগ মানুষের নিরুপায় যাপনিক চর্চা বা চর্যা প্রায় এক স্রোতমুখী। মানুষ সবসময় ভাসমান। আপাত গৃহবাস আপাত। চেনা বা অচেনা হোক, তীর খোঁজে। প্রাণীমাত্রেই পাড় খোঁজায় নিরন্তর পরিশ্রমী। যারা সচেতনভাবে ওই খোঁজার কাজে অজানার উদ্দেশে তরী বা জাহাজ ভাসায়, নতুন তীর পাবার পর, নতুন তীরে উঠে কী তারা করেছে, করে, তার সাক্ষী সভ্যতা এবং অসভ্যতার ইতিহাস।

আমার যাপন

বোধ হয় বুঝেছিল ভাসমান তরী

আমি কবি বা লেখক হতে চাইনি। আমি কী হতে চায়নি তা বলা সহজ। চোর, ঠগ, খবিশ, ঋণখেলাপি, মিথ্যাবাদী, খুনি, ধর্ষক, গরুর শিং বিক্রেতা, রাজনীতিবিদ, আমলা, ফাজিল, চতুর প্রমুখের বুদ্ধির মাত্রা করুণানির্ভর, ভিক্ষাপ্রয়াসী। ওইসবের মধ্যে কেউ একজন হতে পারলে, এখনকার সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সিংহের পিঠে বসে আনন্দে বিহার করা যেত। সৃষ্টিশীল মেধার চোখ যোজনবিস্তারী। ‘রাত নামছে’ সবাই বলতে পারে। ‘তোমার চুলের মতো রাত দিনের গ্রীবায় নামছে’, সবাই বলতে পারে না। সূর্য আর চন্দ্রের আছে ‘এইম ইন লাইফ’। প্রতিমুহূর্তে কবরের পাশ দিয়ে হাঁটা এই জীবনের লক্ষ ঠিক করা, এক মূর্খতা। আগেও এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে কীভাবে চড়াই-উতরাইয়ের এই পথে এলাম তার বয়ান দিয়েছি। সঙ্গত প্রহর সামনে বলেই আবার বলছি, ‘কেন এসেছিল সেই সন্ধ্যা? কেন গ্রহণ করেছিলাম ওই বাজি?’

সেই সন্ধ্যায় আমি উচ্চারণ করে পড়ছিলাম। অগ্রজ দাউদ বুকের তলায় বালিশ দিয়ে শুয়ে কবিতা লিখছিল। একই ঘরে দু’জন ঘুমাই। থাকি ঢাকার ১৪/২ মালিবাগে। আমার বয়স তেরো প্লাস। ছাত্র অষ্টম শ্রেণির। স্কুল সিদ্ধেশ্বরী। সাল ১৯৬৮। দাউদ বললো, ‘মনে মনে পড়তে।’ মনে মনে ভাবা যায়, পড়া যায়, তা জেনেছি কিছুদিন পর। ওর কথা শুনলাম না। কারণ, মা পড়ার স্বর শুনতে চায়। সচেতন সব মা-ই বোধহয় সন্তানের পড়ার স্বরে মুগ্ধ হয়। থামলেই পাশের ঘর থেকে বলে, ‘স্বপন পড়িস না কেন?’ দাউদ আবার বললো, মনে মনে পড়তে। আমি বললাম, ‘কী এমন লিখতেছ, ও-সব  লেখা সবাই পারে।’ ঘাড় ঘুরিয়ে ও বললো, ‘দেড়েম আছে, ল্যাখ তো।’ আমি বললাম, ‘লেখে দেখাবোনে।’

‘দেড়েম’ শব্দটি পাবনা অঞ্চলে ব্যবহার হয়। মানে ক্ষমতা। এই ‘দেড়েম’ কীভাবে অর্জন করলাম, অর্জনের ভালোমন্দ মাত্রা কম ও বেশি আছে, বলবো।

কী এক কঠিন পরীক্ষা। ‘দেড়েম’ আর আয়ত্তে আসে না। দু’দিন পর দাউদ জিজ্ঞেস করে, ‘পারলু?’ উত্তর না পেয়ে আবার বলে, ‘দেড়েম লাগে।’

সহপাঠী ও বন্ধু পাশের বাড়ির চুন্নুকে বললাম, ‘একটি কবিতা লিখতে হবে।’ ওর হাতে ছিল টেনিস বল। আকাশের দিকে মারলো। শূন্যতার স্তর ভেঙে বলটা নামছে (শূন্যতাকে ভেঙে ফেলাই কি শিল্প ও সাহিত্যের প্রধান কাজ?), চোখ বলের দিকে, বললো, ‘কি?’ সব বললাম। দুই কিশোরের যৌথ পরামর্শ নিজেদের প্রতি ছিল : রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকুমার, জসীম উদ্দীন ওঁদের বই থেকে এক দুই লাইন করে তুলে দিলেই প্রথম কবিতা লেখা হয়ে যাবে। এবং আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাই, পৃথিবীর সব কবিই তাঁদের প্রথম কবিতা এইভাবেই লিখেছেন।

আমরা নকল করছি, দাউদ দেখে হাসলো। পরে আমি এক লাইন, চুন্নু এক লাইন এইভাবে রচনা করলাম আমার প্রথম ছড়া। সততাকে মান্য করে বলতে হয়, আমি তখন নিজেকে অর্ধেক কবি ভাবতে শুরু করেছিলাম। কেন যে করেছিলাম, তার ক্ষরণ এখনও বইতে হচ্ছে। আজন্ম হবে। যদিও আমি অগ্নিসত্যের পবিত্রতা বুঝে জানি, কবি হয়ে ওঠা এক নিরন্তর যাত্রা। ষাট হাজার বছর সাধনার পর দস্যু রতœাকর হলেন বাল্মীকি। এবং কবি।

হয়তো অনেকে জানেন, আমার অগ্রজরা লেখক। বাড়িতে লেখালেখি হয়। বড় ভাই জিয়া নাটক ও কবিতায় ব্যস্ত, নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় বানালেন। রশীদ গল্প ও উপন্যাস লেখেন, নাটকেও উৎসাহ ছিল। মাকিদও কবিতা ও গল্পের সত্যে শ্বাস নেয়। দাউদের জীবনযাপন সবসময় কবিসুলভ। বাড়িতে লেখা বিষয়ক কথামালার শেষ নেই। কবি, কথাশিল্পী ও নাট্যকর্মীরা বাসায় আসেন। আড্ডা দেন। আকাশ ও পাতালের মধ্যে যা কিছু আছে, কথার ঊর্মিতোড়ে ওইসব জিনিসকে জটিল ও সহজ করেন। আড়াল থেকে শুনি। আড়াল ভালো লাগে।

কবি আল মাহমুদ, ছোটখাটো সুন্দর মানুষ, চোখ উজ্জ্বল, মালিবাগের বাসায় দৃঢ়স্বরে কথা বলছেন, শুনছি। কবি আবুল হাসান একদিন দুপুরের পরে এলেন মাকিদের সঙ্গে। দু’জনই ক্ষুধার্ত। খাওয়ার পর সিগারেট জ্বালিয়ে আবুল হাসান আমাকে বললেন, ‘ছাইয়ের চূড়া না ভেঙে সিগারেট খাবো, তুমি দেখবে।’ চিৎ হয়ে শুয়ে একবারও মুখ থেকে সিগারেট না সরিয়ে, সত্যিÑ ছাইয়ের চূড়া না ভেঙে পুরো সিগারেট ধোঁয়া করে দিয়ে কবি হাসলেন প্রসন্ন-বিজয়ে। আমি মনে করলাম, কবি ছাড়া এই জাদু কে দেখাবে? যদিও কবিরা শব্দ দিয়ে জাদু দেখায়। ঘটনাটি ১৯৭৩-এর কোনো এক মাসে। তখন আমি কলেজে পড়ি।  

১৯৬৬ থেকে ’৭১ সময়পর্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় প্রতি সপ্তাহে সূর্যও এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মিছিল করেছিল, স্লোাগান দিয়েছিল ন্যায্য দাবির পক্ষে। মিছিলে তখন না যাওয়া মানে শ্যাওলাঢাকা ক্লীব হয়ে থাকা। কখনও ভালো ছাত্র ছিলাম না জন্য, যোগ্যতাও ছিল না বলে শ্রেণির পাঠ্যসূচি ও শিক্ষকরা আমার কাছে কিছু আশাও করেনি। আশার সিঁড়ির শেষ নেই।  কেউ আমার কর্মকা-ের মধ্যে আশার আলো দেখুন, সে চেষ্টা আমি কখনও করিনি। বাড়ির সবাই মনে করতো, ‘স্বপন পাস করবিনি।’

মনে করতে পারি, তখনকার দিনবদলের রাজনীতি আমার চোখ ও মানসকে অতি দ্রুত বড় করে দিচ্ছিল। যুদ্ধ হলো। স্বাধীনতা সূর্যালোক নিয়ে এলো। ওই সময়কালের মধ্যেই হঠাৎ, বলা নেই, আভাসও নেই, এক অচেনা বিদ্রোহে এলো যৌবন। বড় হয়ে ওঠা পাতার সবুজ আমাকে আনন্দ দেয়। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া তরুণীর অর্ধেক মুখ দেখে সারারাত ঘুম হয় না। আবার দুর্ভিক্ষ ও ইতিহাসের নির্মম হত্যাকা- এবং লেফট-রাইটের কর্কশ শব্দেও ঘুম হয় না। জাগরণে কত যন্ত্রণা, ঘুমের মধ্যে স্বপ্নেও যন্ত্রণা। বয়স ও কিছু চিন্তার দুর্বহ দায় বহন না করে উপায় নেই। গত শতাব্দর সাত দশকের জাতক যারা তারা বোধ হয় জানেন, চালের মধ্যে কত পাথর ছিল। ওই দশকের কবিরা কিছু উচ্চৈঃস্বরের কবিতা লিখেছেন, না লিখলে নিজের কাছে ছোট থাকতে হতো। নিজের অস্তিত্বের চলাচলকে জানান দিতে হলে বেশ জোরে কথা বলতে হয়, আমরা বলেছি। কবিতা লিখেছি, চিৎকার করিনি। 

১৯৭৯-এর জুলাই মাসে ‘এই জেনারেশন’ শিরোনামে নিচের কবিতাটি লিখেছিলাম। আমার সামান্য, অথচ দৃঢ় বিচারবুদ্ধি বলছে, কবিতাটি পড়বার পর আপনাদের চিন্তার যৌক্তিকতা বলবে, ওই জেনারেশন কী খুঁজছিল, কোন্ ছাইদগ্ধ পথ ধরে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছিল:

এই জেনারেশনের কোনো ফ্রেম নেই

জ¦লন্ত বারুদ আর মৃত্যুর গন্ধ ছাড়া

এরা পায়নি তেমন কোনো প্রেম।

ভঙ্গুর হৃদয় পোড়ে যুদ্ধের রুক্ষ বাতাসে

কালচে রেেক্তর গন্ধ জমে আছে চাপা নিঃশ^াসে,

অস্তিত্বের ক্ষতে প্রতিদিন বসে

এবং আনন্দে চোষে

সময়ের অন্ধ কালো মাছি,

ভরাট গলায় সকালে সন্ধ্যায়

পাংশুটে আলোর রেস্তোরাঁয়

চিৎকার শুনি : ভেঙে যাচ্ছি, ভেঙে যাচ্ছি

                                      তবু বেঁচে আছি।’

কালোদিনের কাঠঠোকরা সত্তাতে ঠোকরায়

                এরা মধ্যেসধ্যে

                নিজেকে নিজের খরাজ¦লা মনস্তাপ থেকে স্বাধীন করতে

একটু-আধটু মদ্যটদ্য খায়,

নিজেকে পোড়ায় নৈরাজ্যের প্রবল আগুনে।

চায় মনেপ্রাণে উদ্ভাসিত সবুজ স্বদেশ।

সামনের রাস্তায় তাকালেই দ্যাখে

                : মাথা নিচু ক’রে হেঁটে যাচ্ছে ভঙ্গুর মানুষ

                ম্লান চোখে ঝুলছে করুণ স্বপ্নের বিবর্ণ রেশ।

এই জেনারেশন পায়নি কোনো প্রেম

জেগে উঠবার পর  থেকে শুনছে শুধু

ভাঙনের ঘণ্টাধ্বনি

অগ্রজের দীর্ঘশ্বাস

অদ্ভুত রাজনীতির রঙিন ঠোঁটের হাসি,

তার বিকৃত শরীর ঘামতেলে অত্যন্ত পিচ্ছিল

মানুষের হৃদয়ের লেনদেন তার কাছে বাসি।

তবু এই জেনারেশন

আর্তনাদ ক’রে চায়

আকাক্সক্ষার ব্যানার মিছিল,

যার ’পর রৌদ্র দিয়ে লেখা

 : পেয়ে গেছি সেই সুন্দর জীবন

তাই উৎসবমুখর আজ বাংলার নিখিল।’

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, পদার্থবিজ্ঞানী হওয়ার ইচ্ছে জেগেছিল। বন্ধুরা বলল, ‘তুই কি আইনস্টাইন হবি? চল বাংলা বিভাগে পড়ি, রবীন্দ্রনাথ বানান শুদ্ধ লিখলেই দ্বিতীয় শ্রেণি পাওয়া যায়।’ ওই মানবের নামের শুদ্ধ বানান আমি ক্লাস টুতেই শিখেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় একজন ছাত্রকে শুধু শেখাতে পারে : বই খোলার নিয়মকানুন, অভিধানের শব্দ ছাড়াও মানুষের ব্যবহৃত অনেক শব্দ আছে তা বোঝা, কোন কোন বই না পড়লেও চলে, কোন কোন বই রক্তের দেয়াল দিয়ে নিজের কাছে রাখতে হয়। বলে রাখি, আমার প্রিয় শখ মানুষের মুখ দেখা। জীবিত ও মৃত মানুষের মুখে জীবনের ও কর্মের সব সত্য ও মিথ্যা থাকে। কবিতায় তাকে ধরা কবির একটি প্রধান দায়িত্ব। 

কলেজে পড়বার সময় মনে হলো, বড় সম্পাদক কবিতা না ছাপলে কেউ কবি বলবে না। কবি হতে চাওয়া তরুণের একটি স্বপ্ন থাকে, তা হলো, অমুক বড় কবি যে-সাহিত্য পত্রিকা বা কোনো কাগজের সাহিত্যপাতা সম্পাদনা করছেন, সেই কাগজে একটি কবিতা বড় কবি যদি ছাপাবার জন্য মনোনীত করেন, তা হলে বন্ধুদের কাছে তরুণ বলতে পারে, ‘কবি হওয়ার কঠিন পথ আমার জন্য খুলছে।’ 

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সাত দশকের তরুণ কবিদের, আমি যতদূর জানি, স্বপ্ন ছিল, কবি আহসান হাবীব যদি একটি কবিতা ছাপতেন, তা হলে, বন্ধু ও পরিচিত কারও কাছে, কণ্ঠে গর্বিত স্বর তুলে তরুণ বলতো, ‘হাবীব ভাই আমার কবিতা ছেপেছেন।’

কবিতা নিয়ে গেলাম কবি আহসান হাবীবের কাছে। তিনি দৈনিক বাংলার সাহিত্যপাতার সম্পাদক। কবিতা পকেটে রইল। দৈনিক বাংলা ভবনের তিনতলার কাচঘেরা একটি ছোট্ট ঘরে শুভ্রকেশধারী, চোখে পুরু কাচের কালো ফ্রেমের চশমা, পরনে পাঞ্জাবি, সম্পাদক বসে আছেন। ওই হিমালয়সম গুরুগম্ভীর কবি-সম্পাদককে দেখে ভয় পেলাম। বুকে ঘাম জমে যায়। পালালাম। ঘটনাটি বলছি, কারণ হলো, কবি হওয়ার জন্য কোন মাত্রার ধৈর্য আর নিষ্ঠা দরকার কবি আহসান হাবীব বুঝিয়েছিলেন। কথায় নয়, মার্জিত ব্যবহারে।

সাত দিন পর বন্ধু আবু সাঈদ জুবেরীকে নিয়ে গেলাম। ও গল্প লেখে। একা যেতে ভয় পেয়েছিলাম। আগের মতোই কাচের ওপার থেকে সম্পাদককে দেখে চলে এলাম। চার দিন পর আবার গেলাম। সম্পাদককে পেলাম না। দেখলাম দুই কবি, হাসান হাফিজুর রহমান ও শামসুর রাহমান অন্য দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। চোখ সুখী হলো। তিন দিন পর আবার গেলাম। নিজেকে বললাম, ‘এবার আর ফিরব না।’

‘আসতে পারি?’ চোখ না তুলেই আহসান হাবীব ভেতরে যেতে বললেন। দু’জন দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের শ্বাসের ঘনত্ব বাড়ছে। হাতের ইশারায় তিনি আমাদের বসতে বললেন। কিছু একটা পড়ছিলেন। পড়া শেষ করতে মিনিট দু’তিনেক লাগল। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছিল। দুই বন্ধুই ঘেমে একাকার। রাগ হচ্ছিল। তারুণ্যে রাগ না থাকলে খারাপ দেখায়। কিছু বলতেও পারছিলাম না। যদি ঘর থেকে বের করে দেন। রাগের ভাবনা বলছিল, ‘লিখেছেন তো ‘মেঘনা পাড়ের মেয়ে’ একজন তরুণ কবি সামনে বসে আছে পাত্তাই দিচ্ছেন না।’ তাঁর পঠিত কাগজের দিকে চোখ রেখেই বললেন, ‘লেখা নিয়ে আসলে রেখে যাও, তিন মাস পরে আসবে।’ কথা সংক্ষিপ্ত। গ্রহণ ও দূরত্বের ব্যঞ্জনায় পূর্ণ। আমরা দু’জন বাইরে এসে সংক্ষুব্ধ। ‘খুব ভাব দেখাইলো।’

নব্বই দিন নব্বই বছর মনে হয়। সংবাদে ছড়া দিয়েছি। দু-এক সপ্তাহের মধ্যে বজলুর রহমান ভাই ছেপে দিয়েছেন। সত্তর সালের শেষের দিকে সংবাদের সাহিত্যপাতায় কবিতা ছেপেছেন শহীদুল্লা কায়সার। আর তিনি কিনা বলেন তিন মাস পর যেতে। গেলাম। ‘কী চাই?’ উদ্দেশ্য বলবার পর বললেন, ‘এক মাস পর এসো।’ বাইরে এসে বন্ধুকে বললাম, ‘লোকটি ফাউল।’ জুবেরী বললো, ‘তোকে পরীক্ষা করছেন, ধৈর্য দেখছেন, তোর কবি হবার স্বপ্ন খাঁটি কিনা?’

এক মাস পর গেলাম। বললেন ‘বসো।’ আমার কবিতার কী অবস্থা সে-বিষয়ে কিছু না বলে, কী করি, কোথায় থাকি, বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমার বড় ভাই জিয়া হায়দার’ বললাম। মনে হলো, নেম ড্রপিং তিনি পছন্দ করলেন না। ‘সাত দিন পরে এসো।’ শুনি তাঁর প্রশান্ত স্বর।

তাঁর সামনে আমার তিনটি কবিতা। কবি আহসান হাবীর কবিতাগুলো পড়েছেন। লাল কালির পীড়নে আমার কবিতা রক্তাক্ত। কাটাকাটি করেছেন। ‘ছন্দ তো শেখোনি, জানো না, কিছু শব্দের বানানও ভুল করেছ, অভিধান পড়ো না, অভিধান পড়বে ?’ অপেক্ষা করছি, কবিতা মনোনীত হলো কিনা, কবে ছাপা হবে, শুনতে। ‘তিন দিন পর আরও তিনটি কবিতা নিয়ে আসবে, চা খাবে?’ কী সুন্দর হিমালয়। দুই বন্ধু চা খেয়ে চলে এলাম। তিন দিন পর তিনটি কবিতা নিয়ে তাঁর সামনে আবার। চায়ের কথা বলে, আমার কবিতাগুলো পড়লেন, একটি কবিতা মনোনীত করলেন এবং মনোনীত কবিতাটির দু-তিনটি শব্দের যথাশব্দ বলে, বললেন ‘বদলে দিলে ভালো হবে।’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, জি, জি। করলে সুন্দর হবে।’ তিনি স্মিত হাসলেন। তরুণ কবির ওই ত্বরা কেন, তিনি জানেন। কবি হতে চাওয়া তরুণের কবিতার প্রতি ধৈর্যশীলতার ঘনত্ব কতটুকু তার পরীক্ষা কি আহসান হাবীব নিয়েছিলেন? আমার বয়সের অভিজ্ঞতা বলছে, ‘অগ্রজ কবি ও মান্য সম্পাদক সঠিক কাজ করেছিলেন।’ তিনি যতদিন সম্পাদক ছিলেন, কী ঋদ্ধ করেছেন আমাদের। বয়সের দূরত্ব এক আশ্চর্য রুচির সৌন্দর্যে দূর করে দিতেন।

কবি আহসান হাবীব একদিন বললেন, ‘তুমি যে-ভাবে কথা বলো, গল্প বলো, গল্প লেখ। লিখে আমাকে দেবে।’ লিখলাম, দিলাম। কী বিস্ময় : পরের রোববারেই তিনি ছেপে দিলেন। গল্পের তিনটি বই আমার সামান্য অর্জনে আছে।  আজকাল দেখছি, কেউ কেউ আমার নামের পাশে  ‘কবি ও কথাশিল্পী’ লিখছেন।

আহসান হাবীব তো কবিতা ছাপলেন। দেখা যাক, বিষ্ণু দে সম্পাদিত ‘সাহিত্যপত্রে’ কবিতা পাঠালে কী উত্তর আসতে পারে? সাহিত্যপত্রের  ঠিকানা জুবেরীই সংগ্রহ করেছিল।  

তাঁকে কবিতা পাঠালাম। অপেক্ষার বাঁধ আমার অস্থিরতার প্রবল ঢেউয়ে প্রায় ভেঙে যাবার উপক্রম। হিসাব করি,  ‘এক মাস হতে চললো, কবিতা মনোনীত হলো কিনা, কলকাতায় চিঠি যেতে সাত দিন, আসতে সাত দিন, বিষ্ণু দে জানাবেন না?’ বুদ্ধদেব বসু, শুনেছি, ‘কবিতা’য় কবিতা পাঠালে তরুণ কবিকে চিঠি লিখতেন। ‘কবিতা’ বন্ধ না হলে সেখানেও কবিতা পাঠাতাম।

মধ্য সেপ্টেম্বরের এক দুপুরে, ১/১০ প্রিন্স গোলাম মহম্মদ রোড, কলিকাতা ২৬ থেকে কবির স্ত্রী প্রণতি দে’র চিঠি এলো। লেখা ৪ঠা সেপ্টেম্বর,’৭৩ তারিখে:

সবিনয় নিবেদন,

আমার স্বামী, শ্রীবিষ্ণু দে, আপনার ১০-ভাদ্র লেখা চিঠি ও কবিতা পেয়েছেন। তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। কবিতাটি ডিসেম্বরের সংখ্যা সাহিত্যপত্রে ছাপা হবে, এবারের সংখ্যা সব ছাপতে চলে গেছে।

                আমার স্বামীর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। গত বছর একটা ‘অপারেশন’ করতে হয়েছিল, কিন্তু তাতেও খুব স্বস্তি বোধ করতে পারছেন না। সেজন্য আমি তাঁর হয়ে চিঠি লিখছি, আশা করি আপনি বুঝবেন। তাঁকে আমরা যতদূর সম্ভব বিশ্রাম দিতে চেষ্টা করি। সেজন্যই আমি তাঁর চিঠির উত্তর দিয়ে থাকি। এই এক কারণেই তাঁর পক্ষে এখন ঢাকা যাওয়া সম্ভব হবে না।* কবে যেতে পারবেন তাও ঠিক বুঝতে পারছি না।

ইতি

প্রণতি দে

পু. সাহিত্যপত্র ছাপা হচ্ছে, জায়গা হলে এ সংখ্যাতেও যেতে পারে, উনি বললেন।

বিষ্ণু দে ২৩/৪/’৭৪ তারিখে বিহারের রিখিয়া থেকে আমাকে লিখেছিলেন :    

জাহিদ হায়দার,

স্নেহভাজনেষু,

আপনার ২৭শে চৈত্রের চিঠি ও কবিতা পেয়েছি। লজ্জিত বোধ করছি, কিন্তু আমার ধারণা আমি চিঠির উত্তর দিয়েছিলুম এবং সুদীপ্ত বসুকে (১২এ, জাসটিস চন্দ্রমাধব রোড, ক্যালকাটা-২০) জানিয়েছিলুম আপনার পত্রিকাদি পাঠাতে। এবারেও আপনার কবিতা ও চিঠি জিষ্ণু দে**-কে (১/১০ প্রিন্স গোলাম মহম্মদ রোড, কলকাতা-২৬) পাঠিয়ে দিচ্ছি, সে আশা করি সুদীপ্তকে ধরতে পারবে, যদিও তাঁকে ধরা সাধনার ব্যাপার। ‘সাহিত্যপত্র’-কে বাঁচিয়ে রাখা খুব শক্ত মনে হয়।

দুঃখিত। কিন্তু আমি নিরুপায়। মাজর্না করবেন, শারীরিক অযোগ্যতা ও ভৌগোলিক অসুবিধা থাকলে আমার বয়সে কি করতে পারি?

কিন্তু মাঝে মাঝে খবর পেলে খুশি হবো। হায়দার-দের বিষয়ে আমার উৎসাহ আছে।

                শুভাকাক্সক্ষী

বিষ্ণু দে

অগ্রজ কবি তরুণ কবিকে কীভাবে সম্মান দেখান ও  কবিতার প্রয়োজনে কিছু শেখান তা বোঝা যাবে নিচের কথাগুলো পড়লে। তখনও কলেজের ছাত্র। সাল ১৯৭৩। বাংলা একাডেমি থেকে ‘উত্তরাধিকার’ বের হচ্ছে। কয়েক সংখ্যা বের হয়েও গেছে। উত্তরাধিকারের কবিতা দেখেন কবি রফিক আজাদ। ওঁর কাছে কবিতা দিলাম। দশ কি পনেরো দিন পর অগ্রজ রশীদ হায়দারকে তিনি বলেছেন, তাঁর সঙ্গে আমি যেন দেখা করি। সেলিনা হোসেন, রফিক আজাদ ও আমার অগ্রজ তখন বর্ধমান হাউজের দোতলার একটি ঘরে বসেন।

রফিক আজাদ চা খাওয়ালেন। সিগারেট জ্বালিয়ে বললেন, ‘জাহিদ বাইরে আসো।’ দেখিনি আমার কবিতাটি তাঁর হাতে। বাইরে এসে আমাকে বললেন, কবিতার একটি লাইন পড়তে। পড়া হলে রফিক আজাদ বললেন, ‘মাত্রা কম পড়েছে, কবিতাটি ভালো লেগেছে।’ তিনি দু-তিনটি বিকল্প শব্দ বললেন। আমি রাজি হলাম।

বর্ধমান হাউজের কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে হলো, ওই ঘরে  সেলিনা আপা, রশীদ ভাই এবং অন্য যাঁরা ছিলেন তাঁদের সামনে রফিক আজাদ ছন্দ ভুলের কথা কেন বললেন না? বললে আমি লজ্জা পেতাম। কবিকে কবি সম্মান না করলে কী হতো? একজন কবি একজন কবির কাছে, মানুষের কাছে অভিজাত ব্যবহার আশা করে। যদিও এখনকার বাংলাদেশে প্রায় সব ব্যবহারই নর্দমার কাদায় জীবন্ত।

আরও কিছু দেখা ও সাহচর্যের কথা বলা যেতে পারে। যা আমার চিন্তাকে, দেখা ও বোঝার চোখকে ঋদ্ধ করেছিল।  বন্ধু জুবেরী আর আমি কমলাপুরে এক সকালে কবি জসীম উদ্দীনের বাড়ির সাহিত্য আসরে গেলাম। ‘কবর’ কবিতা পড়া হয়ে গেছে আমাদের। ‘পল্লীকবি’ অনেক তরুণ আর কিশোরের মধ্যে আমাদের দিকে একবারও তাকালেন না। যারা সেদিন ছড়া আর কবিতা পড়েছিল, তাদের পড়া বেশ মনোযোগ দিয়ে তিনি শুনেছিলেন। কবিতা ও ছড়া লিখতে হলে কী কী করতে হয়, যতদূর মনে পড়ে, তাঁর কবিতার মতোই সহজ ভাষায় বলেছিলেন। আমরা দু’জন কিছুই পড়িনি।

আমাদের মালিবাগের প্রথম লেনে থাকতেন বড় উজ্জ্বল চোখের, যেন এই মরজগতের সবকিছু একবারে দেখছেন, দীর্ঘশরীরের, দৃঢ় পদক্ষেপে হাঁটাচলা করা ‘ডাহুকে’র কবি ফররুখ আহমদ। দূর থেকে দেখে অন্য পথে চলে যেতাম। ভয় পেতাম। জিয়া ভাইয়ের কাছে শুনেছি, তাঁর নাকি ঠোঁটস্থ ছিল সম্পূর্ণ ‘মেঘনাদবধ’। এবং তিনি যখন গম্ভীর কণ্ঠে আবৃত্তি করতেন, আমার অগ্রজের মনে হতো, কবিতা ওইভাবেই পড়তে হয়। আর তাঁকে দেখে আমার মনে হতো, কবিকে দৃঢ় পদক্ষেপে হাঁটতে হয়।

আমাদের পাড়ায় আরও থাকতেন কবি হুমায়ুন কবীর। মাকিদ ও দাউদের সঙ্গে সখ্য ছিল। মাঝেমধ্যে দেখা হলে, স্নেহের স্বরে কুশল জানতে চাইতেন। ঢোলা পায়জামা ও পাঞ্জাবিতে তাঁকে সুন্দর দেখাত। শুনেছিলাম, তিনি সিরাজ শিকদারের রাজনৈতিক আদর্শের বিশেষ কর্মী ছিলেন এবং আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণেই স্বাধীনতার পরে তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর চলাফেরা বলে দিত, তিনি সবসময়ই কবিতার মধ্যে থাকতেন। 

যে-হাতে ‘বিদ্রোহী’ লিখেছেন, সেই হাত ছুঁতে হবে আমার। ধানমন্ডিতে কাজী নজরুল ইসলামকে দেখতে গেলাম। বেলা অপরাহ্ণ। ঘরে কবি ছাড়া কেউ নেই। একটি মেয়ে একবার এসে ঘুরে গেল। মনে হয়, তিনি খিলখিল কাজী। আমি এদিক-ওদিক তাকিয়ে নজরুলের ডান হাতের ওপর আমার হাত রাখতেই তিনি একটি ছোট্ট ধমক দিলেন। কণ্ঠে বিদ্রোহ ছিল না। চোখের সব সত্য খুলে আমার দিকে একবার তাকালেন। কী নরম তাঁর হাত ! আঙুলগুলো লম্বাটে, সরু। ওই মেয়েটি ঘরে এসে আমাকে বললো, ‘আপনি কি কাছে গিয়েছিলেন?’ ‘হ্যাঁ’ বললাম। বললাম না, ওঁর হাত ছুঁয়েছি। ‘চশমা পরা কেউ তার কাছে গেলে উনি ধমক দ্যান।’ মেয়েটি বললো। বন্ধুদের ওই অভিজ্ঞতার কথা বললে, বন্ধুরা বললো, ‘এক সপ্তাহ হাত ধুবি না, তা হলে কবি হতে পারবি।’

আগে জানতে পারিনি। সাল ১৯৭৬। মাস মনে পড়ছে না। ড. আহমদ শরীফ আমাদের বিভাগের চেয়ারপারসন। অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন আমাদের ক’জনকে বললেন, ‘সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা বিভাগে বক্তৃতা করবেন।’

ক্লাস সেভেন থেকে এমএ পযর্ন্ত আমি  প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির বেঞ্চিতে কখনও বসিনি। বসতাম শেষ বা তার আগের বেঞ্চিতে। ক্লাসের বইটার ওপর কোনোদিন সুকুমার রায়, কোনো দিন প্রেমে›ন্দ্র মিত্র (ঘনাদা) অথবা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (টেনিদা), কোনোদিন রোমেনা আফাজ (দস্যু বনহুর) রেখে প্রতিটি ক্লাসের ঘণ্টা পার করে দিতাম। কোনো স্যার যদি পড়াতে পড়াতে হেঁটে পেছনের দিকে আসতেন, দ্রুত ক্লাসের বইটি দিয়ে ঢেকে দিতাম ‘টেনিদা’ বা ‘দস্যু বনহুর’কে। যত উপরের ক্লাসে উঠেছি, বইও ছোটোদের থেকে বড়দের হয়ে গেছে। এই কাজ যতদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ছিলাম, বিশেষ মনোযোগসহ করে গেছি। ভালো ছাত্র না হওয়ার কত লাভ।

ভালো ছাত্ররা প্রথম দিকের বেঞ্চে বসে। সব শিক্ষক তাদের দিকেই বেশি চোখ রাখেন। সুনীতিকুমারের কথা শুনতে হবে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কলাভবনের ২০১৭ নম্বর কক্ষে সেদিন দ্বিতীয় সারির বেঞ্চে বসেছিলাম। সামনের সারিতে ছিলেন আমার শিক্ষকরা। 

সুনীতিকুমার মানুষটি উচ্চতায় সাড়ে পাঁচ ফুটের বেশি ছিলেন না। দু’মিনিট হবে তিনি মঞ্চের চেয়ারে বসেছেন। খুব হন্তদন্ত হয়ে কোথাও থেকে ছুটে এলেন ড. মুহম্মদ এনামূল হক। তাঁর শিক্ষক সুনীতিকুমার। আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে শ্বেতশুভ্র চুলের এনামূল হক তাঁর শিক্ষকের পায়ের ধুলো নিলেন। কৃতী ছাত্রকে সুনীতিকুমার বুকে জড়ালেন, বসালেন পাশে। সুনীতিকুমারের চুল ছিল শাদাকালোয় মেশা।

সেদিন সুনীতিকুমার তাঁর বক্তৃতার শুরুতে সুন্দর আরবি উচ্চারণে তিলাওয়াত করলেন সুরা ‘আলাক।’ তিলাওয়াত শেষ হলে সম্পূর্ণ সুরাটি বাংলায় অনুবাদ করলেন। এবং আবার বললেন, ‘পড় তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন রক্তবিন্দু হতে।’ সুরাটিতে কেন প্রথম শব্দ ‘পড়’, দ্বিতীয় ‘তোমার’ এবং তৃতীয় শব্দ ‘প্রতিপালক’, তার ব্যাখ্যায় তিনি বললেন, ‘‘বিশেষভাবে লক্ষ্য করবার বিষয় প্রথম শব্দ ‘পড়’, দ্বিতীয় ‘তোমার’ এবং তৃতীয় শব্দ ‘প্রতিপালক’। আয়াতটি বলবার সময় প্রতিপালক ইচ্ছে করলেই বলতে পারতেন, ‘প্রতিপালকের নামে পড়। তা না করে প্রথম শব্দটি বললেন পড়। অর্থাৎ পড়লেই জ্ঞান অর্জন হবে, জীবন, জগৎ ও প্রতিপালককে বোঝা এবং চেনা যাবে’, ব’লে তাঁর সামনে বসা ছাত্রদের সুনীতিকুমার সুরায় বর্ণিত ‘পাঠ’, ‘শিক্ষা’, ‘কলম’ এই শব্দগুলির বিশেষ অর্থ বুঝতে বললেন। ব্যাখ্যাও করলেন।

ওঁর বক্তৃতা শোনার পর আমি এক নতুন ছাত্র হয়ে বের হলাম। পরে বন্ধুদের রসিকতা করে বলতাম, ‘আমি কিন্তু সুনীতিকুমারের ছাত্র।’  

বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজন শিক্ষকের ক্লাস কখনও বাদ দিইনি। তাঁরা হলেন ড. আহমদ শরীফ ও সৈয়দ আকরম হোসেন। চিন্তাকে বিশেষ অর্থে চিন্তাশীল করতে কী করতে হবে সে-বিষয়ে আমি কিছু শিখেছিলাম তাঁদের কাছ থেকে। আহমদ শরীফ প্রথম দিনের ক্লাসে বলেছিলেন : ‘আমি পড়াই একজন ভালো মানুষ তৈরি করবার জন্য।’ ভালো মানুষ হতে হলে কী কী পথ ও পন্থা গ্রহণ করতে হয়, তিনি বলেছিলেন। 

সৈয়দ আকরম হোসেন একদিন আমাকে তাঁর ঘরে ডেকে কিছু কথা বলবার পর বললেন, ‘যে-সব গ্রন্থ  যেমন উল্লেখযোগ্য সব ধর্মগ্রন্থ, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলা চিন্তা ও সভ্যতাবিকাশে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে, সেগুলো পড়লে, বোঝার চেষ্টা করলে, দেখবে নিজের চিন্তা একটি পথ খুঁজে পাচ্ছে। মেজর লেখকদের মেজর কাজ পড়লেই চলে। এসবের সঙ্গে সমকালে চিন্তার ক্ষেত্রে মেজর যা যা ঘটছে সেসব বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।’ 

আমি এখনও তাঁদের পরামর্শ মেনে চলি। তবে জানি না, কতখানি ভালো মানুষ হয়েছি, জ্ঞানের কতটুকু অর্জন করেছি। জ্ঞানকে প্রজ্ঞার স্তরে নিতে পেরেছি কিনা।

আশা করি এখানে বলা প্রাসঙ্গিক হবে, আমি নিয়মিত অভিধান ও ‘গীতবিতান’ পড়ি। যখন ঘরে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি, যেহেতু গাইতে পারি না, কণ্ঠস্বরে খড়কুটো আর বালির সংসার, গীতবিতান খুলে গানটি পড়তে থাকি। গানে ব্যবহৃত শব্দ সুরের সৌন্দর্যে বহুবিধ মাত্রায় অর্থের সীমা অতিক্রম করে। আমাকে ঋদ্ধ করে। চেতনাকে আলো দেখায়।

বেড়ে ওঠার সময়গুলোতে বাংলাদেশের কবি ও কথাসাহিত্যিকদের দেখা, সঙ্গ পাওয়া, কথা শোনা ছিল আনন্দপূর্ণ, শিক্ষাপূর্ণ। নিউ মার্কেটের ‘মণিকা’ নামের রেস্তোরাঁয় উচ্চকণ্ঠে কথা বলা ও রসিকতায় সদাদীপ্ত শহীদ কাদরী, ‘দৈনিক বাংলা’য় মৃদুভাষী শামসুর রাহমান, কোথাও দেখা হলেই কথা প্রসঙ্গে শামসুর রাহমানের নাম ঠিকভাবে উচ্চারণ না করা আল মাহমুদ, ‘সমকাল’ অফিসে রুচিশীল মৃদুভাষী হাসান হাফিজুর রহমান, বায়তুল মোকারমের ‘তাসমিন জুয়েলার্সে’ শাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা হাস্যময় ও আড্ডামুখী মাহমুদুল হক, কবিদের সংগঠন ‘পদাবলী’র কবিতা পাঠের প্রস্ততিপর্বে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর বাসায় রুচিশীল আড্ডা, ‘সন্ধানী’ অফিসে সুদর্শন বেলাল চৌধুরী, দীপ্ত দৃষ্টির কাইয়ুম চৌধুরী, বাংলা একাডেমি ও ‘সাপ্তাহিক রোববারে’ রফিক আজাদের প্রশ্রয়, একাডেমির মহাপরিচালক মনজুরে মওলার আমাকেসহ দশজন তরুণ কবির কবিতা পাঠের আয়োজন এবং কোনো কোনো জায়গায় শওকত ওসমান, এস. এম. সুলতান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মোহাম্মদ রফিক, আসাদ চৌধুরী, আহমদ ছফা, সিকদার আমিনুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, সমুদ্র গুপ্ত প্রমুখের কিছু কিছু সুন্দর সঙ্গ মনে করায়, তখন বাঁচাটা, কবি হতে চাওয়ার পথ তাঁদের সাহচর্যে দেখতে পাওয়া, স্বাস্থ্যময় ছিল।   

যে-সব সম্পাদক আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, বারবার লেখা ছেপেছেন, লেখা পছন্দ না হলে, ডেকে মিত্রস্বরে বলেছেন, ‘এর থেকে তুমি ভালো লেখ, আর একটি লেখা দাও’, তাঁরা হলেন : আহসান হাবীব (দৈনিক বাংলা), রফিক আজাদ (উত্তরাধিকার ও রোববার), বেলাল চৌধুরী (সন্ধানী) ও আবুল হাসনাত (সংবাদ)। আমার মনে পড়ে না তাঁরা বলেছেন, ‘অমনোনীত হয়েছে।’ ‘অমনোনীত’ শব্দটি বলেননি কেন? নিজেকে প্রশ্ন করে বুঝেছি, নেতিবাচক ব্যবহারে কাউকে এগিয়ে দেওয়া যায় না, সে-কারণে তাঁরা ওই শব্দ বলেননি।  স্বীকার করতেই হবে, শুধু আমার জন্যে নয়, সত্তর দশকে, যে-সব তরুণের মধ্যে কবি বা লেখক হবার সামান্য সম্ভাবনা ভালো সম্পাদকরা দেখেছেন, স্বাধীন দেশে এক নতুন লেখকগোষ্ঠী গড়ে তোলার জন্য তাঁরা সহযোগিতা করেছেন উদার মনে, উদার পরামর্শে।  

সম্পাদকের বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্যের একটি ঘটনার কথা বলি। কবি হায়াৎ মামুদ ‘প্রণোদনা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকাটি বের হতো একটি এনজিও থেকে। কয়েকটি সংখ্যা বের হওয়ার পর পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। শেষের দিকের একটি সংখ্যায় আমার কবিতা ছাপা হয়েছিল। একদিন সকালে নিচের তলার অফিসের পিয়ন আমার অফিসে এসে বললেন, ‘জাহিদ হায়দার নামে এখানে কেউ আছেন? উনার জন্যে একটা লোক আসছে।’ আমি নিচে যেয়ে দেখি হায়াৎ ভাই। আমি অবাকের রৌদ্রে উজ্জ্বল। হায়াৎ ভাই পকেট থেকে আমার কবিতার সম্মানী দিয়ে বললেন, ‘পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেল, তোমার লেখার সম্মানী।’ আমি বললাম, ‘ঠিকানা পেলেন কোথায়?’ ঠিকানা ছিল লেখার নিচে। তাঁকে বললাম,  ‘উপরে আসুন, চা খাই।’ তিনি খুব ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর চলে যাওয়া আমাকে বলে গেল, সম্পাদকের কর্তব্য-মাত্রার স্বরূপ কী।

১৯৮১-তে একটি সাহিত্য পত্রিকা আমরা করেছিলাম। নাম : বিপক্ষে। প্রকাশক ছিলেন মানিক চৌধুরী। সম্পাদনার দায়িত্ব ছিল গল্পকার আবু সাঈদ জুবেরী, আহমদ বশীর ও আমার। পত্রিকাটি তরুণ কবি ও কথাসাহিত্যিকদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। ছয়টি সংখ্যা বের হয়েছিল। অকালমৃত্যু কার ভালো লাগে? নিজেদের আলাদা কণ্ঠস্বর পাঠককে শোনাবার জন্য ছিল ওই প্রচেষ্টা।

বোধ হয় আপনাদের ভালো লাগতে পারে। আমাদের বাসায় ভাইবোনদের মধ্যে কীরকম রসিকতা হতো, তার দু-একটা বলি। কোনো কারণে দাউদ গালে হাত দিয়ে বসে আছে, মাকিদ বললেন, ‘সুকান্ত শোন।’ দাউদ উত্তর দিল, ‘ডাকছেন কেন ?’ যারা কবি সুকান্তের ওইরকম ছবি দেখেনি, তারা এই রস থেকে বঞ্চিত হবে।

ঢাকায়, মাদুরে বসে খাচ্ছি ভাইবোন। হয়তো আমি বললাম, ‘মাছটি বিভূতিভূষণের গ্রাম থেকে কেনা।’, হেনা আপা বলল, ‘মা তেঁতুল দিল মাটির গন্ধ গেল না।’ এই আপাকে বড় বোন ঝরনা আপা রসিকতা করে বলতেন, ‘দোহারপাড়ার সত্যজিৎ’। কে সত্যজিৎ, আমি জানতাম না। তখন পাবনায় থাকি। বার্ষিক পরীক্ষার শেষে, প্রতিবছর উঠোনে মঞ্চ তৈরি হতো। আপা রবীন্দ্রনাথের ‘সামান্য ক্ষতি’র পরিচালক। খড়ে আগুন লাগাবার দায়িত্ব পেয়ে আমি বড় অভিনেতা হয়ে উঠি। ‘বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা’ নাচ করি। চাচাতো বোন বিলকিসের গলায় মালা পরাতেই হেসে ফেলি। বড় সিঁড়িতে বসা দর্শকরাও হাসেন। ‘হাসলু ক্যা?’, মঞ্চেই বিলকিসের প্রশ্ন। আজও উত্তর দিইনি।

অনেক কথা হলো।  ক্ষমা করবেন।

অপমান আছে বলেই তোমার কাছে যাই

রচিতে রচনা কী কী শৈলী, শব্দসমবায়, বিষয়ের আশ্রয় নিয়েছি, ব্যবহার করেছি তা নিশ্চয়ই আমার লেখার পাঠকালে পাঠকের চোখে ও মানসে পড়বে, শোনার পর্বে কতটুকু পড়বে আমার অজানা। পড়া, পাঠ এবং অধ্যয়ন এই তিনটি শব্দের শেষ শব্দটি উচ্চারণ করা মাত্রই ধ্বনির সংঘাতে ধ্যান-চিত্রটি ধরা পড়তে পারে। কবিরা আবদার করেন, কবিতা পড়া একরকমের মন্ত্র পড়া। কেন মন্ত্র? বোধ হয় সেখানে কিছু জাদু আছে। 

আমার কয়েকটি কবিতা নিচে দিলাম। যদি কেউ পড়েন, আশা করি বুঝতে পারবেন, কতরকম মেজাজ বা বলবার পথ, জীবনের কথা আমি নির্মাণের চেষ্টা করেছি। চেষ্টার ভিত্তির উপরে যা দাঁড়িয়েছে তাকে যদি আবাস বা পরবাস বলে কারও মনে হয়, আমার শ্রম সার্থক হবে।  

প্রথমে প্রেমের কবিতা পড়ি। কেন প্রথমে প্রেমের কবিতা? আজও, এই যুদ্ধ ও সংঘাতলাঞ্ছিত পৃথিবীতে কিছু প্রেম ও ভালোবাসা আছে মনে হয়। তা না থাকলে মানুষ বাঁচতো না। প্রেম একইসঙ্গে আনন্দ ও কষ্ট ধারণ করে। সার্থক প্রেমের কবিতা লেখা কঠিনতম কাজ। প্রেম ও প্রেমের কবিতা নিয়ে অনেক কথা বলবার পর পাঠক বা শ্রোতা হয়তো মুগ্ধ হবেন কিন্তু মুগ্ধতার আপাত পর্ব শেষ হয়ে যাবার পর, হবেন অতৃপ্ত এক মানুষ। এই ঘরে যাঁরা আছেন তাঁদের অনেকের এইরকম অভিজ্ঞতা থাকবার কথা:

সামনে ছিল গঠনগত ভুল

সামনে ছিল সত্য গঠনগত,

দুটোর ভেতর বৃষ্টি ভাঙে সিঁড়ি

রাত্রি নামে দেখার মর্ম চিরে।

পরম্পরার বুনন সংকেতে

থমকে দাঁড়ায় তরফ-প্রবণতা।

কোথায় মুখ স্বপ্নতুল্য একা

কোথায় ঋণ শস্যহীন নত

বললে তোমার বিশদ পাবে ফিরে,

বললে আমার সুস্থ হবে ক্ষত।

কবিতাটির নাম কী হতে পারে? কেউ বলতে পারেন, ‘কোনো নামের দরকার নেই। নাম দিলেই নামের গরাদ বহন করতে হয়।’ একজন বলতে পারেন, ‘হ্যাঁ আমি তো বুঝতে পারছি, অনুভব করছি নিঃসঙ্গ একজন মানুষের সঙ্গ না পাওয়ার ছবি-কথা বলছে কবিতাটি। সে-জন নারী না পুরুষ তার উল্লেখও দরকার নেই।’ অন্য একজন বলতে পারেন, ‘আমার জীবনের পরাজয়ের কথা বলা হচ্ছে, বিরহের যন্ত্রণার কথা বলা হচ্ছে।’ কেউ বলতে পারেন, ‘কিছুই বুঝিনি, কী যে লেখে?’ শেষ পাঠকও আমার শ্রদ্ধার পাত্র। কারণ, তার সামান্য কিছু বুঝে ওঠার স্তরের কাছে আমার কবিতার ভাষা ব্যর্থ। ভাষাকে বিষয়ের সঙ্গে যথার্থ করবার শিক্ষা অর্জন করতে সামনের সুস্থ গাছটির দিকে তাকান, পাতায়, ডালে, শাখায়, বাকলে কোনো বাহুল্য নেই। কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের বাহুল্যতা আবর্জনা:  

সব কবিই একরকমের দস্যু

লুণ্ঠিত শব্দে ফোটায় গোলাপ।

কবিতা কি অভিশাপ?

বলো রত্নাকর।

কেন দেখেছিলে?

কেন ক্রোধে আগুনের ভাই?

তুমিও ঘাতক

দেখার বাইরে চলো যাই।

বাঁচার তিমির

গভীরের কোলাহল,

কারো না ফেরার মায়া

অভিশপ্ত করে

আগুনের কৃষি করে

তোলে বীজ, করে ছাই।  

সার্থক মিথুন নেই

আছে তীর।

আছে আর্তনাদ।

শবের ক্রৌঞ্চ জেনে গেছে

প্রেম নয়

মানুষ ব্যাধের সহোদর।

নিয়তি-অক্ষরে কবি কষ্টের রাখাল।

সবাই কমবেশি অভিশপ্ত, মনে হয়, কবি সবসময়ই কিছুটা বেশি। কবিতার শিরোনাম হতে পারে : ‘আত্মঘাতী অভিশাপ’, ‘কষ্ট’, ‘সুন্দরের ব্যর্থতা’, ‘প্রেম’; হতে পারে ‘দেখা অশান্তি পোষে?’ অনেকগুলো শিরোনাম বললাম।

কবিতায় ব্যবহৃত যথাশব্দের জন্য কবির দস্যুতা ইতিবাচক। যদিও বাল্মীকি সচেতন বিবেচনায় ওই উচ্চারণ করেননি। ক্রোধে উচ্চারিত হওয়া এক অভিশাপ-উক্তিকে আমরা কবিতা বলছি। যদিও ওই উচ্চারণ থেকে বিষাদের একটি আবহ পাওয়া যায়। অন্যভাবে বলা যায়, ষাট হাজার বছর তপস্যার ফলে তাঁর চিন্তাচেতনায় যে-মানবিক বোধ তৈরি হয়েছিল, তারই ফল ওই অভিশাপ-ঋদ্ধ উচ্চারণ। প্রশ্ন আসতে পারে, ‘প্রতিটি কবিতার পেছনে কি কোনো অভিশাপ আছে বা বিষাদ?’ এবং ওই অভিশাপ বা বিষাদ সুন্দর ও মান্য হয়ে জন্ম নেয় কোনো একটি প্রেক্ষিত থেকে। প্রেক্ষিত ওত পেতে থাকে। অথবা প্রেক্ষিতের মধ্যে কখনও সচেতন, কখনও না-বুঝে আমরা পড়ে যাই। প্রশ্ন আসতে পারে, সুন্দর কিছু দেখে এবং তার কথা কবিতা কি বলবে না? অবশ্যই বলবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, একটি অভাববোধ, মানে সুন্দরকে না পাবার অভাববোধ থেকেই সুন্দর বা সৌন্দর্য সম্পর্কে কবি কবিতা লেখেন। অভাব আছে বলেই ব্যথা আছে। ব্যথা আছে বলেই তার উচ্চারণ আছে। তা হলে কি আনন্দ আছে বলে কি তার উচ্চারণ নেই? অবশ্যই আছে।

তপস্যাকালে বলী¥কাবৃত হন রতœাকর (বল্মীক অর্থ উইঢিপি। রতœাকর আবৃত হয়েছিলেন উইঢিপিতে, সে জন্য তাঁর নাম হয় বাল্মীকি)। তমসা নদীর তীরে এক প্রেক্ষিতের মধ্যে তিনি পড়ে গেলেন, তাঁর চোখ দেখলো এক হত্যা। কে নয় ক্ষুধিত?  মিথুনরত ক্রৌঞ্চ-ক্রৌঞ্চী, ব্যাধ ও বাল্মীকি সবাই ক্ষুধিত। সবার মধ্যে নিরন্তর চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কে জয়ী হবে আর কে পরাজিত, তার দায় নির্ভর করে সামর্থ্যরে ওপর।    

উপরযুক্ত কবিতাটির শব্দ, বিষয়, দৃশ্য এবং অ-দৃশ্যের ব্যবচ্ছেদে গিয়ে অনেক কথার চড়াই-উতরাই পাওয়া যাবে, ভাবের সম্প্রসারণে কবির বলা ভাব বা কথা ঠিক আছে কিনা, তা পাঠক খুঁজতে পারেন কিন্তু তার আগে দেখতে হবে ওই শব্দ-সমবায় কবিতা কিনা। হয়তো কবি একটা কথা বা চিন্তার শব্দরূপ দেবার জন্য চেষ্টা করেছেন কিন্তু কবির দেওয়া চিন্তা বা মত বা দার্শনিকতা বিভিন্ন পাঠকের কাছে আলাদা আলাদা হয়ে যদি ধরা দেয়, প্রসন্ন-প্রশান্তি দেয়, নিঃসঙ্গতার দূরত্ব তৈরি করে, তার জন্য একটি গল্প বলে, তা হলে বুঝতে হবে, কবিতাটি সার্থক।

আমি কবিতাটি লেখার পর, দু’জনকে পড়ে শোনাই। পুরুষবন্ধু বলল, ‘পলিটিক্যাল কবিতা, বর্তমানের গুম, হত্যা, ধর্ষণ, সমাজে প্রেমহীনতা, মানুষের অসহায়ত্ব সবকিছু কবিতার আড়ালে উঠে এসেছে।’ আমার নারীবন্ধু বললেন, ‘এখনও আমার কথা তোমার মনে পড়ে?’ আমি দু’জন শ্রোতাকেই বলেছি, ‘ঠিক বুঝেছ।’ দুজনেই খুশি। পাঠ শেষে পাঠক যদি বলেন, ‘কবিতায় কী বলা হলো?’ প্রশ্নটি তোলা হলেই কবির উদ্দেশ্য সফল। বিধেয়তে ভাঙন হলে কবির সুখ।

পরবর্তী কবিতাগুলো সম্পর্কে কিছু বলবো না। আগের দুটি এবং নিচের কবিতাগুলো মিলিয়ে পড়লে আমার কবিতা কী বলতে চায়, আমি কীভাবে কী বলতে চাই, কী কী বিষয় আমার কবিতার আধারে জায়মান তার একটা পূর্ণ ছবি হয়তো পাওয়া যাবে। তখন হয়তো বলা যাবে, জাহিদের কবি-মানস কেমন:

আমি কেবল হাত তুলেছিলাম

আমি কেবল শূন্যতার মধ্যে হাত তুলেছিলাম,

চিৎকার ক’রে উঠলো আকাশ

মেঘেরা মেঘের নিঃশব্দ মিছিলে

অন্ধকারে ভরে দিল আমার পৃথিবী।

রেডিও, টিভি এবং বাসসকর্মীরা

দিনরাত মেতে রইলো

আমার হাত তোলা নিয়ে।

পৃথিবীর অন্যান্য সংবাদ-মাধ্যম

তড়িঘড়ি দৌড়ে এলো,

সৈনিকেরা কামান তুলে

এগিয়ে এলো আমার দিকে।

রাজনীতিবিদরা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন,

এই হাত কার কথা বলে?

অর্থনীতিবিদরা করলেন জরুরী বৈঠক,

এই হাত নামাতে বাজেটের কত খরচ হবে?

সাজবিদরা ডেকে বসলেন এক সেমিনার,

সমাজের কত অংশ

এই হাত দেখে বিভ্রান্ত হতে পারে?

সবাই নিজেদের প্রশ্ন করলেন,

মানুষটি হাত তুলেছে কেন?

হাতে কিছু ধরা আছে কি না,

সেখানে কিছু লেখা আছে কি না?

তার পেছনে আছে কি আর কোনো হাত?

মানুষের বিরুদ্ধে নয়

আমি কেবল ঘুম থেকে উঠে

আড়মোড়া এবং আলস্য ভাঙার জন্যে

শূন্যতার মধ্যে হাত তুলেছিলাম।

শূন্যস্থান পূরণ করো

‘কিছুই না ক’রে’

‘অনেক কিছু ক’রে’

‘শুধু একটি মুখ দেখে’

‘রাতদিন তাশ খেলে’

‘কেবল যুদ্ধ ক’রে’

‘কেবল নগ্নতা দেখে’

‘একটি শিশুকে চুমু খেয়ে’

‘বাড়ি খুঁজে খুঁজে’

উপরের যে কোনো একটি বাক্য নিয়ে

নিচের শূন্যস্থান পূরণ করো

এসেছিলাম ‘‘ ……………” চলে যাচ্ছি।

এই কবিতার নাম হতে পারে রফিক আজাদ

কবি কি নিয়ম ভাঙে?          হ্যাঁ কবি নিয়ম ভাঙে।

কবি কি নিয়ম মানে?           হ্যাঁ কবি নিয়ম মানে।

তবে কবি দাঁড়ায় কেন         বিপরীত, মেঘের পাশে?

তবে কবি চড়ে কেন             গুণটানা নৌকা ’পরে?

কবি কি ভালোবাসে              যা কিছু উল্টো খেলা?

কবি কি শব্দ খোঁজে               যেখানে জীবন বাঁচে?

কবিকে প্রশ্ন করো,                              কেন সে এত দ্যাখে?

চোখ দুটো অন্ধ হবে              রোদ কি রাখবে পাশে?

এমনই কবির খেলা               সুখ তার ব্যবচ্ছেদে,

বসবাস করবে সে কি           উড়ন্ত দৃশ্য-ঘরে?

ভালোবাসা পেলে কবি          অগ্নিপথে হাঁটে

আজীবন একা একা               জোড়া দেয় পাপড়ি-ঝরা।

কোথা সে শান্তি পাবে,           কে দেবে ঋদ্ধ স্বপন?

ভাঙে সে আঁধার আলো        চুষে খায় নিজের ক্ষরণ।

কবি কি ছন্দে থাকে?            অ-ছন্দে কোথায় থাকে?

প্রশ্নমুখর, স্বপ্নবিধুর

কবিতা না পড়া মানুষরা কেন ভালো থাকে বেশি?

যারা প্রশ্নপত্র ছাপায় তারা কী রকম স্বপ্ন দ্যাখে?

একদল ভিখারির সাথে সুশীলসমাজ কী নিয়ে কথা বলছে?

একজন যৌনকর্মীর কাছেই পড়া যেতে পারে মানুষের শ্রম-ইতিহাস।

পাখি বিক্রেতার সাথে ট্রাফিক হাসছে কেন?

জেলরক্ষীর গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে ফাঁসির কয়েদি

বলেছিল : ‘আমি বাঁচতে চাই।’

দেবদূত ও শয়তান একই মঞ্চে গাইছে গান,

দুজনই দেবীর রাখাল।

জানি, বসন্তকাল বাগান থেকে শহরে আসতে পায় না ঋতুর ট্রেন।

আমরা সবাই প্রশ্নমুখর, স্বপ্নবিধুর, রাত্রিজাগা।

ঘুম বিষয়ে গবেষণার রিপোর্ট 

রাত্রির বৃষ্টিরা কারও কারও ঘুম ভেঙে দেয়। ঘুমেরা সমাজের সকল স্তরে মেঘের স্বাধীনতা নিয়ে চলাচল করে। ঘুমেদের মধ্যেও দেখা যায় শ্রেণিভাগ। রাজা আর কৃষকের ঘুমের পার্থক্য জানেন অর্থনীতিবিদ। আছে এক শীতমেশা ঘুম, যার কাছে সবাই শ্রেণিহীন।

ঘুমের চেহারা কুমারীর চোখে নীল  জামা পরা তরুণের চোখের মতন। স্বর্ণ-ব্যবসায়ীর চোখে রুপার বাক্সে ভরা গহনার মতন। ঘুমের চেহারা নিয়ে গরিবেরা কখনও ভাবে না, সময় নেই, তাদের কাছে সত্য শুধু শ্রম। এইসব ভাবনায় মুগ্ধ ঘুম-বিজ্ঞানের অলস পণ্ডিতগণ।

ঘুমের শরীর এক ঠাণ্ডা ছায়ার জাতক। ঘুম হালকা সমতল এক কাচের বোন। একরকম ঘুম আছে কঠিন এক পাথরের প্রতিমা। মানুষের আবিষ্কৃত কোনো বিজ্ঞান ওই ঘুমের রূপ আজও ভাঙতে পারে নাই। 

ঘুম ভেঙে যেতে পারে স্বপ্নের অত্যাচারে। কড়া নাড়ার শব্দে। হঠাৎ আসা যে-কোনো আওয়াজে। শিশুর কান্নায়। টিভির সংবাদ-পাঠে। তোমার আতঙ্কময় কণ্ঠস্বরে। স্বপ্নদোষে আর প্রচ- ক্ষুধায়।

ঘুম ভেঙে যায়। ওই ভাঙনের শব্দ আমরা কক্ষনো শুনি নাই।  শব্দহীন শব্দ কেবল মৃত্যুমুখী মানুষেরা শোনে। আর সম্ভবত শুনেছিলেন শিশিরের শব্দ শোনা জীবনানন্দের সজাগ-ঝিমিকি কান। ঘুম ভেঙে যাবার সময় নিশ্চয়ই ভোরের জেগে ওঠার মতো শব্দ হয়, না হলে চোখ জেগে ওঠে কেন ? ওই ভাঙনের আর্তনাদ শুনে জোছনারাত জেগে ওঠে বকুলতলায়। কখন ঝরবে ফুল, কুমারী হাত কুড়াবে বকুল।

ঘুমের বাহন হতে পারে একটি উত্তেজিত আলিঙ্গন। হতে পারে মায়ের হাতে কপাল নেড়ে দেওয়া।  অথবা বিষ মাখানো একটি আলপিন অথবা একটি কার্তুজ। আছে অনেক সূচনা, হয়তো তাদের পাওয়া যাবে কোনো জাদুঘরে। আর এক ক্লান্তি, যার চোখ কেবল দেখে ঝিমানো পারাবত। 

ঘুমের এক পরী আছে। ঘুমের রাজকন্যা সে। ঘুমের এক গরিব মাসিপিসি আছে, যাকে পিঁড়িতে বসতে দেওয়া হয়, এরকম রূপকথা জানে নবীন মাতৃকুল। পরী আর মাসিপিসিকে কোনোদিন কোনো মাতা চোখে দেখে নাই। কেবল শিশুরা তাদের দেখে ঘুম আসবার মুহূর্তে। শাদা, নাকি কালো, নাকি নীল একশ’ ডানার পরী, চোখেমুখে এক স্নিগ্ধ হাসি, পরম আত্মীয়, পরম আপন, ঠিক পাশে শোয়া মায়ের প্রতিরূপ।

ঘুমেদের কোনো বাড়ি নেই। বাসা নেই। বাসা ভাড়া দেবার কোনো ঝামেলা নেই। দিতে হয় না পানি, গ্যাস আর বিদ্যুতের বিল। ঘুম কোনো ফোন ব্যবহার করে না। ঘুম বাতাসের মতো সর্বত্র বিরাজমান। ঘুমের আসন কেবল চোখের বিছানা নয়। ঘুমিয়ে পড়া হাত, ঘুমিয়ে পড়া নদী, ঘুমিয়ে পড়া ‘না’ কত দেখিয়াছি।

ঘুম মেঘের সাথে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। ঘুম ঘুমিয়ে গেলে জেগে থাকে সবাই। ঘুম জেগে থাকলে ঘুমিয়ে পড়ে সকল প্রাণী আর লজ্জাবতীর দল। ঘুমের বয়স কত? প্রাণের বয়স যত। ঘুমের সুন্দর আবাসনে স্বপ্ন বেড়াতে আসে, বলে যায় জীবনঘেঁষা গল্প প্রতীকে, চিত্রকল্পে, প্রতিচ্ছায়ায়। 

ঘুমেরও অভিমান আছে। কারও কারও কাছে শত শত রাতেও আসে না। ঘুমের অষুধে যে-ঘুম থাকে তার নাম অসুখ। ওই ঘুম ঘুমের সতীন।

ঘুম রাত্রিতে চলাফেরা নিরাপদ মনে করে। তবে সামরিক অভ্যুত্থানে রক্তাক্ত দেশগুলোর রাত ঘুমের চলাফেরার জন্যে নিরাপদ নয়। খুব ভয়ে আর আতঙ্কে পা টিপে হাঁটে।

ঘুম নিয়ে গল্প, উপন্যাস অথবা কবিতা লেখা একদম উচিত নয়। জলরং ছবি আঁকা যেতে পারে।

গবেষণার ফলাফল বলে : ঘুম এক সুন্দর রহস্য, শাদা-কালো-বিবর্ণ কুয়াশার মধ্যে হেঁটে যাওয়া, হামাগুড়ি দিয়ে যাওয়া, গড়িয়ে গড়িয়ে চলা এক শান্ত চোখ, সকলকে সাদরে আশ্রয় দেয়, সেবা করে, টাকাপয়সা নেয় না।

এই রিপোর্ট পড়তে পড়তে কারও ঘুম পেয়ে যেতে পারে। কেন না তৃতীয় বিশ্বের জন্য এটা একটা উন্নয়ন রিপোর্ট। এবং আমার ঘুম পাচ্ছে এখন।

SOME NOTES FOR YOU

কোথায়  যেন আমাদের আর adjust হচ্ছে না।

সেই কোথায়টা যে কোথায়, কেউ বলতে পারছে না।

Perhaps I am living on the edge of a scary light !

মনে করো না আমি drug  নিয়েছি

ও-সব আর ভালো লাগছে না।

Swear, never I would take Yaba again

Trust me, live together boring লাগছে

continue তোমার সাথে আমি আর continue করবো  না।

ভেব না, তোমার বন্ধু ইফতির সাথে আমার কিছু হবে।

যদিও সেই রাত্রির party-তে ওর hug খুব sexy ছিল।

কিছুদিন একা থাকতে চাই

পুরুষের সঙ্গ ভালো লাগছে না।

তুমি জানো আমি কিন্তু lesbian নই।

I hate that.

মনে পড়ছে, যোগাযোগহীনতার মধ্যে এক বৃষ্টির দিনে

তোমাকে দেখে Crush খেয়েছিলাম।  

তুমি ছিলে অন্য টেবিলে।

মুখে ছিল নরম Pizza, সামনে black coffee.

তোমার গায়ে ছিল Che-র বিখ্যাত ছবির sexy T-shirt.

Color ছিল blue, আমার প্রিয় রং।

মনে হয়, Che-র soul এই business ঘৃণা করে।

যারা পরে তারা তাঁর পথে নেই।

আমার বান্ধবী তোমার চোখ দেখে বলেছিল,

Not bad, he could manage your tidal wave.

আমরা তোমাকে Hi বলেছিলাম।

তুমি সুন্দর smile দিয়েছিলে।

কানে ছিল I-pod.

পরে বলেছিলে, তখন শুনছিলে Bob Dilan.

আজকাল স্বপ্নেরাও আমাকে rape করে।

নদী ছাড়া পাড় উঠে আসে আমার চারদিক।

ঝরা পাতা শুধু আমার উপরেই পড়ে।

সবকিছুকে fuck’n shit মনে হয়।

Am I fucking my identity? What is that?

আমি অনেকদিন sun rise দেখিনি।

মনে পড়ছে, একরাতে আমাদের fleshy romance শেষে

আমরা memory game খেলেছিলাম।

আমাদের মধ্যে তখন বেড়ে যাচ্ছিল প্রশ্ন-প্রবণতা;

Floccinaucinihilipilification meaning  কী?

English Dictionary র সবচেয়ে বড় শব্দ।

তুমি জানতে কিন্তু ভুলে গিয়েছিলে।

আমরা একমত হয়েছিলাম,

সবকিছুকে তুচ্ছ করবার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে।

হেসে বলেছিলাম, memory বাড়াও, terabite করো।

তুমি হেসে অনেক love bite দিয়েছিলে।

আমার এই notes facebook-এ দেব।

Friend-রা ফাটাফাটি খুশি হবে।

আজ সকালে আমি more than hundred times লিখেছি

আর কেটেছি adjust & compromise

সেই doodle থেকে বের হলো তোমার আমার অচেনা মুখ।

After that I have broken our mirror.

তুমি জান, অনেকবার ওই আয়নার সামনে

We had been lovely savage.

ভেঙে পড়তে থাকা কাচগুলির সাথে খ’সে পড়ছিল আমার চোখ,

আমার moony breast, my heart and hip,

I think my dream  and memory even.

বোধগুলি

আমাদের মধ্যে আছে নদীবোধ, পাড়ভাঙাবোধ;

কারো মধ্যে কেবল আঁধার নামে, জাগে দুঃখবোধ।

কেউ যায় পড়শীর ঘরে দিতে পুষ্পবোধ।

বোধের মৈত্রী হলে মানুষ কাঁদবে না।

কৃষিজীবী নারীর প্রেম-ভাষা

তুমারে না দেখলি আমার মুখে জইমে ওঠে লাল শাকের রং,

দুই চোক্ষে শর্ষেদানা, কালা চিটা ধান।

তুমার ছুঁয়ায় হইয়া যাই ফুইলে উঠা চিতই পিঠা,

হাতের তাপে খেজুর রসের গরম টগবগ।

চৈতমাসে তাল পাখা নিয়া

তুমার শিথানে বইসে ডাকি বইচি ফল আমার।

তুমারে ভালোবাসি পাকা ধানের খ্যাতের মতন,

বাতাস বইয়া যায় সোনার ঝালর দিয়া কপালে আমার।

তুমারে ভালোবাসি ধান-সিদ্ধ বাসের মতন।

যহন বিহানবেলা লাঙ্গল কাঁধে যাও খ্যাতের কামে,

মাথায় বান্ধা লাল গামছা আমার সূর্য হইয়া যায়।

আমার জুয়ান যায়,  আমার গরম ভাত যায়।

লাওফুল আমার ভাব দেইখা বাতাসের অঙ্গে সঙ্গে দোলে।

বিদায়-গাথা

বিদায় চিত্রিত, প্রতিধ্বনিময় বোধের নির্মাতা।

গোলাপ পড়ে আছে রোদের চুল্লিতে

স্পর্শ কাঁপছে মলিন পাপড়িতে

যত্নহীন ক্ষণ কষ্টে সংবৃত।

পাল্লা ঝাপটায়, কই সে গৃহী কই।

বৃষ্টিভেজা ঘরে শালিক একাকী

মৃত প্রেমিকার না-ওড়া ঢেকে রাখে পীড়িত পালকে

আকাশ আবৃত ভেড়ার পশমে।

বিদায় চোখ তুলে দেখছে তাজা ঘাস

ঊর্মি-কাহিনি পড়ছে ভাঙা পাড়

পাতারা ঝরে পড়ে বিনয়মাত্রায়।

ট্রেন ধরবো না আজকে সন্ধ্যায়।

নদীতীর তাকে রাখো

কবি জেগেছিল আগুনের রাতে

জেগে থাকে কবি শীতে,

পুড়েছিল চোখ দেখার পালক

বিষণ্ন প্রাণ একা,

গিয়েছিল কবি শান্তি-নদীর কাছে।

কবি দেখেছিল বিরতির পায় ঊর্মিশর্ত দ্বিধা

আকাশে বিছানো মলিন কাঁথা শ্রাবণগগন।

তৃষামর্মরে জেগে থাকে কবি

নদীতীর তাকে রাখো,

চলমানগুলি সামাজিক

নাকি অবিবেক?

কবিতার খ-কালীন পাঠ সরস্বতী পছন্দ করেন না। তবে, কবিতা যত না পড়া যায়, তত ভালো থাকা যায়। বাল্মীকির সেই আর্তনাদপূর্ণ অনুষ্টুপ-বাক্য মনে রাখুন। যা আদি কবিতা নামে খ্যাত:

‘‘মা নিষাদ ! প্রতিষ্ঠাং স্ত¡মগমঃ শাশ্বতী সমাঃ

যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্।’’

অর্থাৎ, ‘‘হে নিষাদ ! কামক্রীড়ারত ক্রৌঞ্চমিথুনের ক্রৌঞ্চকে তুই যে হত্যা করলি তার জন্য তুই জীবনে কোনোদিন প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারবি না।’’

 প্রাসঙ্গিক হবে আশা করি। ষাট হাজার বছরব্যাপী তপস্যার শেষে একদিন অযোধ্যার দক্ষিণে অরণ্যমধ্যে তমসা নদীতীরে ভরদ্বাজের সঙ্গে ভদ্রলোক (তখন আর দস্যু নন) বাল্মীকি ভ্রমণ করছিলেন। তখন ওই কষ্টদায়ক ঘটনা ঘটে। এবং ঘটনাটি বিখ্যাত হলো, বাল্মীকির ছন্দবদ্ধ উচ্চারণে। ব্যাধের শরাঘাতে ক্রৌঞ্চের মৃত্যুতে ক্রৌঞ্চী করুণসুরে বিলাপ করতে থাকে। প্রেমের বাস্তবরূপের মৃত্যু হলো? প্রেমিকের জন্য প্রেমিকার কষ্ট। এই দৃশ্য দেখে শোকে আক্রান্ত বাল্মীকির কণ্ঠ থেকে হঠাৎ ওই অভিশাপপূর্ণ শ্লোক উচ্চারিত।

নিম্নরেখায় চিহ্নিত অংশ দুটি আমাকে ভাবায়। তপস্যাকালে শুদ্ধ হওয়ার জন্য বলা মন্ত্র এবং জীবনের, সমাজের, শূন্যতার ন্যায়-অন্যায়ের সঙ্গে তর্ক ও নিজ-অস্তি¡তের জিজ্ঞাসা, দস্যু রতœাকরকে কবি বাল্মীকি হতে সহযোগিতা করেছে। কবি হতে তপস্যা করতে হয়। ‘তমসা নদীতীরে’, অর্থাৎ বহমান অন্ধকারের তীরে কবি হাঁটছেন। খুবই ইঙ্গিতবহ ওই অন্ধকার। তখন হত্যা ও ক্রৌঞ্চীর করুণস্বর এবং বাল্মীকির উচ্চারণ। যা অভিশাপ, এবং বিষাদ, কবিতা বলে মান্য। এবং নিজেই তিনি অবাক। উচ্চারিত পঙ্ক্তি কি চেতনাকে আলো না অন্ধকার দিল? পরে তিনি রামায়ণের অথর।  

অর্থবহ মৃত্যু যোগ্যতা দাবি করে। আমি জানি না, আমার কবিতার মান আমার শারীরিক মৃত্যুর অনেক পরে উত্তরাধিকারের বিবেচনার ব্যবচ্ছেদে আমাকে প্রতিষ্ঠা দেবে কি না।

সকলের কল্যাণ হোক। 

বৈশাখ-আষাঢ়, ১৪২৫। ঢাকা

*আমি কবিকে বাংলাদেশে আসবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। 

**জিষ্ণু দে, বিষ্ণু দে’র পুত্র।

***পুনশ্চ : কোনো কোনো স্তবকের মধ্যে ও  শেষে উদ্ধৃত কাব্য-পঙ্ক্তি আমার।

[১৯.০৭.২০১৮ তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ আয়োজিত সেমিনারে ‘কেন লিখি, কীভাবে লিখি’ শীর্ষক প্রদত্ত বক্তৃতা]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Pinterest
Instagram