অপূর্ব শর্মা ও তাঁর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা

মিহিরকান্তি চৌধুরী

নবপ্রজন্মের সাহসী দেশপ্রেমিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক অপূর্ব শর্মা। প্রায় দুই দশক ধরে নির্ভীক সাংবাদিকতার সাথে নিজেকে জড়িত করে অনেক ব্যতিক্রমধর্মী কাজ করেছেন, লিখেছেন বেশ কিছু গ্রন্থ, যার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থগুলো বিশিষ্ট। তিনি ধাপে ধাপে নিজের লেখনীর মানোন্নয়ন ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ, কম চর্চিত ও অচর্চিত বিষয় ও ভাবনার দ্বারা জাতিকে, অঞ্চলকে এবং মুক্তিযুদ্ধ ঘরানা চিন্তাধারাকে প্রতিনিয়তই উজ্জীবিত করে যাচ্ছেন, অনুপ্রাণিত হচ্ছেন নিজেও।

তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে তাঁর সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও অন্যায়ের সাথে আপোস না করার মানসিকতা। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সাহসিকতার সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর কাজ। অত্যাচার, নির্যাতন, জেল-জুলুমÑ সবই হয়ে গেছে তার ৩৯ বছরের জীবনে। ওয়ান ইলেভেনের সময় পাঁচ মাস তিনি কারান্তরীণ ছিলেন। মিথ্যা সাক্ষীর বিনিময়ে ছাড়া পেতে রাজি হননি, রেহাই নেননি। টেনেছেন জেলের ঘানি এবং তা অসাধারণ সাহসিকতার সাথে।  

প্রতিবাদ করার মাধ্যম হিসেবেই সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়েছেন অপূর্ব শর্মা। ১৯৯৮ সালে যুক্ত হন সাংবাদিকতার সাথে। মৌলভিবাজার থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পাতাকুঁড়ির দেশ পত্রিকার আঞ্চলিক সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় তার। একই সময়ে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যুক্ত হন শ্রীমঙ্গল থেকে প্রকাশিত দৈনিক খোলাচিঠি পত্রিকার সাথে। ১৯৯৯ সালের শেষ দিকে জাতীয় দৈনিক প্রভাত বেলার শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ২০০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে যোগ দেন শ্রীমঙ্গল থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক শ্রীভূমি পত্রিকার বার্তা সম্পাদক হিসেবে। পাশাপাশি সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তাবাহক পত্রিকার শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন প্রায় এক বছর। দৈনিক ‘যুগান্তর’ পত্রিকা বের হলে এর শুরু থেকে ২০০১ সালের জুলাই পর্যন্ত পালন করেন শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধির দায়িত্ব।

২০০১ সালের আগস্ট মাসে তিনি সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক যুগভেরী পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক পদে উন্নীত হন। যুগভেরীতে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লেখার জন্য চক্ষুশূলে পরিণত হন তিনি একটি বিশেষ মহলের। ২০০৪ সালে দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকায় যোগদান করেন। ২০০৫ সাল থেকে বন্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আজকের কাগজের সিলেট অফিসের ব্যুরো চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়াও সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ, সাপ্তাহিক ২০০০-এর বিভাগীয় প্রতিনিধি এবং নিউজ বাংলাদেশ ডটকমের ব্যুরো চিফের দায়িত্ব পালন করেছেন দক্ষতার সাথে। অনলাইন দৈনিক ‘শীর্ষ নিউজ’-এ ব্যুরো চিফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনে তিনি অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন তবে তিনি বিচলিত হননি। বরং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দিয়ে তিনি নানা স্তরের, নানা মাত্রার নাশকতাকারীদের স্বরূপ সন্ধানে ব্রতী হন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, রাজাকারদের বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, লেখনী চালিয়ে তিনি প্রশংসিত হন। নতুন প্রজন্ম অদেখা-অজানা মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ সহজ, সরল ও সাবলীল ভাষায় পড়তে শুরু করে, শুরু করে জানতে। সাংবাদিকতার প্রথম কয়েক বছরে তিনি রাজাকারদের ও জঙ্গিবাদবিরোধী, দুর্নীতিবিরোধী ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি ঘটনা কভার করেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার অপূর্ব শর্মার কলম। ২০০৯ সালে সিলেট অঞ্চলের রাজাকারদের খুঁজে বের করে দৈনিক যুগভেরীতেÑ ধারাবাহিকভাবে লেখেন ‘তুই রাজাকার’ সিরিজ। এতে অনেক যুদ্ধাপরাধীর স্বরূপ উন্মোচিত হয়। এরপর থেকে অনেকটা ধারাবাহিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধের চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস অনুসন্ধান করে চলেছেন।

দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় এ পর্যন্ত প্রকাশিত তার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক রিপোর্ট ও প্রতিবেদনের সংখ্যা দুই শতাধিক। দৈনিক যুগভেরী পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তার সাড়া জাগানো শতাধিক প্রতিবেদন। উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে রয়েছে জগৎজ্যোতি, বীরাঙ্গনা কথা, মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী, অস্তিত্ব সংকটে বধ্যভূমি, ওরা ফিরে আসেনি, সিলেটে যুদ্ধাপরাধ, চা বাগানে গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া মুখ ইত্যাদি।

সাংবাদিকতা এবং লেখালেখি উভয় ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বীকৃতিও পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণায় ২০১০ সালে তিনি লাভ করেছেন এইচএসবিসি কালি ও কলম তরুণ লেখক পুরস্কার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ২০১৩ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রবর্তিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাংবাদিকতায় বজলুর রহমান স্মৃতিপদক লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদন গ্রন্থে তার ১৫টি প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়।

এ পর্যন্ত তার লেখা ১৪টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা ৮টি। তার লেখা গ্রন্থগুলো হচ্ছে, ১. অনন্য মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি (বইমেলা ২০০৯), সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ২. সিলেটে যুদ্ধাপরাধ ও প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র (বইমেলা ২০১০) ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ, ঢাকা, ৩. বিপ্লবী অসিত ভট্টাচার্য (বইমেলা ২০১০) ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ, ঢাকা, ৪. মুক্তিপথের অভিযাত্রী আমীনূর রশীদ চৌধুরী (বইমেলা ২০১১) সাহিত্যপ্রকাশ, ঢাকা, ৫. অভিজাত গণতন্ত্রী আব্দুর রশীদ চৌধুরী (বইমেলা ২০১১) সাহিত্যপ্রকাশ, ঢাকা, ৬. বীরাঙ্গনা-কথা (বইমেলা ২০১৩) সাহিত্যপ্রকাশ, ঢাকা, ৭. মুক্তিযুদ্ধের এক অসমাপ্ত অধ্যায় : ফিরে আসেনি ওরা (বইমেলা ২০১৩), গদ্যপদ্য, ঢাকা, ৮. মুক্তিসংগ্রামে নারী (বইমেলা ২০১৪), শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ৯. সাহিত্য সংস্কৃতি ও অন্যান্য (বইমেলা ২০১৬) হাওর প্রকাশন, সিলেট, ১০. মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর (বইমেলা ২০১৬), নাগরী প্রকাশন, সিলেট, ১১. সুরশব্দের ধ্রুবতারা (বইমেলা ২০১৬), হাওর প্রকাশন, সিলেট, ১২. চা-বাগানে গণহত্যা : ১৯৭১ (বইমেলা ২০১৬), সাহিত্যপ্রকাশ, ঢাকা, মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস, সিলেট জেলা।

অপূর্ব শর্মার গবেষণা ও সাংবাদিকতার বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এই অর্জনের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরাই তার প্রত্যয়। সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও গবেষণার পাশাপাশি সম্পাদনায়ও তিনি সিদ্ধহস্ত। প্রবন্ধগ্রন্থ, সাহিত্য পত্রিকা, স্মারকসংখ্যা, সম্মাননাগ্রন্থ মিলিয়ে এ পর্যন্ত তাঁর সম্পাদনার সংখ্যা ১৫টি। বর্তমানে দৈনিক যুগভেরীর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত থাকা ছাড়াও তিনি সাহিত্য পত্রিকা অভিমত সম্পাদনা করেন।  

অনন্য মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি

২০০৯ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থ মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ এলাকার দাস পার্টির সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাসকে নিয়ে। ‘অনন্য মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি’ গ্রন্থটি যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা পায়। অনেকগুলো পাঠ প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন সাময়িকী ও দৈনিকে স্থান পায় :

১.            কোন আকাশের তারা, দ্বিজেন শর্মা, কালের খেয়া, দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর ২০০৯

২.            সুন্দর নাম : জগৎজ্যোতি, দিলওয়ার, দৈনিক যুগভেরী, ২৪ এপ্রিল ২০০৯

৩.           এক দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধার কাহিনী, প্রফেসর আবদুল আজিজ, ২০০৯

৪.            অনন্য মুক্তিরযোদ্ধা জগৎজ্যোতি ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা, শেখ ফজলে এলাহী, ২০০৯

৫.            জগজ্জ্যোতি জগৎজ্যোতি, নন্দলাল শর্মা, নানা বই নানা কথা, ঘাস প্রকাশন সিলেট, ২০১০

৬.           জগৎজ্যোতি, বিস্মৃতপ্রায় বীরমুক্তিযোদ্ধা, ছুটির দিনে, প্রথম আলো, ৭ মার্চ ২০০৯

জগৎজ্যোতি দাস সম্মুখ সমরে বীরত্বের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রথম বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি লাভ করেন। পরে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। বীরশ্রেষ্ঠ শুধুমাত্র নিয়মিত বাহিনীতে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। তবে জগৎজ্যোতিকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি দিয়েও প্রত্যাহারে সুশীল সমাজসহ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সাধারণ জনগণও বিস্মিত হয়েছিলেন। বীরশ্রেষ্ঠ উপাধির পরিবর্তে জগৎজ্যোতিকে ‘বীরবিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে এবং স্বাধীনতা লাভের প্রায় দুই যুগ পরে তা প্রদান করা হয়েছে। বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও লেখক দ্বিজেন শর্মা জগৎজ্যোতিকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হয়নি বলেই মনে করেন :

‘…জগৎজ্যোতিকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হয়নিÑ এ অভিযোগ অনেকের। মানুষের বিচার প্রায়শ ত্রুটিপূর্ণ হলেও ইতিহাসের বিচার সর্বদাই অভ্রান্ত। সন্দেহ নেই, জগৎজ্যোতি জনস্মৃতিতে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন। তাকে নিয়ে ইতিমধ্যেই লেখা হয়েছে দুটি বই ও অনেকগুলো প্রবন্ধ…।’

দৈনিক সমকালের কালের খেয়া ম্যাগাজিনে ‘কোন আকাশের তারা’ শীর্ষক আলোচনায় দ্বিজেন শর্মা… জগৎজ্যোতির অসীম সাহসিকতা ও তীক্ষè বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গ গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন :

‘…জগৎজ্যোতি দাস এক অনন্য মুক্তিযোদ্ধার নাম। বিস্ময়-জাগানিয়া এই তরুণ অসীম সাহসিকতা ও তীক্ষè বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে পাকবাহিনীর ত্রাসে পরিণত হয়েছিলেন।… তিনি হয়ে উঠেছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তী। ১৬ নভেম্বর ১৯৭১ এক অসম অথচ অসীম সাহসীযুদ্ধে জীবন বিসর্জন দিলেন জগৎজ্যোতি। পরম যতœ ও নিষ্ঠার সঙ্গে জগৎজ্যোতির সংগ্রামী জীবন ও সাহসিক যুদ্ধাভিযানের সবিস্তার বিবরণ সংগ্রহ করেছেন অপূর্ব শর্মা…।’

কবি দিলওয়ার সম্মুখ সমরে প্রদর্শিত জগৎজ্যোতি দাসের বীরত্বের প্রসঙ্গে অপূর্ব শর্মার উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন : 

‘… অপূর্ব শর্মা এই ভাটির যোদ্ধার জীবন ও যুদ্ধের নানা দিক যেভাবে তুলে এনেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবীদার। এক্ষেত্রে এই অনুজ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে সাহিত্যের ছোঁয়ায় যেভাবে বইটির বর্ণবিন্যাস করেছেন সাংবাদিক শর্মা তাতে বইটি শুধু সুখপাঠ্যই হয়নি, গবেষণা ক্ষেত্রেও যুক্ত হয়েছে এক নতুন মাত্রা।

বইটি পড়ে সবচে বেশি যে বিষয়টি উপলব্ধি করেছি তা হচ্ছেÑ উপেক্ষা। দুঃসাহসিক এই মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধ দিনের অবদান এতদিন অন্তরালে থাকায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই অসম্পূর্ণ ছিল! মেঘে ঢাকা ছিল একজন বীরের বীরত্বগাথা। লেখক পরম মমতায় তা তুলে এনে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন …।’ 

অধ্যাপক মো. আবদুল আজিজ অধিনায়ক জগৎজ্যোতির অধীনে দাস পার্টি যে বীরবিক্রমে হানাদার বাহিনীকে নাজেহাল করে চলত, তার উল্লেখ করেছেন। জগৎজ্যোতিকে তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। দুর্ধর্ষ অপারেশন চালাতে গিয়ে জগৎজ্যোতি কখনও প্রচলিত যুদ্ধকৌশল যে মেনে চলতেন না, অবস্থা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতেন এবং সফলও হতেন, সে বিষয়গুলো ভাষাসৈনিক অধ্যাপক মো. আবদুল আজিজকে উৎসাহিত করে। তিনিও যুদ্ধক্ষেত্রে জগৎজ্যোতি দাসের বীরত্বের কথা প্রকাশনার মাধ্যমে পাঠক ও জনগণের কাছে তুলে ধরা প্রসঙ্গে অপূর্ব শর্মার উদ্যোগের প্রশংসা করেন :

… অপূর্ব শর্মা পরম মমতায় তুলে ধরেছেন জগৎজ্যোতির একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠার কাহিনী-তার বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণের কলাকৌশল ও অবিস্মরণীয় বীরত্বগাথা। তিনি জ্যোতির সহপাঠী ও সহযোদ্ধাদের নিকট থেকে সংগ্রহ করেছেন বিস্তৃত তথ্যরাজি। এর মাধ্যমে আমরা সুযোগ পেয়েছি এক দেশপ্রেমিক ও দায়বদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার সাথে পরিচিত হতে। জ্যোতি শুধু অদম্য যোদ্ধাই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ব্যক্তিত্ব যিনি কখনও কোনো অন্যায়ের সাথে আপোস করতেন না। চোখের সামনে কাউকে কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত দেখলে জ্যোতি নিজেই তার শাস্তি বিধান করতেন। আর সেজন্য তাকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার দ- ভোগও করতে হয়েছে একাধিকবার…।

শেখ ফজলে এলাহী ‘অনন্য মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় এই গ্রন্থের অনেক বিষয়ের চুলচেরা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, কোনো খেতাবের লোভে জগৎজ্যোতি মুক্তিযুদ্ধ করেননি বা নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেননি। তিনি যা করেছেন তা দেশের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য। তবে যারা আমাদের জীবনকে স্বাধীন ও নিরাপদ করার জন্য জীবনদান করেছেন, তাদের স্বীকৃতিদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জগৎজ্যোতির স্বীকৃতি ও তাঁর বীরত্বগাথাকে জনগণের সম্মুখে তুলে আনার জন্য অপূর্ব শর্মার অবদান সম্পর্কে সময়োপযোগী মন্তব্য করেন :

…অপূর্ব শর্মার গ্রন্থ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে জগৎজ্যোতির কীর্তি-গাথা সম্বন্ধে সম্যক অবহিত হবেন বলে আশা করা যায়। জগৎজ্যোতির আত্মত্যাগকে ধর্ম-বর্ণ-দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে রেখে তার দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের মহিমাকে বিবেচনা করতে হবে। মুজিবনগর সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা পরবর্তী প্রতিটি সরকারের কর্তব্য। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের সরকার ক্ষমতায় আরোহণ করেছে। এ দলটিরই মহিমান্বিত নেতারা গঠন করেছিলেন মুজিবনগর সরকার। তাই আশা করা যায় যে, বর্তমান সরকারের আমলে মুজিবনগর সরকারের দেওয়া সর্বোচ্চ মরণোত্তর খেতাব প্রদানের প্রতিশ্রুতির আলোকে শহীদ জগৎজ্যোতিকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে…।

অধ্যাপক নন্দলাল শর্মা জগৎজ্যোতি সম্বন্ধে শৃঙ্খলাহীন মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জগৎজ্যোতি সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্র ছিলেন। কলেজে চত্বরে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ অন্য দু’জন ছাত্রের নামের সঙ্গে তাঁর নামের একটি ফলক আছে। সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরির নাম ‘জগৎজ্যোতি পাঠাগার’ করা হলেও হবিগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের নামে যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে, তাতে জগৎজ্যোতির নাম স্থান পায়নি। অধ্যাপক নন্দলাল শর্মা জগৎজ্যোতিকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ প্রকাশের জন্য অপূর্ব শর্মার কাজের নির্মোহ মূল্যায়ন করেছেন :

…শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস বীরবিক্রম সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে। বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর যুদ্ধগাথা বর্ণিত হয়েছে। অঞ্জলি লাহিড়ী তাঁর জীবন ও কর্মকে কেন্দ্র করে রচনা করেছেন উপন্যাস ‘জগজ্যোতি’। পত্রপত্রিকায় তাঁর সহযোদ্ধা ও গুণগ্রাহী অনেকেই তাঁর সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখেছেন। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ কোনো গ্রন্থ এতদিন প্রকাশিত হয়নি। তাঁর মা-বাবা ও অগ্রজের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা মূল ভিটেমাটি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যান। ফলে তাঁর সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধানও স্তিমিত হয়ে যায়…।

অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাস ভিন্ন আঙ্গিকে অপূর্ব শর্মার সামগ্রিক কর্মের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে ‘অনন্য মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি’ গ্রন্থের প্রসঙ্গ টেনে গ্রন্থের মহানায়ক জগৎজ্যোতি দাসের মূল্যায়ন করেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের এক জ্যোতির্ময় নায়ক ছিলেন জগৎজ্যোতি। এই মহান মুক্তিযোদ্ধার জীবনায়ন অপূর্বের গবেষণায় প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে। দুঃসাহসিক এই গেরিলার কথা জাতির সামনে তুলে ধরে তিনি শুধু ইতিহাসকেই সমৃদ্ধ করেননি, প্রান্তিক জনযোদ্ধাদেরও করেছেন সম্মানিত। তার ক্ষেত্র গবেষণা অনুষঙ্গের নানা ধারাপাত এই বইকে ইতিহাসযানে স্থাপন করেছে।’ এই মহামূল্যবান গ্রন্থটি ইংরেজিতে অনুবাদের অপেক্ষায় রয়েছে।

২২ মার্চ ২০০৯ নিউজ বাংলার চৌধুরী ভাস্কর হোমের সাথে এক সাক্ষাৎকারে অপূর্ব শর্মা মত দেন যে, জগৎজ্যোতিকে বীরশ্রেষ্ঠ পদক প্রদান করা উচিত।

সিলেটে যুদ্ধাপরাধ প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র

বইটি পাঠক মহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়, সাড়া জাগায় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির মধ্যে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে। বিশেষভাবে চারটি পরিচ্ছেদ ঐতিহাসিক কারণে খুবই মূল্যবান : শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীর গঠন প্রক্রিয়া, আলবদর বাহিনী গঠনের পটভূমি, দালাল অধ্যাদেশ, বিচার ও বাস্তবতা এবং যেভাবে থমকে গেল বিচার প্রক্রিয়া। লেখক এই গ্রন্থে বাংলাদেশে রাজাকার বাহিনী গঠন ও তাদের বেতন বা ভাতার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ এবং সিলেটের রাজাকার বাহিনীর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের কথাও তুলে ধরেছেন। আমাদের দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গ্রন্থটি বেশ দায়িত্ব পালন করতে পারছে। যে সকল পাঠ প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন সাময়িকী ও দৈনিকে স্থান পায় তার মধ্যে রয়েছে :

১.            অপরিশোধ্য ঋণ, হায়াৎ মামুদ, দৈনিক প্রথম আলো, ৭ আগস্ট ২০১১

২.            গ্রন্থকীটের দপ্তর : সিলেটে যুদ্ধাপরাধ ও প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র, জাকির জাহামজেদ, ১১ মার্চ ২০১০, কালের কণ্ঠ

৩.           ফিরে দেখা উল্কাপাত, আতাতুর্ক কামাল পাশা, দৈনিক যুগান্তর, ১৭ ডিসেম্বর ২০১০

দৈনিক প্রথম আলোতে ‘অপরিশোধ্য ঋণ’ শিরোনামে হায়াৎ মামুদ লেখক ও তাঁর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, ‘লেখক বিস্তৃত পাঠকশ্রেণির পক্ষ থেকে নিরঙ্কুশ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। নিজের প্রাণের তাগিদে প্রচুর সময় ও শ্রম ব্যয় করে তিনি তথ্যসংগ্রহ করেছেন; এই ঐকান্তিকতার জন্য তাঁর ঋণ অপরিশোধ্য বলেই মনে করি।’

‘গ্রন্থকীটের দপ্তর : সিলেটে যুদ্ধাপরাধ ও প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র’ শীর্ষক আলোচনায় জাকির জাহামজেদ সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের মুখোশ উন্মোচন করার জন্য অপূর্ব শর্মার সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেন : 

‘… গ্রন্থের একটি পর্বে লেখক বর্তমানে সিলেটে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের কথা তুলে ধরেছেন। এদের কেউ কেউ নিজের এলাকায় প্রভাব প্রতিপত্তির সঙ্গেই টিকে আছে, আবার কেউ একাত্তরে নিজের কুকর্ম ঢেকে ফেলার জন্য নিজের নামও পাল্টে ফেলেছে। সমাজের চোখে ফাঁকি দিলেও পেশায় সাংবাদিক অপূর্ব শর্মা সাহসী লেখনীতে একাত্তরের সেসব বর্বর রাজাকারদের ভদ্রতার মুখোশ উন্মোচন করেছেন তাঁর এই গ্রন্থে…।’

এই গ্রন্থ নিয়ে ‘ফিরে দেখা উল্কাপাত’ আতাতুর্ক কামাল পাশা শীর্ষক আলোচনায় ভিন্ন আঙ্গিকে উদ্যোগের সারবত্তাকে দেখেছেন :

‘এ তথ্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্মান্তিক দিকটি হচ্ছে ‘স্বাধীন দেশে বেপরোয়া যুদ্ধাপরাধীরা’ অনুচ্ছেদটি। লেখক এখানে সিলেটের বেশ কয়েক অঞ্চলের যুদ্ধাপরাধীদের বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে অব্যাহতি পাওয়ার পর বাইরে এসে জনসমাজে তাদের প্রতিশোধস্পৃহা ও জিঘাংসার তথ্য তুলে ধরেছেন। এটি সত্যিই দেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং স্বাধীনতাকামী যে কোনো বাংলাদেশির মনে প্রবল ক্ষতের সৃষ্টি করে।’

বীরাঙ্গনা কথা

লোকচক্ষুর অন্তরালে যেসব নারীশ্রেষ্ঠরা স্বাধীনতার জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, সতীত্বের মতো মহাসম্পদ বিলিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের কথা লিখেছেন অপূর্ব শর্মা। অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাসের মতে, ‘হাজারো বীরাঙ্গনা মাতার মানসপুত্ররূপে অপূর্ব এই মাতৃকৃত্য করেছেন’।

এই গ্রন্থেরও দুটি পাঠ প্রতিক্রিয়া জাতীয় সাময়িকী ও দৈনিকে স্থান পায়। তার মধ্যে রয়েছে :

১. বুক ফেটে যায় জননী আমার, চঞ্চল শাহরিয়ার, জুন সংখ্যা, ২০১৩ কালি ও কলম

২. কষ্টগাথার বিবরণ, নৃপেন্দ্রলাল দাশ, দৈনিক জনকণ্ঠ : ১৫ মে ২০১৫

‘বুক ফেটে যায় জননী আমার’ শীর্ষক গ্রন্থ আলোচনায় চঞ্চল শাহরিয়ার যথার্থই বলেছেন :

‘…এই বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করা তাদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের সেই নির্যাতিত দিনের সত্য উদ্ঘাটন করা সহজ কথা নয়। দিনের পর দিন সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলের মাঠঘাট পেরিয়ে কখনো গ্রাম, কখনো শহর ছাড়িয়ে, নদী পেরিয়ে, কতো সাধ্যসাধনায়, কতো কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই অপূর্ব শর্মা দাঁড় করিয়েছেন এই হৃদয়-কাঁপানো, মর্মস্পর্শী কাহিনি। বীরাঙ্গনা কথা পড়লেই বোঝা যাবে সেই অনবদ্য কাহিনি। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। হীরামণি, প্রভারাণী, সাবিত্রী, সাফিয়া খাতুন, মনোয়ারা, ছাবেদা, প্রবাসী মালাকার, পুষ্পরাণী, এশনু বেগম, জ্যোৎস্না, আরিনা, সন্ধ্যারাণীদের পাক-সেনাদের হাতে নির্যাতিত হওয়া, সিঁথির সিঁদুর মুছে যাওয়া, কারো চিরতরে নিঃস্ব হওয়ার গল্প খুব যতেœ লিখেছেন অপূর্ব শর্মা…।’

অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাস কষ্টগাথার বিবরণ শীর্ষক গ্রন্থ আলোচনায় সত্যের অনুসন্ধান করেছেন :

‘…তরুণ সত্যসন্ধ গবেষক অপূর্ব শর্মা বীরাঙ্গনাদের ট্র্যাজেডির কথা তুলে এনেছেন সাধারণের কাছে। প্রচুর শ্রম, নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা আর ইতিহাস-চেতনার দায় থেকে, স্বাধীনতার চেতনার অমোঘ চিন্তায় তিনি একাজ করেছেন। কোনো শিরোপার লোভে করেননি, করেছেন বিবেকের তাড়নায়। তার চলার পথ সুগম ছিল না। পূর্বপক্ষের পথরেখাও ছিল না। নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয়েছে তাকে…।’

গ্রন্থে আলোচিত বারোজন নারীযোদ্ধার পরবর্তী জীবনও ছিল দুঃখময়। তাঁদের ভাগ্যে রাষ্ট্রীয় কোনো আনুকূল্য জোটেনি, সমাজও দেখায়নি কোনো সহানুভূতি। কেউ উপলব্ধি করেনি যে, আমাদের এই স্বাধীনতা তাঁদেরই গৌরবের সুসমাচার। অপূর্ব শর্মা নিঃসন্দেহে একটা জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি এই বারোজন ছাড়াও আরও অনেক বীরাঙ্গনা আছেন। আন্তরিক প্রয়াস আর অধিকতর অনুসন্ধানে বের হয়ে আসবে আরও অনেক মায়ের গৌরবগাথা। তাঁদের জীবনযুদ্ধের কথা আমাদের কাছে ঋণস্বরূপ। অপূর্ব শর্মা তথ্য সংগ্রহে নিষ্ঠাবান ছিলেন বলে কাজটি কাজের মতো হয়েছে। তাঁর সেই অভিযাত্রা অব্যাহত থাকলে মুক্তিযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট অনেক অজানা তথ্য ও ত্যাগ-তিতিক্ষার কাহিনী প্রকাশিত হবে।

মুক্তিসংগ্রামে নারী

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পুরুষদের পাশাপাশি নারী সমাজের ছিল বীরোচিত অংশগ্রহণ যা ইতিহাসের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছে। নারীমুক্তি আন্দোলনের ধারা বেয়ে দেশমাতৃকার মুক্তিসংগ্রামে যেসব মহীয়সী নারী ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, দেশ ও জাতি তাঁদেরকে চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীরা কেবল আপনভাগ্য জয় নয়, হানাদার কবলিত মাতৃভূমির মুক্তি ছিনিয়ে আনতে পুরুষের সাথে সমভাবে যুদ্ধ করেছিলেন। ২০১৪ সালের বইমেলায় এটি প্রকাশিত হয়েছে শুদ্ধস্বর থেকে। মুক্তিযুদ্ধে নারীর বহুমাত্রিক অংশগ্রহণের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এ গ্রন্থে। ১৮৩৮ সালে চন্দ্রমুখী বসু ও কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় প্রথমে গ্রাজুয়েট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। নারী মুক্তিতে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪-১৯০৩) ও বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেনের (১৮৮০-১৯৩২) ভূমিকার কথাও লেখক তুলে ধরেছেন। এরপর সিলেটের বিপ্লবী নারী লীলানাগ (রায়) (১৯০০-১৯৭০) এর প্রসঙ্গ এসেছে। ১৯২৮ সালে সিলেটে বিদ্রোহী কবির পদার্পণ, ১৯৪৭ সালে সিলেটের গণভোট ও দেশভাগ, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণÑ সকল মুহূর্তেই নারীরা এগিয়ে গেছেন। গ্রন্থের ১২টি অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী সমাজের অংশগ্রহণের একটি রেখাচিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকা পালনকারী ২০ জন সংগ্রামী নারীর সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য তুলে ধরা হয়েছে। ‘অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে’ শীর্ষক অধ্যায়ে সিলেট অঞ্চলের যে পাঁচজন নারী অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এই অধ্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে। ‘সাহসিকতা’ শিরোনামের অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের তিনজন অসীম সাহসী নারীর ঘটনাবলির উল্লেখ করা হয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের নির্যাতিতা নারী’ অধ্যায়ে সিলেট অঞ্চলের চারটি জেলায় নারী নির্যাতনের কিছু করুণ ঘটনা, ‘বাগানে বাগানে পাশবিকতা’ শীর্ষক অধ্যায়ে পৃথকভাবে হায়েনাদের হাতে একুশজন নারীর নির্যাতনের কথা, ১২ জন বীরাঙ্গনার জীবন সংগ্রামের করুণ কাহিনিসহ অনেক ভয়াবহ ঘটনা লেখক তুলে ধরেছেন। রণাঙ্গন থেকে মাকে লেখা দুটি চিঠির একটির লেখক অঞ্জন চক্রবর্তী। বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরলেও অপর চিঠির লেখক সোলেমান স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ‘বন্দিশিবিরে আর্তনাদ’ শীর্ষক পরবর্তী অধ্যায়ে মুদ্রিত হয়েছে পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের জীবনের করুণ চিত্র। এই গ্রন্থ নিয়ে অধ্যক্ষ রসময় মোহান্তের একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা অভিমত, জানুয়ারি ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তিনি ইতিহাসের একটি স্বল্প আলোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিক পাঠক-পাঠিকাদের সামনে তুলে ধরার জন্য লেখককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন :

‘… অপূর্ব শর্মা একজন শিকড়সন্ধানী মুক্তিযুদ্ধ গবেষক। তাঁর ‘মুক্তি সংগ্রামে নারী’ শীর্ষক গ্রন্থটি দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি স্বল্প আলোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিক পাঠক-পাঠিকাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এর জন্য ধন্যবাদ অবশ্যই লেখকের প্রাপ্য। তাঁর মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত গ্রন্থ সিরিজে নূতন নূতন পালক যুক্ত হবে বলে আশা করা যায় …।’

আর অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাসের অভিমত হলো :

“এই জালালী কইতরের দেশ সিলেটের মহীয়সী নারীরা মহান মুক্তিযুদ্ধে যার যার ভূমিকা থেকে যে অবদান রেখেছিলেন, তার আনুপূর্বিক বর্ণনা আছে ‘মুক্তিসংগ্রামে নারী’ বইয়ে। যারা এতদিন ছিলেন অনালোচিত এবং অন্তরালে; সেইসব নারীর অবদানকে মলাটবন্দি করে অপূর্ব প্রমাণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধে নারীরাও পিছিয়ে ছিলেন না।”

স্বপন নাথ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীসমাজের অবদানকে অবিস্মরণীয় মনে করেন। ‘…একাত্তরে অংশগ্রহণকারী নারীদের ভূমিকা, ত্যাগের বাস্তবতা লেখক অপূর্ব শর্মা তুলে এনেছেন তৃণমূল পর্যায় থেকে। সংগঠক, অস্ত্র হাতে লড়াইয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গোপনে তথ্য আদান- প্রদান, হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবাদান, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতন, স্থানীয় সহযোগীদের হিংসাত্মক ভূমিকা, নির্যাতনের ঘটনা…’ স্থান পেয়েছে গ্রন্থে।

মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর

গ্রন্থটি মাঠপর্যায়ের একটি গবেষণা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে অনেক ঘটনা-অনুষঙ্গ চাপা পড়ে আছে কারণে-অকারণে। এসব বিষয়ের প্রায় পুরোটাই অলিখিত। সেখান থেকে বেশ কিছু বিষয়কে লেখক তাঁর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। বিজিত দে ‘মুক্তিযুদ্ধের অলিখিত অধ্যায়’ শিরোনামে ২৭ আগস্ট ২০১৬ দৈনিক যুগভেরীতে এক গ্রন্থ আলোচনা করেন। লেখকের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন :

‘…যা আমাদের চেতনাকে বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের নিকট নিয়ে যায়। তাঁর লেখার নির্মোহ সত্য প্রকাশ শানিত করে আমাদের রাজনৈতিক অর্থনেতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংকটের দ্বৈরথকে। আলোচ্যগ্রন্থে গবেষক শর্মা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোট ১০টি শিরোনামে লিপিবদ্ধ করেছেন। শিরোনামগুলো হলোÑ যুদ্ধজয়ের গান, অস্তিত্ব সংকটে বধ্যভূমি, ১৬০টি স্পটে গণহত্যা, বউ সাজা হলো না ফরিজার, বীরপ্রতীকের বিড়ম্বনা, আলোহীন কিরণ, তেলিয়ার আকুতি, শহীদদের গ্রামে নেই স্মৃতির মিনার, নিবেদিতার আক্ষেপ, শহিদ পবন কুমার তাঁতির কথা…।’

তা ছাড়া লেখক ‘অস্তিত্ব সংকটে বধ্যভূমি’ শিরোনামের কয়েকটি উপ-শিরোনামের মাধ্যমে বধ্যভূমির স্বাধীনতা-উত্তর চিত্র তুলে ধরেছেন জাতীয় মানবাধিকার ও জাতীয় বিবেকের কাছে। অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি বিষয়গুলোকে তুলে নিয়ে এসেছেন। কাজটি কঠিন ও দুঃসাধ্য বটে। কাজটিকে হৃদয়গ্রাহী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ বিবেচনায় তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন বিজিত দে। গবেষকের শব্দশৈলীতে অনেক উপশিরোনাম তাঁর দৃষ্টি কাড়ে। উদাহরণ দিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘বধ্যভূমিতে বসতি’, ‘সুনামগঞ্জের পিটিআই, বধ্যভূমি নয় যেন ডাস্টবিন’, ‘বধ্যভূমিতে মডেল স্কুল’, ‘জয় বাংলায় বুলডোজার’, ‘মার্কেট গ্রাস করেছে দাসের বাজার বধ্যভূমি’ ‘অজানা বধ্যভূমি ও ‘বধ্যভূমিতে ডরমেটরি’ ইত্যাদি। সিলেট অঞ্চলে ১৬০টি স্পটে গণহত্যায় প্রায় ৫ হাজার ৫০৭ জন মানুষ পাকিস্তানি মিলিটারি এবং এদেশীয় পাক-অনুচরদের হাতে প্রাণ বিসর্জন দেয় বলে লেখক উল্লেখ করেছেন তাঁর গ্রন্থে । ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার নিহত হলে খন্দকার মোশতাক এবং অন্য ঘাতক দালালকে পুনর্বাসিত করে। এ বিষয়টি লেখককে নিদারুণভাবে পীড়িত করে।

চা বাগানে গণহত্যা : ১৯৭১

গ্রন্থটি কার্যত গণহত্যার এক নির্ভরযোগ্য দলিল। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধ নিয়ে ইতোমধ্যে তাঁর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সে গ্রন্থগুলো পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে, পেয়েছে বোদ্ধাদের প্রশংসা।

তাঁর বর্তমান গ্রন্থ সিলেট অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাসে এক নতুন সংযোজন। শুধু চা-শ্রমিক নন, একাত্তরে বাগানে বসবাসকারী যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের নাম, ঘটনার মাস, তারিখ, কীভাবে হত্যা করা হয়েছে প্রাসঙ্গিক সবকিছুই লেখক তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। প্রাইমারি ডাটা যেগুলো সংগ্রহ করেছেন তা অবশ্যই নির্ভরযোগ্য। তবে সেকেন্ডারি ডাটার ব্যাপারে কতটুকু যাচাই-বাছাই করেছেন এর উল্লেখ করেননি। সেকেন্ডারি ডাটার প্রাইমারি সংগ্রাহকের মনোযোগ ও আন্তরিকতার ওপর তা নির্ভর করেছে। পাঠকরা আশা করব, সেকেন্ডারি ডাটাগুলোকে আরও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধিত আকারে তুলে ধরবেন।

লেখক গ্রন্থের শুরুতেই কী কারণে এই গণহত্যা সংঘটিত হয় এর ওপর আলোকপাত করেছেন। কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন চা-শ্রমিকদের অধিকাংশই ছিলেন আওয়ামী লীগের সমর্থক ও সনাতন ধর্মাবলম্বী। পাকহানাদারদের কাছে উভয় গোষ্ঠীই ছিল প্রতিপক্ষ। ১৯৭০-এর নির্বাচনে চা-শ্রমিকরা একচেটিয়াভাবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন ও ভোট দেন। ভারতে তাদের মূলভিত্তির ইতিহাসের সূত্র ধরে পাকিস্তানিরা ধরে নেয় এ দেশের অনেক সামরিক তথ্য ভারতের সীমান্তের ‘সৈনিকদের কাছে এই চা-শ্রমিকরাই পাচার করেছে হিন্দি ভাষা জানার জন্য। হত্যাকা-ের ধরন নিয়ে লেখক আলোকপাত করেছেন। সরাসরি গুলি, সারিবদ্ধভাবে গুলি, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে এবং অনেককে বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করেছে হানাদাররা। চা-শ্রমিকদের পাশাপাশি মালিক ব্যবস্থাপকরা যে রেহাই পাননি তা-ও লেখকের বিবরণে উঠে এসেছে। সিলেটের তারাপুর চা বাগানের মালিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে একই দিনে একই সময়ে হত্যা করা হয়। শ্রীমঙ্গলের গোবিন্দপুর চা বাগানের মালিককে ঢাকা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে অজ্ঞাত স্থানে হত্যা করা হয়। সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগানের ব্যবস্থাপক, মালনীছড়া চা বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক, মির্জাপুর চা বাগানের সহব্যবস্থাপক, কুরমা ও মাজডিহি বাগানের স্টাফদেরও হত্যা করা। এসব ব্যক্তির মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। বাগানে বাগানে যে পাকবাহিনীর ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল, তা জানা যায় লেখকের বিবরণে। বাগানে প্রাকৃতিকভাবে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় তার সদ্ব্যবহার পাকহানাদার বাহিনী করেছে। সীমান্তবর্তী বাগানগুলো এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেয়েছে। সীমান্তে বাগানগুলোকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে হানাদাররা জোর চেষ্টা চালায়। এর জন্য তারা অনেক অপকৌশলের আশ্রয় নেয়। বিভিন্ন এলাকার বাগানসমূহে পৌঁছতে হানাদাররা বিভিন্ন রুট ব্যবহার করেছিল। সহযোগিতা করেছিল এ দেশীয় রাজাকার আলবদর বাহিনী। একই সঙ্গে বাগানকে ব্যবহার করেন মুক্তিযোদ্ধারা। চলার পথে হানাদাররা কত যে দুর্ঘটনা, বর্বর কাজ করেছে তার শেষ নেই। রাজঘাট বাগানে হানাদারদের নৃশংসতার করুণ চিত্র উঠে এসেছে গ্রন্থে। রাজঘাটে তুমুল যুদ্ধের বিবরণও পাওয়া যায়। যাঁরা বেঁচে গিয়েছিলেন প্রথম দফায়, তাঁদের অনেককে পরবর্তীকালে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বিভিন্ন চা বাগানে যে গণহত্যা হয়েছে, বধ্যভূমি রয়েছে, যে নির্মম বর্বরোচিত ঘটনাগুলো ঘটেছে এর একটি নির্মোহ প্রতিবেদন রয়েছে এই গ্রন্থে-বিবরণ আছে কলাপাড়া শ্রমিক বস্তির বর্বরোচিত ঘটনার। এই সকল নির্মম, বর্বরোচিত কাহিনির শিকার বাগানের চা-শ্রমিকসহ মালিক-ব্যবস্থাপক, পার্শ্ববর্তী এলাকার শ্রমজীবী লোক। তবে নারী শ্রমিকদের ভয়ানকভাবে বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। তাঁদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা তৎকালে ছিল না, এখনও নেই। বাগানে পারিশ্রমিক যারপর নাই কম। বাধ্য হয়ে পাশ্ববর্তী সমভূমিতে কৃষিক্ষেত্রে মজুরের কাজ করতে হয়। সেখানেও তুলনামূলকভাবে কম পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। রেশন ঠিকমতো পাওয়া যেত না, এখনও নেই।

মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখভাগ থেকে চা বাগানের ধীর চা-শ্রমিক, মালিক- ব্যবস্থাপক, পার্শ্ববর্তী গ্রামবাসী যে আত্মত্যাগ করেছেন তার তুলনা নেই। ইতিহাসে তাঁদের যথাযোগ্য স্থান করে দিতে অপূর্ব শর্মার চা বাগানে গণহত্যা : ১৯৭১ গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই গ্রন্থে চা বাগানে চা-শ্রমিক ও অন্যদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য অনেক স্মৃতিসৌধের বিবরণ দিয়েছেন, দিয়েছেন এগুলোর চিত্র। ভাড়াউড়া, দেওড়াছড়া, নালুয়া, সিন্দুরখান, মালনীছড়া, খাদিম, ফুলছড়া, লালচান্দ, চান্দপুর, মৌলভী, তারাপুর, রাজঘাট, ফুলকুড়ি চা বাগানের বধ্যভূমি ও স্মৃতিসৌধের ছবি এবং শ্রীমঙ্গলের সাধু বাবার গাছতলা বধ্যভূমির ছবি সংযোজন করেছেন। এ সংযোজনগুলো গ্রন্থের ভাবগাম্ভীর্য বৃদ্ধি করেছে। বিবরণের কথাগুলো মূর্ত হয়ে উঠেছে এগুলোর মধ্যে। ছবি রয়েছে বেশ কয়েকজন মালিক-ব্যবস্থাপক ও চা-শ্রমিকের। চা-শ্রমিক, মালিক-ব্যবস্থাপকের পরিচিতি দাঁড় করাতে গিয়ে লেখক যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তা শুধুই অনুমান করা যেতে পারে। অনেকের ঠিকানা, বয়স পর্যন্ত দিয়েছেন। এই অসাধারণ কাজের মূল্যায়ন প্রয়োজন যথাযথভাবে ঠিক জায়গায়। আঞ্চলিক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করলে এই বৃহৎ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাকেন্দ্রিক অনেক তথ্য, উপাত্ত, ব্যবহার্য জিনিসপত্র, চিত্র, বইপুস্তক, দলিল, মানচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র কত কিছুই থাকতে পারে। কেন্দ্রীয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে একটি বিশেষ অঞ্চলের সবকিছুকে সংকুলান করা দায় হতে পারে। ১০-১২টি আঞ্চলিক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ইতিহাস চর্চায় নিবিষ্ট লেখক অপূর্ব শর্মার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সকল গ্রন্থকে নিয়ে ‘তৃণমূলে মুক্তিযুদ্ধ ও অপূর্ব শর্মার প্রদক্ষিণ’ শীর্ষক সার্বিক আলোচনায় স্বপন নাথ প্রাসঙ্গিক এক নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়ন করেছেন :

‘… লেখক অপূর্ব শর্মা নিজে ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ করে কয়েকটি বই লিখেছেন। সংগ্রহ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক ও শহিদ পরিবারের উত্তরাধিকারী এবং সহযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার। একই সঙ্গে সেসময়ের পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য দলিল পর্যবেক্ষণ করেছেন নিজের তথ্য প্রতিপাদনে। তাঁর আলোচিত গ্রন্থসমূহে তিনি অনেক অজানা তথ্য দিয়েছেন, যা আমরা এর আগে কখনও পাইনি। ঘটনা পূর্বাপর বর্ণনায় নির্মোহ থাকার চেষ্টা করেছেন। বলাবাহুল্য যে, লেখক অপূর্ব শর্মা এ বিবেচনায় অসামান্য কাজ করেছেন…।’

বীরাঙ্গনা কথা

গ্রন্থ সম্বন্ধে স্বপন নাথের মূল্যায়ন প্রণিধানযোগ্য :

‘যে মাত্রার নির্যাতনের বর্ণনা এখানে তুলে আনা হয়েছে, তা ভাষা দিয়ে ধরা যায় না। শুধু সচেতনতার সঙ্গে অনুধাবন করা কর্তব্য মনে করি। মুক্তিযুদ্ধ কী?Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে হাজার হাজার নির্যাতনচিত্র পাঠের প্রয়োজন নেই। বীরাঙ্গনা কথা পাঠেই বোঝা যায় বাংলাদেশ কেমন ছিল ১৯৭১ সনে।’

মুক্তিযুদ্ধের এক অসমাপ্ত অধ্যায় :

ফিরে আসেনি ওরা

১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হিসেবহীন মানুষকে ধরে নিয়ে গেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর এদেশীয় রাজাকার- আলবদর গোষ্ঠী। অনুমান করাই যায় যে, ১৯৭১-এ যাদের পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার আলবদররা ধরে নিয়ে গেছে, নির্যাতনের প্রক্রিয়াতেই তাদের হত্যা করেছে। তাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। লেখক অপূর্ব শর্মা এ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন :

‘…মুক্তিযুদ্ধের পর অতিবাহিত হয়ে গেছে ৪২ বছর। কিন্তু ফিরে আসেননি যুদ্ধের দামামায় হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতাকর্মীরা। নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এসব লোকজনেরা ফিরে না আসায় ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক পরিবার। ছন্দপতন ঘটেছে অনেক পরিবারের চলার পথে। কিন্তু তাদের শেষ পরিণতি নিশ্চিত না হওয়ায় স্বজন হারানোর পাশে দাঁড়ায়নি কেউ…।’

গ্রন্থের আলোচনায় স্বপন নাথ একাত্তর সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে না-ফেরাদের ব্যাপারে পাঠক অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন :

‘…এসব বিবরণ পড়তে পড়তে যুদ্ধের সময়ে চলে যাওয়া যায় আর পাঠক হিসেবে দুঃসহ বেদনার চাকা সচল হয়ে ওঠে। সরাসরি যুদ্ধে প্রাণ হারানোর পাশাপাশি বাড়ি থেকে ধরে নেওয়া, পালিয়ে যাওয়া অবস্থায় ধরা পড়া, অথবা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী হিসেবে ধরে নিয়ে গেছে। মূলত, পাকিস্তানি সেনারা এদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কোন এলাকায় কোন মানুষটি কী কাজ করে, তা কিছুই জানতো না। গ্রন্থিত বিবরণ থেকে সহজইে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ দেশীয় রাজাকার আলবদর বাহিনীর সদস্যরাই পথ, ঘাট, যোগাযোগ, সে সময়ের আওয়ামী লীগ কর্মী, সংস্কৃত ও রুচিবান, প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গ, নৌকার সমর্থক ও ভোটারসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কার কী অবস্থান, বাড়ি ও পরিচয় নির্দেশ করে দিয়েছে। এ রকম বহু ঘটনার মর্মন্তুদ ঘটনার কাহিনি লেখক সংগ্রহ করেছেন…।’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ ছাড়াও তাঁর আরও বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। এ গ্রন্থগুলোও যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি গ্রন্থ যেমন বিপ্লবী অমিত ভট্টাচার্য মুক্তিপথের অভিযাত্রী আমিনুর রশীদ চৌধুরী’ অভিজাত গণতন্ত্রী : আব্দুর রশীদ চৌধুরী স্বাধীনতা সংগ্রামের তিন বীরসেনানীকে নিয়ে লেখা। তাঁরা এই দেশেরই স্বাধীনতার জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করে গিয়েছেন। তাঁদের জীবন ও কর্ম ভিত্তিক এই গ্রন্থগুলো আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য দলিলের অন্যতম। তাঁদের কর্ম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার ধারাবাহিকতায় আমরা বাহান্নতে এসে পৌঁছি। তারপর নানা ধাপে এগিয়ে গিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এই গ্রন্থগুলোর সারকথা আমাদের নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। অপূর্ব শর্মা দুরূহ কাজগুলো করেছেন মেধা দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে।

বিপ্লবী অসিত ভট্টাচার্য

এই পর্যায়ের তিনটি গ্রন্থের মধ্যে বিপ্লবী অসিত ভট্টাচার্য অন্যতম। বইমেলা ২০১০ উপলক্ষে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ বইটি প্রকাশ করে। দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে বিপ্লবী অসিত ভট্টাচার্য অন্যতম। এই বিস্মৃতপ্রায় বিপ্লবীকে নিয়ে গবেষক অপূর্ব শর্মা লিখেছেন এক অনন্য গ্রন্থ বিপ্লবী অসিত ভট্টাচার্য। ১৯৩৩ সালের ১৩ মার্চ অসিত ভট্টাচার্য পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁর পাঁচ সহযোগীকে নিয়ে হবিগঞ্জের মাধবপুর থানার অন্তর্গত রেলওয়ে ভ্যান থেকে ডাক লুটে অংশ নেন। পালানোর সময় স্থানীয় জনতা ডাকাত মনে করে তাঁদের ধাওয়া করে। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য বিপ্লবীরা গুলি নিক্ষেপ করলে জনতাদের একজন ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায়। উত্তেজিত জনতা বিপ্লবীদের আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। সিলেটে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচারকার্য চলে। তাঁদের অস্ত্রভা-ারের সন্ধানের জন্য পুলিশ তাঁদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। তবুও মুখ খোলেননি কোনো বিপ্লবী। ১৯৩৪ সালের ২৪ মে বিচার কার্যক্রম শেষ হয়। বিচারে জজ ও জুরিরা ভিন্নমত হওয়ায় চূড়ান্ত রায়ের জন্য মামলার নথিপত্র কলকাতা হাইকোর্টে পাঠানো হয়। হাইকোর্টের রায়ে অসিত ভট্টাচার্যকে মৃত্যুদ-ে দ-িত করা হয়।

অসিত ভট্টাচার্য ও অন্যান্য বিপ্লবীরা দেশপ্রেমে উজ্জীবিত ছিলেন। অসিত ফাঁসির আগেও অবিচল ছিলেন। কারাগারে সহযোগী বিপ্লবীকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বলেছেন। অগ্নিযুগের বিস্মৃতপ্রায় বিপ্লবী শিরোনামে এই গ্রন্থটির আলোচনা করেন স্বকৃত নোমান। আলোচক বিস্মৃতপ্রায় বিপ্লবীকে নতুন করে পরিচিত করে দেওয়ার জন্য লেখকের প্রশংসা করেন, ‘সত্যি অসিতের নির্ভীক ভাষণ দেশপ্রেমে আমাদেরকে উজ্জীবিত করে। অপূর্ব শর্মা এই অকুতোভয় বিস্মৃতপ্রায় বিপ্লবীকে নতুন করে পরিচিত করে দিলেন আমাদের কাছে। তার এ কাজ প্রশংসনীয়, ব্যতিক্রম।’

মুক্তিপথের অভিযাত্রী আমীনূর রশীদ চৌধুরী  ২০১১ বইমেলায় সাহিত্যপ্রকাশ বইটি প্রকাশ করে।

ব্রিটিশ আমলে ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের উত্তাল আন্দোলনের সঙ্গে, স্বদেশি আন্দোলনের তরুণকর্মী এবং পরবর্তীকালে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যিনি স্বাধীনতা আন্দোলন বিশেষ ভূমিকা রাখেন তাঁর নাম আমীনূর রশীদ চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধে তিনি সংগঠকের গুরুদায়িত্ব পালন করেন বিশেষ দক্ষতার সাথে এবং পাকবাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে অশেষ নির্যাতন ভোগ করেন। সিলেটের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তাঁর রয়েছে অবিস্মরণীয় অবদান। তিনি ‘যুগভেরী’ও করেছেন। চা শিল্পের উন্নয়নে তাঁর ছিল বলিষ্ঠ ভূমিকা। সিলেট বিভাগের রূপকার, সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় এবং সিলেটের শিক্ষা বিস্তারে বৃত্তি প্রদানসহ নানাবিধ সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে আমীনূর রশীদ চৌধুরী মূল্যবান অবদান রেখেছেন।

মুক্তিপথের অভিযাত্রী আমীনূর রশীদ চৌধুরী গ্রন্থটি প্রণয়নের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বইটির লেখক অপূর্ব শর্মা বলেছেন :

‘…আমীনূর রশীদ চৌধুরী নিজে প্রচারবিমুখ থাকায় সমাজ উন্নয়নে তাঁর অবদানের অনেক তথ্য উঠে আসেনি। জীবদ্দশায় নিখাদ এই সিলেটপ্রেমিককে সিলেটবাসী ‘সিলেট বন্ধু’ অভিধায় ভূষিত করেছিল। যান্ত্রিকতার যুগে আমরা যেন আজ ভুলতে বসেছি আমীনূর রশীদ চৌধুরীর কীর্তি ও গৌরবগাথা। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁকে পরিচিত করার তাগিদ থেকেই আমার এই প্রচেষ্টা…।’

এই গ্রন্থের আলোচনা করতে গিয়ে অধ্যাপক মো. আবদুল আজিজ আমীনূর রশীদ চৌধুরীর ন্যায়নিষ্ঠ এক মূল্যায়ন করেন :

‘…একজন আমীনূর রশীদ চৌধুরী যিনি ছিলেন একাই একটি ‘প্রতিষ্ঠান’ তাঁর জীবনের অনেক অজানা কাহিনী ও কর্মের ইতিহাস বা ইতিকথা হয়তো একটি বইয়ে সম্পূর্ণরূপে সন্নিবেশিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু তরুণ সাংবাদিক অপূর্ব শর্মা অকৃত্রিম আন্তরিকতায় তাঁর বাল্য ও শৈশব থেকে পরিণত বয়সের নানা অনুষঙ্গ ইতিহাস ও বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছেন…।’

আশিস বিশ্বাসও এই গ্রন্থের একটি আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে আমীনূর রশীদ চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বকে নিয়ে গ্রন্থ রচনা করে অপূর্ব শর্মা ইতিহাসের দায় রক্ষা করেছেন :

‘… দেশভাগের আগে যারা স্বদেশি আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের জীবনকাহিনী আমরা খুব কমই জানি। কারণ, তাদের জীবন ও সংগ্রামের কাহিনী নিয়ে আমাদের দেশে খুব কম গ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে। এর জন্য অগ্রজদের দায়ী করে থাকেন উত্তরসূরিরা। সেদিক থেকে অপূর্ব শর্মা ইতিহাসের দায় রক্ষা করেছেন…।’

অভিজাত গণতন্ত্রী : আব্দুর রশীদ চৌধুরী 

গ্রন্থে যে মানুষটির জীবন ও কর্মের নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তিনি উপমহাদেশখ্যাত আব্দুর রশীদ চৌধুরী। তাঁর অগাধ পা-িত্য, সহজ-সরল জীবনযাপন ও স্নিগ্ধতা এখনও ব্যথাতুর করে এই সমাজকে। সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, সমাজচিন্তক, রাজনৈতিক কর্মী, রাজনীতিবিদÑ বিভিন্ন পরিচয়ে তিনি ছিলেন অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। প্রতিটি পরিচয়ের মৌলিক মানদ- এবং নৈতিক ভিত্তি ও কাঠামোর প্রতি তিনি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের দুর্গাপাশায় প্রয়াত আব্দুর রশীদ চৌধুরী যখন জন্মগ্রহণ করেন, সেই সময় এই অঞ্চলের মুসলমান সমাজ কুসংস্কার ও গোঁড়ামির শৃঙ্খলে ছিল বন্দি। মুসলমান সম্প্রদায়ের নারীরা ছিলেন কঠোর রক্ষণশীল পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রতিকূল পরিবেশ, পরিস্থিতি অতিক্রম করেই অব্যাহত থাকে আব্দুর রশীদ চৌধুরীর জীবন সংগ্রাম, পথচলা। প্রথম জীবনে সীমাহীন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। নানা প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। ভাগ্যের সহায়তায় শৈশব-কৈশোর উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ক্রমশ ভাগ্যকে জয় করতে থাকেন নিজের বহুমাত্রিক গুণে, মেধায়, পরিশ্রমে। চাকরিজীবী থেকে ব্যবসায়, ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিবিদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন স্বচ্ছন্দে। এ সময় তিনি চা শিল্পেরও বিকাশ ঘটান। যুগভেরী নামক একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকারও সূচনা করেন। এই পত্রিকাটি শুধুই সংবাদপত্র হিসেবে নয়, ঐতিহাসিক একটি দলিল হিসেবে সমাজে সার্থক বিবেচনা পেয়েছে। শিক্ষানুরাগী, সংস্কৃতিসেবী ও দানশীল ব্যক্তি হিসেবে সমাজ উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রবাদতুল্য। তবে তিনি প্রচারবিমুখ ছিলেন। নিজের প্রচার ও প্রসারে তিনি কোনো সময়ই মনোযোগী ছিলেন না। তাঁর প্রচারবিমুখ বাংলার শাশ^ত মূল্যবোধে আলোকিত করেছেন সমাজকে তাঁর মেধা দিয়ে, প্রজ্ঞা দিয়ে। উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশ ও সিলেটের সুসন্তান, এই প্রচারবিমুখ খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব। অভিজাত গণতন্ত্রী : আব্দুর রশীদ চৌধুরী প্রকাশ করেছে ঢাকার অভিজাত প্রকাশনা সংস্থা ‘সাহিত্যপ্রকাশ’। অপূর্ব শর্মা অনেক প্রশংসার দাবিদার। এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা প্রয়াত আব্দুর রশীদ চৌধুরীর অসাধারণ জীবন ও ব্যক্তিত্বের নৈকট্য লাভ করব, জানতে পারব অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক আর্থ-সামাজিক আন্দোলন, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের অবদানের কথা। উপমহাদেশের অনেক রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংবাদিকতা ও চা-শিল্প নিয়ে অনেক তথ্য ও তত্ত্ব রয়েছে এই গ্রন্থে। আব্দুর রশীদ চৌধুরীর মতো বড় মাপের ও উঁচু মানসিকতার একজন ব্যক্তিত্বকে নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন মোটেই সহজসাধ্য একটি কাজ নয়। তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ একটি দুঃসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তবে সাহসী লেখক অপূর্ব শর্মা এই অসাধ্য সাধন করেছেন। এই গ্রন্থ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন নিষ্ঠাবান সৈনিক আব্দুর রশীদ চৌধুরী এবং তাঁর মতো ব্যক্তিত্বদের নতুন করে জানতে পাঠক-গবেষকদের উৎসাহিত করবে। এ ধরনের গবেষণা কর্ম উপমহাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক অজানা দিকের উন্মোচন করবে। অবিভক্ত সিলেটেরও একটি চিত্র পাই। অবিভক্ত সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে। আরও অনেক বিষয়। তৎকালীন সময়ে স্বাস্থ্যসেবার কথা। কলেরার মতো দানবের তা-বের কথা।

গ্রন্থটির আলোচনা করেন সরকার এস. মুজিবুর রহমান মুজিব ও মিহিরকান্তি চৌধুরী। সরকার এস লিখেছেন :

‘…তার পুরো জীবন পর্যালোচনা করলে তীব্র ব্রিটিশ বিরোধিতার পরিচয় ফুটে ওঠে। নিজ বাসভবন ‘রশীদ মঞ্জিল’-এ বিপ্লবীদের আশ্রয়দান, তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে নিজ ছেলেকে উদ্বুদ্ধ করা, আসাম ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে ব্রিটিশ সরকারের স্বার্থ-রক্ষাকারী বিভিন্ন বিলের বিরোধিতা, নাইট উপাধি প্রদানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, বক্তৃতা-বিবৃতিতে ব্রিটিশদের লুটেরা হিসেবে আখ্যায়িত করা ও ব্রিটিশ শাসনের ফলে ভারতের অধঃপতনের চিত্র তুলে ধরা ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। অবশ্য এই কর্ম সম্পাদনের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি। দৃঢ় মনোবল এবং তার মেধা দিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। এতে প্রকাশ পেয়েছে নিখাদ দেশপ্রেম…।’

মুজিবুর রহমান মুজিব আব্দুর রশীদ চৌধুরীর পরিবারের প্রভাব নিয়ে কথা বলেছেন:

‘…ষাটের দশকের শুরুতে ঐতিহ্যবাহী এম. সি. কলেজের ছাত্র ছিলাম। তখনও ‘রশীদ মঞ্জিল’-এর প্রভাব প্রতিপত্তি সিলেটের সমাজ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। ‘যুগভেরী’ জন্ম দিয়েছে অনেক নবীন লেখকের। দেখেছি শ্রদ্ধেয় আমীনূর রশীদ চৌধুরী সাহেবের আন্তরিকতা ও ব্যক্তিত্ব। আশির দশকের মধ্যভাগে দেখেছি হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সাহেবকে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে, আইনজীবী হিসাবে দেখেছি বিশিষ্ট চা-কর জাহান রশীদ চৌধুরী সাহেবকে। সকলেই বিনয়ী। সদালাপী। নিরহংকারী। বন্ধুবৎসল…।’

আর আব্দুর রশীদ চৌধুরী সম্বন্ধে মুজিবুর রহমান মুজিবের মূল্যায়ন অনুধাবনযোগ্য :

‘…সেই সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত বৃহত্তর সিলেটের কৃতী সন্তানগণ যুগে যুগে রাষ্ট্র ও সমাজ উন্নয়ন উন্নত সমাজ বিনির্মাণে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখে গেছেন। বৃটিশ ভারতে সেই বৈরী পরিবেশে বৃহত্তর সিলেট-আসাম- অঞ্চলের এমনি একজন নির্ভীক ও নিবেদিতপ্রাণ দেশ সেবকের নাম আব্দুর রশীদ চৌধুরী…।’

২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, সিলেট-এর বাংলা বিভাগের অপূর্ব শর্মার ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা : প্রান্তজনের কথা’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. জফির উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই সেমিনারে যৌথ উপস্থাপক ছিলেন ৩য় বর্ষ ২য় সেমিস্টারের ছাত্র প্রিয়াংকা বনিক টুম্পা, সাবরিনা আহমদ, আফসানা শারমিন এবং সাহেদ আহমদ।

বিশ্লেষণাত্মক এই উপস্থাপনায় উপস্থাপকগণ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে কথা বলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস প্রণয়নের উপর গুরুত্বারোপ করে অপূর্ব শর্মার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কাজগুলোকে এই ধারার মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন :

তিন অধ্যায়ে বিস্তৃত আলোচনার প্রথম অধ্যায়ে অপূর্ব শর্মার জীবন কথা ও কর্মপরিচয় প্রসঙ্গে অধ্যাপক হায়াৎ মামুদের মন্তব্য করেন :

‘…লেখক বিস্তৃত পাঠকশ্রেণীর পক্ষ থেকে নিরঙ্কুশ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। নিজের প্রাণের তাগিদে প্রচুর সময় ও শ্রম ব্যয় করে তিনি তথ্যসংগ্রহ করেছেন এই ঐকান্তিকতার জন্য তার ঋণ পরিশোধ্য বলেই মনে করি।’

২০১৩ সালে প্রকাশিত বীরাঙ্গনা কথাকে উপস্থাপকগণ সাড়া জাগানো হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সরকার যে বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বইটি রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে কাজে লাগে বলে তাঁরা মন্তব্য করেন। গ্রন্থটি সম্বন্ধে অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশের কন্ঠগাথার বিবরণ’ প্রবন্ধের পুনরুল্লেখ করা হয় :

‘বীরাঙ্গনা কথা’র ভেতরে বীরামনি, প্রভারানী, সাবিনী, সাফিয়া, মনোয়ারা, ছাবেদা প্রমুখ বীর নারী বা নিজেদের দুর্ভাগ্যের বিবরণ দিয়েছেন। অপূর্ব অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে শুনেছেন সেসব কথা। উপস্থাপন করেছেন নির্মোহভাবে।’

মুক্তিযুদ্ধের এক অসমাপ্ত অধ্যায় : ফিরে আসেনি ওরা গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের মর্মস্পর্শী বয়ান উঠে এসেছে বলে মন্তব্য করেন উপস্থাপকরা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য সংযোজন।

মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর ও চা বাগানে গণহত্যা দুটি গ্রন্থ নিয়ে উপস্থাপকগণের যে পর্যবেক্ষণ রয়েছে তাঁর রয়েছে সবিশেষ গুরুত্ব :

‘…মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর এবং চা বাগানে গণহত্যা গ্রন্থ দুটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণায় তাঁর সর্বশেষ সংযোজন। যা বিপুল প্রশংশিত হয়েছে। এ-গ্রন্থের প্রকাশ উপলক্ষে গত ১৭ মে (২০১৬) মদনমোহন কলেজ সাহিত্য পরিষদ সবুজের রক্তগাথা নামে একটি প্রকাশনা-স্মারক বের করেছে। স্মারকটি সম্পাদনা করেছে মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ ড. অধ্যাপক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ্ ও সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির কর্মকর্তা ও রবীন্দ্র গবেষক মিহির কান্তি চৌধুরী। এই গ্রন্থে ১৮ জন লেখক মূল্যায়ন করেছেন অপূর্ব শর্মার গবেষণাকর্ম।…’

বজলুর রহমান স্মৃতিপদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বক্তব্য এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রণিধানযোগ্য :

‘সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ, সাংবাদিকরা এর কারিগর এবং সমাজে নির্মাণে মিডিয়া এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কিন্তু এজন্য বিভ্রান্তিমূলক আস্থামূলক ও পক্ষপাতহীন সাংবাদিকতার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অবশ্যই মিথ্যাকে মিথ্যা আর সত্যকে সত্য বলার সাহস থাকতে হবে। … বজলুর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের কল্যাণে তরুণ সাংবাদিক সমাজে অবদান রাখবে।’

দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘অপূর্ব শর্মার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা’ নিয়ে সেমিনারের উপস্থাপকগণ নাতিদীর্ঘ বিষেøষণ করেছেন। এই আলোচনায় যে গ্রন্থগুলো স্থান পেয়েছে সেগুলো হলো :

অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাস লেখক অপূর্ব শর্মার কর্মের এক হৃদয়গ্রাহী মূল্যায়ন করেছেন :

‘…প্রত্যয়ের সীমাকে প্রসারিত করাই হচ্ছে সাংবাদিকতার শোভাভূমি। সেখান থেকেই গন্তব্যমুখী হয় সাহিত্যের সচকিত উচ্চারণ। এ রকম শুদ্ধ উচ্চারণ বিকশিত হয়েছে অপূর্ব শর্মার আতত বিশ^াসে। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্যসুলভ মহতী প্রেরণায় প্রান্তিক মুক্তিযোদ্ধাদের কথা লিখে চলেছেন গভীর শ্রমে, নিষ্ঠায় ও ইতিহাসশুদ্ধতায়। বিশেষ করে নারীযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা ও চা-জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে তিনি মহত্তম মাত্রায় তাঁর সৃজনধর্মের কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন। তাঁর বিশদ সৃষ্টিসম্ভারকে নয়, কয়েকটি চিরায়ত চিন্তায় ভাস্বর বইয়ের কথা উল্লেখ করা যায়। অনন্য মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি, সিলেটে যুদ্ধাপরাধ ও প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র, বিপ্লবী অসিত ভট্টাচার্য্য, ফিরে আসেনি ওরা, মুক্তিসংগ্রামে নারী, বীরাঙ্গনা কথা, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর, চা বাগানে গণহত্যা; ১৯৭১-এই বইগুলোর ভেতর দিয়ে সহজেই তাঁর অবলোকনের ভিন্নমাত্রাকে স্পর্শ করা যায়…।’

অপূর্ব শর্মা মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিনিধি। ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তিনি যা জানেন তা তো বই, পত্রিকা পড়ে এবং গল্প শুনে। তিনি পড়ে, শুনে যা করেছেন তা অসাধারণ। তিনি কবিতা দিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন। তিনি সেই কবিতার কল্পনাকে অবলম্বন করে একাত্তরে নিয়ে গেছেন নিজেকে। তাঁর পড়াশোনা আরও এগিয়ে যাক, শোনা বাড়–ক। এই সমাজ যে অপূর্ব শর্মার দ্বারা আরও ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেÑ সে সম্ভাবনাই প্রবল।  

লেখক  : অনুবাদক, গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares