বাংলার প্রত্যন্ত দ্বীপে পাকিস্তানি বর্বরতা : ভোলা জেলা ১৯৭১

রেহানা পারভীন

বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলা। ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যেও এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলন-সংগ্রামে ভোলার সম্পৃক্ততা থাকলেও লিখিত ইতিহাস বা লেখার তথ্য-উপাত্ত অত্যন্ত অপ্রতুল। ভোলা জেলার এ প্রবণতা বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিচ্ছিন্নতাকে দেখা যেতে পারে। একদিকে এটি দ্বীপ জেলার অধিবাসীদের স্বাভাবিক প্রবণতা, অন্যদিকে দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষের দ্বীপের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। সহজ ভাষায় বলা যায়Ñ স্বতন্ত্র ভৌগোলিক পরিবেশে ভোলার স্থানীয় মানুষেরা যেমন দেশের অন্য অঞ্চলের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় কম উৎসাহী, তেমনি জাতীয় পর্যায়ে দ্বীপকে একটি দুর্গম ও কম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বলে বিবেচনা করে থাকে। এ পটভূমিকায় ভোলা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একটি প্রান্তিক ইতিহাসে পরিণত হয়। ফলে জাতীয় ইতিহাসে এর উপাদানগুলোর উপস্থিতি গৌণ হয়ে পড়ে।

বিগত দিনে ভোলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের লিখিত উপাদানে গণহত্যা-নির্যাতনের প্রাপ্ত চিত্র উপরের বিচ্ছিন্নতার ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে। খুলনায় অবস্থিত ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট যখন বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন ভোলা জেলার প্রশ্নটি সামনে আসে। গ্রন্থতাত্ত্বিক উপাদান বিশ্লেষণ করে ভোলা জেলায় মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা-নির্যাতনের চারটি নিদর্শনের তথ্য পাওয়া যায়। ফলে পূর্ব ধারণা অনুসারে মনে করা হয় ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার ফলে এ জেলা মুক্তিযুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে।

এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয় গণহত্যা জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে মাঠপর্যায়ে গবেষণা কাজ শুরু হওয়ার পর। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় ভোলা জেলায় গণহত্যা নির্যাতনের নিদর্শনের সংখ্যা ৮১টি। গবেষকের মতে সংখ্যাটি চূড়ান্ত নয়। এর সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা মাঠপর্যায়ে এ জরিপ কাজটি পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে। নদীভাঙন কবলিত ভোলা জেলায় মানব সভ্যতার অন্যান্য নিদর্শনের মতো গণহত্যার বহু নিদর্শন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। 

প্রাথমিক গ্রন্থতাত্ত্বিক গবেষণায় তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে গবেষক জাতীয় অভিলেখাগারে দৈনিক পত্রিকায় তথ্যানুসন্ধান শুরু করেন। সেখানে ১৯৭১ সালে ভোলা জেলার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বেশ কয়েকটি সংবাদ শিরোনাম গবেষকের দৃষ্টি আর্কষণ করে। দুটি শিরোনাম ছিল এমনÑ ‘মরণপুরী ভোলা ওয়াপদা কলোনী’ (দৈনিক পূর্বদেশ, ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২) ও ‘খান পশুদের বর্বরতার স্বাক্ষর ভোলার বোরহানউদ্দিন বাজার’  (দৈনিক পূর্বদেশ, ৮ মার্চ ১৯৭২)। দুটি প্রতিবেদনে ভোলা জেলার মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বরতার একটি চিত্র উঠে আসে। ফলে আগে যে ধারণাটি বিদ্যমান ছিল যে, ভোলা জেলার মতো নদীবেষ্টিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাকিস্তানি বর্বরতা তেমন ব্যাপক ছিল না, সেখানে নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

মাঠ পর্যায়ে গবেষণার ফলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভোলা জেলায় পাকিস্তানি বর্বরতার যে চিত্র পাওয়া যায়, তা গ্রন্থবদ্ধ রূপে প্রকাশিত হয়েছে গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ : ভোলা জেলা শিরোনামে। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র ২০১৮ সালে। এতে দেখা যায় ভোলা জেলা নদীবেষ্টিত ও দুর্গম হলেও তা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। উল্টো এ জেলা সীমান্ত অঞ্চল থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় অধিবাসীদের পক্ষে জেলা ছেড়ে কোথাও আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।

পাকিস্তানি সেনারা ভোলা আসে ১৯৭১ সালের মে মাসের ৬ তারিখে। কিন্তু ভোলার গণহত্যার সূচনা হয় তারও আগে। একাত্তরের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বিশাল প্যাট্রোল গানবোট মেঘনা নদী হয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরে যাচ্ছিল। ভোলার চৌকিঘাটা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা গানবোট লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এর পরপরই পাকিস্তানি গানবোটটি তীরের দিকে এগিয়ে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। পাকিস্তানিদের ভারী অস্ত্রের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানি গানবোট নির্বিচারে গুলি চালাতে চালাতে চলে যায়। এতে সাধারণ মানুষ মারা যায়, কেউ আহত হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণের একদিন আগে ১৬ এপ্রিল ভোলা মহকুমা এক অকল্পনীয় বিমান হামলার শিকার হয়। দুটি বিমান ভোলার চৌকিঘাটায় ও গাজীপুরে ব্যাপক গোলাবর্ষণ করে। হরিনারায়ণ নামে এক কৃষক কাজ করছিল জমিতে। পাকিস্তানি বিমান হামলায় সে ফসলের জমিতেই ঝাঁজরা হয়ে যায়। বসতবাড়ি, ফসলের জমি, রাস্তা, বাজার সব জায়গায় কর্মরত সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি গণহত্যার শিকার হয়। মহকুমাজুড়ে শুরু হয় স্বজন হারানোর আহাজারি। এ হামলায় ভোলার মুক্তিযোদ্ধারা চিন্তিত হয়ে পড়ে। কারণ তারা পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে লড়াই করার জন্য এতদিন যে প্রস্তুতি নিয়েছিল সেখানে আকাশপথে হামলা প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ ভোলায় প্রথম হামলা আকাশপথেই হলো। তবু মুক্তিযোদ্ধারা দমে যায়নি। তারা পূর্ণোদ্যমে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। মে মাসের ৬ তারিখে ভোলার খেয়াঘাট দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ভোলায় আসে এবং ভোলার পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এর আবাসিক এলাকা ওয়াপদা কলোনিতে ঘাঁটি স্থাপন করে। পাকিস্তানি বাহিনীর আগমনে মুক্তিযোদ্ধারা আত্মগোপনে চলে যায়। আতঙ্কে শহর জনশূন্য হয়ে পড়ে। মহকুমায় এসেই পাকিস্তানি সেনারা ভোলার প্রতিটি থানায় শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠন করে। এসব বাহিনীর মাধ্যমে তারা মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ধরে এনে ওয়াপদা কলোনিতে নির্যাতন শুরু করে। একপর্যায়ে তারা ভোলা খেয়াঘাট, শিবপুর মেঘনা ঘাট এবং এ ধরনের নির্জন নদীতীরে ধরে আনা মানুষদের নিয়ে গুলি করে হত্যা করে লাশ পানিতে ভাসিয়ে দিতে শুরু করে। অক্টোবরের দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বেড়ে গেলে পাকিস্তানি জান্তা গণহত্যার ধরন পাল্টায়। তখন নদীর পাড়ের পরিবর্তে তারা ওয়াপদা কলোনির ভেতরে গণহত্যা চালায়। কলোনির পুকুরে, পুকুর পাড়ে এবং সীমানা প্রাচীরের ওপর দিয়ে পেছনের জলাভূমিতে লাশ ফেলে মাটিচাপা দিতে আরম্ভ করে। এ ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ঘাঁটি, হিন্দুপ্রধান এলাকা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারীদের লক্ষ্য করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার-আলবদর অতর্কিতে আক্রমণ করে গণহত্যা চালাতে থাকে। এভাবে চলতে থাকে ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তানিদের ভোলা ছেড়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। পাকিস্তানিরা রাজাকারদের সহযোগিতায় অতর্কিতে বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাসহ বহু সাধারণ মানুষ হত্যা করে। ২৭ অক্টোবর তারিখে টনির হাট বর্তমান বাংলাবাজারে ভোর রাতে ঘুমন্ত মানুষের ওপর হামলা চালিয়ে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাসহ কয়েকশ’ সাধারণ মানুষ হত্যা করে। একই তারিখে ঘুইঙ্গার হাট বাজারে হামলা চালিয়ে শতাধিক মানুষকে হত্যা করে। এভাবে চলতে থাকে তাদের হত্যালীলা। ৩০ অক্টোবর বোরহানউদ্দিন বাজারে হামলা চালিয়ে কয়েকশ’ মানুষকে হত্যা করে। একই সাথে বোরহানউদ্দিন বাজারে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় অনেক দোকানপাট। এমনকি মসজিদের ভেতরে আটকে রেখেও মানুষকে হত্যা করে তারা। হত্যা, নির্যাতন, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ একদিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি। রাজাকাররা রাতের আঁধারে প্রতিদিনই কোনো না-কোনো বাড়ির নারী-পুরুষকে ধরে নিয়ে যেত পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে। ধরে নেওয়া এসব নারীকে তারা নানাভাবে নির্যাতন করত, নির্যাতনে অনেকেই মৃত্যুবরণ করত। পুরুষদেরও নির্যাতন করে এক সময় ক্যাম্পেই গুলি করে মেরে ফেলত। কখনও রাজাকার-আলবদর নিজেরাই হত্যা করত তাদের। এ ছাড়া ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা ভোলা ছেড়ে যাওয়ার দিন তারা খালের দু’পাশের গ্রামগুলোতে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে বহু সাধারণ মানুষকে হত্যা করে।

স্বল্প পরিসরে জেলার গণহত্যা ও নির্যাতনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। পাঠকের জ্ঞাতার্থে এখানে কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ সংযুক্ত করা যেতে পারে। বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখিত গ্রন্থে সন্নিবেশিত রয়েছে।

একাত্তরে ভোলা জেলায় পাকিস্তানি বাহিনীর মূল ঘাঁটি ছিল ভোলা সদরের যুগীরঘোলের ওয়াপদা কলোনিতে। জেলার সবচেয়ে বড় গণহত্যাটিও হয় এখানেই। ভোলার পাকিস্তানপন্থি নেতারা খেয়াঘাটে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের অভ্যর্থনা জানায়। শুরুতে পাকিস্তানি সেনারা খুব স্বাভাবিক আচরণ করে। কিন্তু তার পরেও সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। ভোলা শহর জনশূন্য হয়ে পড়ে। পাকিস্তানি বাহিনী এর মধ্যে ভোলায় শান্তি বাহিনী গঠন করে। গঠন করে পেশাদার খুনি বাহিনী আলবদর, আলশামস, রাজাকার। এ সময় তারা জিপে করে ভোলার বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করত এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করত। চারদিকে নিস্তব্ধ নীরবতা বিরাজ করছিল। তখন পাকিস্তানি বাহিনী শান্তি কমিটির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে ঘোষণা করে যে, আপনাদের কোনো ভয় নেই। যার যার কাজে ফিরে যান। হিন্দুদের উদ্দেশে বলা হলো, প্রেসিডেন্ট আপনাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। যার যার বাড়িঘরে ফিরে আসুন। নির্দেশিত সময়ের মধ্যে ফিরে না এলে বিনা বিচারে গুলি করে হত্যা করা হবে। তাদের এ ধরনের ঘোষণায় গ্রামের মানুষেরা আশ্বস্ত হয়ে অথবা আতঙ্কে ফিরে এসেছিল। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী এর পরই স্বরূপে ফিরে আসে। ভোলার বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের ধরে এনে ওয়াপদা কলোনিতে গুলি করে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে আবার কখনও পাকিস্তানি জল্লাদদের দ্বারা গলা কেটে হত্যা করা হতো। তেমনি এক জল্লাদ আবদুল্লাহর জবানিতে জানা যায় যে, প্রায় ৩০০ জন মানুষকে গলা কেটে হত্যা করেছিল সে। এমন কোনো রাত ছিল নাÑ পশুরা দশ-বারোজনকে হত্যা করেনি। প্রতিদিন ১০-১২ জনের এ হিসাব ধরলে ৭-৮ মাসে পাকিস্তানি বাহিনী শুধু ওয়াপদা কলোনির অভ্যন্তরে প্রায় তিন হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। আবার ওয়াপদার নির্যাতন কেন্দ্রে নির্যাতনের করণেও বহু মানুষ মারা যেত, যাদের ওয়াপদা কলোনির একাধিক স্থানে গণকবর দেওয়া হয়। এখানে অগণিত নারীকে এনে নির্যাতন করে। বহু নারী তাদের নির্যাতনে মারা যায়, আবার অনেককে তারা ভোলা ছেড়ে যাওয়ার আগে হত্যা করে। ভোলা ছেড়ে যাওয়ার আগে পাকিস্তানি বাহিনী তড়িঘড়ি করে বহু বাঙালি নারী-পুরুষকে হত্যা করে মাটিচাপা দেয়। তড়িঘড়ি করে মাটিচাপা দেওয়া এসব লাশের হাত-চুল-শরীরের বিভিন্ন অংশ বেরিয়ে ছিল। এখন পর্যন্ত ওয়াপদা কলোনিতে গণহত্যার শিকার যাদের নাম অথবা কিছু পরিচয় জানা যায় তারা হলেনÑ দৌলতখান উপজেলার মকরম আলীর ছেলে মোবারক আলী। তাকে শান্তি কমিটির লোক পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দেয়। ভোলা সদরের বাদশা মিয়া মোক্তারের এক মেয়ে, সাহেব আলী প-িতের দুই মেয়েকে হত্যা করে। সদরের মৌলভী তোফাজ্জল হোসেনকে ওয়াপদা কলোনিতে হত্যা করে। কালীবাড়ির শাহজাহান, সুবেদার আবুল কাদের, ডাক্তার আমিন উদ্দিন, মাওলানা আবদুস সোবহান, দৌলতখান উপজেলার দক্ষিণ জয়নগরের আবদুল মুনাফÑ এমন আরও অনেকে।

দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত ওয়াপদা কলোনি বধ্যভূমির চিত্র

বাংলাবাজারের অবস্থান দৌলতখান ও ভোলা সদর উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানে। ১৯৭১ সালে বাংলাবাজারের নাম ছিল টনির হাট। মোহাম্মদ টনি ছিল এলাকার অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার নামেই এই বাজারের নামকরণ করা হয়েছিল টনির হাট। মে মাসে পাকিস্তানিরা ভোলায় এলে অন্যদের সাথে টনি মিয়াও পাকিস্তানিদের স্বাগত জানায়। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাতে ভোলা ও বাংলাবাজার এবং চারপাশের এলাকার মানুষের জীবন বিভীষিকাময় করে তোলে মোহাম্মদ টনি। তার নির্যাতনের শিকার হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। সাধারণ মানুষকে রাজাকারদের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাবাজারে ঘাঁটি গড়ে তোলে। ভোলা সদরের যে রাস্তা বাংলাবাজারের ওপর দিয়ে গেছে সেই সংযোগস্থলে ছিল টনির হাট ব্রিজ। এ রাস্তা দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করত। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা এখানে পাকিস্তানিদের প্রতিহত করতে অবস্থান নেয়। তারা এখানে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়। একাধিক ট্রেঞ্চ খনন করে। বাংকার তৈরি করে এবং রাতভর ভোলামুখী অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানিদের আসার অপেক্ষা করে। কিন্তু মোহাম্মদ টনি মুক্তিযোদ্ধদের এ পরিকল্পনা পাকিস্তানিদের জানিয়ে দেয়। মোহাম্মদ টনি ভোলার মূল সড়ক দিয়ে না এসে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদীর বাঘমারা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে। পাকিস্তানি সেনারা যে এ বিকল্প পথটি ব্যবহার করতে পারে তা মুক্তিযোদ্ধাদের ধারণার বাইরে ছিল। ২৭ অক্টোবর ভোররাতে রমজানের সেহরি খাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অনেকে অবার ঘুমিয়েও পড়েছিল। কারণ পাকিস্তানিদের আক্রমণের কোনো তথ্য তাদের কাছে ছিল না। সেদিন বাংকারে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নিয়েছিল। এ অবস্থায় পেছন থেকে পাকিস্তানিরা নির্বিচারে গুলি চালায়। টনির হাট ব্রিজের গোড়ায় নিজেদের খনন করা বাংকারে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে পাকিস্তানি হায়েনারা। এখানেই পাকিস্তানিরা ক্ষান্ত হয়নি। তারা বাংলাবাজার ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যাপক গণহত্যা ও লুটতরাজ চালায় এবং বাংলাবাজারের দোকানগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বোরহানউদ্দিনের গঙ্গাপুর ইউনিয়নের জেবল ফকির পাকিস্তানিদের গুলিতে আহত হয়ে পড়ে থাকে। লোকমুখে সংবাদ পেয়ে তার ছেলে নূরুল হক নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ছুটে আসে বাবাকে নিয়ে যেতে। কাঁধেও তুলে নেয় বাবার আহত শরীর। কিন্তু সে অবস্থায় রাজাকারের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে বাবা ও ছেলে। দু’জনের স্থান হয় বাংলাবাজারের কোনো এক গণকবরে। মুক্তিযুদ্ধের পর টনির হাটের নাম হয় বাংলাবাজার। বাংকারের মধ্যে যেসব মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়, তাদের অনেককেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কারণ এখানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যারা সমবেত হয়েছিল, তারা ভোলা ও বিভিন্ন অঞ্চলের লোক হওয়ায় বেশিরভাগের পরিচয় পাওয়া যায়নি। যারা দৌলতখান বা ভোলার ছিল তাদের অনেককেই তাদের আত্মীয়-স্বজনেরা ভয়ে নিতে আসেনি। ফলে বেশিরভাগের ভাগ্যে জুটেছে গণকবর। পাকিস্তানি বাহিনী এরপর বাজার এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকাতে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে। হতাহতের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ছিল শতাধিক আর অগণিত সাধারণ মানুষ। বাজারের বিভিন্ন স্থানে এদের গণকবর দেওয়া হয়। পরিখার মধ্যে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, তাদের লাশ পরিখায় গণকবর দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত বাংলাবাজার গণহত্যার শিকার ৩১ জন শহীদের নাম জানা যায়। ভোলা সদরের ভেলুমিয়া ইউনিয়নের শহিদ মুক্তিযোদ্ধা আলী ইসলাম ওইদিন বাংলাবাজারে সম্মুখযুদ্ধে শহিদ হন। জঙ্গলের মধ্যে অবস্থান গ্রহণকালে যুদ্ধরত অবস্থায় তিনি শহিদ হন। কিন্তু তার লাশ তার পরিবারের কাছে পৌছানো যায়নি, শেয়াল-কুকুরের খাদ্যে পরিণত হয়। ওইদিন বাংলাবাজারে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ মিলে কতজনকে হত্যা করা হয় তার সঠিক হিসাব আজও জানা যায়নি। কেননা এ আক্রমণটি ছিল এমন অতর্কিত যে, মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের সামান্য প্রস্তুতিটুকুও নিতে পারেনি। তবে ধারণা করা হয় তিনশ’রও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এসব শহিদের কবর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাংলাবাজারের বিভিন্ন স্থানে।

 জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বাজারে একটি বড় গণহত্যা সংঘটিত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা বোরহানউদ্দিন থানা দখল করে নেওয়ার পর তারা বোরহানউদ্দিন স্কুলে ঘাঁটি স্থাপন করে। ১৭ অক্টোবর পাকিস্তানি বাহিনী বোরহানউদ্দিন বাজারে প্রথম আক্রমণ করে। সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তারা প্রচ- মার খায়। ১৭ অক্টোবরের যুদ্ধে ৩৪ জন পাকিস্তানি হানাদার এবং ১২ জন দালাল খতম করে মুক্তিযোদ্ধারা। এর প্রতিশোধ নিতে ২৯ অক্টোবর ১৯৭১ ভোররাতে পাকিস্তানি সেনারা ঘুমন্ত মানুষের ওপর নির্বিচারে আক্রমণ চালায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধাসহ বহু নিরীহ মানুষকে। এদিন ভোলার পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে যোগ দেয় পটুয়াখালী, চাঁদপুর, বরিশাল ও নোয়াখালী থেকে আসা হানাদার বাহিনী। বোরহানউদ্দিন বাজার সম্পূর্ণ আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয় তারা। বোরহানউদ্দিন স্কুলে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি। তাই পাকিস্তানি বাহিনী স্কুলের প্রতিটি ভবনে আগুন দেয়। মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বেরিয়েছেন নুরুল ইসলাম মাস্টার, তাকে হত্যা করা হলো। বাজার-সংলগ্ন বাড়িতে মজিবর কেরানি ও তার দুই ছেলেকে ঘরের ভেতর রেখেই আগুন জ্বালিয়ে হত্যা করা হয়। চা দোকানি আবদুর রব মিয়া দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। সে অবস্থায় পেছন থেকে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। এভাবে সেদিন বোরহানউদ্দিন বাজার ও তার চারপাশে পাকিস্তানি বাহিনী যাকে পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছে। বর্বর বাহিনী বোরহানউদ্দিন বাজারের তিন দিক থেকে আগুন জ্বালিয়ে ঘর-বাড়ি, সরকারি-বেসরকারি অফিস, ডাকঘর, হাসপাতাল, রেজিস্ট্রি অফিস সম্পূর্ণ ভস্মীভূত আর লুট করে। চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা আর মানবশিশুর কান্না বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল। বোরহানউদ্দিনের তৎকালীন সার্কেল অফিসার এ অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনÑ পাকিস্তানিদের প্রচ- আক্রমণে মুক্তিবাহিনী রণে ভঙ্গ দেয়। পাকিস্তানি সেনারা অতঃপর বিভীষিকাময় কার্যকলাপ শুরু করে। বোরহানউদ্দিন বাজার ও এর আশপাশের সব ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ভস্ম করে। মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ মিলে একদিনে তারা শতাধিক লোককে নির্মমভাবে হত্যা করে।

দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত বোরহানউদ্দিন বাজার ও বোরহানউদ্দিন বাজার মসজিদ গণহত্যার স্থান

তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের অনিল সাধুর আখড়া ভোলা মহকুমার ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবার পরিচিত স্থান ছিল। ফলে এখানে আশ্রয় নিতে আসে বহু মানুষ। পাকিস্তানি জান্তা এখানে বর্বর আক্রমণ চালায়। শান্তি কমিটির কেরু মিয়া দক্ষিণে লালমোহনের দিক থেকে নদীপথে পাকিস্তানি বাহিনীকে গানবোটে করে নিয়ে আসে অনিল সাধুর আখড়ায়। এখানে এসে তারা এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। সাধুর আখড়ায় ভোলা থেকে বহু ব্যবসায়ী তাদের স্বর্ণালঙ্কার, নগদ অর্থ নিরাপদে রাখতে নিয়ে আসে। দালালদের নজর ছিল সেদিকে। ভোলা থেকে পালিয়ে আসা দু’জন ব্যবসায়ীকে পাকিস্তানিরা ধরে ফেলে। ঘটনাস্থলে তাদের নির্যাতন করে গাছের সাথে বেঁধে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে গুলি করে হত্যা করে। লুটপাট করে তাদের সম্পদ। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে আরও বহু সাধারণ মানুষকে।

উল্লেখিত কয়েকটি বিবরণ ১৯৭১ সালে ভোলা জেলায় পাকিস্তানি বর্বরতার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তৈরি করে। তবু এ চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় কতটা দাম দিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ করেছি। আজ বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে যে সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশ, একাত্তরে তা বাঙালি নিরপরাধ নারী-পুরষ-শিশুর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। দেশকে ভালোবেসেই কেবল আমরা এ রক্তের ঋণ শোধ করতে পারি।

 লেখক : মুক্তিযুদ্ধের গবেষক   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Pinterest
Instagram