বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস

বাংলাদেশের মানুষের অজেয় বীরত্ব ও বিশাল আত্মত্যাগের ফলে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়। মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সৃষ্ট স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস সুদীর্ঘ সূত্রে গ্রথিত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর এদেশের মানুষের আশা ছিল দেশের সব অংশের আশা-আকাক্সক্ষা পূর্ণ হবে। কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখা গেল, বিশেষ এক শ্রেণির স্বার্থে বিশেষ এলাকার প্রয়োজন অনুসারে এবং বিশেষ এক লক্ষ্যকে সামনে রেখে পাকিস্তানের রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে।

রিষিণ পরিমল

বাংলাদেশের মানুষের অজেয় বীরত্ব ও বিশাল আত্মত্যাগের ফলে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়। মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সৃষ্ট স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস সুদীর্ঘ সূত্রে গ্রথিত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর এদেশের মানুষের আশা ছিল দেশের সব অংশের আশা-আকাক্সক্ষা পূর্ণ হবে। কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখা গেল, বিশেষ এক শ্রেণির স্বার্থে বিশেষ এলাকার প্রয়োজন অনুসারে এবং বিশেষ এক লক্ষ্যকে সামনে রেখে পাকিস্তানের রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে। এ কারণেই পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থার সাথে বাঙালি একাত্মতা অনুভব করতে পারেনি। স্বল্পকথায়, পূর্ববাংলার নবজাগ্রত মধ্যবিত্ত শ্রেণির আশা ভঙ্গের কারণেই মূলত পাকিস্তানের শাসকচক্রের সাথে পূর্ববাংলার জনগণের বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়। পাকিস্তানের শাসক-গোষ্ঠী প্রথম হতেই বাঙালিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। তারা বাঙালি মুসলমানদের প্রকৃত মুসলমান মনে করত না। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অনৈসলামিক ও হিন্দু-ঐতিহ্য হতে উদ্ভূত বলে মনে করত এবং পূর্ববাংলায় ভারতের প্রভাব বেশি মনে করে তারা বাঙালিদের প্রতি আরও বেশি সন্দিহান হয়। এসব কারণেই পাকিস্তানের শাসক-গোষ্ঠী বাঙালিদের পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রকৃত মুসলমান বানাতে ও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করে বাঙালিদের হিন্দু-সংস্কৃতির মূল উচ্ছেদ করতে তৎপর হয়ে ওঠে। বাঙালিদের দাবি ছিল বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার। এই ন্যায়সংগত দাবিকে উপেক্ষা করে পাকিস্তানি শাসকচক্র সিদ্ধান্ত নেয় যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। বাংলা ভাষার প্রশ্নে বাঙালিরা প্রথম আন্দোলনে নামে এবং রক্তে রাজপথ রাঙিয়ে দেয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির মূলে এই ভাষা-আন্দোলনের বিরাট ভূমিকা কার্যকর। ভাষা-আন্দোলনের মধ্য দিয়েই প্রথম পাকিস্তানি শাসক ও শোষক এবং তাদের তল্পিবাহকদের বিরুদ্ধে বাঙালিমনের বিদ্রোহ প্রকাশ পায় এবং সর্বপ্রথম বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ সংঘবদ্ধ হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের উৎপীড়ন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাঙালিদের বঞ্চনা, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের অভাব ও ইসলামের নামে পূর্ববাংলাকে উপনিবেশে রূপান্তরিত করা বাংলাদেশের জন্মের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের জন্ম নিহিত রয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সর্বপ্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রাণ পায় অর্থাৎ বাঙালিরা উপলব্ধি করে যে, তারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের থেকে স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্যবোধে উজ্জীবিত বাঙালি ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের মধ্য দিয়ে সর্বপ্রথম তাদের রাজনৈতিক শক্তি বিকশিত করে। এরপর যুক্তফ্রন্ট সরকার বরখাস্তকরণ, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন জারি এবং সামরিক সরকারের দমননীতি সত্ত্বেও ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন ও ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে বাঙালি জাতি আত্মবিশ্বাস লাভ করে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এর দৃঢ় প্রকাশ দেখা যায়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে। কিন্তু নির্বাচিত প্রার্থীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। অতঃপর ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি হত্যায় নামে। নিরস্ত্র বাঙালি জাতীয় চেতনায় দু’কূল ছাপিয়ে ক্রমেই শক্তিশালী হয় এবং দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীনতার বিজয় পতাকা ছিনিয়ে আনে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয় জীবনে অপরিমেয় ত্যাগ, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, রক্তপাত ও সাফল্যের সূর্যোদয় গৌরবময়। ইতিহাসের যে গতিশীল ও দ্বন্দ্বময় ধারা পলাশির বিপর্যয় (১৭৫৭) থেকে শুরু করে বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫), লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০), দেশ বিভাগ (১৯৪৭), ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-১৯৫১), ১৯৫৪’র নির্বাচন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন প্রভৃতি ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জীবনে সেই ঐতিহাসিক নিয়মেরই চরম পরীক্ষা।

এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতি এক বিন্দুতে মিলিত হওয়ায় আর্থ-সামাজিক- রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জীবনের গুণগত রূপান্তরের পথ যেমন প্রশস্ত হয়, তেমনি দীর্ঘকালের ঔপনিবেশিক শাসন ও নিপীড়ন জাতির সৃষ্টিশীলতায় যে সংগ্রামশীল জীবনদৃষ্টি ও ভবিষ্যৎস্পর্শী কল্পনার পুঞ্জীভবন ঘটেছিল, তার গঠনমূলক রূপায়ণের পথও বাধামুক্ত হয়। বাঙালির ভাষা-সমাজ -সংস্কৃতি- ইতিহাস প্রভৃতিকে উপেক্ষা করে। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠিত হওয়ায় শুরু থেকেই তারা অস্তিত্বের প্রশ্নে সংগ্রামমুখর হয়ে ওঠে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে ইতিহাস ও জাতীয় জীবনের  মাইলফলকরূপে চিহ্নিত করে তারা চিন্তা- চেতনায় একীভূত হয়ে এদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে ত্বরিতগতি দান করেছে। ১৯৪৭-এর পর আমাদের সংকট- সমস্যার, সংহতির, সংগ্রামের ও বিজয়ের চারটি স্তম্ভ, চারটি বিকন রশ্মি, চারটি মিনার। এক. বায়ান্নর ভাষা সংগ্রাম, দুই. বাষট্টির শিক্ষাদ্রোহ, তিন. ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান এবং চার. একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এগুলোই আমাদের ঐতিহ্যের স¤পদ।

এরকম ঐতিহ্য ও চেতনাশ্রয়ী হয়েই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের ক্রমিক বিস্তার। উপন্যাস জীবনঘনিষ্ঠ শিল্প হওয়ায় তা সমকালীন সমাজের আর্থ- সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতাকে ধারণ করে। একারণেই আমাদের সমকালীন সব আর্থিক সামাজিক -সাংস্কৃতিক-রাষ্ট্রিক সংকট- সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ- চেতনাকেই স¤পদ ও সম্বল করা ফলপ্রসূ বলেই আবশ্যিক।

কেননা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতিরূপে আত্মপ্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপের বিকাশ ঘটে। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রভাবে পরিবর্তিত জীবনের ছায়া সাহিত্যের জগৎটাকেও পরিবর্তিত করেছে। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকেই এ পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটেÑ যা একাত্তরে বাঙালি-জীবনের আত্মা ও দেহে সঞ্চালিত হয়। বাহান্নর আন্দোলন ছিল মূলতই ঢাকাকেন্দ্রিক, কিন্তু তার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ছিল সমগ্র দেশব্যাপী। আর একাত্তরের ঘটনাস্থান গোটা বাংলাদেশ, সংকটের চেহারা ভয়াবহÑ প্রতিক্রিয়া একেবারে প্রত্যক্ষ এবং মর্মমূলস্পর্শী। তখন নগর গ্রাম সব একাকার হয়ে যায়। সব মানুষ যেন অকস্মাৎ গ্রামবাসী হয়ে যায়। বাহান্নতে তাদের ভাষা-সংস্কৃতি এবং মানসিক অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়েছিল। একাত্তরে তার গোটা অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে।

কিছু দেশদ্রোহী দালাল ছাড়া সমগ্র দেশের সাধারণ মানুষ জাতীয় আত্মপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। কেউ কেউ প্রত্যক্ষভাবে কলম ছেড়ে অস্ত্র ধরেছিল আবার কেউ কেউ বন্দুককে অভিনব কলম ভেবেছিল। বেদনাবহ ও  মহিমাময় এই অনাস্বাদিত ও বিস্ময়কর অভিজ্ঞতাকে এড়িয়ে গিয়ে অন্য ধরনের সাহিত্য সৃজন এদেশের সাহিত্যিকদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাই স্বাধীন বাংলাদেশের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ এক অপরিহার্য উপাদান। কথাসাহিত্য, বিশেষত উপন্যাস সাহিত্যে এর ব্যত্যয় দুর্লক্ষ। মুক্তিযুদ্ধ-প্রাণিত উপন্যাস- গুলোতে আমরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৫শে মার্চের নির্মম হত্যাকা-, যুদ্ধচলাকালে সারাদেশে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর বর্বর অত্যাচার-নির্যাতন, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সাহসী সংগ্রাম, যুদ্ধচলাকালে বাংলাদেশে অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের যন্ত্রণাদগ্ধ দুঃস্বপ্নভরা দিনযাপন, বর্বর শত্রুর দ্বারা বন্দিশিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্যাতন, পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দালাল-দোসর দ্বারা নারী ধর্ষণ এবং হত্যা প্রভৃতি আলেখ্যের পাশাপাশি নতুন জীবনের আকাক্সক্ষা, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন-সাধ- নির্ভর চিত্র প্রতিফলিত হতে দেখি। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসে বাঙালির যে আত্ম-অন্বেষণের আকাক্সক্ষা বাক্সময় হয়ে উঠেছে তা মূলত মুক্তিযুদ্ধপূর্ব ঐতিহ্যের অনুসারী। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ চলা  সময়ের প্রত্যক্ষ ঘটনা-সমৃদ্ধ উপন্যাসে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের গণহত্যা, মুক্তিসংগ্রামের শুরু, সংঘর্ষ, রক্তপাত, অকথ্য নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ, বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের গৃহে ফেরা প্রভৃতি বিধৃত হয়েছে। এ পর্যায়ের উপন্যাসগুলোর মধ্যে আনোয়ার পাশার (১৯২৮-১৯৭১) রাইফেল রোটি আওরাত (১৯৭৩), শওকত ওসমানের (১৯১৭-১৯৯৮) জাহান্নম হইতে বিদায় (১৯৭১), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), দুই সৈনিক (১৯৭৩), জলাংগী (১৯৭৪), রশীদ করীমের (জ. ১৯২৫), আমার যত গ্লানি (১৯৭৩), সৈয়দ শামসুল হকের (১৯৩৫-২০১৬) নীল দংশন (১৯৮১), নিষিদ্ধ লোবান (১৯৮১), মৃগয়ায় কালক্ষেপ (১৯৮৬), শওকত আলীর (জ.১৯৩৬) যাত্রা (১৯৭৬), রাবেয়া খাতুনের (জ. ১৯৩৫) ফেরারী সূর্য (১৯৭৪), মকবুলা মনজুরের (জ. ১৯৩৮) শিয়রে নিয়ত সূর্য (১৯৮৯), মাহমুদুল হকের (১৯৪৩-২০০৮) জীবন আমার বোন (১৯৭৬), খেলাঘর (১৯৮৮), রশীদ হায়দারের (জ. ১৯৪১) খাঁচায় (১৯৭৫), অন্ধ কথামালা (১৯৮২), আমজাদ হোসেনের (জ. ১৯৪২) অবেলায় অসময় (১৯৭৫), ঝর্ণা দাশপুরকায়স্থের বন্দী দিন বন্দী রাত্রি (১৯৭৬), আহমদ ছফার (১৯৪৩-২০০১) ওঙ্কার (১৯৭৫), অলাতচক্র (১৯৯০); মিরজা আবদুল হাইয়ের (১৯১৯-১৯৮৪) ফিরে চলো (১৯৮১), তোমার পতাকা (১৯৮৪), শামসুর রাহমানের  (১৯২৯-২০০৬) অদ্ভুত আঁধার এক (১৯৮৫), সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের (জ. ১৯৫৩) জীবনতরু, সেলিনা হোসেনের (জ. ১৯৪৭) হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬), মাহবুব সাদিকের (জ. ১৯৪৮) বারুদগন্ধ দিন (১৯৭৩), বেগম জাহান আরার অয়নাংশ (১৯৮৩), হুমায়ূন আহমেদের (জ. ১৯৪৮) শ্যামল ছায়া (১৯৭৩), সৌরভ (১৯৮৪), আগুনের পরশমণি (১৯৮৬), ১৯৭১ (১৯৮৬), ইমদাদুল হক মিলনের (জ. ১৯৫৫) কালো ঘোড়া (১৯৮৩), ঘেরাও (১৯৮৫) উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো কথাসাহিত্যেও বিশেষত উপন্যাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বিষয় হিসেবে নবতর সংযোজন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে আনোয়ার পাশার রাইফেল রুটি আওরাত সর্বপ্রথম লিখিত উপন্যাস। যুদ্ধ চলাকালে এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে  এটি লিখিত হয়েছিল অর্থাৎ ১৯৭১-এ যখন অবরুদ্ধ ঢাকায় দেশপ্রেমী জনগণ সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করছিল, সেই দুঃসহ ও ভয়াবহ পরিবেশে অবস্থান করে আনোয়ার পাশা এ গ্রন্থটি রচনা করেন। এতে ২৫শে মার্চের কালরাত্রির হত্যাকা-ের এবং তৎপরবর্তী কয়েক দিনের হত্যাযজ্ঞ ও অগ্ন্যুৎসবের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এ উপন্যাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক বাঙালি নিধনের নির্মম ও নারকীয় অভিজ্ঞতা বর্ণিত। যেমন : নীলক্ষেতের পরিত্যক্ত রেললাইনের দু’পাশে বাস করত হাজার হাজার গরিব মানুষ। নানা সময়ে ঝড়ে-বন্যায় গ্রামবাংলার লক্ষ লক্ষ বাস্তুহারা শহরে এসেছেÑ তারাই এখানে এসে হয়েছে বস্তিবাসী। সেই গরিব মানুষের বস্তি পুড়িয়ে অশেষ বীরত্ব দেখিয়ে গেছে পাক-ফৌজ।

এ উপন্যাসে আনোয়ার পাশা বাস্তববাদী শিল্পীর নিরাসক্তিতে একাত্তরের ২৫শে মার্চের নারকীয় অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করেছেন। এই অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া সুদীপ্ত শাহিনকে এবং পাঠককে একই সাথে আতঙ্কিত, রক্তাক্ত ও শিহরিত করে। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সুদীপ্ত শাহিন তার অবস্থানগত শ্রেণির দ্বন্দ্ব ও সংশয় থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধের মূলধারার সাথে মিলিত হতে পেরেছিলেন। তবুও মুক্তিযুদ্ধের কারণ অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছেন এবং স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর থেকেছেন। এ উপন্যাসে চিত্রশিল্পী আমান চরিত্রের আকাক্সক্ষার মধ্য দিয়ে লেখকের আশাবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সুদীপ্ত শাহিন মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অস্ত্রধারণ না করে বরং অস্ত্রধারীর সহযোগী শক্তিরূপে নিয়োজিত ছিলেন। মূলত আনোয়ার পাশা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই সত্যই প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন যা তার গ্রন্থের  নায়ক সুদীপ্ত শাহিন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ঔপন্যাসিক নিজেই সুদীপ্ত শাহিন। তাই আত্মজৈবনিক বিশ্লেষণই তাঁর রচিত রাইফেল রোটি আওরাত উপন্যাসে প্রধান হয়ে উঠেছে। শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রথম উপন্যাস জাহান্নম হইতে বিদায়। এ উপন্যাসটিও রাইফেল রোটি আওরাত-এর মতো যুদ্ধ চলাকালে রচিত এবং ১৯৭১ সালেই ভারতের কলকাতা থেকে মুদ্রিত  ও প্রকাশিত। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের নারকীয় গণহত্যার বিভীষিকাময় বর্ণনা উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র স্কুলশিক্ষক গাজী রহমান ঢাকা থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পথে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, খোলা এবং তাজা চোখসহ লাশের  সারি, কাটা মু-ুধড়হীন হাত, মৃত উলঙ্গ রমণীর দুই ঊর্ধ্বমুখী পায়ের মাঝখানে বেয়নটের খোঁচা।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হিংস্র তা-বে হতশ্রী বাংলাদেশকে শওকত ওসমান জাহান্নামের প্রতীকে দেখাতে চেয়েছেন। ফলে জাহান্নম হইতে বিদায় উপন্যাসে মধ্যবিত্ত গাজী রহমানের স্বদেশ থেকে পলায়নপর মানসিকতার রূপায়ণ ঘটেছে। জাহান্নম হইতে বিদায় কাহিনি-নির্ভর নয়, চিত্রধর্মী উপন্যাস। তবে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিকতা বা গাজী রহমানের সমগ্র জীবনচিত্র এতে স্থান পায়নি। গাজী রহমানের অভিজ্ঞতা-সূত্রে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের খ- খ- চিত্র বা জীবন-রূপ এ উপন্যাসে সাংকেতিকভাবে অঙ্কিতÑ যা সামগ্রিকতার ইঙ্গিতবাহী। এ উপন্যাসে গাজী রহমান ঔপন্যাসিকের বিবেকরূপে চিহ্নিত। উপন্যাসটির কলেবর সংক্ষিপ্ত, কাহিনিবিন্যাসে কল্পনার স্থান গৌণ। তাঁর নেকড়ে অরণ্য উপন্যাসেও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পাশবিক অত্যাচারের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী একাত্তরের যুদ্ধ-সংঘাতময় দিনগুলোতে বাঙালি নারীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছেÑ তারই বাস্তবচিত্র নেকড়ে অরণ্যে বিধৃত। একটি বিরাট গুদামঘরে শত বন্দিনীর সাথে তনিমা, জায়েদা, সখিনা আমোদিনী ও চাষী বৌ রশীদার বন্দি জীবনের দুঃখ কাহিনি ঔপন্যাসিক অত্যন্ত সচেতনভাবে বাস্তবানুগ করে নির্মাণ করেছেন। অর্থাৎ যে যন্ত্রণার বিনিময়ে স্বাধীনতা পাওয়া গিয়েছে তাকে এবং স্বাধীনতাকে একত্রিত করে মনের মধ্যে রাখা হয়েছে এই বইটিতে।

নেকড়ে অরণ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর হিংসা ও লালসায় বিপন্ন বাঙালি নারীর বিনষ্ট  জীবনরূপের চিত্রায়ণ এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন পৃথক পৃথক বিচ্ছিন্ন ঘটনার গ্রন্থন হওয়া সত্ত্বেও আমাদের মুক্তিসংগ্রামের একটি অনন্য দলিলরূপে পরিগণিত। এ উপন্যাসও কাহিনি-নির্ভর নয়, চিত্রধর্মী-স্মৃতিচিত্রের ধরনে রচিত। এতে কাহিনি বা চরিত্রগুলোর বিকাশ ঘটেনি। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ একটি দিকের বর্ণনা প্রাধান্য পেয়েছে। উপন্যাসটির নেকড়ে অরণ্য নামকরণ যুক্তিযুক্ত। ‘দুই সৈনিক’-এর বিষয়েও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে রাজনৈতিক মতাদর্শের যে কোনো মূল্য ছিল  না এবং তারা যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকারকারীদেরও ক্ষতিসাধন করেছিলÑ সে কথাটি ঔপন্যাসিক এ গ্রন্থে উপস্থাপন করেছেন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কিছু সংখ্যক স্বাধীনতাবিরোধী বাঙালি পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে দোসরতা তৈরি করে বাঙালিকে হত্যার সহযোগিতা করেÑ এ তথ্যও  এতে পরিবেশিত। ঔপন্যাসিক পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে বাঙালির এরূপ দোসরতা যে আত্মহত্যারই  নামান্তরÑ এ সত্যই এ গ্রন্থে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হলেও যুদ্ধ হত্যা-অগ্নিকা-ের দৃশ্যের বর্ণনা এখানে অনুপস্থিত। দুই সৈনিক উপন্যাসের কাহিনির পরিসর স্বল্পায়তন। একমুখী বা সরলরৈখিক মূলকাহিনি সীমিত চরিত্রের মধ্য দিয়ে বিকশিত। এর কাহিনির প্রথমাংশ বর্ণনাত্মক এবং অপরাংশ নাটকীয় সংলাপের মাধ্যমে গঠিত। শওকত ওসমানের জলাংগী উপন্যাসেও স্বাধীনতা  সংগ্রামের মর্মন্তুদ কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। পঁচিশে মার্চের অব্যবহিত ঘটনাক্রম, জাতীয় জীবনের কৌতূহল ও উৎকণ্ঠা, পাকিস্তানি অপশক্তির পাশব বর্বরতা, গ্রামাঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি প্রভৃতি প্রসঙ্গের বস্তুনিষ্ঠ বিন্যাস এ-উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য।

বাঁকাজোল গ্রামের প্রতীকে শওকত ওসমান মুক্তিযুদ্ধে বিধ্বস্ত গ্রামবাংলার বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছেন। জলাংগী খ-িত চিত্র নয়। এ উপন্যাসে জনজীবন, যুদ্ধ, অত্যাচার ইত্যাদি বিষয় স্থান পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পটভূমি তৈরির ইঙ্গিতসহ যুদ্ধ, যুদ্ধকালীন বাস্তবতা, রাজাকার- আলবদর বাহিনীর অপতৎপরতা, পাকিস্তানি সৈন্যদের নারকীয়  তা-ব- বর্বরতা এবং পৈশাচিক উল্লাস-বিকৃতি স্বল্প কলেবরে এতে ব্যঞ্জনাবহ হয়ে প্রস্ফুটিত। আমার যত গ্লানি উপন্যাসে রশীদ করীম মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে মধ্যবিত্ত বাঙালি মানসের দ্বিধা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব উন্মোচন করেছেন। বিভাগোত্তর কাল থেকে শুরু করে একাত্তরের ২৬শে মার্চ পর্যন্ত সময়কালের বিভিন্ন ঘটনা এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। বিশেষত ১৯৭০-এর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আক্রান্ত দেশ, নির্বাচন, গণপরিষদের অধিবেশন, শেখ মুজিব, ৭ই মার্চের ভাষণ, যুদ্ধের মুখোমুখি দেশ প্রভৃতি প্রসঙ্গ মধ্যবিত্ত মানসের প্রেক্ষিতে এতে উত্থাপিত হয়েছে। এখানেও পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক ২৫শে মার্চের হত্যাকা-ের চিত্র উত্থাপিত। যেমন : পঁচিশে মার্চ তারিখের রাতে ট্রাক-ভর্তি মরা মানুষ দেখা গেছে। একটা-দুটো নয়। ডজন ডজন ট্রাক। একটা দুটো মরা মানুষ নয়, শত শত। রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। সকলে আবার মরেওনি। পাশে, ওপরে, নিচে, মরা লাশ; সেই অনড় স্তূপের ফাঁক দিয়ে হঠাৎ একটা হাত একবার নড়ে ওঠে।

তবে তৎকালীন রাজনৈতিক তরঙ্গক্ষুব্ধতা ও গতিশীল ঘটনাস্রোতের মধ্যে প্রধান চরিত্র এরফান মিঞার রতিচেতনা, আত্মগত অনুভব এ গ্রন্থে প্রধান হয়ে উঠেছে। আত্মকথন রীতি বা ঔপন্যাসিকের জবানিতে উপন্যাসের কাহিনি বর্ণিত। সৈয়দ শামসুল হকের নীল দংশন ও নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাস দুটিও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ চিত্রনির্ভর। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে বাঙালি মাত্রকেই নির্যাতনের শিকারে পরিণত করেছিল এবং বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধ্বংসের নিমিত্তে সংস্কৃতিবান লোকদের হত্যা করেছিল নীল দংশন উপন্যাসে এ সত্যই প্রকাশ পেয়েছে। এর কাহিনিতে একাত্তরের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বাংলাদেশ আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ের চিত্র বর্ণিত হয়েছে। পাকিস্তানি পশুশক্তির ক্রমাগত নির্যাতনে নিরীহ বাঙালিও যে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে এ উপন্যাসের নজরুল চরিত্রটি তার উদাহরণ। ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এর ঘটনা সাজিয়েছেন। একাত্তরের যুদ্ধারোপিত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি সমগ্র দেশের হত্যাকা–ধ্বংস তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনায় : সমস্ত শহরের ওপর দিয়ে গুলির ঝড় বয়ে গেল, ট্যাংক গড়িয়ে গেল, বাড়ি ধসে পড়ল, লাশের পাহাড় জমে উঠল রাস্তার মোড়ে মোড়ে।

১০

নীল দংশন কাহিনি-নির্ভর নয়, চরিত্র-নির্ভর উপন্যাস। কাহিনি-অংশ বর্ণনাত্মক হলেও চরিত্রের সংলাপকে কেন্দ্র করে নাটকীয় ঢঙে উপন্যাসটি সুগঠিত। বাস্তববাদী ঢঙে লিখিত হলেও কাহিনিটি এলিগরি বা রূপকের ন্যায় বিন্যস্ত। তাছাড়া কাহিনির পরিণতিতে তার আর বাস্তবিকই বাস্তবতার নিগড়ে বাঁধা থাকে না। নীল দংশন উপন্যাসের পটভূমি, কাহিনির বিস্তার ও চরিত্রচিত্রণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। কাহিনি বর্ণনা ও চরিত্র সৃষ্টিতে ঔপন্যাসিকের বিশিষ্টতা গভীর মনোযোগের দাবিদার। সৈয়দ শামসুল হকের নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাসে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ও বিহারিরা যে শুধু ঢাকা শহরে নয়, বাংলাদেশের মফসসল শহরগুলোসহ গ্রামে-গঞ্জে নির্মম হত্যাকা- চালিয়েছে এবং বাঙালি নারীদের অমানবিকভাবে নির্যাতন করেছে তার শব্দরূপ লিপিবদ্ধ। বাংলাদেশের মফসসল শহরগুলো পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হতে শুরু করে ২৫শে মার্চের তিন-চার  মাস পরে। তারা সমগ্র দেশে যে হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ চালিয়েছে তার চালচিত্র ঔপন্যাসিক জলেশ্বরীর আক্রমণের মধ্য দিয়ে উপস্থাপিত করতে চেয়েছেন : জনপদে এখন কন্টিকারি ও গুল্মলতার বিস্তার, শস্য অকালমৃত, ফল কীটদষ্ট, ইঁদারা জলশূন্য। সড়কগুলো শ্বাপদেরা ব্যবহার করে এবং অরণ্যে লুকায়। দিন এখন ভীত করে, রাত আশ্বস্ত করে। বাতাস এখনো গন্ধবহ, তবে কুসুমের নয়, মৃত মাংসের।

১১

নিষিদ্ধ লোবানে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার পাশাপাশি রতিচেতনার আধিক্যও প্রবল। নিষিদ্ধ লোবানে জলেশ্বরীর প্রতীকে সমস্ত বাংলাদেশকেই ধারণ করতে চেয়েছেন ঔপন্যাসিক। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালি হত্যার পর তাদের যে শেষকৃত্য করত না এ কথাটিও এখানে উল্লেখিত। পাকিস্তানি সৈন্যরা পশু ও বাঙালিদের এক প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে তাদের অজস্র মৃতদেহ শেয়াল-শকুনের খাদ্যরূপে ফেলে  রাখত। এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিলকিস এতে অপমান বোধ করে এবং প্রতিবাদ জানায় অভাবনীয় ও অসম্ভব পদ্ধতিতে। নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাসটি স্বল্প-পরিসর এবং অল্প ক’টি চরিত্রের সমাবেশে গঠিত। বিলকিস চরিত্রকে কেন্দ্র করেই কাহিনির শ্রীবৃদ্ধি। বিলকিস জীবনবোধে উদ্দীপ্ত, মৃতব্যক্তিকে সম্মান দিয়ে সে জীবনের মর্যাদা দিতে চায়। বিলকিস ভিন্ন অন্যান্য চরিত্রের বিকাশ লক্ষযোগ্য নয়। বলা যায়, এটিও চরিত্র-নির্ভর উপন্যাস। এতে মুক্তির-সংগ্রাম বা বিজয় লাভের দৃশ্য অনুপস্থিত। উপন্যাসটি নাতিদীর্ঘ হলেও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা-সমৃদ্ধ হওয়ায় ব্যতিক্রমধর্মী। নজরুল ও বিলকিস চরিত্র দুটি মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত হয়েও স্বদেশ ও স্বসমাজের ক্রান্তিকালে চূড়ান্ত সম্ভাবনাময়, তৎপর ও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। মধ্যবিত্ত মানুষও, স্বশ্রেণির সমাজভূমি নিজের শেকড় ছিঁড়ে গেলে কী অভাবিত মাত্রায় বেড়ে উঠতে পারে, মধ্যবিত্ত মানসসীমা অতিক্রম করে অসামান্য সম্ভাবনায় দীপ্তিমান হতে পারে, দৃষ্টান্ত মেলে সৈয়দ শামসুল হকের নিষিদ্ধ লোবান এবং নীল দংশন উপন্যাস দুটিতে।

১২

তাঁর এ উপন্যাস দুটি নিরীক্ষাধর্মী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের পাশব অত্যাচারের বিভিন্ন পটভূমিতে দুটি সাধারণ মানুষের আন্তর্জাগতিক ক্রম-রূপান্তরের বাস্তবতা এ গ্রন্থ দুটিতে চিত্রিত। উপন্যাস দুটিতে মুক্তিযুদ্ধ-কালের বাঙালির সামগ্রিক জাগরণের ছবি নেই, এটি সমগ্র যুদ্ধের একটি খ-াংশের শিল্পরূপ-তবে নীল দংশন ও নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাস দুটি দর্পণের স্বরূপ-বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র রূপ এতে প্রতিফলিত হয়। তাঁর মৃগয়ায় কালক্ষেপ উপন্যাসের কাহিনিও মুক্তিযুদ্ধের চালচিত্র-সংবলিত। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন ও যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রশ্নে মধ্যবিত্ত বাঙালির মানস-সংকট এতে প্রকটভাবে উপস্থাপিত। হাদী চরিত্রের স্মৃতিচারণে কাহিনির সূত্রপাত। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক-কালে সে দেশত্যাগ করে লন্ডনে যায় এবং প্রবাসী বাঙালির সাথে তার সাক্ষাৎ-পরিচয়ের সূত্রে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা দেশপ্রেম, সাম্প্রদায়িকতা, ভারতের সমর্থন প্রভৃতি প্রসঙ্গে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে উন্মোচিত হয়েছে। বলা যায়, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-চলাকালে প্রবাসী মধ্যবিত্ত বাঙালির চারিত্র্য, চিন্তা-স্রোত তথা যাপিত-জীবনের রূপায়ণ। এ উপন্যাসের কাহিনির পরিসর স্বল্প, এতে কাহিনি বা চরিত্র  নয়, ঘটনাই মুখ্য। বিষয়ের ভিন্নতা তো বটেই, নিরীক্ষাধর্মিতার জন্যও মৃগায় কালক্ষেপ উপন্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ। শওকত আলীর যাত্রা উপন্যাসটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকের সময়কালের পটভূমিতে রচিত। এর প্রকাশকাল ১৯৭৬ সালে হলেও রচনাকাল ১৯৭২ সাল। ২৫শে মার্চের কালরাতে সংঘটিত নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞের পর মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুর দিনগুলোর ঘটনাবলি এতে বর্ণিত হয়েছে। এর বিষয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পাশবিক আক্রমণে ভীত ঢাকাবাসীর নিরাপদ আশ্রয়-সন্ধান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে প্রাথমিকভাবে সংগঠিত হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ। যাত্রা উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রচিত নয়, যুদ্ধ-পরবর্তীকালে অভিজ্ঞতা-স্মৃতি- কল্পনার সমন্বিত নির্মিতি। শওকত আলীর বর্ণনার প্রাখর্য ও প্রত্যক্ষতার দৃঢ়তার জন্য এতে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের উত্তাল পরিস্থিতি ও যুদ্ধবন্দি নানা সমস্যামূলক ঘটনার জান্তব পরিবেশের বাস্তবানুগ উদ্ভাসন ঘটেছে। যেমন : ওদিকে উত্তরে শহরের আকাশে এখনো ধোঁয়ার কু-লী। ডাইনে থেকে বাঁয়ে, গোনা যায় আজÑ একটা, দুটো, তিনটে-চারটে, পাঁচটা- ঐ যে আরেকটা, ওদিকে বাঁয়ে আবার আরেকটা আরম্ভ হয়েছে। তবু গোনা যায়। গতকাল গোনা যেত না।

১৩

এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অধ্যাপক রায়হান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী। একসময় প্রগতিশীল রাজনীতির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার প্রশ্নে আশাবাদী কিন্তু যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রশ্নে দোদুল্যমান, সংশয়গ্রস্ত। এ চরিত্রটি মধ্যবিত্ত মানসিকতার না-ঘরকা না-ঘাটকা স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের। রায়হান চরিত্রে মধ্যবিত্ত মানসিকতা প্রবলভাবে দৃশ্যমান। তিনি পঁচিশে মার্চের আগে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকা ত্যাগে মনস্থির করেন; কিন্তু পথের অসুবিধার কথা ভেবে তা থেকে বিরত হন।  পরবর্তীকালে ঢাকা আক্রমণের পর বুড়িগঙ্গা পার হয়ে গ্রামের পথে যাবার সময় আহত ছাত্র হাসান অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তাকে ফেলে রেখে চলে যেতে চান। পথ চলতে অক্ষম হাসানকে তিনি বোঝা মনে করে বিরক্তবোধ করেন। তাঁর স্বগতোক্তিতে তা ¯পষ্ট : কী দায় পড়েছে যে, পথের একটি অপরিচিত রুগ্ন মানুষের দেখাশুনা করতে হবে। চারিদিকে এমনি অসহ্য অবস্থাÑ তার নিজেরই সবকিছু অনিশ্চিত, সে নিজেই ভবিষ্যতের কথা ভেবে উঠতে পারছে না, তবু তাকেই কেন এ দায়িত্ব নিতে হবে?

১৪

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নেতৃত্বদানের সুযোগ পেয়েও যুদ্ধে না গিয়ে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিরাপত্তা ও পুরনো জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যের সন্ধানে ব্যস্ত থাকেন। একাত্তরের যুদ্ধগন্ধী সময়ের জীবন-যন্ত্রণা ও অত্যাচারিত, নিগৃহীত মানুষের নানাবিধ সংকট-সমস্যার মধ্যেও উপন্যাসের অন্য চরিত্র হাসান আশাবাদী। সে রায়হানের মতো আত্মসুখ সন্ধানী এবং সে কারণে গ্লানিবোধে ভারাক্রান্ত নয় বরং যুদ্ধজয়ের আকাক্সক্ষা বুকে চেপে উচ্চারণ করে, ‘এখন আমাদের জীবনের আরেক নাম হয়ে উঠেছে স্বাধীনতা।’

১৫

এ উপন্যাসে মধ্যবিত্তের চিরন্তন সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে দেশের জন্য আত্মত্যাগের মহিমা মুখ্য হয়ে ওঠেনি। যাত্রা বর্ণনামূলক উপন্যাস, দিনলিপি বা ডায়েরিসদৃশ রচনা। বলা যায়, ঔপন্যাসিকের আত্মজীবনীর প্রতিচ্ছায়ায় পরিব্যাপ্ত। মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক চিত্র এখানে নেই। স্বাধীনতা বা মুক্তির প্রশ্নে কেন্দ্রীয় ঐক্যের উপস্থিতিও লক্ষ করা যায় না। চরিত্রগুলোর সংলাপে খেদ-প্রকাশক শব্দ উচ্চারিত হলেও ঔপন্যাসিকের বর্ণনা-চাতুর্য ও মন্তব্যের ভাষায় উষ্মা বা ক্ষুব্ধতাবাচক শব্দের ব্যবহার দুর্লক্ষ। উপন্যাসের কাহিনি গতিশীল। সে কারণে সংলাপে কাহিনির দীর্ঘ-অংশ গঠিত। যাত্রা উপন্যাসে পাকিস্তানি হানাদারদের চরিত্র চিত্রিত হয়নি, তাই উর্দু ভাষার ব্যবহার নেই। মধ্যবিত্তের মানসিকতার আরও ¯পষ্ট রূপায়ণ রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’। এই উপন্যাসে যুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ নগরজীবনের কাহিনি বিধৃত। ঢাকা শহরের ত্রিতল ফ্ল্যাটে অবরুদ্ধ ও আতঙ্কগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের অসহায়তা, নিরাশা, সংশয় এ গ্রন্থের উপজীব্য। অবরুদ্ধ পরিবারের সদস্যরা মুক্তির আকাক্সক্ষা পোষণ করে কিন্তু যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে। কখনও তাস খেলে, পান করে, রেডিও শুনে ভয়ভীতিতে দিন কাটায়। তারা আকাশে ভারতীয় বিমানবাহিনী ও পাকিস্তানি বাহিনীর যুদ্ধ দেখে এবং ইন্দিরা গান্ধীর রেডিও ভাষণে স্বাধীনতার আশ্বাস খোঁজে। মধ্যবিত্ত নগরজীবনের আত্মপরতা ও স্বপ্নবিলাসের মধ্যেও এ উপন্যাসে এক খ-িত বাস্তবতার চিত্র রূপায়িত। কথাশিল্পী রশীদ হায়দার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, পরিপার্শ্বে ঘটে যাওয়া বিচিত্র ঘটনা প্রভৃতির আলোকে যুদ্ধকালীন নিরাপত্তাহীন বাঙালির অস্তিত্বের-সংকট রূপায়িত করেছেন। উপন্যাসটি প্রত্যক্ষযুদ্ধের উন্মাতাল পরিস্থিতিতে রচিত হয়নি, তবে ঔপন্যাসিকের বর্ণনার প্রাখর্য, তাঁর অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও কল্পনার প্রসারতা একে যুদ্ধের সময়ের বাস্তব পরিবেশ দান করেছে। খাঁচায় উপন্যাসের কলেবর ক্ষুদ্র, কাহিনি সংক্ষিপ্তাকার। এতে যুদ্ধের তীব্রতা বা সামগ্রিক অবস্থা, যুদ্ধের অনিবার্যতায় বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ বা আত্মত্যাগ প্রভৃতির অনুপুঙ্খ বর্ণনা নেই। তবে গৃহবন্দি ক’টি পরিবারের কিছু মানুষের যুদ্ধের উত্তাল পরিস্থিতির অস্বস্তি-অস্থিরতা বা টেনশন ও বন্দিত্ব থেকে মুক্তির সুতীব্র আকাক্সক্ষার শব্দরূপ নির্মাণে ঔপন্যাসিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। খাঁচায় বর্ণনাত্মক উপন্যাস। ঔপন্যাসিক পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী কবলিত বাংলাদেশকে খাঁচার এবং বন্দি পাখিকে শৃঙ্খলিত বাঙালির  প্রতীকে অবলোকন করেছেন। অন্ধ কথামালা উপন্যাসটি রশীদ হায়দারের পরিণত সৃষ্টি। এর ক্যানভাসে সরাসরি মুক্তিযোদ্ধারা উঠে এসেছে। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের অব্যবহিত পরে একটি ব্রিজ ধ্বংসের পরিকল্পনা করতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ে বাঙালি যুবক বেলাল হোসেন বেলটু। তার বন্দিত্ব, নিরাপত্তাহীন ভবিষ্যৎ ও মৃত্যুতাড়না এবং সেই অবস্থায় তার স্মৃতিতে ভিড় জমানো অতীতের  ঘটনাবলি এই উপন্যাসে বিন্যস্ত। বেলাল তার কয়েক বন্ধুর সাথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রতিরোধকল্পে একটি ব্রিজ ধ্বংসের পরিকল্পনা করে। বেলালের উক্তিতে ব্রিজ অপারেশনের পরিকল্পনা সম্বন্ধে অবগত হওয়া যায় : ‘কথা হয় মোকসেদই প্রথম উঠবে, ওর অ্যালার্ম দেয়া ঘড়ি আছে। তিনটের ওদিকে ওঠে গনি, নওরেশ ও কাশেমকে ডেকে শেষে আমাকে ডাকবে, আমরা আড়াই মাইল দূরে বুড়িদর সাঁকো উড়িয়ে দিতে যাবো।

১৬

কিন্তু অপারেশন বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই বেলালের এক বন্ধু তাকে শত্রুপক্ষের হাতে ধরিয়ে দেয়। অন্ধ কথামালা উপন্যাসে কাহিনি নির্মাণে রশীদ হায়দার ফ্ল্যাশ-ব্যাক আঙ্গিকের আশ্রয় নিয়ে বেলাল নামক জনৈক যুবকের অন্তর্ময় স্মৃতিচারণার মাধ্যমে একটি জনপদ ও তার বাস্তব পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন। ফলে বিষয় অপেক্ষা বিষয়ের ব্যঞ্জনাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। অন্তর্বাস্তবতা-ধর্মী উপন্যাসে অর্থাৎ উপন্যাসে বহির্বাস্তবতার চেয়ে অন্তর্ময়তা প্রাধান্য পেলে বিষয় গৌণ হয়ে পড়ে। এ কারণে অন্ধ কথামালা বিষয় সমৃদ্ধ উপন্যাস হওয়া সত্ত্বেও জীবনের বস্তুসমগ্রতার উপস্থিতি এখানে ব্যাপকতর হয়ে ওঠেনি। বরং সময়ের দিক থেকে কাহিনিটি মাত্র কয়েক ঘণ্টার হলেও বেলাল নামক ব্যক্তির প্রতিক্রিয়ায় জাগ্রত স্মৃতি ও অনুভবের মধ্যে রশীদ হায়দার একটা জনপদ, তার অন্তর্গত ব্যক্তি ও সমষ্টি, ব্যক্তির প্রত্যাশা, অপ্রাপ্তি, সংকট ও যন্ত্রণার যে স্বরূপ উন্মোচন করেছেন, তা বাঙালি জীবনের সমগ্রতার স্পর্শ-শিহরণে তরঙ্গিত ও স্পন্দিত হয়ে উঠেছে।

১৭

আর তা বেলাল চরিত্রের আত্মকথন রীতিতে উন্মোচিত হওয়ায় অন্ধ কথামালা অন্তর্বাস্তবতা-ধর্মী শিল্পরূপে পরিণত হয়েছে। অন্ধ কথামালা বিশ্লেষণধর্মী নয়, এর কাহিনির বিন্যাস চিত্রধর্মী, অতিনাটকীয় ও কাব্যময়। এ উপন্যাসে বেলাল চরিত্র সৃজনে ঔপন্যাসিকের সদর্থক জীবন-ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। ঔপন্যাসিকের ব্যক্তি-উদ্ভূত ঘটনার মধ্যে সমষ্টিগত জীবনের সমগ্রতাকে অভিব্যক্ত ও খ-ের মধ্যে সমগ্রতা নির্মাণের দক্ষতার কারণে অন্ধ কথামালা সার্থকতা লাভ করেছে। মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষের খবরাখবর সংবলিত উপন্যাস। এর রচনাকাল ১৯৭২ সাল হলেও ১৯৭৩ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়। একাত্তরের উন্মাতাল অসহযোগ আন্দোলন থেকে ২৫শে মার্চের হত্যাকা-ের পটভূমিতে রচিত হলেও জীবন আমার বোন উপন্যাসে প্রতিবাদ ও দ্রোহের পরিবর্তে লিবিডোই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এ উপন্যাসে সাহসী কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা কোনো প্রতিরোধের কাহিনি না থাকায় এটিকে নিষ্ক্রিয় রোমান্টিকতা আক্রান্ত নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবন-যন্ত্রণার শব্দরূপ বলাই শ্রেয়। এ উপন্যাসের নায়ক খোকা সমাজ- সত্তা-বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি। সে ও তার বন্ধুরা নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করে দেশে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটতে পারে অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ায় বিচিত্র কিছু নয়। এর পরও তারা দেশের সংকট থেকে দূরে থাকে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এ উপন্যাসে নাগরিক মধ্যবিত্তের পলায়নপর মানসিকতার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গবাহী জীবন আমার বোন মূলত প্রেম ও রতিচেতনার আবহম-িত। মাহমুদুল হক এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সময় মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে অংশ নিরাপদে থাকার আকাক্সক্ষায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলেছে, তাদের ছবি এঁকেছেন। এ ছাড়া মধ্যবিত্তের সুবিধাবাদ, তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ, ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতির ব্যবহার ইত্যাদি অঙ্কিত হয়েছে। এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র খোকা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সে দ্বিধান্বিত। সে প্রবলভাবে কামসচেতন ও রিরংসাতাড়িত। প্রধান নারী চরিত্র নীলা ভাবিও অনুরূপ। মাহমুদুল হক অন্তর্ভাবনার ঔপন্যাসিক। তাই চরিত্রগুলোর আত্মবিশ্লেষণে তিনি বেশি আগ্রহী। জীবন আমার বোন অন্তর্বাস্তবতা-ধর্মী উপন্যাস, তবে এ উপন্যাসের প্রধান সুর রোমান্টিক। মুক্তিযুদ্ধ স¤পর্কে সদর্থক চেতনা এখানে অনুপস্থিত। তাঁর খেলাঘর উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ স্পষ্টতর। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকের যুদ্ধকেন্দ্রিক একটি বিষাদময় ঘটনা এর ভিত্তিভূমি। পাকিস্তানি বাহিনীর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া এবং তাদের প্রতিরোধে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের প্রস্তুতির চিত্র এতে বিধৃত। এর কাহিনির প্রধান চরিত্র তিনটিÑ রেহানা, ইয়াকুব ও মুকুল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা নির্যাতিত রেহানার জীবনকথা তার স্মৃতিচারণে বিবৃত। আর রেহানাকে আবর্তন করেই ইয়াকুব চরিত্রের বিকাশ। মুকুলের জীবনভাবনা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করেই ক্রম-অগ্রসর। তার ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়েই এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ উপস্থাপিত। খেলাঘর-এর কাহিনি স্বল্পায়তন, সাধারণ ও জটিলতাহীন তবে সুগ্রথিত। সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গ্রামীণ জীবনের ঘটনাপ্রবাহের আবেগায়িত শব্দরূপ। এই উপন্যাসে মূল ঘটনাটি অনেক পরে। বিস্তারিত পটভূমি নির্মিত হওয়ার পরে মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ পাওয়া যায়। অর্থাৎ ১৯৪৭-এর বিভাগোত্তর সময় থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় পর্যন্ত এ গ্রন্থের পটভূমির বিস্তার। এই বিস্তৃত পটভূমিতে উঠে এসেছে গ্রামীণ জীবনযাত্রা, নি¤œমধ্যবিত্ত মানুষের পরিণতি ও আকাক্সক্ষা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার ও নারী নির্যাতন, রাজাকার বাহিনীর অপতৎপরতা প্রভৃতি প্রসঙ্গ। উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা ও বিষয়বস্তুর এরূপ ক্রমবিন্যাসে ঔপন্যাসিকের জাতীয় ঐতিহ্যের মূল সন্ধানের প্রয়াস লক্ষণীয়। এতে কেন্দ্রীয় চরিত্রের ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে সামষ্টিক প্রাপ্তির আশায় আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ উল্লেখিত। উপন্যাসটিতে কেন্দ্রবিন্দু বুড়ি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বাদ বুড়ি চরিত্রটির মনোজগতের নানামুখী প্রক্রিয়ায় এবং সেই সাথে হলদী গাঁয়ের প্রতীকী অবস্থানে স¤পন্ন হয়েছে। হাঙর নদী গ্রেনেডের কাহিনি একরৈখিক নয়। প্রারম্ভিক অংশের চেয়ে শেষাংশের কাহিনির গতি দ্রুত। এতে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত চরিত্র নেই। সবক’টি চরিত্রের উৎস গ্রাম, কিন্তু উপন্যাসে গ্রামের আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষিত হয়নি। কাহিনি বর্ণনায় ঔপন্যাসিকের নিরাসক্তি ও গভীর জীবনোপলব্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। বুড়ি চরিত্র চিত্রণে ঔপন্যাসিকের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতা লক্ষযোগ্য। জলিলের মুখে অগ্নিকা-ের নির্মম বর্ণনা শুনে, সলীমের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে, রাজাকার বাহিনীর হাতে কলীমের মৃত্যু ও ফুলির ধর্ষিত হওয়া দেখে স্বাধীনতার জন্য অজপাড়াগাঁয়ের বুড়ির মনে দৃঢ়প্রত্যয় জাগে। তারপর মুক্তিযোদ্ধা কাদের ও হাফিজকে বাঁচাতে নাড়িছেঁড়া ধন বোবা সন্তান রইসকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। সেনাবাহিনী সোল্লাসে তাকে হত্যা করে। রইসের মৃত্যুতে বুড়ি বিচলিত হয় না। সে ভাবে এবং সিদ্ধান্ত নেয় বুড়ি এখন ইচ্ছে করলেই শুধু রইসের মা হতে পারে না। বুড়ি এখন শুধু রইসের একলার মা নয়।

১৮

বুড়ির এ ভাবনা শুধু আত্ম-প্রবোধ নয় চেতনার উদ্বোধন, উত্তরণ- আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার সীমা অতিক্রম করে সমষ্টির স্বার্থে জীবন উৎসর্গীকরণ। বুড়ি চরিত্রের এ চেতনাগত উত্তরণ ঔপন্যাসিকের সদর্থক জীবন-ভাবনা ও আশাবাদী জীবন-চেতনার দ্যোতক। বুড়ির মাতৃ-ইমেজ হলদী গাঁয়ের সীমাবদ্ধ পরিসর থেকে সমগ্র বাংলাদেশেই প্রসারিত করে দেয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। গ্রামীণ জীবন-কাঠামো, যুদ্ধের অভিঘাতে তার রূপান্তর, চরিত্রসমূহের বাস্তবানুগ ক্রিয়াশীলতা এবং সর্বোপরি বুড়ির আত্ম-উজ্জীবন এ উপন্যাসের জীবন- দর্শনকে করেছে সমগ্রতা¯পর্শী।

১৯

যদিও ঔপন্যাসিক হাঙ্গর নদী গ্রেনেডে স্বাধীনতার চরম প্রাপ্তিসংবাদ পরিবেশন করেননি তবে তা ইঙ্গিতের মাধ্যমে প্রকাশমান। সংকেতময়তার নানামুখীর আশ্রয় নিয়েছেন ঔপন্যাসিক। হলদী গ্রাম শুধু একটি গ্রাম নয়, অবরুদ্ধ বাংলাদেশের প্রতীক। বুড়ি চরিত্রের মধ্য দিয়ে অবরুদ্ধ দেশের মুক্তিকামী মানুষের আকাক্সক্ষা প্রতীকায়িত হয়েছে। আমজাদ হোসেনের অবেলায় অসময় উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামবাংলার চিত্র বিন্যস্ত হয়েছে। এর বিষয় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে ভীত-সন্ত্রস্ত গ্রামবাসীর নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে চলা। আত্মরক্ষার নিমিত্তে ছুটে চলার পথেই তারা প্রত্যক্ষ করেছে বাংলাদেশের শ্যামল গ্রাম বর্বর পাকিস্তানি সেনারা কতটা নির্মম ভাবে জ্বালিয়ে দিয়েছে। একই সাথে তারা এও অনুভব করেছে যে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে গণমানুষের চেতনা জাগ্রত হচ্ছে। যুদ্ধচলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর সন্ত্রাসময় প্রলয়ংকরী চিত্র অঙ্কিত করতে গিয়ে ঔপন্যাসিক দেখিয়েছেন : নিজের গ্রাম বলতে এখন শুধু ভয়ঙ্কর আকাশ-ছোঁয়া একটা আগুন, বিরাট একটা সবুজ তেপান্তর বোঝাই অজস্র ধোঁয়া। অসংখ্য কচি কচি সবুজ গাছ-গাছালির পোড়া পোড়া একটা গন্ধ। হাজার হাজার মানুষের দৌড়াদৌড়ির একটা বিকট শব্দ। অসংখ্য আর্তনাদ, চিৎকার। বুট জুতার লাথি। বুকে বুকে বেয়োনেট মারার নৃশংসতা। তারপর মুহূর্তে মুহূর্তে লাখো লাখো গোলা-বারুদের আকাশ ফাটানো আওয়াজ।

২০

‘অবেলায় অসময়’ উপন্যাসের যুদ্ধের ধ্বংসচিত্র ও নিরাশ্রয় মানুষের এতটুকু আশ্রয়ের জন্য হাহাকার রূপায়িত হলেও যুদ্ধরত বাঙালি জাতির সংগ্রামশীল জীবনাকাক্সক্ষা প্রাধান্য লাভ করেনি। উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র আত্মরক্ষার প্রচেষ্টাতেই ব্যস্ত। শেষ পর্যন্ত একটি নৌকা বিধ্বস্ত মানুষ নিয়ে সন্ত্রাসময় একটা অন্ধকারে, অচেনা অজানা অনিশ্চিত অকূল পথের দিকে অগ্রসর হওয়ার মধ্য দিয়ে এ উপন্যাসের সমাপ্তি। রাবেয়া খাতুনের ফেরারী সূর্য উপন্যাসেও মুক্তিযুদ্ধকালীন আক্রমণ- প্রতিআক্রমণের চিত্র পাওয়া যায়। তবে এ উপন্যাসে নাগরিক জীবনের বর্ণনার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি পশুশক্তির বর্বরতার কথা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী প্রতিরোধের কথা ব্যক্ত হয়েছে। এ উপন্যাসের পটভূমি একাত্তরের ২৫শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি। এ গ্রন্থে গেরিলা তৎপরতার ঘটনাগুলোর পাশাপাশি যুদ্ধকালীন সময়ের বিপন্নতা-নিরাপত্তাহীনতা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অসহায়ত্ব ঔপন্যাসিকের বাস্তব অভিজ্ঞতা সহকারে বর্ণিত হয়েছে। রাশা চরিত্রের অভিব্যক্তিতে এর প্রমাণ মেলে : জানালার ধারে কাৎ করা মাথাটা। বিস্ফারিত চোখ, গড়ানো আধ শুকনো রক্তের দাগ। মাথার ঘিলু তখনো গড়াচ্ছে। এইমাত্র গরাদের ফাঁকে মগজ ঠোকরাতে এসে উড়ে গেল যে কাক ছুটে। সেদিকে দ্বিতীয়বার তাকাতে পারলো না রাশা।

২১

একাত্তরের রক্তাক্ত ও বেদনাময় কাহিনি নিয়ে রচিত মকবুলা মনজুরের শিয়রে নিয়ত সূর্য উপন্যাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এক ভাগ্যবিড়ম্বিত নারীর বেদনাময় কাহিনি মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত পটভূমিকায় অঙ্কিত হয়েছে। ঝর্ণা দাশপুরকায়স্থের ‘বন্দী দিন বন্দী রাত্রি’ যুদ্ধকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিবিধ প্রসঙ্গের চিত্ররূপ। শিল্পগতভাবে উপন্যাসটি সাফল্য¯পর্শী না হলেও মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিত ও নির্যাতিত বঙ্গনারীদের হাহাকার এবং তাদের জন্য প্রার্থনা এতে উজ্জ্বলপ্রভ : ‘নতুন স্বাধীনতা পাওয়া বাঙলায় ফুলের মতো ফুটে ওঠা উন্মুখ কলিগুলো পাকিস্তানি পশুসৈন্যদের ধর্ষণের যে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের বোঝা বহন করছে, ওদের অন্ধকার জীবনে যেন বিধাতা তুমি সূর্য হয়ে দেখা দাও। এই অনাদৃতা হাজারো নারীর, এই পৃথিবীতে সম্মানজনক স্থান দাও।’

২২

এ উপন্যাসের বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আবেগ পরিস্ফুট। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ঘটনা বা চরিত্রনির্ভর না হলেও মুক্তিসংগ্রামের মূল আকাক্সক্ষার সঙ্গে স¤পর্কযুক্ত উপন্যাস আহমদ ছফার ওঙ্কার। একজন বোবা মেয়ের পরিবর্তন-পর¤পরার রূপায়ণে বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণের অন্তর্সত্য এ উপন্যাসে বিধৃত। ঔপন্যাসিক একটা বোবা মেয়ের কথা বলে ওঠার প্রতীকে বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্ম স¤পর্কে আলোকপাত করেছেন। তার প্রথম শব্দ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামের একটি রাষ্ট্র এবং বাঙালি জাতির আত্মপ্রকাশের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ভারতীয় পুরাণ মতে, ওঙ্কার হচ্ছে আদ্যধ্বনিÑ সকল ধ্বনির মূল। বাহ্যজগতে সেই ধ্বনি শ্রুত হোক বা না হোক চেতনে ও মননে তা সর্বদা বিরাজিত। সেই চেতনা বোবা মেয়েতে ছিল। তাই সে মুক্তি চেয়েছে। বাঁচার অধিকার চেয়েছে, অন্যসব সভ্যসমাজের মুক্ত-অবাধ-স্বাধীন মানুষের মতো। ফলে তার দাবির সপক্ষে জেগে ওঠার জন্য সে আন্দোলিত হয়েছে। তার সর্বাঙ্গ বোবাত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ-বিক্ষোভে ফেটে পড়তে চায়। এ যেন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনে অবরুদ্ধ অথচ অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশÑ যা বোবা মেয়েটির মতো মুক্তির সংগ্রামে ফুঁসে ফুঁসে উঠেছে। ঔপন্যাসিকের বর্ণনায় তা ধরা পড়েছে এভাবে : ‘মিছিলটা একেবারে আমাদের বাড়ির সামনে এসে পড়েছে। গোটা মিছিলটা যেন বাংলাদেশের আগ্নেয় আত্মার জ্বালামুখ। সমস্ত বাংলাদেশের শিরা-উপশিরায় এক প্রসব বেদনা ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের বুকফাটা চিৎকারে ধ্বনিত হচ্ছে নবজন্মের আকুতি… চারপাশের সবকিছু প্রবল প্রাণাবেগে থরথর কাঁপছে। বাংলাদেশের আকাশ কাঁপছে, বাতাস কাঁপছে, নদী, সমুদ্র, পর্বত কাঁপছে, নরনারীর হৃদয় কাঁপছে। … আচানক বোবা বৌ জানলা সমান লাফিয়ে বাঙলা শব্দটি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করল। তার মুখ দিয়ে গলগল রক্ত বেরিয়ে আসে।’

২৩

বোবা মেয়ের এই রক্তাক্ত আত্মঘোষণায় আহমদ ছফা বাঙালি জাতির জাগরণ, ত্যাগ ও সংগ্রামের  মধ্য দিয়ে স্বাধীন সত্তায় উত্তরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই ইঙ্গিতময়তায় স্বাধীনতার প্রশ্নে ঔপন্যাসিকের আশাবাদ প্রকাশিত। আবুল ফজলের ভাষায়, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রচ- আবেগ এবং অনুভূতি নিয়ে এর চাইতে উৎকৃষ্ট কিছু কোথাও লিখিত হয়েছে এমন আমার জানা নেই।

২৪

বস্তুত বোবা মেয়ের চিৎকারের প্রতীকাবরণে ঔপন্যাসিক বাঙালির তথা বিশ্বমানবের মুক্তির ওঙ্কার গীতবদ্ধ করেছেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসটিতে বোবা মেয়েটি হয়ে ওঠে রুদ্ধকণ্ঠ শৃঙ্খলিত বাংলাদেশ। আহমদ ছফার অলাতচক্র মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব-অভিজ্ঞতার চালচিত্র। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সংঘটিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি এতে উপস্থাপিত। মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসা, শরণার্থীর আশ্রয়, তাদের আর্থিক-মানসিক সহযোগিতা-সমর্থন প্রদানে পশ্চিমবঙ্গের জনগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কলকাতার থিয়েটার রোড, স্বাধীন বাংলা সরকার প্রভৃতির দায়িত্ব ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এসব ছাড়া ভারত সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা, হিন্দু-মুসলমানের অসাম্প্রদায়িক উদার মনোভাব সৃষ্টির কার্যকারণ, তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিতর্ক, মুজিব-তাজউদ্দীন প্রসঙ্গ প্রভৃতি দানিয়েল চরিত্রের দৃষ্টিতে উপন্যাসে বর্ণিত। অন্যদিকে স্বার্থের দ্বন্দ্ব, নেতৃত্ব দানের দ্বন্দ্ব, মতাদর্শের দ্বন্দ্ব, মধ্যবিত্তের মানসিক টানাপোড়েন, মুক্তিযুদ্ধে পক্ষশক্তি- বিপক্ষশক্তি এসব প্রসঙ্গও এতে সন্নিবেশিত। বলা বাহুল্য মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলিই এর মূল উপজীব্য। এ উপন্যাসের ঘটনা বর্ণনায় ঔপন্যাসিকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় লক্ষণীয়। মাত্র ক’টি চরিত্রের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালের অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি তিনি সুগ্রথিত করেছেন। মিরজা আবদুল হাইয়ের তোমার পতাকা উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ ক্ষীণ। গাজীপুরের এক সেবাপরায়ণ মানবদরদী ডাক্তার সুবল দাসকে হিন্দু হওয়ার অপরাধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। ‘তোমার পতাকা’ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ ক্ষীণ হলেও ঔপন্যাসিকের হাতে ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের শহর ছেড়ে গ্রামে পালানোর দৃশ্য বাস্তবানুগভাবে চিত্রিত হয়েছে, ঢাকা শহরে কামান গর্জাল। ট্যাংক সব গুঁড়িয়ে দিল। ঢাকা ছেড়ে লোক পালাচ্ছে। এক কাপড়ে, বৌ-বাচ্চার হাত ধরে, কাদাপানি ভেঙে নদী সাঁতরে আসছে গ্রামে। গ্রাম থেকে ছুটছে আরও দূরে।

২৫

তবে তাঁর ফিরে চলো উপন্যাসে জীবনাভিজ্ঞতার নতুন দিক প্রকাশিত হয়েছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ও পরবর্তী সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালি পরিবারের বন্দি-মানসিকতা রূপায়িত ফিরে চলো উপন্যাসে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূলবিষয়কেন্দ্রিক না হলেও আটকে পড়া বাঙালিদের উদ্বেগ, অসহায়তা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সত্ত্বেও দুর্নিবার স্বদেশপ্রেম এ গ্রন্থের বিধৃত। পাকিস্তানের রাজধানীতে আটকে পড়া বাঙালি সরকারি কর্মচারীদের অসহ জীবন-যাপন, মানসিক বন্দিত্ব প্রভৃতি আলমগীর খান ও তার পরিবারের কাহিনিসূত্রে উদঘাটিত হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধচলাকালে তো বটেই, ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালি রাষ্ট্রীয় ও জাতিগতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন ও শোষণমুক্ত হলে তারা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পাকিস্তান-প্রশাসনের প্রতিকূল আচরণে জটিল সমস্যার আবর্তে নিক্ষিপ্ত হয়। ঔপন্যাসিক তাদের এই সংকটাপন্ন অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে : ‘কয়েক হাজার মাইলের সীমারেখা চিহ্নিত পাকিস্তান নামক বিরাট জেলের এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বন্দী কয়েক লক্ষ বাঙালি। জেল সুপারের অফিস ইসলামাবাদে। এ বন্দিত্বে স্বাধীনতা প্রচুর, যতক্ষণ না সীমান্ত ডিঙানোর চেষ্টা করা হয়। বাঙালির সীমান্ত পার হওয়া দেশের প্রচলিত আইনে কোনো অপরাধ ছিল না। তবু বাঙালি ধরা পড়ত। জেলে পচত।’

২৬

তবে সদ্য স্বাধীন স্বদেশের জন্য বাঙালিরা পাকিস্তান নামক বৃহৎ জেলের বিরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তিলাভের আকাক্সক্ষায় অধীর হয়ে ওঠে। তারা আইনের শৃঙ্খল ও বিরুদ্ধ পরিবেশের বেড়াজাল ডিঙিয়ে হিন্দুকুশ পর্বতের হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রা উপেক্ষা করে বন্দিত্ব পরিহারের আকাক্সক্ষায় স্বদেশের পথে যাত্রা শুরু করে। মিরজা আব্দুল হাই প্রতিকূল পরিবেশ থেকে স্বদেশের পথে অগ্রসরমান সাহসী বাঙালিদের অন্তরবাহিরকে অত্যন্ত নৈপুণ্যের সাথে উপস্থাপন করেছেন। কেবল উপকরণের অভিনবত্বে নয়, ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা ও তার রূপায়ণদক্ষতা ফিরে চলো উপন্যাসকে অনন্যতা দান করেছে।

২৭

বিষয়গৌরবে এবং স্বদেশে ফিরে আসার প্রবল আকাক্সক্ষার আবেগাকুল চিত্রাঙ্কনে বিশিষ্ট মিরজা আবদুল হাইয়ের ফিরে চলো। শামসুর রাহমানের অদ্ভুত আঁধার এক উপন্যাসে যুদ্ধকালে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মানসরূপের পরিচয় বিধৃত। এই গ্রন্থের প্রধান চরিত্র কবি ও সাংবাদিক নাদিম ইউসুফ ২৫শে মার্চে সংঘটিত হত্যাকা-ের পর গ্রামের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করে। কিন্তু একদিকে মুক্তিযুদ্ধ, অন্যদিকে নিষ্ক্রিয়তা তার মনে অপরাধবোধের সূচনা করে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রশ্নে দ্বন্দ্বময় টানাপড়েনের মধ্যে যদিও তার চেতনালোকে লাশ, গুলি, ব্যারিকেড, মর্টার, চিৎকার, আগুন, কারফিউ, রেডিও, ভয়ানক আওয়াজ;  ছোটাছুটি, কুকুরের ডাক, ট্রাক, জিপ, হত্যা প্রভৃতি ক্রিয়া করে, তবুও সে ব্যক্তিগতভাবে বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষাতেই নিমগ্ন থাকতে চায়।

সে ভুলে থাকতে চায় ঢাকার কথা। ঢাকা থেকে সে পালিয়ে এসেছে বন্ধু-বান্ধবকে ছেড়ে, অনেক আত্মীয়-স্বজনকে পেছনে ফেলে রেখে। ওর বড় ভাই ফাহিম সাদেক স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে ঢাকায় রয়ে গেছেন। পলাশতলীতে আসেননি। পরে আসবেন, আরো দু-চারটা দিন দেখে। নাদিমের শ্বশুর-শাশুড়িও ঢাকায়। ওঁরা অবশ্যি আসবেন না। আসার সময় বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, কারও খবর নিতে পারেনি নাদিম। উপায় ছিল না। এমন সন্ত্রস্ত ছিল যে, রাস্তাঘাটে বেরোয়নি পর্যন্ত।

২৮

বস্তুত তার সংবেদনশীল মন কখনও স¤পূর্ণরূপে দ্বন্দ্বমুক্ত হতে পারেনি। তাই সমষ্টি জীবন নয়, ব্যক্তিগত জীবনই তার কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়। অন্তর্দ্বন্দ্ব, আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মখননের যে জটিল প্রক্রিয়া কবি-সাংবাদিক নাদিম ইউসুফের চরিত্রভাবনায় রূপলাভ করেছে আত্ম- কেন্দ্রিক, সংবেদনশীল অথচ দায়িত্ব- সচেতন নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবপ্যাটার্নের সঙ্গে তা সঙ্গতিপূর্ণ।

২৯

মধ্যবিত্ত মানসিকতার গ-ি পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের চিত্র সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের জীবনতরু উপন্যাসে বিধৃত। এ উপন্যাসের শ্যামল চরিত্রটি মধ্যবিত্ত-মানসিকতা থেকে দূরবর্তী। সে বাবা-মায়ের অজ্ঞাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং মৃত্যুবরণ করে। তার এই ঝুঁকি নেওয়ার প্রশ্নে দ্বিধাহীনতার মূলে রয়েছে মৃত্তিকামূলসংলগ্ন জীবনচেতনার অঙ্গীকার। ফলে শ্যামলের মৃত্যুকে অতিক্রম করে এদেশের তরুণদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য ঐকান্তিকতা ও মৃত্যুঞ্জয়ী জীবন চেতনার উত্তরণ ঘটে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ঔপন্যাসিক অবলোকনের ক্ষেত্রে নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবনবলয়ে আবর্তিত হলেও সুকান্ত চট্টোপাধ্যায় জীবনতরু উপন্যাসে একটা আশাবাদী মীমাংসায় পৌঁছেছেন। তিনি এ উপন্যাসে যুদ্ধকালীন মর্মমূলস্পর্শী জীবনচেতনার রূপায়ণে স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। জীবনবোধের প্রশ্নে হাঙর নদী গ্রেনেড ও অন্ধ কথামালার মতো জীবনতরু উপন্যাসটি তুলনা- মূলকভাবে সফলতর সৃষ্টি।

মাহবুব সাদিকের বারুদগন্ধ দিন উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ স্পষ্ট। এটি ১৯৭৩ সালে রচিত এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রার বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর দালাল- রাজাকারদের হত্যাযজ্ঞ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের চিত্র এখানে বিধৃত। কেন্দ্রীয় চরিত্র বামপন্থি মানস ঢাকা থেকে এক পাহাড়ি অঞ্চলের কুমারপাড়ায় জনৈক মুক্তিযোদ্ধা যুবকের বাড়িতে আশ্রয় নেয় এবং একটি ব্রিজ অপারেশনের জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে যুবকটি নিহত হলে মানস পাড়াটি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে মুক্তি-আকাক্সক্ষী মানুষদের সংগঠিত করে। হানিফ, আনজা নামের দালাল-রাজাকাররা এর বিরোধিতা করলে সংঘর্ষ বাধে। হানিফ ধরা পড়ে এবং আনজা পালিয়ে গিয়ে শহর থেকে সেনাবাহিনী আনে। এর প্রতিরোধ যুদ্ধে মানস মারা যায়। মৃত্যুকালে তার মানসপটে বাংলাদেশের অভ্যুদয় তথা বিজয়ের ছবি ভেসে ওঠে। লেখকের ভাষায় :

‘মুক্তাররা তখনই দাঁড় করিয়ে দিলো শ্যামাকে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি লেপ্টে রইল মানসের। মনে হলো তার আত্মার দরোজা খুলে গেছে। আশ্চর্য এক শান্ত নগর, এক সবুজ গ্রাম, মানুষ ঘরবাড়ি, গভীর সবুজ বনভূমি সেই দরজা দিয়ে একের পর এক বেরিয়ে এলো। মানসের মনোচৈতন্যে উড়ছিল শ্যামার ঘনসবুজ শাড়ির আঁচলÑ সেখানে তার বুকের তাজা রক্ত ভোরের প্রথম সূর্যের মতো জ্বলছে।’

৩০

মানসের মনে উদ্ভাসিত এ ছবি একই সঙ্গে ঔপন্যাসিকের সদর্থক চেতনার ও বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের ইঙ্গিত বহন করে। সীমিত চরিত্র ও সংক্ষিপ্ত কাহিনির এ উপন্যাসে ঔপন্যাসিক একাত্তরের যুদ্ধগন্ধী দিনের উত্তাল অবস্থা আপন অভিজ্ঞতায় তুলে ধরেছেন।

বেগম জাহান আরা রচিত অয়নাংশ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালির দেশত্যাগ, নিরাপদ  আশ্রয়-সন্ধান, তাদের শঙ্কাময় ও উৎকণ্ঠিত জীবন চিত্র। প্রতিবেশী দেশ ভারতের অভিমুখে দলবদ্ধভাবে যাবার সময় তারা মুক্তিযোদ্ধা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল কামনা করতো। ‘সোনার বাংলা গান’ ও বাংলাদেশের পতাকা তাদের ¯পন্দিত করত। দেশত্যাগী অগণিত অচেনা নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধের একত্রে দলবদ্ধ পথচলা, তাদের মানসিকতা মনিরা চরিত্রের জীবনের বাস্তবতায় বিশ্লেষিত। এ উপন্যাসে ১৯৭১ সালের দেশব্যাপী ব্যাপক বন্যা যে মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে লেখিকা তারও উল্লেখ করেছেন :

‘এ বছরের বন্যাকে স্বাগতম জানিয়েছে এপার বাংলার যুদ্ধপাগল মানুষেরা। বর্ষায় অধিকাংশ গ্রামগুলোর দ্বীপের মতো হয়ে গেছে। চারদিকে থৈ থৈ পানির মধ্যে গ্রাম। যেন প্রকৃতির পরিখায় ঘেরা মাটির মানুষের মাটির রাজত্ব তাই এবারের বর্ষা আশীর্বাদ। এবারের বর্ষা স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে বড় সৈনিক।’

৩১

এ উপন্যাসের সালাম ও জমিলা দেশপ্রেমে উজ্জীবিত ব্যতিক্রমর্ধী চরিত্র। সালামের চাচা তথাকথিত শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান। সে দেশমাতৃকার মাটি ছুঁয়ে তাকে হত্যার শপথ নেয়। অপরদিকে জমিলার স্বামী পাকিস্তানি বাহিনীর দালাল হওয়া সত্ত্বেও সে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় কামনা করে। এ দুটি চরিত্র মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের স্বাধীনতাপ্রত্যাশী ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত গণমানুষের প্রতিনিধি। হুমায়ূন আহমেদের শ্যামল ছায়া, সৌরভ, আগুনের পরশমণি, ১৯৭১ প্রভৃতি উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের খ- খ- চিত্র বিধৃত হয়েছে। তাঁর ‘শ্যামল ছায়া’ একদল মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক একটি থানা আক্রমণের ঘটনায় বিন্যস্ত। শ্যামল ছায়ার কাহিনি খুব বিস্তৃত নয়। একদল মুক্তিযোদ্ধার অপারেশনের ঘটনা এতে বিবৃত। পাঁচজনের স্মৃতিচারণে কাহিনি বর্ণিত। আত্মজৈবনিক ধরনের উপন্যাসোপম রচনা। আত্মকথন রীতির সুবিধা হলো অভিজ্ঞতাটি ভেতরের দিক থেকে দেখা যায় এবং এর ফলে মনের মধ্যে একটা প্রত্যক্ষতার প্রতিভাস সৃষ্টি হয়। একটি থানা আক্রমণের ঘটনায় ঔপন্যাসিক যুদ্ধকালীন প্রত্যক্ষ চিত্র আঁকতে সচেষ্ট হয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের সৌরভ উপন্যাসে অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের একটি দ্বিতল বাড়ি এবং সে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটেদের জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে যুদ্ধকালীন শহরবাসীর মানুষের হতাশা, নিরাপত্তাহীনতা, অত্যাচার- নির্যাতনের চিত্র উপস্থাপিত। এ উপন্যাসের কাহিনিও সংক্ষিপ্ত। বিষয়বস্তু রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’ উপন্যাসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আগুনের পরশমণিতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাকায় ফিরে আসার এবং ঢাকায় অপারেশন করার ঘটনা চিত্রিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালে এদেশের মানুষ অনিশ্চিত, দুর্বিষহ ও রক্তাক্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে এবং মুক্তির আকাক্সক্ষায় রুদ্ধশ্বাসে এক কালো অধ্যায় অতিক্রম করেছেÑ এ তথ্য এখানে পরিবেশিত। ১৯৭১ উপন্যাসের কাহিনি নির্মিত হয়েছে একটি হতদরিদ্র গ্রাম নীলগঞ্জকে কেন্দ্র করে। সেই গ্রামে পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচারের ও নারী ধর্ষণের চিত্র এই উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রথমে তারা মুক্তিবাহিনী ও হিন্দু-ধর্মাবলম্বীদের নিশ্চিহ্ন করতে গ্রামে ঢোকে; কিন্তু কেউ তাদের কবল থেকে রক্ষা পায় না। এ উপন্যাসের কলেবর ক্ষুদ্র, বর্ণনা সাদামাটা।

ইমদাদুল হক মিলনের ঘেরাও ও কালো ঘোড়া উপন্যাসে যুদ্ধকালীন উত্তপ্ত সময়ের ঘটনাপ্রবাহ স্থান পেয়েছে। ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পরে ঢাকার নিকটবর্তী একটি শহরের আতঙ্কিত জনসাধারণের পলায়নের চিত্র দিয়ে উপন্যাসটির সূচনা। তাছাড়া ঘেরাও উপন্যাসে তারুণ্য-শক্তির সদর্থক বিকাশ ঘটেছে।

আবার প্রৌঢ়দের দ্বিধা-অবিশ্বাসও চিত্রিত হয়েছে। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে মধ্যবিত্তশ্রেণির স্ববিরোধী ও হতাশাগ্রস্ত মনোভাব প্রকাশমান। কালো ঘোড়া উপন্যাসে স্থানীয় চেয়ারম্যানের শান্তি কমিটিতে যোগদান এবং তার পাশব অত্যাচার ও নারী ধর্ষণের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁর কালো ঘোড়া উপন্যাসে যুদ্ধকালীন বাস্তবতা ও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের বাস্তব পরিস্থিতিও চিত্রিত; দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরেই সঠিক নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধানের অভাবে মুক্তিযোদ্ধারা বিপক্ষগামী হওয়ার পর পরই দেশে নানাবিধ অব্যবস্থা দেখা দেয়। ঔপন্যাসিক দেখিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মহীনতা ও অর্থ উপার্জনের সংস্থানের অভাব তাদের বিপথগামী করে তুলেছে। ‘ঘেরাও’ এবং ‘কালো ঘোড়া’ দুটি উপন্যাসের কাহিনি স্বল্প কলেবরে আবদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ চিত্র বা সামগ্রিক চিত্র এগুলোতে বর্ণিত হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ চিত্র-সমৃদ্ধ এসব উপন্যাসে আমরা যুদ্ধ-চলাকালের উত্তাল-অস্থির সময়ের দিনগুলোতে নানাস্তরের মানুষের আশা-নিরাশার ঘটনাপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করি। এই বিরুদ্ধ পরিস্থিতি ও পটভূমিতে এদেশের মানুষ আশা-আকাক্সক্ষা, দুশ্চিন্তা, সাহস, স্বদেশপ্রেম ও মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনায় আত্মত্যাগের অনুভূতিতে যেভাবে আন্দোলিত-অনুরণিত-উদ্বেলিত হয়েছিল তার বহুমাত্রিক চিত্র এসব উপন্যাসে সংস্থাপিত হয়েছে। এসব উপন্যাসে বিষয়গত ঐক্য পরিলক্ষিত হলেও ঔপন্যাসিকদের উপস্থাপন ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্থানিক পটভূমির পার্থক্যের কারণে উপন্যাসগুলো বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ যথেষ্ট শক্তিশালী, আবেদন সৃষ্টিকারী মর্মস্পর্শী এবং কোনো কোনো উপন্যাসে তা উচ্চকণ্ঠ, অতিশয্যপূর্ণ ও অতিনাটকীয় বৈশিষ্ট্যম-িত।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস- গুলো পূর্বতন বাংলা উপন্যাসের সীমানা-প্রাচীর ভেঙে শুভ ও মহৎ মূল্যবোধস¤পন্ন পরিসরে প্রসারিত হয়েছে এবং ঔপন্যাসিকগণ নিজস্ব চেতনার মাত্রামাফিক মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম-উৎসারিত জীবন-জিজ্ঞাসা এসব উপন্যাসে সংস্থাপিত করে বাংলাদেশের উপন্যাসের সীমানাকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করতে সমর্থ হয়েছেন।

তথ্যসূত্র:

১.            রফিকউল্লাহ খান, বাংলাদেশের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃ. ২৩৭

২.            আহমদ শরীফ, সঙ্কট : জীবনে ও মননে, বিদ্যাপ্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ. ৬৮

৩.           ঐ. পৃ. ৬৮

৪. সারোয়ার জাহান, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান্তর : বিষয় ও প্রকরণ প্রসঙ্গ-উপন্যাস, একুশের প্রবন্ধ ৮৮, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৮, পৃ. ২৭

৫.            আনোয়ার পাশা, রাইফেল রোটি আওরাত, বাংলাদেশ বুক কর্পোরেশন লি., ঢাকা, ১৯৯০, পৃ. ৫৬

৬. শওকত ওসমান, জাহান্নম হইতে বিদায়, স্টুডেন্ট ওয়েজ, ঢাকা, ১৪০৪, পৃ. ২৬

৭.            উদ্ধৃত, অনীক মাহমুদ, বাংলা কথাসাহিত্যে শওকত ওসমান, ইউরেকা বুক এজেন্সী, রাজশাহী,  ১৯৯৫, পৃ.১৭৪

৮. রফিকউল্লাহ খান, বাংলাদেশের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩১৪

৯.            রশীদ করীম, আমার যত গ্লানি, আদিল ব্রাদার্স অ্যান্ড কোং, ঢাকা, ১৯৭৩, পৃ. ২৭৬

১০. সৈয়দ শামসুল হক, নীল দংশন, শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, বিদ্যাপ্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯০, পৃ. ৫৪

১১. সৈয়দ শামসুল হক, নিষিদ্ধ লোবান, অনন্যা, ঢাকা, ১৯৯০, পৃ. ৬২

১২.          সারোয়ার জাহান, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৯-৩০

১৩.        শওকত আলী, যাত্রা, বইঘর, চট্টগ্রাম, ১৯৭৬, পৃ. ১২

১৪.         ঐ, পৃ. ২৮

১৫.         ঐ, পৃ. ৯১

১৬.        রশীদ হায়দার, অন্ধ কথামালা, অনিন্দ্য প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৮৮, পৃ. ১৭

১৭.          রফিকউল্লাহ খান,বাংলাদেশের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩১৮

১৮. সেলিনা হোসেন, হাঙর নদী গ্রেনেড, বিদ্যাপ্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ. ১১৭

১৯. রফিকউল্লাহ খান,বাংলাদেশের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩১৯

২০. আমজাদ হোসেন, অবেলায় অসময়, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র, স্টুডেন্ট ওয়েজ, ঢাকা,  ১৩৯৮ পৃ. ৯৯-১০০

২১. রাবেয়া খাতুন,  ফেরারী সূর্য, মুক্তিযুদ্ধের সাতটি উপন্যাস, সাহিত্য বিলাস, ঢাকা, ২০০৪, পৃ. ২৫৬

২২. ঝর্ণা দাশপুরকায়স্থ, বন্দী দিন, বন্দী রাত্রি, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৭৬, পৃ. ১১২

২৩. আহমদ ছফা, ওঙ্কার, বুক সোসাইটি, ঢাকা, ১৯৮২, পৃ. ৪৭

২৪.          আবুল ফজল, অভিমত, ওঙ্কার, পূর্বোক্ত

২৫. মিরজা আবদুল হাই, তোমার পতাকা, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৮৪, পৃ. ১৯৯

২৬.         মিরজা আবদুল হাই, ফিরে চলো, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৮১, পৃ. ৪০

২৭. রফিকউল্লাহ খান,বাংলাদেশের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩২১

২৮. শামসুর রাহমান, অদ্ভুত আঁধার এক, মনন প্রকাশন, ঢাকা ২০০৬, পৃ. ১৩

২৯. রফিকউল্লাহ খান,বাংলাদেশের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩২২

৩০. মাহবুব সাদিক, বারুদগন্ধ দিন, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ৫২

৩১. বেগম জাহান আরা, অয়নাংশ, তরুণ পাবলিশার্স, ঢাকা, ১৯৮৩, পৃ. ৮৮-৮৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Pinterest
Instagram