সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

জলেশ্বরীর জাদুকর সৈয়দ শামসুল হক সম্মাননা-সংকলন : লেখকের কর্মময় জীবনের বিশেষ মাইলফলক

September 21st, 2016 12:08 am
জলেশ্বরীর জাদুকর সৈয়দ শামসুল হক সম্মাননা-সংকলন : লেখকের কর্মময় জীবনের বিশেষ  মাইলফলক

বইকথা

জলেশ্বরীর জাদুকর সৈয়দ শামসুল হক সম্মাননা-সংকলন : লেখকের কর্মময় জীবনের বিশেষ  মাইলফলক

হারুন পাশা

 

জলেশ্বরীর জাদুকর

সম্পাদনা : শামসুজ্জামান খান,

জাকির তালুকদার, পিয়াস মজিদ।

প্রচ্ছদ : রফিকুন নবী

প্রকাশক : কথা প্রকাশ

মূল্য : ১০০০ টাকা, পৃ. ৭০০

 

জীবিত লেখককে নিয়ে বড় আয়োজনে প্রকাশিত কোনো বই প্রথম পড়ছি। এর আগে পাঠক সমাবেশ থেকে প্রকাশিত শহীদুল জহির স্মারকগ্রন্থ পড়েছি, যা বেশ মোটাতাজা ছিল, কিন্তু তা প্রকাশিত হয়েছিল তার মৃত্যুর বছর-দুয়েক পর। একজন তাঁর দীর্ঘ কিংবা স্বল্প লেখকজীবনে কতটুকু কী করতে পেরেছেন অথবা পারেন নাই তা তো দেখে যাওয়ার ইচ্ছে রাখতেই পারেন। আর সেই ইচ্ছে ব্যক্ত করার আগেই তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিশেষ আয়োজনে প্রকাশ খুবই দরকারি।

কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত জলেশ্বরীর জাদুকর সৈয়দ শামসুল হক সম্মাননা-সংকলন ভালো ও নান্দনিক কাজ; এটি হাতে নেবার পরপরই ভালো লেগে যাবে একজন পাঠকের। সাধারণ হিসেবে এই ভালোলাগার কারণগুলো হতে পারে, উন্নত প্রচ্ছদ, মানসম্মত কাগজ, সাজানোর কৌশল, বইয়ের পেছনে ছবি যোগ। পাঠশেষে জানা যাবে লেখককে ঘিরে গভীরতর আলোচনা ও মত ব্যক্ত করতে প্রত্যেকের সাধ্যমতো চেষ্টার হিসাব এবং যেখানে সৈয়দ হকের ব্যক্তিজীবন ও লেখা সম্পর্কে খুঁটিনাটি অধিকাংশ তথ্যই বেরিয়ে এসেছে।

সূচির বিভাজনগুলো হলো, নিবেদিত কবিতা, স্মৃতি ও সামগ্রিক মূল্যায়ন, কবিতার সৈয়দ হক, সৈয়দ হক : ফোকলোর বিবেচনায়, কথাসাহিত্য বিবেচনা, ভাষা-কৃতি, নাট্য-পর্যালোচনা, কবির সঙ্গে ভ্রমণ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ বিশ্লেষণ, স্মৃতিকথার সৈয়দ হক, প্রসঙ্গ : চলচ্চিত্র ও সংগীত, অনুবাদকর্ম প্রসঙ্গ, শিশু-কিশোর সাহিত্যের অনুষঙ্গে, প্রসঙ্গ : জলেশ্বরী, মুক্তিযুদ্ধের আভায়, আলাপন, পরিশেষ। বাংলা ও ইংরেজি মিলে ১০০টিরও বেশি প্রবন্ধে ব্যক্তি ও লেখক সৈয়দ হককে আলোচকরা নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন; যেখানে ৮১ বছরের সৈয়দ হক হয়ত পুরোপুরিই উপস্থিত।

‘নিবেদিত কবিতা’ অংশে প্রত্যেকে চেষ্টা করেছেন সৈয়দ হককে ঘিরে কথামালার শৈল্পিক প্রকাশ ঘটাতে নির্দিষ্ট সীমায়। নির্দিষ্ট সীমায় এজন্য যে, কবিতার একটি ফর্ম আছে, আয়তন আছে, শিল্প আছে, যার যথাযথ সমন্বয়েই কেবল হয়ে উঠতে পারে কবিতা। কবীর চৌধুরীর নিবেদিত কবিতা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সদাসোচ্চার’ শিরোনামের কবিতাটি সহজেই নজরে আসে। নজরে আসে এজন্য যে, কবিতাটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। বৈশিষ্ট্যটি হলো, প্রত্যেক লাইনের প্রথম অক্ষরটি একসাথে করলে দাঁড়ায় সৈয়দ শামসুল হক’। এ এক দারুণ খেলা ও প্রকাশ, যা নিজেকে টেনেছে দারুণভাবে ও চমকও তৈরি করেছে। কৃষ্ণা বসু বন্ধু ও সখা সৈয়দ শামসুল হকের জন্য’ কবিতায় সৈয়দ হকের ভাষার নিজস্বতার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং বলেছেন সেই ভাষায় কবি যেন তাকে ডাকে ও আপন করে নেয়।

শিল্পী স্বভাব, পরম প্রিয়, ভাষার তুমি কর্মী,

অতীত এবং ঐতিহ্যকে ভালোবাসার বর্মী।

একটা কথা বলেই রাখি,Ñআমার বাড়ি এসো,Ñ

ভাষাপ্রেমে এই কবিকে একটু ভালোবেসো!

তরুণের চোখে কবি হয়ে ওঠেন নায়ক :

এক যুবকের ছায়াপথজুড়ে আগলে দাঁড়ানো দুর্লঙ্ঘ্য হিমালয় ফুঁড়েÑ অগণ্য ধারায় প্রবাহিত যে ঝরনার প্রস্রবণ বয়ে যেতে দেখেছে বাঙালি, তারই এক অসামান্য জনক কবি সৈয়দ শামসুল হক তাঁর জলের আঙুল দিয়ে আজো দুইহাতে লিখে চলেছেন একমুঠো জন্মভূমি। সম্পূর্ণ নিজস্ব বিষয় বলে আমরা যারা একাত্তরে পাঁজর রক্তাক্ত করে ছিনিয়ে নিয়েছি বাংলাদেশÑ সৈয়দ শামসুল হক তাঁর বিশাল বাংলার অকৃত্রিম ও খাঁটি বাঙালির সেই সমগ্র রক্তঋণ বুকে তুলে সাবলীল বিবৃত করেন আদিঅন্ত রচনাসম্ভার। (পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেলে কবি সৈয়দ শামসুল হক অতন্দ্র প্রহরীর মতো কান খাড়া করে কাটিয়ে দেন সারারাত/ ওবায়েদ আকাশ)

সৈয়দ হক পঠিত হচ্ছেন ৫ যুগেরও বেশি সময় ধরে। তিনি নিজেকে কখনও পৌঢ় খেতাব দিতে চান না। তাঁর সাহিত্য সবসময়ই তারুণ্যে ভরা এবং ব্যক্তি হকও তাই। তিনি কাল বিষয়ে বেশ সচেতন; এই সচেতনতাই তাঁকে করে তুলেছে সব যুগের পাঠকের নিকট সমান প্রিয়। এই প্রিয়তার কারণেই তাঁকে দিয়েছে বাংলা সাহিত্য স্থায়ী আসন। তিনি আসলে রাজমুকুট মাথায় নিয়ে একজন পাঠকপ্রিয় নায়ক।

তিনিই বাংলাদেশের প্রথম সাহিত্যিক যিনি লেখাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এজন্য তাঁকে নানা যন্ত্রণাময় জীবনও অতিবাহিত করতে হয়েছে। লেখাকে পেশা হিসেবে নেওয়া আমাদের দেশে খুবই রিস্ক, তিনি সেই রিস্ক উতরিয়ে মাইলফলকের আসনে পৌঁছেছেন।

সৈয়দ হকের সাথে পরিচয় তাঁর সময়কার লেখক থেকে তরুণ প্রজন্মের অনেকেরই, লিখেছেন তাঁরা সেই প্রসঙ্গে ‘স্মৃতি ও সামগ্রিক মুল্যায়নে’। আলোচকদের কীভাবে পরিচয় সৈয়দ হকের সঙ্গে, আড্ডার ধরন-ধারণ, ব্যক্তি সৈয়দ হকের জীবনের ভেতরের কথা ও তাঁর মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কেউ কেউ তাঁর লেখার বিষয়, গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বাতন্ত্র্যের বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। যেমন, বেলাল চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলা ছোটগল্পের ক্ষেত্রে সৈয়দ শামসুল হক অবশ্যই বেশ ক’টি অবিস্মরণীয় গল্পের ¯্রষ্টা। আর উপন্যাসে তো তিনি জলেশ্বরীকে উপজীব্য করে জাদুবাস্তবতার একটি আবহ তৈরি করতে সচেষ্ট রয়েছেন। কবিতায় তো তিনি স্বরাজ এবং একচ্ছত্র, নাটকে বিশেষ করে আগেই বলা হয়েছে স্বাধীনতাউত্তরকালে তার জুড়ি এখনও তেমনভাবে দৃষ্ট হয়নি’ (যৎকিঞ্চিৎ সৈয়দ শামসুল হক/ বেলাল চৌধুরী)। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী মধ্যবিত্তের জীবন নির্মাণে প্রথম স্রষ্টা উল্লেখ করে বলেছেন, আমাদের কথাসাহিত্যে পূর্ববাংলার উদীয়মান মধ্যবিত্ত এবং তাদের নগরজীবনের প্রথম সার্থক উদ্বোধন ঘটে সৈয়দ হকের ছোটগল্প ও উপন্যাসে’ (অনন্য সৈয়দ হক/ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী)।’ তিনি তো সেই সময়টা যাপন করছেন, যখন মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটছে এ দেশে। যাপিতজীবনের অংশ ছিল এটি, যে জীবনকে যাপন করছে তার চেয়ে সেই জীবন সম্পর্কে আর কে-ই বা ভালো বলতে পারে। মধ্যবিত্তের বাইরে নিম্নবর্গের জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে; তাদের নিয়েও লিখেছেন গল্প। স্মৃতিকথায় একটি তথ্য পাওয়া যায়, যা এতকাল জানা ছিল না, তথ্যটি হলো, তিনি কবিতা ব্যতীত অন্য সব লেখাই কম্পিউটারে লিখতেন এবং কবিতা লিখতেন খাতায়।

‘কালপুরুষ’ শিরোনামে একটি চমৎকার গদ্য লিখেছেন সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ। একটি গদ্য দিয়েই সামগ্রিক সৈয়দ হকের সাহিত্য বৈশিষ্ট্য জানা সম্ভব। অনেক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বলেছেন, তার ভেতর একটি হলো, ‘সৈয়দ হক দীর্ঘ দীর্ঘ বাক্য রচনা করে গেছেন এবং যতি-চিহ্নর উচ্চতম ব্যবহার করেছেন। কখনও রুদ্ধশ্বাসে শব্দের পর শব্দ ক্ষণিক বিরাম দিয়ে বলে গেছেন আবার এরকমও হয়েছে যে, থেমে থেমে বলে চলেছেন সে সমস্ত কথা, ভেবে বলতে হচ্ছে সেই সময়, এমনকি দীর্ঘ বাক্য তিনি গুঁজে দিয়েছেন চরিত্রের জবানে।’ গল্প বলার কৌশলে তিনি আনয়ন করেছেন ভিন্ন ভিন্ন কৌশল, এক কৌশলেই আটকে থাকেননি, যা দিয়ে শুরু করেছেন, শেষাবধি গ্রহণ করেছেন আরেকটি। আহমাদ মোস্তফা কামালের মত নেওয়া যাক : ‘প্রথমদিকের গল্পগুলোতে তিনি আখ্যান-বর্ণনার দিকে যতটা মনোযোগী ছিলেন, পরবর্তীকালে সেটিও পাল্টে ফেলেছেন, বিশেষ করে আঙ্গিকে এমন এক পরিবর্তন এনেছেন যে, মনে হয়, লেখক কেবল গল্পটিই বলছেন না, বরং পাঠকদের সঙ্গেও কথা বলছেন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করছেন, আখ্যানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তোলার জন্য পাঠককে সরাসরি সম্বোধন করছেন, যেন পাঠক নিজে কেবল দর্শকের অবস্থানে না থেকে নিজেও অংশগ্রহণ করে’ (সৈয়দ হকের গল্প : জীবন ও পৃথিবীর চেনা-অচেনা কোণে বহুবর্ণিল আলো/ আহমাদ মোস্তফা কামাল)।

তিনি ছুটেছেন সবসময় জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য, নিজের কৌশল, অবস্থানে পরিবর্তন এনেছেন নিজের স্বাতন্ত্র্যের ঔজ্জ্বল্য রাখতে। ভাষা বিষয়ে মোস্তফা তারিকুল আহসান বলেছেন, ‘কবিতার শরীর দিয়ে তিনি উপন্যাস লিখেছেন আবার টানা গদ্যে উপন্যাস লিখেছেন কাহিনির গভীরতাকে ধরে রাখার জন্য। বর্ণনাভঙ্গির যে স্বকীয়তা সৈয়দ হকে আমরা লক্ষ্য করি তা তার চয়িত ভাষার উপর নির্ভর করে’ (উপন্যাসের ভাষা : প্রসঙ্গ সৈয়দ শামসুল হক/মোস্তফা তারিকুল আহসান)।

বইটির নাম কেন-ইবা এমন, সে-বিষয়ে জানা যায় কথামুখ অংশে, ‘সাহিত্যে সৈয়দ শামসুল হকের স্বসৃষ্ট জনপদÑজলেশ্বরী। জলেশ্বরী এক অর্থে যেমন লেখক-কল্পিত এক বিশেষ অঞ্চল আবার রূপকের জাল ছিন্ন করে মর্মগত বিস্তারে জলেশ্বরীরই যেন গোটা বাংলাদেশ। তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাস, কথাকাব্য ও প্রবন্ধে-নিবন্ধে জলেশ্বরীকে ভিত্তিভূমি রেখে তিনি যেমন তৃণমূলের নিঃস্বর মানুষকে ভাষাময় মূর্ততা দিয়েছেন তেমনি মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী কথামালা এ জনপদের অবয়বে খুঁজে পেয়েছে সার্থক জায়গা জমি। জলেশ্বরী কোথাও না থেকে এভাবে হয়ে ওঠে অশ্রুরক্তস্বপ্নময় ভূমি ও জলের বাংলাদেশ। আর জলেশ্বরীর জাদুকর লেখক সৈয়দ শামসুল হক হয়ে ওঠেন ব্যক্তি থেকে সমষ্টি মানুষের পরাস্ত ও একইসঙ্গে অজেয় উত্থানের অনন্য লিপিকা।’

সৈয়দ শামসুল হক একটি কালের অন্তর্গত হয়েও চেয়েছিলেন কাল অতিক্রম করতে। তিনি পেরেছেন নিজের চাওয়াকে জয় করতে। তাই তিনি আজ বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রধান পুরুষ।

সবশেষে, জীবিত লেখকদের নিয়ে বড় পরিসরে আরও অনেক অনেক কাজ হোক, পাঠক মূল টেক্সটের সাথে সমালোচনাসহ একজন লেখককে জানুক, পড়ুক!