শ্বেতশুভ্র ক্যাটস্কিল পাহাড়ে মধ্যদুপুর : শামীম আল আমিন

ভ্রমণ

শ্বেতশুভ্র ক্যাটস্কিল পাহাড়ে মধ্যদুপুর

শামীম আল আমিন

 

হঠাৎ করেই চোখের সামনে অন্য এক দুনিয়া। এ যেন রূপকথার এক রাজ্য। পৃথিবীতে এখনও সৌন্দর্য আছে, না দেখলে হয়তো বিশ্বাসই হতো না! একদিন আগেই মারাত্মক একটি তুষার ঝড়ের কবলে পড়েছিল নিউইয়র্কসহ পূর্ব-উপকূলীয় স্টেটগুলো। তাতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক। উপড়ে গেছে বহু গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি। এমনকি পাহাড়ি এই জনপদের অনেক এলাকা তখনও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এরপরও প্রকৃতি যেন উদার হাতেই সাজিয়ে রেখেছে চারপাশ। একজন আগন্তুকের চোখে এ যেন এক স্বর্গোদ্যান। চারপাশে তাকিয়ে চোখ জুড়ে কেবল ভালো লাগা টেনে নিচ্ছি নিজের ভেতরে। সাদা বরফ কেটে কেটে ছুটে চলেছে জিপ-বাঙলার রুবিকন গাড়িটা। আমাদেরকে বহন করে ফোর হুইলার গাড়িটা একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে উপরের দিকে।

চারিদিকে সাদা আর সাদা। পথঘাট, গাছ, কোনো কিছুই আলাদা করে চেনার কোনো উপায় নেই। তবে অবয়ব দেখে কিছু কিছু বোঝা যায়। বরফের চাদরে ঢেকে থাকা চারপাশ যেন ভাস্কর্যের একনগরী। মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাগুলোর কোথাও কোথাও কেবল কালো পিচের দেখা মিলছে। সর্পিল আকারে এগিয়ে যাওয়া আঁকা বাঁকা রাস্তা। কখনও বামে অনেক নিচে নেমে যাওয়া গিরিখাদ, ডানে সারি সারি গাছ। এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ রাস্তার ডান দিকে চোখে পড়লো একটা পাহাড়ি ঝরনা। অনেকটাই বরফে ঢেকে গেছে। এর মধ্য থেকেই উঁকি মারছে ক্ষীণ হয়ে আসা জলের ধারা। পাশেই গাড়ি পার্ক করার একটি জায়গা আছে। সেখানে থেমে কিছুটা হেঁটে আমরা চলে এলাম সেই ঝরনার কাছে। আমি, আমার দুই সহকর্মীর রনিভাই এবং স্বপন ভাই। রনি ভাই আইটি এক্সপার্ট, সেই সাথে দুঃসাহসী অভিযাত্রী। আর স্বপন ভাই বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা ফটো সাংবাদিক। তিন জনের এই দলটা তখন পাহাড়ি ঝরনাধারার সামনে দাঁড়িয়ে।

 

বরফে ঢাকা ঝরনার একটি শীর্ণধারা তখনও গড়িয়ে যাচ্ছে নিচের দিকে। কুল কুল শব্দ শুনতে পাচ্ছি। চারপাশটা অদ্ভুত রহস্যময়। দেখে মনে হতে লাগল এ যেন অন্য এক ভুবন। থরে থরে তুষার জমে আছে। তাজা, এখনও জমাট বাঁধেনি। চারিদিকে তখন ঝকঝকে রোদ থাকলেও, আগের রাতেই হয়েছে প্রচ- তুষার ঝড়। একটি জায়গায় দিক-নির্দেশনার একটি বোর্ড চোখে পড়ল। তার উপর বরফের স্তূপ। লেখা ঠিকমতো পড়া যাচ্ছে না। হাত দিয়ে কিছু বরফ সরাতেই লেখাটি পড়ার উপযুক্ত হয়ে উঠল, ‘ট্রেইল টু ক্যাটার স্কিল ফলস’। এখান থেকে আধা মাইল দূরত্বের পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটে গেলে দেখা মিলবে আসল ঝরনাটির। সারাবছর ধরেই সেই ঝরনার সৌন্দর্য মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের।

শীতে একরকম, আর গরমে তার অন্যরকম রূপ। ক্যাটস্কিল পর্বতমালায় ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সৌন্দর্যের এটি প্রধানতম। ২৬০ ফুট উচ্চতার এই ওয়াটার ফলসটি উচ্চতার দিক থেকে নিউইয়র্ক স্টেটের মধ্যে অন্যতম। যার রূপ চোখ চেয়ে দেখার মতো। তবে সেই পথ ধরে আমরা এগিয়ে গেলাম না। কেননা এমনিতেই পাহাড়ি পথ,

তার উপর বরফে ঢেকে হয়ে উঠেছে বিপদসংকুল। সেখানেই কিছুটা সময় কাটিয়ে, ছবি তুলে আমরা চললাম পরের গন্তব্যের দিকে।

নিউইয়র্ক শহর থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার দূরত্ব পেরিয়ে আমরা যাচ্ছি হান্টার মাউন্টেন রিসোর্টে। পাহাড়ে স্কি করার জন্যে। হান্টার রিসোর্টটি পড়েছে ক্যাটস্কিল পর্বতমালার মধ্যেই। উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়িটা। কখনও পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে চোখে পড়ছে সমভূমি। কোথাও খাড়াভাবে নেমে গেছে। তবে তারপরও রাস্তাগুলো যথেষ্ট নিরাপদ করেই তৈরি। মসৃণ এবং প্রশস্ত। তার উপর কোথাও যদি পাহাড়ের খাড়া ঢালের পাশ দিয়ে গেছে, সেখানে নিরাপদ লোহার পাতের বেষ্টনি দেয়া। খুব বেপরোয়া না চালালে, খুব বেশি বিপদ হবার কারণ নেই। তবে এমন ¯েœাফলের পর যেভাবে সাদা বরফে রাস্তা ঢেকে আছে, তাতে গাড়ি চালানোর জন্যে দরকার বাড়তি সতর্কতা। সেই সাথে ফোরহুইলার গাড়ি ছাড়া এই পথে এগিয়ে যাওয়া প্রায় সম্ভবই নয়। নিউইয়র্কের দক্ষিণ পূর্বে চমৎকার একটি পর্বতমালা ক্যাটস্কিল। মূলত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই মানুষ এখানে ছুটে আসে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কি শীত, কি গ্রীষ্ম সব সময়ই মানুষের আনাগোনা লেগেই আছে। শীতে এই পাহাড়ি জনপদের প্রধান আনন্দ স্কি-খেলা। এখানে কয়েকটি স্কি-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ছুটির দিনগুলোতে এত মানুষ আসে যে, জায়গাই পাওয়া যায় না। আবার গরমে অন্য রূপ। ন্যাড়া পাহাড় হয়ে ওঠে সবুজের উদ্যান। আর তাতে লাগে বাহারি ফুলের রঙ। ঝরনা, সর্পিল গতির পাহাড়ি নদী, আর নানান ধরনের বিনোদনের আয়োজন। বিশেষ করে হাইকিং, সাইক্লিং কিংবা গলফ খেলার জন্যে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। ক্যাটস্কিলে রয়েছে একটি পার্ক এবং বন্যপ্রাণি সংরক্ষণাগার। ৭ লাখ একরের এই বনাঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য প্রাণি। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে জনপদ। মানুষের বসতিও এখানে রোমাঞ্চকর। পর্যটনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানান ধরনের রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল আর বিনোদনকেন্দ্র। পোকোনোস, শাওয়াংগু করিজ, হাডসনভ্যালি, গ্রেট অ্যাপ্পালি চিয়ানভ্যালি, মোহকভ্যালি এই পাহাড়ি এলাকাকে ঘিরে রেখেছে। হাডসন এবং বেশ কয়েকটি পাহাড়ি শাখা নদী বয়ে গেছে ক্যাটস্কিলের বুক চিড়ে। এসব নদীতে শক্ত পাথর খণ্ড ছড়ানো যা রীতিমতো ভয়াবহ, অথচ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দেয়। বিশেষ করে এখানে বোটিং করার মজাই অন্যরকম। তবে খরস্রোতা এসব পাহাড়ি নদীতে রাফটিং কিংবা বোটিংয়ের জন্যে দরকার বিশেষ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা। হাডসন নদীর বুক থেকে ক্যাটস্কিলকে কখনও ব্লুমাউন্টেনের মতো দেখায়। কিছু কিছু সময় সূর্যের আলোয় পাহাড়টা কেমন নীল হয়ে ওঠে। দেখতে অদ্ভুত লাগে।

সমুদ্র-সমতল থেকে ক্যাটস্কিল পর্বতমালার উচ্চতা ৪ হাজার ১৫৪ ফুট। এই পর্বতমালার মাঝে মাঝে রয়েছে পাহাড়ি খাঁজ, সমতল ভূমি আর উপত্যকা। ক্যাটস্কিলের সর্বোচ্চ চূড়ার নাম ¯¬াইড মাউন্টেন। ¯¬াইড মাউন্টেনটি পড়েছে আলসটার কাউন্টির সান্ডাকেন শহরে। এই পর্বতমালার মধ্যে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক স্থান। হাডসন রিভার স্কুল আর্টট্রেইল নামের ওই জায়গাটি নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। বিশেষ একটি থিমকে কেন্দ্র করে এই জায়গাটি গড়ে তোলা হয়েছে। মূলত এটি একটি ট্রেইল করার ব্যবস্থা। থমাসকোল নামের এক ব্যক্তি বহু বছর আগে এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে থাকা কোলের বাড়িটির সাথে সাতটি স্থানের অসাধারণ এক সংযোগ। উনিশ শতকের দিকে অনেক বিখ্যাত চিত্রকর এখানকার ল্যান্ডস্কেপ এবং পাহাড়ি ভূমির ছবি আঁকার বিষয়ে খুবই উৎসাহিত ছিলেন। এই ট্রেইলটি মানুষকে আজও সমানভাবে আকৃষ্ট করে। থমাসকোলের বাড়িটি এখনও একটি ঐতিহাসিক ল্যান্ড মার্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেখান থেকে মূলত পাহাড়ি পথে ট্রেইল করার জন্যে এক ধরনের ধারণাও দেয়া হয়।

আমাদের গাড়ি তখন এসে দাঁড়িয়েছে হান্টার রিসোর্টের সামনে। কিন্তু খুবই দুঃখজনক খবর মিলল এবার। আগের দিনের ঝড়ে এই এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে; যা তখনও ঠিক করা সম্ভব হয়নি। ফলে সেদিনের জন্যে হান্টার রিসোর্ট বন্ধ। সারি সারি গাড়িতে মানুষ এসেছে। পর্যটকরা এসেছেন বাসভর্তি করে। তাদের প্রায় সবাই খোঁজ নিয়ে আসেননি পার্কটি খোলা কিনা। যেমন আসিনি আমরাও।

কেননা এমন দিনে তার প্রয়োজন পড়ে না। তুষার শুভ্র দিনই এখানে স্কি করার জন্যে আদর্শ। আর এমন দেশে খুব সহজে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হবার কথা কেউ ভাবতেও পারে না। আমাদের মতো অনেকেই তখন হতাশ। নিরাপত্তা কর্মীরা গাড়িগুলোকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে ফিরতি পথে। পেছনে হান্টার পাহাড়কে রেখে আমরাও অন্য পথ ধরলাম।

ক্যাটস্কিল পর্বতমালার অনবদ্য ওজন প্রিয় স্কি করার স্থান হচ্ছে হান্টার। নিউইয়র্কের গ্রিন কাউন্টির মধ্যে পড়েছে এই জায়গাটি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, হান্টার এবং লেক্সিংটন শহরের ভেতরে গড়ে উঠেছে বিশাল আয়তনের রিসোর্টটি। যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ৪ হাজার ৩৯ ফুট। স্কি করার জন্যে দারুণ সব ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। ক্যাবল কারে করে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয় স্কি-খেলোয়াড়দের। সেখান থেকে স্কি করে তারা নেমে আসে নিচে। রয়েছে পরিবার কিংবা প্রিয়জন নিয়ে রাত কাটানোর চমৎকার সব ব্যবস্থা। এখানে ভাড়ায় পাওয়া যায় চমৎকার সব অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি কিংবা কন্ডো। পাহাড়ি খাঁজে রয়েছে দারুণ দারুণ বাংলা বাড়ি। যার প্রায় কিছুই দেখা সম্ভব হলো না আমাদের।

রনিভাই কিছুদূর গিয়ে সিদ্ধান্ত বদলালেন। পাশেই রয়েছে উইন্ডহ্যাম নামে আরেকটি রিসোর্ট। সেখানে গিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে এখানে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক ভালোমতো পাওয়া যাচ্ছে না। তাই গুগল করে দেখার সুযোগ নেই সেটা খোলা কিনা। তবুও রনি ভাই বললেন, এতটা দূর এসে শূন্য হাতে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। দেখাই যাক। খোলা থাকলে ভালো, না থাকলেও ক্ষতি নেই। আমাদের গাড়িটা একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে। এরি মধ্যে কিছু বিশেষ ধরনের গাড়ি চোখে পড়ল যেগুলো বরফ সরানোর কাজ করছে। আবার রাস্তা যেন পিচ্ছিল হয়ে না পড়ে, তার জন্যে বড় বড় লরিতে কেলবন ছিটানো হচ্ছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত অনেক গাড়ির চাকায় শেকল পড়িয়ে এসেছেন অনেকে। এতে করে রাস্তায় গাড়ির দুর্ঘটনায় পড়ার সম্ভাবনা কমে। যতই ভেতরে যাচ্ছি, রাস্তাগুলোকে দেখে মন বদলে যাচ্ছে। কিংবা হয়তো একই আছে, আমার কাছে অন্য রকম মনে হচ্ছে। কোথাও কোথাও মানুষের বাড়িঘর, ছোট ছোট শপিংমল চোখে পড়ছে। সব কিছুই পুরু বরফে ঢাকা। পাতাহীন গাছগুলোতে যেন থোকা থোকা বরফ ফুল ফুটেছে। এভাবে কিছু দূর যেতেই স্থানীয় পুলিশ রাস্তায় গাড়িগুলোকে আটকে ফিরতি পথে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। তারা বলছে, উইন্ডহ্যাম রিসোর্টে এত বেশি মানুষ এসেছে, বাড়তি গাড়ি রাখা কিংবা মানুষের যাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ রিসোর্টটি খোলা আছে। এবার পুলিশকে অনুরোধের সুরে রনিভাই বললেন, আমরা গিয়ে একটু দেখে আসতে পারি কিনা। বিশেষ করে আমার আর স্বপন ভাইয়ের কথা বললেন। কেননা রনিভাই প্রায়ই এলেও, এই সাদা স্বর্গে এর আগে কখনওই আসা হয়নি আমাদের। কি মনে করে ওই পুলিশ সদস্য, হাতের ইশারায় যেতে বললেন। খুশিমনে আমরাও চললাম সেদিকে। গিয়ে দেখাই যাক না। যতটা দেখতে পারা যায়।

কোনো একটি জায়গায় যতটা ভিড়ই হোক, আমেরিকায় এরপরও এক ধরনের শৃঙ্খলা থাকে। উইন্ডহ্যাম রিসোর্টে গিয়ে দেখলাম, সত্যিই অনেক মানুষ এখানে চলে এসেছে। বিশেষ করে হান্টারে যারা ঢোকার সুযোগ পাননি, তাদের মধ্য থেকেও বড় একটি দল এখানে এসেছে। এরপরও কোথাও শৃঙ্খলার এতটুকু ঘাটতি নেই। তবে পার্কিং লটে জায়গা না পেয়ে অনেক গাড়ি রাখতে হয়েছে রাস্তায়। বরফের স্তূপের কারণে এমনিতেই রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে, তার উপর গাড়ি রাখায় কিছু সমস্যা সবারই হচ্ছে। এরপরও খুশি মনেই সবাই তা মেনে নিয়েছে। বাইরে থেকে দাঁড়িয়েই দেখা গেল পাহাড়ের উপর থেকে স্কি করে দল বেঁধে অনেকে নেমে আসছে। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, সবাই আছে সেই দলে। একপাশে একটি ভবন দেখলাম। মূলত এটিকে প্রশাসনিক ভবন বলা যেতে পারে। এখান থেকে টিকেট বিক্রি করা হয়। যারা স্কি করতে চান, তাদেরকেই কেবল টিকেট কিনতে হয়। আর সেই টিকেট লাগে ক্যাবল কার-এ করে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার জন্যে। যতবার ইচ্ছা ওঠা যায়। যারা স্কি করতে পারেন, তারাই কেবল চূড়ায় ওঠেন। কারণ স্কি করেই পাহাড় থেকে নেমে আসতে হয়। যারা এমনি ঘুরে দেখতে চান, তাদের জন্যে কোনো টিকেট লাগে না। উন্মুক্ত। আবার যাদের স্কি করার ব্যক্তিগত সরঞ্জাম নেই, তারা এখান থেকে ভাড়া করতে পারেন। যাদের স্কি করার দক্ষতা নেই, তারা এখানে ইনস্ট্রাকটর নিয়ে শিখতেও পারেন। তাদের জন্যে আলাদা একটি জায়গা বরাদ্দ রয়েছে।

পুরো জায়গাটি দেখে মন জুড়িয়ে গেল। উৎসবমুখর একটি পরিবেশ। সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়ে যেন রঙিন উৎসব বসেছে। বিশেষ করে স্কি করার সরঞ্জামগুলো সব রঙিন। ফলে পুরো পাহাড়ি এলাকাই রঙে রঙে ভরে উঠেছে। একপাশে অনেকগুলো কটেজ চোখে পড়লো। কিছু ভবনও রয়েছে। এগুলোতে রয়েছে থাকার ব্যবস্থা। যারা দিনে এসে দিনে ফিরে যেতে চান না; কিংবা অনেকদূর থেকে আসেন তারা এখানে রাত্রি যাপন করেন। একটু বেশি সময় কাটান।

গাড়ি থেকে নেমে আমরাও চললাম ভেতরের দিকে। রনিভাই স্কি করবেন। স্কি করার সবধরনের সরঞ্জামই তার আছে। সেগুলো সঙ্গে নিয়ে নিলেন তিনি। আমি আর স্বপনভাই কেবলই দর্শক। মানুষকে উপরে টেনে তুলবার জন্যে মজার একটি ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। সাদা বরফ কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে এসকেলেটর বা চলন্ত সিঁড়ি। সিঁড়ির শেষপ্রান্তে একটি ভবন। সেখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি খাবারের দোকান। স্যুভিনির শপ। আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। এরপর টিকেট কেটে রনিভাই তৈরি হয়ে নিলেন স্কি করার জন্যে। দুই পায়ে স্কির সাথে বিশেষ ধরনের বুট, মাথায় হেলমেট, শরীরে জ্যাকেট, চোখে রোদ চশমায় রনিভাইকে মানিয়েছে বেশ। আর বরফের উপর চলাচলে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পোলস। ছবি তুলে বাঁধিয়ে রাখার মতোই। সুঠাম দেহের রনিভাই ভীষণ সাহসী ও সৌখিন মানুষ। এমন খেলায় তাকেই মানায়। দেখতেও লাগছে বেশ। তিনি ক্যাবল কারে করে পাহাড়ে ওঠার জন্যে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার সামনে তখন অনেক মানুষ।

আমি তখন ভাবছি, এই পাহাড়ই গরমে রূপ বদলায়। সাদা বরফশুভ্র পাহাড় হয়ে ওঠে সবুজ। সেই সবুজে চলে তখন অন্য উৎসব। কেবল কারে করে দুঃসাহসী অভিযাত্রীর দল উপরে উঠে, সাইকেলে করে নিচে নেমে আসে। অনেকে ছোট ছোট এক ধরনের বিশেষ গাড়ি চালায় এই পথে। কেউ করে ট্রেইল, কেউবা ট্রেকিং। অনেকে গলফ খেলে সময় কাটায়। অর্থাৎ পুরো বছর ধরেই এই পাহাড় জেগে থাকে, থাকে জম জমাট। রাতে হোটেলগুলোর ভেতরে থাকে কমেডি-শো, গান কিংবা নানাধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা। বাহারি খাবার এখানে অবস্থানকে আরও আনন্দময় করে তোলে।

উইন্ডহ্যাম পাহাড়টির সর্বোচ্চ উচ্চতা ৩ হাজার ১ফুট। ২৮৫ একর জায়গা জুড়ে এখানে স্কি করা যায়। ক্যাটস স্কিল পর্বতমালার উত্তরের এই রিসোর্টে রয়েছে ৫৪টি  ট্রেইল। সাতটি লিফট অভিযাত্রীদের উপরে টেনে নিয়ে যায়। তারা ফিরে আসেন নিচে, দুর্দান্ত গতিতে। সূর্য খাড়া হয়ে আলো ফেলছে। তখন মধ্যদুপুর। সাদা বরফে সেই আলো পড়ে বিচ্ছুরিত হয়ে যাচ্ছে চারিদিকে। উজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পাহাড় জুড়ে। জ্বল জ্বল করছে; কোনো কোনো দিক থেকে তাকালে মনে হয় উজ্জ্বল পাহাড়। এ এক অন্য সৌন্দর্য। অনেকের সাথে রনিভাই উঠে যাচ্ছেন উপরের দিকে। একটু পরেই দুর্দান্ত গতিতে নেমে আসবেন নিচে। আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছি আলোয় উদ্ভাসিত পাহাড়টার দিকে।

লেখক : সাংবাদিক

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *