সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

ন’টা একান্ন মিনিট – এনামুল রেজা

September 20th, 2016 11:55 pm
ন’টা একান্ন মিনিট – এনামুল রেজা

গল্প

ন’টা একান্ন মিনিট

এনামুল রেজা

 

মাংসের বিবরণ

বিছানায় শুয়ে জানালার বাইরে তাকালাম সেখানে কিছু এলোমেলো ছায়া, আসলে কাচের ওপাশে জগতের সবকিছুই ছায়াময়। শহরে ইদানীং ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে, মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে পারি না বলে মশা থেকে বাঁচতে দুটো কাজ বাধ্য হয়ে করতে হয়: কয়েল জ্বালানো আর জানালা লাগিয়ে দেয়া। ভাদ্রের পচা গরমে একটা পাতলা সুতি চাদর গায়ে জড়িয়ে শুয়ে থাকি, পথে সমানতালে পাড়াঘোষণা করতে থাকে কুকুরের পাল, হঠাৎ হঠাৎ গার্ডের বাঁশি বেজে ওঠে। আজকাল হাতঘড়ির তেমন চল নেই, সবাই সময় দেখে সেলফোনের ডিসপ্লেতে। সময়-দেখা নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ নেই, ছিল না কখনও। এটুকু নিশ্চিত জেনে এসেছি, সময় দেখা হয়  তা বাঁচাতে; ওই পিছল বস্তুটা ধরবার চেষ্টা যেহেতু বৃথা, কী লাভ ঘড়ি দেখে? তবু একটা গল্প করবার আগে সময় জানিয়ে দেয়া খুব জরুরি, আমাদের মাথায় রাখতে হবে নিজের প্রয়োজনের চেয়ে কখনও বেশি গুরুত্ব পাবার অধিকার রাখেন পাশের মানুষটি। এখন এ-গল্পটি পড়ছেন মানেই আপনি আমার পাশের মানুষ অথবা সমুখনিবাসী। আপনার প্রতি আমার যে দায়িত্ববোধ, সেটি থেকেই সময় জানিয়ে দেয়া দরকার মনে করছি, আমার সেলফোনের ডিসপ্লেতে রাত ন’টা বেজে একান্ন মিনিট।

ঘটনাটি কবেকার? মুসলিম বাজার কসাইখানার সামনে একজন মহিলা মারা গেল, ভরদুপুরে এই রকম ভিড়ভাট্টাময় স্থানে কীভাবে কেউ মরে ভাবতে ভাবতে আপনার সময় পেরিয়ে যেতে পারে, ধরে নিতে পারেন আমি মৃত ওই মহিলাটির গল্প করতে বসেছি। সত্যি বলতে বিষয়টা তাই, আবার ভিন্ন কিছুও হতে পারে। আমি ওসময় ঘটনাস্থলে ছিলাম, কসাইখানার উল্টোপাশে যে চায়ের টং আছে সেখানে। চিনি ছাড়া দুধ-চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলাম.. (থাক তখন কী ভাবছিলাম ওটা গোপন বিষয়, বলতে চাইছি না, ওই ভয়ানক গোপন কথা আমি কাউকে বলতে চাই না)। চা খাচ্ছিলাম আর হুট করে মহিলাটি কসাইখানার সামনের রাস্তায় পড়ে গেল। ঘিয়ে আর সবুজের পাখিছাপা সালোয়ার কামিজ পরা, ভারি নিতম্ব এবং বিশাল স্তনযুগলবিশিষ্ট এক লাশকে ঘিরে আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম, মুখে বয়সের ভাঁজ না থাকলে নির্ঘাত ওই রূপবতীর মরদেহটিকে আমরা তরুণীর লাশ বলে ভুল করতে পারতাম। ভিড়ের মাঝখানে আমি দেখতে পাই অজস্র লোভী চেহারা, যাদের চোখে মেখে ঝুকে আছে কামনার ছায়া, হুট করে একজন মানুষ যে মারা গেল এ নিয়ে বিষাদের চেয়ে ওইসব চোখে উপচে পড়ছিল লালসা। সম্ভবত হার্টফেইলিউর ছিল, নিশ্চিত তিনি মরলেন কী-না পরীক্ষা করবার জন্য বাজারের হাতুড়ে নজিবুর আসলেন, অযতেœ পড়ে থাকা নিথর এবং রূপবতী নারীদেহটির বিশাল বুকে জোরে জোরে চাপ দিতে লাগলেন দুহাত এক করে, মিনিটখানেক বাদে ঘোষণা করলেন, তিনি পৌছুনোর পূর্বেই মৃত্যু ঘটেছে। সকলে যতটা দুঃখ পেল, তারচে বেশি অনুভব করলো সম্ভবত আক্ষেপ, হাতুড়ে নজিবুরের মত তারা মৃত নারীদেহটির বুকে শ্বাস ফিরাবার ছলে চাপ দিতে পারলো না, এ কি বঞ্চনা নয়? লাশটি পড়ে রইলো রাস্তায়, কেউ সরালো না, ঠিক আধঘন্টা পর পুলিশ পৌছুলো যদিও বাজার থেকে থানা পাঁচ মিনিটের পথ।এখন আমাকে ক্ষমা করবেন, পুলিশ সম্পর্কে এটুকু বলবার লোভ সামলাতে পারছি না, এলোকগুলো দরকারি স্পটে আসতে সব সময় দেরি করে, ঢাকাই ছবির ক্লাইম্যাক্স থেকে বাস্তবের রুক্ষ নগর-বন্দর-গ্রাম,

সবখানেই পুলিশ পৌছুবে ঘটনা ঘটবার পর; তবে একাকী নেশারুকে আটক কিংবা মাঝ রাস্তায় পথচারিকে থামানো, রিকশায় ঘুরতে থাকা তরুণ-তরুণীকে বিপদে ফেলতে এদের জুড়ি মেলাভার। আরও নানান বিষয় আছে, আপনাকে বলবো কখনও, এখন দরকার গল্পে ফিরে যাওয়া। পুলিশ ভ্যানে লাশ তুলে নিয়ে যাবার পর লোকজন খানিক হা-হুতাশ শুরু করেছিল, এমন কী এদের মাঝে কিছু লোক গুজগুজ করে উঠলো, “বাজে মহিলা ছিল কী না কে কইবো! দিন দাহাড়ে এমুন টাইট জামা পইরা ভদ্দর ঘরের মহিলা ঘুরেনি?” আমি বলতে চাইছি না ওসব গুজগুজ ফিশফিশের মাঝে আরও বিশ্রি রকম কথার বিস্তারিত, তবে এটুকু নিশ্চিত মানুষের আলাপের মূল বিষয় মহিলাটির মৃত্যু ছিল না, ছিল পোশাক, শরীরের গড়ন-টড়ন। এটাতো আপনি অস্বীকার করতে পারেন না যে নারী মরলে তার মৃতদেহটিও নারী থেকে যায়, লাশ হয়ে ওঠে কেবল তা পচে যাবার পর। মরদেহ নিয়ে পুলিশ ভ্যান চলে গেলে যথারীতি চায়ের দোকানে ফিরে গেলাম, চিনি ছাড়া আরেক কাপ চা দিতে বললাম চাঅলাকে, ক্যাপস্টানের পোঁদে আগুন ধরিয়ে তাকালাম ওই জায়গাটিতে কিছুক্ষণ আগে যেখানে চিৎ হয়ে পড়েছিল মহিলাটি, মৃত। আজকাল আপনি জানেন: মানুষ যত্রতত্র খুন হচ্ছে, নারী এবং শিশুরা হচ্ছে ধর্ষিত, ভিন্নমতের লোকজনের গর্দান যাচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠদের হাতে; এই রকম অস্থির সময়ে কোনো মানবসৃষ্ট গোলযোগ ছাড়া চলতি-ফিরতি একনারী হুট করে পড়ে যাবে মাংসের দোকানের সামনে, আবিষ্কার করতে হবে এ পড়া চিরকালীন পড়া, মৃত্যুময়, ওতে আমার হৃদয় বিস্ময়ে ফেটে পড়তেই পারে শিমুল ফলের মতো, পট পট পট। আপনার ফাটে না? আসলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমাদের বিস্ময়টাই যত গ-গোলের পিতা।

চায়ের দোকান থেকে উঠে নিজের বাসায়, এ কামরায় পৌঁছুতে খুব বেশিক্ষণ লাগে না আমার; কিন্তু ওই অল্পপথ পার হতে সে দুপুরে বহুক্ষণ লেগে যায়। এক সময় হুঁশ হয় আমি তো বাসার দিকে আসিনি, হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছি থানার সামনে, যেখানে কিছুক্ষণ আগে নিয়ে আসা হয়েছে লাশটি। অবাক হচ্ছেন না? হ্যাঁ আপনি এতক্ষণে অবাক হচ্ছেন, বিস্ময়ে ফেটে পড়ছেন শিমুল ফলের মতো, পটপট ফাটছে ফলটা, ভাবনার তুলো আছড়ে পড়ছে বাতাসে এবং আপনাকে কেবল এখনই নিশ্চিত করতে পারি, আমি গল্পটি শুরু  হচ্ছে।

আমার চেহারা খানিকটা বাঁদরের মতো : হনুর হাড় উঁচ ুএবং চোখ দুটো ভিতরে ঢোকা, চুলগুলো এমন দেখলে  মনে হবে খুলির সাথে তাদের সখ্য লাইলি-মজনুর মতো, একজন আরেকজনকে জাপটে ধরে আছে। ঘন হলেও পুষ্টির অভাবে চুলগুলো ফ্যাকাশে এবং সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে বসত করে উকুন। পুরুষদের মাথা গরম বিধায় তাদের উকুন হয় না এমন মিথ আমার ক্ষেত্রে খাটেনি কিংবা কে জানে খেটেছে, আমার মাথা হয়ত আর্কটিক পৃষ্ঠের মতো শীতল, সুতরাং উকুনেরা সেখানে গড়ে নিয়েছে ইগলু। বাঁদর চেহারার একজন লোক থানার সামনে উৎসুক দাঁড়িয়ে থাকলে কারও কিছ ুযাওয়াআসার কথা ছিল না তবু খুব সুদর্শন এক কনস্টেবল ভ্রুকুঁচকে আমার দিকে এগিয়ে  আসে, ‘কী বিষয়? কারে খুঁজেন?’ বিনয় আমার মাঝে খুব প্রবল এমন বলবো না, যদিও পুলিশ দেখলে ব্যাপারটা কেন যেন এমনিই চলে আসে; এর আগে যতবার পুলিশের মুখোমুখি হয়েছি বিনয়ে গলে পড়েছি নিজের অজান্তে, এবারও ভিন্ন কিছ হয় না, মুখের হাসি বিকশিত হতে হতে গাল ছিঁড়ে যাবার উপক্রম হয়, কেমন কুঁজো হয়ে যাই, কণ্ঠে মধু ঢেলে খানিকক্ষণ কাশি। আমাকে দেখে সুদর্শন কনস্টেবলের ভ্রু আরও কুঞ্চিত হয়, ওই মিয়া, নেশা ভাং করছেননি? সেই কখুনথেইকা দেখতাছি খারায়া রইছেন, বিষয় কী আপনের, সার, বিষয় তেমন কিছুনা।’ খারায়া রইছেন কেন তাইলে? হাজতে ঢুকবার চান? জ্বিনা।একটু আগে ওই যে একটা.. অইযে একখান কী? ওইযে একটা লাশ আনলো না মুসলিম বাজার থেকে? মহিলার? হ, তো? উনি ভালো আছেন? ওনার খোঁজ-খবর নিতে এসেছিলাম।

খানিক পর নিজেকে আবিষ্কার করি ডিউটি অফিসারের সামনে। এই লোকটি দেখতে ঠিক ওই কনস্টেবলের মতোই, সুন্দরের আধিক্যে চেহারায় রমণীয় আভা চলে এসেছে, খেয়াল করে দেখলাম ডিউটি অফিসারের চোখের নিচে কেমন কাজলটানা; আমার আম্মা বলতেন এই রকম চোখকে জন্ম কাজলি বলা হয়। জন্ম কাজলপরা পুলিশ আমার দিকে তীব্র বিদ্বেষ নিয়ে তাকান আপনাকে পাগল তো মনে হয় না, এমন বিচিত্র আচরণ কেন করলেন? পুলিশকে কি নিজের ইয়ার-দোস্ত ভাবেন, সার, লাশটি সম্পর্কে নাগরিক কৌতূহলে একাজ করেছি। ধুপ করে চোখের সামনে উনি ওভাবে পড়ে গেলেন, নিজের বিস্ময় আঁটকে রাখতে পারি নাই। ওনাকে নিয়ে আপনারা কী করবেন এখন? সেটা আমরা আপনাকে বলতে যাব কেন? যাইহোক, লাশের আত্মীয়-স্বজন খুঁজবার চেষ্টা করা হচ্ছে। এরপর ময়না তদন্তে পাঠানো হবে।’ আমি কি আরেকবার দেখতে পারি? যদি পরিচিত হয়? এলাকার ঘটনাই তো সার, পরিচিত হতেও পারে, ভিড়ের মাঝে ভালোমতো খেয়াল করতে পারিনি তখন। থানার ভিতর দিকের বারান্দা,এককোণায় চাটাই পাতা, ওর উপর লাশটি শাদা কাপড়ে ঢেকে ফেলে রাখা হয়েছে; সম্ভবত কিছুক্ষণ পরেই মেডিকেলে পাঠিয়ে দেয়া হবে। ধীরপায়ে এগিয়ে গেলাম, ইচ্ছে হলো মুখের কাপড় সরিয়ে মনযোগ দিয়ে চিনবার চেষ্টা করি, চিনে ফেলবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও কী নেই? কিছুক্ষণ বাদে হাসি পায়, মিরপুর বারো খুব বড় এলাকা, সবাইকে আমি যেন চিনে বসে আছি? আর লাশটা দেখতেও আমি কেন এসেছি? কী কারণে? তখন বারান্দা গলে আসা বাতাসে পাতলা চাদরটি সরে যায়, ঠিক সিনেমায় সচরাচর যেমন হয় আর কি, অমন ব্যাপার-স্যাপার। মনে হলো মৃতদেহটি হাসছে সিলিঙের দিকে চেয়ে, ধীরে ধীরে হাসিটি বিকশিত হচ্ছে, এবার কি তবে লাশটির গাল ছিঁড়ে যাবে? গাল ছিঁড়বার আগে আমার পিঠে কারও হাত পড়ে।

চিনতে পারলেন?

এযাঁ?

নাহ। চেনা গেল না। খুব খারাপ লাগলেও স্বীকার করতে হচ্ছে সার, এইরকম ঘটনা বাপের জন্মেও দেখিনি, বলা নেই কওয়া নেই, একজন মহিলা স্রেফ ধপ?

ঠিক ঘোরগ্রস্তের মতো বের হই থানা থেকে, মগজের কপাটে কপাটে বাড়ি খায় সিলিঙের দিকে চেয়ে হেসে ওঠা মৃতদেহটির মুখ, একটি স্বাস্থ্যবান, রূপবতী লাশ, যে লাশ জগতের সকল পুরুষের বুকে কামনা জাগিয়ে দেয়, জীবিত অবস্থায় না-জানি সে কতজনার ভোগের শিকার হয়েছিল আর শেষপর্যন্ত কেমন রাস্তার পাশে মৃত্যু এগিয়ে এলো তার দিকে! আমি ডানদিকে পা বাড়ালে, আকাশে তাকালে কিংবা উঁচুতলার ব্যাল্কনিতে দেখতে পাই মৃতদেহটি দাঁড়িয়ে আছে। একটানা, অজস্র মৃত দেহ, চোখে চোখ পড়লে তারা হাতও নাড়ে যদিও তাদের শূন্য আর দৃষ্টিহীন চোখ আমার অস্বস্তিকে বাড়িয়ে দেয় প্রতিমুহূর্তে, কী ভেবে আমিও প্রতিটি লাশের দিকে চেয়ে হাত নাড়তে থাকি।

রাত নটা বেজে একান্ন মিনিট, শৈশবে আমার একবার টাইফয়েড হয়:  দেখতে পাই প্রচ- এক জন্তুর মতো ব্যাধিটি আমাকে জাপটে ধরে আছে, গোঁ গোঁ শব্দ করছে তার মুখ থেকে বেরুনো লালায় জবজবে হয়ে উঠছে শরীর, দুর্গন্ধ আর যন্ত্রণায় ঘুম আমার থেকে বিদায় নেয়। সারাদিন নিস্তেজ হয়ে থাকি, রাত্তির বেলা বেঁচে থাকাটাই অসহ্য লাগে; এসবের মাঝে টের পাই পাশে বসে রাত জাগতে জাগতে ভেঙে পড়ছেন আম্মা। সমস্ত দুর্দিনের যেহেতু শেষ থাকে, তারিখের উপর তারিখ গড়ায়, সেভাবে সুস্থ হবার পথে আবিষ্কার করি আম্মা ভেঙে পড়ছেন। এরপর যখন প্রায় সেরে উঠছি বহুদিন বাদে, তিনি বিছানা নিলেন। চিরকাল আমার আম্মা ছিলেন রুগ্ণ দেহের অধিকারী, সে রুগ্ণ দেহ আরও দুর্বল, শীর্ণকায় হয়ে বিছানায় পড়ে রইলো। একজন নারী নিঃসন্দেহে জগতের শ্রেষ্ঠতম প্রাণ যখন সে কারও জননী হয়ে ওঠে, সে অর্থে তারা সব সময় জননী হবার সম্ভাবনা ধারণ করে; আমি বুকের সমস্ত আবেগ দিয়ে অনুভব করি, তাদের অধিকাংশই জগতের শ্রেষ্ঠতম প্রাণ।

এই শহরটা তো আসলে ভেঙে পড়ছে, ঝরে পড়ছে, হাতের মুঠোয় বালু নিয়ে চাপ দিলে সেগুলো আঙুলের ফাঁক গলে যেমন ঝুরঝুরঝুরঝুর পড়তে থাকে পুনরায় বালির স্তূপে, ওভাবেই ঝরে পড়ছে এ শহর। দিনের বেলা বাইরে বেরুতে ভয় পাই আমি, প্রতিটা মোড়ে, রাস্তার ফুটপাথে কিংবা চলমান রিকশায় ওই স্বাস্থ্যবতী নারীটির মৃতদেহদের চলে যেতে দেখি আমায় ছাড়িয়ে, তাদের মুখের হাসিটি বিকশিত হবার ক্ষেত্রে কোনো রকম বাঁধ মানে না। দিবসরজনী আমি ভাবতে চেষ্টা করি মায়ের মুখ, একটা বলের মতো গোলমুখ, চওড়া এবং সমতল কপাল, চোখ দুটোতে বিষাদি সমুদ্র নিয়ে তিনি বসে আছেন যেন শিয়রে, আমাকে নিস্তেজ গলায় জিজ্ঞেস করছেন- কটা বাজে?

নটা বাজে আম্মা।

ঘড়ি দেখে বল বাবা, নটা কত?

নটা বেজে একান্ন মিনিট।

এত বেজে গেল? তুই ঘুমিয়ে পড়গে যা।

আমি আমার বিছানায় চলে আসি নটা একান্নর কথা ভাবতে ভাবতে, মনে হয় তলিয়ে যাচ্ছি, যে শহর প্রতি মুহূর্তে ঝরে পড়ে সেখান থেকে সরে যাচ্ছি বহুদূরের অচেনা কোনো বন্দর কিংবা নগরে, যেখানে গেলে আমি দেখতে পাব আমার আম্মা সুস্থ আছেন, হেসে খেলে পার করছেন সময় আর মাংসের দোকানের সামনে ওই রূপবতী মহিলাটি এসে অবলীলায় আবার ফেরত যাচ্ছেন তার গন্তব্যে, জীবিত। একটি দেয়াল ঘড়ির সুদৃশ্য ডায়ালও দেখতে পাই, সেখানে নটা বেজে একান্ন মিনিট চিরকাল রাত্রির যে প্রহর দুচোখে ঘুম নামায় বানের পানির মতো, আমি প্রার্থনা করতে থাকি এঘুম যেন না ভাঙে।

 

জান্তব

গল্পটা ঠিক জমলো না, শুরু আছে অথচ ঠিক শেষ হলো না, টুইস্ট ফুইস্ট নেই; আবার মূল চরিত্র হয়ে কেমন বিজ্ঞের মতো আওড়ে গিয়েছি অতি চেনা তত্ত্বকথা। সত্যি বলতে এখন ঘড়িতে কত বাজে বলতে পারছি না, জানালার কাঁচ খুলে দিয়েছি যদিও ছায়াগুলো সরে যাচ্ছে না ওতে।

কিন্তু জানালার ওপাশে ডাস্টবিন আর ভাঙাচোরা রাস্তা নিয়ে যে পৃথিবীটি দাঁড়িয়ে আছে, ওখানে তাকাবেন? ওই তো কুকুরটিকে দেখতে পাচ্ছেন, দু’পাড়ার নৈশ জন্তুগুলোর মাঝে যে জায়গাটি নো ডগস ল্যান্ডÍ সেখানে ওই পঙ্গু ও একচোখ কানা ঘিয়ে কুকুরটি ঘাড় উঁচিয়ে চেয়ে আছে আপনার দিকে। এখন সে নগর ভ্রমণে বেরুবে, স্মরণ করবে তার শৈশবের স্মৃতি: তাদের তিনবোন আর দু’ভাইয়ের জন্ম একসাথে, প্রচ- শীতের ভোরে। তারা পায় গোলগাল দেহ, উজ্জ্বল চামড়া এবং চোখ; এরপর সময় সেই চোখ ও উজ্জ্বলতা গিলে নিয়ে যা ফেরত দেয় তা হয় গল্প। সে হাঁটতে থাকবে, চারদিকে ঝরে পড়তে থাকা শহর রয়ে যাবে পিছনে, কুকুরটি রাত্রিভর নগরের প্রত্যেক মহল্লায় চক্কর দেবে খাদ্যের সন্ধানান্তে পঙ্গু ও অন্ধ তাই কোন এলাকায় সে বাধা পাবে না। কুকুরদের জগৎ বড় বিচিত্র, তাদের ঘড়িতে অনন্ত রাত্রি ও সেখানে চিরকাল নটা একান্ন মিনিটের বেশি আমি বাজতে দেখিনি কখনও।