কবিতা

 

মোহাম্মদ রফিক

স্বপ্ন

 

এ মুহূর্তে

ছোট্টো এক হরিণশাবক

 

জল পানে ব্যস্ত ছিল

শিবসার স্রোতে

 

তাকে দ্রুত ফিরতে

হবে মা ওই হোগলার ঝোপে

 

দাঁড়িয়ে, এক্ষুনি যেতে হবে

ঘোলা জল সাদা নয় তবু

 

রং পালটে সাদা হয়ে গেল

একটি তারা নেচে যায় দূরে

 

মাগো ওই দেখো শুকতারা

মা হরিণ কেওড়ঝোপে

 

বিস্মিত মাতার অশ্রু ঝরে

তার শিশু শুকতারা ওই

 

হাসছে হাসছে দিগন্তরে

কোনো এক বাংলার আকাশ

 

মুহম্মদ নূরুল হুদা

মানুষচাষীর মুখে মূলকথা

লোকশ্রুত প্রথম শব্দটি যদি ওঙ্কার,

তার বিরোধী শব্দটির নাম হুঙ্কার;

মিত্র যদি আমাকে দশহাতে আগলায়,

শত্রু কিন্তু বিনা ওজরে দশপায়ে তড়পায়;

পরস্পর প্রতিযোগী এইসব অসংখ্য শব্দ

দিনরাত আমাদের বোধের কারগারে জব্দ।

 

বাংলা ছেড়ে যখন ইংরেজি ধরি,

অগোচরে ঠিক এই কাজটাই করি।

নান ইজ মাই এনেমি;

আই অ্যাম ইউ, ইউ আর মি।

 

ভগবৎ গীতা থেকে মহাগ্রন্থ কোরান শরীফ

সর্বত্র খুঁজে ফিরি ত্রিভুবনে স্রষ্টার তারিফ।

ঐশী কিতাব থেকে যুগে যুগে মানব-মনীষা:

শব্দে শব্দে খুঁজি প্রেম, খুঁজি নাতো হিংসা-বিবমিষা।

 

এভাবেই জগতের সাড়ে আট হাজার মাতৃভাষা

আর তার প্রতিটি শব্দে ব্যাপ্ত আলো-ভালোবাসা

জেগে আছে মিলনে-বিরহে, মানুষের দুঃখে আর সুখে;

শব্দে শব্দে গড়ে ওঠে শব্দঘর; প্রাণে-প্রাণে বুকে-বুকে।

 

মানুষ মূলত শব্দচাষী;

মানুষচাষীর মুখে মূলকথা : ভালোবাসি।

 

রবিউল হুসাইন

স্বর্গাঙ্গার স্বরলিপি

এই কথা মনে থাকে যেন। বলে যয়ে বনফুল বারে বারে। নদীকূল বড়বড় মাছ মাথা তোলে ইতি উতি। চোখে চোখে চোখ রাখে। কেন তারা ডাক দেয় ওই পারে যেতে। সেইসব গাছে গাছে পাখি সব ওড়াউড়ি করে। পাতা ধরে ঝুলে পড়ে নিচে। দূরে গিয়ে কথা কয় হেসে হেসে শোনে। আর ঝরে ঝরে যেতে যেতে মনে হয় আর কোনদিন দেখা হবে কিবা নাও হতে পারে। তাই সব শেষে চলে যেতে হবে। তবে চোখ যদি ভালো থাকে দেখা হবে। তবে চলে যেতে হবে। সেটা করে বলা যায় কিন্তু তাকে দেখা দিতে হবে। কথামালা ডালা ভরে নাড়–মুড়ি দিয়ে মেখে মেখে আদাজল নেড়ে নেড়ে। নুন ঝাল দিয়ে। মনে মনে কত কথা কিযে ধরা পড়ে। ধীরে ধীরে তারা সব একে একে কাছে এসে বলে। কেন তবে কাছেপিঠে মুখ চেয়ে থাকে। বাঁকে বাঁকে খালেবিলে ছোট ছোট জল ঢেউ। কেন ওঠে নামে। কেন তারা হাতে হাতে ধরে। সব কিছু নিয়ে দূরে যেতে থাকে। যেতে যেতে কেন তারা বারে বারে আরও আরও দূরে যেতে চায়, তারা আর এই ভাবে দূরে যাবে। এত পথ পাড়ি দিলে পথহারা হবে। তা কি তারা জানে। দূরে গেলে কেন তারা কাছে কাছে যাবে। তার আসা হবে। তবে যারা কাছে আসে কেন তারা বারে বারে দূরে যেতে চায়। তারা আর কতদূর যাবে। এই ভাবে চলে যেতে যেতে। দূরে দূরে। মনে মনে। বারে বারে। ফিরে ফিরে। চেয়ে চেয়ে। সেই দিন কত দিন। সারা রাত জলে ভেজা। মেঘে মেঘে বেলা যায়। বারে বারে কাছে আসা। মনে হয় সেই ভালো। ভোর বেলা চলা ফেরা। বয়ে যায় সুখ দুখ। আর কেন ঘুরে ফিরে দূর থেকে কাছে আসা। বারবার কত আর কাছে থেকে দূরে দেখা দৃষ্টিহীন যাবতীয় যারা তার অন্ধ। বিছুই দেখে না। যাদের সতেজ দৃষ্টি। তারা দেখে সবকিছু। এটাই প্রকৃতি। কাছেই বজ্রপাতের ঠাঠা শব্দ। সব দেখা যায় দূরে দূরোকিত শোনা যায়, কোলাহল। হৈচৈ। আর কানে কানে কথা বলা।  অথচ আশেপাশে কেউ নেই কোনদিনও ছিল না। কোনদিন সমাগম হবেও না যদি যে কথাটা বলা যায় না। সামনে  দিনে হলেও হতেও পারে আবার না-ও হতে পারে। এতে কারো কিছুই যায় আসে না। সবকিছুই অনির্ভাবনীয়। কখন যে ঘটবে বলা যায় না। আবার বলা যায়ও। তবে কী। কখন। কেন। কোথায়। কবে। এখন। কে জানে। এই যে  প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসা। এটিই আসল। অন্য সব ধোঁয়াশা । এটিই সম্বল।

 

 

অসীম সাহা

অথর্ব চাঁদ

 

অথর্ব চাঁদের পেটে লাথি মেরে বিভীষণ

অকস্মাৎ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ঢুকে গিয়ে

ইতিহাস বদলে দেয় নিজের মতন।

 

মেঘনাদ প্রার্থনায় বর মাগে;

ইন্দ্রের সভায় গিয়ে করজোড়ে

পেতে চায় অমর জীবন।

 

এরই মাঝে অন্ধকার হামাগুঁড়ি দিয়ে ঢোকে;

মেঘনাদ মেঘের আড়াল থেকে নিপুণ শিল্পীর মতো

অব্যর্থ বাণ ছুড়ে লক্ষ্যভেদ করে।

বোকা চাঁদ স্নিগ্ধ আলোর স্রোতে

কচুরিপানার মতো ভেসে গেলে

সমুদ্রমন্থন করে বিশ্বাসঘাতক।

 

এইভাবে চোরাস্রোতে ডুবে যায় প্রকৃত জীবন।

সন্দেহাতীত জলে ভেসে যায়

পরান্মুখ প্রেমিকার নাকের বেশর।

তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু ডুবে যায় অতল সাগরে।

 

সোনালি নদীর তীরে সূর্যোদয়ের পর

সুন্দরী প্রেমিকার ভুরুর মতন যেই চাঁদ দেখা দেয়

তাকে নিয়ে আলোর সন্ধানে যেতে

ম-বর্ণের জীবনে কোনো কলঙ্কের কালিমা লাগে না।

 

রবীন্দ্র গোপ

সাগর সঙ্গম

 

সাগরের সাথে বেশ জমছে আমার

ধুলোকণা নোনা জল তিতে দেহ

তবু ডুব সাঁতারে ওরই দেহ পেতে থাকে,

জোয়ার জলের ঢেউ ওতো আমারই বউ।

 

ওর সাথে যত কথা শঙ্খচিলের ঝিলিকমিলিক

সাগরের ঢেউ ঢেউ স্বপ্ন সূর্য, ডাকে কেউ

অনন্তের পথে সামান্য যাত্রা বিরতির কাল

অলৌকিক যোগাযোগ হিসাব নিকাশ।

 

২.

সাদাপাতা কবিতার খাতা চঞ্চল চোখের তারা

কাকে খোঁজে, বঙ্গোপসাগর থেকে ঢেউয়ের ই-মেইলে

তোমাকেই লেখে, লেখে যায় প্রেমের ঈশ্বর ঠিকানায়

শঙ্খচিল ঝাঁকে ঝাঁকে আসে ফেনিল শব্দের গানে।

এপার  ওপার কোন পারে যে যাবার কথা জানে কি সময়

কবিতায় মশকের নগ্ন নাচন আসন শাসন কাপিয়ে যায়

স্বপ্নকন্যার ঢেউয়ে উথালপাথাল মন ছুটে যায়

দূরে অনেক অনেক যেখানে কেউই নেই আর।

 

৩.

ছেঁড়াদ্বীপ আসলেই কবিতার ছেঁড়া শব্দকুসুমের ঘ্রাণ

সাগর কন্যার অভিমান ফোটা পাথরের জলে স্নান

স্ফটিকের ঝলমলে বালির কলতান সূর্যের গান

সাগরের সোহাগে রাত্রির চুম্বনে একাকী জাগে দ্বীপকন্যা।

 

প্রেমের বন্যায় ভাসতে ভাসতে ভেজা চুলে বিলি কাটে মন

ছেঁড়াদ্বীপ কবির জন্যই মৎস্য কন্যার রূপালি দেহে আঁকে প্রেম

নোনতা জলের স্বাদ মেখে শুয়ে থাকে সাদা পাথর প্রতিমা

কোন কবি এসে টোকা দিতেই জেগে উঠলো প্রতিমা সুন্দর।

 

শিহাব সরকার

মণিদীপা আছে সুবাসে

মণিদীপা গিয়েছে চলে শেষ বিকেলে

ব্যালকনিতে সাইড টেবিলে চা-কাপ

বৃষ্টি নেই আর, মেঘ কেটে গেছে।

কেয়াঝোপ থেকে গন্ধ আসে এসময়

আজ গন্ধ নেই, না থাকুক

নারীর সুবাসে বাতাস ভারি

 

বোতলে পুরে রাখি মণিদীপার ঘ্রাণ,

আসবে না আর এই পথে

পেয়ালাটি থাকুক সাইড টেবিলে

অভিমানে কান্নায় উত্তাপে বরফ গলেছে

অনেক ফোঁটায় অশ্রু ঝরেছে সারাটা দিন

চা-কাপ সরাবো না আমি

 

থাকুক  পেয়ালা অমলিন

কিনারায় থাকুক ঠোঁটের স্পর্শ, থুতু ।

বৃষ্টিমাখা দীর্ঘ পদরেখা সিঁড়ি অবধি

কতদিন থাকে, থাকে  না জানি

ভোরের রৌদ্রে পৃথিবী ভেসে যাবে কাল

দিনের স্মৃতিগুলো মরে যায় পরদিন।

 

বাতাসে আঁকা মণিদীপা মুছে গেছে

রোদে ঝলসানো নারী তবু ফিরে আসুক

বৃষ্টি সহজে থামবে না, বর্ষা থেমে আছে

সাইড টেবিলে পেয়ালাটি আছে

 

বোতলে ভরা মণিদীপা আছে সুবাসে।

 

নাসির আহমেদ

বসন্তে শীতের এলিজি

 

রক্তজবার মত উদিত সূর্যের আলোয় একাকার আজ গোধূলি দেখার সাধ

যেন আগুন জ্বলছে এই ভোরের বাংলায়, আগুন জ্বলছে শিমুলে কৃষ্ণচূড়ায়

আগুন জ্বলছে ফাল্গুনে এই ফেব্রুয়ারিরর ভোরবেলায়

আগুন মাথায় নিয়ে হাঁটছে বাংলাদেশ।

 

এই ফাল্গুনে ডাকছে কোকিল শহিদ মিনারের পেছনে শিমুলের ডালে

কৃষ্ণচূড়ায় আগুন লেগেছে আজ এই বসন্তের ভোরে

টের পাই আমার বুকের মধ্যে গলায় রক্ত তুলে ডাকছে এক নিঃসঙ্গ কোকিল

বিরহী কোকিলের রক্ত ঝরছে এই কবিতার মর্মমূলে।

 

হু হু বেগে বইছে দখিনা বাতাস, উড়ছে শুকনো ঝরাপাতা উদ্যানে, সড়কে

এই প্রবল বাতাস উড়িয়ে নিচ্ছে আমার চুল, এলোমেলো

করে দিচ্ছে আমার মন, আমি কি তাহলে বসন্তাহত এক নিসর্গ সন্তান!

সূর্যাস্তের রক্তিমাভা আমার এই ভোরবেলাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে আজ।

 

যেন এই ফাল্গুনে, এই বসন্তে বইমেলা থেকে হঠাৎ একটি

তরুণ আর একটি তরুণী ঢুকে পড়েছে আমার বুকের মধ্যে

তুমি যদি কোনোদিন জানতে বাংলাদেশ আজ এই ফেব্রুয়ারিতে

এই ফাল্গুনে কী নিবিড় উল্লাসে ডাকছে তোমাকে- তুমি এসো…

 

তুমি আজ তোমার ভূগোল থেকে বহুদূরে, কৃষ্ণচূড়াহীন

বরফাচ্ছন্ন এক তৃষ্ণার্ত রাত্রির কাছে সমর্পিত বসন্তহীন ফেব্রুয়ারিতে

আমি তোমার জন্য এই বসন্তে রচনা করছি শীতের নির্জন ঝরাপাতা

তুমি কোনোদিন জানবে না এই বইমেলা ডেকেছে তোমাকে।

 

প্রতীক্ষায় তোমার পথ চেয়ে আছে এই নগরীর কৃষ্ণচূড়া-শিমুল পলাশ

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্সে তুমি বিরহের দীর্ঘশ্বাস হয়ে আছো দূরে।

 

ফারুক মাহমুদ

এত কাছে এত দূরে

সামান্য মুহূর্ত মাত্র, এর কিছু আগে-পরে হলে

কখনও হতো না দেখা তোমার-আমার

 

তোমার বন্ধুর বাড়ি। বেরুচ্ছিলে একা

আমার বন্ধুর বন্ধু। আমাদের ফেরার সময়…

 

দৈববশে কী যে এক দেখা হয়েছিল!

 

এর পর, এরও পর, নিদ্রা ও জেগে থাকার বেড়েছে বয়স

কত নদীজলশূন্য হল

কত চোখে যুক্ত হল ভস্মজন্ম শ্রাবণের ধারা

 

আমাদের সেই দেখা এখনও তো প্রবাহিত আছে

 

এত কাছে। এত দূরে। দূরে দূরে। এত এত কাছে

 

কামাল চৌধুরী

তুষারপাত-১

মাথার উপরে মনখারাপের আকাশ

মাথার উপরে ছড়িয়ে পড়ছে সাদা সাদা পঙ্ক্তি

পায়ের নিচে তুলো ভেজা দীর্ঘ চরণ

একটি আচ্ছন্ন সকাল তুষারপাতের দখলে যেতে যেতে

শিখে নিচ্ছে পিপীলিকার দুর্যোগ প্রস্তুতির পূর্বাভাস

 

ওভারকোটের নিচে জমা রাখছি উষ্ণতার স্বপ্ন

হাতের তালুতে ছুঁয়ে দেখছি হিমাঙ্কের নিম্নগামিতা

পাশেই অরক্ষিত বৃক্ষশাখে হাহাকার করছে

জবুথবু সময়

জানালায় উঁকি দিচ্ছে ধবল কার্পেটের স্তব্ধতা

জানালার পাশে ভিন্ন মহাদেশ…

 

৭/২/২০১৮

মাউন্ট হলিঅক কলেজ, ইউএসএ

 

 

তুষারপাত-২

ব্রেকফাস্টের টেবিলে নাতিশীতোষ্ণ সময়

এগ মাফিন আর হল্যান্ডেইজ সসে পান্থশালার উষ্ণ সকাল

বাইরে তুষারপাতের নিস্তব্ধতায় বরফ সরানো ট্রাকের শব্দ

বাইরে জমে যাওয়া লেকের পানির দীর্ঘশ্বাসে ভারি বাতাসের পদধ্বনি

 

তবু জীবন এখানে কলেজের ছাত্রীদের

স্নোবুটে ভর করে হেঁটে বেড়াচ্ছে

খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে গাড়ির বরফ সরাচ্ছে

মধ্যবয়সি এক মহিলা

গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠতেই থমকে যাওয়া যে জীবন

গতি পেয়ে গেছে- সেখানে এসো,

দু’ছত্র কবিতা লিখে তুষার পতনের বন্দনা করি।

 

৮/২/২০১৮

মাউন্ট হলিঅক কলেজ, ইউএসএ

 

 

তুষারপাত-৩

তুষারবিন্দুর কাছে জ্যোৎস্নাকে জমা রেখেছি আজ

আকাশে চাঁদ নামে কোনো মামাকে দেখা যাচ্ছে না

পায়ের নিচে এত সাদা মেঘ

রোদ উঠলে না জানি ভুল করে কাশবন ভাবি

একটি অভিবাসী দেশে আকাশের মতিবিভ্রমেও

পূর্ব-পশ্চিম আলাদা

এখানে বর্ষার কবিতা জমাবে না ভেবে

জানালায় উঁকি দিচ্ছে আমার দেশে ফেরার তাড়া।

 

৯/২/২০১৮

মাউন্ট হলিঅক কলেজ, ইউএসএ

 

তুষারপাত-৪

ধীর লয়ে, প্রলম্বিত বিলাসিতায় ক্রমাগত পরিব্যাপ্ত

তুষারের আয়োজন

যেন চিরচেনা অক্ষরবৃত্তের খসড়ায় মৃদু অনুশীলন চলছে

যেন হারানো অন্ত্যমিল খুঁজতে গিয়ে তুষারে মুখ ঘষছে তরুণ কবি

ভিন গোলার্ধের মাত্রার হিসাবের জটিল অঙ্কে

ম্যাপল গাছের বিবর্ণ কাঠামো

একে রক্ত মাংস দিতে হবে- ভাবতেই যুগপৎ রোদ উঠছে দেখি

 

এইসব অলস অনুষঙ্গে আমি দূর প্রবাসে

খেঁকশিয়ালের বিয়ের উপমা খুঁজে পাই।

 

১২/২/২০১৮

মাউন্ট হলিঅক কলেজ, ইউএসএ

 

শামীম আজাদ

তোমার কথা থেকেই দিলাম

 

জানি এই ভাবে ড্যাফোডিল ঢালে নেমে গেলে

মনে হবে একদিন আমিও বিদ্যুৎ ছিলাম আর

কুয়োকাটা মধ্যাহ্নে স্থির বসা বালিকাদের স্তন দেখে

দুধের বোতল ভেঙে ডাকিবে ডাহুক।

 

চারিদিকে পাঁজরের ফুল দেখে

তোমাদের সাথে থেকে আমিও করিতেছি ভুল।

সমস্ত রাতের রতি শেষে তোমার বুকের গন্ধ ভরে দিয়েছিনু ঘুম

পাথর পালঙ্ক ঘিরে বকুলের শ্বাস ফিরে বন্ধক রেখেছিল অদ্ভুত তান্ত্রিক তূণ।

 

আজ অতীতের যতকথা যত কিছু কথকতা

সকল হয়েছে প্রবল, একরোখা জল আর কালের কপোল

আমার এ জীবনে শুধু রয়ে গেছে স্মৃতির পেঁচাল

তুমিও দেখিবে একদিন কূশপত্রে প্রশ্ন ঝরিতেছে

তোমারেও নিন্দাকাঁটা বিঁধিতেছে

তরঙ্গ ভাঙিতেছে তুষারের যাবতীয় তাপ

দূরতম দীপ্র প্রথমালোকে

মেঘের জাহাজ ধরে আসিতেছে প্রাচীন

যা শুধু আমারি চিহ্ন, নহে কোন পার্থিব ঋণ।।

 

ড্যাফোডিল নমিত হলে নন্দিত নববর্ষ বলে,

শামীম আর কতদিন? এভাবে প্রবাস তুমি করিবে রঙিন !!!

 

মুহাম্মদ সামাদ

আমার নন্দিতা বাড়ি নেই

 

ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে এথেন্সের পথে

মেঘের উপরে ভাসতে ভাসতে

আমি চোখ বুজে নন্দিতাকে দেখি :

 

[ছোটোবেলা যে মেয়ে আমার জামা, জুতো

ছোটো গায়ে ছোটো পায়ে গলিয়ে হাসতো খিলখিল করে]

এই শীতে- গায়ে ডাউন জ্যাকেট, পায়ে গামবুট

মাথায় উলেন টুপি আর জিনসের প্যান্ট পরে

ব্যাগ পিঠে সে লন্ডনের পথে পথে হাঁটে;

বাস থেকে বাসে ওঠে, ট্রেন থেকে ট্রেনে চড়ে,

ওভারব্রিজের সিড়ি ভেঙে প্ল্যাটফর্ম বদলায়;

বাসভর্তি ট্রেনভর্তি ব্যস্তসমস্ত মানুষ

সাদা কালো আর বাদামি মানুষ-

তবুও এখানে কেউ যেনো কারো নয়;

নন্দিতাও কাউকে চেনে না!

কখনও বা খুব ঠান্ডায় কফিশপে ঢুকে যায়

এক কোণে বসে একা একা কফি খায়।

 

আমি দেখি, সামারে সবুজ ঘাসে গাছে

প্রজাপতির রঙিন দোলা; কাঠবিড়ালির ছুটোছুটি;

মৌমাছিদের সুরে মশগুল ফুলের বাগান;

আর, নন্দিতা কফির মগ হাতে করে

ইস্ট লন্ডন ইউনিভার্সিটির সবুজ চত্বরে

পাখিদের মতো ওড়ে, ঘোরে, আড্ডা দেয়;

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে, মাদাম তুসোতে যায়;

লন্ডন ব্রিজের রেলিঙে দাঁড়িয়ে

ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেয়;

ফেসবুকের দেয়াল জুড়ে লাইক, লাইক…

 

রীমা আর আমি প্রতিরাতে ভাইবারে কথা বলি

ওর ছোট্ট ঘরের নানান ছবি দেখি-

বই ল্যাপটপ ফ্রাইপ্যান রাইসকুকার

ডিপফ্রিজে ডিম মাছ বেরিফল…

হাসিমুখে কত না বাহবা দিই!

 

কোনো কোনো দিন বাড়ি ফিরে

অভ্যেসবশত ডাক দিই- মা, কী করো? এসো খাই।

ওর ঘর থাকে পাথরের মতো নিরুত্তর;

আমার বুকের ভিতর মুহূর্তে

বয়ে যায় শূন্যতার ঝড়…

[আমার নন্দিতা বাড়ি নেই]!

 

 

আসাদ মান্নান

দয়াল মাওলানা

আপন পুত্রের রক্তে এ কেমন আলো আপনি জ্বাললেন

হে মহান মাওলানা ইমদাদ রাশিদী!

মসজিদের ইমাম থেকে

আপনি হয়ে গেলেন আজ

মানবতার প্রকৃত খলিফা:

কতিপয় মৌলবাদী দাঙ্গাবাজ হিংস্র জানোয়ার

অশান্তির দাবানলে পুড়ে দেয় মানবউদ্যান-

ওরা খুন করে

আপনার মাসুম বাচ্চাকে;

অথচ অবাক হয়ে জগৎ দেখলো

পুত্রের হত্যার পরে

কী অবলীলায় এক দুঃখী বাবা

তাঁর প্রিয় জন্মভূমি আসানসোলে

শান্তির অমৃত বাণী মুখে

উড়ালেন মানবপতাকা।

হে মহান মাওলানা!

আপনি তো জানেন

এ মাটিতেই জন্মেছিলেন আরেক অনন্য দুখু মিয়া-

মানবতার অমর কবি।

 

ভালোবাসা মানুষেরে করেছে মানুষ

ভালোবাসা বেঁচে থাকে শুধু ভালোবেসে;

যেখানে মানুষ থাকে সেখানেই জন্মে মানবতা :

তবে কি ভারতে আজ মরে গেছে

মানবতা এবং মানুষ!

কে দেবে উত্তর?

কেউ কি আছেন ভাই,

কেউ কি আমাকে শুনছেন?

আজ এই দুঃসময়ে

কোথায় মহাত্মা গান্ধী

কোথায় রবীন্দ্রনাথ

কেউ কি এমন নেই বিশাল ভারতে!

আছেন, আছেন… কেন থাকবেন না-

ভারতে আছেন সবে-

কবি শিল্পী চিত্রকর এবং গায়ক

হাজারে হাজার;

এ খবর তারা কি পায়নি!

কেউ কেউ হয়তো পেয়েছে,

আর কেউ হয়তো পায়নি-

তারা জাগবে- অবশ্যই

সমস্বরে ওরা জেগে উঠবে;

আপনার দেয়া

শান্তির ললিত বাণী

আকাশে বাতাসে উড়ছে, সে সঙ্গে উড়ছে আজ

আপনার নি®পাপ পুত্রের খুনে রঞ্জিত পতাকা-

যে পতাকা অশ্রু আর বেদনাকে ঢেকে

আপনি উড়ালেন, যেরকম একদিন

উড়িয়ে ছিলেন কবি চণ্ডিদাস-

সবার উপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই।

আপনার এ পতাকা পৃথিবীর দেশে দেশে

কে আজ উড়াবে-

বলুন, দয়াল মাওলানা!

 

হাসান হাফিজ

ভাঙাপোড়া রাঙাপঙ্ক্তি

 

১.

আলোর সামান্য আশা

তোমার মধ্যেই বাঁচে স্বপ্নের আলেখ্য ভালোবাসা

২.

রাত পোহালেই ফুটবে কচি শিশু ভোর

আলোর ঠিকানা বেয়ে ছুঁতে চাইবে বন্ধু মনোচোর

৩.

পাপেই তোমাকে পাই পূর্ণ ও ঘনিষ্ঠ করে

পুণ্য বেশি স্বার্থপর,পাপিষ্ঠই থেকে যাবো তাই

৪.

আধো আলো আধো অন্ধকারে তুমি

স্বপ্নছেঁড়া ঘুম হয়ে নেমেছো দু’চোখে

৫.

ভালোবাসার আগুন ভালো জ্বলে

কিন্তু মনের বিরহতুষ ইচ্ছে করেই পোড়ায় না!

৬.

মরতে মরতে বাঁচি, বাঁচতে বাঁচতে মরি

এমন বেহায়া কেন নির্লজ্জ ও বেপথু জীবন?

৭.

পাহাড়ের উচ্চতায় স্থাপন করার পর

কেন ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছ মর্ত্যরে ধুলোয়?

৮.

সমুদ্রের খোঁজে নদী পাড় ভাঙবে মত্ততায়

এটাই তো স্বাভাবিক, কিন্তু নোনতা দীর্ঘশ্বাস কেন?

৯.

মাটির বিছানা পাতা রয়েছেই হোক না দরিদ্র ম্লান

মৃত্তিকাই মহান বন্ধু ও সখা, অন্য কেউই নয়!

১০.

ধ্রুপদী সংগীতে কেন ভেসে ওঠে

হারানো শৈশবস্মৃতি, কাশবন, ভাঙা খেলনা. ঘুম?

১১.

দারুচিনি মেয়েটির নিভৃতি ও সখ্য চায় কবি

কিন্তু সে লুকিয়ে পড়ে চিত্রকল্পে কবিতা-খাতায়

 

হারিসুল হক

আমি জাগি কোন জানালায়

 

পাখিই আমাকে জাগায় আমি জাগি না

ডুবে যাওয়া কিস্তির মতো তলানি ছুঁয়ে

আমিও ডুবতে থাকি

ঘুমের পুকুরে ঘোরের সায়রে

পাখিই আমাকে তোলে আমি ওঠি না

 

একেকটা ঘুম আসে স্বপ্নের লোবান জ্বালাতে

ওয়ালেটে থাকে তার পালাবার টিকিট

 

কোনো কোনো ঘুম আসে বৃষ্টির মতো

-ভেজায়   কাঁদায়

অথচ চিহ্ন রাখে না

কোনো কোনো ঘুম আসে কেবল ভাসাতে নিয়ত ভাসাতে

আমি অতলে থাকতে চাই-  গহনে ভাসতে…

পাখির ডিমের মাঝে কুসুমের প্রায় নিবিড় খাঁচায়

সে কোন বরষাদিনে স্বপ্নের সোনার মাছি পথ হারিয়েছে

সুন্দরবনের নিবিড় গহিনে ..  ..

আজও নিশিডাকা তন্দ্রার ঘোরে বালিশের ওম ছেড়ে

মেঘ ছোটে স¦র্ণাভ মাছির পেছনে

 

নাকাল আমি

হাত পাতি .. ..

বোবাস্রোত উপ্চে পড়ে নদীর আদলে

ভাসি আমি

টলমল টলটল দুঃখার্ত হাঁস নমিত মস্তকে

 

দূরেতে ময়ূর নাকি ডেকে ওঠে গোত্রহীন কাকের ননদী

সংকেতে বলছে বুঝি নেমে যেতে অশীল ক্রীড়ায়

পাখিই আমাকে জাগায় আমি জাগি না

 

তমিজ উদ্দীন লোদী

একটি সকাল ও চেরিব্লজম

 

আবারও ফুটেছে ফুল চারপাশে, চেরিব্লজম

এত উজ্জ্বল রোদ

দুঃখ শুষে নিচ্ছে অচেনা সৌরভ।

উন্মুক্তির সূর্যোদয়ে শুরু হয়েছে ভোর যেন

অঘ্রানের নবান্নের উৎসবের মতো উৎসব।

সমস্ত ক্ষয়, নেতি ও হিংস্রতা লুটিয়ে পড়েছে

পাতাঝরা ও পাতার উন্মেষে।

অলৌকিক মায়াবী কোনো বোধ নির্বাক সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো লুটিয়ে পড়ছে

আর অচেনা পাখি

চেনা ডাহুকের মতো ডেকে যাচ্ছে অবিরাম।

যে ঝরনাটি বয়ে যাচ্ছে, যে সরোবর স্বচ্ছ জলে ভরে আছে তার

নৈঃশব্দ্য ও নিস্তরঙ্গ উপরিতল ব্যেপে

এক নিরবচ্ছিন্ন হাওয়ার উতরোল

চুইয়ে পড়া সৌরভের রসের মতো ডুবে যাচ্ছে সহসা।

নারীরা শিশুরা একেকটি প্রজাপতির মতো

সমস্ত অভিমান ও অনুযোগ ভেঙে প্রাকৃতিক

একটি ভালো লাগা উড়ছে ফুলে, চেরিব্লজমে।

 

জাফর সাদেক

দ্বিধান্বিত জন্মফুল

 

জন্ম হও,

জন্মের কাছে বসে আছে শতবর্ষী পুনর্জন্ম উঠোন

 

গোয়ালঘরে উৎসব, মা-গাভী চেটে চলেছে

জন্মের পর পরই উঠে দাঁড়ানো শৈশবের গা

বাতাসে বইছে মৃত্তিকা নারীর গন্ধ

 

: জানিস বাছুরটার বাবা কোন মাঠে ঘাস খাইছে এখন

 

শৈশবে সেই প্রথম জেনেছি জন্মের গন্ধে জড়িয়ে

এক একজন প্রান্তরপ্রেমী বাবার নাম

সেই প্রথম দেখা একটা জন্ম কীভাবে গোধূলিকে

দেখায় সুন্দর, বাউল সন্ধ্যের পথে

 

কিছু কিছু জন্মফুল সন্ধ্যেসুখ ছুঁতে না ছুঁতেই

জন্মমুখ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে জন্ম-শরীর

যেমন কৃষাণির খেতের আঁচলে কুমড়ো কিংবা লাউ

কিছু কিছু জন্মফুল নিজেই জানে না কেন তারা ফুল

যেমন ফাগুনে আগুন পলাশ…

 

মানবশিশু জন্ম যেদিন দেখেছি প্রথম

না ছোঁয়া নারীশরীর তখনো নৈরাশ্যবাদী স্লোগান

তখনো এড়িয়ে চলেছি পাহাড়ি ঝরনায় অবগাহনকাল

 

প্রসূতির চিৎকার আর চিকিৎসক বন্ধুর হাতে ফরসেপ

মনে হয়েছেÑ আহা মানব কী দীর্ঘ দ্বিধান্বিত জন্মফুল

প্রসূতিঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি দ্রুতই…

কিন্তু দূরের দিগন্তে স্মৃতিসূর্য অস্তমিত নয়

মনে পড়ছিল সব, শৈশবে প্রথম জন্ম দেখা গোয়ালঘর

মৃত্তিকা নারীর গন্ধ…

আর বাবার নাম জানতে চাওয়া ঐ গোধূলির প্রস্তাব

 

: আয় গোপনে বাবা বাবা খেলি, কিন্তু তুই নিবি সব পাপ

 

গোলাম কিবরিয়া পিনু

ট্রেনের জানালা

জানালা খুলে কমলাপুর থেকে

যেতে পারি না জয়দেবপুরও!

ঢিলের ভয়

অন্য কিছু ছোড়ার ভয়

ভীতিবাদও চতুর্দিক!

 

ট্রেন-জানালা বন্ধ করে যাই

আরও দূরে!

মুগ্ধ হয়ে আকাশ দেখা

ফসল দেখা

নদীও দেখা

আর হলো না!

 

চটচটে কী হিংসা হায়-

কোপদৃষ্টিতে নাচে

কারা চ-মূর্তি হয়ে বাঁচে?

রোষবহ্নি জ্বলে!

 

হয়েছি পার জামালপুরেও-

বন্ধনহীনতায় ছুটে চলা

আর হলো না!

সার্বভৌম দুটি চোখও

তাকাতে পারে না-

ইচ্ছে মত জানালা খুলে;

ট্রেন চলেছে শুধুই দুলে দুলে!

 

উদারতা ও স্বাধীনতা-

মনস্তাপে পোড়ে!

মনও ভেঙে যায়

মুষড়ে পড়ি

কোথায় নড়ি!

 

মাহমুদ কামাল

পাখি জীবনের মতো

 

যেখানেই নাচি  তো সেখানেই বাঁচি।

আমাদের বেঁচে থাকা

বর্তে থাকা

আমাদের ঠুনকো জীবন।

 

আমাদের শুষ্ক হাসি

তার কোনও মধুরতা নেই

আমাদের কান্নাগুলো

শোকধ্বনি নয়।

 

পাখি জীবনের মতো যদি হয় আয়ু

সেমতেই বাঁচি বলে সেভাবেই নাচি।

 

মারুফ রায়হান

পরম মানবমিত্র

 

গাছটার সঙ্গে যদি এ জীবন বদলাতে পারতাম

দেখছি দশকভর তাকে, সে আমার প্রতিবেশী

আশ্চর্য স্থিরতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঋজু সন্ত

কোনো তাড়া নেই, ছুটছে না জিভ বের করে

 

মাটি ও মেঘের সঙ্গে তার নিত্য কথোপকথন

ভূমির জমিন জুড়ে বন্ধুতার শত বাহু প্রসারিত

পাখিদল আর নক্ষত্রের সঙ্গেও রয়েছে মাখামাখি

ঝড়ঝঞ্ঝা রোদবৃষ্টি বরাবর ওকে উচ্ছেদে অক্ষম

মানবসেবার ব্রত থেকে কভু সামান্য নড়েনি

 

শুধু ফল ছায়াময়তার কথা বললে কৃপণতা হবে

তৈরি করে চলেছে অমূল্য অনিবার্য আমাদের জন্যে

শ্বাসের বাতাস যদি না পেতাম বল কীভাবে বাঁচতাম!

ওর বিপরীতে আমি কেউ নই, অর্বাচীন উজবুক এক

কোনো মানুষের কোনো কাজে এসেছি কস্মিনকালে?

এমনকি যখন সুহৃদ গাছটির ডান হাত কেটে নিল

নিঠুর কুঠার, তাকে রুখবার কথাটিও মনে আসে নাই

 

স্বার্থপর আত্মপ্রেমী এ জীবন ছুড়ে কবে বৃক্ষ হবো

কোন পুণ্যে বলো একবার হতে পারি পরম মানবমিত্র?

 

মিনার মনসুর

ম্যাডোনা নাচছেন

 

কোথায় না ছিল সে! অথচ গাণ্ডিবের বন্দনায় মুখর পৃথিবী। মহাত্মা কৃষ্ণের আসন সবার ওপরে- কেননা সবাই জানে অর্জুনসারথি তিনি! কিন্তু অর্জুন কি জানেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কার কাঁধে ছিল অপ্রতিরোধ্য সেই রথভার? চেঙ্গিস খানের তলোয়ারের বিদ্যুতেই সম্মোহিত সবাই, কে রাখে তার বাহকের অবিনাশী অগ্নিভুক কেশরের খোঁজ?

আমাদের শৈশব মানে জব্বারের বলী খেলা। লালদিঘির পূর্বকোণেই আবদ্ধ থাকত বলীদের সব লম্ফঝম্প- যদিও তারা শিশ্নের বল্লম হাতে শিশু কিংবা নারীদের দিকে ধেয়ে এসেছে এমনটা কখনোই শোনা যায়নি। ধরিত্রীজুড়েই এখন শিশ্নসর্বস্ব বলীদের দাপাদাপি। স্যুট-টাই পরা। কিন্তু পকেটে পারমাণবিক বোমা।

চারপাশে যারা হরেকরকম পসরা সাজিয়ে বসেছে তারাও হস্তপদহীন। পুরুষাঙ্গে ভর দিয়ে হাঁটে। তালপাতার সেপাই আর টমটমকে হটিয়ে প্রস্তুত এটমসজ্জিত শত সহস্র র‌্যাম্বো সেপাই। চনামনার ঠ্যাং নয়- মেলাজুড়ে সাজানো আছে দগ্ধ শিশু আর ধর্ষিত নারীদের হিমায়িত ঠ্যাং।

আমার ঘোড়াটি বড়ই অস্থির। কী যেন বলতে চায়। কিন্তু হেভি মেটালের শব্দে সব ঢাকা পড়ে যায়। ম্যাডোনা নাচছেন।

 

রেজাউদ্দিন স্টালিন

চোখের বাড়ি

 

তাহার সাথে প্রথম দেখা নীল সাগরে,

কাহার সাথে তাহার দেখা দ্বিপ্রহরে?

মনের কথা মানতে গিয়ে ঢেউ হয়ে যাই,

মুঠোফোনের শব্দ ভাসে ফেরার বেলায়।

ফেরা কি আর হয় কখনো চোখের বাড়ি,

স্টেশনে থমকে থাকে রেলের গাড়ি।

গাছ-গাছালির পাতায় লেখা পরিচিতি,

তাহার কি নাম হতেও পারে আফ্রোদিতি।

কিংবা কোনো মফস্বলের সুরঞ্জনা,

চিবুকে তার দীর্ঘ দূরের প্রভঞ্জনা।

তাহার সাথে কাহার ছবি নীল সাগরে,

জলমহালের প্রতিধ্বনি মন-জাগোরে।

মন কি জাগে পাবার আগে প্রেমের কড়ি,

হৃদয় ভাঙা ইট পাথরের ছড়াছড়ি?

উপেক্ষা আর চোরাবালির প্রবঞ্চনা,

চলার পথে লোক পাওয়া যায় হাতে গোনা।

কৃষ্ণ থাকে চোখের ফাঁকে ভূসংসারে,

তাহার সাথে কাহার দেখা নীল সাগরে।

 

সৌরভ জাহাঙ্গীর

নিভৃতে রাজকন্যা এক

 

ঘরের ভেতর বসে যে খেলে আগুনের খেলা

তার সাথে হয়নি দেখা আজও। সর্বক্ষণ নীরবেই

জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দগ্ধ করে আমাকে।

 

এই যে অহোরাত্র আগুন-খেলায় মত্ত সে

অথচ তাকে আজও হয়নি জানা

কে সে? সে কি কোনো এক মানবী?

তবে কেন আজও দেয়নি ধরা। গোপনেই কি তবে

আগুন-উত্তাপে পোড়াবে আমাকে।

 

মাঝে-মধ্যে লেলিহান উত্তাপে  অস্থির আমি

ভাঙি দরজা-কপাট। সহসা সে যেনো মিশে যায়

লজ্জাবতীর মতো ঘরের ভেতর।

 

খুঁজেও পাইনি তাকে- খুঁজে খুঁজে উপায়ান্তর না পেয়ে

অবশেষে অস্থির অগ্নিতে পোড়াই নিজেকে এবং

অনুভবে ছেড়ে দিয়ে জলকলে ভিজাই শরীর।

 

খালেদ হোসাইন

ঘুম ভাঙলেই নরকবাস

 

ঘুম ভাঙলেই নরকবাস

দীর্ঘদিনের বদভ্যাস।

 

দগ্ধ করে আগুনে

কত প্রহর না গুনে।

 

পুড়তে পুড়তে ভস্ম হই

কাল কাটে না অবশ্যই।

 

কাল কাটে না তাল কাটে

সেই আগুনের হল্কাতে।

 

আগুন-বিষের যন্ত্রণায়

সর্ব শরীর টনটনায়।

 

চোখ কী দেখে? অন্ধকার!

সোরা বারুদ গন্ধক আর।

 

কান কি শোনে? আর্তনাদ!

একটু বাঁচার প্রার্থনা।

 

নাক কি শোঁকে? লাশের ঘ্রাণ

সমস্ত সন্ত্রাসের দান।

 

ত্বক কী-রকম শান্তি পায়?

শিরেসংক্রান্তি প্রায়।

 

জিভ কি পাচ্ছে জগৎ-স্বাদ?

জিভ ছিঁড়ে যায় অকস্মাৎ-

 

অগ্নিগর্ভে রক্তপাত

তাই পরস্পর হোক তফাৎ।

 

তবু যখন সন্ধ্যা হয়

চোখে কিছু তন্দ্রা হয়।

 

ঘুম ভাঙলেই নরকবাস

চোখ দুটি তাই চড়কগাছ!

 

সুহিতা সুলতানা

না দেখা অরণ্য

 

সেই কবে থেকে আমি তোমাকে ভাবছি বলো দেখি? তোমার মন ভার থাকলে

গুমোট হতে থাকে চারপাশ। সবুজ দিগন্তের ভেতরে একটি বিষণ্ন দুপুর ও নদী

প্রিয় শৈশবের কাছে নিয়ে যায়! এক বৃষ্টির বিকেলে বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের গল্প

শোনাতে তুমি যেদিন আমাদের উঠোনে এসে দাঁড়ালে সেদিনও চারপাশে এরকম

শব্দহীন কান্না ছিল! আমরা দু’ধর্মের দু’জন কখনো মুখোমুখি হতে পারিনি! এক

উড়ন্ত জাল বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে আমাদের চিরচেনা পথ! সেই থেকে অচেনা

দিগন্তের দিকে মুখ সরিয়ে বসে আছো তুমি! চৈত্রের এই দিনে একান্ত আমার বলতে

দ্বিখ-িত চাঁদ, স্মৃতির শহর, না দেখা অরণ্য! উপেক্ষার জলরাশি ভিজিয়ে দিয়েছে

দু’পা! অন্তর বাজিয়ে তুমি যখন অনুপ্রাণিত করো তখন চৌদিক সমুদ্রদর্শনের মতো

অনুরাগ হেলে পড়ে! সারাদিন বরফঘরে বসে স্মৃতির বাক্স খুলে কী দ্যাখো তুমি?

কৌতূহলবশত কখনো কখনো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মেঘ ছুঁয়ে দেখি ঠিক যেন

বরফের চাঁই হয়ে কাফকার জামা হাতে তুমি টাইম লাইনে অবনত হয়ে গভীর

পর্যবেক্ষণে মেতে ওঠো! প্রতিদিন ডোরাকাটা ভোরে সুপ্রভাত জানাতে এসে

ইনবক্সে রবিঠাকুরের গানের সাথে তুমিও কেশর দুলিয়ে বিরাম চিহ্ন এঁকে দাও

এইখানে বসে থাকো আমি বিষয়ক জাগতিক তাবৎ জল ও আলোর সংসারে

 

কাজী জহিরুল ইসলাম

তুই

 

বাতাস নাকি তুই?

তোকেই আমি ছুঁই।

ছুঁয়ে দিতেই জল!

জলের নিচে ভাসছে নদী

কেমন করে তোর কাছে যাই, বল?

 

রৌদ্র নাকি তুই?

কোলের ওপর শুই?

উষ্ণ চুমু গালে।

হঠাৎ কেনো মিষ্টি রোদের

স্পর্শ হারায় মেঘের অন্তরালে?

 

তুই কি স্রোতস্বিনী?

তোকেই আমি চিনি।

ভাসিয়ে নিবি? নে না।

তোর বুকে যে নুনের ঘ্রাণ

সে-তো আমার চেনা।

 

অরণ্য কী তুই?

বৃষ্টি হয়ে তোকেই আমি ধুই।

শুদ্ধ করি জলে।

তুই ছাড়া কে আছে আমার

আকাশ-ছাদের তলে?

 

শতাব্দী জাহিদ

ত্রয়ী : ৫

 

ঘুমের সকালে ফেরি করো তুমি চুল শুকানো রোদ

খড় পাতানো হলুদ মাঠে দোয়েল-শালিক ছায়া টোকাতে মশগুল।

 

একঘেয়ে শহর তুমি আধুনিক কলা ছলে খাঁচার দিনলিপি

রাত বেঁচে থাকে ল্যামপোস্টের ক্যানভাসে, তারাদের অভিমান কে রাখে খোঁজ।

 

ফিরে আসবে না বলে তুমি লিখলে না ফেরার অপেক্ষার গান

দূরের দেশে আমার মতো কেউ কি তাকিয়ে বেমালুম নিবেদন প্রাণ।

 

ভাগ্যধন বড়ুয়া

নিয়তির তরি

 

নদীঘেরা পলিচরে বসতি আমার ;

কুহু স্বরে পার হই জলের শরীর।

নৌকা ভাসে, শব্দ হাসে, দাঁড়ের সোদর

ভালো লাগে জল, চর, মিহিবালি সুখ…

 

বর্ষায় বাড়ন্ত দেহ, নুড়িতে আবেগ ঢেলে প্রসব বেদনা

উড়িয়ে-গড়িয়ে এলো পাড়ের সীমায়

পরিমিত নীতি নিয়ে সমরূপে গতি

বেড়াজালে ভিড়ে আমি নিয়তির তরি…

 

আমারও ঝিমুনি হয় সন্ধ্যার পাঠে

আমারও ঝাঁকুনি হয় বোধের উঠোনে

বুঝে নিতে কিছুক্ষণ অনায়াসে কাটে

ততোক্ষণ মনোতলে তরঙ্গফেনা…

 

মনে হয় নিয়মের ঘেরাটোপে দিন-রাত

মনে ভাসা কথামালা অবিরাম জায়মান

কানে কেউ বলে যায়;

অধিক সবুজ মন জেগে ওঠা চরে…

 

মুস্তাফিজ শফি

কুয়াশা কিংবা কুহক

 

একদিকে তোমার সঙ্গে ডুবসাঁতারের গল্প

অন্যদিকে কুয়াশানগর,

মাঝখানে নির্জন পথের ছায়া, ঝরা বকুলের গান।

 

ভয়াবহ কোনো দুঃস্বপ্নের রাতে হঠাৎ জেগে উঠলে

ডানা ঝাপটানো অজানা পাখিদের মতো

তুমিও দাঁড়াও এসে ফ্রেমবন্দি দূরের জানালায়।

বিভ্রমরেখা ধরে হাঁটতে হাঁটতে

আমিও পৌঁছে চাই স্পর্শের কাছে, মায়ার কাছে,

মায়াহরিনীর গোপন আর্তনাদের কাছে-

রাতের অন্ধকার শেষে অজানা পাখির ডানায়

একে দিতে চাই রৌদ্রের ঝিলিক।

 

আবার হাতের মুঠো থেকে লাল নীল মার্বেলগুলো

খসে গেলে সম্বল শুধু জমাখরচের খাতা।

সবই কি কুয়াশা, কিংবা কুহক-

তখন আমি কিছুই মনে করতে পারি না,

কিছুই মনে করার থাকে না আমার ॥

 

মুজিব ইরম

কসম

 

লক্টন জবার ডাল সেই কবে দিয়েছিলে তুমি

দিয়েছিলে রাধাচূড়া

তুলসির চারা…

 

আমার বাগানে

মাধ্যমিক মনে

তারা সব ফুটেছিল খুব…

 

রোজ ভোরে মা আমার

ওজিফা পড়ার শেষে জল ছিটাতেন

জবাগাছে

তুলসিচারায়

রাধাচূড়াতলে…

 

তুলসির রসে

মায়ের ছোঁয়ায়

একদা আমার জ্বর কমে গিয়েছিল…

 

ইশ্বর জানেন

তুমি তো আমার জানের টুকরা ছিলে

পড়শিনী ছিলে, আজও আছো, খোদার কসম…

 

 

মাসুদ পথিক

কাঁটাতার ৩

 

হ্যাঁ-রে তারাপদ, তোর কি মনে পড়ে? যে-দিন অসমাপিকা ক্রিয়ায়

ভরে গিয়েছিল উত্তরপাড়া

আর খুব সন্ধ্যায়, গাবের ডালে গলায় সবিতার ফাঁস, গাঁ থমথম!

 

সবিতার মায়ের সেকি আকাশপাতাল কান্না…

 

নেশাখোর বাপটা ভাবলেশহীন ম্যাড়মেড়ে চোখ, যেন কিছুই হয়নি

তারপর আমাদের সুজনকে অনেকদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি

 

আমি ছিলাম অব্যয়ের ঘরে, বাক্যের শেষ মাথায়,

যেখানে গ্রামটা সীমান্তের কাছে বাঁক নিয়েছে, কাঁটাতার

ওপারে ভারতের খোয়াই;

আমি যাইনি কখনো, তবে শ্রী পলা মজুমদার চলে যাবার পর

স্কুল পালিয়ে বসে থাকতাম খোয়াই বরাবর এই কাঁটাতার ঘেঁষে

ব্যাকরণ বই ছিঁড়ে বানাতাম পাখি, তবে হ্যাঁ আমি কোনো পাখিই

 

আর উড়ে গিয়েছি বারবার সমাপিকা ক্রিয়ার উঠানে, চুপি

পলা’কে দেখবো বলে

বিদিশার সুর মেখে ছুড়েছি ব্যর্থতার  গান, শ্রাবস্তীর নৈতিকতা আজও বাতাসে,

আর যদিও অনেক

স্মৃতিসুর বাতাস নিয়ে চলে গেছে সবিতার কাছে

 

এখন তো চোলাই মদের পর প্রান্তরের হারিকিরি জুড়ে

কিছু শব্দের বাকি বাড়ি ফেরার

আমি সমাসে তাই আমার ও পলার স¤পর্কের মধ্যে

সবিতাকে হাইফেনের মতো বুনে যাই

 

হ্যাঁ-রে তারাপদ বল, জীবন কী ফিরে আসবে এ-গাঁয়ে আর? ওই ধানখেত গড়িয়ে!

অনুভবের দুই প্রান্তে, আমি কিন্তু এখনো কাঁটাতার জড়িয়ে বসে আছি

 

ঝরুক না এতটুকু রক্ত, ঘাসের  মতো, বুকে শিশির নিয়ে

আমি তো পলার ছেড়ে যাওয়া পায়ের ছাপের অনুরক্ত,

যদিও অনেক প্রিয়জনের রক্ত

মাটি থেকে ধুয়ে দিতে পারেনি; না-কোনো জল না-কোনো পানি

আয় তারাপদ বন্ধু আমার, আবার গলা জড়িয়ে কাঁদি

আরো একটা ঝড়ো কান্না খুব দরকার, খুব। আয় বন্ধু।

 

একাকার হয়ে যাক-না এই চারটি চোখের জল ও পানি

 

শামীম হোসেন

পৃথিবীকে ঘাড়ে নিয়ে

পেটমোটা পৃথিবীকে বস্তায় ভরে

ঘাড়ে নিয়ে পার হচ্ছি বন, চুলবিছানো পথ…

দূর কোনো করবীগাছের তলে

পুঁতে আসবো পৃথিবীর প্রাণ।

 

টিকটিকির ডিমগুলো অপেক্ষায় আছে

আর ভেন্টিলেটরে জমেছে ঝুল-

মাকড়সার চোখে একটা সর্ষে লুকিয়ে

ভূত তাড়ানোর মন্ত্র পড়ছি।

 

এই যে বহু বহু পথ- চূর্ণ হয়ে ঢুকে গেছে

আধখানা আয়নার ভেতর; আর

মাথার মাঝ বরাবর একটা নুড়ির আঙুল

বের করে আনছে মগজ…

 

জাদুবাক্সের ডালা থেকে খসে পড়ছে-

বুড়ির নড়বড়ে দাঁত

আর করবীগাছের তল খোঁজ করছে

দম ফুরানো পৃথিবীর চোখ…

 

রাসেল রায়হান

অন্বেষণ

 

যখন পৃথিবীর একমাত্র ঋতু শীত,  একটি বিশেষ ডালিম গাছ তার অর্চনা করে।

ওখানে দাঁড়াও।  ডালিম গাছের ফাঁকে পলাতক টিয়েটিকে  খুঁজে বের করো…  ঐ অবয়ব তোমারই।

তুমি; যার একটি পাথরের চোখ  মণির ভারে নেমে আছে নিচের দিকে; জীবন্ত চোখটি উপরে তাকিয়ে,  জোড়াটিকে খুঁজছে।

এভাবে একজন মানুষ খোঁজে অপর মানুষকে।

 

তুষার কবির

জঙ্গলে বেড়াতে এলে

 

জঙ্গলে বেড়াতে এলে আমি যেনবা তোমার শরীরেই

নিঃশব্দে ভ্রমণ করি!

 

জঙ্গলের বুকঝিম্ পথে হেঁটে গিয়ে

আমি খুঁজে পাই দূরের ছড়ানো ভাঁটফুল

পাতাঝরা আমলকীবন-

কোথাও যেনবা ভেসে আসে তিতিরের ডাক

ঝোপ থেকে উঠে আসে ময়ূরীর মনোলগ

আর জলডাহুকীর গান-

 

জঙ্গলে বেড়াতে এসে তোমার শরীর জুড়ে লেখা হতে থাকে

আরণ্যিক নোটবুক!

 

জঙ্গলের কিছুটা দূরে তাঁবুর ভেতর থেকে

উঠে আসে হাল্কা পালক, শালপাতা, ঘুমহরিণীর চোখ-

আরো দূরে কালো জিপ, পোড়া ডিজেলের ঘ্রাণ,

ছায়া ও ছাতিমতলায় ডুবে যায়

হাওয়া হ্রেষার গান-

 

জঙ্গলে বেড়ানো মানে তোমার শরীরের অরণ্যের ভেতর

নিঃশব্দে হেঁটে যাওয়া!

 

নওশাদ জামিল

নীল শাড়ি

 

যেখান থেকে যাত্রা শুরু করি

আবার আমি সেখানে আসি ফিরে

অনেক পথ পেরিয়ে এসে দেখি

ফেরার পথে কুহক আছে ঘিরে।

 

পাহাড় নদী পেরিয়ে মেঠোপথ

এসেছি ফিরে হৃদয় আহ্লাদে

অন্ধ ফুলে পরাগ ঢেলে দিয়ে

আবেগ ছাড়া কে আর পড়ে ফাঁদে?

 

পথের বাঁকে বাতাস ছেঁড়া মেঘ

উড়ল বুঝি আগুন হাতছানি

ধোঁয়ার রেখা মাড়িয়ে বহুদূর

পেলাম দেখা পরম ঝলকানি।

 

হৃদয় টানে আবার আসি ফিরে

ফেরার পথে কুহক ছড়াছড়ি

কুয়াশাজাল ছিন্ন করে দেখি

পথের বাঁকে উড়ছে নীল শাড়ি।

 

মিছিল খন্দকার

ট্রেনের হুইসেল

 

ক্রমে দূরে সরে যাওয়া

ট্রেনের হুইসেল শুনলে

কেন যে অস্থির লাগে!

মনে হয়, টিকিট কেটেও আমি

বসে আছি ঘরে।

যার সাথে কোনোদিন দেখা হয়নি,

চিনিই না যাকে-

যেন তাকেই দিয়েছি কথা,

আসবো তার সাথে দেখা করে।

 

মিলু শামস

দীর্ঘ কবিতা

 

আংটি ও এক কিশোরীর গল্প-২

 

ভূর্জপত্রের ঢাল বেয়ে নেমে আসা

বর্ণের ধারায়

মথুরায় ভেজেন

বড়ুচ-ী দাস।

শান্ত হলে বখতিয়ারের উদ্ধত ঘোড়া

বাংলা ও বাঙালি চিনে  নেয়

আত্মপরিচয়;

ইবনে বতুতা সাক্ষী

সাক্ষী মা-হুয়ান, বারবোসা-

অখ- বাংলার অধিপতি শামসুদ্দীন ‘শাহ-ই-বাঙ্গালিয়া’

বৈদগ্ধ্য তাঁর খুঁজে পায়

শাসনের মূলসূর-

ভাষা ও মাটির নেই জাতপাত;

যবন ব্রাহ্মণ কবি এক পঙ্ক্তিতে রাজসভায়

কাব্য লেখেন বাংলায়,

ফারসি সংস্কৃত যমজ দু’বোন

পাশাপাশি দু’ধারায়।

 

সুফীদের গান কচি ধানখেতে

ঢেউ তুলে

মানচিত্র ছোঁয় গোটা বাংলার;

নদীয়ায় নাচে শ্রীধর, শুক্লাম্বর

দুঃখীদাসী, যবন হরিদাস

সুর ওঠে তার

চট্টলা থেকে ওড়িশা

বিহার থেকে কোচবিহার।

 

চণ্ডীদাস বুঝেছিলেন বাঙালির মন,

বৃন্দাবন ছেড়ে যশোদা-নন্দন

চলে গেলে মথুরায়-

শরবিদ্ধ চন্দ্রাবলী

বিরহে জর্জর;

সেই শোকে ভারি হয় বাংলার বাতাস

মেঠোপথে কেঁদে ওঠে

খঞ্জনীর ছিন্ন স্বর।

 

আলোর চাদরে বোনা ইতিহাসে-মিথে

জড়িয়ে মেধা ও মনন

কিশোরী টপকায়

সময়ের চৌকাঠ; একেকটি ক্ষণ।

 

॥ দুই ॥

মার ভারি প্রিয় পরান বোষ্টম

গীতা বোষ্টমীর ‘বিরহভঞ্জন’;

কাটা হয়ে গেলে হেমন্তে ধান

উঠোন জোড়া সোনালি ফসল।

তারই এক কোণে

জারুলের তলে খঞ্জনি বাজে

যুগল স্বরে

কপালে তিলক চন্দন;

প্রসন্ন মনে ভিক্ষার ঝুলি

ভরে দেন মা নিজ হাতে

নবান্নের চালে।

এবারও হয়নি ব্যতিক্রম-

শুধু কি জানি কী ঘটে

কিশোরীর মনে

বাজে মোহন বাঁশির সুর

আংটি স্পর্শ করে যমুনার কূল।

 

॥ তিন ॥

বাতাসই বার্তাবাহক-

লুই, ভুষুকি, কাহ্নপার পদধূলি মাখা

বাংলার মেয়ের;

পূর্ণিমার ভরা চাঁদ প্রেমপত্র তার

মেঘ যেমন দূত ছিল

কালিদাসের।

 

জ্যোৎস্নায় এঁকে ছায়াচিত্র-

কোনার্কের মন্দির কিংবা

ইলোরার দেয়ালের গা;

আধখোলা বই হাতে

কোজাগরি এই রাতে-

আরও দুটি নিমগ্ন চোখ

পাঠ করছে চাঁদ হয়ত

ঠিক এই ক্ষণে;

কিশোরী ভাবে-

চাঁদে রেখে চোখ

সেই ভরসায় পত্র লেখে সে

সন্ধ্যা ভাষায়।

 

দূর থেকে দেখে দাদা-

জীবনের পৃষ্ঠাগুলো বোনের

প্রসন্ন প্রলম্বিত ধীরলয়ে

জাদুকরী এক আংটির স্পর্শে।

বর্ষার বিবর্ণ দিন কিংবা

ছায়ামাখা সন্ধ্যায়

বাবার পড়ার ঘরে

গুটিসুটি আরাম কেদারায়-

শরৎ-বঙ্কিম অথবা

এ্যামিলি, এ্যান, শার্লট ব্রন্টির

অনুবাদে চোখ রেখে

হারিয়ে যায় সে

সাদাকালো অক্ষরের গহিনে।

 

প্রকৃতির কোলে হাওয়ার্থ গ্রাম, ইংল্যান্ডের

ইয়র্কশায়ার মুরসে-

শার্লট, এ্যামিলি- দু’বোন

সমবয়সি ওর প্রায়

লিখেছে বিখ্যাত দুই বই

ইংরেজি ভাষার।

পিছু ফেলে সেই বয়স-

আলপথে ঘাসফুল কৈশোর

পুকুরের ধার,

শ্রাবণের ভেলায় নুয়ে পড়া ধনচের

আহ্লাদি ডগা

দু’হাতে সরিয়ে অনাবিল ভেসে চলা;

হালটের পাড়ে ফুলে ফুলে ছাওয়া

গোলাপি হিজলতলা-

সব কিছু ছেড়ে

ও যাবে চলে

কিছুই নেই বলার।

 

গৃহকর্মে অপটুভীষণ

মোটেই নয় গিন্নী-বান্নী ধাঁচ

খেলেনি পুতুল কোনোদিন-

শৈশবে পাতেনি

পুতুলের সংসার।

প্রকৃতিই ছিল খেলাঘর, আর

ভাইয়ের মননের ভাঁড়ারে আশ্রয়।

শেখা হয়নি তাই বুঝি

সংসারের জটিল নিয়মনীতি, কৌশলী হিসাব নিকাশ

রয়ে যায় আজন্ম কিশোরী

প্রকৃতি  কন্যা এক।

 

॥ চার ॥

কার্পাস ফাটা শরৎ-আকাশে

আশ্বিন উঁকি দেয় অবশেষে

শারদ দেবীর আগমনী বাজে

সনাতন পাড়ায়; ছড়ায়

ঢাকের গুড় গুড়;

বাতাসে কুর্নিশ-কাশফুল নদী তীরে

একদিন পাল তোলা নৌকার আভাস-

সওয়ারি সফেদ পোশাক

মাথায় পাগড়ি, কোলাপুরি

জুতা পায়

সঙ্গীরা আলাদা নৌকায়।

 

পালকি প্রস্তুত আগে থেকে

তৈরি বেহারারাও

‘আল্লাহু আকবর’ বলে সমস্বরে

তুলে নেয় কাঁধে

ধীর পায়ে উঠে এলে

সফেদ অতিথি।

 

পেরিয়ে বটতলা মোড়

ইউনিয়ন বোর্ডের উঁচু রাস্তা ধরে

দেবদারু পাতায় সাজানো গেটে

পালকি এসে থামে।

অন্দরে পৌঁছায় বার্তা দ্রুত

বর এসেছে…এ…এ…

ছোটদের হুটোপাটি হুল্লোড়

ব্যস্ততা বাড়ে বড়দের;

রঙিন কাগজে বানানো চালতার ফুল

লাল সাদা বেগুনি হলুদ

আর চার কোনা মোটিফে

সাজিয়ে ঘরদোর, রাতজেগে;

তরুণেরা ছোটে এবার বরের পেছনে।

তাজা ফুল হাতে গানে গানে

বর-বরণ, গেট ধরা, রুমাল খেলা

এইসব ফাঁদে

নাকালের প্রয়াস;

বেচারা বর, আজ তার

কথা বলা নিষেধ

উঁচুস্বরে

সামলায় সহযাত্রী বন্ধুরা সব।

 

অভ্যাগত আপ্যায়ন শেষ

শেষ সব আচার নিয়ম,

মেয়েলি বিয়ের গীতে

কৌতুক ছাপিয়ে ওঠে

বিষাদের সুর।

 

এবার বিদায়ের পালা-

বাড়িজুড়ে থমথম

স্তিমিত উৎসবের আভা

‘ভালো থেকো মা, ভালো রেখো’

সম্মিলিত আশীর্বাদ

চোখের জলে-

কিশোরীও সিক্ত তাতে

অশত্থ পাতার মতো তির তির কাঁপে।

‘আলেক্সেইর কথা মনে আছে?’

কান্নার দেয়াল ভেঙ্গে দেয়

আজন্ম বন্ধু বড় ভাই-

ঋজু স্বর, বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে।

আলেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভের কথা শুনিয়ে ছিল সে

কোনো এক বিষণ্ন রাতে-

ভোল্গার তীরে জন্ম, নিজনী নোভগরদে;

বড় সাধ

শিখবে পড়ালেখা

সাহিত্যে দর্শনে।

নিজ শ্রমে ঘামে বেড়ে ওঠা

অভাবী শ্রমিক

উচ্চ শিক্ষার টানে

শেষমেশ পৌঁছায় কাজানে-

প্রিয় তলস্তয় যেখানে নিয়েছিলেন

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ।

কিন্তু হায়-

হলো না সেখানে পড়া

হাতে নেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা সনদ;

ফিরে আসে যুবক

ব্যর্থ মনোরথ,

হৃদয়ে ব্যথার ক্ষত

নিয়ে তারপর-

ভোল্গার তীরে

কোন এক শীত সন্ধ্যায়

ট্রিগার টিপে দেয়

রিভলবার ঠেকিয়ে বুকে।

সেখানেও প্রত্যাখ্যান-

ধরণী ফিরিয়ে আনে তাকে;

তারপর থেকে পাঠ শুরু

‘পৃথিবীর পাঠশালা’য়

জীবনের পথে ঘুরে

হয়ে যায়

জগদ্বিখ্যাত।

 

‘মনে আছে’-

ভাইয়ের প্রশ্নের জবাবে

ফিরে আসে কিশোরীর

নিজস্ব দৃঢ়তা-

‘আজ থেকে পৃথিবীই পাঠশালা আমার’।

‘হ্যাঁ, জীবনই সেরা শিক্ষক, জানবি-

পাঠ নিবি সেখান থেকে।

মানুষ ভাগ্যবান, কেননা

তার আছে মনুষ্য-জীবন ।

ব্যর্থ হলে তা

পার্থক্য থাকে না

চতুষ্পদী থেকে;

হোসনে গৃহপালিত প্রাণী।’

‘তাই হবে দাদা’-

ভেতরে বারুদে লাগে ঘা।

 

উঁচু শিক্ষালয়ে হলো না যাওয়া-

এই এক ডানা ভাঙা আশার

বিবরে দিয়ে পাথরচাপা

ভাই বোন ছিন্ন বৃন্ত

দু’পথে রাখে পা।

ভাই করাচিতে

উচ্চশিক্ষার পাঠ নিতে

বোন শ্বশুরালয়ে।

 

মিতুল দত্ত

ভূতেরা আমার কাছে আসে

 

অঙ্ক থেকে শুঁড় তুলে হাত-পা নাড়ছ। ছেলের বেদম ভয়, ত্রৈরাশিকে এসে আটকে গেছে। ওদের চরিত্র নেই, খানিকটা জেলির মতো, যত বলি তত সে আঁকড়ে ধরে। এদিকে মাছের স্বপ্ন ঘুমে আসে। আলো নেভে। দরজা বন্ধ হয়। শিরা-কাটা মেয়েরা অনেকটা খুলে দেখায় তোমাকে। রক্ত নয়, কালো সেফটিপিন। ব্লাউজ খোলার আগে পরে।

 

আলো ফুটে গেছে আর তুমিও বিছানা থেকে নেমে গেছ। শরীরে তবুও চাপ। অম্বলের মতো কিছু বুক থেকে উঠে এল। তাকে খেতে দিতে হবে। সে আমাকে ফিতে দিয়ে মেপে, ‘৪২’ লিখে রাখবে। বিকাশ রায়ের মতে জুতোসুদ্ধ লাথি মারবে পেটের ওপর।

 

শ্রেয়া চক্রবর্তী

এক্স

 

তুমি রেগে যেতে খুব এ কথায় ও কথায়

মুখখানা ভার করে চলে যেতে কেচশানের পথে-

ফোনে যেখানে বাক্যালাপ হতো সারা রাতভোর

আদরে নামতো জ্বর, রাগও, এভাবেই কোনমতে।

কিভাবে সাজবো আমি সেখানেও ভারি অভিমত!

 

ভালোবাসা তেমনি ছিল মেঘ রৌদ্র বৃষ্টিপাতে ভরা

জড়িয়ে ধরতো বুকে, রেখেছিলে নক্ষত্র দু’হাত ভর্তি কত

সে আলোয় সাজতে কত না আমাকে তুমি

লাগেনি সে স্পর্শ কিছুমাত্র অসঙ্গত!

নিয়েছিলে অলিগলি শহরের চৌরাস্তা ছুজুড়ে

কত না সময় গেছে এভাবেই দিন ভেঙে গড়ে।

 

সেদিন চলেই গেছে, সে রাতও হয়েছে কবে গত

তবুও রয়েছি আমি, তুমিও, নদীর কাছে নত।

 

স্নিগ্ধা বাউল

সেনসেটিভ জিহ্বা

 

ইদানীং আমি মুখ আর মাছের পার্থক্য করতে পারি না

মীনমুখ না মুখমীন যেন এবং আমি

খেয়ালে দেখি লকলকে ছিপ আমার;

সাদা নাইলনে পরিপক্ব শিকারির চোখে

বেঁধে নিয়েছি রূপসা স্যান্ডেলের বোঁটা; আমি

অবাক হই, আমিই টুকরো টুকরো করেছি লাল কেঁচো

দক্ষ প্রশাসকের মতো গেঁথে রেখেছি, যেন

আরও পটু আমি

এবং প্রতিদিন আমি ওত পেতে থাকি।

জেনে রাখিস- আমি

হিজলের তলায় বসি, চারটি সিঁড়ি ভেঙে

আছে, ডুবে গেছে

একটি, পা ডুবিয়ে রাখা অস্থির জলে।

জানতাম আমাকে অপেক্ষা করতে হবে

আর যারা করে আমার মতো শিকার,  মাছ

অথবা পায়ের চিহ্ন;

মানুষ শিকার করা যায়, আমি কিন্তু শিকারি।

প্রতিদিন আমি শিকার করি মুখ

প্রতিদিন আমি শিকার করি থুতু

প্রতিদিন আমি খাই মানুষের মুখ

প্রতিদিন আমি খাই আমার থুতু।

 

অতনু তিয়াস

রাত্রিযাপন ও একান্তবাদ

 

নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিলাম কিছু সপ্তর্ষিমণ্ডল

সামনে আপাত শিব ত্রিনয়ন, বিশ্বস্ত উন্মাদ।

 

কেউ যদি থেকে থাকো হিরণ্যকশিপু? চোখ টান টান করে দেখ-

পাষাণে উঠছে ফুটে নৃসিংহ অবতার

জলে ওত পেতে আছে ক্ষুধার্ত ব্যাধমৎস্যগণ

সময়ের প্রহ্লাদ হিরাধার কেশের সাঁকোতে রেখে পা

পার হচ্ছি থৈ থৈ অগ্নিগর্ভ নদী

ইন্দ্রপুর হয়ে যাব স্বরচিত বৈকুণ্ঠবিহারে।

 

এরপর কোনো এক সন্ধ্যায় কোনো এক আগন্তুক

তোমাদের জতুগৃহে শান্তিজল ছিটিয়ে দিলে

শয্যার পাশে যে সঙ্গিনী অঘোরে ঘুমিয়ে তার সিঁথির সিঁদুর থেকে প্রেম

চোখের কাজল থেকে মায়া সিঞ্চিত হয়ে

পূর্ণ হবে গার্হস্থ্যবিন্যাস

পৃথিবীর নদীসব সমুদ্রচারিণী জেনে

যেসব দুঃখবাদী মেঘ উড়ে গেছে নিরুদ্দেশ

তাদের থেকে দীক্ষা নিয়ে গ্রহণ করেছি এই নন্দিত সন্ন্যাস।

 

আলোকবর্ষী একাগ্র বৃক্ষের মতো মহাবিশ্বপথে সারি সারি মৌন সময়

দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করছে একান্ত অহম

মানুষের হাতিয়ার সময়কে ভেঙে ভেঙে গড়ে তুলছে সভ্যতা

গড়ে তুলছে আত্মনাশা, বরাহ-বামন।

 

কারো কারো প্রয়োজন রাত্রিযাপনে সুখকর-তেমন সঙ্গিনী

অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে কেউ দেখে-বিধ্বস্ত জরায়ুর রক্তক্ষরণ!

কেউ কাঁদে লাল দেখে পবিত্র জমজম

রাত্রিযাপনে যার কষ্টেরা যত তীব্রতর

বলিরেখায় তার ফুটে ওঠে প্রাকৃত জীবন

শরবিদ্ধ বুকে ফুটে ওঠে সহস্র রক্তগোলাপ।

 

যদি কেউ হতে চায় ধর্মহীন, ধর্মান্ধ কিংবা সভ্য-অন্ধ-আধুনিক জন

যদি ফুঁ মেরে উড়িয়ে দেয় হুদায়বিয়ার সন্ধি, কুরুক্ষেত্র ধর্মসংস্থাপন

তাদের বিপরীতে আমার এই একান্ত রাত্রিযাপন।

 

তারিক সালমন

পার্টিতে

 

সেজেছে দু’চোখ তার এমন করে

না পড়ে দৃষ্টি যাতে তার অধরে

রজনীগন্ধা মেশে রাতের হাওয়ায়

ঘুরেফিরে শেষতক তার কাছে যায়

 

চুলের ভেতরে মেঘ অমন বলে

পড়ে না নজর তার বাহুর ডৌলে

ধারালো ছুরিকা ওই উতল শরীর

নদী ঢেকে দিলো যেন নদীটির তীর

 

সেজেছে আঙুলগুলো এমন করে

না যায় দৃষ্টি যাতে বুকের পরে

তার চারপাশে আছে সুবাস এমন

তাকেই ভেবেছি এই রাত্রির বোন

 

কুসুমনিচয় নিয়ে রেখেছি হাতে

খুন হয়ে যেতে আজ তার আঘাতে

এখানে দাঁড়িয়ে আমি পৃথিবীর লোক

তারাগুলো সরে চাঁদ নিরিবিলি হোক

 

তায়েব মিল্লাত হোসেন

ব্যক্তিগত বুড়িগঙ্গা

 

বুড়িগঙ্গা―এই শহরের সমান বয়সি নদী

ঢাকাই বালকের অবাধ্যতায় ভরা বয়াঃসন্ধির নদী

একাল-সেকালের ইতিহাসের তোড়াবন্দি

নিয়ত জলরাশির এক অমোঘ কিংবদন্তি এ নদী।

 

সেন-সুলতান-মুগলের কীর্তি আর অকীর্তির

অথৈ কাহিনির চলচ্চিত্রময় দারুণ প্রবাহ নিয়ে নদীটির নাম।

 

বর্গী আসে, ফিরিঙ্গি আসে,

ইংরেজ আসে―ডাকুর নাও,

সন্তের জাহাজ, কবির গয়না,

মাঝির ডিঙা―জীবনের ষোলআনা

আমাদের ব্যক্তিগত এই গঙ্গা।

 

অরবিন্দ চক্রবর্তী

আয়ত

 

গোলের কিনারে যা থাকে, দাঁড়ানোর মতো, বলা হয় পরিসর। এখান থেকে ফেলা যায় জাল, রাক্ষস-খনি উঠে আসে না কেন? মাছিকন্যা, তোমার জন্মের দায় তুমি নিয়ে নাও। ধরা যাক, পাখা খুলে দেওয়ার পর তোমার গতি মচকে গেল। এবার বিন্দুদল এসে ফুল ফুল ফুটল না, স্রোতস্বরে ফেটে গেল। আকাশ মাখল ঝোল। নভোম-ল ভাবছিল তখন ভাঙা চাকা নিয়ে ভ্রমণ না হলেও আখ্যানখণ্ডের তালুপত্রে বিছানো যায় ঘামের ফসিল-যেখানে একজন তন্ত্রী বাতাস নিয়ন্ত্রণ করে আর পতাকা রোপণ করে রেহেলপাঠের প্রজাপতি।

 

নাহিদ ধ্রুব

সুখ-দুঃখের মাঝখানে

বুবু তো মইরা গেছে আমার জন্মের আগে

তার লাগিয়া মনে মনে কী যে বাসনা জাগে

 

তার মুখ ভাবতে গেলেই ঝাপ্সা লাগে চোখ

অনেক ঝড়ের মধ্যে যেন আদরমাখা রোদ

 

সেই রোদে আম্মা যখন বইসা থাকে একা

বুবু তুমি গাছের পাতা, দিতেছ কী ছায়া?

 

পুকুরপাড়ে আমি যখন একা একা হাঁটি,

হাওয়ায় কেন ডুব দেয় অচিন জোনাকি?

 

তারে দেইখা ইচ্ছা করে ডুব দেই এ জলে

এইখানেতে, বুবু আমার একা বসত করে

 

ভাবি তারে সঙ্গ দিবো, বলবো ঘরের কথা

সুখ-দুঃখের মাঝখানে কান্দে আমার মা!

 

ফারজানা আক্তার রীতু

নারী

 

তুমি যখন সবকিছু মেনে নাও,

আমার জন্য বিসর্জন দাও-

মনপ্রাণ আর পেলব দেহ

তুমি যে কতটা ভালো তখন!

তুমি অনন্যা, তুমি সম্পূর্ণা,

তুমি লক্ষ্মী সরস্বতী

আমি জানি…

 

পুরুষ! সে তো উদ্ভ্রান্ত উন্মন

এ আচার একটু ছাড়ের মুখাপেক্ষী

মেনে নাও।

যদি না পারো তবে এ তোমার কেমন ভালোবাসা!

তাহলে তুমি নষ্টা, তুমি বেশ্যা

তুমি কলঙ্কিনী কুৎসিত

ভালোবাসার অভিনয়ে তুমি দক্ষ!

আমি জানি…

 

তোমার বিবর্জিত দেহভস্ম

কত পুরুষ তোমাতে নিঃস্ব

হে নারী, আমি জানি।

 

 

 

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *