সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

নিরুদ্দেশ : হাবিবুল্লাহ ফাহাদ

November 23rd, 2018 7:20 pm
নিরুদ্দেশ  :  হাবিবুল্লাহ ফাহাদ

গল্প

নিরুদ্দেশ

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ

সাবের দাবা খেলায় ভালো ছিল। ওর সঙ্গে সহজে কেউ পেরে উঠত না। খেলতে বসলে ও একেবারেই কথা বলতে চাইত না। কিছু জানতে চাইলেও হু-হ্যাঁ ছাড়া জবাব মিলত না। এতটা নিবিষ্ট দাবা খেলার মধ্যে কী সুখÑ আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি।

একদিনের ঘটনা। আমি আর সাবের ক্লাস শেষে মেসে ফিরেছি। কাঁটাবন ঢাল থেকে হাতের বাঁয়ে। দুটো বিল্ডিং পরেই লাল ইটের বাড়িটার দোতলায় থাকতাম মেস করে। আমি আর সাবের একঘরে। দুজনই ভার্সিটিতে পার্টটাইম লেকচারার। পাশের ঘরে ইউনিভার্সিটির থার্ড ইয়ারে পড়–য়া কিছু ছেলেপেলে থাকত। আমাদের অবসরের বিনোদন বলতে ছিল দাবা। কিস্তি, হস্তি, মন্ত্রী। আর রাজা।

সেদিন ঘরে ফিরে দুজনে বসে পড়লাম। দাবার কোর্ট নিয়ে। সাদা গুটিগুলো বরাবরই আমার দখলে থাকত। কালোগুলো সাবেরের। কিন্তু তারপরও সাবেরই জয়ী হতো বেশির ভাগ সময়। খেলায় দু-দান দিয়েছি কি দিইনি, অমনি দরজা খুলে ঘরে ঢুকল মিহির। আমাদেরই বন্ধু। কবি। ভালো লিখত। কোনো বই না বেরুলেও, কবি নামটা পাকাপোক্ত করে নিয়েছিল ততদিনে। তবে কারও কারও চোখে সে ছিল ভবঘুরে। কেউ কেউ, রহস্য করে বলত, নব্য যাযাবর।

জীবনের প্রতি সত্যিই বড় উদাসীন ছিল মিহির কান্তি। জীবনের প্রতি বিন্দুমাত্র মায়া ছিল না ওর। জীবনটাকে কী অদ্ভুতভাবে অপচয় করেছে ছেলেটা! তিলে তিলে ক্ষয় হয়ে যাওয়া বলতে যা বোঝায়, তাই। লিকলিকে শরীর। লম্বা চেহারাটা ভেঙেচুড়ে গালগুলো ভেতরে ঢুকে গেছে। দাড়ি-গোঁফের যত্ন নেই। তামাটে বর্ণে আড়াল হয়েছে গায়ের উজ্জ্বলতা। বিবর্ণ হয়েছে চুল। পোশাকের দিকেও মিহিরের বিন্দুমাত্র খেয়াল ছিল না। কী পরছে, কী খাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে- এসবে মন ছিল না মোটেই। অথচ ভার্সিটিতে পড়ার শুরুর দিকেও কতটা গোছালো ছিল ছেলেটা। দ্বিতীয়বর্ষ শেষ করে তৃতীয়তে পা দিয়েই কেমন বদলে গেল। কবিতার নিমগ্ন পাঠক ছিল মিহির। রাত জেগে কবিতা পড়তে গিয়ে পরদিন ক্লাস কামাই দিত। কতদিন হয়েছে এমন!

জীবনানন্দে বুঁদ হয়েছিল ভার্সিটির প্রথম জীবনে। যখন প্রেমে পড়ার বয়স, তখন। একদিন বললাম, প্রথম বর্ষে প্রেম না জুটলে আর জুটবে কবে? প্রেম না করলে ভার্সিটির মজা কীসে ইয়ার? এসব কবিতা-টবিতা করে কী হবে তখন? ও হাসত।

মিহির বলল, আমি প্রেমে পড়িনি, তোদের কে বলল?

আমরা তখন আকাশ থেকে পড়ার মতো বললাম, কবে? কোথায়? কাকে?

ও হাসিটা ম্লান হতে দিত না। উদাস গলায় বলত, জানবি। সব জানবি। কদিন যাক না।

কদিন পর আমরা জেনেছিলাম। ওর প্রেমের কথা। ও-ই বলেছিল, ‘ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ, ক্লান্ত শেষপ্রহরের শশী! অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে কালো নদী, ঢেউয়ের কলসী…’। যৌবনের ঊষায় জীবনানন্দ দাশ নামের কুয়াশার আড়ালে ঢাকা পড়েছিল সব শখ, আহ্লাদ। বন্ধুরা আজও বলে, গভীর অনুযোগে, জীবনানন্দ মিহিরের জীবনের আনন্দটুকুই কেড়ে নিয়েছিল তখন!

হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার একটা কঠিন রোগ ছিল মিহিরের। এই আছে। এই নেই। মাঝে মাঝে ওর নিরুদ্দেশ যাত্রা শীতের রাতের মতো এতটাই দীর্ঘ ছিল যে, মনে হতো আর হয়তো ফিরবে না মিহির। মিহিরই মাঝে মাঝে বলত, যদি হারিয়ে যাই কখনও, ধরে নিস, মিলিয়ে গেছি দিগন্তরেখায়। মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হতো, বহুদূরে, যেখানে আকাশ নেমে গেছে মাটিতে, মিহির তার কবিতার খেরোখাতার মতো মিলিয়ে গেছে। যেমনটা এবার হয়েছে। টানা ছ’মাস নিখোঁজ থাকার পর হঠাৎ ব্লু মুনের মতো উদয় হওয়া। ঘরে ঢুকেই, হাতে থাকা কবিতার খেরোখাতাটা দাবার কোঁটে ছুঁড়ে দিয়ে সব লণ্ডভণ্ড করে দিলো।

আমি বললাম, দিলি তো খেলাটা ভণ্ডুল করে?

মিহির তখন শরীরের অসংখ্য জোড়াতালি দেওয়া পাঞ্জাবির মতো দেখতে কোরতাটা খুলতে খুলতে বলল, খুব গরম পড়েছে ইদানীং। গায়ে কিছুই রাখা যাচ্ছে না। এই গরমে তোরা থাকিস কী করে?

সাবের তখন মাথার ওপরে তাকাল। ফ্যানটা দানবের মতো শব্দ করে ঘুরছে। ফেব্রুয়ারি শেষ হয়নি। ফাগুন এসেছে। কিন্তু এখনও তো শীতের রেশই কাটেনি। মিহিরের দিকে একবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। বলল, তোর কি খুব গরম লাগছে মিহির? গায়ে পানি ঢালিস না ক’বছর?

মিহির তখনও গায়ের কোরতাটা খোলায় ব্যস্ত। অনেকগুলো বোতাম। চাইলেই কি সহজে খোলা যায়! না তাকিয়েই বলল, নাহ্! আর কোথাও যাব না বলে ঠিক করেছি। কোথাও না। তোদের এখানেই থাকব কদিন।

মিহির আমাদের ভালো বন্ধু হলেও ওর সঙ্গ যে আমাদের খুব বেশি আনন্দের ছিল, তা নয়। জীবনের প্রতি অবহেলা তাকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছে যে, কোনো সুস্থ মানুষ ওর সঙ্গে থাকার মতো দুঃসাহস দেখাবে না। এই যে, ও এসেছে মিনিট কুড়িও হয়নি। এর মধ্যেই ঘরের মধ্যে একটা গোমট গন্ধে ছয়লাপ। নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে ওর শরীর আর নোংরা পোশাক থেকেই দুর্গন্ধটা ছড়াচ্ছে। শরীরের জায়গায়-জায়গায় ঘাঁ হয়ে গেছে। ক্ষতগুলো লাল হয়ে আছে। আঠালো রসগুলো গড়িয়ে এসে শক্ত হয়ে গেছে। ঠিক, কাফিলা গাছের ঘন আঠার মতো। আর যাই হোক, ওর সঙ্গে একঘরে কোনো সুস্থ মানুষের থাকা সম্ভব নয়।

আমি বললাম, কদিন না হয় গ্রামের বাড়িতে থেকে আয়। ভালো লাগবে।

মিহির গলায় বিরক্তির ভাব এনে বলল, কোথায় যাব? গ্রামের বাড়ি? সে আবার কোথায়?

মাঝে মাঝে ওর কথা শুনে মনে হয়, ওতো উন্মাদ নয়, আমরাই উন্মাদ।

আমি বললাম, খুলনায় যাবি। সেখানে তোর মা আছেন বলে শুনেছি। মায়ের কাছে কদিন থেকে আয়। শরীরের যা হাল করেছিস!

মিহির কিছুই বলল না। সেই লাল, নীল, হলুদ তালিঅলা কোরতাটা দিয়ে হাতের কনুইয়ের কাছের ঘাঁ থেকে গড়িয়ে পড়া আঠালো রসটা মুছতে লাগল।

সাবের ততক্ষণে নাক চেপে জানালার কপাটগুলো খুলে দিয়ে বলল, শালা, বোদলেয়ার হয়েছে। কবিতা লিখলেই এমন হতে হবে? বেপরোয়া জীবনকে জীবন বলে? জীবনটাই শেষ করে দিলো। ভার্সিটিতে ফার্স্টক্লাস সেকেন্ড হয়ে এমন উন্মাদ হয়ে যেতে আমি দেখিনি কাউকে।

আমি তখন নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে আছি মিহিরের দিকে। ও তখন দশ নখে শরীর চুলকে শুকনো চামড়াগুলো ফেলছিল মেঝেতে। আমি দেখছিলাম, কীভাবে একটা জীবন তিলে তিলে ঝরে যায়।

মিহির থাকেনি। বিকেল হতেই কাউকে কিছু না বলে, কোরতাটা কাঁধে ফেলে বেরিয়ে গেল।

কোথায় যাচ্ছিস?

যেখানে যাবার। এখানে তো থাকতে আসিনি। তুই কি থাকতে এসেছিস, এখানে? কদিন থাকবি। মিহির হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। জীবনবোধের গভীরে তলিয়ে যাওয়া একজন মানুষকে আমি বেরিয়ে যেতে দেখলাম। সাবের ততক্ষণে পাশের ঘরে ঠাঁই নিয়েছে। গন্ধটা ওর সহ্য হচ্ছিল না কিছুতেই।

 

০২.

রেজানুর রহমান গল্পের প্রথম পর্বটা লিখে থামলেন। এই গল্পটা গত কদিন তাড়া করে ফিরছিল তাকে। শুয়ে-বসে শান্তি পাচ্ছিলেন না। মনে হতো কবি মিহির চৌধুরী তার আশপাশেই ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। যেদিন থেকে তিনি ভাবলেন মিহিরের জীবনের গল্পটা তিনি লিখবেন, সেদিন থেকে। মনে হচ্ছিল, মিহির তাকে বারবারই বলছে, কোথায় রেজা, লিখবি না? লিখবি না আমার জীবনের গল্প? গল্পকার রেজানুর জানেন, এই গল্পটা তিনি শেষ অবধি টানতে পারবেন না। না বাস্তবে। না কল্পনায়। জীবনে এমন অসংখ্য গল্প মানুষ বুকে করে বয়ে বেড়ায়। কাউকে বলতে পারে না। সব গল্প তো আর বলার নয়। কিন্তু রেজানুর রহমান জেনেশুনেই লিখতে বসেছেন। ছোটোগল্প। নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্বের একটা জবাব তিনি খুঁজে পেয়েছেন। গল্পের শুরু আছে। শেষ নেই। সব গল্পের শেষ খুঁজতে নেই।

রেজানুরের মনে পড়ল শার্ল বোদলেয়ারের কথা। সাবের মিহিরকে নিয়ে প্রায়ই বলত কথাটা। এখনও কথা হলে বলে। কবিতা ভালোবেসে শার্ল বোদলেয়ার হয়ে গেছে মিহির। সত্যিই তো কী বেপরোয়া জীবন ছিল ফরাসি এই কবির। জীবনের জন্য বিন্দুমাত্র মায়া ছিল না। স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে। বোহেমিয়ান জীবন। সমাজের আর সবার চেয়ে আলাদা হয়ে বাঁচা যায়? বোদলেয়ার সেই চেষ্টা করে গেছেন। মূল্য দিতে হয়েছে পুরোটা জীবন।

প্যারিসের ছাত্রদের কাছে উচ্ছৃঙ্খলতার নামই জীবন। সেই নেশায় জড়িয়ে গেলেন তরুণ বোদলেয়ার। জীবনটাকে উপভোগ করার কী চেষ্টা! মেয়েটির নাম ছিল লুশেত। শার্লের রক্ষিতা। দেখতে মোটেও সুশ্রী কেউ ছিল না লুশেত। ট্যারা। শরীর স্বাস্থ্য ভালো ছিল, এই যা। নারী সংসর্গ খুব প্রিয় ছিল তার। একটা সময়, আফিম, মদ, সিদ্ধির নেশায় ডুবে ছিলেন শার্ল। চিন্তাচেতনায় ছিলÑশিল্পকলা। সঙ্গী গোতিয়ে, বাঁভিল, দ্য বোভেয়ার। আঠারো বয়সে সিফিলিসের মতো কঠিন রোগের কাছে ধরা পড়েছিলেন জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো কবি।

এই উন্মাদনা, জীবনের প্রতি উদাসীনতার মূলে ছিল কবিতা। আর ছিল প্রেম। জান দ্যুভাল নামে এক তন্বীর প্রেমে পড়েছিলেন শার্ল। ফরাসি রক্তের সাথে কাফ্রি রক্ত মিশে এক মোহিনী রূপ ছিল তার। থিয়েটারে অভিনয় করতেন। জানের রূপে বিমুগ্ধ বোদলেয়ার বললেন, ‘জান, আমি তোমাকে নিয়ে যেতে চাই।’

কোথায়? মেয়েটি আকাশ থেকে পড়লেন।

যেখানে হোক। কিন্তু থিয়েটারের এই নোংরা জীবন তোমাকে কাটাতে দেব না আমি।

কিন্তু কেন? কতটুকুইবা তুমি চেনো আমাকে?

যতটুকু চিনি। তুমি বলো, আমার সঙ্গে যাবে।

দ্যুভাল একটু আনমনা হয়ে গেলেন। এমন প্রস্তাব আগে কখনও দেয়নি কেউ। কতজন তার পেছনে পেছনে ঘুরে বেরিয়েছে। শুধু কয়েক ঘণ্টার আনন্দ উপভোগের জন্য। কিন্তু আজ ভালোবাসার দাবি নিয়ে এসেছে একজন। সাধারণ কেউ নন, তিনি একজন কবি।

নৈঃশব্দ্য ভেঙে জান বললেন,  বেশ। আমি যাব তোমার সাথে। কিন্তু একটা শর্তে-

কী সেই শর্ত?

যেদিন মনে হবে ভালো লাগছে না, চলে আসব কিন্তু।

বেশ। তাই হবে।

তারপর দ্যুভাল সত্যি সত্যিই চলে এসেছে একসময়। যখন তার ভালো লাগছিল না। আবার ফিরেছে ভালো লাগা জন্মালে। দ্যুভালের বারবার চলে যাওয়ার মূলে ছিল শার্লের বেপরোয়া জীবন। আর ফিরে যাওয়ার মূলে কবির জন্য ভালোবাসা। দ্যুভাল ফিরে এলে একবার বোদলেয়ার তার সামনেই ছুরি বসিয়ে দিয়েছিল নিজের বুকে। প্রেমিকা তিনি বোঝাতে চাইলেন, বিরহ বেদনার চেয়ে মৃত্যু তার কাছে বেশ সুখের। ওই যাত্রায় প্রেমিকার ভালোবাসার শক্তি তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। তার আগে ‘বিদায়পত্রে’ তিনি লিখেছিলেন- আমি আর বেঁচে থাকতে পারছি না। তাই আত্মহত্যা করছি। ঘুমোতে যাবার আগে জেগে ওঠার পরিশ্রম অসহ্য হয়ে উঠেছে আমার পক্ষে।

জানের আসা-যাওয়ার মাঝে মারি দোব্রাঁর প্রেমে পড়েছিলেন শার্ল। তরুণীর বয়স তখনও কুড়ির ঘরে যায়নি। সোনালি চুল। সবুজ চোখ। মুগ্ধতা ছড়িয়েছিল কবির হৃদয়ে। প্রেম নিবেদন হলো। লাভ হলো না। বোদলেয়ার ঝুঁকলেন মাদাম সাবাতিয়ের দিকে। মেয়েটি অসামান্য রূপসী ছিলেন। বহু শিল্পের মডেল। এক ধনী ব্যবসায়ীর রক্ষিতা ছিলেন। তার সঙ্গে ধীরে ধীরে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠেন বোদলেয়ার। মেয়েটিও তাকে মনেপ্রাণে চাইত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে শার্ল তাকে বিশ্বাস করতে পারেননি। দুজনের প্রেমপত্রের ভাষা থেকে ধীরে ধীরে ভালোবাসার শব্দগুলো হারিয়ে যেতে থাকে।

 

০৩.

বোদলেয়ারের মতো মিহিরের জীবনে প্রেম এসেছিল কিনা বন্ধু হয়েও আমরা জানতে পারিনি। হতে পারে মিহিরই জানতে দেয়নি। সেকি দ্যুভালের মতো নাকি সাবাতিয়ের মতো? বাঙালি মেয়েরা কবিদের ভালোবাসে জানি। কিন্তু  কবিদের উচ্ছৃঙ্খল জীবন? ভালোবাসে। আশপাশে দু-একজনের নাম তো আমাদের জানাই। মিহিরকেও নিশ্চয়ই কেউ একজন ভালোবেসেছিল। মিহির তাকে ভালোবেসেছে কিনা তার কোনো খবর বন্ধুদের কাছে নেই। বন্ধুরা তাকে একটা সময় দূর দূর করত। কাছে ভিড়তে দিত না। অথচ এক সময়, ক্লাসে ও সবারই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। মেধাবী ছাত্রদের পেছনে মেয়েদের লাইন পড়ে, কথাটা মিথ্যে নয়।

পাগলের বেশভুষায় মিহির একবার হাজির হলো সাবেরের কাছে। উখিয়াতে। সাবের তখন উখিয়ার ইউএনও। মিহিরকে দেখে আকাশ থেকে পড়েছিল সাবের। তুই এখানে?

মিহির নির্লিপ্ত। যেন তার ওখানেই যাবার কথা ছিল। বলল, হ্যাঁ। তোর কাছে এলাম।

আমার কাছে?

হ্যাঁ।

কেন?

কদিন এখানে থাকব ভেবেছি।

অসম্ভব! এখানে তুই কী করে থাকবি? সরকারি বাংলোতে তোর মতো একটা দুর্গন্ধময় পাগলকে কী করে রাখি! কথাগুলো সাবের নিঃশব্দে নিজেকেই বলল। মিহিরকে সে দুবার খাইয়ে বোঝাল। এখানে থাকা নিরাপদ নয়। তোর মতো একজন কবির জীবন এখানে নিরাপদ নয়। ঢাকাই একমাত্র তোর নিরাপদ শহর। তোকে সেখানে ফিরে যেতে হবে।

এমন কদিন, কতজনার কাছে গিয়ে হাজির হয়েছে মিহির। কতজন এভাবে তার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়েছে! মিহির নিখোঁজ হওয়ার পর আড্ডার স্মরণসভায় এসব গল্প উঠে এসেছে। গরম কফিতে চুমুক দিয়ে সবাই তখন মিহিরের নিরুদ্দেশ যাত্রায় দুঃখ করেছে। মিহিরের কাব্য প্রতিভার প্রশংসা হয়েছে। কবি মিহিরের প্রস্থান সাহিত্যের কতটুকু ক্ষতি হলো, সেই হিসাবও কষা হলো। কেউ কেউ মিহিরকে তুলনা করলেন কবি সাবদার সিদ্দিকীর সাথে। বোহেমিয়ান কবি। ঘর-সংসার-নারীর প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না তার। সন্ন্যাসীর লিঙ্গের মতো নিস্পৃহ হয়ে যেতে চেয়েছিলেন যিনি। কলকাতার আলো-বাতাসে কেটেছে যার শৈশব, কৈশোরের একটা সময়। সেই স্মৃতি নিয়ে লিখেছিলেন- ‘কলকাতা, আমার কলকাতা। হাওড়া ব্রিজ যেন লোহার ব্রেসিয়ার।’

কেউ আবার মিহিরে তুলনা করেছিলেন মংটু দার সঙ্গে। ভালো নাম বিনয় মজুমদার। শেষ জীবনটা যার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। কবিতার কাছে এক জীবনের ঋণ ছিল তার। সেই ঋণ মেটাতে গিয়ে বেঁচে থাকার বোধ কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল। লোকে দেখে তাকে পাগল বলত। দা হাতে কতদিন কতজনকে তাড়া করেছেন- চব্বিশ পরগনার ঠাকুরনগরের মানুষ তার সাক্ষী।

মিহিরের কোনো কবিতার বই ছিল না। কবিতার কোনো খাতাও রেখে যায়নি সে। কিংবা রেখে গেছে, কিন্তু কেউ তার খোঁজ পায়নি। সভার দু-একজন স্মৃতি হাতড়ে বের করে আনলেন কবির দু-চারটে স্তবক। একদিন মিহিরের এই সৃষ্টি তাদের কান ঝালাপালা করেছিল। তিতি বিরক্ত শ্রোতা তাড়া করেছে কবিকে। কী আশ্চর্য! আজ তা শুনতে মোটেও খারাপ লাগছে না। কী গভীর জীবনবোধ ছিল ছেলেটার। বলতে বলতে, কারও কারও চোখ সজলমেঘে আড়াল হলো। স্মরণসভায় নৈঃশব্দ্যের ঘোর। সবাই তাকিয়ে দেখল, সভার মাঝ দিয়ে মলিন মুখে বেরিয়ে যাচ্ছে মিহির। কেউ তাকে পিছু ডাকল না।

লেখক : গল্পকার