সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

জলের মানুষ মাহবুব – ময়ূখ রিশাদ

September 20th, 2016 11:53 pm
জলের মানুষ  মাহবুব – ময়ূখ রিশাদ

গল্প

জলের মানুষ

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

 

মূল সড়ক থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে গেলে মাহিনদের বাসা। রোদভেজা হয়ে প্রতিদিন বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় অতটুকু পথ বেশ ভোগায় মাহিনকে। অল্পতে বুড়িয়ে যাচ্ছে, এই ভাবনাও উঁকি দেয় মাঝে মাঝে। যত বেশি বাসার কাছাকাছি এগোয় তত তার গতি শ্লথ হয়ে আসতে থাকে। প্রতিদিন তার মনে হয় বাসা বুঝি একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। গলির মাথা থেকে তিনতলা বাসার বারান্দা দেখা যায়। সে যখন কাউকে বলে চারপাশ খোলা বারান্দা আছে আমাদের বাসায় সবাই অবাক হয়ে তাকায় এবং মিথ্যাবাদী বলে তাকে গালমন্দ করে। মাহিনদের বাসায় এখনও ডেভলাপারদের কুনজর পড়েনি, মাহিনের বাবাও অর্থলোভী হয়ে উঠতে পারেননি। যার ফলে, ধুঁকে ধুঁকে নিশ্বাস নিচ্ছে বাড়িটি। এখানে সেখানে প্লাস্টার খসে পড়েছে। একসময় যে উজ্জ্বল সাদা রঙ ছিল, এখন বোঝা দায়। তারপরেও এটি শহরের সবচেয়ে সুন্দর বাসা। একটি কৃষ্ণচূড়া গাছও বাড়িটির সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ হচ্ছে। ডালপালার ফাঁক দিয়ে রাস্তা থেকে অল্প করে বারান্দা দেখা যায়। আজ দূর থেকে তিনতলার বারান্দায় ছবির ফ্রেমে আটকে থাকার মতো একজন মানুষকে দেখতে পায় মাহিন। কাছে এগোতে থাকলে ধীরে ধীরে তারুণ্য ধরে রাখা একজন মধ্যবয়স্ক মহিলার অবয়ব ¯পষ্ট হয়ে ওঠে। যে বারান্দায় তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, সে বারান্দা ও বারান্দা লাগোয়া ঘর দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। ভাড়া হবে হবে করেও হচ্ছে না বলে জানত মাহিন। তবে কি নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে? ভাড়াটিয়া এলে নিশ্চয় বেশ কদিন আগে তার তোড়জোড় শুরু হবার কথা। মাহিনের না জানাটা বাসা সম্পর্কে তার উদাসীনতার পরিচায়ক হলেও, কজন টিনএজ ছেলে বৈষয়িক খবরাখবর রাখে সেই প্রশ্নটিও চলে আসবে সামনে।

মাহিন বাসার কাছাকাছি এলে ছবি আউট অফ ফোকাস হয়ে যায়। গেট খোলার পর আবার দেখতে পায় তাকে। কেমন যেন একটা শিরশিরে অনুভূতি শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায়। প্রথমে মনে করেছিল বোধহয় মাহিনের দিকেই তাকিয়ে আছেন। এতটা হাহাকার মেশানো চাহনি আগে দেখিনি কোনোদিন।

বাসায় ঢুকেই মাহিন জানতে পারল, নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। ছোট বোন টাপুর মাহিনকে দেখেই বলল, ভাইয়া, সামার ফিনের ফ্যামিলি আমাদের ভাড়াটিয়া হয়ে আসছে।

সামার ফিন জানি কে?

তোর তো ভোলার কথা না। তুই জানতে চেয়েছিলি না, আমার কাছে- সামার ফিন কেন আত্মহত্যা করল? আমাদের স্কুলের আপু ছিলেন। ভুলে গেলি? জানিস, আপুর মাকে দেখলে অবাক হয়ে যাবি। একদম বোঝা যায় না সামারের মতো এত বড় একটি মেয়ে ছিল তার!

সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যায় মাহিনের।

মেয়েটি মারা গিয়েছিল সতের বছর বয়সে। পত্রিকায় পড়ে জেনেছিল সবাই। একদিনের জন্য শহরের টক অব দ্য টাউন। নামটা খুব অদ্ভুত ছিল- সামার ফিন। পত্রিকায় স্কুলে ড্রেস পরিহিত একটি ছবি ছাপা হয়েছিল। নিচে ক্যাপশন ছিল, সামার ফিনের আত্মহত্যা। আত্মহত্যার খবর তো কত ছাপা হয়। চোখ এড়িয়ে যায়। নাম এবং মায়াময় চেহারায় দৃষ্টি আটকে গিয়েছিল মাহিনের।

এরপর কতজন আত্মহত্যা করল, ধর্ষিত হলো, নিজঘরের ভেতরে সন্তানের সামনে খুন হলো, লেখকদের উপর চাপাতির আঘাত নেমে এল- এর মাঝে সামার ফিনের কথা মনে থাকবে এই আশা করেনি মাহিন কিংবা বলা যায় অতটা গভীরে ভাবেনি।

সদ্য ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে মাহিন। হিসেবে সামার ফিন থেকে বয়সে দুতিন বছরের বেশি বড় হবার কথা নয়। এই বয়সে আত্মহত্যা করার মতো কঠিন কারণ কী থাকতে পারে? কাউকে ভালোবেসেছিল, বাবা-মা বকা দিয়েছিল?

আর হয়ত আগ্রহী হতো না মাহিন, যদি না সামার ফিনের মাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখত অমন শূন্যদৃষ্টি নিয়ে। মাহিন বুঝতে পারে একটু আগে যাকে বারান্দায় দেখেছিল তিনিই সামার ফিনের মা। বুঝতে পারে আসলেই সামারের মতো একজন টিনএজ মেয়ের মা তিনি রীতিমতো অবিশ্বাস্য। সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো চিন্তাটিও ফিরে এল; সামার ফিন কেন আত্মহত্যা করেছিল? টাপুরকে অবশ্যি কিছুই বলে না সে। ও বকবক করতেই থাকবেÑসামার ফিন থেকে নিমিষে ঝাঁপ দিয়ে ওর কথা স্টিভেন ফিনের কাছে চলে যেতে পারে; ইংলিশ ফাস্ট বোলার স্টিভেন ফিন। যেদিন আত্মহত্যার খবর পত্রিকায় এল, সেদিন সে বলেছিল, ভাইয়া, আমরা ভাবতাম সে বোধহয় স্টিভেন ফিনের আত্মীয়। বিরক্ত হয়েছিল মাহিন। ধমক দিয়ে বলেছিল, তোদের স্কুলের সিনিয়র এভাবে মারা গেল, আর তুই ফাজলেমি করতেছিস?

কথা না বাড়ালেও টুকটাক কিছু কথা ঠিক কানে চলে আসে। সামার ফিনের মৃত্যুর পর মানুষের কৌতূহলের অত্যাচারে বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। টাপুর-ই বোধহয় একদিন এসে বলেছিল, জানিস, মানুষের যে কত প্রশ্ন, সামারের বাবা-মা রাস্তায় বের হলেই বলত কার সঙ্গে প্রেম ছিল, খোঁজ পাইসেন?

হয়ত সেজন্য নিজের জায়গা থেকে দূরে এখানে চলে এসেছেন তারা। মানুষের অনুর্বর, অভদ্র ব্যবহারে বিরক্তি জাগলেও নিজের ভেতরে সামার ফিনের আত্মহত্যা বিষয়ক যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল তা নিয়ে কোনো বিবমিষা তৈরি হয় না মাহিনের ভেতরে। ঐ প্রথমদিন দেখার পর বেশ কিছুদিন পার হয়। সামার ফিনের মা’র সঙ্গে মাহিনের দেখা হয় না কিংবা পরিচয়ের কোনো সুযোগ ঘটে না। মাহিন একটা সুযোগ খুঁজছিল, তাদের বাসায় যাওয়ার; কোনো একটা ছুঁতোয়, কোনো একটা উছিলায়। সকালে বের হবার সময়, বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় অবধারিতভাবেই তার চোখ বারান্দার দিকে চলে যাচ্ছিল। অস্থিরতার মূল কারণ ধরতে ব্যর্থ হয় মাহিন। সামার ফিন নাকি সামার ফিনের তরুণী মা’র সান্নিধ্য পাবার ইচ্ছে তাকে কাতর করছে? প্রশ্নটা করার জন্য কাউকে বিশ্বস্ত মনে হয় না। বন্ধুদের আড্ডায় চাইলেই বিষয়টি তোলা যায়। সন্দেহ নেই, কথাবার্তা শরীর পর্যন্ত গড়াবে; কিন্তু সদ্য মেয়ে হারানো মাকে এমন আড্ডার অংশ বানাতে একদম ইচ্ছে হয় না মাহিনের।

কয়েকদিন পার হয় এভাবে। মাহিনের বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়, এজন্য তাকে অর্থাৎ সামার ফিনের মাকে দেখা যায় না। অবসরকালীন হাহাকার মেশানো ব্যস্ততা শেষে তিনি ঘরে ফিরে যান। অবশ্য বারান্দা তো ঘরের বাইরের অংশ না। হয়ত মানুষের মতোই ব্যাপার; বাইরের আবরণ, ভেতরের রহস্য।  আদৌ কি কোনো রহস্য ঘিরে আছে?

টাপুর বলেছে, সামারের প্রেম ছিল না। প্রেম না থাকলেই আত্মহত্যার পেছনে ভালোবাসার কারণ থাকতে পারবে না, তাও যৌক্তিক চিন্তা নয় একেবারেই। হয়ত ভালোবাসার মানুষটি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এমন মায়াময় চেহারার একজনকে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারে? চেহারার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক নেই- এই জাতীয় শুদ্ধতা দিয়ে কথাটা উড়িয়ে দেয়া গেলেও জীবন শুদ্ধ কিছু নয়। এই যে সামার ফিন যদি দেখতে কুৎসিত কেউ হতো, তবে এত ভাবনা মাথায় আসত মাহিনের? কিংবা সামার ফিনের মা মধ্যবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও যদি সুন্দরী না হতেন, দ্বিতীয়বার ফেরার পথে বারান্দার দিকে তাকাত মাহিন? দ্বিধার সাগরে হাবুডুবু দিয়ে দিন পার করতে থাকে মাহিন। সে জানে, সামার ফিন যে কারণেই আত্মহত্যা করুক না কেনÑ সে তার মাকে ভীষণ একা রেখে চলে গেছে। শুক্রবারের অপেক্ষায় থাকে মাহিন। শুক্রবার বাসায় থাকবে সারাদিন। সামার ফিনের মাকে নিশ্চয় এর মাঝে একবার হলেও দেখা যাবে। মাহিনের দুরভিসন্ধি কি ধরা পড়ে যাবে ওনার কাছে? এই কথা মাথায় এলেও পাত্তা দেয় না। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ওনার নাম জানা হয়নি এখনও মাহিনের। অবশ্য এটাও ঠিক, সন্তান হলে সবাই তো সন্তানের নামেই পরিচিত হয়ে যায়, মাহিনের মাকে যেমন মানুষ ডাকে মাহিন-টাপুরের মা। শুক্রবার আসার আগেই মা’র কাছে জানতে চায় মাহিন, নতুন ভাড়াটিয়ার নাম কী, মা?

মা তখন সবেমাত্র খিচুড়ি চড়িয়েছেন। ফুটন্ত চালের গন্ধের সঙ্গে ঘির গন্ধও খাদ্যরসিক মাহিনের পাকস্থলীকে জাগাতে পারে না। কিছুটা বিরক্তি নিয়েই মা উত্তর দেন, করিম সাহেব। কোনোদিন তো এসব জানতে চাস না। আজ কী হলো? খিদা লেগেছে বলে মাহিন প্রশ্নটি এড়িয়ে যায়।

রান্না হয় নাই এখনও। ঘুরঘুর করিস না।

করিম সাহেব মানে সামার ফিনের বাবা। ভদ্রলোকের সঙ্গে একবারও দেখা হয়নি মাহিনের। কেবল মাহিনের সঙ্গেই নয় ভাড়া নেবার পর এমনিতেও খুব বেশি দেখা যায়নি তাকে। এই নিয়ে মাহিনের বাবাও বেশ চিন্তিত। একা মহিলা থাকেন, কখন কি অঘটন ঘটে যায়। এইসব কথা জানা নেই মাহিনের। জানা থাকলেও করিম সাহেবকে নিয়ে আগ্রহ তৈরি হতো না। যদিও মাহিনের বাবা প্রায় বলেন, ভাড়াটিয়াদের নাড়ি-নক্ষত্র আমাদের জানতে হবে, এমনকি কখন তারা বাথরুমে যায়, কতক্ষণ বাথরুমে কাটায়। একচোট হাসার মতো কথা । বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কথাটা হাসার মতো না যদিও।

রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসে মাহিন। মাকে আর প্রশ্ন করে না। মা’র কাছে আবার জানতে চাইলে তিনি বলবেন, মিসেস করিমের কথা জানতে চাচ্ছিস ?

রুমে চলে যায় মাহিন। মাহিনের ছোট্ট রুম। দখিনের খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢোকে। তারপরেও শীতল হয় না মাহিনের মন। ভাবে, শুক্রবার যদি দেখা না হয় তবে সে সরাসরি চলে যাবে। বেল বাজাবে তাদের বাসায়। বেল নষ্ট ছিল। এতদিনে ঠিক করা হয়েছে কিনা ঠিক নিশ্চিত নয় সে। যদি বেল নষ্ট থাকে খুব অভদ্রের মতো দরজায় সজোরে নক করবে, নিশ্চয় উনিই দরজা খুলবেন। চোখে চোখ রেখে তখন মাহিন বলবে, আপনি কেমন আছেন?

 

দুই

ঘড়ির টিকটিক শব্দ আজকাল আর শোনা যায় না। ব্যস্ত নগরজীবনের খুব ক্ষুদ্র একটা উদাহরণÑ শব্দ কিভাবে শব্দকে কেড়ে নেয়। তবে মাহিন নিজের বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ শুনতে পায়। এমনও হতে পারে, উনি মাহিনকে পাত্তা দেবেন না। পাত্তা দেবেন কেন? মাহিন তো তার কাছে ছোকড়া ছাড়া আর কিছু নয়। আশা হারায় না সে। নিজের কাছে পরিষ্কার নয় মাহিন আসলে ঠিক কি আশা করছে। সামার ফিন বেঁচে থাকলে কি তার বন্ধু হতো? কাছাকাছি বয়স। একই বাসা। বন্ধুত্বের চাইতে বেশিকিছু হবার কথা ছিল। যেহেতু এখন সামার ফিন নাই এবং তার ফিরে আসার সম্ভাবনাও নেইÑ মাহিনের মাথার ভেতর সামার ক্রমশ পেছন দিকে যেতে থাকে যেখানে সুপ্ত ইচ্ছাগুলো ঝিম মেরে বসে থাকে। শুক্রবারের আর বার ঘণ্টা বাকি। ছাদে যেতে ইচ্ছে হয় মাহিনের। অনেকদিন যাওয়া হয় না তার। অবসর মেলে না। ছাদে একসময় খেলত। পুতল খেলা, না কি খেলা এখন ঠিক মনে করতে পারে না। কার সঙ্গে খেলত তাও মাথায় আসে না।

আচমকাই তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়। এত আচমকা, কোনো আভাস ছাড়া  ছাদের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে নেবার সুযোগ পায় না মাহিন। মুহূর্তের ভেতরে ভিজে যায় সে। মাত্র গোসল শেষে পরা গ্রামীণ চেকের ফতুয়া, চেক ট্রাউজার, ভিজে থাকা চুলকে দফায় দফায় ভিজিয়ে আকাশে বজ্রপাত হতে থাকে, সাদা আলোর রেখা তীব্র শব্দে মাটি ছুঁয়ে যেতে থাকে, সন্ধ্যার আলো নিভে নিভে জ্বলতে থাকে মৃত্যুর আগে নেয়া মানুষের শেষ শ্বাসের মতো আর ঠিক তখন সবকিছু ছাপিয়ে ভারি নিশ্বাস কানে আসে মাহিনের। চকিতে পেছনে তাকিয়ে মাহিন দেখে হালকা গোলাপি সুতির শাড়ি পরনে একজন মহিলা ছাদের রেলিং ধরে দাড়িয়ে আছে। সিঁড়ি পার হয়ে মরচে ধরা স্টিলের দরজা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুললেই ছাদ। আশেপাশে উঁচু বিল্ডিং নেই। এই শহরে এমন ছাদ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার নিঃসন্দেহে এবং কেউ যদি এখান থেকে লাফ দিয়ে মরে যেতে চায় বুদ্ধিটা একেবারে খারাপ না। সামার ফিন কিভাবে আত্মহত্যা করেছিল, মনে করতে পারে না মাহিন। সে কি এভাবে ঝাপ দিয়েই নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করতে চেয়েছিল?মহিলাকে ডাকব কি ডাকব না সেই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই মহিলা  পেছন ফিরে তাকালেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মাহিন বুঝতে পারে যে তিনিই সামার ফিনের মা। আর ঠিক তখন বিকট শব্দে ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরিত হয়ে পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়।

খুব সম্ভবত পাঁচ সেকেন্ডের জন্য তিনি তাকিয়েছিলেন তারপর আবার আগের মতো রেলিংঘেঁষে দেয়াল ভাঙা জায়গায়Ñ এমন বৃষ্টিপ্রবণ রাতে যেখানে পিছলে পড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয় সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাকে দেখে মাহিনের প্রথমে টাপুরের বলা কথাটিই মনে হয়, ইনি সামার ফিনের মা! আদৌ তা সম্ভব! উনি আত্মহত্যা করতে পারেন ভেবে বুক খা খা করে ওঠে। মাহিন কি তবে এই মধ্যবয়স্ক মানুষের প্রেমে পড়ে যাচ্ছে, যিনি বয়সে ঠিক কত বড় না জানলেও, যার মাহিনের সমান একজন মেয়ে ছিল!

একটু এগিয়ে মাহিন বলে, এখান থেকে লাফ দিলে মৃত্যুর কিন্তু নিশ্চয়তা নেই। তিনি আবার ফিরে তাকালেন। অন্ধকারে ঠিক ¯পষ্ট দেখতে পায় না মাহিন। কিন্তু বুঝতে পারে সেই হাহাকার মেশানো দৃষ্টিতে বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছা অবশিষ্ট নেই। নিজের সন্তানের মৃত্যুর ভার বহন করা মুখের কথা নয়, তাও যদি আবার হয়

অস্বাভাবিক কোনও মৃত্যু!

লাফ দিবেন না, প্লিজ।

আমি লাফ দিতে চাচ্ছি তা তোমাকে কে বলল?

যাক, বাঁচা গেল। আমার ধারণা ভুল।

উনি মিষ্টি একটি হাসি দিতে চেষ্টা করেন বলে মাহিনের মনে হয়। নিশ্চিত হতে পারে না।

তুমি বাড়ি যাও, ঠান্ডা লাগবে।

আপনার লাগবে না?

তিনি আর কিছু বলেন না। বুঝতে পারেন  যাবে না  মাহিন। কেন যাবে? যার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছে বলে দীর্ঘদিন ধরে একটি ছুটির দিনের অপেক্ষা করছিল, তার সঙ্গে এমন একটি মুহূর্ত ফেলে কোথায় যাবে সে? দীর্ঘদিন নয় আসলে, কয়েকদিন, মাহিনের কাছে দীর্ঘদিন মনে হচ্ছিল দেখে অবাক হয় না। সামার ফিনের আড়ালে মাহিন যে সামার ফিনের মাকে খুঁজছিল মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায় সে। কে বলেছিল মনে নেই। বুঝলি, যৌনকলা শেখার সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হচ্ছে মধ্যবয়স্ক মহিলারা, এই ধর পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের ভেতরে। এখন এই কথাটি মনে হওয়ায় নিজেকে ধিক্কার দেয় সে, কুৎসিত চিন্তা ভাবনা করা মানুষের সঙ্গে তফাত থাকল কই?

আপনার নাম জানতে পারি? সমবয়সি মেয়েদের সঙ্গে কিভাবে আলাপ জমানো যায়, জানা থাকলেও ওনার সঙ্গে ঠিক কিভাবে কথা শুরু করা যেতে পারে এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই মাহিনের।

ফাউন্টেন।

জ্বি?

আমার নাম ফাউন্টেন। আমার মেয়ের নাম সামার। কথা বলে না মাহিন। চুপ করে থাকে। যার মেয়ের নাম সামার, তার নাম ফাউন্টেন হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সে অবাক হয়, উনি নিজ থেকে সামারের কথা তোলায়। বৃষ্টিও বাড়ছে। হতচ্ছাড়া বিজলি বন্ধ হয়ে গেছে। অন্ধকারে বৃষ্টিভেজা শাড়ির জ্যামিতি  বুঝতে না পারলেও কণ্ঠের কান্না বুঝতে পারে। আমার মেয়ের নাম সামার বলার সময় তার গলা যে কেঁপে উঠেছিল তাও টের পায় সে। এখানেই বোধহয় অন্য মানুষের সঙ্গে মা’র পার্থক্য। অন্য কেউ, এমনকি যদি সামারের ভাই থাকত, সে বলত- আমার বোনের নাম ছিল সামার। ফাউন্টেন মানে সামারের মা’র কাছে সে বেঁচে আছে নিশ্চয়। আর মাহিন কিনা এমন একজন অসহায় মানুষকে নিয়ে উলটোসিধা ভাবছে!

কথা খুঁজে না পেয়ে মাহিন বলে, নাম সুন্দর। আনকমন।

সামারের বাবা একসময় ফিনল্যান্ডে থাকত। মেয়ের নাম রাখল সামার ফিন। সামারে হয়েছে দেখে। সে তখন ফিনল্যান্ডে। আমি গ্রামে। পরে যখন দেশে এলো তখন নামের শেষে ফিন লাগিয়ে দিল।

ফিন কেন? মানুষজন হাসাহাসি করত না?

করত। তাতে ওর বাবা কেয়ার করত না। ফিনল্যান্ডে থাকত দেখে ফিন। আমাকে বলল, মেয়ে যেহেতু সামার তুমিও ফাউন্টেন হয়ে যাও। আমি ফাউন্টেন হয়ে গেলাম ওর কাছে, মেয়ের কাছে।

ফাউন্টেন এত কথা বলবেন, আগে ভাবতে পারেনি মাহিন। তাকে ফাউন্টেনই ডাকার সিদ্ধান্ত নেয় মনে মনে। ভাবার কথাও না অবশ্য। মাহিনের সঙ্গে তো তার পরিচয় নেই। ছোট হওয়ার এটা একটা সুবিধে। বড় মানুষেরা নিজেদের জন্য বিপজ্জনক না ভেবে অনেক কিছু বলে ফেলে। তবে মাহিন চায় না, ফাউন্টেন তাকে ছোট কেউ ভাবুক।

কি ভেবে সে বলে বসে, আপনি কি অনেক একা? বলে জিভে কামড় দেয় কিংবা দেয় না। তবে নিজের বোকামির উপর রাগ হয় ক্ষণিকের জন্য। আবার ভাবে, না হয় একসন্ধ্যায় খানিকটা বোকামি করা হলো। উত্তর না পেয়ে সে আবার বলে, আপনি কি কাঁদছেন?

ফাউন্টেন চুপ থাকে।

বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের ভেতরে নীরবতা নেমে আসে। নীরবতা ভালো লাগে মাহিনের। মনে মনে ভাবে এই নীরবতা যদি  চিরকাল থাকত!

তোর তো কোনও দোষ ছিল না সামার। তোর বাবা যে হুট করে মরে গেল, তাতে কি তোর দায় ছিল? তারপর আমি যে কিছু না ভেবে করিমকে বিয়ে করলাম, তোর সম্মতি ছিল তাতে? তোকে নিয়ে ঘুরতে যাবার কথা ছিল। তোর পরীক্ষার পর। ভূটানে। টাকা জমাচ্ছিলাম। আমি আর তুই। হলো না কিছুই।

ফাউন্টেনের মুখ থেকে এসব কথা ভেসে আসে নাকি নীরবতা তার নিজস্ব শব্দ সাজিয়ে মাহিনকে এসব বাক্য বলতে থাকে, সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। অন্ধকার সয়ে এসেছে খানিকটা। ফাউন্টেনের কাছে দাঁড়িয়ে তার ঠোঁটের ওঠানামা দেখতে পায় না। কথাগুলো তবে ফাউন্টেন বলছে না। দুই মিনিটের পরিচয়ে তিনি এসব কথা মাহিনকে বলবেন না। বুকের ওঠানামাও দেখে সে। বৃষ্টিতে পরিচয়ে সেখানে কি কোনও অধিকার জন্মাবে মাহিনের? ছি মাহিন! ছি! নিজেকেই যেন বলে। হয়তো এসব কিছু ঘটছে না। মাহিন ভার্সিটি শেষে এখন ঘুমিয়ে আছে নিজ বিছানায়। সে স্বপ্ন দেখছে।

একটু সরে আসতে নিলে পিছলে যায় মাহিন। ধপাস শব্দে পড়ে গেলে ফাউন্টেনের হাত মাহিনকে ছোঁ মেরে ধরে ফেলতে চায়। হাত পিছলে গেলে  ক্রমশ পতনের দিকে ধাবিত হয় সে। ফাউন্টেন উপায় না পেয়ে জাপটে ধরেন মাহিনকে। এবার যেন সে আটকে যায় বুকের ভেতরে, ওমের ভেতরে।

আহারে! এত অসাবধান তোমরা। আমার মেয়েটাও এমন। তুমি আমার মেয়ের বয়সি। এখন যদি পড়ে যেতে কোনও উপায় থাকত বলো? মাহিনের গালে জল ছুঁয়ে যায়। বৃষ্টির নাকি কান্নার ঠিক ধরতে পারে না। মাহিনের মনে হয়, নতুন করে জন্ম হচ্ছে তার। এভাবেই কি কোনও একসময় মাতৃদুগ্ধ পান করত সে? তারপর তার মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন? ফাউন্টেন তাহলে কে? মা? মা তো বটেই। সামার ফিনের মা। কিন্তু মাহিনের তো কেউ নন। মাহিন ছুটতে চায়। তিনি যেন মাহিনকে আরও জাপটে ধরেন। সামার ফিন যে আত্মহত্যা করেছিল, মাহিনের মনে হতে থাকে সে হয়ত ফিরে আসতে চাইছে তা মা’র কোলের ¯পর্শ পেতে। মাহিনের খুব রাগ হয়। সামার ফিন কেন আসবে এখানে? সে তো নিজ ইচ্ছায় চলে গিয়েছিল। কেন সে ফাউন্টেনের ভেতর মা’র ভালোবাসা জাগিয়ে দিতে চাচ্ছে?

ফাউন্টেন তাকে খোকা বলে ডাক দিলে কান্না পায় মাহিনের। বুঝলে খোকা, একটু সাবধান থাকতে হবে। সবখানে বিপদ ওৎ পেতে আছে। মাহিন যেন খোকা হয়ে যায়। দুই মাসের খোকা। কিংবা এক মাসের। তার মুখের কথা হারিয়ে যায়। কিন্তু সে তো খোকা হতে চায় না। মাহিন কারো খোকা নয়। সে যুবক, ভালোবাসতে জানে। চিৎকার দিয়ে সে বলে, খোকা নই আমি, আমাকে খোকা বলবেন না।

বজ্রপাত হয়। মাহিনের কথা শুনতে পারেন কিনা বুঝতে পারে না সে। আবার ক্রমশ যুবক হয়ে উঠতে থাকে মাহিন। ফাউন্টেন, আপনি অনেক একা। ফাউন্টেন শোনে কি শোনে না বোঝা যায় না। ফাউন্টেন বললেন, সামারের মতো বোকামি করবা না। আমি তো জানতাম ওর দোষ নাই। একদিন, ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। মেয়ের রুমের দিকে গিয়ে দেখি করিম বের হচ্ছে। আর মেয়ে-আমার বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে। চোখে পানি। আমাকে দেখে কুঁকড়ে গেল কেমন করে যেন। এরপর কি যে হলো আমার। সামারের গায়ে হাত তুলে বসলাম। এরপর মেয়েটা আমাকে অপরাধী করে চলে গেল। আমি একা হয়ে গেলাম। আর করিম দিব্যি তার জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেল, যেন কিছুই ঘটেনি, কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো অনুতাপ নেই।ফাউন্টেনের কোলের ভেতর ছটফট করে ওঠে মাহিন। নিজেই এবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মৃদুস্বরে বলে, চলেন পালিয়ে যাই, অনেকদূরে কোথাও যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না।