সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

যেভাবে দুপুরগুলো বিকেল হয়ে যায় – শামীম আহমেদ

September 20th, 2016 11:52 pm
যেভাবে দুপুরগুলো বিকেল হয়ে যায় –  শামীম আহমেদ

গল্প

যেভাবে দুপুরগুলো বিকেল হয়ে যায়

শামীম আহমেদ

 

মারুফ গাড়িতে উঠেই পকেটে হাত দেয়। জরুরী জিনিসপত্র ফেলে রেখে অনেকদূর চলে গিয়ে আবার সেগুলো নেবার জন্য ফিরে আসার ঘটনা এন্তার তার জীবনে। আঙুলের ছোঁয়ায় বোঝে বাসার চাবিটা আছে পকেটে। ওয়ালেটও আছে ব্যাক-পকেটে। চশমাটা শার্টের কলারের পাশে  ঝোলানো। যাক, কিছু ভুলে ফেলে আসেনি।এবার নিশ্চিন্তে গাড়িতে স্টার্ট দেয়া যায়। নতুন গাড়ি কিনেছে, এখনও ছয় মাসও হয়নি। অদ্ভুত ব্যাপার, গাড়ি স্টার্ট নিল না। মারুফ আবারও স্টার্ট দেয়, এবারও হলো না আশ্চর্য! এমন তো হবার কথা না। তার গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ প্রায় নিখুঁতই বলা চলে। গাড়ি গুলশান-বনানির বাইরে চালানো হয় না তেমন তবু প্রতি তিন মাস অন্তর একবার করে রহিম আফরোজে সার্ভিসিং করানো হয়। গাড়ি থেকে নেমে সামনের বনেটটা খোলে মারুফ।

ব্যাটারি ঠিক আছে, এখনকার গাড়িগুলোর ব্যাটারিতে আর পানি দেয়া লাগে না, তাই এ সমস্যা হবে না সে জানত। রেডিয়েটরে যথেষ্ট পানি আছে। ফ্যানবেল্টও দিব্যি আছে দেখা যায়, তাহলে গাড়ি স্টার্ট নিল না কেন? মারুফ কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে গাড়িতে ওঠে। সময় নিয়ে আবার স্টার্ট দেয়। মৃদু গুঞ্জন করে ইঞ্জিন স্টার্ট নিল এবার; নিখুঁত। মারুফের ভ্রু কুঁচকে যায় বিরক্তিতে। এমন হবার কোন কারণ নেই আসলে, কোনই  কারণ নেই। দিনটা খারাপ যাবে মনে হচ্ছে!

রিয়ার মিররে একবার চোখ দিয়ে ব্যাক ক্যামেরার দিকে নজর রাখতে রাখতে গাড়িটা গ্যারেজ থেকে বের করে আনে সে। এসি অন করে তার প্রিয় গানগুলোর সিডিটা অন করে দেয়। শনিবার আজ। রাস্তায় খুব ভিড় থাকবে বলে মনে হয় না। যাবে উত্তরা। আধঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া খুব কঠিন হবার কথা না। রাস্তার মোড়ের দোকানটার সামনে এসে হালকা করে হর্ণ বাজায়, আঙুল দিয়ে ইশারা করে ডাকে কাউকে।

হাসিমুখে বোরহান প্রায় ছুটে আসে দোকানের ভেতর থেকে। মারুফের বিরাট ভক্ত এই ছেলে। ‘মামা, কী অবস্থা? অনেকদিন দেখি না আপনারে।’

‘এই তো ব্যস্ত ছিলাম, তোদের কী খবর?’

‘ভালো। কয়ডা দিমু মামা? আপনার জন্য আইনা রাখি, আপনারই খবর নাই।’

‘দুইটা দে। ঠান্ডা দেখে আনিস।’

পকেট থেকে তিনটা একশ টাকার নোট বের করে মামুনকে দেয় মারুফ। রেড বুল তার প্রিয় পানীয়। মদ-সিগারেট কিংবা অন্য কোন নেশা নেই তার। কোল্ড ড্রিংকসও পান করে না তেমন। শুধু মাঝে মাঝে রেড বুলের বরফ শীতল ক্যানে চুমুক দিতে বেশ লাগে। মনে হয় চাঙা হয়ে যায় শরীরটা। এই গরমের দিনে যেমন এখন দারুণ লাগছে। মনে হচ্ছে রাতে না ঘুমানো ক্লান্তিটা কেটে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। তেজগাঁ লিংক রোড দিয়ে নিকেতন পার হয়ে গুলশানের দিকে গাড়ি ছোটাতে থাকে মারুফ। শরীরটা চনমনে লাগলেও মেজাজটা খিঁচরে আছে এখনও। গাড়িটা তখন স্টার্ট নিল না কেন? রাস্তার মধ্যে আবার বন্ধ হয়ে যাবে না তো? শুধুমাত্র রাস্তার মধ্যে যাতে গাড়ি স্টার্ট বন্ধ হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে গাড়ি গ্যাসে কনভার্ট করেনি সে। এখনও গুনে গুনে ৮৯ টাকা লিটার প্রতি অকটেন কিনে গাড়ি চালায়।

গুলশান কেএফসি রেস্তোরা পার হওয়ার সময় আচমকা এক লোকের দিকে চোখ পড়তেই খানিকটা থমকে যায় মারুফ। লোকটা দেখতে পুরোপুরি তাদের জামাল স্যারের মতো। লম্বায় প্রায় ছয় ফিটের কাছাকাছি। ঝোলা পাঞ্জাবি পরনে। কাঁধে ব্যাগও আছে একটা। উস্কখুস্ক চুল, সাদা কালো মিলিয়ে। পায়ে একটা চপ্পল পরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু এক্টার অপেক্ষায় আছেন। দেখেই বোঝা যায় জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ভদ্রলোক। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি বোধহয় মেলেনি এই জীবনে। হয়ত ক্ষুরধার কোন জীবনাদর্শকে বিক্রি করে নিত্যনৈমিত্তিক অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চিন্তা করতে হয় আজকাল তাকে।

ভদ্রলোক দেখতে ঠিক যেন জামাল স্যারের মতো, আবারও মনে হয় মারুফের। জামাল স্যার ছিলেন মারুফদের দর্শনের শিক্ষক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেইসব দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায় তার। স্যার ভরাট গলায় ক্লাসে লেকচার দিয়ে যাচ্ছেন। ‘দর্শনের মধ্যে বাস্তব এবং লৌকিকতার স্থান যেমন পাকাপোক্ত, ঠিক তেমনই অবস্থান আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব এবং অলৌকিকতার। দর্শন দুভাবে তার অবস্থান পাকাপোক্ত করে। প্রথমত, মানুষের ভালো-মন্দ বুঝবার ক্ষমতা এবং তার ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক ভিত্তি। দ্বিতীয়ত, সেই আক্ষরিক জ্ঞানকে অভিজ্ঞতার নিরিখে যাচাই বাছাই করে নেবার ক্ষমতা। মানুষ যুগে যুগে দর্শনের নানা তত্ত্ব, ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক করেছে। কিছু মেনে নিয়েছে, কিছু মেনে নেয়নি। এই যে পৃথিবী সৃষ্টি নিয়ে নানা ধরনের সূত্রের ধারণা, তা কিন্তু দর্শন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে না। যারা মনে করেন ঈশ্বরের হাতে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি তারা একধরনের দর্শনে বিশ্বাস করেন, যা উড়িয়ে দেবার জো নেই। ঈশ্বর সম্ভবত মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় দার্শনিক ধারণা। অন্যদিকে যারা মনে করেন শূন্য থেকে বিস্ফোরণের মাধ্যমে পৃথিবীর সৃষ্টি, তারাও একধরনের দর্শনের আবির্ভাব ঘটান। দর্শন তাই একধরনের ধারণা। দর্শন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে; না মানুষ দর্শনকে নিয়ন্ত্রণ করে এ নিয়ে ভাববার বিস্তর অবকাশ আছে।’

মারুফ রোদ চশমাটা পরে নেয়। বাইরে বেশ খোলামেলা আজ। খোলামেলা শব্দটা সে কেন ব্যবহার করল বলতে পারবে না। রাস্তায় গাড়ির ভিড় কম। প্রচ- রোদে সব ঝকঝকে লাগে। প্রচ- দাবদাহ যেন কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়াগুলোর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। গুলশান একনম্বর মোড় পেরিয়ে ভাঙা-চোরা রাস্তায় ওঠে মারুফের গাড়ি। বর্ষায় ঢাকাবাসীকে এবার যাতে পানিতে নাকানি-চুবানি না খেতে হয় তাই নাকি এই অধুনা সংস্কার কাজ। গত চার মাস ধরে এই পথে যারা যাওয়া-আসা করেন তাদের মনে অব্যশ্যি তাতে কোন শান্তি আসেনি। গুলশান বনানির এই ৩-৪ কিলোমিটার পথ পার হতে লেগে যায় ঘন্টার পর ঘণ্টা। মানুষের কর্মদক্ষতা কোথায় যাচ্ছে সে কথা বাদ-ই দিলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি যা হচ্ছে সে আর বলে বোঝানোর নয়। ধুলা-ময়লা গরমে অতিষ্ঠ শিশুগুলোর মুখের দিকে তাকানো যায় না। পাশেই আবার বিশাল বিশাল করপোরেট অট্টালিকা, কেমন যেন উপহাসের হাসি হাসতে থাকে সবার দিকে হেলায় তাকিয়ে প্রায়ই মনে হয় মারুফের। মোড়ের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট পোলে টাঙানো লেখা ‘ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা’। ওই পোলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। তার এক চোখ আর বুকের একটা পাশ ঝলসে গেছে বহু বছর হবে। আগে খালি গায়েই ঘুরে ফিরে ভিক্ষা করত মেয়েটি, ইদানীং দেখা যাচ্ছে একটা গ্রামীন চেকের গামছা ঝুলিয়ে নেয়, গলা থেকে বুক হয়ে নীচে নেমে আসে। বোধহয় আব্রু রক্ষা করে, কিংবা গরম নিশ্চিত হতে পারে না কেউ-ই।

মেয়েটির চোখে-মুখেও রাজ্যের বিতৃষ্ণা। প্রতিটি মানুষকেই  তার ইবলিশ শয়তান মনে হয়। প্রতিটি অস্তিত্বই হয়ত তার কাছে ভোগবাদী বিমূর্ত আলাপ মাত্র। তাই তাতানো দুপুরে ‘ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা’ পোলে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো তার অবয়বটিকে মারুফের মনে হতে থাকে অন্য কোন পৃথিবীর দৃশ্য। মেয়েটির অবশিষ্ট চোখের দৃষ্টিতে কোন ইঙ্গিত নেই। না ভালোবাসা, না বেঁচে থাকবার আকুতি, না কোন অনিশ্চিত মৃত্যু ভয়।

‘দর্শন যদিও মানুষকে জীবনধারণের একটি মৌলিক ধারণা দেয়; জানান দেয় জীবন একটি প্রবহমান নদীর মতো, তবু দর্শনেরও কোন আক্ষরিক সংজ্ঞা নেই। দর্শনের সাথে জ্ঞানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমার কাছে মনে হয় দর্শন হচ্ছে জ্ঞানের প্রতি জেগে থাকা তৃষ্ণা। এই তৃষ্ণা কখনও পুরোপুরি মেটে না, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। জ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতোই দর্শনেরও কিন্তু গাণিতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। দর্শনের মূলপাঠ শুরু হয় প্রাচীন গ্রীসে, এ বিষয়টি আমরা সকলেই জানি। ঠিক ওই সময়টাতে গ্রীসে গণিতের চর্চাও ছিল প্রাসঙ্গিক। যুক্তিবিদ্যা তাই দর্শনকে এগিয়ে নিয়েছে সবসময়। অনেক প্রখ্যাত দার্শনিক যুক্তিবিদ্যার চাইতে দর্শনে নন্দনতত্বের অবস্থানকে প্রাসঙ্গিক করেছেন বহুগুণে। নান্দনিকতা দর্শনকে সমৃদ্ধ করেছে যুগে যুগে। দার্শনিকরা তাই সৌন্দর্যপিয়াসী। সৌন্দর্যের সংজ্ঞাও একেকজনের কাছে একেকরকম।’ জামাল স্যারের কথাগুলো মারুফের কানে বাজতে থাকে। স্যার হাসতে হাসতে বলতেন, ‘সৌন্দর্যের সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেকরকম বলেই আমার মতো লোকগুলোরও বিয়ে-শাদি-প্রেম-ভালোবাসা হয়! সবার সৌন্দর্যের সংজ্ঞা যদি অভিন্ন হতো তবে পৃথিবীর সকল নারী-ই একই পুরুষকে চাইতেন তাদের জীবনে, ঠিক একইরকম অভিন্ন চাওয়া হতো সকল পুরুষেরও। পৃথিবীর তাবৎ কবি-ই তখন কবিতা লিখতেন একটি ফুলকে নিয়েই!’ মারুফ ভাবে স্যারের কথা ঠিক হতে পারে। আবার স্যারের নিজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী-ই তার কথা ঠিক নাও হতে পারে। দর্শনশাস্ত্র শ্বাশত নয়, এর পরিবর্তন ঘটে পারিপার্শ্বিকতার বিচারে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সামনে একটা বড় গর্তে গাড়ির চাকা পড়লে অজান্তেই উফ করে ককিয়েওঠে মারুফ। প্রতিদিন এই পথে যাতায়াত করতে করতে তার গাড়ির বারটা বেজে যাচ্ছে, সাথে নিজের শরীরেরও। গতমাসেই ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিল এপোলো হাসপাতালে। সবকিছু পরীক্ষা করে ডাক্তার বলেছেন, মেরুদণ্ডের অবস্থা বিশেষ সুবিধার নয়। সাবধানে চলাফেরা করতে, রিকশায় না চড়তে। বেশিক্ষণ একই অবস্থায় না থাকতে। মানে কিছুক্ষণ বসে থাকলে তারপর একটু হেঁটে আসতে হবে, কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলে আবার উঠে বসতে হবে কিছুক্ষণের জন্য। মেরুদ- বাঁকা করে উপুড় হয়ে মাটি থেকে কিছু তোলা যাবে না, ভারী জিনিস বহন করা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এই অল্প বয়সেই এত বিধি-নিষেধ ভালো লাগে না মারুফের। কিন্তু কোমরটা বেশ ভোগাচ্ছে। গর্তে সামনের চাকাটা পড়তেই সেটা বেশ ভালোই টের পেল আরেকবার। গর্তে চাকাটা পড়ার আসলে তেমন কোন কারণ ছিল না। এই ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়েও সে মোটামুটি সোজাই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল গাড়িটা। কিন্তু এক নচ্ছার মোটর সাইকেল চালকের যন্ত্রণায় কিছুতেই ঠিক মতো গাড়ি চালানো যাচ্ছিল না। এমনিতেও রাস্তাটা সরু, তার উপর আবার বামের লেনের ডানের অংশ প্রায় পুরোটাই কাটা। দুটো গাড়ি গায়ে-গা লাগিয়ে চলছে কোনমতে। এর মধ্যে কোত্থেকে এসে এই ভদ্রলোক তার বাম পাশ দিয়ে বারংবার বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন যদিও যাবার কোনো জায়গা-ই নেই! কয়েকবার ফুটপাথ দিয়েও উঠে চলে যাবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ফুটপাথ জুড়ে বসেছে চায়ের দোকান। অবৈধ, অবৈধে জান জেরবার। এর মধ্যে একবার ভুল দিক দিয়ে ওভারটেক করতে গিয়ে তার গাড়ির বাম দিকের আয়নায় হালকা ঘষাও দিয়েছেন তিনি। জানালার কাঁচ নামিয়ে তাকে কড়া গলায় সতর্ক করতে গিয়ে খানিকটা গালিও শুনল মারুফ। সেই লোক উল্টো তার হেলমেট নামিয়ে সরকারকে রাস্তা কাটার জন্য দু-প্রস্থ গালাগাল করতে করতে মারুফকেও বলেছে সে নাকি ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারে না। এই আকাট-মূর্খ লোকের নির্বুদ্ধিতায়, গ্রীষ্মের তাপদাহে এবং ধুলোর অত্যাচারে গাড়ির জানালা তুলে দিয়ে এবার নির্বিঘেœ, নীরবে দুটো গালি দেয় মারুফও। গালিটা ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে দেয় জানে না সে, কিন্তু দেয়। দিয়ে বড্ড আরাম লাগে। ভালো লাগে। বাইরে তাতানো রোদ হলেও বৈশাখের চির চেনা রূপকে বাস্তবতায় টানিয়ে দিয়ে ঈশান কোণে হালকা মেঘ করেছে। এই মেঘে বৃষ্টি নামতেও পারে, নাও নামতে পারে। বৃষ্টি এখানে না নামলেও কোথাও না কোথাও তো নামেই। ঈশান কোণের মেঘের দূরত্ব কখনওই ঠিক-ঠাক ঠাহর করা যায় না। মনে হয় এই কাছেই, কিন্তু আসলে হয়ত শত মাইল দূরে কোথাও। সিডিটা মিউট করে দেয় মারুফ, বাইরে আযান দিচ্ছে। আযান দেবার সময়টায় নিজেকে বড্ড পাপী মনে হয় তার। অপরাধ জাগে, জীবনের বড় বড় অপ্রাপ্তিগুলো অপরাধ হিসেবে জানান দিতে থাকে হৃদয়ের কোন গহিন কোণে। যাস-শালা বড্ড দর্শন হয়ে যাচ্ছে আজ! গুলশান দুই নাম্বার মোড়ে পৌঁছে নিজের মনেই আউড়ে ওঠে মারুফ। এই মোড়টা বেশ জটিল। চার রাস্তার মোড় হওয়াতে এমনিতেও এখানে হালকা জ্যাম লেগেই থাকে সবসময়, তার ওপর আবার ডানে যাবে যে গাড়িগুলো সেগুলো বামে আর বামে কিংবা সোজা যাবার গাড়িগুলো ডানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে ত্রিশ সেকেন্ডের সবুজ সিগনাল যখন পড়ে, তখন একটা হিজিবিজি লেগে যায়, সিগনালটা হয়ে যায় প্রয়োজনের তুলনায় ঢের কম। মারুফের ইচ্ছে ছিল ডানে মোড় নিয়ে প্রগতি স্মরণী দিয়ে এয়ারপোর্ট হয়ে সোজা চলে যাবে উত্তরা। কিন্তু যেমনটা আশংকা করছিল, একটি মেরুন রঙের কার, বোধহয় এলিয়ন, ডানের লেনে বসে ইমারজেন্সি সংকেত দিয়ে বসে আছে। তার মানে সে যাবে সোজা। এ এক বড় আজিব শহর ঢাকা, যেখানে সোজা পথে যাবার সময় ড্রাইভাররা সব ইমারজেন্সি সংকেত দিয়ে বসে থাকে। কেন রে বাবা! তুই ডানে গেলে ডানের সংকেত আর বামে গেলে দিবি বামের সংকেত, যে কোন সংকেত দেবে না সে যাবে এক্কেবারে সোজা, এটা বোঝা কী এতই কঠিন! মারুফ ঝুকে পড়ে মেরুন এলিয়নের ড্রাইভারকে দেখার চেষ্টা করে। চোখে সানগ্লাস, কালো শার্ট পরা এক দারুণ সুন্দরী তরুণী চালাচ্ছে গাড়িটা। মারুফের মনটা একটু উদাস হয়। ঢাকায় সে একাই থাকে। বয়সটা বেশ বেড়ে গেলেও এখনও বিয়ে-শাদি করা হয়ে ওঠেনি তার। যদিও তার বন্ধু-বান্ধবীরা প্রায় সবাই ইতিমধ্যে বাবা-মা হয়ে সংসার-ধর্ম করে বেশ থিতু হয়ে গেছে। আবারও জামাল স্যারের কথা মনে পড়ে মারুফের। স্যার ক্লাসের এ-মাথা থেকে ও-মাথাপায়চারি করছেন আর তার ভরাট গলায় বলছেন, ‘অস্তিত্ববাদ হচ্ছে সেই দর্শন যা ব্যক্তিসত্তায় নিহিত। ব্যক্তিসত্তাই অগ্রগামী নতুবা সার্বিকসত্তা মুক্তচিন্তাকে ব্যহত করে। ফ্রিডরিখ নীটশে, জঁ-পল সার্ত, মার্টিন হাইডেগারের মতো অস্তিত্ববাদী দার্শনিকেরা নান্দনিক বিষয়কে জীবনে প্রাধান্য দেন। আমাকে যদি বলতে বলো আমার বিশ্বাস কী, তবে আমি বলব প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ঈশ্বর লুকিয়ে আছেন। ঈশ্বর মানুষের মধ্যে রুহ দিয়ে তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। রুহ শুধুমাত্র মানুষকে জীবিত করেনি বরঞ্চ দিয়েছে সেই সক্ষমতা যার মাধ্যমে মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, বেছে নিতে পারে ভালোমন্দের দিকনির্দেশনা আর ব্যক্তিবিশেষে দায়বদ্ধতার সীমাপরিসীমা। প্রতিটি মানুষই তার জীবনদর্শন, জীবনকে কাছ থেকে দেখবার অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস এবং দৃষ্টিগ্রাহ্য অবস্থানের ভিত্তিতে অস্তিত্ববাদের সংজ্ঞা নিরূপণ করে। তাই অস্তিত্ববাদের পূজারি হয় সেইসব মানুষ যাদের দর্শন তাদেরকে জীবনে এমনভাবে পরিচালিত হতে সাহায্য করে যে জগতে আইন-আদালত, নিয়ম-নীতি এবং পর¤পরার গ্রহণযোগ্যতা সীমিত। এই দর্শনে বিশ্বাসী মানুষেরা দীর্ঘদিনের সাধনায় তুলে দিতে পারেন নিজেদের চারপাশে একটি কাঁচের দেয়াল এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তাদের পারিপার্শ্বিকতাকে। তারা কী দেখবেন, কী ভাববেন, তাদের চিন্তা এবং বিশ্বাস কীভাবে সংক্রমিত হবে অন্যের অবস্থান নির্ধারণে সেটা নির্ভর করবে চেতনার কোন স্তরে পৌঁছে গেছেন তিনি। সকল মানুষই যে সচেতনভাবে চেতনার উঁচুস্তরে বিচরণ করবেন এমনটি নয়, অনেকে অবচেতন মনেই তাদের জীবনদর্শনে অস্তিত্ববাদকে এমন স্থান দেবে যে নিজের অজান্তেই তিনি পারবেন তার সামষ্টিক অবস্থানকে নিয়ন্ত্রণ করতে।’ যা ভেবেছিল মারুফ, সিগনালের সবুজ বাতি তার যাত্রাপথকে বিন্দুমাত্র সহজ করে দিতে পারে না। সুন্দরী তরুণী ডানের সারি থেকে যতই সোজা যেতে চাক না কেন, মাঝের অন্যসব প্রাইভেট কার এবং সব থেকে বামের সারির যাত্রীবাহী বাসগুলো যখন মাঝসমুদ্রে তীব্র বাঁক নেয়া স্রোতের মতো প্রায় ভেসে যেতে থাকে, তখন তার গাড়ির গতি হয়ে যায় শম্বুক, দিক নির্ণয়ে হয় বিভ্রান্ত। মারুফের মেজাজ খারাপ হতে থাকে, যদিও সে প্রস্তুত ছিল এ ঘটনার জন্য, তবু তার ক্লান্ত লাগে। মনে হয় এ ঘটনার জন্য হয়ত সেই দায়ী! এই যে বাসা থেকে বের হবার সময় তার গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছিল না, তখন যে সে মেজাজ খারাপ করল, তারই ধারাবাহিকতায় কী একের পর এক বিরক্তিকর ঘটনার উদ্রেক হচ্ছে? ভাবতে থাকে মারুফ। এদিকে সিগনালে সবুজ বাতি নিভে আবার লাল বাতি জ্বলে ওঠে। এবার পাশাপাশি একদম প্রথম সারিতে অপেক্ষা করতে থাকে মারুফ এবং তরুণীর গাড়ি।

দিশার মন ভালোই ছিল আজ সারাটা দিন। অনেকদিন পর আজ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে। বাসার ছাদে গিয়ে সূর্যোদয় দেখেছে। এই গরমের দিনেও যে একদম ভোরবেলায় এতো স্নিগ্ধ একটা মায়াবী পরিবেশ থাকে তা বোধহয় এতদিনে ভুলতেই বসেছিল সে। তাদের বাসার সামনেই একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ, এই ছয়তলা বাড়ির ছাদে উঠেও তার মাথা ছুঁতে পারে না দিশার মন। ঢাকার ইট-পাথরের এই কৃত্রিম নগর গুলশানে এখনও প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশেপাশে বড়সড় কিছু গাছ দেখতে পাওয়া যায়। এর কিছু কিছু নিতান্তই ধুঁকতে ধুঁকতে বেঁচে রয়েছে কোনমতে ফুটপাথের মেঝেতে শেকড় গেঁথে, অন্যেরা সৌভাগ্যবান হয়ে পেয়েছে রাস্তার পাশের একটুকরো জমিতে খানিকটা মাথা গোঁজার ঠাই। অনেকদিন ধরেই উত্তরার খালার বাসায় যাওয়া হয় না দিশার। খালা প্রায়ই বলেন, আজও ফোন করেছিলেন, অথচ আজও যাওয়া হবে না। বিকেলে ইউনিমার্টে কলেজের বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেবে ঠিক করেছে ওরা, বিকেলের দিকে ওদিকটায় যাবে বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিশা। বাবা-মা বহুদিন ধরেই আমেরিকায় থাকেন। ওরও যাওয়া প্রায় ফাইনাল, তার আগ পর্যন্ত গুলশানের এই বাসাটায় একাই থাকছে দিশা। একটা বিদেশি দূতাবাসে কাজ করে, নিজেই গাড়ি চালায়, ভালোই আছি, ভাবে দিশা! নিজেকে ছুটির দিনে আর সাজগোজের ঝামেলায় ফেলতে ইচ্ছে করে না তার। বিকেল হতেই আলস্য কাটিয়ে একটা জিন্স আর কালো শার্ট পড়ে নিচে নেমে আসে দিশা। তার বহু শখের কেনা পুরনো এলিয়ন গাড়িটায় স্টার্ট দেয়। ইঞ্জিনটা বেশ শব্দ করে নিজের বেঁচে থাকবার খবরটা জানান দিতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে দিশা। পুরনো গাড়ি তার, প্রায়ই নানারকম সমস্যা করে, তবে আজ একবারেই স্টার্ট নেয়ায় মনে হলো নাহ দিনটা আজ ভালোই যাবে বোধহয়। গুলশান দুই নম্বর মোড়ে এসে অহেতুক একটা জ্যামে পড়ে মেজাজটা কিঞ্চিত খারাপ হয় দিশার। এইখানে জ্যাম হবার কোন কারণ নেই, তারপর আবার শনিবারের বিকেল। আশেপাশের বাস-ট্রাকগুলো যেন হর্ন বাজিয়ে মাথা নষ্ট করে ফেলবে তার! ড্রাইভার মেয়ে হলেই হয়েছে, এই শহরের নির্লজ্জ পুরুষেরা নানারকম সমস্যার পসরা সাজিয়ে বসে। অহেতুকই তাকে ডানে চাপিয়ে দিয়েছে একটি প্রাইভেট কার। ভেতর থেকে আবার মাঝে মাঝেই উঁকি দিচ্ছে ড্রাইভার। ভাব-সাব দেখে মনে হয় গাড়ির মালিকই লোকটা। অসভ্য, ওইদিকে তাকিয়ে আনমনে বলে দিশা। সিগনাল ছাড়তেই ভজঘট বাঁধিয়ে ফেলে। সোজা বেরিয়ে যাওয়া আর হয় না তার। দ্বিতীয় সিগনালে যখন বেরিয়ে যাবে ভাবছিল, তখন পাশের গাড়িটা এতটাই বিপজ্জনকভাবে তাকে চাপিয়ে দিয়ে ডান দিকে চলে গেল যে আর সোজা যাবার সাহস পায় না দিশা, সেও ডানে মোড় নেয় আর ভাবে এই পথ দিয়ে সোজা একটানে চলে যেতে পারে তার খালার বাসায়, যে বাসায় বহুদিন যাই যাই করেও যাওয়া হচ্ছে না তার!

 

দুই

শনিবারে কোন ক্লাস নেই জামাল সাহেবের। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন যদিও বেশ কবছর হলো, তাকে এমিরেটাস প্রফেসার পদমর্যাদায় নিয়োগ দিয়েছে সিনেট, এমন মেধাবী মানুষের সেবা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বঞ্চিত করতে চাননি তারা। শনিবার বিকেলে পদ্মার পাড়ে বেশ কিছুটা সময় কাটান জামাল সাহেব। এটা তার প্রায় ত্রিশ বছরের পুরনো অভ্যাস। চোখের সামনে দিয়েই দেখেছেন প্রমত্তা পদ্মা তার চিরায়ত রূপ হারিয়ে শান্ত নদীতে স্থিত হয়েছে, ধুধু বালু কেড়ে নিয়েছে উত্তাল ঢেউয়ের জায়গা। জামাল সাহেব অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক। ছাত্ররা তাকে ভালোবাসে। সময়ের সাথে সাথে তার ছাত্ররা জেনে যায় যে স্যার প্রতি শনিবার বিকেলে পদ্মার পাড়ে হাঁটতে যান। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে সেখানেই আরও বেশ কিছুটা সময় কাটান একাকী বসে। এই সময়টাতে প্রথমে কিছুক্ষণ তেমন কথা বলেন না তিনি, তবে মুহূর্তগুলো যখন প্রকৃতি থেকে তাঁকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করতে থাকে সন্ধ্যার অবগাহনে, তখন তিনি ধীরে ধীরে কথা বলতে বলতে শুরু করেন। ক্লাসে যে রাশভারী জামাল স্যার, সবার বন্ধু হয়ে ওঠেন তিনি এই সময়টায়। ‘অস্তিত্ববাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে মনোজাগতিক প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাময় অথচ অপার দুয়ার। অস্তিত্ববাদে বিশ্বাসী দার্শনিকেরা মনে করেন মানব জীবন কোনভাবেই পরিপূর্ণ এবং সম্পূর্ণভাবে সুখকর নয় কেননা এ জীবন ছেয়ে যায় নানা দুঃখ, বিরহে। মানুষের সমগ্র জীবনে থাকে সন্তোষ, ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণের অভাব যা তাকে ব্যথিত, দুঃখী এবং অসফল ভাবতে বাধ্য করে। যদিও জীবন শুধুই ফুলের বিছানা নয়, তবে এর যে একটি স্বতন্ত্র অর্থ আছে তাও স্বীকার করে নিয়েছি আমরা দর্শনতত্ত্বে। তাই তো অস্তিত্ববাদের মধ্য দিয়ে আমরা খুঁজে চলি জীবনের প্রকৃত অর্থ এবং বেঁচে থাকবার জন্য একটি নিজস্ব জগত।’

জালাল স্যার ছাত্রদের দিকে তাকান। এদের চোখে-মুখে তিনি জ্ঞানের পিপাসা দেখতে পান, তার ভালো লাগে। তবে তিনি এও বোঝেন এরা সবাই তার ছাত্র নন। কেউ কেউ ছাত্র, কেউবা তাদের বন্ধু, কেউবা বিকেলে আড্ডায় এসে জমে গেছেন, আবার কেউ কেউ অবিশ্বাসী, সতর্ক। ছাত্রদের মাঝে একজন হাত তুলে তাঁকে প্রশ্ন করতে চায়, তিনি মাথা নেড়ে সায় দেন। ‘স্যার, আপনি বলছেন অস্তিত্ববাদ ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং সমাজ-সংসার, অন্যের বিশ্বাস, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিধিনিষেধ সেই দর্শনকে ক্ষতিগ্রস্ত, এমনকি ধ্বংস করে দিতে পারে। এইসব নিয়ম কানুন ব্যক্তিকে অবস্থানবিশেষে আসলে বস্তুতে পরিণত করে। তাহলে যেসব ব্যক্তি অস্তিত্ববাদে বিশ্বাসী, কিংবা নিজের অজান্তেই অস্তিত্ববাদের ধর্ম পালন করে তারা বৃহত্তর শক্তিতে কীভাবে পরিণত হতে পারে?’

– ছেলেটি প্রশ্ন শেষ করে বসে পড়ে আগের জায়গায়।

‘এ বিষয়ে কোন পরিষ্কার দিক-নির্দেশনা কিন্তু দর্শনের বইগুলোতে পাওয়া যাবে না। তবে অনেক সাংবাদিক এবং দার্শনিক তাদের জীবনভর করা গবেষণায় দেখিয়েছেন যে অনেকক্ষেত্রেই একজন খাঁটি অস্তিত্ববাদের পূজারি তার চেতনায় কিংবা অবচেতনে অন্যকে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন ধরো, কোন একজন ব্যক্তি যদি দীর্ঘদিন ধরে হতাশায় ভোগে তবে সে তার কাছের কিংবা আশপাশের মানুষকেও হতাশাগ্রস্ত করে ফেলে। আমরা মাঝে মাঝেই দেখি কোন এক বিশেষ কারণে কোন একটি স্কুলের অসংখ্য শিক্ষার্থী একযোগে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এমনও দেখা গেছে কোন কোন বিশেষ অঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষ খুবই নিকটবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে আত্মহত্যা করতে থাকে।

‘আবার খুব ছোট আঙ্গিকে এর ব্যপক প্রভাব প্রতিফলিত হতে পারে। যেমন কোন কারণে যদি তোমার মন খারাপ হয়, এবং তুমি চেতনার ওই বিশেষ স্তরে পৌঁছে যেতে পার যেখানে তুমি অন্যের মনকেও প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখ, তবে দেখবে তোমার আশেপাশের মানুষেরও মন খারাপ হচ্ছে। আবার উল্টো দিকে তোমার মন যখন ভালো থাকবে তখন তোমার আশেপাশের মানুষেরও মন ভালো থাকবে। এভাবে একটি পুরো সমাজ কিংবা গোত্র একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে, জেনে কিংবা না জেনে।’ জামাল সাহেব বলতে থাকেন, ‘মানুষের মন অত্যন্ত বিচিত্র সাথে সাথে বেঁচে থাকবার দর্শনও, এ দর্শন সবার বোধগম্য হয় না।’

 

তিন

জামাল সাহেব যখন তার ছাত্রদের সাথে দর্শন নিয়ে আলাপ করছিলেন পদ্মা পাড়ে বসে, তখন ঢাকার আকাশেও সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। মারুফ উত্তরার কাছাকাছি, এয়ারপোর্ট রোডের কোন একটা জায়গায় রাস্তার পাশে গাড়িতে জরুরি সংকেত জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কারও সাহায্যের অপেক্ষায়। কিছুক্ষণ আগেই তার গাড়ির টায়ার পাংচার হয়েছে। গাড়িতে আজকে স্পেয়ার চাকাও নেই। সকাল থেকে হতাশ হতে হতে মারুফ এখন হতাশ হওয়া ছেড়ে দিয়েছে, খানিকটা নির্ভারও বোধহয় লাগছে নিজেকে ভাগ্যের কাছে সমর্পণ করে। মেজাজ আর খারাপ করবে না ঠিক করে সিডিতে প্রিয় একটা বাংলা গান ছেড়ে দেয় মারুফ। কানে বাজে জগজিৎ সিংয়ের সুমধুর কন্ঠস্বর, বেদনা মধুর হয়ে যায়, তুমি যদি দাও। সন্ধ্যার এই সময়টায় হঠাৎই সব ভালো লাগা শুরু করে তার। এয়ারপোর্ট রোডে তেমন জ্যাম নেই, ঝকঝকে পরিষ্কার লাগছে সবকিছু। আকাশে সিঁদুর রঙ ভালোবাসা জানিয়ে আস্তে আস্তে রাতকে নিমন্ত্রণ জানায়। বন্ধুর প্রতীক্ষায় গাড়িতে হেলান দিয়ে বসে সাঁ সাঁ করে চলমান গাড়িগুলোর দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকে মারুফ আর কানে আসতে থাকে অদ্ভুত এক মন্ত্রধ্বনি যেন জগজিতের গান আর জামাল স্যারের লেকচারের মিশ্রণে মনে হয় অন্য এক ভুবনে সময় পরিভ্রমণ করে সে। দক্ষিণ দিক থেকে একটা গাড়ি গতি কমিয়ে মারুফের গাড়ির দিকে আসতে থাকে। অন্ধকারে গাড়ির রং পরিষ্কার বোঝা যায় না কিন্তু মারুফ নিশ্চিত জানে গাড়িটি মেরুন রঙের একটি এলিয়ন আর ভেতরে বসে যে গাড়ি চালাচ্ছে তার পরনে জিনস আর কালো রঙের একটা শার্ট, শার্টের ওপরের বোতাম খোলা, তরুণীটিকে কিছুক্ষণ আগেই গুলশান দুই নাম্বার মোড়ে দেখে এসেছে মারুফ। মারুফ হঠাতই বুঝতে পারে চারপাশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে সে…অজান্তেই…