সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

সমাধি বিরচিত – পিয়াস মজিদ

September 20th, 2016 11:50 pm
সমাধি বিরচিত – পিয়াস মজিদ

গল্প

সমাধি বিরচিত

পিয়াস মজিদ

 

স্বপ্ন আর বাস্তবের দ্বন্দ্বে ভুলেছিলাম ফাল্গুনও এক বাস্তব যেমন স্বপ্নও আরেক পরম বাস্তব কিন্তু বেঁচে থাকতে গিয়ে দেখলাম মানুষ মূলত অদ্ভুত; শুধু পক্ষ খোঁজে। কাউকে জয়টিকা দেয় সে অপর কাউকে পর্যুদস্তের বাসনায়। আমি এর মাঝামাঝি একটা পথ চাইছিলাম- ছায়া আর রৌদ্রের সমান সম্পাত। একথা বলাও অবশ্য বিপজ্জনক, তাহলে সুবিধাবাদীর কাতারবন্দি হবার আশঙ্কা থাকে তবু আমার মাথায় গোঁয়ার ষাঁড়ের শিং বসানো। আমি নিজেকে সেই লোক মনে করি যে মনে মনে তার শত্রুকেও সমর্থন করে এবং কিছুটা হোর্হে লুই বোর্হেসের মতো যে আত্মঅবমাননাজনক অবস্থান গ্রহণে গোপন ব্যাভিচারের আনন্দ পায়। আমার বন্ধুদের বিস্ময় কী করে আমি এত সুস্থ স্বাভাবিক আমার পরিবার-স্বজনের দুঃখে আমি ছেলেটা কেমন পাগলধারা!

কী করব বলুন?

তারাপ্রবাহে ভাসতে গেলে দেখি দশদিক থেকে আমাকে অন্ধবালারা ডাকছে হঠাৎ আলোর ঝলকানির চেয়ে এরা হাজারগুণ প্রলুব্ধকর আমি তাই-

ঝু

লে

থাকি

ত্রিশঙ্কু, না অন্ধকার। না আলো। ঝুলে থাকি শুধু। ইন্দ্রিয়ে সাড়া দিতে না দিতে বুঝতে পারি ইন্দ্রিয়াতীত অনুভবের দিব্যদরোজা খোলা। নিঃশরীর সুখসুন্দরতা মৌহূর্তিক রতির রাক্ষসকে দুয়ো দেয় তারপর সীতাভাগ্য আমাকে পাতালে ছুঁড়ে ফেলে। আমি ব্যক্তিগত সুড়ঙ্গবলে যাত্রা করি সমুদ্রধমনীতে; জলের প্রাতিরক্ষায় অতিষ্ঠ হলে আমাকে বাহু বাড়িয়ে নেয় চাঁদনিসদন। রূপসী তামসে জ্বলেপুড়ে যাই নীলিমার গুহায়। গুহা থেকে টিলায়। না। স্বপ্নের মিনার সহ্য হয় না। মেঘমদ উপেক্ষা করে কিছুদিন ময়ূরের বেশ নিই। মানুষ থাকতে জয় গোস্বামীতে পড়েছিলাম বয়সকালে ময়ূর দেখে তিনি নাকি সমলিঙ্গ প্রেম অনুভব করেছিলেন। আমি হঠাৎ ভয় পেয়ে পেখমপরিধি ছিন্ন করি।

কিন্তু হায়! এই স্মৃতিপ্রসূ মন কেমনে ছিঁড়ি?

স্মৃতি আসলে জটিলতা

স্মৃতি মানে জড়িবুটি

স্মৃতি মানে গোধূলিসন্ধি

স্মৃতি মানে সোনালি সংগোপন

স্মৃতি মানে পেনাল কলোনি

স্মৃতি মানে বহ্নিজল

আর আমি স্মৃতি খুন করে সেই স্মৃতির কাঁচা কবরেই রেখে আসি আমার ঘুমন্ত নৃত্যকলা; যার রেশমি ক্রন্দনে, যার সলমা-জরির কাজে, যার মরণঝংকারে সারারাত এক ফোঁটা ঘুমুতে পারি না। আমি চাই হৃদয়কে কঙ্কাল করতে কিন্তু হৃদয় আমার রক্তের চুপচাপ তানগুলোকে ধাবিত করে সুরের শীর্ষে। খানখান হয়ে আমি তাই জায়মান। অজ্ঞাত কোনো খয়েরি অভিশাপ আমার তন্ত্রীসমূহে যেন সদা-সন্দ্যমান। আমার বাড়ির পিছের নিরালা নদীতে রোজ রাতে রুপালি লাশবাহী লালকালো শত শত খেয়া ভেসে চলে। এমন নিরুদ্দেশনিয়তিই আমার বিবর বাসনা; যখন আমার জন্য বরাদ্দ ঘুমহীন রাত ও অনন্ত নেব্রিয়াম। কখনও সখনও পালাবার চেষ্টাও করি। যাই জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে; তারা হাতে সমাধান ধরিয়ে দেয়। জানে না বোধহয় পরিত্রাণ আমার সয় না। মুহুর্মুহু ডাকে রসাতল। সবার তো যাবতীয় যা কিছু পুরনো হয় নতুনের সম্মোহে কেবল আমার ত্রিশঙ্কুতে মরচে পড়ে না।

ঝু

লে

থাকি

মাঝেমধ্যে ক্ষুধাও তো পায়, পিপাসাও কম না। চোখ বুঁজে কাজ করি। পরক্ষণে ভাবি এমন বিরল মনুষ্যজন্ম গাধা খেটে বিফল হবে! সঙ্গে সঙ্গে সিলভিয়া প্যাথকে বন্ধু পাই। প্যাথের সাথে ঠোঁট মিলিয়ে বলি Dzing is an Art. তবে কারা যেন কানে কানে বলে যায় ‘আত্মহত্যার অধিকার থাকে না সবার’।

হায় চিল,

ফিরোজা চিল!

বলো তবে কোথা যাই? আমি পরাহত যত মেঘলা স্বপ্নের রক্তকরোজ্জ্বল; দেখি পাতালদিগন্তব্যাপী তোমার ক্ষুধিত নাচমহল। তার দুয়ারে জগতের যত সেতার মাথা কুটে মরে।

এই আমার সংকট,

ইত্যাকার সিম্ফনিই আমার সর্বনাশ।

রোগটা শৈশববাহিত। কালো মেঘের বিদ্যুৎ তাড়া করে ফিরছে মূলত তখন থেকে। শম্পারেখা অতিক্রমের ক্ষমতা আমার নেই, তাই জাল স্বপ্ন ও স্বপ্নের জালে ধরা পড়েই কৈশোর-যৌবন অতিবাহন।

বলছিলাম অভিশাপের কথা। শাপগ্রস্ত বলে আমার রোদনেরাও বসন্তভরা, রাগপ্রধান ফলে কারও দায় পড়ে নি আমায় পার করার, উপায় করার। কবিতাকে একবার ভাবলাম সহায়, ভগ্নিপ্রতিম। পরক্ষণেই বোঝা গেল কবিতা তো সেই অজ্ঞেয় কাকলি যা আমার নিজস্ব নির্জনকে তছনছ করে আর কবিতায় তো হয় না আমার প্রকৃত প্রকাশ। আমাকে বর্ণনা করতে গেলে ভাষা শুধু তার সীমা প্রকাশ করে। ভাষাও তো চক্রান্তময়, ফাঁদবহুল ফলে আমি ধন্দজর্জর। ভাষার চোরাপথ পেরিয়ে তাই অন্যতর পথসন্ধানী।

সামনে কেউ নেই

ধু

ধু

রাত্রি পড়ে আছে

রাত্রির কালো নৈবেদ্যে রঞ্জিত আমি ভাবি রূপকথা নিশ্চয়ই নিরাশ্রয় করবে না। সবুজ গোলাপের কাঁটায় গেঁথে অতঃপর প্রবজ্যা খঞ্জনা পাখির কোলে।

পাঁচ পাশে-

কত ব্যঙ্গমা ব্যঙ্গমী

কত কোটালপুত্র

কত রাঙা রাজকন্যা

দুপুরের ঢেউ আমাকে রূপকথার কানাগলি থেকে টেনেহিচঁড়ে দাঁড় করায় অনুর পাঠশালার মাঝখানে। সরুপিসি, ঝিল্লিরব, লামাদের জঙ্গলে লীন হতে না হতে মাল্যবান আমার হাতে স্যানাটোরিয়ামের নকশা ধরিয়ে দেয়। সেই স্যানাটোরিয়ামে রাঁচি, হেমায়েতপুর সবার জায়গা হয় কিন্তু আমার হয় না। কেননা আমার তীর্থ তো বিনোদিনী কুঠি। সবাই যখন গোলায় ফসল তোলে তখন আমি অপেক্ষায় থাকি, সুপর্ণা শীতকালের জন্য নয়, মারবেল ফলের মওসুমের তরে। তোমাদের সুতীর্থে তো মারবেল ফলের ঠাঁই নেই শুধু সুসমাচারের বিস্তার যদিও নাস্তির নেমির মধ্যে জীবন-

প্রতিরাত

প্রতিদিন

হায়! শোভাকুসুমে ভরা তোমাদের মালঞ্চে আমি খোঁপায় ফুল-পরিহিত একটি মেয়েও দেখলাম না। যা ছিল তা ফুল নয়, রাশি রাশি ফুলের ছল। ফুল থেকে রক্তরঞ্জিত তৈলগন্ধ ভেসে আসছিল দিগ্বিদিক। আমার শতকের নাকি এমত বিধান-কদাচিৎ তারানা যদি ঝরেও পড়ে তা পড়ে গন্ডারের গলা থেকে। যেহেতু সমস্ত সারগাম আমরা বিসর্জন দিয়ে এসেছি শৌচাগারে। দক্ষিণের বারান্দায় দাঁড়ালে তরুরাজিতে দেখা যায় শাখাভরা মরুভূমি।

এই তবে সেই অপুষ্পক উদ্ভিদের যুগ!

আমি মরুভূমিতে নাও ভাসাই। সাত সাগরের ফেনায় ফেনায় মিশে ভেসে যেতে চাই দূরদেশে, অনুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়। এই কাননে মরুভূমিই অশেষ, অফুরান বাজারপৃথিবীতে সমুদ্রকল্লোল পর্যন্ত অবিক্রিত নয় আমি জগতের মূল্যবান ক্রেতাগুণরিক্ত;

কোথায় পাব তারে

বেঁচে থাকার নন্দনকে?

আছে আছে প্রেম ধুলোয় ধুলোয়। আছে ব্যথার অন্দরমহলে; যেমন হেরম্ব বাঁচে আনন্দের মৃত্যুকুসুমটিলায়। জলসাঘরে ভেঙে চুরমার বেলোয়ারি ঝাড়। সমস্ত সিডারবৃক্ষ পতিত হইয়াছে ভয়াবহ ঘূর্ণিতে; তাহা নতুন করিয়া রোপণ করিবে কে? যে করিবে সে আমি না। আমি তো আছি সুপ্রিয় স্বখাত সলিলে।

পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া

নাও কুড়িয়ে টুটাফাটা আমাকে

যে যেভাবে পারো

বেঁচে থাকা ফুরিয়ে এলেও শিল্পভূত ছাড়ে না আমার তাই মরণমুহূর্তে উৎপল বসু স্মরণে আসেÑ

মরে গেলে বেঁচে গেলে?

তারও পর খরচাপাতি আছে

করুণসুন্দর পৃথিবীতে রাজহাঁসেরও তো মৃত্যুস্বাদ আছে আর আমি ত্রিশঙ্কু সেই-

ঝু

লে

থাকি

এবং

মরে যেতে যেতে ভাবি- তোমার বর্ধিষ্ণু পুঁজি শীঘ্রই কিনে নেবে সমাধি আমার।