সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

বৃষালী – মহি মুহাম্মদ

September 20th, 2016 11:49 pm
বৃষালী  – মহি মুহাম্মদ

গল্প

বৃষালী

মহি মুহাম্মদ

 

মহাকটিশ্রোণ্য কম্পমানৈ পয়োধরৈঃ।

কটাক্ষহার মাধুর্ষৈশ্চেতোবুদ্ধি মনোহরৈঃ ॥

-মহাভারত, বনপর্ব্ব- ৪৩/৩২

 

এক

অম্বপালি তার জন্ম ইতিহাস শুনছে।

মহানামা নিঃসন্তান ছিল। সন্তান লাভের জন্য সে কয়েকটিবার বিয়ে করে। স্ত্রীরাও রূপেগুণে অনন্যা। কিন্তু কারও সন্তান হয়নি। মহানামা তাই স্ত্রীদের ওপর অসন্তুষ্ট। স্ত্রীরা মহানামাকে খুশি করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু কিছুতেই তাকে আনন্দের  স্রোতে ভাসাতে পারেনি। এমনকি রাজ্যের যত বিজ্ঞ কবিরাজ ছিল, তাদেরও শরণাপন্ন হয়েছে। তাদের দিকনির্দেশনা মেনে চলেছে। তাদের দেওয়া ঔষধপথ্য  খেয়েছে।  কাজ হয়নি। শুধু শুধু দিন মাস কেটে গেছে। প্রতীক্ষার অবসান হয়নি। তাদের মনে আস্তে আস্তে ঘন কালো মেঘের মতো হতাশা জমাট বেঁধেছে। সমস্যার সমাধান হয়নি।

আকাশ সেদিন রহস্যময়। যেন বা আকাশে এক গোপন শলা-পরামর্শ হচ্ছিল। মহানামার ভেতরে অজানা এক তরঙ্গ ঢেউ খেলছে। কিন্তু কি বিষয়ে, তা সে বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঘটতে চলেছে। তারই সংকেত সে আগাম পাচ্ছে। সে রাতে মহানামার ঠিকমতো ঘুম হলো না। জল্পনাকল্পনায় মাথা ঘুলিয়ে গেল তার। যা একটু চোখে তন্দ্রা লেগে এল সেখানেও স্বপ্ন এসে সবকিছু গোলমাল করে দিল।

গভীর রাত্রি। মহানামার আম্রকানন। সেখানে নানাজাতের আমগাছের ঘন সারি। ক্রোশের পর ক্রোশ বিস্তৃত হয়ে আছে বৃক্ষরাজি। তারই ভেতরে অদ্ভুত এক কদলিসদৃশ বৃক্ষ। মহানামা স্বপ্নের ভেতরে চমকে উঠল। তাঁর আম্রকাননে কদলিবৃক্ষ এল কীভাবে? কিছুতেই সে মনে করতে পারল না। বৃক্ষের ভেতর থেকে এক মোচাসদৃশ ফুল বেরিয়ে এল। আর সেই ফুলের ভেতর থেকে  বেরিয়ে এল অপূর্ব এক কন্যাশিশু।

স্বপ্নে এই দৃশ্য দেখে মহানামা ধরফড় করে বিছনায় উঠে বসল। স্ত্রীরা এসে সবাই জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে, কী হয়েছে?

মহানামা তাঁর আশ্চর্য স্বপ্নের কথা স্ত্রীদের কাছে বলতে শুরু করে। স্ত্রীরা সকলেই চিন্তিত হয়। এ ধরনের স্বপ্নের মর্মার্থ তাদের বোধগম্য হয় না। পর পর তিনরাত একই স্বপ্ন মহানামা দেখে গেল। স্ত্রীরা ভাবল, নিঃসন্তান মহানামার মাথা বুঝি খারাপ হতে চলেছে।

তারপর একদিন মহানামাকে কী এক চঞ্চলতা তাড়িয়ে নিয়ে যায় আম্রকাননে। মহানামা তন্ন তন্ন করে খোঁজে সেই আশ্চর্য কদলিবৃক্ষ। মনের ভেতর গভীর আশা বেঁচে থাকে। যদি স্বপ্নের মতো কোনো এক কদলিবৃক্ষের সাক্ষাৎ পেয়ে যায়! সত্যি সত্যি যদি এই ভাগ্য ঘটে, তবে আরও সপ্তদিবস পরে কি আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটবেÑতা ভেবে মহানামার মধ্যে একধরনের আনন্দের স্ফুলিঙ্গ নাচানাচি শুরু করে। সে বাগান চষে বেড়াল। কিন্তু কোনো বৃক্ষের সন্ধান পেল না। মন খারাপ করে হতাশায় ডুবে গেল।

আম্রকাননের পূর্বদিকটা তাকে টানছে।  ভগ্নমন নিয়ে সে পূর্বদিকে হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে একেবারে শেষ দিকে চলে এসেছে মহানামা। ঠিক তখনই সে দেখতে পেল বৃক্ষটাকে। কদলিবৃক্ষই তো ওটা! আনন্দে দুচোখ লাফিয়ে উঠল। মনে হলো সে আবার স্বপ্ন দেখছে। বৃক্ষটাকে কেমন স্বর্গীয় বলে মনে হচ্ছে তার। তা হলে স্বপ্ন ফলতে শুরু করেছে!

 

দুই

মহানামার ভেতরে অসহনীয় অস্থিরতা।

আর এই অস্থিরতা বেড়েছে সত্যি সত্যি বাগানে কদলিবৃক্ষের আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যেত যদি না এই বৃক্ষের উপস্থিতি হতো তার বাগানে। কিন্তু বৃক্ষের উপস্থিতির কারণে বাকিটুকুও যদি সত্যি হয়ে যায়! মনের ভেতর সেই আশাই বেড়ে ওঠে। স্ত্রীরাও বসে নেই।  তারা দিনরাত কদলিবৃক্ষের গোড়ায় ধূপধুনো দিয়ে পূজার্চনা করছে। যদি স্বপ্নটা সত্যি হয়!

সপ্তম দিবস সকাল।

আজ মহানামার স্বপ্নের সপ্তদিবস পূর্ণ হতে চলেছে। আম্রকাননে আলোর খেলা। সূর্যের আলোর তীব্রতা আছে তবে তেজ নেই। আকাশের রং যেন ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে যাচ্ছে। মহানামা বুঝতে পারছে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। পায়ে পায়ে মহানামা বাগানে ঢুকল। তার সঙ্গে রূপসী ভার্যারাও বাগানে ঢুকল। কদলিবৃক্ষের দিকে এগিয়ে গেল তারা। যতো নিকটবর্তী হতে লাগল, ততো তাদের ভেতরে উত্তেজনা বাড়তে লাগল। এবং ঠিক ঠিকই তাই হলো। যে ঘটনা মাহানামা স্বপ্নে ভেতরে ঘটতে দেখেছে, তাই যেন তার চোখের সামনে ঘটে গেল।

কদলিবৃক্ষের শীর্ষে আশ্চর্য এক মোচার আবির্ভাব হয়েছে। তার ভেতর থেকে ফুটে উঠেছে অদ্ভুত এক ফুল। চারপাশ সুবাসিত। সেই ফুলের ঘ্রাণে আমোদিত অলি। ফুলের ভেতরে চুপচাপ বসে আছে এক ফুটফুটে কন্যাশিশু। মহানামার যুবতী ভার্যারা আনন্দধ্বনিতে আম্রকানন ভরিয়ে তুলল। কন্যাশিশুটির রূপ দেখে চোখ ভরে যায়। গা থেকে জোছনা ঝরছে। চন্দ্রমুখ। আর হাসিতে ফুলের পাপড়ি খসে পড়ছে। চারদিক যেন আলোকিত হয়ে উঠেছে সে শিশুর আগমনে। নাকি এ তাদের পুলকিত মনের অদ্ভুত কল্পনা! আসলে ওসব কিছুই হয়নি কন্যাশিশুটিকে ঘিরে। কেমন একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার খেলে গেল মহানামার ভেতরে। কেউ কেউ বলল, আসলে তেমন কিছুই না। মহানামা মেয়েটিকে  আম্রকাননে কুড়িয়ে  পেয়েছে।

 

তিন

আম্রকাননে জন্ম কন্যার।

তাই এই শিশুর নাম হবে অম্বপালি। দিনে দিনে বড় হতে থাকল সেই কন্যা । কন্যার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বৈশালিনগরে এক রূপের কন্যার আবির্ভাব ঘটেছে। সবাই কানাঘুষা করতে থাকে, এত রূপ কি করে ধরল এই কন্যা। এ যেমন তেমন কন্যা নয়! কন্যার কণ্ঠ গলে যেন মধু ঝরে। আর নৃত্যের তালে তালে ঘুঙুরের আর্তনাদ দেখে সবাই আত্মহরা। শুধু তাই নয়, নানা শিক্ষায় অম্বপালি হয়ে ওঠে অনন্যা।

কিশোরীকাল যেমন তেমনভাবে কাটলেও যৌবন আসে কন্যার ঝড়ের আগমনী বার্তা নিয়ে। বেদিশা হয়ে ওঠে আশপাশের মানুষ। খবর রটতে থাকে। তাই নগরের মানুষ যেন প্রতিনিয়ত উন্মাদ হতে থাকে অম্বপালির রূপের সৌরভে। এ যেন -একবার দেখিলে তারে নয়নের তৃষ্ণা যায় বেড়ে। দিনরাত সব সমান হয়ে যায়। চোখে তাকে আরেকবার দেখবার জন্য সতৃষ্ণ আর ব্যাকুল হয়ে  ওঠে।

মহানামা পড়ল খুব দুঃশ্চিন্তায়। কন্যার বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এত রূপবতী কন্যা বিয়ে দেবে কার কাছে? বৈশালি নগরে এমন সুপুরুষ কোথায়? চিন্তায় ঘুরতে ঘুরতে মহানামা একদিন নগরপতির কাছে এসে পড়ল।

সবশুনে নগরপিতা ঘোষণা দিলেন ‘অনির্বহ স্ত্রীরত্নম’ অর্থাৎ স্বাধীনা নারী সম্পূর্ণ গণের ভোগ্যা। সে কখনও একজনের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে পারে না। অম্বপালির বিয়ে হবে না। অতি সুন্দর নারীর বিয়ে করার রেওয়াজ নেই। সে সবার মনোরঞ্জন করবে। অতিসুন্দর গুণে মনোহরা অম্বপালি সবার হতে হবে। তাকে ঘর-সংসার করা চলবে না। এসব কথা শুনে মহানামার মাথায় হাত পড়ল। মন খারাপ করে সে চুপচাপ বসে রইল। বাড়িতে ফিরে সে কোনো কথাই বলল না কারও সাথে।

 

চার

অম্বপালি সব শুনে থ মেরে বসে রইল।

কি এক গভীর চিন্তায় ডুবে গেল সে। এখন কি হবে! এই জীবন কি সে চেয়েছিল? এই সিদ্ধান্ত তাকে মেনে নিতে হবে?  জীবন তার। তাকে পূর্ণতা দেবার অধিকার তার। অথচ এখন অন্যের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় তাকে চলতে হবে। তার নিজের কোনো স্বপ্ন থাকবে না? না, এ কিছুতেই হতে পারে না। পুরুষের ভোগ্যা হয়ে তাকে জীবন কাটাতে হবে! এ কী করে সম্ভব? মহাভাবনায় নিমগ্ন হলো অম্বপালি। রাতদিন একাকার করে ভাবতে লাগল। কোনো কূলকিনারা পেল না সে। কিন্তু সহজেই সে এদেরকে ছেড়ে দিতে পারবে না। নেবে এক অন্যরকম শোধ।

কয়েকদিন পর। অম্বপালি নগরপিতার কানুন মেনে নিতে রাজি  হলো। শুধু কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিল সে। যথাসময়ে অম্বপালির শর্ত নগরপিতার কাছে পৌঁছে গেল। অম্বপালির শর্তসমূহ হলোÑতাকে নগরীর শ্রেষ্ঠস্থানে রাখতে হবে। নিজের স্বাধীনতা বজায় রেখে সে পুরুষ নির্বাচন করবে। একজন পুরুষ অবস্থানকালে অন্যজনের প্রবেশ নিষেধ। সে যেই হোক না কেন, অম্বপালির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। তার সঙ্গে রাত্রিযাপন করতে ৫০০ কার্ষাপণ দিতে হবে। নগরপিতা কোনোদিন যদি তার গৃহ তল্লাসির হুকুম দেয় তবে তা আদেশ জারির সাতদিন পর কার্যকর হবে। সবশেষ শর্ত হলোÑ তার গৃহে কে আসছে আর কে যাচ্ছে তার ওপর কোনো নজরদারি করা চলবে না।

নগরপিতা ও তার পারিষদবৃন্দ অম্বপালির শর্তসমূহ মেনে নিল। মহানামার সংসার ত্যাগ করে অম্বপালি নগরের প্রাণকেন্দ্রে সুরম্য প্রাসাদে ঠাঁই পেল। কিন্তু নগরপিতা অম্বপালির সাক্ষাৎ লাভে ব্যর্থ হলো। বিভিন্ন দেশের রাজপুত্রগণ আর বণিক মহাজনরা ধর্না দিতে থাকল। অম্বপালি সবাইকে সাক্ষাৎ দিত না। কেউ কেউ তার সাক্ষাৎ পেত। অনেকেই ভগ্নহৃদয়ে ফিরে যেত। আর কেউ কেউ একনজর দেখার জন্য বৈশালি নগরে দিনের পর দিন থেকে যেত। অম্বপালির চৌষট্টি কলার কথা রাজ্য থেকে রাজ্যে ছড়াতে লাগল। দিনের পর দিন তার সাক্ষাৎপ্রার্থী বেড়েই চলল। অম্বপালির মন তারপরেও ভরল না। সে যেন কোনো এক কল্পরাজ্যের রাজপুত্রের জন্য অপেক্ষা করে চলেছে। কি এক অপূর্ব তৃষ্ণায় তার মনপ্রাণ দিন দিন হাহাকার করতে লাগল।

পাঁচ

রাজা বিম্বিসারের খ্যাতি তখন তুঙ্গে।

বিশ্বস্ত অনুচর থেকে তিনি বৈশালি নগরের এই গুণান্বিতা গণিকার খবর পেলেন। তার গুণগান শোনার পর বিম্বিসার আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। একদিন তার একান্ত পারিষদদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কে কত অপরূপা রমণীর খবর জানো?

একে একে সবাই এই প্রশ্নের জবাব দিল। একজন বলল, কারও কথাই সঠিক নয়! বৈশালি নগরের অম্বপালিকে দেখলে আপনারা আর কাউকে কোনোদিনও দেখতে চাইতেন না। তার অপরূপ রূপ একবার দেখলে চোখ আর কিছুই দেখে না। যতক্ষণ চোখে চোখ রাখা যায় তার রূপের অবয়ব মনে রাখা যায়। এরপর হাজার চেষ্টা করেও তাকে স্মরণে আনা যায় না। চোখ তৃষ্ণায় কাতর হয়। জগৎ সংসার সব কিছু মিছে মনে হয়। আরেকবার তাকে দেখার জন্য মনপ্রাণ আকুল হয়ে কেঁদে বেড়ায়। কিন্তু অম্বপালি যাকে একবার নিষেধ করে, তাকে দ্বিতীয়বার স্মরণ করে না। তার দুয়ারে শত করাঘাত করলেও কোনো দ্বারবান ফটকের দরজা খুলবে না।

বিম্বিসার বিভোর হয়ে শুনলেন সে কথা। কল্পনায় সেই লাস্যনটী চঞ্চলার অপরূপ দেহের ভঙ্গিমা আঁকলেন। সে অবয়বেও অপরূপা চঞ্চলা, হরিণীর মতো ছুটে চলতে লাগল। কিছুতেই বিম্বিসারের কল্পনার সোনার শিকলে, সে নটী বিনোদিনী ধরা দিল না।

বিম্বিসার তার পিছু নিল। কিন্তু তার প্রিয়ভাজন অমাত্যের বর্ণনার ছটায় আবার মুগ্ধ হতে হতে ফিরে এলেন। আর তার অমাত্যবৃন্দ তখন অম্বপালির নৃত্যের প্রশংসায় মশগুল ছিল।

যুবরাজ তার নৃত্যের ছন্দ প্রকৃতির সকল ছন্দকে হার মানায়। তার ভ্রƒ আর চোখের ঠমকে বুকের জল শুকিয়ে যায়। তার নূপুরের নিক্বনে যেন আকাশে মেঘের ডমরু বেজে ওঠে। নাচের ছন্দে মেঘ আর বৃষ্টিকে ধরে রাখতে পারে না। অবিরল ধারায় নেমে আসে ভূতলে।

 

ছয়

সন্ধ্যা।

অম্বপালি কেশবিন্যাসে নিমগ্ন।

দুজন সহচরী তার কেশে ধূপের ধোঁয়া দিচ্ছিল। কিশোরীসন্ধ্যা উত্তীর্ণ হলে অম্বপালি রাত্রির আভরণ পরিধান করে। একে একে তার প্রস্তুতি সম্পন্ন হতে চলেছে। তখনই লোক মারফত খবর এল। রাজা বিম্বিসার অম্বপালির ফটকে এসে পৌঁছেছে।

অম্বপালি এতটুকু বিচলিত হলো না। বার্তবাহককে সে হাত ইশারায় যেতে বলে দুই সহচরির একজনকে রাতের জলসার আয়োজনের কথা বলল। কারণ এসব রাজ-রাজারা শুধু শরীরের মধু সিঞ্চন করতে আসে না। সঙ্গে সঙ্গে এদের নানা বিদ্যার ধারে কাটতে হয়। কলাবিদ্যা এদেরই ওপর প্রয়োগ করতে হয়। তবেই তাদের প্রশ্বস্তি।

অম্বপালি যৌবনের শুরু থেকে এত পুরুষ দেখল তবুও তার মনষ্কাম পূর্ণ হলো না। কেন জানি তার মনে হয়েছে, যার প্রতীক্ষা সে করছে এখনও সে তার মহলে এসে উপনীত হয়নি। কখন তাঁর সময় হবে? কে জানে? তাঁরই জন্য হয়ত তার মনের তৃষ্ণা নিবারণ হচ্ছে না। একবার তাঁকে পেলেই সে এই পাপ-পুরি থেকে চলে যাবে অন্যকোথাও। আর কোনোদিন সে পুরুষ ফোটাবে না। সেই পরম পুরষকে সে হৃদয়ে সযতনে লালন করবে। আর কোনো ধন সম্পদের বিনিময়েও সে তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবে না।

অম্বপালির মহলে যেই আসুক, নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। যথারীতি রাজা বিম্বিসারের সাক্ষাৎপর্বও শুরু হলো। রাজা বিম্বিসারের বড় অদ্ভুত মনে হলোÑ এ কেমন নটী? যার কাজ নৃত্যকলা আর দেহদান করা সেও সঙ্গী বাছাই করে। নাকি এ শুধু তার নিছক শুচিবায়ু। না এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে!

যা হোক, যথাসময়ে অম্বপালি এসে উপস্থিত হলো। রাজা বিম্বিসার মুখখানা হা হয়ে গেল। চোখ দুটো ঈষৎ বড় হয়ে গেল। ঘন ঘন বায়ু সঞ্চালন করতে গিয়ে বুকটা ধুকপুক করতে শুরু করল।

ঝাড় লণ্ঠনের আলোও যেন নিষ্প্রভ হয়ে গেল। অম্বপালির রূপের বন্যায় বিম্বিসার যেন উন্মাদ হয়ে উঠল। অম্বপালিকে আলিঙ্গনের জন্য সে তড়পাতে লাগল। কিন্তু এখানে অধৈর্য হলে চলবে না। কারণ অম্বপালি এই মুহূর্তে তার সঙ্গী নির্বাচন করতে এসেছে। সঙ্গী নির্বাচন করতে এসে যদি কোনোক্রমে তাকে বাতিল বলে গণ্য করে তবে মান-সম্মান কিছু থাকবে না। ইতিহাসে তার নাম কলঙ্কিত হয়ে অংকিত হবে। কাজেই একটু চেষ্টা করে বিম্বিসার তার আবেগ সংহত করল। দাঁড়িয়ে সে অম্বপালিকে সম্ভাষণ জানাল। এবং সে যে তার রূপে মুগ্ধ হয়েছে, তা জানাতে কার্পণ্য করল না।

অম্বপালিও কম যায় না। রাজা বিম্বিসার যে কষ্ট করে তার মহলে পদধূলি দিয়েছেন এতেই সে সার্থক। এ তার জন্ম-জন্মান্তরের পুণ্য। সে সাধারণ এক নগরনটী বইতো আর কিছু নয়!

বিম্বিসার বলল, তুমি সাধারণ নও। তোমার গুণের কথা নগর থেকে নগরে ছড়িয়ে পড়েছে। সবার বুকে দিনের আলোয় কিংবা রাতের আলোয় অম্বপালির কল্পিত মুখ সুখ হয়ে ধরা দিচ্ছে।

অম্বপালির মধুর হাসিতে রাতের শরীর কেঁপে উঠল। ঝাড় লণ্ঠনের আলো একবার নি®প্রভ হয়ে এল বলে মনে হলো বিম্বিসারের। সপ্তাহকাল অবস্থানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে সে। এর আগে কেউ এত দীর্ঘ রজনী এই নগরে কাটায়নি। রাজা বিম্বিসারের মনে মনে যে দুরভিসন্ধি তা যেন অম্বপালি টের পেল। আর তাই তার মুখাবয়বে এক অদ্ভুত খুশির মিহিজাল ছড়িয়ে পড়ল, বলে মনে হলো বিম্বিসারের।

বিম্বিসারের আগমন উপলক্ষে খাওয়াদাওয়ার অন্যরকম আয়োজন। যত সময় যেতে লাগল বিম্বিসারের শরীর মন আকুল হয়ে উঠতে লাগল। অপেক্ষা করার অভ্যাস তার নেই। রাতের মধ্যযামের আগেই বিম্বিসারের ডাক পড়ল। অপূর্ব দুই সহচরী এসে বিম্বিসারের হাত ধরে নিয়ে চলল। বিম্বিসারের মনে হলো অম্বপালির সহচরীরাও মন্দ নয়। তারাও হাস্যরস আর নটীপনায় কম যায় না। তার ইচ্ছে হলো-অম্বপালির সহচরীদের ফুলের পাপড়ির মতো দেহলতাগুলো ছুঁয়ে দেখে। তাদের গুণপনার অশেষ শৈলীতে বিম্বিসার বিহ্বল হয়ে পড়ল।

 

সাত

নারী শরীরের অদ্ভুত ভঙ্গিমা।

চারপাশে রহস্যময় এক আলো। আর মাঝখানে অনেক বড় জায়গা। মখমলের ঝালরকাটা পরিবেশ। রেশমি উড়না চারপাশে দুলছে, নাকি পুরুষের মনপ্রাণ নিয়ে খেলছে, বিম্বিসার কিছুই বুঝতে পারছে না। অপার সৌন্দযের্র এক প্রতীক হয়ে বৃত্তের মধ্যে বন্দি অম্বপালি। বিম্বিসারের আগমনে চারপাশ হতে যন্ত্রের মূর্ছনার বাধভাঙা সুর কম্পন তুলল। আর আস্তে আস্তে অম্বপালির শরীরের বিভিন্ন মুদ্রা বিম্বিসারের চোখ ধাঁধিয়ে দিতে লাগল। বিম্বিসার কি মূর্ছা যাবে? সময় কিভাবে চলে যাচ্ছে, তিনি টের পাচ্ছেন না। নাকি সব পানিয়ের গুণ। যে সব পাত্রের সুধা সে একটু একটু করে পান করেছে, তা তাকে অন্য এক জগতে নিয়ে চলেছে যেন!

ভৌতিক কিংবা স্বর্গীয় ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে। অম্বপালির নৃত্য আরও ইংগিতময় হয়ে উঠেছে। তার শরীর শানিত ছুরির মতো চক চক করছে। দেহলতা ঘিরে অপূর্ব এক মাদকতা ছড়িয়ে পড়েছে। চারপাশের আলো আস্তে আস্তে কমে এল। এবার কে যেন এসে বিম্বিসারকে হাত ধরে নিয়ে চলল। এখানে প্রতিটা ঘর আলাদা আলাদা। রতিক্রিয়ার ঘরও আলাদা। বিম্বিসারকে যেন হালকা একটা পালকের শরীর ছুঁয়ে গেল। অনুভূতি জোরাল হয়ে উঠতে সময় নিল না। অদ্ভুত মিলন তৃষ্ণায় বিম্বিসার ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মতো গর্জন করে উঠল। কিন্তু অপরপক্ষের কলা নৈপুণ্য যেন ফুরোচ্ছেই না। নারীর চৌষট্টি কলার পরিচয় পেতে পেতে বিম্বিসারের কি করুণ হাল হবে, কে জানে!

আলো অন্ধকারে মায়াময় স্পর্শ বিম্বিসারকে বিবশ করে তুলল। কিন্তু ভেতরের গর্জনটা সে টের পাচ্ছে। কি করবে না করবে, বুঝতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে কোনোদিন পড়েনি সে। এ কী নারীদেহ, না ধারাল তলোয়ার? তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। অসহ্য, এ অপরূপ শৈলী। সে যেন ছুরির নিচে পড়া অসহায় এক জীব। তার কোনো জারিজুরিই খাটছে না। সব কিছুই তার আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এটা হতে দেয়া যায় না। তাই তার ভেতরের পুরুষটা হুংকার দিয়ে উঠল।

সে বাহুর নিচে কোমল শিমূল তুলোর শরীরটা আলেগোছে চেপে ধরল। বন বিড়ালির নিষিদ্ধ আর্তনাদ শুনতে পেল যেন! তুলকালাম কা- ঘটে যাচ্ছে। ঘামের নহর বেয়ে সুখ চুইয়ে নামছে! নারীর শরীর থেকে পরম মমতার শিৎকার ধ্বনি উঠল। রমণীর শীৎকারÑএ যেন ঝড়ের তীব্র আর্তনাদ। সবকিছু  মিলেমিশে একাকার হয়ে নতুন এক অভিজ্ঞতায় উপনীত হলো বিম্বিসার। তারপর কখন সে ঘুমের অতলে হারিয়ে গেল বুঝতেই পারল না।

একটু পরেই অম্বপালি সেখানে উপস্থিত হলো, তার প্রধান সহকারীর দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার মানে তুমি ভালোই পেরেছ!

 

আট.

সেই অরূপের প্রতীক্ষায় সে আজও দিন গোনে।

অদ্ভুত তৃষ্ণা বুকে। রাতের নগরে আসরে আসরে স্বপ্নের ঘোরে ঘুরে বেড়ায় তার তৃষ্ণার্ত মন! তার কথা শুনে তাই সে আত্মহারা। তার আমের বাগানে দলবল নিয়ে এসে গেছে সেই স্বপ্নের রাজকুমার। সারাক্ষণ ধ্যানে মগ্ন থাকেন। দেখতে সিদ্ধার্থ সুপুরুষ।  বৈশালি ধন্য হয়েছে তার পদস্পর্শে। তার নিমন্ত্রণ নেবেন তো রাজপুত্র! নাকি তার অতীত ইতিহাস শুনে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবেন! না এমনটি হতে পারে না। নিজের মনকে নিজেই প্রবোধ দিল অম্বপালি। যে মানুষ আরাম আয়েশের তোয়াক্কা না করে মানুষের কল্যাণ করে বেড়ান, সে কখনও তাকে অবহেলা করবে না। নগরপ্রধানের সংবর্ধনার কথা সে শুনতে পাচ্ছে। তার গৃহে আসার চেয়ে তা আরও লোভনীয়। কিন্তু সে পুরুষ অম্বপালির নিমন্ত্রণ নিলেন। দলের সবাইকে তিনি এতে অংশ নিতে বললেন।

এ কথা শোনার পর অম্বপালির অন্তরাত্মায় লহরের পর লহর ছুটেছে। কিছুতেই তা থামছে না। নানা আয়োজনে তার প্রাসাদ ব্যতিব্যস্ত। সবাইকে সে বলেছে উনার আদর আপ্যায়নে যেন কোনো ঘাটতি না পড়ে। নানা ব্যঞ্জনে খাবারের পদ ভারি থেকে ভারি হতে লাগল।

এদিকে সেই পুরুষের আসার সময় হয়ে এল। প্রাসাদের সবাই উৎসুক হয়ে আছে। দৃষ্টি সবার ফটকের বাইরে। এই বুঝি দলবল নিয়ে তিনি এসে পড়লেন। বহুদূর থেকেই অম্বপালি দলটিকে দেখতে পেলেন। কিন্তু ফটকের কাছে এসে সবাই যেন থমকে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ। তাদের মধ্যে কি যে কথা হচ্ছে অম্বপালি বুঝে উঠতে পারল না। তবে ভেবে নিল, দলের সবাই হয়ত এ প্রাসাদে ঢুকতে বেঁকে বসেছে। হয়ত বলছে, নগরনটীর প্রাসাদে শ্রমণের কি দরকার! তাই  প্রবেশ নিষেধ। এখানে তাঁর মতো সিদ্ধার্থপুরুষের গমন শোভা পায় না।

যাই হোক, সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। নিরাশায় অম্বপালির মন কচুপাতার পানির মতো দুলছে। অনেকক্ষণ পর সে প্রাসাদে উল্লাসধ্বনি শুনতে পেল। তারমানে রাজপুত্র শ্রমণ তার প্রাসাদে প্রবেশ করেছে। তার মনের গুপ্ত ইচ্ছেটি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। মনকে সে শান্ত করল এই বলে, ধীরে, ধীরে। এত আকুল হয়ো না। রাত পড়ে আছে। পুরুেেষর চোখ ভোলাতে তোমাকে বেগ পেতে হবে না। বিকেলের রং ফিকে হয়ে এল। প্রাসাদে সবাই ব্যস্ত মেহমানদের নিয়ে। অম্বপালি নিজেই তদারকি করে এসেছে। আজ তার প্রাসাদ যেন পুত-পবিত্র হয়ে উঠছে। ঐ বুঝি সন্ধ্যা নেমে এল। ঘরে ঘরে উলুধ্বনি উঠল। ঘণ্টির আওয়াজ শংখের ধ্বনি আর ধূপ ধোয়ায় মন কেমন ব্যাকুল হয়ে উঠছে। মেহমানদের থাকার জন্য অনেকগুলো ঘর খুলে দেওয়া হয়েছে। একটা বিশেষ ঘর শ্রমণ গৌতমের জন্য রাখা আছে। আজ রাত অনেক অনুনয় বিনয় করে তাদের রাখা হয়েছে।

রাতের আহার সমাপন হলে যে যার কক্ষে চলে গেল। শুধু শ্রমণরা অনেক রাত একসঙ্গে আরাধনা করল। রাতের শেষ প্রহর। অম্বপালি ভাবল, এখন আর কেউ জেগে নেই। এই সময়ে শ্রামণের ঘরে সে যেতে পারে। বহুদিনের খায়েশটি সে মিটাতে পারে। আজ তার পরম আরাধ্য পুরুষ তার প্রাসাদে। মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে  সে এগিয়ে চলল শ্রমণের কক্ষের দিকে। অবাক হয়ে সে দেখল, শ্রামণের কক্ষের দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে আছে। আর সে পথে অদ্ভুত এক কিরণ বিচ্ছুরিত হচ্ছে। মন্ত্র মুগ্ধের মতো সে এগিয়ে গেল। দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার সারাদেহে কামনার আগুন জ্বলে উঠল। ঢুকে পড়ল সে ভেতরে।

অম্বপালির চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল। বিস্ময়ে তার মুখ হা হয়ে গেছে। শ্রামণ হাঁটু মুড়ে বসে আছেন এক হাত উপরে তুলে। খালি গা। চারপাশে তার অপূর্ব আলোকবলয়। অম্বপালির চোখ দুটো অন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে হলো। মন থেকে সকল কামনা নিমিষেই যেন ধুয়ে মুছে গেল। তার জন্মদাতা পিতার কথা মনে নেই। তবে সে যাকে পিতা বলে জেনে এসেছে সেই মহানামার মুখখানি ভেসে উঠল। আজ তার পিতার কথা মনে পড়ছে। না দেখা পিতার প্রতি এক অন্ধভক্তি তার মনপ্রাণ আকুল করে তুলল। অম্বপালি অল্প দূরত্ব রেখে তাঁরই সামনে  করজোড়ে  বসে পড়ল। অদ্ভুত আলোকরশ্মি যেন তার ভেতরে প্রবেশ করছে।