বিনামূল্যে বিতরণের জন্য – শাহনাজ মুন্নী

গল্প

বিনামূল্যে বিতরণের জন্য

শাহনাজ মুন্নী

 

একটা দুইটা না, শক্ত সাদা কাগজের লম্বাটে বাক্সভর্তি মসৃণ চকচকে রূপালি প্যাকেটে মোড়ানো প্রায় দুই’শ পিস। রাজবাড়ি থেকে আসবার সময় তড়িঘড়ি করে আরিফ হাতে গুঁজে দিয়েছিল কাগজের বাক্সটা। বলছিল, ‘নেন, এইটা রাখেন। আমার তরফ থেকে সামান্য উপহার।’

এখন ঢাকায় ফিরে কাগজের মোটা বাক্সটা খুলে, উপহারের চেহারা দেখে খানিকটা হতভম্ব হয়ে যায় তারেক। একটু থিতু হয়েই সে দ্রুত ফোন করে আরিফকে।

‘এইসব কি আরিফ?’

‘কিসব তারেক ভাই? কোন কথা বলছেন?’

‘না, মানে .. এতসব কেন দিয়েছো?’

‘কেন, কি সমস্যা? আপনি ব্যবহার করেন না?’

‘না সেটা না ..’

‘তাহলে?’

‘না, মানে এইগুলা তো ঠিক…’

তারেক কথাটা কিভাবে বলবে ভেবে পায় না। সে জানে, এই কনডমগুলো আরিফকে তার অফিস থেকে দেওয়া হয়েছে যৌনকর্মীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করার জন্য, যৌনকর্মীরা  খদ্দেরদের ব্যবহার করতে দিবে, যাতে তারা এইডস বা অন্য কোন যৌন রোগে আক্রান্ত না হয়। এমনকি প্যাকেটের উপর স্পষ্ট লেখা আছে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য, বিক্রয়ের জন্য নহে। আর আরিফ কিনা  তাকে উপহার দিয়েছে ! নাহ্্ কাজটা একদম ঠিক করেনি সে। তারেক বিব্রত আর ভীষণ অপ্রস্তুত বোধ করে। নিজের একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে যৌনকর্মীদের জন্য নির্ধারিত প্রতিরোধক ব্যবহার করতে রাজি নয় সে। ফোনের অপর প্রান্তে আরিফের বিগলিত হাসির শব্দ শোনা যায়।

‘হে হে হে, বস ইউজ কইরা ফালান। এইগুলা কোন ব্যাপার না। আরও লাগলে বইলেন, অনেক আছে,

‘না, না, আরিফ শোনো, আমি এইগুলা তোমাকে ফেরৎ দিতে চাই।’

‘ধূর, বস্্ কি যে বলেন, ফেরৎ কে নিবে? আপনের কাছেই রাখেন। দরকারি জিনিস। আর উপহার তো উপহারই, উপহার ফেরৎ নেয়া যায় না।’

আরিফ ওই পাশ থেকে ফোন রেখে দিলে তারেক বিছানায় ফেলে রাখা কনডম ভর্তি কাগজের বাক্সটা হাতে নিয়ে সেটা রাখার জায়গা খুঁজতে থাকে। বিয়ের পর থেকে ওষুধের দোকান থেকে প্রয়োজন মতো  দুয়েক প্যাকে কেনে সে। বিছানার পাশের ড্রয়ারে, কাগজপত্রের নিচে এক কোণায় ফেলে রাখে সেসব। শেষ হয়ে গেলে আবার কেনে। কিন্তু এখন এই এত্তগুলো ঘরের ঠিক কোথায়, কোন কোণায় রাখা যায় ভেবে পায় না তারেক। এর মধ্যে মা এসে খাওয়ার জন্য ডাক দিলে দ্রুত বাক্সটা আলমারিতে কাপড়-চোপড়ের উপর রেখে দেয় তারেক।

সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে আলমারিতে কাপড় গুছাতে গিয়ে হঠাৎ করেই বাক্সটা চোখে পড়ে ইয়াসমিনের।

‘এই, কি এটা?’

বিছানায় কাৎ হয়ে শুয়ে থাকা তারেক-কে আল্লাদি ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে সে। তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই খুলে ফেলে কাগজের বাক্সটা।

‘একি?…’

ইয়াসমিন প্রথমে থমকে গিয়ে তারপর হঠাৎ খিল খিল করে হেসে উঠে।

‘এই, আমি তো ভয় পাইছি, তুমি যদি প্রতিদিন এসব ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করো, আমার অবস্থা তো তাইলে শেষ। এতগুলা আনছো কি উদ্দেশ্যে? হুম?’

মজা করে আবেদনময়ী ভঙ্গিতে ভ্রু নাচায় ইয়াসমিন।

‘আরে আমি আনছি নাকি? আমাকে দিছে ওই যে রাজবাড়ির আরিফ …’

তারেক পুরা ঘটনা খুলে বললে আরেক দফা খিলখিল করে হাসে ইয়াসমিন। এই ঘটনায় এত হাসির কি আছে ভেবে পায় না তারেক। নিশ্চয়ই ইয়াসমিনের হাসির ব্যামো আছে।

‘এইগুলা কিছুতেই ব্যবহার করতে পারবো না আমি। এগুলোর সঙ্গে একটা আনএথিক্যাল ব্যাপার জড়িত, যাদের এগুলো প্রাপ্য ছিল তাদের দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছে আমাকে।’

তারেক গোমড়া মুখে ঘোষণা দেয়। তারপর ইয়াসমিনের দিকে তাকায়,

‘আচ্ছা, তুমি একটা বুদ্ধি দেওতো কি করা যায় এগুলি? কাউকে কি দান করা যায়?’

‘কনডম দান? শুনেই কেমন হাসি আসছে। হি হি হি..’

ইয়াসমিন আবার হাসতে থাকে।

‘শোন, হাইসো না। এই যেমন ধরো, আমাদের বুয়াকে দিয়ে দিলাম, উনি বস্তিতে গরিব মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন … কেমন হয় বলো তো? বিনা পয়সায় জন্মনিয়ন্ত্রণের কাজে লেগে যাবে।’

‘পাগল হইছো? বুয়াকে মানুষজন জিজ্ঞেস করবে না, তুমি এইগুলা কই পাইলা? তখন যদি বুয়া বলে যে আমরা দিছি, তখন মানুষ আমাদের নিয়ে কি ভাববে? বাংলাদেশের মানুষ কেমন জানো না? তারা কি এখনও এইসব বিষয় স্বাভাবিক ভাবে নেয়? বদনাম হয়ে যাবে তোমার!’

‘আমাদের কথা না বললেই হয়। বলবে, স্বাস্থ্যকর্মীরা দিয়ে গেছে।’

‘হুহ্ ! বস্তির মধ্যে এত মানুষ থাকতে বুয়াকে কেন দেবে? তুমি তো জানো না, বস্তিতে কত টাউট-বাটপার আছে। ওরা যদি একবার রটিয়ে দেয় বুয়া তার গার্মেন্টসে চাকরি করা মেয়েদের দিয়ে খারাপ কাজ করায়, ব্যবসা করায়, সেইজন্য ওর ঘরে খদ্দেরদের জন্য কনডম থাকে … তখন কত বিপদ হবে, বুঝতে পারছো?’

ইয়াসমিনের কথায় যুক্তি আছে। তারেক তাই বুয়াকে কনডম দানের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করে।

‘এইসব নিয়ে কি করব তাইলে? ড্রেনে ফেলে দিব?’

অসহায় ভঙ্গিতে বলে তারেক।

‘এতগুলি কনডম ড্রেনে ফেললে ড্রেন তো অবশ্যই বন্ধ হয়ে যাবে। ময়লা পানি উপচে পড়ে পুরা গলি ভেসে যাবে, সেইটা চাও তুমি? তোমার কোন নাগরিক চেতনা নাই? মানুষকে দুর্দশায় ফেলতে চাও? মানুষের বকা শুনতে চাও?’

ইয়াসমিন স্কুল শিক্ষিকার মতো গম্ভীর গলায় তারেককে দায়িত্ব-কর্তব্যবোধের কথা মনে করিয়ে দিলে হাল ছেড়ে দেয়।

‘তাহলে কি করব এতগুলা আপদ নিয়ে?’

ইয়াসমিন আবার হাসতে থাকে। হাল্কা মেজাজে বলে,

‘জানো, আমাদের গ্রামে বাচ্চারা কনডমের মধ্যে পানি ভরে নয়তো বাতাস ভরে বেলুন ফুলাইতো। ইয়া লম্বা, স্বচ্ছ বেলুন, হি হি হি.. তুমি ইচ্ছা করলে এই দুইশ পিস কনডম গ্রামের শিশুদের দান করতে পার, তারা ব্যাপক বিনোদিত হবে… শত শত কনডমের বেলুন তখন আমাদের গ্রামের আকাশে উড়তে থাকবে, ভাসতে থাকবে.. কি যে একটা দৃশ্য হবে না!’

‘এই ধুর, ফাজলামি করো না তো !’

‘ফাজলামি না সত্যি, আমি সিরিয়াস..’

‘না, না, ধুর, কনডমে কি সব লুব্রিকেন্ট-টেন্ট লাগানো থাকে, ওইসব মুখে দিলে বাচ্চাদের মুখে ঘা হয়, ইনফেকশন হয়…’

‘মুখে দেওয়ার আগে ধুয়ে নিবে। দেয়ার সময় বলবা যে, বাচ্চারা, এই বেলুনগুলি আগে ধুয়ে নেও তারপর মুখে দেও।’

‘কেন এমন রসিকতা করছো বলো তো, ভাল্লাগছে না আমার।’

তারেক বিরক্ত হয়। স্বামীর প্রতি এবার একটু মায়া হয় ইয়াসমিনের। সে কনডমগুলি আবার গুছিয়ে রেখে দেয় আলমারিতে। ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলে,

‘তোমার বন্ধু বা কলিগদের জিজ্ঞেস করে দেখতে পার, কারো যদি লাগে…’

স্ত্রীর এই কথাটা মনে ধরে তারেকের। পরদিন অফিসে যাওয়ার আগে ব্যাগের ভেতর কনডমের বাক্সটা ভরে নেয় সে।

তারেকের পাশের টেবিলে বসে ফজলুর রশিদ। হাসি-খুশি, দিলখোলা মানুষ। টিপ-টপ থাকে। দুই জমজ ছেলের বাপ। ছেলেগুলোর বয়স’ও সম্ভবত ছয়/সাত পেরিয়ে গেছে। তারেকের মনে হয়, ফজলুর রশিদের যৌন জীবনে কনডমের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও থাকতে পারে।

দুপুরে লাঞ্চ টাইমে তারেক এসে ফজলুর রশিদের টেবিলে বসে। দুয়েকটা অফিশিয়াল কথা সারার পর তারেক একটু নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে.

‘কনডম লাগবে নাকি রশিদ ভাই?’

‘কনডম?’ একটু চমকে উঠে ফজলুর রশিদ। তারপর যেন খুব মজার কথা শুনেছে এমন ভাব করে হো হো করে হেসে ওঠে।

‘দূর মিয়া আমাদের এখন আর ওইসব লাগে না।’

‘না মানে আমার কাছে দুইশ পিস ছিল …’

তারেক বিড়বিড় করে। ফজলুর রশিদ বিশেষ কায়দায় চোখ টিপে,

‘আরে আপনারা ইয়াং ম্যান, দুইশ পিস কেনো, তিনশ পঁয়ষট্টি পিস্্ও কাজে লাগাতে পারবেন। আমাদের বয়সে মেশিন এত চলে না। হা হা হা …’

তারেক এবার কনডম গছানোর জন্য অন্য লোক খোঁজে। কিছুদিন আগে জয়েন করেছে, এমন একজন অল্পবয়সি চটপটে এক্সিকিউটিভ জহিরুলকে ডেকে আনে সে,

‘স্যার?’

‘ইয়ে, জহিরুল তোমার কি কনডম লাগবে?’ স্মার্টলি জিজ্ঞেস করে তারেক।

জহিরুল প্রথমে কথাটা বুঝতেই পারে না। সে প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে থাকে।

‘ইয়েস স্যার?’

‘জিজ্ঞেস করছি, তোমার কি কনডম লাগবে? আমার কাছে দুশ পিস কনডম আছে..’

এবার চোখমুখ লাল হয়ে যায় জহিরুলের। সে তোতলাতে থাকে,

‘আ.. আ.. আমিতো স্যার এখনও বিয়ে করিনি স্যার… সরি স্যার ..’

‘না না ঠিক আছে। তুমি যাও।’

তারেকের সামনে থেকে যেন পালিয়ে বাঁচে জহিরুল।

এবার তাহলে কি হবে? ব্যাগভর্তি কনডম নিয়ে পথে পথে ঘুরতে হবে? হতাশ লাগে তারেকের। অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িতে না চড়ে হাঁটতে থাকে সে। একটা একটা করে কনডম পথে ফেলতে থাকলে কেমন হয়? পথে পথে ছড়িয়ে যাক কনডমের নহর। কিন্তু ব্যাপারটা খুব শিশুতোষ আর বোকা বোকা হয়ে যাবে ভেবে নিজেকে নিরস্ত করে তারেক। সে হাঁটতে থাকে, প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট, কার্জন হল পেরিয়ে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের পাশ দিয়ে। রাস্তাটা নিরিবিলি। চুপচাপ। চারিদিকে মন্থর পায়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে। হাঁটতে হাঁটতেই তারেকের চোখ আটকে যায়, পার্কের পাশে একটা বেঞ্চিতে গভীর ঘুমে মগ্ন এক অল্পবয়সি নারীর প্রতি। নারীটির  পরনে সস্তা কাপড়ের ময়লা সালোয়ার কামিজ, সালোয়ারটা উঠে আছে হাঁটু পর্যন্ত, কামিজটা সরে গিয়ে দেখা যাচ্ছে পেটের সামান্য অংশ। তারেক অনুমান করে সম্ভবত এই মেয়েটি একজন ভাসমান যৌনকর্মী। রাস্তার পাশে এরকম খোলা জায়গায় ভালো ঘরের কোনো মেয়ের তো এভাবে ঘুমিয়ে থাকার কথা নয়। তারেকের মনে হয়, কনডমগুলো হয়ত এরই ভালো কাজে লাগবে। মেয়েটি তার খদ্দেরদের বিনামূল্যে কনডম দিতে পারবে, ফলে সে নিজে এবং তার খদ্দেররা যৌন রোগের সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকবে।

তারেক সন্তর্পণে ব্যাগ থেকে কাগজের বাক্সটা বের করে। এইবার মেয়েটার পায়ের কাছে নীরবে বাক্সটা রেখে চলে যাবে সে। ঘুম থেকে উঠে মেয়েটি বাক্সটা আবিষ্কার করুক। তারেক আশপাশে তাকায়, না, যে দুয়েকজন ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে তাদের কেউই তারেককে বা ঘুমন্ত মেয়েটিকে লক্ষ্য করছে না। ভালোই হয়েছে, কনডমগুলির একটা গতি হবে। তারেক ধীর পদক্ষেপে মেয়েটির পায়ের কাছে নিচু হয়ে বাক্সটা রাখতে যায়। আর তখনই অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় মেয়েটি ঘুম ভেঙে সটান উঠে বসে, আর ডান হাত দিয়ে খপ্্ করে তারেকের শার্টের কলার চেপে ধরে।

‘বাক্সে কি আছে? বিরানি? নাকি পচা গান্ধা খিচুড়ি? কি?’

ভাঙা খ্যান্খ্যানে গলায় মেয়েটা জিজ্ঞেস করে। ঘটনার আকস্মিকতায় তারেক হকচকিয়ে যায়। এভাবে মেয়েটির ঘুম ভেঙে যাবে সে কথা চিন্তাও করেনি সে। মেয়েটির প্রশ্নের উত্তরে  কি বলবে বুঝতে না পেরে তোতলাতে থাকে তারেক।

‘এযাঁ এযাঁ…এযাঁ.. ’

‘কি অইল কথা কন না কেন? এইটা তো বিরানির বাক্সের মতো লাগে না… কি আছে এইটাতে?’

মেয়েটি তারেকের শার্টের কলার ছেড়ে দিয়ে ঘাড় কাৎ করে সন্দেহ ভরা চোখে বাক্সের দিকে তাকায়। মেয়েটির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে কোনোরকমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তারেক, মিন মিন করে বলে, ‘কনডম। বাক্সে দুইশ পিস্ কনডম আছে।’

‘কনডম তোর চেটের মধ্যে লাগায়া রাখ। খানকি মাগির পোলা, কনডম আইছে। পেটে নাই ভাত, আমি চাবায়া চাবায়া কনডম খাই…. হারামির বাচ্চা…. ’

মেয়েটি সমানে চিৎকার করে গালিগালাজ করতে থাকে। পথচারিদের কেউ কেউ এতে উৎসুক হয়ে থমকে দাঁড়ালে তারেক দ্রুত কনডমের বাক্স ব্যাগে ভরে প্রায় দৌড়ে জায়গাটা পার হয়ে যায়। পেছনে মেয়েটির অবিরাম খিস্তি খেউর চলতেই থাকে।

রাতে ঘরে ফিরলে স্বামীর ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত, ভেঙে পড়া বিধ্বস্ত চেহারা দেখে তাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করে না ইয়াসমিন। যেন তারেককে সব কিছু নিজে নিজে সামলে নেয়ার জন্য কিছুটা সময় দেয় সে। ব্যাগ থেকে কনডমের বাক্সটা বের করে আবার আলমারিতে রেখে দেয়।

রাতে শোবার পর তারেকের কানের কাছে ফিস্্ ফিস্্ করে ইয়াসমিন।

‘কনডমগুলো কাউকে দিতে পারলা?’

‘নাহ্। কে নিবে?’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। ইয়াসমিনের দিকে পেছনে ফিরে কাৎ হয়ে শোয়। আজ সন্ধ্যায় বেঞ্চিতে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটির সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির কথা চিন্তা করে শিউরে উঠে তারেক। উফ্ বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। ভাগ্যিস, পরিচিত কেউ দেখেনি। যদি দেখতো কর্পোরেট অফিসার তারেক যুবায়েরকে রাস্তার একটা ভাসমান যৌনকর্মী মা বাপ তুলে বিশ্রি গালি-গালাজ করছে, তখন কেঁদে-কেটে, কসম খেয়ে বললেও তো কেউ বিশ্বাস করতো না যে তারেক নির্দোষ।

‘ঘুমিয়ে পড়েছো?’

ইয়াসমিন পেছনে থেকে তারেকের পিঠে তার নরম হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে।

‘উহু..’

তারেক সংক্ষেপে বলে। ইয়াসমিন এবার পেছন থেকে তারেককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ওর ঘাড়ে, পিঠে সমানে চুমু খায়। এবার আর পেছন ফিরে থাকতে পারে না তারেক। ঘুরে ইয়াসমিনের মুখোমুখি হয়। তার ভেজা ঠোঁটে গভীর চুমু খায়। সারাদিনের সমস্ত গ্লানি, অপমান, ক্লেদ সবকিছু যেন সে ভুলে যেতে থাকে। একটা আনন্দ বিন্দু ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে তার সারা শরীরে আর মনে ছড়িয়ে যেতে থাকে। অদ্ভুত এক প্রশান্তি, এক ভালো লাগা এক কোমল মধুর উত্তেজনায় সে এবং ইয়াসমিন যুগপৎ প্লাবিত হয়।

একদম চরম মুহূর্তে ইয়ামমিন ফিস ফিস করে মনে করিয়ে দেয়.

‘এই আনসেফ টাইম কিন্তু .. প্রটেকশান প্লিজ’

এই বছরটা সন্তান নিতে চায় না ওরা, এটা অনেক আগের সিদ্ধান্ত। তারেক চট্্ করে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বিছানার পাশের সাইড টেবিলের ড্রয়ার হাতড়ায়। কাগজের ভিড়েই তো থাকার কথা। ফাঁক- ফোকড়ে পড়লো কোথাও? নাকি নেই? শেষ হয়ে গিয়েছিল? মনে করতে পারে না তারেক। সে প্রাণপণে ড্রয়ার হাতড়াতে থাকে।

‘কি হলো? পাচ্ছো না?’

ইয়াসমিন জিজ্ঞেস করে।

‘নাহ্ … বুঝলাম না… শেষ হয়ে গেছিল?’

‘সে তো তুমি জানো…. আমি কিভাবে বলি’

ঘরে জ্বলতে থাকা ডিম লাইটের নীল আলোয় আঁতিপাঁতি করে ড্রয়ারের কাগজপত্র উল্টে পাল্টে কনডমের প্যাকেট খোঁজে তারেক। নাহ্ নেই। একটাও নেই।

‘এই শোন, আলমারিতে আরিফের দেয়া জিনিসগুলা আছে না..’

ইয়াসমিন বিছানায় শুয়ে থেকেই তারেককে মনে করিয়ে দেয়। বলে, ‘ওইখান থেকে একটা নেও।’

তারেক এবার ভূতগস্ত মানুষের মতো আলমারি খোলে।

কাপড় চোপড়ের উপর নিরীহ ভঙ্গিতে পড়ে আছে কনডমের সাদা বাক্সটা। কাঁপা কাঁপা হাতে বাক্সটা খোলে তারেক। তারপর একটা প্যাকেট তুলে মোড়কটা ছিঁড়ে ফেলে। আর হঠাৎ করেই তার চোখ যায় বিছানায় শুয়ে থাকা নিরাভরণা ইয়াসমিনের দিকে। তারেকের মনে হয় ওটা ইয়াসমিন নয় বরং ইয়াসমিনের জায়গায় শুয়ে আছে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের বেঞ্চে ঘুমিয়ে থাকা সেই মেয়েটি। যে এক্ষুনি তারস্বরে গালি দিয়ে উঠবে। তারেক কেমন উদ্ভ্রান্ত বোধ করে, কি হচ্ছে এসব? কেন এমন হচ্ছে? তারেকের অস্থির লাগে। বিছানা থেকে এসময় ইয়াসমিনের কাতর কণ্ঠ শোনা যায়,

‘এই কি হলো? কতক্ষণ লাগে তোমার?’

তারেক এবার চোখ পিট্ পিট্ করে তার বিভ্রান্তি ঘুচানোর চেষ্টা করে, নিজেকে নিজেই বোঝায়, না এসব নেহায়েৎই কল্পনা, সে আসলে ভুল দেখছে। এই কণ্ঠ তো ইয়াসমিনের-ই, ওই মেয়েটার নয়। সে মাথা থেকে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দ্ইু হাত দিয়ে পরতে যায় কিন্তু তার শিথিল হয়ে পড়া অঙ্গে কিছুতেই আর কনডমটা স্থাপন করা যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Pinterest
Instagram