সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

উপেক্ষিত – জুলফিয়া ইসলাম

September 20th, 2016 11:42 pm
উপেক্ষিত  – জুলফিয়া ইসলাম

গল্প

উপেক্ষিত

জুলফিয়া ইসলাম

 

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান অবতরণ করেছে একঘণ্টা আগে। বিমানবন্দর থেকে সে বের হবে কিছুসময়ের মধ্যে। বিমানবন্দরে তার জন্যে কেউ এসেছে কি? কেন আসবে? কোনদিনই কেউ আসে না। এ পৃথিবীতে সে নিজেকে মূল্যবান করে গড়ে তুলতে পারেনি। দেশে তেমন একটা সুবিধা করতে না পেরে যতবারই সুদূরে পাড়ি জমিয়েছে ততবারই ফিরে আসতে হয়েছে এ ঘাটেই।

এদেশে সব কিছুই স্বল্পমূল্য। কুলি-ভাড়াটে-গাড়ি। কিন্তু কই পরিবারের এতগুলো হৃদয়বান ব্যক্তির কেউ তো আসেনি তাকে রিসিভ করতে! কেউ যদি একটু অপেক্ষা করতো! জাহিদ রাস্তায় এসে দেখলো সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। গুমোট একটা আবহাওয়া বিরাজমান। এই অস্বস্তির মধ্যেও মানুষের মিছিল। অনেকের স্বজনেরা বাইরে অপেক্ষা করছে। ভাগ্যবান লোকদের গ্রহণ করার জন্য এরা এসেছে।

এরা বোধ হয় খাঁটি মানুষ। এরা কথাবার্তায়, আলাপ আলোচনায় অপেক্ষাকৃত অতি খাঁটি। জাহিদের এমন খাঁটি কোনো কিছুই নাই। আগেও ছিল না। নিজে তা তৈরি করে নিতেও পারেনি।

মাত্র একঘণ্টা হলো সে দেশের মাটিতে ফিরেছে। প্রথম ধাক্কা মোটামুটি কাটিয়ে উঠেছে। অন্যান্য প্যাসেন্জারের সঙ্গে সে বেরিয়ে আসছে। ঢাকা শহর কোলাহলমুখর শহর। বাইরে বেরিয়ে আসার পর খানিকটা বাতাস গায়ে লাগল। আরেকটু এগিয়ে দেখলো ভাড়াটে গাড়ির সারি। বাতাসে কেমন একটা বোঁটকা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। গাড়ির আসা-যাওয়া, মানুষের কোলাহল, হকারদের চিৎকার। এসব তো জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কতভাবেই তো জীবনকে দেখা হলো। কখনও কখনও জীবনের দুর্বলতা ও ক্লেদগুলোকেও বড় মধুর মনে হয়। একটা ভাড়া গাড়ি এগিয়ে এলো। দরদাম করে চড়ে বসলো। গাড়িগুলো বেশ মজবুত ও সুন্দর। অন্যান্য গাড়ি বহরের মধ্যে জাহিদকে বহন করা গাড়িটি দ্রুত এগিয়ে চলল। রাস্তার দুপাশে গাছের সারি। তবুও ড্রাইভার ছেলেটি তাকে বহন করে দুই ঘণ্টার একটা শান্তি এনে দিয়েছে। গাড়ির গদির উপর শান্তিতে কিছু সময় তো কাটানো গেলো।

ভূতের গলির ৯/২ নাম্বার বাসার সামনে গাড়িটা এসে থামলো। ঘরে ঢুকতেই সবাই ঘিরে ধরল তাকে। বড় ভাবি এগিয়ে এসে বললেন, সুটকেস কি এই একটাই? আর নাই?

জাহিদ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, না, একদম হঠাৎ এসে পড়েছি তো?

ভাবির মুখে মুহূর্তে অন্ধকার নেমে এলো। আস্তে করে বলল, তাহলে দুবছর কী কাজ করলে?

চেষ্টা করেছি অনেক। হয়ে ওঠেনি কিছু। জাহিদের এমন কথা শুনে কেউ আর কথা বাড়ালো না। জাহিদ তার পুরোনো রুমে ঢুকে কাপড় ছাড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

এরই মধ্যে ভাবি টেবিলে খাবারের ব্যবস্থা করলেন। জাহিদ টেবিলের দিকে তাকিয়ে মর্মাহত হলো। ভাবি বুঝতে পেরে বললেন, আসলে ঘরে বাজার ছিল না তো?

না, ভাবি এতেই চলবে। বিমানে খেয়েছি তো। কেউ আর কিছু বলল না।

জাহিদ মনে মনে ভাবল, খেতে না বসলেই ভাল ছিল। মুখে কিছুই বলল না। কিছুক্ষণ পরে আস্তে করে বলল, বাজার কে করে ভাবি?

তোমার ভাই তো সময় পায় না। তাই আমিই যাই। ও খুব কমই যায়। মাঝেমধ্যে মন চাইলে যায়। বাজার সদাই করা ও একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে এই আর কি?

জাহিদ মনে মনে ভাবল, ভালো খাবার দাবারের ব্যবস্থা মনে হয় এ বাড়িতে আর নেই। বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই জাহিদ সেটা বুঝতে পেরেছে। মনে মনে নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হলো। সেও তো এমন কোনো ব্যবস্থা করতে পারে নাই। এতোদিন সে যেভাবে খেয়েছে বা থেকেছে, এরা তার চাইতে আরও বেশি খারাপ থাকছে। বাড়িতে ভালো কোনো বই নেই। অভাব এ সংসারে ভালো চিন্তার জগতকেও বিছিন্ন করে দিয়েছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আহার গলধঃকরণ করলো।

আহার শেষে খবরের কাগজ খুঁজতে গিয়ে সেটাও পেল না। বিষাদে ছেয়ে গেল মন। এ বাড়ির মানুষগুলো তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল। সে ওদের স্বপ্নভঙ্গ করেছে। জাহিদ এ নিয়ে দুবার বিদেশে গিয়েছে। দুবারই রিক্ত হস্তে ফিরে এসেছে। এজন্য এবার তার অভিনয়ের টেকনিক আর কাজে লাগছে না। বড় ভাই সামাদ পাশে এসে বসেছেন।

একেবারেই কিছু করতে পারিসনি? হাতে কিছু রেখেছিস?

না, মানে… চুপ মেরে গেল জাহিদ।

ভাবি বললেন, এ বাড়িতে কোনোদিক থেকেই আয়ের কোন পথ নেই?

কেন? বড় দুলাভাই তো মাঝেমধ্যে কিছু পাঠাতেন!

বেশ কিছুদিন থেকে সেটাও বন্ধ। তার কিছু ঋণ আছে, তাই।

অতএব বুঝে দেখ, কেন গিয়েছিলে গাঁটের টাকা খোয়ানোর জন্য!

জাহিদ ঘাড় হেঁট করে মনে মনে ভাবল তার হাতে পাঁচ হাজার টাকা আছে মাত্র। মাঝে কিছু লেখালেখি করেছিল। পত্রিকার সম্পাদক পরিচিত ছিল বিধায়, বিল পরিশোধ করে দিয়েছিল, এছাড়াও আরও কিছু উপার্জন আছে তার। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হওয়ার পর কিছুদিন টিউশনি করেছিল। টাকাগুলো সে খরচ করে নাই। যক্ষের ধনের মত আগলে রেখেছিল। রক্তের দামে কেনা এটুকু সঞ্চয় কীভাবে খরচ করবে সে! লেখালেখি করতে ভালো লাগে। লাগলেই কি? লেখার তো কোনো হাত পা নেই যে টাকা বয়ে আনবে। বাঁচতে হলে তো উপার্জন দরকার। কিন্তু সেই উপার্জনের সাথে মনের কোনো ইচ্ছারই কোনো দাম থাকবে না? যার যেটা ভালো লাগে না তার সেটা করেই বাঁচতে হবে! এখানে খাওয়ার সুযোগ কেউ দেয় না। নিজেই খেতে পায় না, অন্যকে কীভাবে খাওয়াবে সে? অতএব, সমস্ত পৃথিবী তার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করছে। স্ত্রী শিলা বাবার বাড়ি থেকে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে। টাকার বাইরে আর কোনো কিছুতেই মেয়েটি আচ্ছন্ন নয়। শিল্প, সংস্কৃতি, ঘর-সংসার, প্রেম-প্রীতি এসব কোনো কিছুর প্রতিই মেয়েটির আর কোনো আগ্রহ নেই। কিছু কিছু মানুষের জীবনের রীতিই এটাই। এঁদের বাঁচার কোনো উপায় জানা নেই। অত্যন্ত নিচুদরের জীবন যাপন করে থাকে এরা। শিলা এখন আর তার লেখার প্রতি কোনো আগ্রহ দেখায় না। কিন্তু সে নিজেও শুধুমাত্র স্বামীনির্ভর ননির পুতুলমাত্রÑ কিছুটি করার নাম নেই। দোষ যত যেন সব নন্দঘোষের।

কিন্তু জাহিদ বুঝতে পারে এসবে জীবন অগ্রসর হয় না। অন্য কাজ দরকার তার। এসব ভাবতে ভাবতে বিহ্বল, লজ্জিত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে সে।

ধীরে ধীরে ভালোবাসার অবলুপ্তি ঘটেছে। মোহ কাটতে খুব বেশি সময় লাগে না। টাকার কাছে সব কেমন জানি অসহায়। কিছু দিনের মধ্যেই সাহিত্য সম্বন্ধে মেয়েটি উদাসীন হয়ে পড়ে।

আর তাই জাহিদেরও জীবন নিয়ে কোনো উচ্চাশা নেই। জীবনের বাঁকে বাঁকে মানুষের পছন্দেরও পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তনের বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে সে। লেখার মাঝে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। ছাপা হয়েছে অনেক লেখা। আবার কিছু কিছু পড়ে আছে অযতেœ।

নিজেকে এখন আর বুনো মনে হয় না। সার্কাসের কেউ একজন হয়ে গেছে সে। অন্তত সবাই এখন ওকে নিয়ে তাই ভাবছে। ¯্রফে টিউশনী কিংবা দালালিতে নেমে যেতে হবে। যে বাড়িতে খবরের কাগজ রাখা হয় না। নিত্য খাবার নিয়ে ঝগড়াঝাটি সেখানে এসবের আর কি মূল্য হতে পারে? সংসারের এসব আকুতি তাকে লেখা থেকে অনেকটা দূরে ঠেলে দিয়েছে। প্রবাসে গিয়েও ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয়নি। বাবা, চাচাদের এতিহ্য এখন আর এ যুগে কোনো কাজে লাগে না। অতীতের নীল গহীন জীবন এখন অনেক দূরে ফেলে এসেছে। জোনাকির জ্বলে ওঠা নিভে যাওয়া কতদিন তাকে স্পর্শ করেনি। কামনাবাসনায় কি ভরে উঠবে এ মন? কখনও কখনও কিছুটা উঁকি দিয়ে আবার সরে যায়। যেতে বাধ্য। এ জীবন কল্পনার জন্যে নয়। রোদে পুড়ে দগ্ধ জীবন রাতের আঁধারে ফ্রিজ থেকে বের করা মাংসের মতো মনে হয়। হঠাৎ চিন্তায় ছেদ টেনে এনে শিলা বলল, কী ব্যাপার শূন্য হাতেই চলে এলে?

শিলা কখন বাড়িতে ঢুকেছে টের পায়নি জাহিদ। পাবেই কিভাবে বিছানায় শোয়ার পরই ক্লান্তিতে চোখ দুটো বুঁজে এসেছিল প্রায়, হঠাৎ চোখ মেলেই বাস্তব জগতে দেখল, শিলা বলছে এভাবে তো আর জীবন কাটবে না? তাহলে কী হবে বল?

জাহিদ বলল শুনেছি বড় আপাও টাকা বন্ধ করে দিয়েছে। হয়তো ঋণের কারণে টানাটানি চলছে। ঋণ শোধ হলে পরে আবার দেবে।

সেটাতো পরের কথা। এখন কীভাবে চলবে কিছু ভেবেছ?

জাহিদ বলল, বড় আপা এভাবেই তো চালিয়ে নিচ্ছে। উপায় না থাকলে তো এভাবেই চালিয়ে নিতে হবে। আর নিরুপায় হলে ভূতের গলির বাড়িটাতো আছেই। কিন্তু বাড়ির দায়িত্ব কেউ নেবার মতো নাই। খাজনা, বিল সবই বছরের পর বছর জমা হচ্ছে। সমস্যা কিছু হলেই বাড়ি বিক্রির ধান্দা।

বড় আপা একমাত্র এ বাড়িটা আগলিয়ে রেখেছে। তার অনেক পরিশ্রম জড়িত এ বাড়ির পেছনে। এগুলো একপ্রকারের নিরবচ্ছিন্ন ও বাজে খাটুনি। এ পরিবারে আপার শক্তি বেশি। তাই তার এ খাটুনি। একটি পরিবারকে এভাবে আগলিয়ে রাখা। কুড়িটি বছর ধরে গাধার গড্ডলিকা প্রবাহ টেনে নেওয়া নিরেট ধৈর্যের পরিচয়। কিন্তু বড় আপা এ পরিবারে তার শক্তির মর্যাদাবোধ পায়নি। বড় আপার এমন বহু গচ্ছিত সময় এ বাড়ির অপচয়ের মধ্যে ব্যয় হয়েছে।

শিলা বলল, তুমি এসেছ এদিকে বাজার সদাই সব শেষ হয়ে গেছে। ভাগ্যিস গত দুই মাস আগে আপা টাকা পাঠিয়েছিল। তা না হলে যে কি হতো?

জাহিদ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, বেশ বাতাস বইছে বাইরে। বহুদিন পর নিজের দেশের বাতাসের ছোঁয়া পেলাম।

শিলা বলল, বাতাসের আবার দেশ বিদেশ কি? আমি কি বলছি তোমার কানে ঢুকছে না? কয়েকদিন আগে তোমার ছোট ভাই তার বউ নিয়ে এসে সব দেখে গিয়েছে। কই কিছুই তো দিয়ে গেল না? ভালোই হয়েছে। তোমার ছোট ভাইয়ের বউ তো আমাদের ভিক্ষুক মনে করে। দেয়নি ভালো করেছে নইলে খোঁটা শুনতে হতো।

আমরা তো ভিক্ষুকই। বড় আপার দয়ায় চলি।

তোমার কি তাই মনে হয়। আমরা তো ওদের বাড়ি দেখে শুনে রেখেছি। তা না হলে এতোদিনে ঘুঘু চরতো। ওরা ভাবে আমরা এ বাড়িতে আছি। সুতরাং এ বাড়ির দেখভাল তো আমরাই করবো?

জাহিদ কোন প্রত্যুত্তর করল না।

অথচ আমাদের ভাবে ভিক্ষুক। শিলা বলল, আপার কথা কি একবারও ভেবেছে তোমার ছোট ভাই?

জাহিদ হঠাৎ করে গ্লানি বোধ করল। কি মিথ্যা কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছে। কী মর্মান্তিকভাবে জীবনকে এড়িয়ে চলছে। জীবনটা কি কঠিন বেদনার। নিজেকে বীভৎস কাপুরুষ মনে হচ্ছে। অন্তরাত্মা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ভালো লাগছে না। উঠে দাঁড়িয়ে শার্ট গায়ে চড়িয়ে নিল।

শিলা বলল, কোথায় যাচ্ছ?

দেখি বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসি।

ঠিক আছে ঘুরে আস। তুমি তো ডাল রান্না পছন্দ কর। আমি তোমার জন্য রাতে আম ডাল রান্না করছি।

জাহিদের মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠল। জিভে জল এসে গেল। এই শান্তিটুকু মনে নিয়ে বেরিয়ে গেল সে। ফিরে এসে শুনল বড় আপা কিছু টাকা পাঠিয়েছেন। কিছুটা দুশ্চিন্তা কেটেছে। শোন বসে থেকে লাভ নেই। কাল থেকেই পত্রিকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ কর একটা দুটো গল্প লিখলেও তো সামান্য টাকা পয়সা আসে। এক সপ্তাহের বাজার সদাই হয়ে যাবে।

জাহিদের কথাগুলো শুনতে ভালো লাগে না। কী হবে লিখে। কিংবা এভাবে বাড়ি আগলে রেখে। একটা সময় দুইতিনজন সন্তান জন্ম দিয়ে নিকষ কালো অন্ধকারে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার? না হতে পারবে নামি দামি লেখক কিংবা বাড়ির মালিক। আকাশ পাতাল ব্যবধানের জীবনে সামান্য একজন মানুষ সে। অসামান্য হয়ে ওঠার ইতিহাস তার জানা নেই। কারও জন্ম হয় পৃথিবীতে অপচয় করার জন্য কিংবা জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানোর জন্য। এরা জগতের নতুন তথ্য বের করে। সম্ভবকে অসম্ভব করে তোলে। সরকারি অফিস আদালত থেকে বের করে আনে নিরবচ্ছিন্ন কত দলিল!

অথচ জীবনকে যারা বাঁচিয়ে রেখেছে। অনেকগুলো জীবনকে। এদের নেই কোনো নস্টালজিক শক্তি কিংবা সামর্থের তীব্র ঘূর্ণি অথবা লাম্পট্য!

বিবাহ, সন্তান জন্ম দেওয়া, জীবনকে বয়ে বেড়ানো সন্তানদের মানুষ করা কত কঠিন পরিশ্রম। শান্তি রাখবার কত কঠিন প্রয়াস। এদের কথা কে কবে বলেছে, কিংবা বলবে? তারা তো কেবল কম মহান নয়! এই উপেক্ষিত জীবনকে মর্যাদাবান করে তোলা কত কঠিন!

পরদিন ভোরে উঠেই খাতা কলম নিয়ে বসল জাহিদ। কলমে তো মানুষের দাবি মেটে না। তবুও প্রতিবাদী ভাষা যতটুকু দাবি মেটাতে পারে। অবহেলিত মানুষগুলো যতই সোচ্চার হোক পৃথিবীর তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

জগৎ তার নিয়মে চলে, এটাই জগতের রীতি। উপেক্ষিত মানুষের কোনো পুরস্কার তার জানা নেই। জাহিদও তাদের দলেরই একজন। এ জগতে তার কোন ঠাঁই হয়নি। বাবা বলতেন, এ জগতে আশা করে কোনো লাভ নেই। বাবার কথাই হয়তো ঠিক। আমি সাহিত্য করব এবং একই সঙ্গে আমি টিউটর হবো।

শিলার চোখ উজ্জ্বল ও বিস্ফারিত। কী বলছো তুমি? এতো খুশির খবর। আমিও তোমাকে সাহায্য করতে পারবো।

তুমি কি সাহায্য করবে?

আমার পরিচিত জনদের মাঝে বিক্রির ব্যবস্থা করে দেব।

তা ঠিক। সেটা অবশ্য তুমি পারবে। তোমার পরিচিতের গণ্ডি কম নয়! এটি তোমার বদান্যতা। তবে এ বদান্যতা আগে দেখাওনি কেন? তাহলে আমার কবিতার বইগুলো এমন বিফলে যেতো না।

শিলা এ প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারল না। শুধু আগ্রহ সহকারে বলল, আজই তুমি কাজ শুরু করে দাও। আর দেরি নয়। মেঘে মেঘে তো অনেক বেলা হয়ে গেল। টাকা ছাড়া কি জীবন চলে?

জাহিদের জীবনের প্রথম পর্বের এখানেই সমাপ্তি। দ্বিতীয় পর্বের শুভযাত্রা।

ক্রমে ক্রমে সে বড় আপার মত হতে চায়। জীবনের কাছে তার আত্মাহুতি দেওয়া চলবে না। অলস জীবনের বাইরে তার পদার্পণ কেবলই শুরু হলো। লোভ, লালসা, স্থূলতা নেই তার জীবনে। কোথাও কোন উৎকৃষ্ট পুরস্কারের জন্য তার কোনও অপেক্ষাও নেই। পরিবারের ভেতরে সুখ-শান্তি বজায় রাখার যাত্রা সে শুরু করেছে। এখানে তার স্ত্রী, ভাই-ভাবি এবং একসময় সন্তান যোগ হবে। অপ্রিয় প্রয়াসের অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাবে সে।

অসীম সাহস ও সহিষ্ণুতার ভেতরে জীবন এগিয়ে চলবে। জীবনের গতিকে উপেক্ষা করার সময় নাই। নিস্ফলতার মাঝেই জীবনের অর্জন করে নিতে হয়।