সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

পাঠ-প্রতিক্রিয়া : তপন বাগচী

July 28th, 2018 6:32 pm
পাঠ-প্রতিক্রিয়া :  তপন বাগচী

পাঠ-প্রতিক্রিয়া

হরিপদ দত্তের নিষিদ্ধ ঠিকানা : প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া

ভুল আমারও হতে পারে, সে দায়ও একান্তই আমার

তপন বাগচী

একটা বইয়ের আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল শব্দঘরে। হরিপদ দত্তের নিষিদ্ধ ঠিকানা উপন্যাস নিয়ে আমার কিছু প্রতিক্রিয়া। একে সমালোচনাসাহিত্য-পদবাচ্য বলতে আমার বাঁধে। কিন্তু লেখাটি পড়ে অনেক খ্যাতিমান সাহিত্যিক আমাকে যেমন প্রশংসা করেছেন আবার টীকাটীপ্পনী কাটতে ছাড়েননি। অনেকে ভেবেছেন যে, এটা হয়তো হরিপদ দত্তের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত রেষের প্রকাশ। কিন্তু হরিপদ দত্ত’র প্রতিক্রিয়া পাঠের পরে সবাই বুঝবেন যে, এটি একান্তই সাহিত্যের প্রতি আমার আত্মঘোষিত দায় থেকে রচিত সামান্য আলোচনা। আমি কৃতজ্ঞ যে, হরিপদ দত্ত আমার আলোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। যেসব বিষয়ে তিনি আমার সঙ্গে একমত হননি, সেখানে নিজের ব্যাখ্যা হাজির করে আমাকে এবং পাঠককে সজাগ রাখতে চেয়েছেন। এই বিষয়টাকে আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করছি। তবে এখানে একটু ফাঁক থাকে এই যে এই বইয়ের পাঠক, আমার আলোচনার পাঠক আর হরিপদ দত্তের পাঠ-প্রতিক্রিয়ার পাঠক, এক না-ও হতে পারে। তাই সকলের ভ্রান্তিমোচন (!) সম্ভবপর হয় না। এক্ষেত্রে পাঠক হিসেবে আমার প্রত্যাশা হলো,  লেখকের রচনাকেও হতে হয় স্বব্যাখ্যাত, যাতে পাঠকের আর ভুল বোঝার অবকাশ থাকে না। আমি যে সকল ভুলের ইঙ্গিত করেছি, হয়তো তা অন্য পাঠকের বা সমালোচকের কাছে ভুল না-ও মনে হতে পারে। ভুল আমারও হতে পারে, সে দায়ও একান্তই আমার।

বেশ কয়েকবছর আগে কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের অনুরোধে হরিপদ দত্তের ‘কথা ও সাহিত্য’ গ্রন্থের একটা আলোচনা লিখেছিলাম ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সাহিত্যপৃষ্ঠায়। ওই গ্রন্থে আমার ভালো লাগার প্রকাশ ছিল। কেন ভালো লেগেছিল, তা-ও বলেছিলাম। এবং হরিপদ দত্তরা কেন এত ভালো লিখেও পুরস্কার-পদক পান না, তা নিয়ে আক্ষেপও ঝেড়েছিলাম।  ভাবলাম, লেখক খুশি হবেন। কিন্তু শাহবাগে গিয়ে প্যাপিরাস-এ দাঁড়াতেই শুনি লেখক আমাকে গালিগালাজ করে গেছেন। আমি তো অবাক! গালি খাওয়ার মতো কোনো বাক্য তো উচ্চারণ করিনি। আমি তৎক্ষণাৎ ছুটলাম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের ‘নতুন দিগন্ত’ কার্যালয়ে। গিয়ে কৈফিয়ত চাইলাম গালিগালাজের। হরিপদ দত্ত বললেন, ‘আরে এরকম প্রশংসা করলে লোকে ভাববে আমি বুঝি তোমাকে দিয়ে লিখিয়েছি।’  আমি হাসলাম। লিখেছি, আমার দায়িত্বে, সাহিত্য-সম্পাদকের  অনুরোধে, কিন্তু লেখক কেন সেখানে দায়ী হবেন।

তখন প্রশংসা করেও পার পাইনি, এবার একটু সমালোচনা করেও যে পার পাব না, তা আমি আশঙ্কা করেছিলাম। কিন্তু আমার আশঙ্কা আজ আশীর্বাদ হয়ে ঝরে পড়ল, যখন তিনি লেখেন, ‘তপনের এই সমালোচনা শিল্পের স্বার্থে। এমন সমালোচককেই বলে শিল্পের শিক্ষক’। আমার সবিনয় বক্তব্য, এতটা যোগ্য আমি এখনও হয়ে উঠিনি। তবু তার এই আশীর্বাদ মাথা পেতে নিয়েছি, যেন আমার সামনের লেখায় এই শুভকামনার শুভপ্রভাব পড়ে, যেন তার উল্লেখিত ‘ভাড়াটে লেখক’ না হয়ে উঠি, মনে মনে এই প্রার্থনা করি।

সমালোচনা লিখতে গিয়ে প্রশংসা যেমন পেয়েছি, গালমন্দ তেমন কম খাইনি। কত বন্ধু যে আমার শত্রু হয়েছে, তার সংখ্যা কম নয়! তারপর নতুন প্রজন্মেও অনেক লেখক নতুন বই নিয়ে আসে, অভিমত জানতে চায়। এটা একধরনের সম্মান বৈকি। ভেবেছিলাম, হরিপদ দত্ত খুব রাগ করবেন আমার প্রতি, কিন্তু আমার ধারণাকে বদলে দিয়ে তিনি নিজের উদারতা ও মহানুভবতার প্রমাণ রাখলেন। প্রকৃত লেখক বলেই তাঁর পক্ষে এই আঘাত মেনে নেওয়া সম্ভবপর হয়েছে।

প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে হরিপদ দত্তের মতো খ্যাতিমান লেখক যখন আমার লেখাকে আমলে নিয়েছেন, তখনই তো আমার লেখার সার্থকতা ঘোষিত হয়ে যায়। লেখক হরিপদ দত্তকে এবং এই আলোচনার মাধ্যমে সাহিত্যের একটা সুস্থ বিতর্ক উপস্থাপনার জন্য শব্দঘর সম্পাদক মোহিত কামালকে শ্রদ্ধা জানাই।