সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

লিটল ম্যাগ : ছোট কাগজ চালচিত্র : মুনতাসীর মারুফ

July 28th, 2018 6:27 pm
লিটল ম্যাগ : ছোট কাগজ চালচিত্র : মুনতাসীর মারুফ

লিটল ম্যাগ

ছোট কাগজ চালচিত্র

মুনতাসীর মারুফ

চালচিত্র নামের ছোট কাগজটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। এর পর পেরিয়ে গেছে ২৯ বছর। এই ২৯ বছরে এই ছোট কাগজটি পেরিয়েছে নানা চড়াই-উৎরাই, লেখক-তালিকায় এসেছে পরিবর্তন। অনেকে লেখা ছেড়ে দিয়েছেন, অনেকে ছেড়ে গেছেন পৃথিবীও। যুক্ত হয়েছে নতুন মুখ। উত্তরবঙ্গের সাহিত্যপ্রেমী কিছু মানুষের নিরলস প্রচেষ্টায় অনিয়মিতভাবে হলেও প্রকাশিত হয়ে এসেছে ছোট কাগজটি। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই ছোট কাগজটির ২৩তম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে।

উপন্যাস, গল্প, অণুগল্প, গদ্য, কবিতা, লোকসাহিত্য, ইতিহাস ঐতিহ্য, ভ্রমণ, অনুবাদ  ছাড়াও এ সংখ্যার বিশেষ আয়োজন ‘বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহল’। আটষট্টি বছর ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ছিটমহলগুলো রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে থাকলেও বাংলা সাহিত্যে ছিটমহলবাসীর দলিত জীবনের কথা প্রায় অনুপস্থিতই বলা চলে। জনপ্রিয় সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের ২০১০ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ভূমি ও কুসুম ছিটমহলের পটভূমিতে বাংলাদেশে লেখা সম্ভবত প্রথম উপন্যাস। এর বাইরে ছিটমহলকে উপজীব্য করে আলোচিত তেমন আর কোনো লেখার কথা জানা যায় না। সে হিসেবে চালচিত্রের এই আয়োজন অবশ্যই ব্যতিক্রমী, প্রামাণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। ছিটমহলের ইতিহাস, ছিটমহলবাসীর বঞ্চনা, দুঃখ-কষ্ট, দারিদ্র্য, শিক্ষাহীনতা, চিকিৎসাহীনতা, নিরপত্তাহীনতা আর ২০১৫-এর ৩১ জুলাই-এর মুক্তির আনন্দ-এসব বিষয় ফুটে উঠেছে নয়টি প্রবন্ধে। লিখেছেন আলফাজ আইয়ূব, সসীম কুমার বাড়ৈ, মো. হাবিবুর রহমান, তাহমিন হক ববি, আউয়াল আহমদ, সেলিম মো. শহিদুল আলম, গোলাম সারোয়ার স¤্রাট, রাফিক আহান্জ ও রাজা সহিদুল আসলাম। আলফাজ আইয়ূবের ‘ছিটমহল : ঔপনিবেশিক দায়ভার এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক দায়মুক্তির উপাখ্যান’ বিশেষভাবে উল্লেখ্য। এই প্রবন্ধটি লিখতে গিয়ে যে প্রাবন্ধিককে যথেষ্ট পরিশ্রম ও গবেষণা করতে হয়েছে তা পাঠকমাত্রেই বুঝতে পারবেন। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ৩১শে ডিসেম্বর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে কোম্পানির ভারতবর্ষে আগমন, কারখানা স্থাপনের অনুমতি লাভ, বাণিজ্যের পাশাপাশি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ, ১৭৫৭-এর পলাশির যুদ্ধ, ১৮৫৭-এর সিপাহী বিদ্রোহ, ১৯৪৭ সালের ভারতবর্ষ বিভাজন, সীমানা বিভাজনে ব্রিটিশদের কূটচাল-ধাপে ধাপে এসবের বিবরণ দিয়ে প্রাবন্ধিক প্রমাণ করছেন- ‘ছিটমহল সমস্যা ঔপনিবেশিক শাসকচক্রের সিদ্ধান্তে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে সম্পন্নকৃত বঙ্গভঙ্গের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক ফলাফল।’… ‘কিন্তু একে উপস্থাপনা করা হয় এমনভাবে যে মনে হয় ছিট যেন পৌরানিক এলাকা। আর তাই এদের উৎপত্তি ঢাকা পড়ে গেছে কিংবদন্তীর আড়ালে।’ ১৯৪৭ পরবর্তী সময় থেকে ২০১৫-এ ‘ছিটমহল’ নামের অভিশাপ থেকে এর বাসিন্দাদের মুক্তি পর্যন্ত সময়ের রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক ঘটনাপ্রবাহও লেখক তুলে ধরেছেন বিশ্বস্ততার সাথে।

ছিটমহলের বাসিন্দাদের কষ্ট-বঞ্চনার প্রামাণ্য গল্প মুহম্মদ শহীদ উজ জামানের ‘দ’। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘পোহাতু’-এর জন্ম করতোয়া নদীর পাশঘেঁষা এক ছিটমহলে। পোহাতু আর তার পিতা আকালুর স্মৃতির পথ ধরে উঠে আসে ছিটের বাসিন্দাদের দুঃখ-যন্ত্রণার খ- খ- চিত্র। আকালুর পিতা ভংলুর আক্ষেপ, চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু, মৃত্যুশয্যায় শায়িত ভংলুর আঙুর খাওয়ার অন্তিম ইচ্ছে পূরণে আকালুর প্রাণান্ত চেষ্টার পরিণতি, পোহাতুর স্কুল থেকে বিতাড়িত হওয়া, বারবার স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, এরই মাঝে বয়ে চলা জীবন, মৃত্যুর আগে পোহাতুর মা হাজেরার বিশ্বাসভরা উচ্চারণ – ‘এইবার কিন্তুক ছিটখান বাংলাদেশ হোবেই… আফসোস! তোর বাপও দেখি যাবা পারিল নাই, মুইও নাহায়।’, সত্যি সত্যি হাজেরার মৃত্যুর তিন মাস পরই ছিটের বাংলাদেশ হয়ে যাওয়াÑ পাঠককে ছুঁয়ে যাবে নিশ্চিত। আজমত রানার ‘টান’ এবং আফরোজা পারভীন রিকার ‘নেকড়ে নিধনপর্ব -১’ ও ছিটের মানুষের কষ্ট-বঞ্চনার গল্প।

অসিত বিশ্বাস-এর উপন্যাস কালের গান্ধারী গড়াই নদীর তীরবর্তী ধাই ও কাহার সম্প্রদায়ের জীবন-আলেখ্য। মাতৃতান্ত্রিক ধাইসম্প্রদায়ের মহিলাদের কাজ ‘অন্য নারীদের প্রসব খালাস করা এবং এ থেকে যা আসে তা দিয়ে সংসার চালানো, নাড়ানো।’ পুরুষরা ‘লাঠিখেলা, হাট-বাজারে কাড়া পেটানো ও গরিব-দুঃখীর বিয়েতে ঢোল-সানাই বাজায়।’ অন্যদিকে কাহাররা ‘পাল্কি, ডুলির বাহক। কায়েত বামন ও নামি-দামি ঘরের নারীপুরুষসহ নয়া বউ বহন করে।’ এই দুই প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনের আনন্দ, বেদনা, প্রাত্যহিকতা, স্বপ্ন, প্রেম, আকাক্সক্ষা, বঞ্চনার নির্মোহ বিবরণ এই উপন্যাসটি। নদী ভাঙন, নদীর বুকে জেগে ওঠা চর, শিল্পায়ন ও নগরায়নে এদের ভাগ্য বিড়ম্বনার বিষয়টি অনবদ্য নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন ঔপন্যাসিক।

উপন্যাস অংশে স্থান পেলেও সাগিনো ভ্যালিকে ঠিক উপন্যাস বলা চলে না। লেখক সুধাংশু শেখর বিশ্বাসও প্রারম্ভেই বলে নিয়েছেনÑ ‘সব মিলিয়ে এই রচনাটি না উপন্যাস, না ভ্রমণ কাহিনী’। রচনার উপজীব্য লেখকের দেড় মাসের আমেরিকা ভ্রমণ। ‘সাগিনো ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটি’-পড়–য়া সন্তানের সাথে লেখকের দেখা করা এই ভ্রমণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলেও এবং ভ্রমণকাহিনির আদলে কাহিনি এগিয়ে গেলেও প্রবাসী বাঙালিদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার চিত্রও যোগ হয়েছে এতে, মিশেছে কল্পনার রং-ও। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ওয়াশিংটনের পথে পথে ভ্রমণ, স্পেস মিউজিয়াম, ডিউক ইউনিভার্সিটি, নায়াগ্রা ফলস, সাগিনো ভ্যালি, ইয়েল ইউনিভার্সিটি, মার্ক টোয়েনের বাড়ি প্রভৃতি যেমন এই কাহিনিতে উঠে এসেছে, তেমনি আমেরিকানদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ প্রভৃতিও তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক।

ঋষি এস্তেবানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প ‘মানুষের সম্ভাবনা।’ পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া এক ব্যাংক কর্মকর্তার আত্মহত্যা-পূর্ববর্তী আত্মকথনমূলক গল্প ‘ধমনী’, লিখেছেন আশান উজ জামান। গোলাম মুর্তজা সোহাগ লিখছেন তেরোটি অণু গল্প।

জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির দুটি গল্পের বঙ্গানুবাদ করেছেন হোসেন মোতাহার। ‘উবে গেল হাতি’ গল্পটি হাতির খেদা থেকে হাতির উধাও হওয়াকে কেন্দ্র করে রচিত রম্য-স্যাটায়ারধর্মী একটি রচনা। অন্য গল্পটির  শিরোনাম ‘এয়ারপ্লেন : অর হাউ হি টকড টু হিমসেলফ এ্যাজ ইফ রিসাইটিং পোয়েট্রি’ কেন বাংলায় অনূদিত হলো না- এ প্রশ্নটি পাঠকের মনে জাগাই স্বাভাবিক। গল্পদুটির সাথে হারুকি মুরাকামির পরিচিতি সংযুক্ত করা হলে ভালো হতো।

জিম্বাবুয়ের সাম্প্রতিক কিছু কবিতার ভাষান্তর করেছেন শামীম ফারুক। সেখানেও মূল কবিদের পরিচিতি পাঠকের কাছে অপ্রকাশ্যই থেকে গেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের আঞ্চলিক ভাষার কবিতা লিখেছেন আশরাফ-উল আলম, মো. জালালউদ্দিন ও রাজা সহিদুল আসলাম। এছাড়াও শামীম ফারুক, শাফি সমুদ্র, ফরহাদ নাইয়া, আলী আর রেজা, রাফিক আহনাজ, মাহমুদ নাসির, অনামিকা তাবাসসুম, হযরত আলী, খবির আহমেদ, সা’ইফ সজল, সামসুল আলম খন্দকার প্রমুখ কবিদের কবিতা স্থান পেয়েছে। প্রতিবাদের ছড়া লিখেছেন এস এম খলিল বাবু। ওপার বাংলার কবি মিহির সরকার, দেবাশীষ প্রধান, পলাশ দে, প্রদীপ আচার্য লিখেছেন কবিতা। ওপারের সসীম কুমার বাড়ৈ-এর গল্প ‘ভেগাই-এর মাধুকরী’ ভারতবর্ষ বিভাজন পূর্ববর্তী সময়ে হিন্দুসম্প্রদায়ের জাত-প্রথার পটভূমিতে রচিত।

লিখন তারিকুল আলমের ‘নীলফামারী জেলার ঐতিহ্যবাহী উপাসনালয়’ রচনাটিতে বিবৃত হয়েছে জোড়দরগা জামে মসজিদ, আঙ্গারপাড়া সাত গম্বুজ জামে মসজিদ, চিনি মসজিদ, পাগলা পীর মাজার ও মসজিদ, হযরত শাহ কলন্দর (রহ.), হযরত ঘোড়ে শাহ (রা.), পীর মীর মহীউদ্দিন চিশতি (র.), শাহ মকদুম (ঢেলাপির বাবা) ও বুড়াপীর-এর মাজার, রাজা হরিশচন্দ্রের পাট বা প্রাসাদ, ক্যাথলিক গীর্জা প্রভৃতির সচিত্র ইতিহাস।

পঞ্চগড় জেলার লোকসাহিত্য নিয়ে লিখেছেন দুলাল রায়। তার লেখনীতে তিনি পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এই জেলার লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ পালাটিয়া গান, কান্দে না বিষহরীর গান, মেছেনীর গান, ক্ষ্যাপার গান, জিতুয়ার গান, ঢুলিয়াহাটির গান, হুদুমার গান, কর্মসংগীত, বায়োস্কোপের গান, ঘুমপাড়ানি গান, বানর নাচের গান, গোরক্ষনাথের পাঁচালি, লক্ষ্মীর পাঁচালি, লোকছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, শিল্লুক বা ধাঁধা, মন্ত্র, লোকক্রীড়া এবং নানা লোকাচার ও প্রথার সাথে। ড. চিত্তরঞ্জন দাস-এর ‘পর্তুগালে চারদিন’ একটি ভ্রমণকাহিনি। সুখপাঠ্য এ রচনাটির সাথে আলোকচিত্রগুলো খুবই ছোট হওয়ায় পাঠকের জন্য দুর্বোধ্য ও চক্ষু-পীড়াদায়ক।

‘এক সঙ্গে সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ’ শীর্ষক অংশে স্থান পেয়েছে তার রচনা ‘আমেরিকান নামা/বোমারু বিতান খোলা দিবা-রাত্রি’, ‘২১/২/১৯৫২’ এবং ‘খবরের কাগজে যা থাকে না’। এছাড়া গদ্য লিখেছেন জিয়াউদ্দিন শিহাব- ‘ড্রপআউট’।

রাজা সহিদুল আসলামের রঙিন আলোকচিত্র নিয়ে রয়েছে আলাদা উপস্থাপনা। ‘প্রান্তিক নারী’ শীর্ষক এই উপস্থাপনায় পনেরটি আলোকচিত্রে ফুটে উঠেছে উত্তরবঙ্গের কর্মঠ ও কর্মজীবী নারীর জীবন।

বিষয়বৈচিত্র্যে চালচিত্র আলাদা মনোযোগের দাবি রাখে। আশা করি, সাহিত্যমনা মানুষগুলোর এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং পাঠকমহলেও এই ছোট কাগজটির জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।