সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

বইকথা : কবিতার কুয়াশা ক্যাফে’তে আমন্ত্রণ : জুবিন ঘোষ

July 28th, 2018 6:03 pm
বইকথা : কবিতার কুয়াশা ক্যাফে’তে আমন্ত্রণ : জুবিন ঘোষ

বইকথা

কবিতার কুয়াশা ক্যাফে’তে আমন্ত্রণ

জুবিন ঘোষ

কুয়াশা ক্যাফে

পিয়াস মজিদ

প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ

প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ

প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৫

পৃষ্ঠা ৫৬ ॥ ১২০ টাকা

 

সাধারণভাবে আমরা দেখতে অভ্যস্ত বাংলাদেশের কবিতা মানেই তার হৃৎস্পন্দনে ছড়িয়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা-আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা- পরবর্তী স্বপ্নভঙ্গের উপাখ্যান, স্বৈরাচারের উত্থান, চেতনার স্বাধিকার। চিরহরিদ্রাভ ভৌগোলিক সবুজাভ রূপের এবং সহজ চেতনার জন্যই আমরা বারংবার দেখতে পাই বাংলাদেশের বাংলাদেশের কবিতায় প্রকৃতি ও জলবায়ুর অপরূপ প্রভাব, কবিতা বাংলাদেশের রক্তে রয়েছে, সবধরনের কবিতাতেই বাংলাদেশ দারুণ কাজ করেছে তবে বারবারই মনে হয় প্রকৃতি-বর্ণনায় বাংলাদেশ অগ্রণী। আড্ডা পত্রিকায় বাংলাদেশের কবিতা আলোচনার সময় লক্ষ্য করেছিলাম বর্তমানে বাংলাদেশের কবিতা একটা ভিন্নমার্গীয় স্মার্টনেসের দিকে এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ আবার ভাষার বাঁকবদল আসন্ন। সঙ্গে টানা লিখে যাবার একধরনের টেক্সচারের প্রবণতা এসেছে। এমন কিছু টেক্সচার তৈরি হচ্ছে, যা পশ্চিমবঙ্গের কবিরা কিছু ক্ষেত্রে এখনও আয়ত্ত করতে পারেনি। অর্থাৎ প্রথম এবং প্রথম পরবর্তী দশকের কবিরা এটাকে ভাঙছেন। কবিতার কর্জ এটাই যে তার বহমানতা কখনও শেষ হয়নি। বাংলাদেশের ‘অন্যপ্রকাশ’ থেকে ২০১৫ একুশে বইমেলাতে প্রকাশিত কুয়াশা ক্যাফে কাব্যগ্রন্থে সেই ইঙ্গিতই দিয়ে রেখেছেন বাংলাদেশের একুশ শতকের প্রথম দশকের অন্যতম প্রধান কবি পিয়াস মজিদ তার ‘অপুষ্পক উদ্ভিদের ছায়া’, ‘সুড়ঙ্গ থেকে সমুদ্র’, ‘চিত্রবাস্তব’, ‘কুয়াশা ক্যাফে’, ‘জীবন এইমতো’ এবং ‘হেমন্তগুচ্ছ’, ‘নি®প্রদীপ’ ‘সুনীল অভিজ্ঞান’, ‘রাত্রিরচিত’, ‘অফিসকালীন লালন’, ‘পথে পাওয়া’, ‘স্বাগতবিদায়’ প্রভৃতি কবিতার মাধ্যমে।

প্রথমেই যাব পিয়াসের ‘জীবন এইমতো’ কবিতাটিতে। প্রত্যেকটা চলে যাওয়ার উপর দাঁড়িয়ে থাকা আর একটা জীবনের চিত্রকল্প দিয়ে শুরুতেই পাঠককে গভীর দর্শনের দিকে ঠেলে দেয় এবং শেষে তার সেই ফাইনাল ডেসটিনেশনটাই ঘাসের সবুজ উল্লাস হয়ে আবার একটি জীবন্ত প্রাণের উপমা হিসেবে ফিরে আসে কবরের মাটির উপর। এটাই তো একবিংশ শতাব্দীর ভাষ্য। একটা মৃত্যুই যেন অবশেষে তার অনাময় ভালোবাসার বীজ বপণ করে বিশ্ব চরাচরে ছড়িয়ে দিতে চাইছেন আগামীর সবুজের জন্য একনিষ্ঠ স্নেহ। ‘কবর’ শব্দটা এখানে অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায় উচ্চারিত হয়েছে যে বাড়তি বিশেষণ ছাড়াই কবর শব্দের ব্যবহারেই তার উপরে জন্মানো ঘাসের মোড়ক এক অকলুষিত ভিত্তিভূমির পবিত্রতার রূপক হিসেবে শনাক্তকরণ করে দেয় পিয়াস। সেই কবরে শায়িত মৃতের কার্বন, নাইট্রোজেন, খনিজ পদার্থ নিয়েই যেন ঘাস তার উদ্ভিদের রসগ্রাহী খাদ্যনালিতে দৈহিক বৃদ্ধির উপকরণ সংগ্রহ করছে। হিন্দু সংস্কৃতির অদ্বৈতবাদও বোধহয় তাই বলছে, আজ যেখানে তুমি আছ, সেটা ধ্রুবক নয়, এখানে একটা সময় হয়ত গাছপালা ছিল, তোমার শরীর হয়ত বৃক্ষ ছিল, আবার তুমি মরে গেলে তোমার শরীরটাই হয়ত আবার গাছপালা বা পাখি হয়ে যাবে তোমার শরীরের উপকরণ নিয়ে। মৌল কখনও নষ্ট হয় না, তার পরিবর্তন হয় শুধু, ভরের নিত্যতা সূত্রও তাই বলে। গভীরে ভাবলে সব দর্শন-ধর্মও কিন্তু সেই এক জায়গায় স্থির। এখানেই আমরা তার শক্তিশালী কবিত্বের পরিচয় পাই। এই কবিতার শেষেও তাই দুটি আত্মহত্যার উল্লেখ যেন আমাকে তাজ্জব বানিয়ে দেয়-‘পুরোনো পত্রিকার স্তূপে বেঁচে থাকল/ মেরিলিন মনরোর মৃত্যু কিংবা/ দিব্যা ভারতীর আত্মহত্যা।’-লাইন তিনটে পড়তেই আমারও ভাবনা কিছুটা বিস্তার লাভ করে একই সঙ্গে মনে পড়ে গেল সিল্ক স্মিতা, কেয়া চক্রবর্তীর মতো অভিনেত্রীদের রহস্যময় মৃত্যুর কথাও। এই অনন্য ইমেজারি অনুভব মরণশীল মানুষের উপলব্ধির উপান্তে টেনে নিয়ে এসে পিয়াস যেন দেখার একাধারে বস্তুবাদের এবং অন্যদিকে ব্যক্তিবাদের চরম অনাবশ্যকতার উভয় চরিত্রের দ্বিজত্ব।

কবিদের মধ্যেই যেন কাব্যিক সহবাস করে পিয়াস। ভাগিরথী ও পদ্মার ধারাটি যেমন বিচ্ছিন্ন নয়, ঠিক তেমনি হয়তো, তার কবিতায় দুই বাংলার কবিদেরও উল্লেখ মিশে গেছে। এই তরুণ কবির কবিতায় দুই বাংলার অগ্রজ কবিদের অস্তিত্বের সত্য থেকে জীবনের জটিল অংশগুলো ধরা দেয় কাব্যিক ঘোরের সমূহে। ‘হেমন্তগুচ্ছ’, ‘নি®প্রদীপ’ ‘সুনীল অভিজ্ঞান’, ‘রাত্রিরচিত’, ‘অফিসকালীন লালন’, ‘পথে পাওয়া’, ‘স্বাগতবিদায়’ প্রভৃতি কবিতার মাধ্যমে পিয়াস যেন বিরাজ করেন কবিদের অমোঘ অস্তিত্বের সঙ্গে। লালন, কাফকা, জীবনানন্দ, শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ভাস্কর চক্রবর্তী, ফরিদা পারভীন, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, প্রমুখের প্রতি যেন এটাই তার ডিগনিটি এবং পূর্বজ কবিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। ‘সুনীল অভিজ্ঞান’ কবিতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শেষকৃত্যের দৃশ্যটি পিয়াসের কাছে ধরা দেয়, ‘ছাইভস্মের কেওড়াতলা দুপুর/মুহূর্তেই হিরণ্যগর্ভ সমুদ্র হয়ে ওঠে।’ ‘পথে পাওয়া’ কবিতার মাধ্যমে মাত্র চার পঙ্ক্তির সর্বমোট সাতটি মাত্র শব্দ ব্যবহার করে কলকাতার কংক্রিট সভ্যতার প্রতি অদ্ভুত এক উপহাস ছড়িয়ে যায় পর্যটক পিয়াসÑ ‘হৃৎকমল খুঁজছিলেন/ শঙ্খ ঘোষ; পেলেন-/ ধাতব কলকাতা।’ যা বাংলাদেশের তরুণ কবিকে সত্যি আশাহত করে; সমানভাবে আমাদের মনেও যন্ত্রণা দেয়, যেন মনে মনে পিয়াসকে বলি, ‘দুঃখিত পিয়াস তোমাকে একটা কোমল কলকাতা উপহার দিতে পারলাম না।’

পিয়াসের ‘অপুষ্পক উদ্ভিদের ছায়া’ ‘গোলাপের রক্তিম অতলান্ত’ কবিতাদুটির পাঠের প্রাক্মুহূর্তের প্রস্তুতি দীর্ঘতর; তার কৃৎকৌশল, গূঢ়ার্থমূলক ব্যঞ্জনা পাঠকদের কাছে ভিন্নতর অভিজ্ঞান ও মায়াবী নির্মিতি হয়ে ধরা দেয়। পাঠকের প্রস্তুতিও অভিযোজিত না হলে তার মৌলিকতা এবং ভাবের অভিনবত্বের রসাস্বাদনের থেকে বঞ্চিত আশঙ্কাই বেশি। কবিতাদুটির প্রতিটা পঙ্ক্তিতে অবিশ্বাস্য অনুভূতির ছোঁয়া রেখে যান কবি। একটা জিনিস দেখার মতো যে ‘গোলাপের রক্তিম অতলান্ত’ এবং ‘অপুষ্পক উদ্ভিদের ছায়া’ এ দুটো কবিতাতেই কোথাও একটা পরাগ ব্যাপারটা লুকিয়ে আছে,- গোলাপের রক্তিম অতলান্তে ডুব দিলে শেষ পর্যন্ত তা পরাগে এসে পৌঁছায় এবং একইভাবে অপুষ্পক বা সপুষ্পক উভয় উদ্ভিদের ক্ষেত্রেই পরাগরেণু অর্থাৎ সেই বীজ হবার প্রাথমিক শর্তের বা প্রাথমিক অঙ্গের কথাই বলা হয়েছে। ভাবা যায়, ভাবতন্ময়তা কোন্ উচ্চাঙ্গে স্থাপিত হলে ভাবকল্প এরূপ দর্শনে পরিণতি পায়! এইধরনের কবিতার কাছে পাঠক তার নতজানু অভিজ্ঞান চেয়ে নেয়। পিয়াসের ‘গোলাপের রক্তিম অতলান্ত’ কবিতাটি কিছুটা দীর্ঘায়িত, কথা বলার প্রবণতা বেশি হলেও প্রত্যেক সময় কাব্যস্থিত যাপনের তীব্র বৈচিত্র্যের মধ্যে কবি নিজে উপস্থিত থেকেছেন। কবিতাদুটি পড়তে পড়তে যেন মনে হয় যৌনানুভবের এ কোন্ কুয়াশাচ্ছন্ন দর্শন বঙ্গোপসাগরের তীরে পিয়াস তুমি জাহাজ দাঁড় করিয়ে দিলে!

পিয়াসের এই কাব্যগ্রন্থের বেশিরভাগ কবিতায় একেবারেই যে আদিরস উপেক্ষিত তা ভাবার কারণ নেই। থাকলেও যৌনেচ্ছাকে পিয়াস এমন এক শিল্পসম্মত উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে, যা রহস্যগূঢ় ভাবতন্ময়তার মধ্যে সুচারু অন্তর্নিহিত। আগেই যে টানা গদ্যের টেক্সচারের কথা বলছিলাম, পিয়াসের সমগ্র কুয়াশা ক্যাফে কাব্যগ্রন্থে সেই ধরনের টেক্সচারের একটিমাত্র কবিতা এই ‘সুড়ঙ্গ হয়ে সমুদ্র’ যাকে এই কাব্যগ্রন্থের সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি বলে আমার মনে হয়েছে। সেই ধরনের টেক্সচারের নেগেটিভ দিকটি হল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার স্টাকচারাইজেশনে ফ্র্যাগমেন্টেড হয়ে যাবার আশঙ্কা থাকে। পিয়াসের ক্ষেত্রে এই আশঙ্কা অমূলক। তা যেন সাবলীল গতিতেই এগিয়েছে। সেখানে সমুদ্রের মাঝে সুড়ঙ্গ দিয়ে নিজেই যেন আত্মানুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে রূপকের সাঁকো রচনা করে। পিয়াসের বেশিরভাগ কবিতায় আত্মজিজ্ঞাসার প্রশ্নবোধক বা বিস্ময়বোধক চিহ্ন প্রায় অনুপস্থিত। সেখানে এই কবিতায় ‘কাছেই সমুদ্র তবু সুড়ঙ্গ এতটা শান্ত?’ এর মৃদু আত্মজিজ্ঞাসার প্রশ্নবোধক চিহ্ন সাবলীল ভঙ্গিমায় কবিতার আঙ্গিক হয়ে ওঠে। উপর দিয়ে সচ্ছল পদক্ষেপে নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করে তা তিনি ছুঁড়ে দেন পাঠকের দিকে। তেমনই একটা কবিতা ‘সঙ্গমপর্ব’-এ শুষ্ক চুমুর স্বাদ’ ‘এবড়োথেবড়ো, কেটেকুটে/ আমাকে পৌঁছে দেয়-/ মৃত্যু এবং তার আদিম আঁধারে’- বাক্যবন্ধনীগুলোই যেন চুম্বনস্মৃতির অধরা আবেশে জিয়নকাঠি- মরণকাঠি সেই অমৃতসত্ত্বার দর্শন। যখন ওষ্ঠ স্পর্শের সীমানা থেকে অন্তর্হিত হয়, সে প্রহরে যাকে সে উজ্জীবনের চুমু ভেবেছিল, ‘ওপাড়ে গিয়ে’ সে জানতে পারে, ‘সঙ্গম সমাধা হয়েছিল/বাতিল, ভোঁতা/ একটি ব্লেডের সাথে।’ বাতিল ভোঁতা ব্লেডের উপমাটা লক্ষ করার মতো। পরিশেষে সেটাই বিষণœ রোমন্থনে অনুভবের আকর রচিত করে দেয়। এটাই কবিতার পড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎরষু। তবে যেখানে এপারে ‘সাথে’ শব্দ অবশ্য বর্জনীয়-এর মধ্যে পড়ে, বুঝতে পারি সেই ‘সাথে’ শব্দই ওপারে মায়াময় ইঙ্গিতবাহী হয়ে আসে।

অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পিয়াসের কবিতাকে স্লাইডে ফেললে দেখব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কবিতার মধ্যে ছান্দিক উপস্থাপনাকে পিয়াস অনেক আগেই বর্জন করেছে। তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্যগুলো বিশেষ সাঙ্কেতিক, ঋজু অথচ সরল ভাষারীতির যা পাঠকমনস্কে সহজাতভাবে স্থায়িত্ব অর্জন করতে পারে। পিয়াসের কবিতায় প্রত্যক্ষ উপমা, স্টেটমেন্ট, এগুলো সচেতনভাবে বর্জিত। চটকদারি, গিমিক প্রভৃতি অকবিত্বের প্রবণতাগুলোকে হাস্যবদনে এড়িয়ে বরং ভাবনাকে শাব্দিক ট্রান্সফর্মেশন করাতেই সে বিশ্বাসী। একেকটি সংযত বাক্যবিন্যাসে পিয়াসের নির্মেদ ভাষারীতির লেখাগুলিতে স্তবক বিভক্তির প্রবণতাও প্রায় এড়িয়ে চলেছে সে। তার কবিতায় আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখি বারবার পুনরাবর্ত করে বাংলাভাষার বিভিন্ন কবির উল্লেখ। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম চিত্র কারুকার্যে সেন্টার অফ গ্র্যাভিটির মধ্যে থাকে সমোয়চিত সামগ্রিক অনুভবকে ধরার অনন্ত প্রচেষ্টা। তাই হয়তো পিয়াসের কুয়াশা ক্যাফে কাব্যগ্রন্থটি তারই প্রামাণ্য নথি। পিয়াস নিজেও এই সময় যথেষ্ট ইনফ্লুয়েনশিয়াল কবি। তিনি যে বড় পরিসরেও লিখতে পারেন তেমনি ছোট কবিতা লিখতেও যে সমান পারদর্শী, ছোট পরিসরে নিজের ভাবনাকে সে পাঠকের মস্তিষ্কে সঞ্চালিত করে দেয় ছোট ছোট আকরিক অনুভবের মাধ্যমে। পিয়াসের কবিতায় এমন এক অসাধারণ ইমেজারি ক্যাসুয়ালিটি তৈরি হয়, যার প্রতিটি আবার সূক্ষ্মার্থে বোধের বুনোটে সুনিপুণ সুচিশিল্প বলা যায়। পিয়াস তার লেখায় একান্তে মেলোড্রামাটিক রোমন্থন নিভৃতের ভাবনার খোরাক রেখে যায়, তার কবিতা হয়তো আবিষ্কারের নেশা ধরায় না, কিন্তু একটা সম্মোহক শক্তি পাঠককে এক কবিতা থেকে অপর কবিতায় ধাবিত করে। এগুলোই পিয়াসের সিগনেচার ছাপ বলতে পারি। বাংলার ধীমান পাঠকদের অভিনন্দন তাই পিয়াস মজিদের অবশ্যপ্রাপ্য। তার কবিতাগুলো সতত প্রত্যাশার পারদকে উর্ধ্বমুখী করে বলেই হয়তো পিয়াসের কবিতার প্রতি আমার আগ্রহ ক্রমশ বুলবুল হয়।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে বহুতানিক নির্মাণশৈলীতে এরমধ্যেই পিয়াসের পটুত্ব সুবিদিত। ২০১৫ পর্যন্ত পিয়াসের কবিতা চূড়ান্ত বহুস্বরযুক্ত; ভাবনায় জাগলিং থাকে বলেই পিয়াসের কবিতা পাঠের সময় পাঠকদের জন্য কোথাও একটা নিশ্চিন্ত বিস্ময় অপেক্ষা করে যাকে আমরা ওয়াও ফ্যাক্টক বলে জানি। প্রথম থেকে শৈল্পিক বুনোটে পিয়াসের কবিতা শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট বক্তব্যে এসে স্থির হয়। তার বক্তব্যে সে স্থিতিশীল, যা বিশ্বাস করে সেটাই সে বলতে চায় তথা লেখে, সবচেয়ে বড় কথা, অনাবশ্যক অপ্রয়োজনীয় শব্দ তার কবিতাগুলিকে ভারাক্রান্ত করে না। তার কাব্যভাষার সহজিয়া উচ্চারণ পিয়াসের কবিতাকে যেমন জন এবং মনঃসংযোগধর্মী উভয় দিকেই উত্থিত করে। পাঠককে সেই শিল্পসত্ত্বার স্বাদ পেতে গেলে নবনির্মিত এই ক্যাফেতে একবার চেয়ার পেতে বসতেই হবে। এই কেবিনের বেয়ারা-রা আশ্চর্য সব উপস্থাপনা নিয়ে আমাদের মানস-তৃপ্তির উপকরণ সরবরাহ করে যাচ্ছে। কবিতার কুয়াশার এই কেবিন বর্তমানে পিয়াসের। তার তমোঘœ কলম ইতোমধ্যেই কবিতার কফি-কাপগুলো নিয়ে ছড়িয়ে বসেছে কুয়াশা ক্যাফেতে।