সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

বিশ্বসাহিত্য : বব ডিলানের নোবেল ভাষণ : মাসুদুজ্জামান অনূদিত

July 26th, 2018 7:32 pm
বিশ্বসাহিত্য : বব ডিলানের নোবেল ভাষণ  : মাসুদুজ্জামান অনূদিত

বিশ্বসাহিত্য

বব ডিলানের নোবেল ভাষণ

মাসুদুজ্জামান অনূদিত

 

[১০ ডিসেম্বর। পূর্ব ঘোষণা অনুসারে সুইডিশ একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত নৈশভোজে ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়া বব ডিলানের নোবেল বক্তৃতা পড়ে শোনানো হলো।

ভাষণটি পাঠ করলেন সুইডেনে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আজিতা রাজি।]

সবাইকে শুভসন্ধ্যা জানাই। এই সন্ধ্যায় উপস্থিত সুইডিশ একাডেমির সকল সদস্য এবং অন্য সম্মানিত অতিথিদেরকে আমার উষ্ণ অভিনন্দন।

আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি যে সশরীরে আপনাদের মাঝে উপস্থিত হতে পারলাম না, কিন্তু এটা নিশ্চিত জেনে রাখুন, আমি মানসিকভাবে আপনাদের সঙ্গেই আছি এবং এরকম একটা উঁচুমানের পুরস্কার পেয়ে সম্মানিত বোধ করছি। আমি কখনও কল্পনা করিনি বা স্বপ্নেও দেখিনি যে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হবো। খুব কম বয়সে আমি কিপলিং, শ, টমাস মান, পার্ল বাক, আলবেয়ার কামু, হেমিংওয়ে এদের সাথে পরিচিত হয়েছি  তাদের লেখালেখি পড়ে এবং বুঝে তারা এই সম্মান পাওয়ার সত্যি সত্যি যোগ্য ছিলেন। সাহিত্যের এই রথী-মহারথীগণ, যাদের লেখা বিদ্যালয়ে পাঠ্য, স্থান করে নিয়েছে সারা বিশ্বের পাঠাগারগুলোতে এবং পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়- তাদের লেখা আমার উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। এখন সেই তালিকায় আমার নামটা যুক্ত হওয়ায় এই অনুভূতিটা যে কেমন, ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।

আমি জানি না, তারা নিজেরা কখনও নোবেল-সম্মানটা পাবেন বলে আশা করেছিলেন কিনা, কিন্তু আমার মনে হয় যিনি বই, কবিতা অথবা নাটক লেখেন, তিনি হয়তো অজান্তেই এমন একটা স্বপ্ন মনের গভীরে লালন করেন। এই স্বপ্নটা মনের এতটা গভীরে থাকে যে, সেটা যিনি পান, তারও জানা থাকে না।

আমাকে কেউ যদি কখনও বলতো, আমার সুপ্ত সম্ভাবনা আছে নোবেল পুরস্কার জয়ের, আমি হয়তো ভাবতাম, এ তো অনেকটা চাঁদে দাঁড়িয়ে থাকার মতো ব্যাপার হয়ে গেল। প্রকৃতপক্ষে, আমি যে সময়টাতে জন্মগ্রহণ করেছি, এবং সেই সময়ের কয়েক বছর পরেও এমন কেউ ছিলেন না যে, নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য বলে গণ্য হতে পারতেন। ফলে, আমার মনে হচ্ছে, আমি অন্তত সেইসব বিরলদেরই একজন যারা এই পুরস্কারটা পেয়েছেন।

আমি যখন এই অপ্রত্যাশিত খবরটা শুনি তখন রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। এবং খবরটা মেনে নিতে আমার বেশ খানিকটা সময় লেগে যায়। আমি উইলিয়াম শেক্সপিয়রের কথা ভাবতে থাকি- সেই মহান লেখক, তিনি নিজেকে নাট্যকার হিসেবে দেখতেন। এটাও ভাবতেন না যে, সাহিত্য রচনা করছেন। তিনি লিখতেন কেবল মঞ্চের জন্য, যা ছিল বলবার, অর্থাৎ অভিনয়ের বিষয়, পঠিত হবার কিছু ছিল না। আমি নিশ্চিত, যখন তিনি হ্যামলেট লিখছিলেন তখন অনেক কিছু নিয়েই ভাবছিলেনÑ“আচ্ছা, এই চরিত্র বা সেই চরিত্রের জন্য উপযুক্ত অভিনেতা অভিনেত্রী কে হতে পারেন?” কিংবা “কীভাবে মঞ্চস্থ করা হবে নাটকটি?” “আমি কী আসলেই এর পটভূমিটা ডেনমার্কের ধরনে রাখতে চাই, নাকি অন্যরকম কিছু?” শেক্সপিয়রের সৃষ্টিশীল চিন্তা আর উচ্চাকাক্সক্ষাই নিঃসন্দেহে এগিয়ে ছিল। সবার আগে আসলে কিন্তু এই ধরনের বাস্তব বিষয়-আশয় বা সুযোগ-সুবিধা নিয়েও ভাবতে হয়েছিল তাঁকে। “অর্থায়নটা কি ঠিকমতো ঘটবে?” “সেখানে আমার পৃষ্ঠপোষকদের জন্য যথেষ্ট ভালো আসন থাকবে তো?” “আমি মানুষের মাথার খুলি কোথায় পাব?”

আমি বাজি ধরে বলতে পারি, “এসব কী সাহিত্য হচ্ছে”- শেক্সপিয়ার কখনও তা চিন্তা করেননি।

কিশোর বয়সে আমি যখন গান লেখা শুরু করি এবং আমার সামর্থ্যের জন্য সুনাম অর্জন করতে থাকি, তখন থেকেই গান নিয়ে আমার আকাক্সক্ষা বাড়তে থাকে। আমি চাইতাম ওই গান লোকে কফিহাউসে বা বারে বসে শুনুক। পরে কার্নেগি হল, লন্ডন প্যালাডিয়ামের মতো স্থানেও বাজুক, চাইতাম আমি। আমার আর যে উচ্চাকাক্সক্ষাটা ছিল সেটা হলো, আমার গান রেকর্ড হোক, শোনানো হোক রেডিওতে। এটা সত্যিই আমার জন্য ছিল অনেক বড় পুরস্কার। রেকর্ড করা এবং নিজের গান রেডিওতে শোনানোর অর্থ আপনি একসঙ্গে অনেক দর্শকের কাছে পৌঁছে যাবেন এবং আপনি যা করার জন্য মনস্থির করেছেন তা করে যেতে পারবেন।

এটা ঠিক, দীর্ঘ সময় ধরে আমি সেটাই করে চলেছি, যা করব বলে মনস্থির করেছিলাম। আমি অনেক অনেক রেকর্ড করেছি এবং সারা বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার কনসার্ট করেছি। কিন্তু আমি যত কিছুই করি না কেন সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল আমার গান। আমার গান স্থান পেয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির অনেক মানুষের জীবনে আর সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ।

একটা জিনিস অবশ্যই বলব। একজন পারফর্মার হিসেবে আমি যেমন প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের জন্য পারফর্ম করেছি, তেমনি আবার পঞ্চাশজনের জন্যেও করেছি। আমি আপনাদের এটা বলতে পারি যে পঞ্চাশজনের জন্য পারফর্ম করা সত্যিই বেশি কঠিন। পঞ্চাশ হাজার লোকের মধ্যে থাকে সমজাতীয় অনুভব বা একত্ব। পঞ্চাশজনের কিন্তু তা থাকে না। এই পঞ্চাশজনের প্রত্যেকের থাকে আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব, স্বাতন্ত্র্যবোধ, পরিচয়, যার যার পৃথিবী যেন আলাদা। তারা ঠিক স্পষ্টভাবে কোনো কিছু উপলব্ধি করতে পারে না। আপনার সততা এবং এটা কীভাবে আপনার প্রতিভার গভীরতার কতখানি সেটা এই পঞ্চাশজনকে দিয়ে পরিমাপ করা যায়। নোবেল কমিটি বেশ ক্ষুদ্র হওয়া সত্ত্বেও আমাকে তারা বুঝতে পেরেছে।

শেক্সপিয়ারের মতো আমিও আমার সৃষ্টিশীল প্রচেষ্টার সাধনায় ব্যস্ত আছি এবং জীবনের অন্য সব বাস্তব বিষয়ের সঙ্গেও বোঝাপড়া করে চলেছি। “এই যে গানগুলো লিখলাম সেসবের জন্য সবচেয়ে ভালো সংগীতকার কে হতে পারেন?” “আমি কি ঠিক স্টুডিওতে রেকর্ড করব?” “এ গানটার গঠনটা কী ঠিক আছে?” কিছু বিষয় কখনও কখনও বদলায় না, এমনকি চারশ বছরেও।

নিজেকে কখনও জিজ্ঞাসা করার সময়ই পাইনি “আমার গানগুলো কী সত্যি সত্যি সাহিত্য হয়ে উঠেছে, নাকি হয়নি?”

আমি তাই সুইডিশ একাডেমিকে ধন্যবাদ জানাই- একইসঙ্গে সময় নিয়ে পুরস্কারের জন্য আমার কথা বিবেচনা করবার জন্য আর সবশেষে কেন এই পুরস্কারটা আমাকে দিল, তার একটি যুৎসই জবাব প্রদানের জন্য।