সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

ব্যালেন্স শিট – জুনাইদুল হক

September 20th, 2016 11:32 pm
ব্যালেন্স শিট – জুনাইদুল হক

গল্প

ব্যালেন্স শিট

জুনাইদুল হক

 

বিয়েটা হলো না  কেন রে তোদের?

বিয়ে? এতদিন পর কি জিজ্ঞেস করছিস ?

ইচ্ছে করেই করছি। ষাট বছর হলো । হিসেব মেলানো দরকার। হিসেব ! পাগলের কাছে কে মেয়ে বিয়ে দেয়? যে শুধু নদীর পানিতে খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে চায়, কোনো কিছু করতে চায় না । উদ্যোগ নেই, চেষ্টা নেই।

ভালোই বলেছিস। কিন্তু আমি কাব্য চাই না, প্লেইন ফ্যাক্টস চাই। তোর পক্ষে কি কেউ ছিল না? কেন থাকবে না ? মেয়ের বাবা ছিলেন। মেধাবী, আদর্শবাদী মানুষ। মেয়েও ছিল। নইলে টিনএইজ থেকে যার বিয়ের এত প্রস্তাব আসে, সে কি তিরিশ পেরিয়ে বিয়ে করে? অনেক অপেক্ষা করেছে। কপালে নেই, কি করে হবে।

ভালো হলো, না মন্দ হলো বলতো?

ভালোই তো হলো । সচ্ছল, সুপুরুষ স্বামী পেল। গুণীও । বিদেশে থাকল এত বছর ।

কোথায় থাকে খবর রাখিস তো?

রাখি একাধটু। কানাডায়। লন্ডনে ছিল বারো বছর।  স্বামী মাইক্রোবায়োলোজিস্ট। রিসেন্টলি এক কা- হয়েছে। ফেসবুকে ওর এক ভাই আমাকে খুঁজে পেয়েছে। এ কিসের আলামত? জীবন ফুরিয়ে আসছে নাকি আমার? সিনেমার মতো শেষ বেলায় যোগাযোগ হচ্ছে? ২০০০ সালে তাকে পাঁচ মিনিটের জন্য দেখা দিতে বলেছিলাম। দেয়নি বলে বলেছি ইহজনমে আর কথা হবে না, দেখা হবে না। ভাইয়ের সাথে তার কথা আলাপ করিনি বলে তার ছোটবোন আটলান্টা থেকে সেদিন মাঝরাতে ফোন করল।

কি বলল ?

কি আর বলবে? আমাদের খবর নিল। আম্মার খবর নিল। সবার খবর দিল। আমি দুষ্টুমি করে বললাম, একজনের খবর শুনতে চাই না। শেষে বলল, আমরা সবাই বুড়ো হচ্ছি, রাগ পুষে রাখবেন না, অভিমান করবেন না। আপনাকে আমরা ভুলতে পারি ?

বলল এমন করে?

বলল তো! আমি গলিনি রে। উইমেন আর অদ্ভুত পিপল। ওকে বিয়ে দিয়ে দিল বলে আমি গভীর অভিমানে সরে এলাম। বারো বছর পর দেখা যখন করতে চাইলাম সে বলল এত প্রেম এতদিন কোথায় ছিল? কেন বিয়েটা ভেঙে দিল না? কেন জোর করে আমাকে…। আর আমি ভেবেছি ওর যোগ্য যখন নই, দূরে সরে যাই।

জীবন এরকমই।

অনেক  অপেক্ষা করল, আবার ঠিকই আগে বিয়ে করে ফেলল। আমিও বোধ হয় অভিমান করে বেশি দূরে সরে গিয়েছিলাম। এক সময় সম্পর্ক যখন চলছিল স্বপ্নে দেখত আমার বিয়ে হয়ে গেছে কোন ধনীর দুলালির সাথে। আর কেঁদে বুক ভাসাতো। সেই মক্কেল আগে বিয়ে করে ফেলল। এক ছেলে আছে। এতদিনে হয়ত চাকুরি করছে। আমিও তাই ত্রিশ বছর কোনো কথা না বলে, এক পলক না দেখে কাটিয়ে দিলাম।

তোর ওয়াইফ জানে কিছু?

কখনও আলাপ করি না। কি দরকার বেচারিকে কষ্ট দিয়ে। প্রথম দিকে আমার বোনদের কাছে ওর এক ছবি দেখে জেনে ফেলে। কান্নাকাটি করে আবার নরম্যাল। ওর বড় বোন আর  ভাগ্নীর সাথে পরিচয়ও হয়েছিল। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে উদারতা হারিয়ে ফেলে। নানা লোকের মুখে কিছুটা শোনেও হয়ত ওর কথা। দশ বছরে একবারও তুলিনি ওর কথা। বা বিশ বছরেই হয়ত।

তুই কি মিস  করিস?

ঐ বছরে একাধদিন আর কি ! শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা : ‘মনে পড়ল, তোমায় পড়ল মনে’। অথবা ‘অবান্তর স্মৃতির মাঝে আছে/ তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো/ লিখিও উহা  ফিরত চাহো কিনা’।

এই আর কি ! ফিরত চাওয়া ব্যাপারটা কি ?

মেয়েরা বিয়ের পর সবকিছু ফেরত চায় না? কবি তাই ঠাট্টা করছেন। হৃদয়বিদারক ঠাট্টা বলতে পারিস। কখনও কি ভেবেছিস যে ঐ বেচারিও তোকে মিস করে?

অনেক বছর পর হঠাৎ একদিন এমন মনে হয়েছে। আচ্ছা, আমি যে হঠাৎ  হঠাৎ মিস করি, সেও কি করে ? আমি পাঁচবার করলে সেতো একবার অন্তত করে। নাকি?হা হা হা। এত বছর কাটিয়ে দিলি। ত্রিশের বেশি। তবু ভুলতে পারলি না। ওভাবে ভাবিনি। বিয়ের পর কয়েক বছর ঠিকই ভুলে ছিলাম। আমার বিয়ের পর। পয়ঁত্রিশ বছর বয়সে এক মাস হাসপাতালে ছিলাম। মারা যাওয়ার কথা। তখনও ওর কথা ভাবিনি। বউয়ের কথাই ভেবেছি। কখনও বউকে ছোট করে ওর  কথা ভাবিনি।

সেটাই তোর কাছে আমরা আশা করি ।

অন্য কিছু নয়।

মনভাঙা মসজিদ ভাঙার সামিল। বউকে আমি কখনও কষ্ট দিতে চাইনি। শুধু গত ত্রিশ বছরে ওকে এক পলক দেখতে চেয়েছিলাম। এক পলকই। এখন আর তাও চাই না। উনষাট বছরের বুড়িকে, সরি ফর দি ক্রুয়েল ওয়ার্ড, আর দেখতে চাই না। বাহ উনি বুড়ো হয়েছেন আর তুমি বুঝি হওনি? তেইশ-চব্বিশ বছরেরই আছ?

না না। আমি তো বুড়ো হয়েছিই। নিজের মুখ তো আমি দেখাতে কখনও চাইনি। যা একখান মুখ আমার।

না, না,  মুখ তোমার বেশ। বুদ্ধিদীপ্ত, পুরুষালি। দেখা হলে দুজনেরই ভালো লাগবে।

তাই নাকি ?

কেন নয়? পাগলামি করবি না তো তোরা? অন্তত ভেঙে পড়বি নাতো? সে বয়স কি আর আছে? একটু কষ্ট হবে হয়ত। আর কিছু না। চব্বিশ-পঁচিশ বছরের তোকে যখন এই সুন্দরী তরুণীর সাথে দেখতাম, খুব ভালো লাগত।

কপোতকপোতী যেন। ভাবতে পারতাম না যে তাদের বিয়ে হবে না।

আরে কি শুরু করলি ষাট বছর বয়সে? জীবনে এমন তো হয়ই। তা হয়। কিন্তু তুই  আদর্শবাদী মানুষ, কারও সাত-পাঁচে থাকিস না। তোর জীবনেই এমন হলো? ভেরি স্যাড ইনডিড ।

বাদ দে। জীবন  একভাবে কেটে গেলেই হলো। এখন আমি গভীরভাবে এটাচড টু মাই ওয়াইফ। তা ঠিক । জীবন এভাবেই কাটা উচিত। তোমারও, তারও। তোর  ইন্টারভিউ নিই। স্মরণীয় কোন ঘটনা বল। ভুলতে পারিস না এমন কোন ঘটনা।

না না। থাক ওসব। ভুলে গেছি কবে তুমি এয়েছিলে। তার চেয়ে একটি জোক শোন।

জোক?

হ্যা, শোন।

বল দেখি। আমার অভিজ্ঞতা বলে অনুরাগ প্রেমের সেরা পর্ব। অনুরাগের সময় কি বলতো জানিস? মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে কত প্রশংসা করত। একদিন কি বলল? ‘তোমাকে কে না ভালবাসবে’? কি মধুর নম্র হাসি সাথে। সেই মানুষটি  সম্পর্কের শেষদিকে একদিন কি বলে ফেলল ? তখন আমি সম্মানজনক চাকরি পাচ্ছি না। পেলেও জয়েন করছি না। হতাশ, ক্ষুব্ধ অবস্থা তার। বলে ফেলল, ‘তোমাকে আমি হেইট করি। কেন যে জড়ালাম তোমার সাথে!’ হা হা হা।

মনে পড়লে রেগে যাস নাকি? আমি কিন্তু তার কোন দোষ দেখি না। আমিও দেখি না। অন্তত বয়স হওয়ার পর।  আগে ভাবতাম সে আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। এখন ভাবি আমি তাকে কষ্ট দিয়েছি।  বয়স হয়ে আমার বুদ্ধি বেড়েছে, ওর মনের তখনকার অবস্থা পুরোপুরি বুঝেছি। ঠিক তাই।

ওকে হারিয়ে দশ বছর হাসিনি রে। হাসতে ভুলে গিয়েছিলাম। বিয়ে করে নরম্যাল হই। আবার হাসতে শিখি। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনকে খুব ভালো লেগে যায়। জানিস তোর মতো যারা ভালবেসে প্রিয় নারীকে বিয়ে করতে পেরেছে, তাদের আমার খুব ভাগ্যবান মনে হয়। নিজেকে মনে হয় দুভার্গা। ‘নদীর  এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস/ ওপারেতে যত সুখ আমার বিশ্বাস।’ না, না । এপারে যে সুখ নেই তা তো হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। সুখ ওপারেই।

ইউ নেভার নো, ইয়াং ম্যান।

ইয়াং ম্যান? আমি  সিক্সটি, স্যার।

তাতে কি? মন তোমার বুড়ো হয়নি।

তাতে তো লাভ নেই। যাতনা আরও বেশি। বার্ধক্য ত মেনে  নিতে কষ্ট হয়।

বেঁচে থাকার সেরা আনন্দ কি ?

বইপত্র। একটু  লেখালেখি। সমমনস্ক বন্ধুদের সাথে আড্ডা। মানুষের উপকার করা, যতদূর পারা যায়। মনের মতো সাধারণ খাবার খাওয়া। তরুণ-তরুণীদের কি বলবি? হারাতে হতে পারে, তাই ভালোবেসো না?

কখনও নয়। যাকে ভালোবাতে ইচ্ছে করে বেসে ফেলো। আর আপ্রাণ চেষ্টা করো তাকে সারাজীবনের জন্য পেতে।

বউকে ভালোবেসেছিস, ঠকাসনি। তাই তো? তাই। ঠকানোর প্রশ্ন ওঠে না। আগের চেপটার ক্লোজড । বরং বউকে পেয়ে ভেবেছি ঐ চেপটার জীবনে না থাকলেই ভালো ছিল।

নারীর ভালোবাসা ছাড়া জীবনে আর কি কাম্য?

জ্ঞানীর স্নেহ। শিশুদের ভালবাসা। মানুষের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করা। আর কি?

ঠিকই বলেছিস। জীবনকে অর্থময় করতে এসবই চাই।

ষাট বছর বয়সে তুই ভালই জেরা করলি, ইন্দ্রনাথ।

তুইও ভালোই জবাব দিয়ে গেলি, শ্রীকান্ত।

তুই ছিলি সাহসী, ডাকাবুকো। বালক বয়সে।আমি লাজুক, নম্র। আমিই তরুণ হয়ে সাহসী হলাম, কিন্তু অন্তিম সাফল্য পেলাম না। হা হা হা ।

এনি রিগ্রেটস?

নো। পুরুষ মানুষ আফসোস করে না।