সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

বিশেষ রচনা : স্মৃতির মণিকোঠায় কবীর চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী ও নাদেরা বেগম : ফেরদৌসী মজুমদার

June 28th, 2018 7:24 pm
বিশেষ রচনা : স্মৃতির মণিকোঠায় কবীর চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী ও নাদেরা বেগম : ফেরদৌসী মজুমদার

বিশেষ রচনা

স্মৃতির মণিকোঠায়

কবীর চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী ও নাদেরা বেগম

ফেরদৌসী মজুমদার

 

[অনেকের কাছ থেকেই তাগিদ আসে, অনুরোধ পাই, ‘তুমি লেখ, তোমার কথাই লেখ।’ আপনজনেরা বলে, ‘তোমার জীবনে এ-পর্যন্ত যা ঘটেছে, তা-ই সাদামাটা ভাষায় লেখ- পরে তো সব কথা মনেও থাকবে না।’ শেষের অংশটুকু আমার মনে ধরেছে। তাই তো! এরই মধ্যে কত কিছু হয়তো স্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। তাই মাঝেমধ্যে ভাবছি, আমি লিখব- যা মনে পড়ে তাই লিখবÑ আসলে সবার দ্বারা কি সব হয়? আমি বলতে পারি, কিন্তু লিখতে পারি না, হয়তো এলোমেলো হবে, সাজানো-গোছানো হবে না- চুলোয় যাক সে-সব। যা হয় লিখি তো- যার যা বোঝার তাই বুঝবে। সত্য ঘটনা এবং স্মৃতিকে ধরে রাখাই এর উদ্দেশ্য- পৃথিবীর সব লেখাই উৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে তাতো নয়, যা হয় একটা কিছু তো হবেই।]

মানিক ভাই (কবীর চৌধুরী)

 

ভাই-বোনের মধ্যে আমার সবচেয়ে বড়ভাই কবীর চৌধুরী (মানিক ভাই)। মা বলতেন, ‘মানিক আমার সাত রাজার ধন মানিক।’ সুবোধ ও সুশীল বলতে যা বোঝায় মানিক ভাই তাই। লেখাপড়ায় ভালো, স্বভাবে ভালো- যেমন দায়িত্বশীল তেমনি – স্নেহপ্রবণ। আমার বাবা মারা গেছেন সেই সত্তর সালে। এ ৩৪-৩৫ বছর, কখনও আমরা অসহায় বোধ করিনি। যখন কোনো সমস্যা হয়েছে, বিপদে পড়েছি মানিক ভাইয়ের শরণাপন্ন হয়েছি। স্বল্পভাষী মানিকভাই হাসিমুখে ঠিক সময়ে ঠিক কথাটি বলে, যথাযথ পরামর্শ দিয়ে আমাদের আশ^স্ত এবং চিন্তামুক্ত করেছেন। এখনও প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলেন না। দারুণ নির্ভীক। তার পরিচয় পেয়েছি- আন্দোলনগুলোতে। যা বিশ্বাস করেন তাই বলেন, নির্ভীকচিত্তে, নির্দ্বিধায়, কাউকে পরোয়া না করে। এত স্পষ্টবাদী এবং সাহসী লোক বাংলাদেশে কমই আছে। কখনও কারও সঙ্গে, কিছুর সঙ্গে আপোস করেননি। একটা ঘটনার কথা মনে হলে শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে। তখন সবে তাঁর বুকে পেসমেকার বসানো হয়েছে। শরীর বেশ দুর্বল। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে যত মিটিং-মিছিল হয় এবং হয়েছে, তাতে পারতপক্ষে অনুপস্থিত থাকেননি। শরীরের ঐ অবস্থায় একটা মিছিলে তাঁকে আসতে বারণ করা হয়েছিল। তিনি আমার স্বামীকে বলেছিলেন, ‘মিছিলের সামনে আমি থাকব। আমার তো প্রচুর বয়স- আমার প্রাণের মায়া এত নেই। তোমরা যারা কাঁচা বয়সের, যাদের এখনও অনেক কিছু করার আছে তার পেছন দিকে থাক’, এবং এই কথার মধ্যে কিন্তু  তাঁর কোনোরকম সংশয় বা ইতস্ততভাব ছিল না। তিনি সবসময়েই এমনটা বিশ্বাস করেন। সেদিনের তাঁর সেই সাহসী উচ্চারণে সবার মনেই প্রচুর বল সঞ্চারিত হয়েছিল।

মানিকভাই জাতীয় অধ্যাপক হিসেবেই বেশি পরিচিত-সম্মানিত। বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আমার এ বড়ভাইটি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে রেকর্ড নম্বর পেয়ে এম.এ পাস করেছেন। তা বলে কখনও এতটুক অহঙ্কার ছিল না তাঁর। এখন তো তা দেখতেই পাচ্ছি। আবার সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি পাবলিক এডমিনিস্ট্রশনে এম. এ করেছেন। বড় অমায়িক ভাইটি আমার। কখনও কারও প্রতি রূঢ় হতে দেখিনি আমি তাঁকে। কারও প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশেও তাঁর চেহারায় আমি অদ্ভুত একটা ঠান্ডা ভাব লক্ষ্য করেছি। অন্তত আমি কখনও তাঁকে প্রচণ্ড রাগেও ভীষণমূর্তি ধারণ করতে দেখিনি। রাগকে যেন চমৎকারভাবে জয় করেছেন তিনি।

শুনেছি জীবনে যাঁরা বড় হন ছোটবেলাতেই তঁদের আচার-আচরণে কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। মার কাছে শুনেছি মানিকভাই ছিলেন অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ। সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা, ঘুমুতে যাওয়া, পড়তে বসা, সময়মতো খাওয়া এসবই তাঁর স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তাঁর রসবোধও কিন্তু কম নয়। এ নিয়ে কিছু গল্প আছে। একটা ঘটনা তো আমার সঙ্গে ঘটেছে। আমি তখন কলেজে পড়ি- মানিকভাই সে সময়ে বরিশাল বি.এম কলেজের প্রিন্সিপাল। আমি গিয়েছিলাম ওঁর ওখানে বেড়াতে। যৌবনে মানিকভাই সুদর্শন ছিলেন, যার কিছুটা এখনও অনুমান করা যায়। যখন ঢাকায় ফিরছি- মানিকভাই আমাকে পৌঁছে দিচ্ছেন। লঞ্চে এক মজার ঘটনা ঘটল। আমাদের ভাইবোনের জন্য একটা কেবিন ভাড়া করা হয়েছিল। মানিকভাই আমার চেয়ে বিশ বছরের বড়। দেখে কিন্তু মনে হতো না তাঁর ও আমার মধ্যে বয়সের এত ফারাক। সন্ধ্যায় আমি এমনি ডেকে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়েছিলাম। আমার তখন এমনি বয়স যে শুকনা পাতাকেও ভালো লাগে। সবকিছুই আমার চোখে রঙিন, ঝকঝকে, অপূর্ব হঠাৎ মানিকভাই আমার পাশে এস দাঁড়ালেন। ফিস্ফিস্ করে বললেন, তুই পেছনে দিকে তাকাবি না। পেছনে দুটো লোক অবাক বিস্ময়ে আমার আর তোর দিকে তাকিয়ে আছে এবং কি সব বলছে। আমার যতদূর মনে হয়-ওরা ভেবেছে তুই আর আমি স্বামী-স্ত্রী। আমরা স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করে ওদের বোকা বানাব। তুই কিন্তু ভুল করবি না। এই বলে তিনি প্রচণ্ড  হাসতে লাগলেন- সঙ্গে আমিও। ওদিকে লোক দুটো একটু একটু করে আমাদের দিকে এগোচ্ছে। ওরা বেশ কাছে আসার পর ওদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে মানিকভাই আমাকে বললেন, ‘দেখেছ, ঢেউগুলো কেমন একটার পর একটা আছড়ে পড়ছে?’ আমি হাসি রাখতে না পেরে মানিকভাইয়ের গায়ের ওপর পড়ে যাচ্ছিলাম। মানিকভাই আমাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘আহা, হচ্ছেটা কি? আমি হাসিটা একটু সংযত করে সোজা হয়ে দাঁড়ালামÑ এর মধ্যে লোক দুটো কাছে চলে এসেছে। সমস্ত ব্যাপারটা ওরা খুব উপভোগ করছিল। এক সময় একজন মানিকভাইকে বলে বসল, আপনার স্ত্রী বুঝি? বলার সঙ্গে সঙ্গে আবার আমাদের সেকি হাসি। একটু পরে মানিকভাই হাসি সংবরণ করে গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘না, ও আমার ছোট বোন। আমার চেয়ে বয়সে বিশ বছরের ছোট।’ লোক দুটো লজ্জিত হয়ে একেবারে চুপসে গেল। কেবিনে ঢুকে মানিকভাই বেশ দর্পভরে আমাকে বললেন, ‘আমার অভিনয়টা কেমন হয়েছে বল?’ আমি শুধু হেসেছিলাম। বলাই বাহুল্য, ওটা ছিল তাঁর সার্থক অভিনয়। আর আমার কাছে তো বটেই, কারণ আমি তখন অভিনয় শুরু করিনি। এখন বুঝতে পারি, বড় সুখী লোক ছিলেন তিনি, তা না হলে এমন অনাবিল আনন্দফুর্তি করতেন কীভাবে।

আমাদের বাড়ি ‘দারুল আফিয়া’তে দোতলার ঘরে আমরা অবিবাহিত তিন বোন (আমি, বানু ও রাহেলা) থাকতাম। মানিকভাই আমাদের বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে শুয়ে কী যেন লিখছিলেন। আমাদের পাশের বাড়িতে নোয়াখালির এক পরিবার ছিল। তাদের এক ছেলের নাম কবীর, আরেক ছেলের নাম মুনীর এবং মেয়ের নাম হেনা। সবক’টা নামই আমার ভাইবোনের নামে নাম।। এক পর্যায়ে শুনতে পেলাম বাচ্চাগুলোর বাবা ওদের পড়াশোনার জন্য বেদম প্রহর করছেন এবং গালাগাল দিচ্ছেন। হঠাৎ দেখি মানিক ভাই দড়াম্ করে উঠে বাতিটা নিভিয়ে জানালা দিয়ে মুখ গলিয়ে, নিজের স্বর বদলে বেশ উচ্চস্বরে নোয়াখালির ভাষায় বলতে লাগলেন, হইত ন, হইত নÑ যতই মাইর ধর করেন কবীর চোদ্রী মুনীর চোদ্রী মতো হইত ন।’ ঐ কথা শুনে আমরা তিন বোন সে কি হেসেছিলাম। মানিক ভাই বললেন, ‘এমনি একটু মজা করলাম, বুঝলি।’ ঐ রকম গম্ভীর প্রকৃতির পড়ুয়া ব্যক্তিত্ব কতখানি আমোদফুর্তি করতে পারতেন তা যারা একসঙ্গে না থেকেছে তারা বুঝতে পারবে না। মানিকভাইকে আমি প্রায়শ দেখতাম Music-এর সঙ্গে সঙ্গে জামা-কাপড় বদলাতেন। এসব করে নিজে যেমন আনন্দ পেতেন, আমাদের নির্মল আনন্দ দিতেন। যত বয়স হয়েছে ততই নিজেকে প্রাণবন্ত রাখার চেষ্টা করেছেন। কখনওই মলিন জামা-কাপড় পরতে দেখিনি। আজও এই  বিরাশি বছর বয়সে রঙিন জামাকাপড় পরে নিজেকে উজ্জ্বল করে রাখেনÑদেখলেই ভালো লাগে, উদ্দীপিত বোধকরি, বাঁচার তাগিদ বেড়ে যায়। নিজে যেমন পারতপক্ষে গোমরামুখো থাকতেন না তেমনি কাউকে গোমরামুখো হয়ে থাকতেও দিতেন না। আমি তখন কলেজে পড়ি। সেদিন দিনভর টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল- একসময়ে বৃষ্টি যদিও-বা থামল মেঘলা ভাবটা কাটছিল না। আমরা তিন বোন বের হওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠছিলাম, সেটা মানিক ভাই নিশ্চয় লক্ষ্য করছিলেন, তা না হলে সব নীরবতা ভেঙে হঠাৎ করে উচ্চস্বরে বলে উঠবেন কেন- ‘আহ! দেখছিস, What a bright sunny day!’ বলে নিজেই লম্ফঝম্প করে সমস্ত পরিবেশ হালকা করে দিলেন। আজও আমি ওঁর মধ্যে লক্ষ্য করি বেশি দুঃখ হলেই যেন তিনি সহজ হওয়ার, হালকা হাওয়ার চেষ্টা করেন। আশ্চর্য সহ্যশক্তি তাঁর। সুখের প্রকাশ যতটা স্পষ্ট দুঃখের প্রকাশ সে পরিমাণই অপ্রকাশিত এবং চাপা। নিজের দুঃখে কাউকে টানতে চান না বা বিচলিত করতে চান না।

শুনেছি আমার বাবা-মার কাছে মানিক ভাই’র অসীম ধৈর্যের কথা। তাঁর প্রথম সন্তানের (ছেলে) মৃত্যুতে কেউ তাঁকে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলতে দেখেনি-কষ্ট চেপে রাখার সে কি আপ্রাণ চেষ্টা! কেবল নাকি বারান্দার এ-মাথা ও-মাথা পায়চারি করছিলেন। শিক্ষণীয় ব্যাপার বটে। মানুষের জন্য এত ভালোবাসা তাঁর। আমাদের ভাইবোনদের বড্ড স্নেহ করেন। শুধু যে মুখে মুখে স্নেহ করেন তা নয় কিন্তু, তিনি প্রত্যেককে বুঝিয়ে দেন সবগুলো ভাইবোনকেই তিনি বড় ভালোবাসেন এবং তাদের পাশে সদানিয়ত আছেন। এই তো সেদিন আমাদের এক ভাই (জহুর ভাই)- বহুদিন যাবৎ পাকিস্তানে আছেন, সম্প্রতি তাঁর স্ত্রী-বিয়োগ হয়েছে- তিনি বেশ মুষড়ে পড়েছিলেন। মানিকভাই তাঁর মনের ঐ অবস্থায় তাঁকে একটা চিঠি লিখলেন, যার সার কথা হচ্ছে- মানুষ একদিন চলে যাবে- সেটাই বাস্তব। তোমার স্ত্রী হারাবার ব্যথা কারও সঙ্গে তুলনীয় নয়। কিন্তু এও সত্যি আমরা তোমার ভাইবোনেরা তোমাকে সবসময় মনে করি- তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে। তুমি এসো। সবচেয়ে বড় কথা, তোমার ওপর আমাদের এটুকু দাবি আছে, তুমি অস্বীকার করতে পারো না ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর কি কোনো ভাই ভাইর ডাকে না এসে পারে? প্রথম ভাইর কথাই শেষ হতে চায় না- চতুর্দশে পৌঁছবো কখনও?

না বলেও তো পারি না। সময়তে কত যে কঠিন হতে পারেন মানিকভাই! আমার বুড়ো মা- যখন জীবিত ছিলেন (৯০ বছর হবে) শয্যাশায়ী, হাঁটতে পারেন না কিন্তু মাথাটা একেবারে পরিষ্কার। প্রতিদিন ডায়েরি লেখেন, কথা-প্রাসঙ্গিক শ্লোক কাটেন- দীর্ঘ কবিতা গড়গড় করে মুখস্থ বলে যান, সে রবীন্দ্রনাথ হোক আর গাজীর গান হোক-কোনোটাতেই তাঁর কোনো অসুবিধে নেই। কোনো অবান্তর কথা বলতেন না মা আমার। আধা ঘণ্টা তাঁর কাছে বসলে  কত যে খনার বচন, সুবচন শোনা যেত! আর তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার ঝুলিটাও বেশ সমৃদ্ধ ছিল। মা আমার শুধু একটু কথা বলার লোক পেলেই খুশি হয়ে যেতেন। বড় পরিতাপের বিষয়, চৌদ্দ ভাইবোন থাকা সত্ত্বেও তাঁকে আমার যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি আমাদের নানারকম কর্মব্যস্ততার কারণে। সবাই পালা করে আসতাম ঠিকই; কিন্তু তাঁর কাছে অবস্থানের সময়টা বড়ই সীমিত ছিল। সেজন্য তিনি মোটেও অভিযোগ করতেন না। অনেক সময় এমন হতো, হয়তো আমাদের কয়েক ভাই-বোনেরই বেশ কাজের চাপ, মার সঙ্গে দেখা করতে পারছি না, তাহলে কি হবে? মায়ের চৌদ্দ ছেলেমেয়ের ঘরে নাতি-নাতনিও মাশাল্লা কম হবে না-তাদের কি দাদি বা নানির প্রতি ভালোবাসা বা দায়িত্ব নেই? বিশেষ করে যারা ঐ মা’র বাড়িতেই থাকে? কথাটা মা-ই একদিন দুঃখ করে মানিকভাইকে বলছিলেন। ব্যস! আর যায় কোথায়? মানিক ভাইর কানে কোনো কথা গেলে ওটা বিফলে যাবে না। বড়ভাইর মতোই কাজ। তিনি একদিন সমস্ত ভাইবোনের বাচ্চাদের নিয়ে একটা সভা ডাকলেন এবং আনুষ্ঠানিকভকাবে ছোটখাটো একটা ভাষণ দিলেন যার মর্ম হচ্ছে, ‘তোমরা যদি বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকো তাহলে সবাই বুড়ো হবে এবং সবাইকেই একটা পর্যায়ে একাকিত্ব গ্রাস করবে-তোমাদের দাদুর অনেকগুলো ছেলেমেয়ে, তিনি কিন্তু অত একা নন, যত তোমরা একা হবে। আমি বলতে চাই তোমরা পাঁচ মিনিট করে হলেও, ভালোবাসা থেকে না হলেও দায়িত্ববোধ থেকে আমার মাকে একটু সময় দিও- তাতে তোমাদের প্রত্যেকের লাভ বই ক্ষতি হবে না; কিন্তু আমর মা প্রচণ্ড খুশি হবেন।’ তারপর থেকে বেশ কিছুদিন ঐ নিয়মেই চলছিল। কারণ ওটা যে মানিক ভাইর নির্দেশ। মানিক ভাই কখনও কখনও ভাবিসহ নিয়ম করে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে মাকে দেখতে আসতেন- ঐদিন আমার মা ভাইর অপেক্ষায় অধীর হয়ে থাকতেন। প্রায়ই বলতেন, ‘আমার বুড়ো ছেলে এক্ষুনি আসব- দরজা থাইকাই একগাল হাইসা দুহাত বাড়াইয়া আমার দিকে আগায়া আসব আর আমার গলা জড়ায়া ধরব।’ এ-মুহূর্তটা না জানি মায়ের কাছে কত আকাক্সিক্ষত ছিল!

মানিক ভাইর সবকিছুই বেশ গোছানো। কর্তব্য জ্ঞানটা ছিল তাঁর টনটনে। আমার মা যখন শয্যাশায়ী তখন নিয়ম করে মা’কে দেখতে আসতে না পারলে টেলিফোনে জানিয়ে দিতেন যাতে মা চিন্তা না করেন। অমন ছেলেকে ভালো না বেসে পারা যায়? মানিক ভাই জন্মেছেন মা’র ১৫ বছর বয়সে। সুন্দর ফুটফুটে একটা ছেলে। মা’র কাছে শুনেছি, বেশিরভাগ সময়ে তাকে বুকে নিয়ে মা শুয়ে থাকতেন। তার দিকে পেছন ফিরে শুতেও ভয় পেতেন তিনি। মানিক ভাইর আত্মাসম্মানবোধ ছিল লক্ষণীয়। একবার আমার বাবা নাকি ওঁকে বরই (কুল) খেতে বারণ করেছিলেন, কিন্তু ছোট মানুষ বলে লোভ সামলাতে না পেরে গাছতলায় কুড়ানো একটা কুল খেয়েছে। আব্বা কুল খেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করায় মানিক ভাই অস্বীকার করেছিলেন। তখন আব্বা নাকি বলেছিলেন, আজ থেকে মানিকভাইর নাম মানিক না- মিথ্যাবাদী। সবাইকে বলে দেয়া হলো এখন থেকে সবাই যেন তাকে মিথ্যাবাদী বলেই ডাকে। এত মানিক ভাই’র আত্মসম্মানে দারুণ আঘাত লাগল। মানিক ভাই’র সে কি কান্না! বারবার আব্বাকে মিনতি করতে লাগলেন, যাতে সবাই তাকে মিথ্যাবাদী বলে না ডাকে। তার মানিক নামটাই যেন থাকে- তখন তার বয়স কত হবে? শুনেছি ৩-৪ বছরের বেশি নয়।

মানিক ভাই দুষ্টমি না করলেও খুব নাকি জেদি ছিলেন। বাজে জেদ নয় ভালো জেদ- যে কারণে আজ এত বড় হয়েছেন। ভাত খেতে আসলে বারবার ডাকের পরও যখন তিনি এলেন না, তখন মা রাগ করে নাকি একদিন ছোট্ট মানিক ভাইকে বলেছিলেন, থাক তুই দাঁড়িয়ে এই গরম পাক্কায়। মায়ের আর খেয়াল ছিল না। বেশ কিছুক্ষণ পর যখন মনে পড়ল মা দেখলেন মানিক ভাই ঐ একইভাবে গরম বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। টেনে এনে দেখলেন পায়ের নিচে তার ফোস্কা পড়ে গেছে। তাঁর সেদিনের বক্তব্য ছিল, আপনিই তো বলেছেন দাঁড়িয়ে থাকতে। এটা আরেকভাবে নেয়া যায়- মানিক ভাই বাবা-মার কথা বড় শুনতেন। একটু বড় হয়েও যখন বুকের দুধ খেতেন তখন একদিন বাবা নাকি বলেছিলেন- ‘মানিক, তোমার তো মুখভর্তি দাঁত। তুমি দুধ খেলে তোমার মা’র কষ্ট হয়, তুমি আর দুধ খেয়ো না।’ বিশ্বাস হয় না, সেদিন হতে নাকি মানিক ভাই আর মায়ের দুধ খাননি। অথচ এখন শুনি বুকের দুধ ছাড়তে মায়েদের কত কষ্ট হয়।

আসলে আমার মা ঠিকই বলেছিল ‘আমার মানিক, নামেও মানিক, কাজেও মানিক।’ মায়ের চোখে যেমন মানিক ভাই ছিলেন তাঁর সন্তানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, আমারও মনে হয় সব দিক বিচার করলে মানিক ভাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখতে পারেন। আসলে এটা বেশ মজার ব্যাপার। আমরা যখন অবিবাহিত ছিলাম, তখনই প্রায়ই আলাপ-আলোচনা হতো কে কেমন বর চায়। আমার মনে আছে- আমাদের একেক বোনের কাছে একেক ভাই প্রিয় আদর্শ ছিল। তবে, হাসির ব্যাপার ছিলÑএকজনই আদর্শ ছিল না, প্রত্যেকের ভালো গুণটা নিয়ে, যে মানসকুমারকে আমরা কল্পনা করতাম তেমন নিখুঁত মানুষ পৃথিবীতে হয় না। এক ভাইয়ের বুদ্ধিমত্তা, আরেক ভাইয়ের রসবোধ, আরেকজনের সহনশীলতা, আরেকজনের ঠান্ডা ভাব, আরেক ভাইয়ের হাসিখুশি দিক নিয়ে অমুকের রাগটা বাদ দিয়ে  বা নির্লিপ্তিটা বাদ দিয়ে যে পুরুষ কল্পনা করতাম, সে কেবল এ জগতের নয়- কল্পলোকেরই হতে পারে। এসব যখন আলোচনা হতো আমার মনে আছে আমরা ভাইবোনরা খুব আমোদিত হতাম, চিৎকার করতাম, হাসাহাসি করতাম। আবার কোনো কোনো ভাই তাকে বাদ দেয়ার কারণে বিষণœও হয়ে যেত। সে বড় চমৎকার সময় ছিল আমাদের।

বড় ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর কথা কিছু না বললে, বড় ভাইও অসম্পূর্ণ থেকে যান। কবীর ভাইয়ের স্ত্রী মেহের কবীরÑআমার সবচেয়ে বড় ভাবি। সব দিক থেকে যিনি বড়, মাতৃতুল্য। অন্যান্য ভাবি বা ভ্রাতৃবধূর  সঙ্গে যার তুলনা হয় না। সবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমার যখন আড়াই বছর বয়স তখন মেরি ভাবি (মেহের কবীর) নতুন বৌ হয়ে দারুল আফিয়াতে (আমাদের বাড়ির নাম) আসেন। ওঁর মুখেই শোনা, আমি নাকি সেই কাকভোরে, ভাই-ভাবির দরজায় ধাক্কা দিতাম- বাধ্য হয়ে নতুন বৌকে উঠে আসতে হতো। ভাবি খুব সুন্দর করে বলেন, ‘বড্ড জ্বালিয়েছিস তুই ভাইয়া।’ ভাবির ভাষা বড় মিষ্টি দিনাজপুরের সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম, সত্যি বলতে কি ভাবি আসার পর আমরা ভাইবোনেরা অনেক কিছু শিখেছি- ভালোভাবে কথা বলার উৎসাহ পেয়েছি।

এ-মহীয়সী ব্যক্তিত্বময়ী মহিলার জ্ঞানবুদ্ধি, মার্জিত রুচি, স্পষ্টবাদিতা, মাতৃত্ব, দানশীলতা, মমত্ববোধ আমাকে আজও মুগ্ধ করে। হাসিটা বড় সুন্দর তাঁর। দেবর-ননদের জন্য অগাধ ভালোবাসা- মনের মধ্যে এতটুকু সাম্প্রদায়িকতা নেই- ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি নেই। তাই বোধহয় আমার বিয়েটা তাঁর বাড়িতেই হয়েছিল, তাঁর সম্পূর্ণ সমর্থনে ও উৎসাহে। আমাদের সমালোচনা তিনি করতেন ঠিকই কিন্তু ঐ একই কথা, বাইরের কেউ বললে তিনি সহ্য করতেন না- যা হোক দু’-একটা কথা শুনিয়ে দিতেন আমাদের পক্ষ নিয়ে। ভারি চমৎকার।

ভাবি কেমেস্ট্রিতে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন। আমার বাবার কাছে শিক্ষা এবং শিক্ষিতরা বড্ড বেশি সমাদৃত হতো। আমার বড় ভাবিও আমার বাবার বড় প্রিয় পুত্রবধূ ছিলেন- আমার বাবার কথার পিঠে কথা বলার সাহস একমাত্র মেরি ভাবিরই ছিল। বাবা কিন্তু জিনিসটা পছন্দ করতেন। আমার মা কিংবা আর কারও কাছ থেকে আমি শুনেছি- একদিন দুপুরে বাবা নিচের তলায় জল চৌকিতে বসে ওজু করছিলেন। হঠাৎ তাঁর মাথায় দোতালার বারান্দা থেকে পানি পড়ে। বাবা তাঁর স্বভাবসুলভ গলায় রেগে চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘কে রে পানি ফালায়?’ আমার ভাবি রেলিং দিয়ে গলা বাড়িয়ে ন¤্রস্বরে বললেন, ‘আব্বা আমি। বাচ্চা গোসল করাচ্ছিলাম। সে পানি আপনার গায়ে পড়েছে। আমি খেয়াল করিনি আব্বা।’ আব্বা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ‘এমএসসি পাস কইরছ, বাচ্চা গোসল করাইতে পারো না।?’ সঙ্গে সঙ্গে ভাবির উত্তর, ‘এমএসসিতে আমাকে বাচ্চা গোসল করা শেখায়নি।’ আমার বাবা এটা শুনে এত আমোদিত হয়েছিলেন যে উদ্ভাসিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘এইয্যে না উত্তর।’ আসলে অতখানি ব্যক্তিত্ব ছিল বলেই অমন শ্বশুরের সঙ্গে কথা চালাতে পেরেছেন। এমনি অনেক ঘটনা ঘটেছে- বিভিন্নজনের সঙ্গে। সব বলতে গেলে ‘মেহের কবীর’ শিরোনামে একটা বই লেখা যায়।

এক সময় ভাবি ঘরে বাইরে নিরলসভাবে কাজ করেছেন, কখনও সমাজকর্মী, কখনও ছাত্রীদের প্রভোস্ট হিসেবে, কখনও মহিলা সমিতির তত্ত্বাবধানে আরও কতো যে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আমার সব জানা নেই। আমার মাও ভাবিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন- তিনি ভাবিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন- তিনি ভাবিকে বৌবিবি বলতেন। আমার ভারি মজা লাগে ভাবতে- তখনকার সম্ভাষণটা ভেবে। এখন নিশ্চয় কেউ বলবে না। একটা খানদানি ভাব আছে সে সময়কার সম্ভাষণে।

জনান্তিকে একটা কথা বলার লোভ সম্বরন করতে পারলাম না- ভাবি কিন্তু আমাকে খুব ভালোবাসেনÑ অন্যদেরও বাসেন কিন্তু আমাকে একটু বেশি। তিনি প্রায়ই আমার খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য মানিক ভাইকে অস্থির করে তুলতেন। আমার স্বামীকেও খুব ভালোবাসেন, তাকে খুব পছন্দ তাঁর। মজার ব্যাপার সবারই যেন মনে হয় আমাকে বেশি ভালোবাসেন।

প্রকৃতির নিয়মে ভাবি এখন বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে এস পৌঁছেছেন। অসীম ধৈর্য মহিলার। এ পরিণতিকেও খুব স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছেন। ‘কেমন আছেন?’ জিজ্ঞেস করলে হেসে হেসেই বলেন, ‘এ বয়সে আর কত ভালো থাকব ভাইয়া?’ সত্যি প্রশংসনীয়। আমার ভাই কবীর চৌধুরীও এমন স্ত্রী পেয়ে মনে হয় পরিতৃপ্ত। ওঁদের মধ্যে রোমান্টিকতা ছিল লক্ষণীয়। যৌবনে মানিক ভাইয়ের বিবাহবার্ষিকীতে বিদেশ থেকে ভাবিকে লেখা একটা কার্ডের কথা আমি কখনই ভুলব না- মানিকভাই ভাবিকে রবিঠাকুরের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন, ‘ হে নিরুপমা, ঘন কালো,তব কুঞ্চিত কেশে যুঁথির মালা’। বলাই বাহুল্য ভাবির চুল খুব সুন্দর ছিল- কালো, লম্বা কোঁকড়ানো চুল। লেখাটা পড়ে আজও আমার মুগ্ধতা কাটে না। তাঁদের বিবাহিত জীবনের ৬০তম বার্ষিকী পালিত হয়েছিল ধুমধাম করে। ওঁদের তিন মেয়ে রীনু, বেণু, টিংকু। সবাই সন্তানাদি নিয়ে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। মেরি ভাবি মানে মেহের কবীর- বলতে দ্বিধা নেই, আমার কাছে একজন অনুকরণীয়- প্রতিভাময়ী ধৈর্যশীল আধুনিক মহিলা, যদিও তাঁর মধ্যে আধুনিক মননশীলতা এবং কিছু সনাতনী ধ্যানধারণার পাশাপাশি অবস্থানও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সেটার মধ্যেও যেন কিছু শিক্ষণীয় আছে, কারণ সুবচনগুলো এখনও তাঁর কাছ থেকে নির্বাসিত হয়নি। জাগতিক বিষয়-আশয়ের প্রতি ভাবির নির্লোভ এবং উদাসীন দৃষ্টিভঙ্গি সত্যি প্রশংসনীয়। যে-কোনো অবাঞ্ছিত পরিস্থিতিতে যা অহরহ ঘটেছে তাঁর জীবনে সেখানেও অসীম ধৈর্য দেখে হতবাক হতে হয়। ভাবি ভালো থাকুন, জ¦রাব্যাধি জয় করুনÑ মনেপ্রাণে এ-প্রার্থনাই করি।

 

মুনীর ভাই

মানিক ভাইয়ের পরের ভাই মুনীর ভাই- ৪৭ বছর বয়সে ১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর, স্বাধীন হওয়ার দু’দিন আগে যাঁকে আমরা হারালাম। আলবদর আর পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে আরও অনেক বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে নৃশংসভাবে মুনীর ভাইকে হত্যা করা হয়েছিল। আমি তখন দিল্লিতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি আর আমার স্বামী ভারতে চলে গিয়েছিলাম। মুনীর ভাইকে শুধু আমরা নই, তাঁর শ্যালক বাদল ভাই নিয়ে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি শুনেছি- বাদল ভাই বলেছিলেন, আমি আপনাকে চ্যাংদোলা করে ঢাকা থেকে নিয়ে যাবো। উনি যাননি। এটাকেই বোধহয় নিয়তি বলে। মুনীর ভাইকে প্রায়ই বলতে শুনতাম, ‘আমার কিছু হবে না। আমি কি করেছি যে ওরা আমাকে মারবে?’ কিন্তু তিনি নিজেও জানতেন না তাঁর মতো জ্ঞানসমৃদ্ধ বুদ্ধিজীবী দেশের কি ছিলেন, কতখানি ছিলেন, কত বড় সম্পদ ছিলেন। পাকিস্তানিরা ঠিকই বুঝেছিল একটা দেশকে খোঁড়া করতে হলে বুদ্ধিজীবীকে নিধন করতে হবে। তাই, তারা পরাজিত হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। মুনীর ভাইকে চিনতে তারা ভুল করেনি। আমার ভাইবোনদের মধ্যে মুনীর ভাইকে আমার সবচেয়ে মেধাবী বলে মনে হয়- সবচেয়ে রসিক মনে হয়।

ঐ একটা মাথার মধ্যে কত যে বুদ্ধি, কত যে লেখাপড়া ছিল তা আর বলার নয়। মুনীর ভাই দুটো এম.এ. পাস করেছেনÑ প্রথমবার ইংরেজিতে, তারপর বাংলায়। বাংলায় এম.এ করেছেন জেলখানায় বসে। সে আরেক ইতিহাস। কমিউনিস্ট ছিলেন। তাই রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার দায়ে এক কি দু’বছর জেল খাটতে হয়েছিল। ঐ জেলখানাতে বসে বসেই বাংলায় সাহিত্য পড়েছেন এবং পরীক্ষা দিয়েছিলেন। প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থানও অধিকার করেছিলেন। তাঁর পরীক্ষার খাতা এত নিখুঁত এবং এত উচ্চমানের ছিল যে ড. এনামুল হকের একটা উক্তি উল্লেখ না করে পারছি না। পরীক্ষক হিসেবে তিনি খাতা দেখতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বান্চোত্ এত ভালো লিখেছে যে কোথাও একটুকু কাটার জো নেই।’ আসলে তিনি মুনীর ভাইর খাতায় নম্বর কাটার কোনো জায়গা পাচ্ছিলেন না।

মুনীর ভাই বড় সুন্দর করে কথা বলতেন- শব্দ ব্যবহার ও শব্দ চয়ন বড্ড ভালো ছিল তাঁর। একটু বইয়ের ভাষা বলতে ভালোবাসতেন- কিছু মাইকেল থেকে নিতেন, কখনও রবীন্দ্রনাথ, কখনও-বা বঙ্কিম। আমার বাবা যেমন রাগ হলে বঙ্কিমী ভাষায় বলতেন- একদিন আমরা তিন বোন আমি, বানু, রাহেলা একটু সন্ধ্যা করে বাড়ি ফিরেছিলাম- বাবা আমাদের তিনজনকে ডেকে বললেন, ‘পরম করুণাময়কে অশেষ ধন্যবাদ যে বিহঙ্গমেরা কুলায় প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই আমার কন্যাত্রয় তদীয় গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়াছে। যাও, নৈশভোজ সমাপন করিয়া শয্যাগ্রহণ কর।’ মুনীর ভাইও এ ধরনের কথা বলতেন কিন্তু সেটা রাগ করে নয়, ব্যাপারটার মধ্যে রস সৃষ্টি করার জন্য তিনি ওভাবে কথা বলতেন। আমার মা’র হাতের আটার রুটি আর আলুভাজি বড় সুস্বাদু ছিল। মুনীর ভাই ভারি পছন্দ করতেন। একদিন মা অসুস্থ থাকায় আমার মেজ বোন কণাআপার ওপর দায়িত্বটা বর্তেছিল। কণা আপা মহাযতœ করে গরম গরম রুটি ভেজে মুনীর ভাইকে দিচ্ছিলÑ মুনীর ভাই কোনোরকম দু’একটা খেয়ে উঠে যাচ্ছিলেন। কণা আপা বললেন, কী মুনীর ভাই রুটি ভালো হয়নি? মুনীর ভাই গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘না, রুটি ভালো হয়েছে এরং বেশ মজবুত হয়েছে।’ কণা আপা চুপসে গেল। মুনীর ভাই গম্ভীর হয়েই এমনি সব হাসির কথা বলতেন। একদিন আমাদের বাড়ি দারুল আফিয়াতে এসে অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কালেনÑ আমরা কেউ শুনিনি। অনেকক্ষণ পরে আমি যখন গিয়ে দরজা খুললাম, উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- এতক্ষণ কি করছিলি? আমি তাঁর  style-এ কথা বলতে গিয়ে বললাম, ‘ভক্ষণ করিতেছিলাম।’ তিনি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, ‘তোরা আবার ভক্ষণ করিস কিরে? ভক্ষণ তো করেন রাজা-বাদশাহ্রা, আমরা খাই আর তোরা গিলিস।’ কী অবলীলায় হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো বলে গেলেন- সেসময় আমি কিন্তু তাঁর কথাগুলো অবাক বিস্ময়ে গোগ্রাসে  গিলেছিলাম।

মুনীর ভাইর ভাষাটা সত্যি এক আলোচ্য বিষয় ছিল। সুন্দর সুন্দর  কঠিন বাংলা শব্দ ব্যবহার তাঁর স্বভাবজাত ছিল। তিনি যখন অবলীলায় ঐ ভাষায় কথা বলতেন আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম- তাঁর মুখে একটু অস্বাভাবিক মনে হতো না। অনেক সময় নিজেরা ঐ ভাষার কথা বলার চেষ্টা করতাম, কিন্তু বৃথা চেষ্টা- নিজের কানেই হাস্যকর ঠেকত।

তাঁর অনুবাদ পড়ে মনে হয় না যে তা অনুবাদ। এত সহজ, এত গতিশীল। শেক্সপিয়রের Taming of the Shrew-র বাংলা, ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ হতে পারে কে ভাবতে পারে! Taming -এর  বাংলা যে ‘বশীকরণ’ Shrew-র  বাংলা ‘মুখরা রমণী’-এ অভাবনীয়- কী অপূর্ব ছন্দময় অথচ কী সহজবোধ্য! ‘বশীকরণ’ কথাটা আমাকে বড্ড নাড়া দিয়েছে। এত সুন্দর একটা শব্দ কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। মুনীর ভাই সব শব্দ তুলে এনে যথার্থ স্থানে যথাযোগ্যভাবে প্রয়োগ করলেন।

এখানে ‘শাম্মা’র প্রসঙ্গটা না আনলে রসহানি হবে। শাম্মা, আমার immediate বড় ভাই রুশোর উর্দুভাষী স্ত্রী। সে তখন নতুন এসেছে। বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি তার অদম্য ভালোবাসা, উৎসাহ এবং কৌতূহল। প্রশংসনীয় যে অল্প সময়ে বাংলা শিখেও ফেলেছিল; কিন্তু সুন্দর বাংলা নয়- আমরা বাড়িতে যেমন বলতাম, খাইছি, গেছি, করছি ইত্যাদি। ঐ সময়ও বেশ লক্ষ্য করছিল মুনীর ভাইর চালচলন, বিশেষ করে ওঁর বাংলা বলার ঢং এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শব্দ প্রয়োগ। কিছুই বুঝতে না পেরে একদিন বলেই বসল, ‘মুনির ভাই কি বাংলা বলে না? উনি কী ভাষায় কথা বলেন?’ সবাই আমরা হেসে উঠেছিলাম এবং উত্তর দিয়েছিলাম, ‘অবশ্যই বাংলা এবং বিশুদ্ধ বাংলা বলেন- যে বাংলা আমি তুমি বলতে পারব না।’ কথা বলার এ এক অসাধারণ ঢঙ যেটা সহজে রপ্ত করা যায় না। আমি যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম, লক্ষ্য করেছি এবং শুনেছিÑ অনেকেই ওঁর কথা বলার ভঙ্গি এবং ভাষা নকল করার চেষ্টা করতেন- এক আধজন কিছুটা কৃতকার্য হয়েছিলেন কিন্তু হাস্যকর এবং সমালোচিতও হয়েছিলেন বটে। তাঁকে হুবহু অনুকরণ কার সম্ভব ছিল না। কিন্তু যাঁরা আংশিকভাবে তাঁর ভালো দিকগুলো নিয়েছেন তাঁরা অবশ্যই সার্থক হয়েছেন এবং সম্মানিত হয়েছেন। মুনীর ভাইর চরিত্রের আরেকটা সুন্দর দিক ছিলÑ মানুষের প্রতি তার ভালোটাই বের করে নিতেন।

আমি একবার একজনের সম্পর্কে আমার বিরক্তি প্রকাশ করেছিলাম, যিনি অন্য কোনো কাজে বেশ দক্ষ ছিলেন। আমি বলেছিলাম, ‘এত লোক থাকতে আপনি ওঁকে এ কাজের জন্য বাছাই করলেন কেন?’ বললেন, ‘তুই আর একটা নাম বল যে এ বিষয়ে এর চেয়ে অধিক দক্ষ?’ আমি বলতে পারিনি। সেই থেকে আমি এ শিক্ষাই পেয়েছি- একটা মানুষ সম্পূর্ণ খারাপ হতে পারে না। তার ভালোত্বটা বের করে নিতে হয়। মুনীর ভাই-ই কথাটা শিখিয়েছিলেন।

মুনীর ভাইর ছোটবেলাকার কিছু কথা আমার মায়ের কাছ থেকে শুনেছি- আসলে আমার ওপরের কয়েক ভাইর সঙ্গে আমার বয়সের তফাত এতোই বেশি যে নিজের চেখে দেখা আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা খুবই কম।

মুনীর ভাই বুদ্ধি মেশানো কিছু দুষ্টুমির কথা উল্লেখ করতে হয়। দুপুরবেলার ওঁকে ঘুম পাড়ানোর জন্য মা সঙ্গে নিয়ে শুতেন। কিছুতেই ঘুমাতে চাইতেন না। মা ধমকে বলতেন, ‘মুনীর চোখ বন্ধ কর। মুনীর ভাই নাকি চোখ বন্ধ করেই গান গাইতেন, হাত-পা নাচাতেন। মা যদি বলতেন, ‘মুনীর তোর না ঘুমাইতে বলছি।’ ওঁর সপ্রতিভ উত্তর ছিল, ‘আপনি তো আমাকে শুধু চোখ বন্ধ করতে বলেছেন, হাত-পা নাড়াতে তো বারণ করেননি।’

একটা নিষ্পাপ দুষ্টমির কথা বলি। আমাদের বাড়িতে হাউস (চৌবাচ্চা) ভর্তি পানি ধরা হতো। একদিন মা দেখেন, মুনীর ভাই দু’হাত পেছনে দিয়ে বারান্দাময় হেঁটে বেড়াচ্ছেন আর কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘ছব্বোনাছ (সর্বনাশ), কইরা ফালাইছি, ছব্বোনাছ কইরা ফালাইছি।’ সারা চোখেমুখে ভয়-ভীতি তাঁর। মা বললেন, ‘আরে কী করেছিস বল্?’ মুনীর ভাই মায়ের হাত ধরে টেনে হাউসের কাছে নিয়ে গেলেন এবং আঙুল উঁচিয়ে দেখালেন। মা দেখলেন- হাউসের একটা নালি কাপড় দিয়ে ঢিপি দেয়া ছিল, সেটা উনি টান দিয়ে খুলে ফেলেছেন। ফলে পানি বেশ জোরে গলগল করে বেরিয়ে আসছিল। আর তার মতো ছোট্ট মানুষের পক্ষে সেই নালি বন্ধ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। বেচারা প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়েছিল। এবার কিন্তু মা রাগ করতে পারলেন না। ছেলের অপরাধবোধের জন্য তাকে বুকে নিয়ে চুমু খেলেন।

আমার বাবার কড়া শাসনে মুনীর ভাই বিশেষ শাসিত বা প্রহৃত হতে পারেননি। কারণ শুনেছি বাবা মুনীর ভাইকে মারার জন্য এক হাতে বেত নিয়ে আরেক হাতে লুঙ্গি ধরে উঠানময় মুনীর ভাইয়ের পেছন পেছন ছুটতেন। এক সময় ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিতেন- সে এক দৃশ্য! না দেখলেও শুনেই আমি কল্পনা করতে পারি।

মুনীর ভাইয়ের জীবনটা আসলে ঘটনাবহুল। একসময় নাকি বাঁশিও বাজাতেন। জেল তো খেটেছেনই রাষ্ট্রভাষার জন্য। আলীগড় ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেনÑ আরো কত তথ্য যে আছে যা আমার অজানা।

মুনীর ভাইয়ের রাসবোধ ছিল উচ্চমার্গের। তাঁর humour বুঝতে হলে অনেকখানি সচেতন থাকতে হতো। সে সময় আমি আর বানু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ি। বানু ইংরেজিতে, আমি বাংলায়। মুনীর ভাই বাংলা বিভাগের একজন রিডার। বোন বলে বলছি না, বানু তখন বেশ প্রাণচঞ্চল তারুণ্যে মোড়া উজ্জ্বল আকর্ষণীয় একটি মেয়ে ছিল। একদিন মুনীর ভাই ইউনিভার্সিটির মাঠে দাঁড়িয়ে বানুকে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘বানু, বিয়া করবি? একটা ছেলে দেখেছি।’ বানু আর আমি দু’জনেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘ছেলেটা কেমন?’ মুনীর ভাই গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘ছেলেটি তার বাবার নাক, কপাল আর দাঁত পেয়েছেÑ দাঁতগুলো বিশ্রী না, একটু উঁচু আর ফাঁক ফাঁক, হাইটটা ওর মায়ের আর রঙটাও (অর্থাৎ বেঁটে ও ময়লা)। এবার সব মিলিয়ে নেÑ তাহলেই বুঝবি ছেলেটা দেখতে কেমন.’ শুনে আমরা এত হাসলাম, বানু তো প্রায় মারতে ওঠে। মুনীর ভাই কিন্তু হাসলেন না। এমনি তাঁর স্বভাব ছিল, নিজে গম্ভীর থেকে সকলকে অনর্গল হাসাতেন।

মুনীর ভাইর স্ত্রী লিলি চৌধুরী সে আমলে বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চে নাম করা অভিনয় শিল্পী ছিলেন। কিন্তু মুনীর ভাই চলে যাবার পর ভাবী সব ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁদের তিন ছেলে ভাষণ, মিশুক ও তন্ময়। ভাষণ মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল। পরে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে ডিপ্লোমা করে। পেশা হিসেবে বেছে নেয় আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার চাকুরি। বিদেশেই কেটেছে তার কর্মজীবন। ওর এক মেয়ে।

দ্বিতীয় সন্তান মিশুক গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এম. এ. পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছিল, কিছুদিন বিদেশেও কাজ করেছে। তারেক মাসুদের সাথে ছবি করেছে।  চলচ্চিত্র গ্রাহক হিসেবে খুব নাম করেছিল। শেষে যোগ দিয়েছিল এটিএন নিউজে। কিন্তু হঠাৎই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বন্ধু তারেক মাসুদের সাথে তারও জীবনাবসান হয়। মিশুক-মঞ্জুলির এক এক সন্তান সুহৃদ।

মুনীর ভাই-লিলি ভাবীর ছোট ছেলে তন্ময় লেখাপড়া শেষে করে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করেছে। নাটকেও যুক্ত আছে তন্ময়। বিভিন্ন সময়ে টিভিতে ওর বুদ্ধিদীপ্ত বক্তব্য ওর বাবাকেই মনে করিয়ে দেয়। আমাদের থিয়েটারেও যুক্ত আছে, থিয়েটার স্কুলে পড়ায়। লেখার হাত খুব ভালো।

এমন মানুষটাকে এত অল্প বয়সে শেষ করে দিল! আরও ৩০-৩৫ বছর বেঁচে থাকলে কত যে সুন্দর ঘটনা ঘটাত! কত কিছু জানতাম, শিখতাম, আনন্দ করতাম, কিছুই হলো না! অপঘাতে মৃত্যু হলো! স্বাভাবিক মৃত্যু হলে কোনো কিছু বলার ছিল না; তাই মাঝে মাঝেই মন কেমন করে ওঠে, এমন মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না।

 

নাদেরা আপা

মুনীর ভাইয়ের পরে ‘আপা’- যার পুরো নাম উম্মে হেনা নাদেরা বেগম। পরবর্তীকালে নাদেরা বেগম নামেই পরিচিত ছিলেন বেশিÑ খুব মেধাবী এবং তেজি ছিলেন। এখন পরিস্থিতি, বয়স, জরা, ব্যাধি ইত্যাদির কারণে সেই তেজ, সেই জেদের চার ভাগের একভাগও নেই।

আপাও ছিলেন কমিউনিস্ট। ছাত্রীসংঘের নেত্রী। আমাদের ছয় বোনের মধ্যে নাদেরা আপাই সবচেয়ে বড় আমাদের কাছে মাতৃতুল্য ও বন্ধুসম।

আমার ছোটবেলার কিছু মধুর স্মৃতি আছে তাঁর সঙ্গে। আপার সঙ্গে আমার বয়সের তফাত ষোল বছর। কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে আপা পড়তেন। হোস্টেলে থাকতেন। ছুটিতে যখনই আসতেন ছোট ভাইবোনদের ভালোবাসা, সবার চাহিদা মেটানো, ডাক্তার দেখানো, আমাদের চুল বাঁধা, ফ্রক সেলানো ইত্যাদি ছিল তাঁর কাজ। ফ্রক একটু অপছন্দ হলেই সে কি কান্নাকাটি, গাঁইগুঁই। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা আমাদের ঠান্ডা করে দিতেন। আপার  আদর্শকে, নীতিকে, তখনও আমি শ্রদ্ধা করতাম, আজও করি।

আপা নিজেই বলেছেন, ‘আমার জীবনদর্শন হচ্ছে  ‘Love and affection’ অর্থৎ লোককে ভালোবাস, কাজ কর, আত্মাত্যাগ কর, লোককে দাও, নিজেকে পরীক্ষা করÑ নিজের সমালোচনা কর, ক্ষমা কর।’

আপা বরিশাল সদর গার্লস স্কুলে পড়তেন। বাবা তখন সেখানে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। ১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিক পাস করেছেন। তারপর পড়েন কলকাতা লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। এই লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে তাঁর জীবনে একটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এখানে আই.এ. পরীক্ষায় তিনি মেধা তালিকায় ষোড়শ স্থানে ছিলেন, তবে মুসলমান মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন। আপার এ কলেজের পর্বটা বেশ বর্ণিল ও ঘটনাবহুল। লেডি ব্রেবোর্ন থেকে তাঁর নবজন্ম এবং চেতনার উন্মেষ।

আপাকে সম্পূর্ণ আমার বাবার আদর্শে, বাবার আদেশে চলতে হতো। বিশেষ করে পর্দা বিষয়ে। তিনি ছুটিতে বাড়িতে আসতেন বোরখা পরে আবার ফেরার সময়ও বোরখা পরে যেতেন। বোরখা ছাড়ার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা আছে। আপা থাকতেন হোস্টেলে। একবার কলকাতায় ফিরে যাচ্ছেন, তাঁর হাতে বোরখা, মানিক ভাই একটু দূরে আছেন; তিনি নিয়ে যাবেন কারণ সেসময় রায়ট চলছিল। পাবনা, ঈশ্বরদী এবং ভাই মানিক ভাইকেও দেয়া হয়েছিল পৌঁছে দেয়ার জন্য। আপা বাবাকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে যাবেন- অমনি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো বাবা পা দুটো সরিয়ে ফেললেন। আপার মিহি সাদা শাড়ি, অর্গ্যান্ডির ব্লাউজ আব্বার পছন্দ হয়নি। এতে মানিক ভাইও ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন- ঝট্ করে বোরখাটা উঠানে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘এখন থেকে হেনা (আপা) আর কোনোদিন বোরখা পরবে না।’ এমন লোকের সামনে এমন বিপ্লবাত্মক উক্তি করার মতো বুকের পাটা এবং ব্যক্তিত্ব কবীর চৌধুরীরই ছিল। আপা নাকি অত দুঃখের মধ্যেও চোখের জল মুছছিল আর ভেতরে ভেতরে উল্লসিত হচ্ছিলেন। কারণ গোটা কলেজে তিনি একাই বোরখা পরতেন, যদিও fashionable এবং fitting  বোরখা ছিল। এই মনিক ভাই-ই কিন্তু সাহসিকতার সঙ্গে আব্বার মনমানসিকতায় পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনিই একদিন আমার কোনো এক বোন বা ভাইকে প্রহাররত বাবার হাত থেকে শ্যামচাঁদটি (বেত) ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে ঐ বেতের ব্যবহার আমাদের পিঠের ওপর আর হয়নি। আমার কেন যেন মনে হয় আব্বাও চাইতেন কেউ সাহস করে তাঁর ঐ সনাতনী প্রথাগুলো উঠিয়ে দিক। তা না হলে এসব ব্যাপারে পরবর্তীকালে কোনো উচ্চবাক্য করতেন না কেন? রাগও করতেন না। বেশ স্বভাবিকভাবেই  সব মেনে নিতেন।

আপা ১৮ বছর বয়সে বি.এ অনার্স পাস করেন। ক্রমে কমিউনিস্ট মুনীর ভাইয়ের দীক্ষায় দীক্ষিত হন এবং রাজনীতিতে জড়িয়ে যান। আমাদের পিঠাপিঠি ভাইবোনের মধ্যে ভাব ছিল বেশি। মুনীর ভাই সারাক্ষণ নাকি আপাকে নিয়ে কবিতা বাঁধতেন এবং আপাকে ক্ষেপাতেন- সবটাই ছিল নির্মূল আনন্দ আপাকে দেখলে উনি প্রায়ই বলতেন :

ওরে ওরে হেনী(হেনা)

মানুষ তো হোস্ নি-

তোর নাম পেত্মি-

মুনীর ভাই-ই তাঁকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে M.A First Part-এ ভর্তি করে দেন ইংরেজিতে।  M.A Part 1, Part 2 দুটোতেই তিনি ফার্স্ট ক্লাস পান। আপাদের আব্বার কড়া শাসনে বাড়ির বাইরে যেতে দেয়া হতো না। তাই বলে বিনোদন ও জ্ঞানাহরণের পথ বন্ধ ছিল না। মানিক ভাই গল্পের বই এনে দিতেন- বুদ্ধদেব বসু, সুবোধ ঘোষ, প্রতিভা বসু, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এঁদের বই। আসলে ১৮ বছর বয়স থেকেই তিনি নির্ভীক এবং দুর্জয় সাহসী হয়ে ওঠেন। জেলও খেটেছেন দু’বছর। এই দু’বছরই ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। Part 1-এ পড়ার সময়ই ১৯ বছর বয়সে জেলে গিয়েছিলেন- তিনি ঢাকার জেলখানায় এবং রংপুর জেলে ছিলেন। তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে এসব জায়গায়। কিছু বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। আপার মুখেই শোনা- রংপুর জেলে মশার উপদ্রবে ঘুমোতে না পেরে সারা গোয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে শুতেন। খেতে চাইতেন না বলে নাকে নল দিয়ে খাওয়াতো। পাউরুটি আর দুধ দিলে সেটা একটা বেড়ালকে খাইয়ে দিতেন।, যেটা সবসময় ওঁর সেলে আসত। প্রশ্রয়টা উনিই দিয়েছিলেন।

রংপুর জেলের কথা শুনেছি- ওঁর রুমমেট ছিল সুন্দরী নামে এক উন্মাদ মেয়ে। সে স্বামীর সঙ্গে রাগ করে তার ছোট্ট বাচ্চাটাকে বঁটি দিয়ে দু’টুকরো করে ফেলেছিল এবং তারপরই উন্মাদের মতো হয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। তারও দু’বছর জেল হয়েছিল।

আপা সুদর্শনা এবং বেশ সুকণ্ঠী ছিলেন আমার মনে পড়ে। জেল থেকে বেরিয়ে একটা গান শুনিয়েছিলেন- জেলেই শেখা রংপুরের ভাষায় :

মৌনদারী মরিয়া-

মোর হইয়াছে হানি

আঁধার ঘরে বইস্যা বইস্যা পড়ে

চোখ্যের পানি-

হায়, টাপ্পস, কি টুপ্পুস্ করিয়া।

আপা উত্তাল রাজনীতি, মুসলমানদের রাস্তায় নামান এবং যাবতীয় আন্দোলনভিত্তিক কাজ করেছেন একবছর। আমার মা ছিলেন সাদাসিধে নরম-সরম এক মহিলা। মায়ের সঙ্গে আপার খুব বন্ধুত্ব ছিল। নির্ভীক স্পষ্টবাদী আপা, মায়ের সঙ্কুচিত স্বভাবের জন্য অনেক বকতেন মাকে কিন্তু মা ঠিকই জানতেন আপা তাঁকে কী ভালোই বাসত। এই আপাই কোনো এক ঘটনার কোনো এক প্রসঙ্গে বাবাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, আমার মাকে সোজা পাইয়া ঠকাইবেন না। অমন বাবাকে অমনভাবে শাসাতে বুকের পাটা লাগে বৈ কি? যথার্থ কারণেই আপার ওপর আমার মা অত্যন্ত নির্ভরশীল ছিলেন। মা সবসময় বোরখা পরে বাইরে যেতেন। একবার ট্রেনে করে আপাকে নিয়ে যেন কোথায় যাচ্ছিলেন। পাশে এক মহিলা বসেছিলেন। তিনি মাকে জিজ্ঞেসা করলেন আপাকে দেখিয়ে যে, ‘উনি আপনার কী হন?’ মা বললেন, ‘আমার মেয়ে।’ ভদ্রমহিলা বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘বলেন কী? এই বিচ্ছু মেয়েটা আপনার নিজের মেয়ে?’ শুনেছি এই আপাই পুলিশের চোখ এড়িয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতেন। সুযোগ পেলেই এসে মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে আবার চলে যেতেন। বেশিরভাগ রাতবিরাতেই এসব ঘটনা ঘটত। মা অনুনয়-বিনয় করতেন জীবন বিপন্ন করে এসব না করার জন্য এবং অঝোরে কাঁদতেন। আপা নাকি মাকে ধমকে বলতেন, ‘চুপ। কাঁদবেন না। অতই যদি ভালোবাসেন কয়েকটা টাকা দিন আমি চলে যাই।’

পুলিশের তাড়া খেয়ে আপা কতবার যে দেয়াল টপকেছেন ভাবা যায় না। পুলিশের পক্ষে তাঁকে ধরা খুব সহজ কাজ ছিল না। শুনেছি একবার ক্ষিপ্রগতিতে পালানোর সময় পুলিশ তাঁর আঁচলটা ধরে ফেলে। তিনি উপায় না দেখে ঘুরে ঘুরে শাড়িটা পুলিশের হাতে খুলে দিয়ে ব্লাউজ-পেটিকোট পরে দেয়াল টপ্কে পুলিশের নাগালের বাইরে চলে যান। পুলিশ শাড়ি হাতে আহাম্মক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মজার ব্যাপার, বেশ কয়েক বছর আগে এক অনুষ্ঠানে আমি বসে আছি, একজন বয়স্ক ভদ্রলোক আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি নাদেরা বেগমের ছোট বোন?’ আমি বললাম, ‘জি।’ বললেন, ‘ওরে বাপরে বাপ কী আগুন মেয়ে ছিল! আমি সেই ইন্সপেক্টর যার হাতে ওঁ শাড়ি রেখে দেয়াল টপকে চলে গিয়েছিল। আপনিও কি তাঁর মতো তেজি নাকি?

এই তেজি মহিলা এখন অনেক শান্ত। রাজনীতি নিয়ে কোনো আলোচনাই করেন না। তবে সময় সময় এখনও যে দপ্ করে জ¦লে ওঠেন না তা নয়। এখনও আমরা তাঁর মুখের ওপরে কোনো কথা বলতে খুব একটা সাহস পাই না। এখনও আমরা তাঁর মুখের ওপরে কোনো কথা বলতে খুব একটা সাহস পাই না। আপা কিছু দিন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। আপা ১৯ বছর বয়সে জেলে যান, ২১ বছরে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন, ২২ বছরে একজন অতি খাঁটি বিচক্ষণ ব্যক্তি গোলাম কিবরিয়াকে বিয়ে করেন এবং রাজনীতি থেকে একবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সুরুজ ভাই, আমার দুলাভাই (যিনি পরে অর্থ সচিব হয়েছিলেন) আপাকে বোঝালেন সংসার ও রাজনীতি দুটোর পাশাশাশি অবস্থানটা প্রায়ই কষ্টকর হয়। তাছাড়া তখন ১৯৫২-তে কমিউনিস্টদের রীতিনীতিও কিছু বদলে যায় এবং কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে বিপ্লবী রাজনীতিতে কিছু বিভেদ দেখা দেয়। সেটাও রাজনীতি ছাড়তে আপাকে উৎসাহিত করেছিল। তবে আপা বলেন, মূলত পারিবারিক কারণে এবং স্বামীর ইচ্ছাতেই রাজনীতি ছেড়েছেন।

আজ আমার বড় বোনটি শুধুই একজন গৃহবধূ, সুগৃহিণী এবং নিভৃতচারিণী। তিনি এখন আগের সেই জাঁদরেল মহিলাটি নেই। একেবারে নিষ্ক্রিয় বসেও থাকেন না- নানারকম অসুখের কারণে ছুটে বেড়াতে পারেন না ঠিকই; কিন্তু বাগান পরিচর্যা করেন, সংসার দেখেন, পরোপকার করেন, বই পড়েন।

আপা যেমনি উদার, তেমনি স্নেহময়ী, তেমনি দয়াবতী যাঁর দৃষ্টিতে কোনো শ্রেণিবৈষম্য নেই, কাজের লোকদের নিজের মতো ভালোবেসে ভালো রাখেন। তাদের লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক- আশাক, স্বাস্থ্য সবদিকেই তাঁর নজর। এসব কাজ সম্ভব হয়েছে তাঁর স্বামীর পূর্ণ সমর্থন থাকায়। বড় ভালো মানুষ তিনি। আপাদের দুই ছেলে- এক মেয়ে- বিকাল, টিবলু এবং দিশা। সবাই আমেরিকায় বসবাসরত। আপা যথার্থ অর্থে প্রকৃতিপ্রেমী, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত আলো পাওয়া এক মহিলা।

[ক্রমশ]