সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

অবচেতনের সহোদরা – জাকির তালুকদার

September 20th, 2016 11:31 pm
অবচেতনের সহোদরা – জাকির তালুকদার

গল্প

অবচেতনের সহোদরা

জাকির তালুকদার

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ২২ বছর হলে এখন ৬৬। কিন্তু গোলাম রসুলকে দেখলে কেউ তার বয়সের কথা ধারণাই করতে পারবে না। বড়জোর এটুকু বলতে পারবে যে বয়স তার চল্লিশের এপার-ওপার। গোলাম রসুলের দোকানের সামনে সাইকেল থেকে নেমে আব্দুর রশিদ বলল, ‘ব্যানার্জিরা গাছ বেচবে রসুল ভাই। চলো কাল দেখে আসি গাছগুলো। দেখে শুনে দর-দাম করা যাবে।’

নিশ্চিন্দিপুরের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের রেশনের দোকানদার আরশেদ আলির সেজো ছেলে আব্দুর রশিদ। রেশন দোকান ছাড়াও আরও ব্যবসা আছে আরশেদ আলির। কিন্তু লাল হয়ে গেছে রেশন দোকানের কল্যাণেই। সেই স্বাধীনতার পরপরের কথা। বঙ্গবন্ধু সে সময় সব জিনিসের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন রেশনে। বাজারে তখন চাল-গম-তেলের আগুন দর। লোকে বলে রেশনের জিনিস ব্লাকমার্কেট করত আরশেদ আলি। আরশেদ আলির কানেও গেছে কথাটা। কিন্তু কোনো উচ্চবাচ্য করে না সে এ ব্যাপারে। করলই না হয় সে কালোবাজারি। সবাই জানে বঙ্গবন্ধুর আমলে আওয়ামী  লীগের নেতা-হাফনেতা-পাতিনেতা কেউই বড়লোক না হয়ে ছাড়েনি। আরশেদ আলি তবে ছাড়বে কেন? সেও তো বঙ্গবন্ধুর দলেরই লোক, সত্তরের ইলেকশনে ভোটও দিয়েছিল নৌকাতে। ওর দোকান ঘরে টাঙানো থাকত বঙ্গবন্ধু আর সোহরাওয়ার্দি সাহেবের ছবি। প্রথমটা অবশ্য এখন আর নেই। পঁচাত্তরে পনেরই আগস্টের পর নামিয়ে রেখেছে আরশেদ আলি। এ থেকেই বোঝা যায় হাওয়া বুঝে পাল খাটাতে জানে আরশেদ আলি । এহেন বাপের সেজো ছেলে আব্দুর রশিদ তার বাপের বৈষয়িক বুদ্ধির এক কানাকড়িও পায়নি। ধরে-বেঁধে দোকানে বসালে মনমরা হয়ে বসে থাকে, খদ্দেরদের ত্যাড়া কথা বলে। আরশেদ আলি ব্যাটাকে পোষ মানানোর জন্য বিয়েও দিয়েছে। বছর ঘুরতে না ঘুরতে রশিদের বউ একটা নাতিও উপহার দিয়েছে আরশেদ আলিকে। কিন্তু রশিদকে ব্যবসাÑবাণিজ্যে আটকানো যায়নি। বিভিন্ন ব্যবসায় ফেল মেরে আব্দুর রশিদ এখন কাঠের ব্যবসা করছে পার্টনারশিপে।

আব্দুর রশিদের পার্টনার গোলাম রসুল নিশ্চিন্দিপুর বাজারের ‘পলাশ ফার্নিচার হাউজ-এর মালিক। স্বাস্থ্যটা খুব সুন্দর। হাত-পায়ের থোকা থোকা পেশিই বলে দেয়, একসময় দশাসই জোয়ান ছিল সে। এখনও অবশ্য মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়েনি। মাথার চুল উঠে গেছে সামনে আর ওপর থেকে। শুধুমাত্র কানের পাশ আর ঘাড়ের ওপর দিয়ে কাঁচাপাকা চুলের একটা রেখা ঘিরে রেখেছে চকচকে টাককে। গোলাম রসুল অবশ্য এখানকার আদি বাসিন্দা নয়। ও এসেছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। ঢাকায় নাকি কী একটা চাকরি করত। মা আর বোনকে নিয়ে থাকত। পঁচিশে মার্চের পর আটকা পড়েছিল ঢাকাতেই। বাধ্য হয়ে সেখানেই ছিল। কিন্তু রাজাকার আর মিলিটারিরা ওর বোনকে তুলে নিয়ে যাবার পর আর চুপ থাকেনি সে। মাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছিল নিশ্চিন্দিপুরে। মায়ের দূর সম্পর্কের ভাই শওকত উকিলের বাড়িতে মাকে রেখে যুদ্ধে গেল গোলাম রসুল। যুদ্ধ শেষে আর ঢাকায় ফিরে যায়নি। উকিলের একমাত্র মেয়ে নয়নতারাকে বিয়ে করে এখানেই থেকে গেছে সে। এরমধ্যে শওকত উকিল মরে গেছে। দুই ছেলে এক মেয়ের বাপ হয়েছে গোলাম রসুল। যুদ্ধ শেষে ঢাকায় গিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজেছে বোনকে, কিন্তু পায়নি। বোনের কথা কখনও মুখে আনে না গোলাম রসুল। কিন্তু ওর ঘনিষ্ঠ লোকেরা জানে, বোনের জন্যে একটা ভীষণ নরম জায়গা আছে ওর বুকের মধ্যে।

আব্দুর রশিদের কথা শুনে মুখ তুলল গোলাম রসুল। একটা ন্যাকড়াতে হাত মুছতে মুছতে বসল বেঞ্চিতে। বলল, ব্যানার্জিদের গাছগুলো কি ভালো?

‘ভালো মানে’ বেঞ্চিতে একটা চাপড় মেরে বলল আব্দুর রশিদ, ‘এই তল্লাটে অমন গাছ অন্য কোথাও নেই, এ আমি হলপ করে বলতে পারি রসুলভাই। চলো না নিজের চোখেই দেখবে।’

বলতে বলতে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে গোলাম রসুলের দিকে বাড়িয়ে ধরল আব্দরু রশিদ। গোলাম রসুল বয়সে ওর বেশ কয়েক বছরের বড়। আগে লুকিয়ে সিগারেট টানত আব্দুর রশিদ। এক সাথে কাজ করতে হয়, বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে হিসেব-পত্তর করতে হয়। বারবার আড়ালে সিগারেট টানতে যেত আব্দুর রশিদ। বুঝতে পেরে তার সামনেই সিগারেট খাবার অনুমতি দিয়েছে গোলাম রসুল।

আব্দুর রশিদের প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে দেশলাই জ্বালল গোলাম রসুল। নিজেরটা ধরিয়ে রশিদের দিকে আগুনটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে দেখল রাস্তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে সে। সেদিকে তাকিয়ে ছাপা শাড়িপরা একটা মেয়েকে দেখতে পেল গোলাম রসুল। ওর চেনা মেয়েটা। দুখু পাগলার বউ পুতুল। দুখু পাগলা অর্থাৎ দুখেন ছেলেটার রাজনীতির খাঁই ছিল খুব। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বুলি আউরে টেবিল চাপড়ে রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা দিত ইয়ার-বন্ধুদের সাথে। মাকে নিয়ে থাকত। হঠাৎ একদিন বিয়ে করে বউ নিয়ে এল। কোথা থেকে কে জানে। ওর শ্বশুর বাড়ি কোথায়, শ্বশুর-শাশুড়ি, শালা-সম্বন্ধি কেউ আছে কি না তা জানে না নিশ্চিন্দিপুরের মানুষ। তাই অনেকের ধারণা, পুতুলকে তুলে এনেছিল দুখেন কোনো দূরের গ্রাম থেকে। মা আর বউ নিয়ে ভালোই ছিল দুখেন। কিন্ত মাথায় অতি বিপ্লবী রাজনীতির পোকা। সর্বহারাদের দলে নাম লিখিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছিল। ছয়-সাত মাস পরে খবর এল ধরা পড়েছে দুখেন পুলিশের হাতে। জেলে বোধহয় মাত্রা-ছাড়া টর্চার করেছিল পুলিশ। বছরদেড়েক পরে বদ্ধপাগল অবস্থায় ছাড়া পেল জেল থেকে। একেবারে বদ্ধপাগল। এখানে-সেখানে পরে থাকত, নিজের মনে বিড়-বিড় করত। তারপরে বছর দুই হলো উধাও গ্রাম থেকে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। মাঝে মাঝে গুজব শোনা যায় কেউ এখানে দেখেছে কেউ সেখানে দেখেছেÑ কিন্তু ঐ পর্যন্তই।

আর এদিকে যা হবার তাই ঘটল। শাশুড়িকে নিয়ে থাকে পুতুল। বাপের বাড়ির কথা নেই মুখে। রাত-বিরেতে ঘরের দরজায় টোকা, ফিস ফিস করে ডাকা শুরু হলো ক’দিন বাদেই। শাশুড়িরও নাকি সায় ছিল। খেয়ে তো বাঁচতে হবে। কিছুদিন পর জানা গেল ইয়ার-দোস্তদের নিয়ে বুড়ো চৌধুরীর ছেলে খোকা চৌধুরী মজমা করছে রোজ পুতুলে ঘরে। আরও অনেকের চোখ ছিল পুতুলের ওপর, কিন্তু খোকা চৌধুরীর সাথে পাল্লা দিতে যাবে কে? অমন বুকের পাটা নিশ্চিন্দিপুরে কারও নেই। কিন্তু হালে শোনা যাচ্ছে খোকা চৌধুরীর সাথে আর বনিবনা নেই পুতুলের। ব্যানার্জি-গিন্নীর কাছে আশ্রয় নিয়েছে পুতুল। কাজ-কাম করে, থাকে ব্যানার্জিদের বাড়িতেই। ব্যানার্জিদের বাড়িতে অবশ্য বেশি লোক নেই। শুধু বুড়োবুড়ি দু’জন আর সরকার মশাই। ব্যানার্জিরা আগে এই তল্লাটের জমিদার ছিল। দুই ছেলের একজন ডাক্তার, একজন ঠিকাদার। একজন থাকেন ইরানে, একজন ঢাকায়। মেয়েটার বিয়ে হয়েছে ওপারে। বহরমপুরের এক বনেদি পয়সায়ালা ঘরে। এখানকার বিশাল বাড়ি আর সম্পত্তি আগলে রেখেছে দুই বুড়াবুড়ি আর তাদের পরিবারের সাথে চল্লিশ বছরের সম্পর্কযুক্ত সরকার মশাই।

আব্দুর রশিদের ঘাড়ে একটা থাবড়া মারল গোলাম রসুল। চমকে উঠে পুতুলের ওপর থেকে দৃষ্টি ফেরাল সে। হেসে উঠে বলল গোলাম রসুল, ‘কিরে! চোখ দিয়ে যে চাটছিস মেয়েটাকে। অবশ্য তুই যে চেষ্টা করেছিলি বাগে আনতে, সেখবরও আমি জানি।’

মুখ কাঁচুমাঁচু করে ফেলল আব্দুর রশিদ, ‘কি যে বলো রসুল ভাই। আল্লার কিরে, অমন বদচিন্তা আমার মনে আসেনি কখনও।’

গোলাম রসুল বলল, ‘জানি বাবা জানি। চিন্তা তোর মাথায় ঠিকই এসেছিল। তুই তো কিছুদিন ঘুরঘুরও করেছিস। পারিসনি শুধু  ঐ খোকা চৌধুরী আর তার দুই সাগরেদ হীরু আর অনন্ত গু-ার ভয়ে।’

 

দুই

পরদিন সকালে ব্যানার্জিদের বাগানে এল দু’জন। আব্দুর রশিদ গেল সরকার মশাইকে খুঁজতে। তিনিই গাছ দেখাবেন, দাম-দস্তুর করবেন। কিন্তু সরকার মশাই বাজারে গেছেন। অবশ্য ফেরার কথা কিছুক্ষণ বাদেই। অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল ওরা।

বাগানটা ব্যানার্জিদের বাড়ির পেছন দিকে। বিরাট বড় বাগান। আম-কাঁঠাল, কড়ই আর শিমুলের গাছ। বাগানের পরই বিরাট পুকুর। গোটা এলাকাটাই দেড় মানুষ সমান উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এখন অবশ্য পাঁচিল ভেঙে পড়েছে এখানে-ওখানে। পুকুরের ঘাটের অবস্থাও সে রকম। পুকুরের ধারে চিৎ হয়ে শুয়ে সিগারেট টানতে লাগল গোলাম রসুল। পাশে বসে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল আব্দুর রশিদ। হঠাৎ উল্টো দিকের ঘাটে চোখ আটকে গেল ওর। সিঁড়িতে বসে গা ডলছে পুতুল। মুখ তুলে ওদের দিকে পিছন ফিরে টুপ করে ডুব দিল বারকয়েক। তারপর ঘাটে উঠে চুল মুছল আঁচল চিপল পিছন ফিরেই। ভেজা কাপড়ের নিচে দেহের বাঁকগুলো স্পষ্টই বোঝা যায়। নিজের অজান্তেই ঢোক গিলল আব্দুর রশিদ। শরীর বটে মেয়েটার। চট করে গোলাম রসুলের দিকে তাকাল আব্দুর রশিদ। চোখ বুঁজে চিৎ হয়ে আছে সে। মুখ তুলে আবার পুতুলের দিকে তাকাল আব্দুর রশিদ। পুতুল ততক্ষণে ব্যানার্জি বাড়ির খিড়কি দুয়ারের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।

এই সময় আরও লোকের উপস্থিতি অনুভব করল আব্দুর রশিদ। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল তিনজন মানুষ। ভালো করে তাকাতেই আঁতকে উঠল সে। খোকা চৌধুরী আর তার দুই সঙ্গী হীরু, অনন্ত। অনন্তের হাতে ওর সবসময়ের অস্ত্রÑ সাইকেলের চেন। দৌড়ে গিয়ে খোকা চৌধুরী জাপটে ধরল পুতুলকে। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে একটা ঝোপের দিকে।

‘ছেড়ে দাও আমাকে, ছেড়ে দাও বলছি’ বলে চেঁচিয়ে উঠল পুতুল। এতক্ষণে বোধহয় তন্দ্রামতো লেগেছিল গোলাম রসুলের। পুতুলের চিৎকার শুনে চোখ খুলল। ভয়ে উত্তেজনায় এরই মধ্যে কাঁপতে শুরু করেছে আব্দুর রশিদ। কোনমতে বলল, খোকা চৌধুরী… পুতুলকে ধরতে এসেছে!

পুতুলের চিৎকার শোনা গেল আবার, ‘ভাই তোমরা আমাকে বাঁচাও।’ সাথে সাথে ইলেকট্রিক শক খাবার মতো লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল গোলাম রসুল। একরোখা ষাঁড়ের মত ছুটল ঝোপের দিকে। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে তার পিছু নিল রশিদও। ঝোপের কাছে গোলাম রসুলের পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে হীরু আর অনন্ত। অনন্ত বলল, ‘এদিকে আসবেন না। মাগিটার বড় বাড় বেড়েছিল। টাইট দিয়ে চলে যাব আমরা।’

রাগে ফুলছে গোলাম রসুল, ‘একী মগের মুল্লুক পেয়েছ? মেয়েছেলেকে জোর করে….’

কথা শেষ না হতেই মুখিয়ে উঠল অনন্ত, ‘ যা খুশি করব আমরা। ও কি আপনার বউ না বেটি যে নাক গলাতে এসেছেন?’

আর সহ্য করতে পারল না গোলাম রসুল। চটাস করে চড় মারল অনন্তের গালে। স্তম্ভিত হয়ে গেল অনন্ত। হীরু আর আব্দুর রশিদও কম অবাক হয়নি। এই তল্লাটে কেউ অনন্তের গায়ে হাত তুলতে পারে! তার ওপরে এই আধ বুড়ো, নিশ্চিন্দিপুরের অস্থানীয় গোলাম রসুল। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে কোমর থেকে ছোরা বের করল হীরু। ভাঁজ খুলছে। জোয়ান বয়েসে ঘুষি মেরে ঝুনো নারকেল ছিলেছে গোলাম রসুল। সেই রকমের ওজনের একটা ঘুষি ছুঁড়ল হীরুর মুখ লক্ষ্য করে। কাটা কলাগাছের মতো ধপাস করে মাটিতে পড়ল হীরু। হাত থেকে ছুরি ছিটকে চলে গেছে দূরে। হাতের চেন ঘুরিয়ে মারল অনন্ত। সরে দাঁড়িয়েছিল গোলাম রসুল। তবু ডান ভুঁরুর কাছে কপাল ছুঁয়ে গেল চেন। সাথে সাথে চামড়া ফেটে রক্ত বেরুল। কিন্তু ভ্রুক্ষেপ না করে অনন্তের কব্জি ধরে মোচড় দিল গোলাম রসুল। ফট শব্দ তুলে ভাঙল কব্জির হাড়। পেছন দিকে কষে একটা লাথি মারতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল অনন্ত। তারপর উঠে দাঁড়িয়েই ছুট দিল। এদিকে হীরু সবেমাত্র মাথা তুলতে যাচ্ছে। তার চোয়াল বরাবর লাথি হাঁকাল গোলাম রসুল। এক গড়ান দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অনন্ত যে দিকে গেছে সে দিকেই দৌড় লাগাল হীরু।

ঝোপের ওপাশে গাঁ গাঁ শব্দ হচ্ছে। বোধ হয় খোকা চৌধুরী মুখ চেপে ধরেছে পুতুলকে। টর্পেডোর মতো ছুটে গেল গোলাম রসুল।

পুতুলকে চিৎ করে ফেলে ওর ওপর উঠে বসেছে খোকা চৌধুরী। শাড়ি, ব্লাউজ ছিঁড়ে ফেলেছে। কোমড়ের কাছে হাত দিয়ে পেটিকোটের ফিতে ধরে টানছে। ঝাঁকড়া চুল মুঠি করে ধরে খোকা চৌধুরীকে টেনে তুলল গোলাম রসুল। তারপর ধাঁই করে বসাল ঝুনো নারকেল ছেলা ঘুষি। পড়ে গিয়েও এক গড়ান দিয়ে উঠে দাঁড়াল খোকা চৌধুরী। চোখে আগুন জ্বলছে, ‘আমার কাজে নাক গলানোর শাস্তি তুমি পাবে। কাল তোমাকে যদি নিশ্চিন্দিপুর ছাড়া না করি তো…’

অনন্তের ফেলে যাওয়া চেনটা তুলে নিয়ে এগুচ্ছে গোলাম রসুল। দেখতে পেয়ে মুখের কথা শেষ না করেই ছুট লাগাল খোকা চৌধুরী। বলা যায় না বাবা। যে মূর্তি ধরেছে গোলাম রসুল- জানে মেরে ফেলতে পারে!

 

তিন

মাঝরাতে দাওয়ার বাঁশের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে গোলাম রসুল। একা। কপালে লিউকোপ্লাস্ট দিয়ে তুলো লাগানো। তারার আলোতে ঝকঝক করছে আকাশ। একাত্তরের সেই রাতটাও এমনি তারাজ্বলা ছিল। সেদিনও বাতাসে ভেসে এসে গোলাম রসুলের কানের পর্দায় আছড়ে পড়েছিল দু’টো শব্দ- ‘ভাইজান বাঁচাও!’