সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

প্রচ্ছদ রচনা : এদেশের মধ্যবিত্ত বাঙালিরা প্রতিনিধিত্ব করুক : শহীদ ইকবাল

June 28th, 2018 6:18 pm
প্রচ্ছদ রচনা : এদেশের মধ্যবিত্ত বাঙালিরা প্রতিনিধিত্ব করুক : শহীদ ইকবাল

প্রচ্ছদ রচনা

এদেশের মধ্যবিত্ত বাঙালিরা প্রতিনিধিত্ব করুক

শহীদ ইকবাল

কাগজ করার প্রেরণাচোখ করে দেয় অনেক আকর্ষণীয় কাজ। এসব হয় কীসে! কমিটমেন্ট, কর্মযোগ, ক্রিয়াশীলতা এমন আরও কিছু। মীজানুর রহমানের কথা বেশ মনে পড়ে। বেঙ্গল কর্তৃক কালি ও কলম বেরুচ্ছে। শব্দঘরও তিনবছর পার করে ফেলল। উৎসাহ পাই, এসব দেখলে। নিজের কাজেও প্রত্যয় বাড়ে। খানিকটা শ্লাঘাও জন্মে। আমাদের ইতিহাসটাও তাতে বেশ চমক দিয়ে ওঠে। বায়ান্নর পর জাতি-ভাষাচেতনার লড়াই, তারপর মুক্তিযুদ্ধ। আজ অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। ফলে সহজ মনে হয় অনেককিছু। হয়তো সহজাতটাও ভুলে যাই। কিন্তু কাজগুলো আমাদের জন্য কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বাঁকে বাঁকে কতো ভীষণ অভিজ্ঞতা। কাউকে পেয়েছি, কাউকে হারিয়েছি। দেশ পেলাম, সংস্কৃতি পেলাম সব পেলাম আবার হারালামও। হাসান হাফিজুর রহমানকে মনে পড়ে। কী প্রতিকূলতায়- অসম্ভব সাহস আর আগ্রহে তখন কাগজ বেরুত। সিকান্দার আবু জাফর, রফিক আজাদ, আবদুল্লাহ আবু সাইয়িদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ আর স্বাধীনতার পর কতো কাগজÑ স্মৃতিমুখর হয়ে ওঠে। কদাচিৎ হাতে উঠলে ওর কাভার, প্রচ্ছদ, অক্ষরবিন্যাস নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠি, পাশাপাশি কর্মনিষ্ঠাও কম দোলা দেয় না। এটা আমাদের মহলে ‘কাগজের দেশ’। অনেককিছু নিয়ে হতাশা হলেও কাগজ নিয়ে আগ্রহ কমে না। অনেকেই কাগজ করেন, পৃষ্ঠপোষণাও করেন, নানাভাবে যুক্ত হন- লেখেন- লেখাটাতে দেশ-মাটি-মানুষের কথাটা স্বাধীনভাবে বলেন। প্রগতির চাকাটা ঘোরে, এগোয়, সম্মুখে চলে। হোক এ দেশ দরিদ্র, বার বার নেমে আসুক শকুন- তবুও কাজটা বন্ধ হয় না, চলে, বেসরকারিভাবেই চলে- কেউ না কেউ করে। এই চলতি ধারায় শব্দঘর বেশ চলছে। উজ্জ্বলরূপে সে বাড়ছে। বছর বছরই তার রঙ ও রেখা অনেক বর্তমানকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিকূলতাকে ঠেলেই তা ছড়াচ্ছে। প্রসারণ ঘটাচ্ছে। তাই লোভ হয়, লেখার আগ্রহ জমে। অনেকেই প্রবন্ধ লিখছেন, গল্প-কবিতা-অনুবাদ, এমনকি ওর একটি ইংরেজি অংশও পুটবন্দ। এটা খুব আগ্রহের বিষয়। সাহসেরও। এজন্য এর প্রাবল্য একটি অভিমুখ তৈরি করেছে বলে মনে হয়। বিশেষ সংখ্যাও এর অন্য প্রবণতার। সবচেয়ে বড় বিষয়, সমসাময়িক অন্য কাগজগুলোকেও সে আত্মাবন্দ করতে সক্ষম হয়েছে। আমি একটু এগিয়েই বলব যে, চলতি সময়ের গুণগত উৎকর্ষজাত কিছু নির্বাচিত পুস্তককে পরিচিতিমূলক চৌম্বক আলোচনা-অবলম্বী করলে, আগ্রহী পাঠকের তৃষ্ণাকে বুঝি উসকানো যায়; ঠিক একইভাবে লিটলম্যাগের ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। কিছু নতুন লিটলম্যাগ নিয়ে একটি অংশ। মধ্যবিত্ত বাঙালি পাঠকই তো সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রে। বিস্ময়কর, এই ঢাকায় এখন টানা পাঁচরাত ধ্রুপদীসঙ্গীতের উৎসব চলে, ভেতরে ভেতরে সংস্কৃতির কর্ষিত জমিন তার নির্ধারিত লক্ষ্য নির্মাণ করে চলছে, সে খাদ্যটুকু এই শব্দঘর অধিকতর করতে পারে। কীভাবে? যে কাজটুকু সে করছে, তার বৃত্ত বাড়িয়ে- অধিক রঙের তবে অবাণিজ্যিক কিন্তু প্রথাবিরোধী- আধুনিক আবার অপ্রাতিষ্ঠানিকও। হ্যাঁ, পত্রিকা তো লাভ-লোকসানের হিসেবের একদম বাইরে, সেটা অমূলকও- যদি কম মূল্যে অধিক আয়োজন ও উৎসাহের কাজটি করতে হয় তবে আর কি! সেইটিই শব্দঘর করছে। সে আরও করতে সামর্থ্যবান- তাই এসব বলা।

আমি চাই ওতে ধারাবাহিক উপন্যাস থাক, দস্তয়ভস্কির মতো লেখকের অনুবাদ একটার পর একটা চলুক, প্রজন্মকুল- পরিচিত হোক; গ্রহণে আনুক এমে সেজেয়ার, ফ্রানন কিংবা ফ্রেইরির মতো বিদ্বৎজনকে- অনুবাদের পরিধির ভেতর দিয়ে- এজন্য একদম কিছু সৃজনশীল প্রবন্ধও ছাপা যেতে পারে, যা মননধর্মীও- যেখানে জ্ঞান ও বিবেক বিচিত্র প্রশ্নসঙ্কুল হয়ে উঠতে সক্ষম হবে। এগুলো কমবেশি আছে, কিন্তু প্রবলভাবে ও উচ্চাশায় কামনা করি। মিথ-ইতিহাস-ঐতিহ্য-রাজনীতির সাহিত্য চাই। বিজ্ঞাপনের পরিসর যদি কমানো যায়, ভালো হয়। ক্রিয়েটিভ তরুণ কবি ও গল্পকারগণের জায়গা হোক, প্রতিষ্ঠিতরা আরও নতুন হোনÑ তবেই তাঁরা রঙীন হতে সক্ষম, তা না হলে কেন শব্দঘর তা ছাপবে! ওর যাত্রাটা তো ইতিমধ্যেই চাঙ্গা হয়েছে, সেটি আরও পরিপক্বতা পাক। তরুণদের কাছে কাগজটি সার্বভৌমত্বে পুনরুদ্ধার ও প্রতিষ্ঠা পাক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা ওটা নিয়ে ঘুম হারাম করুক। তাই তবে তাদের খোরাকটার দিকে নজর দিতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের বদলে ইউটার্ন হোক, পরিসরে জমে উঠুক সাহিত্যের মেলা; সবার- সব প্রজন্মের মুখপত্ররূপে। বিশ্বাসপ্রবণতাও থাকুক। তবে সতর্ক, সাহিত্যটাই যেন শব্দঘরের মুখ্য হয়, অন্য কিছু নয়।

বাংলা ভাষায় বুদ্ধদেব বসু চমকে দিতেন তরুণদের কবিতা ছেপে, কবি হওয়ার পথ বাতলে দিয়ে। নিজে অনুবাদ করেছেন, গদ্যের নতুন সীমানা ধরে দিয়েছেন, শব্দঘরও তা করতে পারে- করতে পারা যাবে না কেন? গুণী বর্ষীয়ানদের সঙ্গে নিক। গড়ে তুলুক বিজ্ঞানমনস্ক সব ভাবুক। সাক্ষাৎকারভিত্তিক কিছু, বর্ণাঢ্য করে। কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কারও সাক্ষাৎকারও পুনর্মুদ্রণ করে। সবই পারা যাবে, ইচ্ছেটা সজীব করে। এখন মুদ্রণ তো সোজা, তবে তা কঠিনও, লেখা পাওয়াও সোজা কিন্তু খাটিয়ে ভালো লেখা কম; তেলে মাথায় তেল তো বেশ চলে এখন- এ থেকে বেরিয়ে আসা। মধ্যবিত্ত মুক্তিযুদ্ধের আগে খুব দোলাচলে ছিল। পরে উঠতি বয়সে তো নতুন শিং গজাল- অতঃপর যা হয়! আবেগ, সেন্টিমেন্ট, অভিমান, শ্লাঘা, হতাশা, স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন, কাতরতা, বাসনায় পাওয়া, দায়শীলতা, স্ববিরোধিতা- কতো কিছু তখন ঢাকাকে ঘিরে, বাঙালির ভূমি পাওয়ার স্বপ্ন তখন। সেজন্য স্বাধীনতার পর বুঝি চূর! নতুন দেশে শত্রুমিত্র হানাহানিতে সব পরাস্ত- এমনকি ঘৃণ্য হত্যায় জাতির জনককে চিরতরে ট্র্যাজেডির অংশ করে ফেলা হলো। তারপর তো সংস্কৃতি নিয়ে বেলেল্লাপনা, অসহনীয় দুরাশার কাল। তবে এখন তো কতোকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে। এমনকী মধ্যবিত্ত শ্রেণিটিও দাঁড়িয়ে গেছে। এর শ্রেণিস্তর বোঝা যায়। দ্বিতীয় প্রজন্মে এসে সেই আবেগ-সেন্টিমেন্ট জমাটবদ্ধ। সম্মুখমুখ যেমন আছে তেমনি বিপরীতও। তাই এখনই কাগজ করার সময়। শব্দঘর করার সময়। মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য, গণজাগরণের সাহিত্য, জনতার মঞ্চের সাহিত্য, জনপ্রিয় সাহিত্যিক, তরুণ সাহিত্যিক, আর প্রচুর কবিতা ও কণ্ঠশীল লেখক এখন চলছে। কিন্তু নির্বাচনটা জরুরি। পত্রিকার অনেক উইনডো থাকবে, থাকবে জনসৃষ্টির আবেগ-অনুভূতির জ্বালাময় অভিমুখ। নাটক-চলচ্চিত্র-সঙ্গীত -ভাস্কর্য-চিত্রকলা নিয়ে বিস্তর কাজের সালতামামি থাকা বাঞ্ছনীয়। এগুলোর খামতি আছে শব্দঘরে। যোগ্যতর লেখক নির্বাচনও জরুরি। বর্ষীয়ান মানুষদের ধারাবাহিক আত্মকথার মূল্য তো কম নয়। সেগুলোর প্রতিশ্রুতি থাকা সমীচীন মনে করি।

 

২.

পরামর্শ করা সহজ। তাই পর্যালোচনা ভালো। শব্দঘর নিয়ে পর্যালোচনাই চলুক। তবে শুভেচ্ছা স্কন্ধে নিয়ে যেন পত্রিকাটি শুধু ভক্তি বা পুনরাবৃত্তির শরশয্যা না গড়ে। তাতে প্রত্যক্ষ ক্ষতির চেয়ে প্রচ্ছন্ন ক্ষতি অনেক। মনীষী ও মনীষার কেন্দ্র হচ্ছে প্রশ্নশীল হওয়া। এই প্রশ্নশীলতার অধঃক্ষেপ হিসেবেই একটি পত্রিকার জন্ম হয়। সেটি শৈশব পেরুলে তার প্রশ্ন-গতি আরও বাড়ে, তৎপরতাও দৃঢ়তর হয়। ঘনায়িত হতে থাকে তার দিব্যশক্তির আভা। শব্দঘরে সেটি সনিষ্ঠতায় দাঁড়াতে সক্ষম। তাকে কেন্দ্র করেই সেটি তৈরি হোক- বিস্তর মানুষকে প্রশ্নশীল করার চেতনা। যুক্তি ও কর্মই শুধু নয়- তাতে শিল্পগত সৌষম্যও থাক। আনন্দধারার পোষণা জাগরিত হোক। রুচি-বিচার বাড়ুক। এই বাণিজ্যমুখি সময়ে এটা এখন খুব দরকার। সাহিত্যের আত্মা তো জনসৃষ্টির ভিতরেই তৈরি হয়, দাঁড়ায়ও সেখানেই। সে নেতৃত্বটি তো শব্দঘর নিতে পারে। কীভাবে? লেখালেখির ভেতর দিয়েই। লেখক-নির্বাচন ও মুদ্রণের ভেতরেই নীরবে তা করা সম্ভব। এখন এই শূন্যতায় আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে এটা কমবেশি বেশ প্রয়োজন। প্রতিকূলতার মাঝে তো সেই ষাটে এমনটা পরি¯্রুত ছিল অথচ এখন অনুকূল পরিবেশেও তা হচ্ছে না। অথচ, সাহিত্যের জন্য বিসর্জিত ‘পাগল’ কম নেই। আর যারা আছেন তারা মূল্যহীনও নন। শুধু সাহিত্য, সাহিত্যের মানুষ, সাহিত্যের উপভোগ নিয়ে শব্দঘর তার পরিধি ব্যাপক করতে পারে। যেটি বলেছি, চিত্রকলা-ভাস্কর্য-স্থাপত্য বিষয়ক সুখপাঠ্য লেখা মুদ্রিত হোক, ভ্রমণসাহিত্য বা শিশুসাহিত্যের পাতাও বর্ণিল শোভাময় থাকÑ তাতে সাহিত্যরসিকদের যুক্ততা বাড়বে। অনেক আলোর সম্পাতে শব্দঘর সদম্ভ দাঁড়িয়ে যাবে। বিচ্যুত হওয়ার অবকাশ রইবে না। অগোচরেই সেটি তৈরি হবে। লেখালেখির কারণেই তার আবশ্যকতাও ঠিকরে পড়বে। ঢাকায় এটা সম্ভব, আর ঢাকার বাইরের লেখকদেরও যদি আয়ত্বে আনা যায়Ñ তবে কম কী! কার্যত, তা তো অসম্ভব কিছু না। কিন্তু সবার উপরেÑ সুযোগটা সকলকে দিতে হবে।

চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পত্রিকাটির জন্য স্বপ্নময় শুভেচ্ছা। জয়তু।

লেখক : সম্পাদক, চিহ্ন (লিটলম্যাগ)