সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

বৃষ্টি খুঁজে ফিরি – ওমর কায়সার

September 20th, 2016 11:30 pm
বৃষ্টি খুঁজে ফিরি  – ওমর কায়সার

গল্প

বৃষ্টি খুঁজে ফিরি

ওমর কায়সার

 

আমাকে তুমি কোথায় নিয়ে এসেছো?

জেনির আতঙ্কিত প্রশ্ন নির্জন বনভূমির ভেতর প্রতিধ্বনি হতে লাগল। হালকা হাওয়ায় তার চুলগুলো ফুরফুর করে উড়ছে। আমরা দুজন পাশাপাশি হাঁটছি। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামছে। সে আমার হাত ধরল। আর আমার মুখের দিকে চেয়ে আবার একই প্রশ্ন ছুড়ে দিলÑ আমাকে এখানে কেন এনেছ? আমার খুব ভয় করছে।

-কেন? কিসের ভয়? আমি তো আছি।

-আগে তুমি বল কেন এনেছ এখানে আমাকে?

-তোমাকে একটা কথা বলার আছে আমার।

-কী এমন কথা যে এই নির্জন বনের মধ্যে নিয়ে এসেছ? আমার কেমন জানি লাগছে। মনে হচ্ছে কোথাও কোনো ভয়ংকর কিছু ওৎ পেতে আছে। আমি জেনিকে অভয় দিলাম। বললাম তোমাকে বাঁচাতে আমি পৃথিবীর যেকোনো ভয়ংকর প্রাণীর সঙ্গে লড়তে পারি।

-আমাকে বাঁচাতে তুমি মরতে যাবে কেন? প্রশ্ন করেই সে এদিক-ওদিক হাঁটতে লাগল। যেন কিছুতেই তার মন নেই। আর কী যেন খুঁজছে। এ রকমই সে। অস্থির। মুহূর্তে মুহূর্তে তার ভাবনারা পাল্টে যায়। মনের ভেতর চড়ই পাখির মতো ইচ্ছেগুলো ছুটোছুটি করে। একবার এই ইচ্ছা কিচিরমিচির করে উঠলো তো একটু পরে আরেকটা ইচ্ছা সাঁই করে উড়ে এসে বসে গেল মনের বাসায়। কেমন যেন খেয়ালি। আমার সঙ্গে কথা বলার সময় একটু বেশিই হয়ে যায়। একটা প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে ফের আরেকটা প্রশ্ন বেরিয়ে এল তার মুখ থেকেÑ আচ্ছা এই বনে ফুল পাওয়া যায়?

-হ্যাঁ পাওয়া যায়। তবে আমাদের লোকালয়ের ফুলগুলোর মতো নয়। এখানে সব অন্যরকম ফুল। একটা ফুল আছে পাখির মতো দেখতে। পাপড়ির ঠোঁটগুলো আকাশের দিকে হা করে রাখে। আর আকাশ থেকে বৃষ্টি কিংবা শিশির পড়লে সেগুলো টুপ করে গিলে মুখ বন্ধ করে। কিছুক্ষণ পর পাপড়ি আবার খুলে যায়। আর সেই বৃষ্টি বা শিশিরের পানিগুলো হয়ে যায় মধু। পাখিরা, মৌমাছিরা, ভ্রমর এসে সেই মধু খায়।

-সে কি? অবাক হয় জেনি।

-চল আমরা সেই ফুল দেখে আসি। তারপর বসে বসে গল্প করব।

-তখন আমার কথা শুনবে তো?

-কী কথা?

-এটা একটা ভীষণ ভীষণ জরুরি কথা।

-চল আগে তোমার সেই পাখির মতো ফুল দেখে আসি।

আমরা আবার পাশাপাশি হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে একটা বিশাল ফুলের প্রান্তরে এসে পৌঁছে গেছি। যেন হাজার হাজার সবুজ আর লাল রঙের পাখি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। জেনি অবাক হয়ে দেখছে। তার চোখে মুখে খুশির আভাস। বললÑএই ফুলের নাম কি?

-আমি তো এই ফুলের নাম জানি না। ফুলের নাম জানি না শুনে একটু মন খারাপ করল। কিন্তু তার উল্লাস একটুও কমেনি। কৌতূহলেরও শেষ নেই, আচ্ছা ফুল থেকে মধু খেতে কোন পাখিরা আসে? সেগুলোর নামও বুঝি না জান না?

-এখানে কত পাখি আসে! সব ছোট ছোট পাখি। হাতের মুঠোয় আদর করে রেখে দেওয়া যায় এসব পাখিকে। কোনোটি মৌটুসি, কোনোটি রাঙাপাখি, টিয়েরাও আসে ঝাঁকে ঝাঁকে।

-ওরা কখন আসবে?

-আসবে। একটু অপেক্ষা করো। দেখবে পাখি আর প্রজাপতির মেলা। জেনি একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে। আর আমি উত্তর দিয়ে যাচ্ছি।

-ওই যে দূরে একটা গাছ দেখা যাচ্ছে, তার নিচে অনেকগুলো ফুল পড়ে আছে, ওগুলো কী ফুল?

-ওগুলো বনশিউলি। রাতের বেলা ফোটে, আর দিনের আলোয় ঝরে যায়। আমাদের শিউলির মতো। তবে এগুলো অনেক বড় বড়। ওই দিকে আঙুল উঁচিয়ে জেনি বলল, দেখ দেখ ওই বনশিউলির নিচে সাদা সাদা কী যেন নড়াচড়া করছে। ওগুলো কি?

আমি ওদিকে তাকালাম। দেখেই হাসি পেল খুব। বললাম, তুমি খরগোশ চেন না?

-কেন খরগোশ কেন এখানে?

-গাছের নিচের পড়ে থাকা বনশিউলিগুলো খরগোশেরা খেতে এসেছে। এভাবে একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছি। আর আমি জেনির মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। কখন তার ঠোঁট জোড়া নড়ে উঠবে। আর সেখান থেকে একটা প্রশ্ন উচ্চারিত হবে। জেনি প্রকৃতি দেখছে আর আমি দেখছি তার মুখ। এবার দেখলাম উৎফুল্ল মুখটা একটু অন্যরকম হয়ে গেল। কেমন যেন একটা ভয়ের মানচিত্র সেখানে। তার কথার স্বরও একটু নিচু হলো। বলল, দেখ, ওই যে দূরে কী একটা ওৎ পেতে আছে, ওটা কি? আমি দেখলাম, ফুলের গাছের আড়ালে অলস ভঙ্গিতে বাঘের মতো একটা অদ্ভুত প্রাণী বসে আছে। আমি বললাম, বাঘ হবে হয়ত।

ভীষণ ভয় পেয়ে গেল জেনি- এখন কী হবে? আমি তাকে অভয় দিলাম বরাবরের মতো। বললাম, কিছুই হবে না।

ও বলল, হবে না মানে? কি বলো তুমি? চল পালাই। মন খারাপ করে আমি জানতে চাইলাম, পালাবে?

-পালাবে নাতো কি বাঘের পেটে যাবে? আমার কিন্তু একেবারেই ভয় করছে না। মনে হলো বাঘটা আমাদের কিছুই করবে না। কিন্তু পালিয়ে আসতে হলো। এভাবেই পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। না না আমি পালিয়ে বেড়াই না। সেই যেন পালিয়ে বেড়ায়। কেন যে এমন হয় বুঝি না। কত দিন কতজনকে কত কথা বলেছি। অথচ একটা কথা কেন যে ওকে বলতে পারছি না, বোঝাতে পারছি না। একটি কথার দ্বিধা থরোথরো চুড়ে, ভর করে আছে সাতটি অমরাবতী। সেই একটি কথাই কখনও বলা হয় না। বারবার একটি কিছু এসে বাধা দেয়। কেন বাধা আসে? কিন্তু এ কথা যে আমাকে বলতেই হবে। একটি কথা, একটি অনুভব। বারে বারে ঘুরে ঘুরে আসছে আমার সমস্ত সত্তা জুড়ে। আমার অনাগত দিনের হাজারো দিনের মানচিত্র যেন এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। এই কথার ঘোরের মধ্যে আমিও যেন ঘুরতে থাকি। ঘুরতে ঘুরতে বিরক্ত হয়ে মাঝে মাঝে আমি আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসি। আমার সঙ্গে যুদ্ধ করি। ঝগড়া করি। আমি দুজন হয়ে যাই। একজন আমি চলি, ফিরি, কথা বলি, মানুষের কুশল জানতে চাই, ভার্সিটি যাই, ক্লাস করি আর আরেকজন আমি শুধু কষ্ট পাই, ভীষণ কষ্ট, সেই আরেকজন আমির ভেতরে অনেক অনেক দুঃখ জমা হয়ে ব্যথায় পরিণত হয়েছে। সেই ব্যথা কমানোর জন্য নেশা করি। তখন একটু একটু ভালো লাগে। নেশা করার পর আমার সঙ্গে আমির আরও বেশি যুদ্ধ হয়। বলে তুই যে নেশা করছিস শুনলে জেনি খুব রাগ করবে। তখন তোর না বলা কথাটা আর কোনোদিন শুনবে না। একটা কথা বলতে না পারার দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে চাই আমি। বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই স্বপ্নের বনভূমির ভেতর। সেই বনভূমির স্বপ্নের ভেতর। কিন্তু কি আশ্চর্য স্বপ্নের ভেতরেও বাঘ এসে হানা দেয়। স্বপ্নের মধ্যেও একটা তৃপ্তির বাতাস নেই। কেন? এ রকম প্রশ্ন আমাকে অস্থির করে। আমার সঙ্গে আমার আবার খুব ঝগড়া হয়। একজন আমি আমাকে বলে কী হবে কথাটা বলে? কী লাভ হবে তোর? আরেকজন আমি বলে, কথাটা আমাকে বলতেই হবে। ওটা আমাকে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে রেখেছে, আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। কথাটা বলার পর জেনি কি করবে জানো?

-কী করবে?

-জেনি আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকবে। আর আমি বলব, কি দেখছ অমন করে?

-তখন জেনি কি বলবে?

-তখন জেনি বলবে, তোমাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তোমাকে দেখে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কেন, এমন কথা বলবে কেন? কথাটা বলার পর আমি কি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ব। পরিশ্রান্ত হব। আমার সকল শক্তি কী শেষ হয়ে যাবে? আমি ভাবতে পারছি না। তবে মরি কিংবা বাঁচি আমি একদিন কথাটা বলবই। যেদিন বলব সেই দিনটি পৃথিবীটা যেন একান্ত আমার হবে। আমি দিনটির অপেক্ষা করছি। প্রয়োজনে বহু যুগ অপেক্ষা করব। এ রকম অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমি অনাগত দিনগুলোর কথা ভাবি। মনে করি ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। একবার বৈশাখি উৎসবে জেনিকে পেয়েছিলাম কাছে। না না স্বপ্নে নয়, বাস্তবে, মনের ভেতর যতরকম ভয় বাসা বেঁধেছে সবগুলোকে জোর করে তাড়িয়ে দিয়ে তার মুখোমুখি হলাম। গিয়ে এমন ভাব দেখালাম যেন হঠাৎ করেই তাকে দেখলাম, আরে তুমি, কেমন আছ?

-ভালো, তুমি?

-না ভালো নেই, তোমাকে একটা কথা বলব। কি কথা? অতটুক পর্যন্ত। কি কথা আর সে জানাতে পারিনি। তা বলার আগেই তার কোনো এক ভাই তাকে নিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় অবশ্য বলেছিল পরে কথা হবে। সেই যে বলা, কিন্তু আর হয়নি। অথচ কত দিন দেখা হয়েছে, কত কথা হয়েছে একজন আমির সঙ্গে। কিন্তু যে আমিটা অনেক ভেতরে লুকিয়ে থাকি সেই আমি কিছুতেই আর কোনো কথা মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিনি।

সেবারের বৈশাখী মেলার পর আমার সঙ্গে আমার ভয়ানক একটা তর্ক হয়ে যায়। আমার থেকে যে বেরিয়ে তর্ক করছিল। সে বড় একগুঁয়ে জিদ্দি ছেলে। কথাটা সে বলবেই। আমি তাকে আদর করি। কাছে ডাকি। ভয় হয় সে আবার কোথায় কী করে বসে। মাঝে মাঝে সে পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে পড়ার, নদীতে ডুব দেওয়ার কিংবা পতেঙ্গায় গিয়ে কর্ণফুলীর মোহনায় গিয়ে সাগরের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ইচ্ছা দেখায়। আমি তাই ভয় পাই। তাকে জোর করে আমার ভেতর নিয়ে আসি। দুজন আমি আবার এক হয়ে যাই।

আরেকটি সন্ধ্যার কথা বলি। সেদিন জেনির খুব কাছাকাছি এসেছিলাম। আমি তাকে কাছে ডাকলাম। সে একটু বিরক্ত হয়ে বলল, কি ব্যাপার? আমি বললাম, একটা কথা আছে। তার যেন শোনার আগ্রহ নেই। বুঝি শুধু সৌজন্য রক্ষার খাতিরেই সে বলছে, ঠিক আছে, কী বলবে বলে ফেল।

-না, সবার সামনে বলা যাবে না। একটু আলাদা হতে হবে। সে ধীরে ধীরে হেঁটে এল আমার সঙ্গে। একটু আলাদা হতেই একধরনের রাগ দেখিয়ে সে আমাকে বলল, তুমি সবার সামনে থেকে আমাকে আলাদা করে নিয়ে এলে। কে কি ভাববে বলো তো?

-কেন এতে ভাবার কী আছে? আমার পাল্টা প্রশ্ন শুনে জেনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তার মুখের ভাব দেখে আমি কিছুই বুঝলাম না। একটু পর সে মুখ খুলল, আচ্ছা বল, কী কথা বলবে। এবার আর আমার মুখ দিয়ে কথাটা বের হয় না। একটু ইতস্তত করে বললাম, হুট করে বলা যাবে না। কিছুক্ষণ সময় দিতে হবে। এবার যেন একটু বিরক্ত হলো সে, কিন্তু এ-সময় আমি তোমার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বললে সবাই কী বলবে বল তো? আমারও মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। খুব বিরক্ত হলাম। বললাম, কেন তুমি সবার সঙ্গে কথা বলতে পার, আমার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বললে কী হয় তোমার? আমার কথা শেষ না হতেই রেগে জবাব দিল জেনি, সবার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারি, কিন্তু তোমার সঙ্গে আমি পারি না।

আমিও ছাড়বার পাত্র নই, আমার সঙ্গে কথা বলতে তোমার শ্বাসকষ্ট হয়? গলায় কাঁটা বিঁধে?

-না, একটু শান্ত হয়ে জেনি বলল, শ্বাস কষ্ট হয় না। মনে কষ্ট হয়। পাড়ার দেয়ালে দেয়ালে তোমার আমার নামে কত কি যে লিখেছে বখাটে ছেলেরা। এসব কি হচ্ছে? আমি তো কোনো কিছুই করিনি তোমার সঙ্গে? আমি এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেলাম, এসব তো আমি করিনি।

-তুমি করো নাই, তাতো জানি।

-তবে, আমার ওপর কেন রেগে আছ?

এই কথার কোনো জবাব দিল না জেনি। চলে গিয়েছিল সেই সন্ধ্যায়। কি হচ্ছে? কেন এমন হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না। আমার বুকের ওপর চেপে থাকা পাথরটিকে আমি সরিয়ে ফেলতে পারছি না। যেন খেই হারিয়ে ফেলছি। যেন নাই হয়ে যাই। পথ চলতে চলতে, কথা বলতে বলতে আমার ভেতরের আমাকে কেউ বাধা দিচ্ছে। কোনো কাজই করে উঠতে পারছি না। পড়ার টেবিলে বসি। বইয়ের কালো কালো অক্ষরগুলোকে পিঁপড়ার সারির মতো মনে হয়। তারপর শূন্য সাদাপৃষ্ঠাকে রেখে ওরা কোথায় যেন পিলপিল করে চলে যায়। চোখের সামনে চলে আসে পত্রিকার পাতার কল্পিত হেডিং। পাশের হার। হাজার হাজার ছেলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে। আর আমি সেই হাসিমুখগুলোর ভিড়ে নেই। ভাবতেই শিউরে উঠি। ফেল করা মুখ নিয়ে জেনির সামনে দাঁড়াব কী করে। আমার মনে হচ্ছে, আমি যেন একটা যুদ্ধের সৈনিক। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার আমার বয়স ছিল ৫ বছর। ক্লাস ওয়ানের ছাত্র। এখন আমি এইচএসসি পরীক্ষার্থী। আমার বড়ভাই যুদ্ধে গিয়েছিল। যুদ্ধের সময় তারা তাদের দলনেতার নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলত। এখন আমার মনে হয় অদৃশ্য কোনো কমান্ডার আমাকে নির্দেশ দিচ্ছে, চলতে থাকো, এই পথে। আমি সেই নির্দেশ শুনে বললাম, এ পথ দিয়ে গেলে আমি কী পৌঁছাতে পারব?

অদৃশ্য কণ্ঠস্বর আবার শোনা যায়, তোমার পৌঁছানোর সম্ভাবনা শতকরা পাঁচ ভাগ। আমি মিনতি করে বললাম, ৯৯ ভাগ সম্ভাবনা আছে সেরকম একটি পথ আমাকে দেখিয়ে দাও। কমান্ডারের কঠিন কণ্ঠ শোনা গেল আবার- সে তোমার জন্য নয়। আমি খুবই ভয় পেয়ে গেলাম। আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম। আমি কীভাবে যাব?

-তোমাকে কিছুই বলা হবে না। তোমাকে নির্দেশ দিয়েছি চলার। তুমি চল। চলতে থাক। আর তাই যেন আমি চলছি। শুধু কি আমি। আমরা অনেকজন এ রকম অনিশ্চিত পথের দিকে হেঁটে চলেছি অদৃশ্য অধিনায়কের নির্দেশে। আমার ভেতরে যে এত কষ্ট এর জন্য কি শুধু আমি দায়ী। নাকি অন্য কেউ। আমি বুঝতে পারি না। আমি চিন্তা করতে পারি না। ভাবতে পারি না। কিন্তু আমার বন্ধু অলি যেন সব বুঝতে পারে। সে বলে, আসলে কারও দোষ নয়, না আমার, না তোর, এসব আসলে রাষ্ট্রযন্ত্রের দোষ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দোষ। আমার অবাক লাগে আমিও মানুষ, অলিও মানুষ। কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যে অনেক তফাৎ। আমি জেনিকে একটা কথা বলার জন্য যেমন ব্যাকুল, তেমনি সে একটা কথা মানুষকে বোঝাবার জন্য ব্যাকুল। সে বলে, এই সব পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে নতুন করে গড়তে হবে। নইলে তোমার আমার মতো হাজার হাজার অলি হতাশায় ভুগবে। জীবনটা ব্যর্থতায় ভরে যাবে। বৈষম্য দিন দিন বাড়বে। অলির কথাগুলো আমি কিছু বুঝি, আবার কিছু বুঝি না। বলার সময় ওর চোখ দুটো লাল হয়ে যায়। ভেতর থেকে একটা প্রবল শক্তি যেন ওর চোখে মুখে ভেসে আসে। কিন্তু অলির জন্য আমার খুব ভয় হয়। ও হয়ত বেশিদিন বাঁচবে না। এ রকম কথা যারা বলে তাদের বেশি দিন

বাঁচার অধিকার থাকে না। কেন যেন তাকে লুকিয়ে থাকতে হয়। প্রতিপক্ষের ভয়ে ভয়ে কাটাতে হয় দিন। বিজু গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে অলির কথা। বিজুর গলাটা খুব সুন্দর। দারুণ গান গায়। কিন্তু যখন সে অলির মুখে সমাজ পরিবর্তনের কথা শোনে তখন তাকে মনে হয় না সে একজন গায়ক।

তখন যেন সে অন্য একটা মানুষ। আমাদের বন্ধুদের আড্ডায় ইকবালও আসে। ইকবাল আমার কাছে জানতে চায়, কিরে পড়ালেখা হচ্ছে কিছু? আমি কিছু উত্তর করি না। সে বলে যায়, ধুর শালা, সবকিছু থাইমা আছে। বিষ খাইয়া মইরা যাইতে ইচ্ছা করে। সেই একই কথা। পুরোনো বিলাপ। ইকবালকে কী বলব? আমার ভেতরেও তো একই অনুভব। বলি-সিগারেট আছে তোর কাছে? ইকবাল উত্তর দেয় না। সিজার সিগারেটের প্যাকেটটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। এভাবেই চলতে থাকে কলেজজীবন। অতি পুরোনো লাইনের কোনো রেলের মতো। বিকেলে আবির আর আবিদ আসে। আমার বন্ধুদের না দেখলে আমার মনটা কেমন হয়ে যায়। বিকেল হতে না হতেই ওদের জন্য মনটা কেমন ছটফট করে। ওদের জন্য অপেক্ষা করি। ওরা এলে সবাই মিলে বোস ব্রাদার্সে গিয়ে বসব। চাঁদা তুলে চা মিষ্টি খাব। তারপর অনেক অ নে ক আড্ডা দেব। বোস ব্রাদার্সের মালিক যদি বিরক্ত হয়ে ওঠেন তখন আমরা ডিসি পার্কে গিয়ে বসি। আমার বন্ধুরা কবিতা লেখে, গল্প লেখে। আমি আবার ওসব পারি না। জেনিও গল্প কবিতা লেখে। আমাদের বোসের আড্ডায় মাঝে মাঝে আরও অনেক লেখক আসেন। তারা মনে করেন আমিও লিখি। তবে জেনিকে দেখানোর জন্য আমারও মাঝে মাঝে কবিতা ছড়া লিখতে ইচ্ছা করে। সেদিন চুপি চুপি আবিদকে একটি ছড়া লিখে দেখিয়েছি। ছড়াটা জেনিকে নিয়ে লিখেছি।

লতার মতো ঝুলছে দেখ দুই কাঁধে দুই বেণি হাজার ফুলের মিষ্টি সুবাস মন কেড়েছে জেনি। আমার দিকে তাকায়নি সে, আকাশে মুখ তুলল, তাকে আমি স্বপ্নে দেখেই হয়েছি উৎফুল্ল। আবিদ আমাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য ছড়াটার খুব প্রশংসা করল। সে আমার ছড়াটি একটা ম্যাগাজিনে ছাপিয়ে দিল। আমি খুশিতে তাদের রসমালাই খাইয়েছি। মা আর বড় আপাকে আমি সেই ম্যাগাজিনটা দেখালাম। তারা পড়ে বলল, হুম মন্দ না। তবে ওসবে ভাত জুটবে না। ওসবে ভাত কেন জুটবে না, আমি জিজ্ঞেস করিনি। আমি সযতনে ম্যাগাজিনটি আমার ড্রয়ারে রেখে দিই। এভাবেই চলতে থাকে আমার দিনগুলো। কিছুই বুঝছি না। কী হবে আমার। মা আমার ওপর রেগে যান। বলে, তোর কি পড়ালেখা নেই? এভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিস। মাকে খুব কম হাসতে দেখি। সব সময় কী যেন ভাবে। আমরা যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকি তখন মাকে জেগে থাকতে হয়। বাবা ফেরে অনেক রাতে। হয়ত মাঝে মাঝে নাও ফেরে। আবার খুব সকালে উঠে চলে যায়। বাবা একটা অদ্ভুত মানুষ। আমাদের সংসারটা চলে তার রোজগারে। অথচ তার সাথে আমাদের কোনো কথা নেই, কোনো স¤পর্ক নেই। আমার বুদ্ধি হওয়া পর্যন্ত শুধু দুইবার বাবার খুব কাছাকাছি হয়েছিলাম। একবার বিদেশ গিয়েছিল। অনেকদিন পর এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। বুকে চেপে রেখেছিল অনেকক্ষণ। গালে চুমু খেয়েছিল। আরেকবার বাবার টাইফয়েড হয়েছিল। তখন তার কাছ থেকে সরতে পারিনি। সেবার বুঝতে পেরেছিলাম বাবা আমাকে খুব ভালোবাসে। বাবার সঙ্গে আমার আর তেমন কোনো স্মৃতি নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় বাবার ওপর মায়ের খুব অভিমান। অথচ মা তা মুখ ফুটে বলে না। মা যেন এক বোবা দুঃখ নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে আছে। মাঝে মাঝে তাকে অচেনা ও দূরের মনে হয়। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় এর চেয়ে আপন আমার আর কেউ নেই।

আমার মন রক্ষা করার জন্য নাকি অন্য কিছুর জন্য জানি না মা মাঝে মাঝে আমার বন্ধুদের কথা জিজ্ঞেস করে। আবির যদি কয়েকদিন না আসে মা জানতে চাইবে। আমার অনেক কলমবন্ধু আছে। তাদের একজন রেখা আপু। কদিন রেখা আপুর চিঠি না এলে মা বলবে, কিরে তুই বুঝি আর চিঠি লিখিস না। মেয়েটা বড় ভালো মেয়েরে। রেখা আপুর চিঠি পেলে আমার দুঃখগুলো উড়ে চলে যায়। সবশেষ চিঠিতে রেখা আপু আমার সব দুঃখ দুঃখ কথা জানতে চেয়েছে। আমি কিসের কথা বলব আপুকে? জেনির? না, জেনিকে যত দিন কথাটা বলতে পারব না তত দিন তার কথা কাউকে বলব না। পড়ালেখার কথা লিখব? না তাও লেখা যাবে না। যদি পড়ালেখার কথা লিখি তবে পরের চিঠিতে শুধু উপদেশ আসবে। তবে আমি কড়া কথা লিখব? অলির কথা? অলি কয়েক দিন ধরে

হাসপাতালে। ডাক্তার বলেছে, অলির ফুসফুসে ঘা হয়েছে। নানা অনিয়মের কারণেই এই অবস্থা। ভালো হবে কিনা কিনা ডাক্তাররা বলতে পারছে না। কিন্তু তাকে যে বাঁচতে হবে। নইলে অনেক প্রশ্নের উত্তর আমরা পাব না। অলি চলে গেলে আমরা সবাই যেন ছিটকে যাব গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। বিজুর গান আর কখনও শোনা হবে না, বোস ব্রাদার্স-এর আড্ডা আর হবে না। ডিসি পার্কের বিকেলগুলো রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। আমি এসব কিছুতেই সহ্য করব  না। একবার একটা সিনেমায় দেখেছিলাম মনের কষ্ট সইতে না পেরে একজন বিষ খেয়েছে। আমিও এনড্রিন পান করব। তখন মা? মায়ের কী হবে? না আমি ভাবতে পারছি না। আমার মা এমনিতেই ভীষণ একা। কয়েকদিন আগে বড় আপু তার শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছে। বিয়ের পর থেকে বড় আপু আমাদের বাসায় থাকত। যাওয়ার দিন যেন আবার নতুন করে বিয়ে হল আপুর। আপুর মেয়ে রিতা আর নাজু সকালে আমার সঙ্গে আর পার্কে যাবে না। ওরা আমার ছড়া শুনবে না। ভাবতেই মনটা কেমন করে উঠল। আমার মা আরও বেশি একা হয়ে গেল। বড় ভাইও বাবার মতো ভীষণ ব্যস্ত হয়ে গেছে। সপ্তাহে একদিন ঘরে থাকে শুধু। বাবাও ঠিক তাই। অনেক রাতে ঘরে আসে। ঘরটা সারা দিন চুপচাপ থাকে। আমার বোন শিমুটা কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। একবার একটি ছেলের সাথে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল তাকে। মা আচ্ছা বকা দিয়েছিল। সেদিন থেকে সে বদলে গেছে। ছেলেটাকে আর কোনোদিন দেখা যায়নি। তার মন ভালো করতে আমি তাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতে চাই। বেশির ভাগ সময় যেতে চায় না। মাঝে মাঝে যদি যায় চুপচাপ থাকে। আমাদের বাড়ি থেকে প্রাণটা চলে গেছে। বিকেলেও আর সময় কাটে না। আমার বন্ধু আবিদরা ঢাকায় চলে গেছে। পরীক্ষার জন্য অন্যরা ব্যস্ত। এর মধ্যে বাবা আমাকে একদিন ডাকলেন। শিমুর বিয়ের কথা বলল। আমি বললাম, এত তাড়াতাড়ি বিয়ে না দিলে হয় না। আমার মৃদু প্রতিবাদে কাজ হলো না। বর ব্যবসায়ী। একদিন বরের অফিসে আমি গেলাম। আমাকে খুব খাতির করল। অনেক খাওয়াল। ভাবলাম, মরা বাড়িটাতে একটা প্রাণ আসবে। বড় আপুর সঙ্গে তার ছেলেমেযেরা আসবে। দারুণ হইচই আর ফুর্তি হবে।

এ কদিন ভীষণ ব্যস্ত আমি। শিমুর বিয়ের কার্ড করা সহ বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিমন্ত্রণ করা আমারই ঘাড়ে পড়েছে। বাবা কেন জানি টাকা দিতে কোনো দ্বিধা করছে না। বলল, সবাইকে দাওয়াত দিবি। কেউ যেন বাদ না পড়ে। আমি একে একে সবাইকে বলেছি। আমার বন্ধুদেরও। গুনে গুনে সবাইকে। তবুও কেউ যেন বাদ পড়ে গেল। অলি? হ্যাঁ তার বাসায় গিয়ে দেখলাম সে ঢাকায় গেছে। সুস্থ হয়ে সে আবার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। ছোট্ট একটা চিরকুট লিখে তার বোনকে দিয়ে গেলাম। আর কাকে বলা যায় আমার বোনের বিয়েতে? জেনিকে বলব? হ্যাঁ এই সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়?

প্রিয় পাঞ্জাবি আর একটা চেক পেন্ট পরে জেনিদের ওখানে রওনা দিয়েছি। আজ আর পুরোনো কোনো কথা তুলব না। বলব না যে, একটা কথা তোমাকে বলার আছে। শুধু বোনের বিয়ের কথাটা বলে চলে আসব। আজ আমার মনে তাই কোনো দ্বিধাও নেই। ভাবতে ভাবতে কখন যে ওদের বাড়ির গেটের সামনে চলে এলাম। গেঁটের কড়া নাড়তেই দারোয়ান খুলে দিল।

-জেনি আছে?

-জি না, আপায় তো নাই।

সবকিছু ভেবেছি, কিন্তু ও যে না থাকতে পারে সেটি ভাবিনি। বিয়ের কার্ডটা দারোয়ানকে দিয়ে আসব কিনা ভাবছি। চিন্তা করছি। দারোয়ান আমাকে বললÑ কিছু কইবেন? আমি বললাম, না, আমি পরে আসব। এই বলে ফিরে আসছি। এমন সময় রিকশার টুংটাং শব্দ শুনলাম। দেখলাম একটা রিকশা এসে ওখানে থেমেছে। আর তাতে বসে আসে জেনি। আমাকে দেখে যেন চমকে গেলÑ এত দিন পর কোত্থেকে তুমি?

-এই তো আছি। আমি আসলে একটা কথা বলতে এসেছি, কথাটা বলেই আমি ঘাবড়ে গেলাম। জেনি নিশ্চয় মনে করবে আমি সেই পুরোনো রেকর্ডটা আবার চালিয়ে দিলাম।

ও বলল, ঘরে আসো।

-আমার একটু তাড়া আছে।

-কী আবার তাড়া? একটু আসো প্লিজ। ঘরে কেউ নেই। একা একা খুব বোরিং। তোমার সাথে একটা

গল্প করি।

-কেন তোমার মা বাবা কই?

-ওরা সিঙ্গাপুরে।

কথা বলতে বলতে আমরা ঘরে ঢুকলাম। জেনি আগের চাইতে যেন বড় হয়ে  গেছে। আমাকে ড্রয়িং রুমে বসতে বলে ভেতরে গেল। একটু পরে ফ্রিজের ঠান্ডা পানির শরবত এনে দিল। পাখাটা ছেড়ে দিল। জেনি তার দুই বেণি সামনে ঝুলিয়ে দিয়ে আমার সামনাসামনি বসল। আমার এলোমেলো চুলগুলো উড়ছে। তার বেণির বাঁধনের বাইরের চুলগুলো উড়ছে। জেনি বলল- তারপর কি খবর? আমি বললাম, আমার একটা কথা আছে।

জেনির মুখে রহস্যময় হাসি। টোলপড়া গালের হাসিটা আর বেশি করে ছড়িয়ে দিয়ে সে বলল, তুমি একটা আস্ত বোকা। আমি একটু অবাক হলাম। কিছু তো বুঝতে পারছি না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বললাম,

আমার বোন শিমুর বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে এলাম।

-বোকা। আমি তো জানি তুমি কী বলতে চাও। কিন্তু এসব কি কখনও বলে কয়ে হয়? আমাকে তুমি  ভালোবাসো- এই কথাটা কি বলার ব্যাপার? এটা তো বোঝার ব্যাপার। পাগল। আর শোন আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি। এই বলে জেনি হিহি করে হাসির বৃষ্টি ছড়িয়ে দিল। আমি যেন স্বপ্নের সেই পাখির মতো, ফুলগুলোর মতো। অনেকদিন ধরে এ রকম বৃষ্টি খুঁজে ফিরছি। আমি দুহাত দিয়ে জেনির দুবাহু ধরে তার ঠোঁটে আলতো চুমু খেয়ে বললাম, শিমুর বিয়েতে যাবে তো? সে হেসে উত্তর দিল, তুমি আমাকে নিতে এসো।