প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-এর শব্দ শুনি : হুমায়ূন কবির

প্রচ্ছদ রচনা

শব্দঘর-এর শব্দ শুনি

হুমায়ূন কবির

 

বৈরী সময়ে পথে নেমেছে শব্দঘর। ইদানীং সাহিত্য পত্রিকাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক। এর কারণ নিশ্চয়ই আছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের দৈনন্দিন সাধ-আহ্লাদের অনেক কিছুই বাজার অর্থনীতির কাছে বন্ধক দেয়া এখন। এই অবস্থায় শুদ্ধ সাহিত্যচর্চার আকাক্সক্ষা যারা পোষণ করেন তারা অবশ্যই  নমস্য। শব্দঘর তেমনি এক নমস্য প্রয়াস। আজ তার চার বছর। এই উপলক্ষে, শব্দঘরকে আমাদের অভিনন্দন। শব্দঘর-এর জন্য আমাদের শুভেচ্ছা। শব্দঘর-এর কাছে আমাদের প্রত্যাশা।

আমি শব্দঘরে লিখি, কিন্তু দেশের বাইরে থাকার কারণে এর সবগুলো সংখ্যা নিয়মিত হাতে আসে না। এবার স¤পাদক মহোদয় অনেকগুলো সাম্প্রতিক কপি হাতে তুলে দিয়ে বললেন, বর্ষশুরু সংখ্যায় একটা মূল্যায়নধর্মী লেখা দিতে, শুধু আলোচনা নয়, নিরপেক্ষ সমালোচনাও থাকতে হবে। আমি মনোযোগ দিয়ে পড়ে দেখেছি বেশ কয়েকটি সংখ্যা এবং মুগ্ধ হয়েছি। পত্রিকাটি নিঃসন্দেহে সাহিত্য পত্রিকার অবয়ব রক্ষা করে চলেছে। বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকে এর ক্রমাগত সমৃদ্ধি সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। আমরা জানি, সাহিত্য পরিবেশনও একটা শিল্প এবং সব শিল্পকর্মের মতো এতেও নানান দৃষ্টিকোণ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এই প্রসঙ্গে সম্পাদনা বিভাগ আর বিপণন বিভাগ সমান্তরাল চিন্তা নাও করতে পারেন। আর এজন্যই বোধকরি পত্রিকাটিতে ছবির বাহুল্য চোখে পড়ে।

লেখা নির্বাচন আর পরিবেশনায় শব্দঘরের বিষয়-বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। সাহিত্য সম্পর্কিত নানাবিধ বিষয়কে যতœ সহকারে তুলে ধরছে পত্রিকাটি। ছোট কাগজ নিয়ে আলোচনার পাতাটি খুবই প্রয়োজনীয় একটা পাতা মনে হলো আমার কাছে যেখানে শুধু প্রকাশের খবরটিই ছাপা হয় না বরং এর নানান দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এর মাধ্যমে একটা গুরুত্বপুর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে শব্দঘর। পুস্তক পর্যালোচনার বিষয়টি নিয়েও একই কথা বলা চলে। আমাদের দেশে প্রকৃত অর্থে সমালোচনা সাহিত্য গড়ে ওঠেনি তেমন ভাবে, অথচ পাশ্চাত্যে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। পর্যালোচনার ব্যাকরণ মেনে বই নিয়ে আলোচনার এই প্রয়াসটিকে খুবই আশাপ্রদ মনে হয়েছে। আমার ধারণা শব্দঘরের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই দিকটা আরও পোক্ত হবে। আরও একটা বিষয় লক্ষণীয়, শব্দঘরের লেখকসূচিতে দুই বাংলার বরেণ্য লেখকদের পাশাপাশি প্রবাসে বসে সাহিত্য করেন এমন লেখকদেরও সমান বিচরণ। আমি মনে করি পূর্ব বাংলার সাহিত্যকর্ম আর পশ্চিম বাংলার সাহিত্যকর্মের সাথে প্রবাসে রচিত বাংলা সাহিত্যকর্মের নিষ্ঠাবান সংযোজন উদীয়মান এই তৃতীয় ধারাটিকে বুঝতে সাহায্য করবে।

একজন পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে বলব, ইংরেজি বিভাগ এই পত্রিকার একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এই সংযোজন পত্রিকাটিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু কারও কারও কাছে, বিশেষ করে ভিনদেশি পাঠকদের কাছে, মাত্র কয়েক পৃষ্ঠার এই বিভাগটি পূর্ণাঙ্গ কলেবরের একটা বাংলা সাহিত্য পত্রিকায় নবিশি  সংযোজন বলে মনে হতে পারে। তার চেয়ে আমি বলব, বাংলা সাহিত্যের  ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষায় বছরে দুটো সংখ্যা বের করলে কেমন হয়? ইংরেজি পাঠক ওই সংখ্যাটা হাতে নিয়ে বাংলার বাহুল্যে জর্জরিত হবেন না, আবার বাংলা সাহিত্য পত্রিকাটিতেও ইংরেজির অনুপ্রবেশ দৃশ্যমান হবে না।

লেখাটির শুরুতেই যা বলেছিলাম, ছাপা সাহিত্য পত্রিকাগুলো এখন ঝুঁকির মধ্যে আছে, মানোন্নয়নে ক্রমাগত প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ বাণিজ্যিক স্বাচ্ছন্দ্য আসছে না। অথচ সবাই বলেন পাঠক বাড়ছে, লেখকও বাড়ছে। সম্পাদক মোহিত কামাল ২০১৬ সালের বর্ষশুরু সংখ্যায় লিখেছিলেন, “এত বেশি কবিতা, গল্প, উপন্যাস কিংবা প্রবন্ধ-নিবন্ধ শব্দঘর ই-মেইলে আসে, মাঝে মাঝে মনে হয়েছে উত্তরাধিকার, কালি ও কলম কিংবা শব্দঘর-এর মতো আরও অন্তত আরও পাঁচ থেকে দশটি পত্রিকা থাকা উচিত।” তার এই বোধ শুধু একজন সাহিত্যকর্মীর বোধ নয়, একজন সমাজকর্মীর বোধও এখানে প্রচ্ছন্নভাবে উঠে এসেছে। আমরা লেখকের সামাজিক দায়িত্ববোধের কথা বলি, পুস্তক প্রকাশক কিংবা পত্রিকা মালিকদের দায়িত্ববোধের কথাও বলি। কার্যত মুষ্টিমেয় কজনই কেবল এগিয়ে আসেন সচেতনভাবে এই কর্মস¤পাদনে। শব্দঘরের মতো এরাই উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছেন। অনেকে এও বলেন, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে ছাপা কাগজ আসলে বিলুপ্তির পথে। একে রক্ষার উপায় নেই। আমরা এর উল্টো স্বপ্ন আঁকড়ে ধরতে চাই। আর এই স্বপ্ন কুটিরের দাওয়ায় এখনো যারা প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন তাদের মধ্যে শব্দঘর অন্যতম। শব্দঘরকে অভিনন্দন। শব্দঘরের বহুল প্রচার কামনা করি। শব্দঘর দীর্ঘজীবী হোক। শব্দঘর-এর শব্দ ছড়িয়ে যাক দিদ্বিদিক।

লেখক : সম্পাদক, ঘুংঘুর (লিটলম্যাগ)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Pinterest
Instagram