সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর, হও প্রাণের স্বর : খালেদ হোসাইন

May 4th, 2018 8:53 am
প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর, হও প্রাণের স্বর : খালেদ হোসাইন

প্রচ্ছদ রচনা

শব্দঘর, হও প্রাণের স্বর

খালেদ হোসাইন

সাহিত্যের কাছে আমার প্রত্যাশা তা জীবনবোধ পরিপুষ্ট করবে, চেতনা পরিস্রুত করবে, জীবনদর্শন উন্নততর করে তুলবে। সাহিত্য-পত্রিকার কাছেও আমার প্রত্যাশা তেমনই। তাই শব্দঘরে’র কাছেও। কেবল সুমুদ্রিত বর্জ্য যেন সে না হয়ে ওঠে।

দেখতে দেখতে সময় বয়ে যায়, একুশ শতকেরও পেরিয়ে এসেছি দেড়টি দশক। অতিক্রান্ত সময়ে নানারকম সাহিত্য-পত্রিকার দেখা পেয়েছি। সঙ্গত কারণে তার অধিকাংশ মহাকালের অতল গর্ভে হারিয়ে গেছে, কোনো কোনো পত্রিকা পরিণত হয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যে। ফলে এ-সময়ে কোনো পত্রিকা বের হলে, তাকে প্রত্যাশার চাপ ও তাপ বইতেই হবে। সাহিত্যে রসের জায়গা বড়, কিন্তু সাহিত্যপত্রিকার রসিকতার কোনো সুযোগ নেই। তাকে সিরিয়াসলিই কাজ করতে হবে। কিন্তু শব্দঘর যথেষ্ট যোগ্যতা নিয়ে সে কাজ করতে পারছে বলে মনে হয় না। এটা দুঃখজনক। কারণ পত্রিকার কাগজ, মুদ্রণ, বাঁধাই যথেষ্ট মানসম্পন্ন হলেও মুদ্রিত লেখা ততটা গ্রাহ্য হবার মতো নয়। অথচ এ-পত্রিকার সঙ্গে যারা জড়িত, আপাতদৃষ্টিতে তাদের কোনো অযোগ্যতা চোখে পড়ে না। কিন্তু এ পত্রিকার ব্যর্থতার দায় তো তাদেরই নিতে হবে।

মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার দেখে মোহিতলাল মজুমদার আতঙ্কিত হয়ে ‘পুঁথির প্রতাপ’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তাতে এই আশঙ্কা তিনি ব্যক্ত করেছিলেন যে, মুদ্রণ-ব্যবস্থাপনা সহজলভ্য হয়ে পড়ায় অনেক অপাঠ্য বিষয় গ্রন্থে রূপ নিতে পারে। সেই আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, তা নিশ্চয় আমাদের স্বীকার করতে হবে। সেই মানের একটি পত্রিকায় যদি রূপান্তরিত হয় শব্দঘর, তাকে মর্মান্তিক না বলে উপায় থাকবে না। কারণ এর সম্পাদক একজন মনোবিজ্ঞানীÑমোহিত কামাল। ব্যক্তিমন যেমন তার পর্যবেক্ষণের বিষয়, সেই ব্যক্তি-মানুষের সমবায়ে গড়ে ওঠা সমাজ-মানসকেও তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন বলে ধরে নেয়া যায়। পারেন নিশ্চয়। কিন্তু শব্দঘর কি সেই উপলব্ধির অভিব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় পাঠকের কাছে? একটি উন্নত মানসম্পন্ন অর্থাৎ এ-সময়ের একটি প্রতিনিধিত্বশীল পত্রিকার জন্য যে অর্থ ব্যয় হতে পারে, তার সবটুকুই হয় নিশ্চয়, তবু কেন পাঠকের প্রত্যাশার কাছে তাকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে হয়?

কেন পাঠক একটি গল্প বা প্রবন্ধ পড়ে তার শিরা-উপশিরায় রক্তের উন্মাদনাময় ছুটোছুটি উপলব্ধি করেন না? কেন ঘোরগ্রস্ত হয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকেন না ঘণ্টার পর ঘণ্টা? কেন জড়গ্রস্ত চেতনা চিতার মতো ক্ষিপ্র লাফ দিয়ে মেরু-বদল করে অভিনবত্বের স্বাদে উদ্বেল হয় না? বাথটাব থেকে বাইরে ছুটে যায় না কেন কেউ ‘ইউরেকা, ইউরেকা’ বলে?

জানি, ব্যর্থতাকে প্রকট করে তুলবার জন্য সমবেত হন না কিছু সমমনোভাবাপন্ন মানুষ, কিন্তু কেন সাফল্য থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যান? সম্ভবত যে-স্বপ্ন বুকে নিয়ে তারা এ কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তা বাস্তবায়নের ঠিক অনুকূল নয় বাস্তবতা। হাজার পাঠকের বিচিত্র চাহিদার জোগান দেয়া সহজ-সম্ভবও নিশ্চয় নয়। কিন্তু একেবারেই কি অসম্ভব? সিকান্দার আবু জাফরের ‘সমকাল’ তো পাঠকরুচির অনুমোদনই কেবল পায়নি, তা সমুন্নত করার ক্ষেত্রেও প্রগাঢ় ও সুদূরপ্রসারী অবদান রাখতে সমর্থ হয়েছে। তখন যদি সম্ভব হয়, এখন কেন সম্ভব হবে না, যখন তার প্রয়োজন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে তথ্য-প্রযুক্তির বদৌলতে? তাহলে বুঝে নিতে হবে, কী কী বিষয়ে লেখা থাকা জরুরি। এই সময়ের একটি পত্রিকার কাছে আমি চাইব আমার দেশের আমার ভাষার এবং সেই সঙ্গে সারা পৃথিবীর সেরা সাহিত্যকর্ম এবং সেই সম্পর্কিত সারগর্ভ আলোচনা।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান

বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়