সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর ঘরের আশ্রয় : মহীবুল আজিজ

May 2nd, 2018 9:59 am
প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর ঘরের আশ্রয় : মহীবুল আজিজ

প্রচ্ছদ রচনা

শব্দঘর ঘরের আশ্রয়

মহীবুল আজিজ

তিন বছর ধরে শব্দঘর যে-অধ্যবসায়ে তার প্রবহমানতা বজায় রেখে চলেছে তাতে এটিকে এখন এক ধরনের আশ্রয়ের কেন্দ্র বলে অভিহিত করাই যায়। সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-ইতিহাস প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ের মেলবন্ধনে এ-পত্রিকা ক্রমে প্রতিনিধিত্বের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। স্বাদেশিকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শব্দঘর-এর অঙ্গীকার বিশেষভাবে লক্ষ্য করবার মতো।

বাংলাদেশে একসময়ে সাহিত্য- শিল্পবিষয়ক পত্রিকার ভুবন বন্ধ্যাত্বের শিকার হয়েছিল। সমকাল, কণ্ঠস্বর, গণসাহিত্য, উত্তরাধিকার, ছোটগল্প, বিপ্রতীক, সুন্দরম এসব পত্রিকার পাঠকেরা প্রবলভাবে তৃষ্ণার্ত ছিলেন সুস্থ জীবনবোধসম্পন্ন সাহিত্য- পত্রিকার জন্যে। শব্দঘর সেই অভাব পূরণ করবে এমনটি আশা করা যায়। প্রসঙ্গত কালি ও কলম পত্রিকাটির কথাও উলে¬খ করতে হয়।

সময় এগিয়েছে, যুগ বদলেছে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিস্থাপন ঘটেছে। মনে পড়ে, পুরু-খসখসে ক্রাউন কাগজে ছাপা এনকাউন্টার পত্রিকার কথা। হয়তো আজকের প্রযুক্তির যুগে এটিকে সম্পূর্ণ অন্য রূপে হাজির করা যাবে কিন্তু এতে যে মিলান কুন্ডেরা’র গল্প পড়েছিলাম সেটি ভুলতে পারি না। সেই কবে পড়েছিলাম ‘লন্ডন ম্যাগাজিন’। লেখার সঙ্গে ভেতরে ব¬ক করে ছাপানো সিলভিয়া প¬াথ কিংবা লুই ম্যাকনিশ-এর প্রোফাইল-ছবি। তাঁদের ছবি দেখে, সমান্তরালে তাঁদের লেখা পড়ে যেন তাঁদের মনোচোখে ভেসে উঠতে দেখছি। অজান্তে তাঁদের একটা ব্যক্তিত্বও তৈরি হয়ে যায় এর মধ্য দিয়ে। সেটা কতটা মূলানুগ তা বলা মুশকিল তবু মনে হয় লেখালেখি যে একটা মর্যাদাপূর্ণ কাজ তা এসব পত্রিকা মনে রেখেছিল। কতকাল আগেকার কথা, ‘ফিকশন স্টাডিজ’ পত্রিকা পড়ছি- দেখে মনে হচ্ছে আমাদের মুনির অপটিমা’র ইংরেজি ভার্সনে কম্পোজ করে তারপর মুদ্রণ করা হলো। এখনও স্মৃতি ঝকঝকে- লাতিন হোসে দোনোসোকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা পড়ছি পত্রিকাটির। তাঁর সাক্ষাৎকার এবং তাঁকে নিয়ে দারুণ সব লেখা।  কিংবা ইটালো ক্যালভিনোর ‘মার্কোভালডো’। লেটার প্রেসে মুদ্রিত চতুরঙ্গ পত্রিকায় সম্ভবত পড়েছিলাম সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসটি। পত্রিকার সাজসজ্জার কথা ভুলে গেছি কিন্তু জেগে রয়েছে সেই উপন্যাস-পাঠের স্মৃতি। পাঠক শুধু রং আর ঢং-এ ভোলেন না, তিনি চান আধার ও আধেয়’র একত্র সম্মিলন। শব্দঘর হাতে নিয়ে সে-প্রত্যাশা জেগে ওঠে। আজকের প্রযুক্তির আশীর্বাদকে কাজে লাগিয়ে প্রকাশনাকে কতটা হৃদয়গ্রাহী করে তোলা যায় শব্দঘর সে-চেষ্টা করে দেখাচ্ছে।

শব্দঘর-এর প্রতিটি সংখ্যা পড়লে দেখা যাবে এর পেছনে রয়েছে সুচিন্তা ও সুপরিকল্পনা। বাংলাদেশের ও বিদেশের সেই লেখকদের রচনা এ-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে দেখি যাঁদের রচনা চিন্তা-উদ্দীপক এবং যাঁদের রচনা আমাদের মানস-পরিচর্যার পক্ষে উপযোগী। বাংলাদশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উপলক্ষগুলিতে শব্দঘর যেসব বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে সেগুলো নিঃসন্দেহে উচ্চ মানসম্পন্ন। একুশে, স্বাধীনতা ও বিজয়দিবস, বাংলা নববর্ষ প্রভৃতি উপলক্ষে পাঠক শব্দঘর-এর বর্ধিত কলেবর-সংখ্যার প্রতীক্ষায় থাকেন। এটি তিন বছরের আয়ুধারী একটি প্রকাশনার জন্যে গর্বের বিষয়।

এ-পত্রিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অনুবাদকর্ম। কেবল বিদেশি সাহিত্যের বঙ্গানুবাদ নয়, বাংলাদেশের মহৎ-সৎ সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে শব্দঘর-এর ভূমিকা অতুলনীয়। ক’দিন আগেই পড়ছিলাম মাহমুদুল হকের ‘কালো মাফলার’ গল্পটির ইংরেজি অনুবাদ। মূল গল্পটি সামনে রেখে পড়ে দেখছি একজন অসাধারণ শব্দ¯্রষ্টা আমার সামনে। যেসব ইংরেজিভাষী পাঠক কখনই মাহমুদুল হক পড়েননি, আমি নিশ্চিত তাঁরা তাঁর এই অনূদিত গল্পটির মাধ্যমে একজন মহৎ সাহিত্যিককে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন। এসব অনুবাদ আমাদের সাহিত্যকে যেমন পৌঁছে দিচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তর পরিসরে তেমনি নতুন প্রজন্মকে প্রণোদনা যোগাচ্ছে নিজেদের সাহিত্য-সম্পদের প্রতি মনোযোগী হতে। তাছাড়া বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে বসবাস করছে অসংখ্য বাঙালি। সকলেই যে বাংলা ভাষায় পারঙ্গম তা নয় কিন্তু ইংরেজি অনুবাদে তাঁরা বাংলাদেশের সাহিত্য পাঠ করে নিজেদের পূর্বপুরুষদের অবদান সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ পাবেন।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান

বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়