সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

প্রচ্ছদ : রচনা শব্দঘরমঙ্গল : বিশ্বজিৎ ঘোষ

April 30th, 2018 9:52 am
প্রচ্ছদ : রচনা শব্দঘরমঙ্গল : বিশ্বজিৎ ঘোষ

প্রচ্ছদ রচনা

শব্দঘরমঙ্গল

বিশ্বজিৎ ঘোষ

 

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে আমাদের দেশে নিয়মিত সাহিত্য পত্রিকার অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল। সে-সময় বিচিত্রা, সন্ধানী আর রোববার-ই ছিল আমাদের প্রধান পত্রিকা। অনিয়মিতভাবে বের হতো অনেক সাময়িকপত্র, বর্তমান সময়েও অনিয়মিত সাহিত্যপত্রের সংখ্যা কম নয়। তবে নিয়মিত বলতে, বিচিত্রা-সন্ধানী-রোববার-এর পর এতকাল আমাদের একমাত্র আশ্রয় ছিল আবুল হাসানাত সম্পাদিত কলি ও কলম। এ ধারায় বছরতিনেক আগে যুক্ত হয়েছে নতুন একটি নামÑ মোহিত কামাল সম্পাদিত শব্দঘর।

শব্দঘর নানাকারণেই অনন্য একটি পত্রিকা। প্রচ্ছদ, অঙ্গসজ্জা, মুদ্রণ-সর্তকতা, লেখা-নির্বাচন, বিষয়-বৈচিত্র্য, লেখকদের প্রতিকৃতি সংযোজনÑ সব দিক থেকেই শব্দঘর সচেতন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পেশাগত জটিল দায়িত্ব পালন করেও মোহিত কামাল পত্রিকাটির জন্য যে-ভাবে সময় দিয়ে যাচ্ছেন, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। প্রতিমাসে বৃহৎ আয়তনের এমন একটি পত্রিকা প্রকাশ, একক প্রচেষ্টায়, সত্যিই দুরূহ। সেই দুরূহ কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে মোহিত কামাল সচেতন সাহিত্য-পাঠকের কাছে ধন্যবাদার্হ হয়েছেন।

একটি সাময়িকপত্রেব সার্থকতা নির্ভর করে বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এরমধ্যে প্রধান তিনটি দিক হচ্ছে নিয়মিত প্রকাশ, বিষয়বৈচিত্র্য এবং নতুন লেখকসৃষ্টি। শব্দঘর তিন ক্ষেত্রেই ইতোমধ্যে সার্থক ভূমিকা পালনের স্বাক্ষর রেখেছে। পত্রিকাটি প্রথম সংখ্যা থেকেই নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। বিপুলায়তন এমন একটি পত্রিকার জন্য প্রতিমাসে লেখা সংগ্রহ যে কত কঠিন কাজ, তা সংশ্লিষ্টজন ভালোই জানেন। লেখা-নির্বাচন আর বিষয়-বৈচিত্র্যেও শব্দঘর সতর্কতা এবং সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। প্রবন্ধ. কবিতা, ছোটগল্প, নাটক, ধারাবাহিক রচনা, অনুবাদ, ভ্রমণ, বিশ্বসাহিত্য, পুরস্কার, ক্রোড়পত্র, বইকথা, লিটল ম্যাগাজিন সংবাদ, সাহিত্য-সম্মেলন সংবাদ, পাঠ-প্রতিক্রিয়া, শোকাঞ্জলি, পত্রসাহিত্য- কী নেই শব্দঘর-এ? নানাশ্রেণির পাঠকের দিকে লক্ষ রেখেই মোহিত কামাল নির্বাচন এবং বিন্যাস করেন শব্দঘর-এর রচনাবলি। নতুন লেখক সৃষ্টিতেও শব্দঘর পালন করে  যাচ্ছে দারুণ ভূমিকা। প্রতিষ্ঠিত লেখকের পাশাপাশি এ পত্রিকার স্থান পাচ্ছেন আনকোরা নবীন লেখক। রীতিমতো চাপ দিয়ে নতুনদের লেখা বের করে আনছে শব্দঘর। এই-ভূমিকা পালনই একটি সাহিত্য পত্রিকার উল্লেখযোগ্য কাজ হওয়া উচিত। এই ত্রিবিধ কারণেই শব্দঘর অনন্যতা দাবি করতে পারে।

মুদ্রণসৌকর্য একটি সাহিত্যপত্রিকার সার্থকতার গুরুত্বপূর্ণ একদিক। মুদ্রণপ্রমাদ এবং সৌকর্যহীনতা একটি পত্রিকাকে গুরুত্বহীন করে তোলে। শব্দঘর এদিক থেকেও পূরণ করেছে সাহিত্যপ্রেমী পাঠকের প্রত্যাশা। শব্দঘর-এর রচনাসমূহে মুদ্রণপ্রমাদ নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, পত্রিকাটির শিল্পনির্দেশকের কাজও লক্ষযোগ্য। ঝকঝকে ছাপা, উন্নত কাগজ, চমৎকার অঙ্গ-সজ্জা- সবদিক থেকেই শব্দঘর অনন্য।

শব্দঘর ভাষা-আন্দোলনের কথা বলে, শব্দঘর বলে মুক্তিযুদ্ধের কথা। শব্দঘর-এর মর্মে ও মননে সর্বদা ক্রিয়াশীল আছে ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বাঙালি জাতীয়তাবাদে অঙ্গীকারাবদ্ধ মোহিত কামালের শব্দঘর। এই পত্রিকায় মুদ্রিত রচনায় বাঙালির ঐতিহ্যিক-সাংস্কতিক সত্তাই সর্বদা প্রাধান্য পায়। শব্দঘর-এর অনন্যতার এটাও একটা প্রধান কারণ। শব্দঘর-কে এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে, লেখার মাধ্যমে বিস্তৃত করার প্রয়াস থাকতে হবে, বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের।

নানাকারণেই শব্দঘর আমার ভালো লাগে। তবে সূচিপত্রে মালার মতো করে মুদ্রিত লেখকদের প্রতিকৃতি কেমন যেন চাপ সৃষ্টি করে দৃষ্টিতে। সূচিপত্রে না দিয়ে যেখানে লেখাটি ছাপা হয়, সেখানে লেখকের প্রতিকৃতি দেওয়া যায় কিনা, তা ভাবা যেতে পারে। প্রতিকৃতি ছাপা ভালো, কেননা অনেক সময়ই বিশেষ কোনো লেখকের ভালো প্রতিকৃতি খুঁজে পাওয়া যায় না। সে-ক্ষেত্রে শব্দঘর হয়ে উঠবে ভবিষ্যতে এক ধরনের সংগ্রহশালা। গ্রন্থ-পরিচয় শিরোনামে নতুন একটা বিভাগ খোলা যেতে পারে, যেখানে বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত গ্রন্থসমূহের সমালোচনা থাকবে। প্রতি সংখায় একটি বইয়ের দীর্ঘ পরিচিতি ও মূল্যায়ন পত্রিকাটির জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। প্রতি সংখ্যায় বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পুরানো একটি সাহিত্যপত্রিকার পরিচিতি থাকলে কেমন হয়? সম্পাদক মহোদয়, একবার ভাববেন কি আমার এই প্রস্তাব? লেখকদের অপ্রকাশিত পত্রাবলির জন্যও একটা বিভাগ খোলা যায়। কিশোর-শব্দঘর নামে কিশোর-পাঠকদের জন্য একটা বিভাগ খোলা যায় কি? প্রতি সংখ্যাতেই যে সবকিছু থাকতে হবে এমন নয়, তবে এসব বিভাগ খুলতে পারলে, যতই তা অনিয়মিত হোক, পত্রিকাটি আরও মানঋদ্ধ হবে বলে আমার ধারণা।

শব্দঘর বেঁচে থাকুক, শব্দঘর নতুন নতুন লেখক সৃষ্টিতে আঁতুড়ঘরের ভূমিকা পালন করুক, শব্দঘর হয়ে উঠুক বাঙালি সাহিত্য-পাঠকের পরম আশ্রয়।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়