সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘরকে অভিবাদন : মোহীত উল আলম

April 29th, 2018 6:18 pm
প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘরকে অভিবাদন : মোহীত উল আলম

প্রচ্ছদ রচনা

শব্দঘরকে অভিবাদন

মোহীত উল আলম

 মোবাইলে একটা অজানা নম্বর থেকে ফোন এল।

: হ্যালো, স্যার বলছেন?

: হুঁ।

: স্যার, ঘুমের অষুধটা যে দিয়েছেন সেটা আর কতদিন খেতে হবে?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কাকে টেলিফোন করেছেন।

: ডা. মোহিত কামালকে।

তখন মোহিত কামালের সঙ্গে আমার চাক্ষুষ পরিচয় ছিল না। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হবার পর একদিন তাঁকে ওপরের ঘটনাটা বললে, তিনি বললেন, তাঁকেও টেলিফোন করে অনেকে শেক্সপিয়ার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে।

মোহিত কামাল বললেন, আমার এক আমেরিকাপ্রবাসী ভাগ্নে ছিল তাঁর জানের দোস্ত। সেখানে থামলেন না। তাঁর ২০১১ সালে বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ঘর উপন্যাসটি আমাকে উৎসর্গ করলেন। আমি যারপরনাই বিস্মিত। আরও বিস্মিত হলাম যখন ধানমন্ডির এক চীনা রেস্তোরাঁয় আমাদের কয়েকজনকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ করে তিনি জানালেন তাঁর অভীপ্সার কথা। তিনি মন শিরোনামে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বের করতে চান। পরে ঐ নৈশভোজে ঠিক হলো শব্দঘর নামটি।

ইতোমধ্যে মোহিতের দু’টো উপন্যাস আমি পড়ে ফেলেছি। সমালোচনাও করেছিলাম খানিকটা জোরালো। কিন্তু চিকিৎসার ব্যস্ততার মাঝেও তিনি যে এরকম কঠিন একটা কাজে হাত দিতে চাইছেন সেটা নিয়ে আমার উদ্বেগ ছিল। সত্যি বলতে কি আমি সেদিন মোহিত কামালের উচ্ছ্বাসকে ভেবেছিলাম ক্ষণিকের ভালো লাগা। কিন্তু সবার বিস্ময়কে বাড়িয়ে দিয়ে শব্দঘর এ পর্যন্ত নিয়মিত বের হয়ে চার বছরে পা দিল। খুব হালকাভবে পা দিল তা নয়, মোটামুটি প্রতিযোগিতা- মূলকভাবে আরও কয়েকটি জনপ্রিয় সাহিত্য মাসিকের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে। বাংলাদেশে এখন সাহিত্যমাসিক প্রকাশের ঢেউ চলছে। এতগুলো পত্রিকার মাঝে শব্দঘর তার স্বকীয়তা বজায় রেখে টিকে থাকবে নিশ্চয়।

একটা উপদেষ্টা পরিষদ করা হলো। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে ওপরে রেখে আরও কয়েকজনের সঙ্গে কবি কামাল চৌধুরীসহ আমার নাম ঢুকল। আর শব্দঘর একটার পর একটা বের হতে লাগল। ডিজিটাল যুগের সঙ্গে সমতা রেখে সাহিত্যপত্রিকা হওয়ায় শব্দঘর সচিত্র হতে বাধল না। মোহিত কামাল মনোরোগের চিকিৎসক, তাঁর স্ত্রী মাহফুজা আখতার চর্ম চিকিৎসক, তিনিই হলেন প্রকাশক। শব্দঘর-এর একটি উপ-শিরোনাম ঠিক হলো, ‘শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ’। উপদেষ্টা পরিষদের একটি ঘরোয়া সভায় কবি কামাল চৌধুরী সংশয় প্রকাশ করলেন এত সচিত্র বের করলে পত্রিকার খরচ মেটান দায় হয়ে উঠবে। কিন্তু মোহিত-দম্পতি অনড়। পয়সা খরচের কথা ভেবে তাঁরা পত্রিকার সচিত্র গ্ল্যামারটা নষ্ট করতে চান না। বিজ্ঞাপন আগে কম ছিল, এখন বেড়েছে।

কিন্তু আমাদের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে শব্দঘর এ-ফোর সাইজের কলেবরে নিত্য নতুন সাজে বের হতে লাগল। প্রথম প্রচ্ছদ, শেষের প্রচ্ছদ, ভিতরের রচনাগুলোর সঙ্গে ছবি ও চিত্র, ঐতিহাসিক ফটোগ্রাফ, আর একেবারে নির্ভেজাল সাদা পৃষ্ঠায় জীবন্ত কালো কালিতে ছাপা ম্যাগাজিনটি দ্রুত পাঠকপ্রিয়তা পেতে থাকে, এবং এর পাঠকসংখ্যা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে এল যখন জেলা শহরগুলোতেও তরুণ প্রজন্মের লেখকেরা এর মানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এতে জমা দিতে লাগল তাদের সেরা লেখাটি। প্রথমে নিজের ফ্ল্যাট বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে শব্দঘরের সম্পাদনার কাজ চালাতেন মোহিত। পরে ধানমন্ডির ১২/এ সড়কে দপ্তর স্থানান্তর হলে শব্দঘরের চরিত্রে ব্যস্ত সাহিত্যপত্রিকার ছাপ পড়তে থাকে। মোহিত সোল্লাসে জানালেন, এখন লেখার জন্য কারও কাছে হাত পাততে হয় না। মোহিতের আরেকটি ধারণা শব্দঘর বাস্তবায়ন করছে। বাংলা ধ্রুপদী সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ। প্রথম দিকে কয়েকটা গল্প আমিও অনুবাদ করে দিয়েছিলাম : আল মাহমুদের পানকৌড়ির রক্ত, আবদুল মান্নান সৈয়দের মাতৃহননের নান্দীপাঠ, এবং জহির রায়হানের একুশে ফেব্রুয়ারি। এখন অন্যরা করছে। শাবিপ্রবি-র ইংরেজির সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম করছেন। ম্যাগাজিনটার শেষের অংশে একটি পাতলা বিভাগে এই ইংরেজি সংস্করণটি থাকে। একবার ময়মনসিংহে একটি সাহিত্যসভায় কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের বললেন শব্দঘরকে তাঁর অপছন্দের কথা। বিশেষ করে ইংরেজিতে অনুবাদ বিভাগটি তাঁর ভালো লাগে না বললেন।

সৈয়দ শামসুল হক মারা গেলে শব্দঘর অক্টোবর ২০১৬ সংখ্যা তাঁর ওপর প্রকাশিত হলো। সম্পাদকীয়তে মোহিত ‘অমরত্মের সোনার মুকুট কি মাথায় ধারণ করোনি, কবি?’ এই শিরোনামে চমৎকার একটি স্মৃতিকথা জানালেন, যার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি শব্দঘর প্রয়াত কবির খুব প্রিয় পত্রিকা ছিল। আর ঠিক সম্পাদকীয়ের উপরিভাগে ছাপা হয়েছে জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবিÑ কবিকে রোগশয্যায় হাসপাতালে দেখতে আসার ছবি। এমনটিই শব্দঘর। খুব মেলাতে পারে, প্র্যাগম্যাটিক। যেমন গতবছর শেষের দিকে মোহিত টেলিফোন দিলেন। তাঁর একটা ক্ষ্যাপাটে স্বভাব আছেÑ আব্দার, অনুযোগ, খোঁচা, চাপ একত্রে মেশানো থাকে। সে মেশানো মেজাজ নিয়ে হুকুম দিলেন পরের বছর জানুয়ারি সংখ্যায় অর্থাৎ ২০১৬-এর বর্ষশুরু সংখ্যায় আমার একটা উপন্যাস যেতেই হবে। কোনো গাঁইগুঁই চলবে না। আমিও আশ্চর্য তাঁর হুকুম তামিল করলাম, সপ্তাহতিনেকের মধ্যে চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের ওপর আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গ্রেনেড শীর্ষক একটি উপন্যাস আঠার হাজার শব্দের মধ্যে লিখে ফেললাম।  মোহিত ঐভাবে চাপ না দিলে আমার বা অনেকের লেখা বের হতো না। উপন্যাসটি বেহুলা বাংলা সাথে সাথে বইমেলায় প্রকাশ করে। আমি খুব তৃপ্ত হলাম, মোহিতকে জানালাম ধন্যবাদ।

সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যায় সূচিপত্রে তাঁর (হকের) ছবিসহ হাসান আজিজুল হক প্রমুখসহ ঊনিশজন কবি-লেখকের আলোকচিত্র ছাপা হয়েছে। উচ্চ-সাহিত্যের মানে হয়ত এটা প্রগল্ভতা মনে হতে পারে, তবে তড়িৎবাহিত তথ্য-প্রযুক্তির যুগে ব্যক্তিগতভাবে শব্দঘরে আমরা এটাকে বেমানান মনে করি না। ছবি যে-কোনো লেখাকে অধিকতর বক্ষ্যমাণ করতে সাহায্য করে।

শব্দঘর মে ২০১৬ সংখ্যা রবীন্দ্র-নজরুল সংখ্যা। সাথে আছেন হাঙ্গেরির ২০০২ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী লেখক, হিটলারের ইহুদি নিধনের অন্যতম গ্যাস চেম্বার আউশভিৎজের বন্দি, ২০১৬ এর মার্চে প্রয়াত, লেখক ইমরে কার্তেজের ওপর দু’টি আলোচনা। আলপ্তগীন তুষার অংকিত প্রচ্ছদে এই তিনজন মহারথীর প্রতিকৃতি নিয়ে সুন্দর প্রচ্ছদ হয়েছে। একই সাথে নয়জন কবির গুচ্ছকবিতা ছাপা হয়েছে যাঁরা হলেন কামাল চৌধুরী, শিহাব সরকার, শামীম আজাদ, নাসির আহমেদ, খালেদ হোসাইন, সরকার আমিন, শামীম রেজা, টোকন ঠাকুর ও ওবায়েদ আকাশ।

ধারাবাহিক রচনার ক্ষেত্রে শব্দঘর কলকাতার দেশ পত্রিকার রীতি অনুসারে প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা এবং উপন্যাস ছাপে। দেশবরেণ্য শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও ফাতেমাতুজজোহরার ধারাবাহিক রচনা যথাক্রমে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ওপর প্রকাশিত হচ্ছে, যেগুলি খুব পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে বলে আমাদের জানা হয়েছে। হরিশংকর জলদাসের ধারাবাহিক, মুক্তস্মৃতি : নোনাজলে ডুবসাঁতার, সম্ভবত মাঝে মাঝে মধুর বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। বিতর্ক সৃষ্টি করাও একটি সাহিত্য পত্রিকার অন্যতম অভীষ্ট লক্ষ্য হতে পারে।

ঈদসংখ্যা ২০১৬ শব্দঘর ২৮০ পৃষ্ঠার ঢাউস একটি সংকলন। হরিপদ দত্ত পঞ্চপিতা শীর্ষক একটি উপন্যাস লিখেছেন, আর দ্বিতীয় উপন্যাসটি লিখেছেন মঈন আহমেদ বাদ্যি শীর্ষক। কাজী জহিরুল ইসলাম থাবড়া হামিদ নামে একটি উপন্যাসিকা লিখেছেন।

শব্দঘরের কাছে আমাদের চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই। মোহিতকে বলি, মোহিত ভাই, সুধীজন তো আমাদের পত্রিকার কথা তেমন করে বলছে না। মোহিতের ত্বরিত জবাব, আরে, ওগুলি নিয়ে ভাবেন কেন, সব পানি করে দেব না। তাঁর এ আত্মবিশ্বাস ক্রমে ক্রমে আমার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। কারণ শব্দঘরের চরিত্রটা হয়েছে খুব অকৃত্রিম, আন্অ্যাসিউমিং। কোনো কোনো পত্রিকার একটা ভাব থাকেÑ যা সাহিত্যের সত্যিকারের বিকাশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এই কৃত্রিম ভাব থেকে অসাহিত্যের ভিড়ে সাহিত্য হারিয়ে যায়। সাহিত্যের জগতে কৃত্রিমতা, বা ভীষণরকম একটি পোজ বা ভঙ্গি ঠিক সেরকমেরই অপ্রয়োজনীয়, যেরকম মানুষের মন বোঝার ক্ষেত্রে তার বহির্বেশ দেখা অপ্রয়োজনীয়। শব্দঘর এ পর্যন্ত এ কালিমা থেকে এতটুকু মুক্ত থাকতে পেরেছে যে, এর কারণে অন্তত বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে শেয়ালকে ব্যাঘ্র বলে ভ্রম হয়নি।

শব্দঘরের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করে এর বিস্তৃত পাঠককুলকে জানাই ২০১৭-এর নববর্ষের শুভেচ্ছা। সবাই ভালো থাকবেন।

লেখক : উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মসসিংহ