সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

এক সন্ধ্যায় পরিদের বাড়িতে – দিলওয়ার হাসান

September 20th, 2016 11:28 pm
এক সন্ধ্যায় পরিদের বাড়িতে – দিলওয়ার হাসান

গল্প

এক সন্ধ্যায় পরিদের বাড়িতে

দিলওয়ার হাসান

 

এক বিকেলে টোকনকে নিয়ে বেড়াতে যাবে এ রকম কথা দিয়েছিল শাকিল; কিন্তু নানা ব্যস্ততায় ব্যাপারটা ঘটছিল না বলে আজ টোকন নাছোড় হয়ে আবেদন জানালে শাকিল না করতে পারল না।

বিকেলটাও বেশ মনোরম, অথচ মুখে দাড়ির জঙ্গল। ওগুলো ঝেটিয়ে বিদেয় করতে খুব ঘটা করে বাথরুমে ঢুকল। তারপর থেকেই ক্রমাগত তার কণ্ঠের গান ভেসে বেড়াতে লাগলÑআজি বিজন ঘরে নিশীথ রাতে আসবে যদি শূন্য হাতে- আমি তাইতে ভয় মানি। শাকিল পুরো গানটিই গাইছিল গুনগুন করে। তার কণ্ঠের গান বরাবরই ভালোলাগে টোকনের, আজ লাগছে না। প্রতীক্ষা অসহ্য লাগছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে দ্রুত। শাকিল পৌঁছে গেছে শেষ লাইনে- জীবন দোলায় দুলেদুলে আপনারে ছিলেম ভুলে, এখন জীবন মরণ দুদিক দিয়ে নেবে আমায় টানি।

টোকন বিরক্তিতে চিৎকার করে উঠল, ‘আর কত দেরি করবে কাকু, সন্ধ্যে হয়ে এল যে।’ গানটা শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে শাকিল বিরক্ত হলো না। বলল, ‘এই আসছি।’ টোকনের মা রান্নাঘরে বিকেলের নাশতা তৈরি করছিল। ছেলের বিরক্তি দেখে বলল, ‘বাথরুমে এত দেরি করছ যে, অভিসারে যাবে নাকি?’ একথার কোনো উত্তর না দিয়ে শাকিল বলল, ‘হয়ে গেছে তো।’

ইঁচড়ে পাকা বলে বেশ বদনাম আছে টোকনের, চিৎকার করে বলল, ‘মা অভিসার কী?’ মা প্রমাদ গুনল, এই সেরেছে। অভিসার বোঝাতে বারোটা বেজে যাবে তার। ছেলেকে একটা ধমকানি দিয়ে বলল, ‘আর কটা বছর যাক নিজেই বুঝবি অভিসার কী।’ টোকন চুপ করে গেল। বুঝল, এটা বড়দের কোনো ব্যাপার হবে। বড়দের ব্যাপার হলে সবাই এ রকম বাঁকা জবাব দেয়।

তখন ঘোর করে সন্ধ্যা নেমেছিল। নাশতার টেবিলে বসে এককাপ চা আর কিছুই খেল না টোকন। আসন্ন সান্ধ্য ভ্রমণ নিয়ে উত্তেজনায় আছে। বাড়ি থেকে বাইরে বেরুনোই হয় না তার। স্কুল আর বাড়ি। সপ্তাহে একদিন পাবলিক লাইব্রেরি। দুটো বই পায়। পড়ে ফেরৎ দিলে আবার দুটো। হ্যান্স আন্ডেরসেনের রূপকথার বইটা কবে থেকে খুঁজছে। লাইব্রেরিয়ান সুরেশ কাকু বলেছে, ‘হাতে এলেই খবর দেব, বই বদলানোর সময় নিয়ে যেও।’

হ্যান্স-এর একটা মাত্র গল্প পড়েছে- দ্য লিটল ম্যাচ গার্ল। পড়ে যে কী মন খারাপ। দু-তিন দিন ভাতই খেতে পারেনি ঠিকমতো : বছরের শেষ দিনটাতে ভীষণ শীত পড়েছিল, আর চারদিকটা কেমন বিচ্ছিরি একটা অন্ধকার ছেয়ে গিয়েছিল। বরফ পড়ছির ক্রমাগত। গরিব একটা মেয়ে পায়ে জুতো-স্যান্ডেল কিছু নেই, মাথাটাও খালি; পুরনো একটা জামার ভেতর অনেকগুলো দিয়াশলাইয়ের বাক্স বহন করছিল বিক্রি করবার জন্যে; কিন্তু সারা দিনে কেউ একটাও কেনেনি। পেটে প্রচণ্ড খিদে নিয়ে ঠান্ডার মধ্যে পথ চলছিল নিঃশব্দে।

রাস্তার দুপাশের ঘরবাড়িগুলো থেকে উজ্জ্বল আলো ঠিকরে বেরুচ্ছিল। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল ভালো ভালো খাবারের সুঘ্রাণ। নববর্ষ উদ্যাপন নিয়ে ব্যস্ত সবাই। দুটো বাড়ির মাঝখানে একটা কোণায় গুটিসুটি মেরে বসেছিল সে। ঠান্ডায় একেবারে জমে যাচ্ছিল। বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ভেবেছিল একবার; কিন্তু একটাও যে বিক্রি হয়নি দিয়াশালাইয়ের বাক্স। বাবা যে মারবে তাকে। হাত দুটো গরম করবার জন্যে একটা ম্যাচের কাঠি জ্বালাল। সেই আলোতে দেখতে পেল একটা বাড়ির মস্তো ঘরে টেবিলের ওপর থরে থরে সাজান ভাঁপওঠা হাঁসের রোস্ট। কিন্তু অবাক কা- টেবিল থেকে লাফ দিয়ে নেমে থপ থপ করে মেঝের ওপর হেঁটে বেড়াচ্ছে একটা হাঁস, তার সারা শরীরে ছুরি আর কাটা চামচ বেঁধানো। তখন দেখতে পেল আকাশ থেকে একটা তারা পৃথিবীর বুকে খসে পড়ছে। আবার একটা ম্যাচের কাঠি জ্বালাতে দেখতে পেল অনেকদিন আগে মরে যাওয়া তার দাদিমা ওখানে দাঁড়িয়ে। সে আকুল হয়ে বলল, ‘আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও।’ ওর দাদিমা ছোট্ট মেয়েটাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরল তারপর দুজনে ছুটে চলল আলোয় ভরা পৃথিবীর বাইরে যেখানে ঠান্ডা নেই, ক্ষুধা নেই, ব্যথা নেই, বেদনা নেইÑ ওটা যে ঈশ্বরের জগৎ…

পরের দিন ভোরে নতুন বছরের সূর্য্যরে আলো এসে পড়েছিল তার গায়ে। তখনও বসেছিল, হাতে ধরা ছিল দিয়াশালাইয়ের বাক্স। গত রাতেই ঠান্ডায় জমে মরে গিয়েছিল মেয়েটা।…

শাকিল একটা রিকশা ডাকল। শহরে তখন প্রাণের চাঞ্চল্য। সার সার রিকশা চলছে, রাস্তার দু’পাশ দিয়ে। টুংটাং বেল বাজাচ্ছে। এদের অনেকের গন্তব্যই শহরের মাঝখানে অবস্থিত সিনেমা হল মাধবী টকিস। বিশেষ আয়োজনে একটা ভারতীয় ছবি চলছে- রাইকমল। বিখ্যাত লেখক তারাশংকরের কাহিনি। শাকিল একবার দেখেছে। টোকনকে নিয়ে আবার যাওয়া যায়। ছোটদের জন্যে হার্মফুল কিছু নেই।

এ-শহরে সান্ধ্যভ্রমণ বলতে বোঝায় শহরের দক্ষিণে অবস্থিত কালিগঙ্গা নদীর পাড় দিয়ে ঘুরে বেড়ান। ইদানীং পাড়টা চমৎকার করে বাঁধাই করে দেওয়া হয়েছে। অনেক লোকজন যায়। বিশেষ করে যুবক-যুবতী আর তরুণ-তরুণীরা। টোকন ভেবেছিল কাকু তাকে ওখানেই নিয়ে যাবে; কিন্তু রিকশার গতিবিধি দেখে তা মনে হলো না। কাকু বলল, ‘গতানুগতিকতা পরিহার করে আমরা আজ একটা ভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাব বুঝলি কিনা। তাতে আনন্দ বেশি, মজাও খুব, রাজি আসিছ তো?’ টোকন বলল, ‘সে তোমার ইচ্ছে। তুমি নিয়ে যাচ্ছ।’

‘তা ঠিক। তবে তোর একটা মতামত আছে না? সব কিছুতেই যাকে বলে গণতন্ত্র থাকা উচিত।’

‘ও বাব্বাহ, বেড়াতেও ডেমোক্র্যাসি কাকু।’

‘নয় তো কী।’

টোকন একটুখানি হেসে বলল, ‘মত আছে আমার।’

শাকিল বলল, ‘আজ আমরা যাব পরিদের বাড়ি।’

‘পরিদের বাড়ি? পরিদের আবার ঘরবাড়ি থাকে নাকি? ওরা থাকে বনে-জঙ্গলে, ‘গাছ গাছালিতে…’

‘তুই ঠিকই বলেছিস, কিন্তু দু’রকমের পরি হয় তা জানিস?

‘না তো।’

‘এক রকম পরি আছে যারা বনে-জঙ্গলে থাকে। বড়-বড় গাছ তাদের খুব প্রিয়। কোনো ফুটফুটে বাচ্চা তাদের পছন্দ হলে তারা নাকি ওদের গাছে উঠিয়ে নেয়, খুব যত্ন আত্তি করে, ভালো-ভালো সব খাবার খেতে দেয়। তবে একটা কথা তোকে বলে রাখিÑ সবই কিন্তু আমার শোনা কথা। এমন লোক তুই খুঁজে পাবি না যে পরি দেখেছে।

‘সে যাকতো। এই জাতীয় পরীরা দেখতে ভীষণ সুন্দর হয়। রংটা একেবারে টুকটুকে, দুধে আলতায় যাকে বলে, খুব ফর্সা আরকি। তাদের দুটো ডানা থাকে। ডানাগুলোও দেখতে ভারি সুন্দর। নিমেষেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে উড়ে-উড়ে; কিন্তু তারা কথা বলতে পারে না।

‘আর এক ধরনের পরি আছে যারা দেখতে সুন্দর, গায়ের রং ফর্সা। লম্বাচুল, টানা-টানা চোখ, কমলার কোয়ার মতো ঠোঁট, গালে গোলাপি আভা, তবে রংটা ডানাওয়ালা পরিদের মতো এতো উজ্জ্বল নয়- দুধে-আলতায় বলতে যা বোঝায় তা নয়। এদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট কী জানিস? এরা কথা বলতে পারে, ডানা নেই বলে উড়তে পারে না।’

টোকান অবাক হয়ে বলল, ‘পরিদের এই ভিন্নতার ব্যাপারটা জানতাম না তো।’

‘সবাই কি সবকিছু জানে? সবকিছু সরার জানা সম্ভবও নয় বুঝলি কিনা। তবে চেষ্টা করলে অনেক কিছু জানা যায়। তোর তো বয়স কম, বড় হলে আরও অনেক জিনিস জানতে পারবি।

ওদের রিকশাটা ততক্ষণে শহরের কোলাহল ছড়িয়ে শহরতলরি একটা রাস্তায় এসে পড়েছে। এখানে স্ট্রিট লাইট থাকলেও শহরের মতো এত আলোকিত নয।

শাকিল গুনগুন করে একটা গান ধরল, এবার আজি বিজন ঘরে নয়। অন্য গানÑ মনে হলো যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ আসিতে তোমার দ্বারে,…। শাকিল গান শেখেনি কারও কাছে, কিন্তু অনেক গানই গাইতে পারে।

গান শেষ হওয়ার আগেই হাত তুলে রিকশাওয়ালাকে থামাল। রাস্তাটা ওখানেই শেষ। তারপর ফসলের জমি। একটা কাচা রাস্তা নেমে গেছে ডান দিক দিয়ে। হেঁটে যেতে হলো। তারপর মস্তোবড় একটা টিনের বাড়ি। চারদিকে গাছপালা। একেবারে গণ্ডগ্রাম। শহরের এত কাছে এমন একটা গ্রাম দেখে ভালো লাগল টোকনের।

‘এই তোর পরিদের বাড়ি। পরিস্থান বলা যেত, তাহলে রূপকথার মতো লাগত।’ শাকিল বলল।

‘বুঝেছি, দু’নম্বর ক্যাটাগরির পরি- কথা বলতে পারে ডানা নেই বলে উড়তে পারে না।।’

টোকনকে একটুখানি দূরে দাঁড় করিয়ে রেখে দরজায় কড়া নাড়ল শাকিল। বাইরে কম ভোল্টের একটা হলুদ বাতি জ্বলছে। সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায় না। দরজা খুলে কলকল করে উঠল ক’জন। শাকিল বলল, ‘আমার সঙ্গে আমার ভাইয়ের ছেলে আছে। সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছে। ফেলে আসতে পারলাম না কিছূতেই।’ একটা পরি চাপাস্বরে বলল, ‘কাজটা ভাল করনি, ছি।’

‘দূর কিচ্ছু হবে না, ছেলে মানুষ।’ শাকিল ডাকল, ‘টোকন আয় এদিকে।’

ঘরে ঢুকে টোকন দেখল, পুরনো কটা কাঠের রংওঠা চেয়ার সুন্দর করে সাজান। বড় একটা কাচের আলমারি। বার্নিশ উঠে গেছে। একটা কাচ ভেঙে গেছে। তার অভাব পূরণ করেছে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের একটা সাদা কালো ছবি। আলমারির পাশে ভাঙা একটা টেবিল। ধবধবে সাদার ওপর রঙিন মূর্তির কাজ করা টেবিলক্লথ। ধুলোর পাতলা একটা সর পড়ে আছে। দেয়ালে ফড়-ফড় করে উড়ছে সাধনা ঔষধালয় (ঢাকা) লি. এর একটা বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতা। ক্লান্ত ঘুরে চলেছে একটা বৈদ্যুতিক পাখা। নাকে এসে ধাক্কা দিচ্ছে ধুপের গন্ধ। গন্ধটা টোকনের ভালো লাগে। টেপি দি কিংবা ভূপেন কাকুদের বাড়িতে গেলে এ-গন্ধটা পায়।

কাচের আলমারিটাতে তালা দেওয়া নেই। অনেক পুরনো বই সাজানো- রবীন্দ্র ও বঙ্কিম রচনাবলী, মধুসূদন কাব্যসম্ভার, মহাভারত, শারদীয় দেশ, বেলাদের রান্নার বই, গৃহদাহ, পথের দাবী। ছেড়া একটা বই দেখল- নেতাজী সুভাষচন্দ্রের ভারত পথিক, আত্মজীবনী- সিগনেট প্রেস।

টোকন শাকিলকে বলল, ‘বইগুলো নেড়ে চেড়ে দেখতে পারি কাকু?’

‘দাঁড়া, ওদের জিজ্ঞেস করে আসি। পারমিশন না নিয়ে কোনো কিছুতে হাত দেওয়া উচিত নয়। একটা পর্দা সরিয়ে ভেতরে গেল। ফিরে এসে বলল, ‘দেখতে পারিস। তোকে কিন্তু খানিকটা অপেক্ষা করতে হবে পরিদের দেখা পেতে।’

‘ঠিক আছে কাকু।’

ছেঁড়া বইটার ঠিকুজি মেলাতে বসল- দ্বিতীয় সংস্করণ। ফাল্গুন ১৩৫৭। প্রকাশক দিলীপ কুমার গুপ্ত, সিগনেট প্রেস ১০/২, এলগিন রোড, কলিকাতা-২০, অনুবাদ করেছেন সুভাষ সেন, প্রচ্ছদপট সত্যজিত রায়… সূচিপত্রের পরে নেতাজীর একটা বিরল কেশ ছবি। তারপর বইয়ের শুরু। প্রথম পরিচ্ছেদ জš§ ও শৈশব : ঊনিশ শতকের শেষভাগে আমার পিতা শ্রী জানকী নাথ বসু বাংলাদেশ ছেড়ে উড়িষ্যায় গিয়ে আইনজীবী হিসেবে কটক শহরে বসবাস করতে শুরু করেন। এই কটকে ১৮৯৭ সালের ২৩ শে জানুয়ারি শনিবার আমার জন্ম।…

এর বেশ ক পৃষ্ঠা পড়ে সুভাষ বসুর স্কুল জীবনের কথা, টোকনের ভালো লেগে যাওয়ায় পড়তে লাগল : আমার স্কুলটা ছিল মিশনারিদের, আর এখানকার বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীই ছিল য়ুরোপীয় কিংবা এংলো-ইন্ডিয়ান। ভারতীয়দের জন্য গোনাগুনতি কয়েকটি (শতকরা বোধ হয় ১৫টা) সীট ছিল। আমার অন্য ভাইবোনেরাও এই স্কুলে পড়ত, কাজেই আমিও এখানে ভর্তি হলাম।… এদের অনুমতি নিয়ে বইটা ধার করতে হবে এরকম ভেবে টোকন পাতা ওল্টাতে লাগল আর এতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। তখন একে-একে ঘরে ঢুকল পাঁচজন- তাদের হাতে খাবারের থালা, পানির জগ আর গ্লাস। ওগুলো টেবিলে রেখে বলল, ‘টোকন তুমি কেমন আছ?’ পাঁচ পরিকে এক সঙ্গেই দেখে টোকন অবাক। শাকিল কাকুর বর্ণনার চেয়েও এরা অনেক বেশি সুন্দর। বিস্ময়ভরা চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ তারপর সংবিত ফিরে পাওয়ার ভঙ্গিমায় বলল, ‘ও তোমরাই তাহলে পরি?’

‘পরি?’

একযোগে সবাই অবাক। ‘পরি কথাটা পেলে কোথায়?’

‘ওমা শাকিল কাকুই তো বলল।’ শাকিল মুচকি হেসে বলল, ‘তোমরা তো পরি-ই’ টোকন বলল, ‘তবে দ্বিতীয় ক্যাটাগরির। ডানা নেই, উড়তে পারে না, কথা বলতে পারে।’ এ কথা শোনার পর ওরা আরও অবাক হলো। শাকিলের উদ্দেশে একটা ধমক ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘দিনদিন তোমার দুষ্টুমির মাত্রা বাড়ছে।’

‘বাদ দাও তো ওসব, আমার মহাজ্ঞানী ভ্রাতুষ্পুত্রের সঙ্গে আলাপ কর।’

টোকন বলল, ‘তোমাদের নাম তো আছে, তাই না?’ এদের মধ্যে বয়সে যে বড় সে বলল, ‘বিলক্ষণ বিলক্ষণ। এই আমার নাম করবী, ওর নাম মালতী, ওর নাম টগর, ও শেফালী, আর এই যে আমাদের সব্বার ছোট ওর নাম বেলি।’

‘আশ্চর্য সবারই দেখি ফুলের নামে নাম। তা তোমাদের আসল নাম নেই?’ করবী মনে মনে ভাবল ছেলেটা দেখি ভারি ইয়ে। মুখে বলল, ‘অবশ্যই আছে- আমার নাম অনুসূয়া বন্দ্যোপাধ্যায় ও নীপবীথি বন্দ্যোপাধ্যায়,…।’ আরও তিনটে আসল নাম গড়গড় করে বলে গেল করবী।

‘বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় তোমাদের কে?

‘পিতা, পিতা। এ নাম তুমি জানলে কী করে?’

‘এই বইটাতে লেখা আছে, হ্যান্ড রাইটিং খুব সুন্দর। বইটা ধার নিতে চাই আমি নেতাজীর আত্মজীবনী।’

‘নিশ্চয়ই, যে কোনো বই নিতে পার। একেবারে নিয়ে যেতে পার। আমরা এগুলো পড়ি না।’

‘সব আমি নেব না, শুধু সুভাষ বসুরটা নেব। তোমরা পড় না কেন?’

‘পড়ে কী হবে। তাছাড়া ভাল্লাগে না।’ যার নাম মালতী সে বলল।

‘পড়তে ভালো লাগে না তো কী ভালো লাগে?’

এ-ছেলেটা নির্ঘাৎ জ্বালাবে আজÑ একথা ভাবতে ভাবতে টগর বলল, ‘নাচতে ভালো লাগে, গাইতে ভালো লাগে।’

‘সত্যিই। নাচোতো একটু দেখি।

‘এখন? তা কী করে হয়। নাচতে সাজ লাগে, পোশাক লাগে, সুর তাল লাগে।’

‘তোমরা তো সবাই সাজুগুজু করেই আছ। ঠোঁটে লিপস্টিক। গালে রুজ, চোখে কাজল। পায়ে আলতা। তোমরা কি রোজ এমন সাজ? আমি একটা গান জানি, নাচের। তোমরা বললে গাইতে পারি- নৃত্যের তালে-তালে হে- নটরাজ।’

অবাক হয়ে একজন বলল, ‘এতো রবি ঠাকুরের

ভারি কঠিন একখানা গান।’

‘হ্যাঁ, দেবী দি শিখিয়েছে।’

‘দেবী দি মানে? দেবাঞ্জনা সরকার?’

‘হ্যাঁ, তোমরা চেন ওকে?’

‘ওকে এ-শহরে কে না চেনে।’

পাশের ঘরে গিয়ে ওরা নূপুর পরে এল।

হারমোনিয়াম আর তবলা-ডুগি আনল। টোকন একদম বড়দের মতো গাইলÑ নৃত্যের তালে তালে, নটরাজ, ঘুচাও ঘুচাও সকল বন্ধ হে।… ওরা সবাই নাচে অংশ নিল। গানের প্রায় শেষে- যুগে যুগে কালে কালে সুরে সুরে তালে/জীবন- মরণ-নাচের ডমরু বাজাও জলদমন্ত্র হে তে এসে তাল রাখতে খুব কষ্ট হলো টোকনের। ছেলে মানুষ। মালতী বলল, ‘ও হে শাকিল তোমার ভ্রাতুষ্পুত্র সত্যিই একটা ট্যালেন্ট। নাও এবার আমাদের সেবা গ্রহণ কর। বড় ভালো গেয়েছ। এ-গান গাইতে গিয়ে বাঘা বাঘা শিল্পীরা হিমশিম খায়,…।’

থালায় সাজান চিড়ে-মুড়ি-খই। মুড়কি, নারকেল, ঢ্যাপ আর তিলের নাড়ু। কটা প্যারার সন্দেশ রসগোল্লা আর একটুখানি পায়েস। সবটা থেকে একটু-একটু নিয়ে খেল টোকন। বলল, তোমাদের বানান এসব খাদ্যের প্রশংসা না করে উপায় নেই। বড় স্বোয়াদ হয়েছে। ভূপেন কাকুর বাসায় আগেও অনেক খেয়েছি, এত স্বাদ নয়।’

‘কোন ভূপেন কাকু, ডাক্তার?’

‘হ্যাঁ, আমাদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান।’ সবাই একসঙ্গে চমকে উঠল।

‘তা নাচ গান ছাড়া আর কী ভালো লাগে তোমাদের?’

‘খেতে। ভালো-ভালো খেতে। এই ধরো পোলাও, কোরমা কালিয়া, জর্দ্দা, ফিরনি-পায়েস। বড় বড় মাছ রুই, কাতল, পাঙ্গাশ,… বলল টগর।

‘তা খেলেই তো পার।’

বেলি বলল।’ ‘এতো খাবার দাবার আমাদের কে এনে দেবে?’

‘কেন তোমাদের বাবা?’

‘তিনি তো নেই, সেই কবেই মরে গেছেন। মা-ও নেই আমাদের।’ ‘বড় ভাই নেই তোমাদের? আমাদের ফ্যামিলির কথা যদি ধর।’ আমার বাবা সবার বড়, তিনি বড় ভাই,…’

‘নাহ, কোনো বড় ভাই নেই আমাদের। আমরা পাঁচ বোন।’

‘তাহলে তো বড় মুশকিল হলো। তোমাদের টাকা দেয় কে?’

‘আমরা নিজেরাই।’

‘চাকরি টাকরি কর বুঝি?’

‘না মানে ধর চলে যায় কোনো মতে।’ বেলি তোতলাতে থাকে। শাকিল তখন বলল, ‘আজ তবে ওঠা যাক টোকন। রাত অনেক হয়েছে। মা বকবে।’

ওদের সঙ্গে আরও খানিকটা গল্প করার ইচ্ছে ছিল টোকনের, তা আর হলো না। আর একদিন না হয় আসা যাবে ভাবল সে। বিদায় বেলায় সবাই ঝুম ঝুম করে উঠে এল। ঘটা করে চুমু খেল টোকনের গালে। একেকজনের শরীরের ঘ্রাণ একেক রকম। সবাই ভিন্ন ভিন্ন পারফিউম মাখে।

‘টোকন আবার এস তুমি।’ সবাই সমন্বয়ে বলল। ‘হ্যাঁ, তখন মাকে নিয়ে আসব। খুব মজা হবে। মা না কোথাও যায় না। শুধু কাজ আর কাজ।’ এ কথা শুনে সবাই আর এক প্রস্ত চমকাল।

আধো আলো আধো অন্ধকারের ভেতর পরিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামল ওরা। এগারটার মতন বাজে। রাস্তায় একটাও লোক নেই। শাকিল বলল, ‘কিছুটা রাস্তা না হাঁটলে রিকশা পাওয়া যাবে না। পরিদের কেমন দেখলি।’

‘ওদের খুব কষ্ট। বাবা নেই, বড় ভাই নেই।’

‘তাতে কী নিজেরাই নিজেদের দেখ ভাল করে। চিরদিন সবার বাবা থাকে নাকি।’

‘তা ঠিক কাকু। আজ একটা জিনিস লক্ষ্য করে খুব অবাক হলাম। তুমি যখন ও ঘরে ছিলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলাম। দেখলাম এ বাড়ি থেকে মামুন কাকু বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি ডাকলাম জোরে-জোরে, শুনল না। তারপর ভূপেন কাকুকে দেখলাম, তার একটু পর তার ছেলে শিলুদা। আমি তাদেরও ডাকলাম, একবার শুধু পেছন ফিরে তাকাল, তারপর চলে গেল ধাই-ধাই করে। ভূপেন কাকু কেন আসবে? এ-বাড়ির কারও তো অসুখ নয়।’

শাকিলের চোখে-মুখে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল একবার। বলল, ‘ধুর, কী যে বলিস না’ ভূপেন দার এখানে আসবার সময় কোথায়, তার প্রাকটিস আছে না? আর ওই যে বললি মামুনের কথা, আর যেন কার কথা বললি, ও শিলু। ওরা তো আসেইনি, এল তো দেখতাম আমি। তুই অন্ধকারে কাকে দেখতে কাকে দেখেছিস। চল ওই একটা রিকশা আসছে। অ্যাই যাবে? স্টেশন রোড, দশ টাকা বেশি দেব।’

রিকশাওয়ালা বলল, ‘ওঠেন সাহেব, ওঠেন।’ তারপর দ্রুত প্যাডেল করল। আকাশে কাল মেঘ জমেছে, যে কোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে।

শাকিল বলল, ‘সন্ধেটা ভালোই কাটল কী বলিস?’ টোকন কিছু বলল না। শাকিল তখন বলল, ‘তোকে একটা অনুরোধ করতে পারি?’

‘আমাকে? অনুরোধ করবে কেন আদেশ কর কাকু।’

‘না ব্যাপারটা সে রকম নয়।’

‘তাহলে?’

‘আজ যে আমরা পরিদের বাড়ি গিয়েছিলাম এ কথা কাওকে বলতে পারবিনে। তোর মাকেও না।’ খুব অবাক হলো টোকন। ‘ধুর কী যে বল না এমন একটা আনন্দের সন্ধ্যা।

নাচ-গান, মুড়ি-মুড়কি,… মাকেও বলা যাবে না।’

‘বললাম তো কাওকে না।’ একথা বলে খুব গম্ভীর হয়ে গেল শাকিল। গম্ভীর হওয়া শাকিলের স্বভাবের বাইরেÑ সারাক্ষণ হাসি-খুশি ফুর্তিবাজ একটা মানুষ। টোকন খুব চিন্তিত হলো।

‘কী এমন ব্যাপার কাওকে বলা যাবে না?’

‘বললাম তো বলা যাবে না, এত কথা বলছিস কেন?’

‘আর কাউকে না বলি মাকে বলব না এতগুলো সুন্দর-সুন্দর পরির গল্প? তাহলে যে আমার পেটের ভাতই হজম হবে না কাকু। মাকে অন্তত বলতে দাও।’

একথা শুনে শাকিলের মুখ সাদা হয়ে গেল নিমেষে। টোকনের দুটি হাত চেপে ধরে বলল, ‘প্লিজ টোকন।’ কাকুর এই কাতরতায় খুবই অবাক হলো শাকিল। বলল, ‘রোজ তোকে বেড়াতে নিয়ে যাব। ওই যে রাইকমল ছবিটা এসেছে না, দেখাব তোকে কালই,…।’

‘কিছুই করতে হবে না তোমাকে। এত করে যখন বলছ কাউকে বলব না।’ এ-কথা শুনে হালে পানি পেল শাকিল। ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোয়ার রিং বানাতে লাগল। ওদের রিকশা তখন মূল শহরে এসে পড়েছে।